প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২৩
বন্যা সিকদার
“আমি প্রেগন্যান্ট….
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মৌ নিজের মুখ নিজে চেপে ধরল। সে কি বলতে কী বলে ফেলল! ভাবতেই নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তার। কিন্তু ওদিকে উজান কথাটি শোনা মাত্রই বিদ্যুৎ গতিতে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল। আতঙ্ক আর বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল সে।
“আস্তাগফিরুল্লাহ‚ নাউজুবিল্লাহ! শাশুড়ি মেয়ে বলে কি? বাসরের ব ও করতে পারলাম না আর এই মেয়ে বলে সে প্রেগন্যান্ট। দয়াল‚ এ কেমন খেলা দেখাইলা? পরিশ্রম করার আগেই ফসল উৎপাদন শেষ। উজান কী কপাল নিয়ে জন্মেছিস তুই।
মৌ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে উজানে’র দিকে। সে না হয় ভুল করে কথাটা বলেই ফেলেছে‚ তাই বলে মানুষটা তাকে এমন কড়া কথা শোনাবে? সে তো সব সময় তাকে ‘পিচ্চি পিচ্চি’ বলে খেপায়; তাহলে এই পিচ্চি যে ভুলবশত কথাটা বলে ফেলেছে‚ সেটা তার প্রফেসরের মাথায় ঢুকল না? ফের উজান কিছু বলতে উদ্যত হতেই মৌ তড়িঘড়ি করে নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে উজানে’র মুখ চেপে ধরল।
”এই না না! আ আ আমি আসলে ওটা বলতে চাইনি। আমি কোনো পঁচা কাজ করিনি‚ সত্যি বলছি।
মৌ’য়ের গলায় আকুতি। উজান সঙ্গে সঙ্গে মৌ’য়ের হাতটা সরিয়ে তাকে নিজের সামনে সোজা করে বসিয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ “তাহলে বললে কেন যে তুমি প্রেগন্যান্ট? তুমি সত্যি সত্যি প্রেগন্যান্ট নও তো আবার?
মৌ উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলে‚ “না না‚ আমি ওটা একদম বলতে চাইনি। মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। আমি আসলে প্রেম করব‚ এটাই বলতে চেয়েছিলাম।
“হোয়াটটট? তুমি উজান চৌধুরীর ওয়াইফি হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে প্রেম করতে চাও? সিরিয়াসলি? পিঠে চ্যালাকাঠের বাড়ি পড়েনি বলে সাহস বড্ড বেড়ে গেছে‚ তাই তো?
”এ এ এ এমন করছেন কেন? আপনি তো আমায় বউ বলে মানেনই না‚ এমনকি আপনার কাছে গেলেও নাকি আপনি বড্ড বিরক্ত ফিল করেন। সেই জন্যই ভাবছিলাম একটা প্রেম করব‚ তারপর আপনাকে…..
মৌ বাকি কথা শেষ করার আগেই উজান আচমকা তার গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর এক হিংস্র বাঘের মতো গর্জন তুলে। “আমার থেকে মুক্তি চাইলে তোর জিহ্বার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলব। তুই অনলি অ্যান্ড ওয়ান উজান চৌধুরীর‚ জাস্ট মাইন্ড ইট!
উজান মৌয়ের গাল এতটাই জোরে চেপে ধরেছিল যে‚ মেয়েটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। সে ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু উজান তাকে ছাড়ল না। বরং রাগে গজগজ করতে করতে বলে উঠলো।
“নেক্সট টাইম যদি অন্য কোনো পুরুষের কথা তোর ওই মাথায় এনেছিস‚ তবে তোকে নিজ হাতে খুন করবে এই উজান চৌধুরী!
কথাটা শেষ করেই উজান বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রাগের মাথায় সে এত জোরে গাল চেপে ধরেছিল যে‚ মুহূর্তেই মৌ’য়ের ফর্সা গাল দুটো রক্তিম লাল হয়ে উঠল। মৌ’য়ের চোখ বেয়ে এবার অজস্র অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। মেয়েটা কিছুতেই নিতে পারছে না উজানের এই ছোট ছোট কথার আঘাত। একটা মানুষ কি এভাবে বাঁচতে পারে? যে সম্পর্কের না আছে কোনো ঠিক-ঠিকানা‚ আর না আছে একটুখানি ভালোবাসা! এভাবে জোর করে তো কোনো সম্পর্ক টিকে থাকে না। মৌ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই একসময় মেঝেতে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এর কিছুক্ষণ পর উজান তার সেই রাগী মুখখানা নিয়েই রুমে ঢুকল। রুমে ঢুকেই তার কপাল কুঁচকে গেল। পুরো রুম অন্ধকার; সম্ভবত মৌ রুমের লাইট অফ করে ঘুমিয়েছে। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে রুমের লাইটটা জ্বালাল। আলো ফুটতেই সে দেখল‚ মৌ মেঝেতে একদম গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। মেয়েটার এমন মলিন‚ বিষণ্ণ মুখখানা দেখা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা এক নিমেষে মোচড় দিয়ে উঠল।
সে দ্রুত মৌ’য়ের সামনে এগিয়ে গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। মৌ’য়ের এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে মুহূর্তের মধ্যে উজানে’র সব রাগ কর্পূরের মতো উবে গেল। সে তড়িঘড়ি করে মৌ’কে বিছানায় নিয়ে গিয়ে পরম যত্নে শুইয়ে দিল। মনে মনে এক তীব্র অনুশোচনা জাগল তার—রাগের মাথায় মেয়েটাকে সে বড্ড বেশি হার্ট করে ফেলেছে! কিন্তু সে তো এমনটা চায়নি; আসলে নিজের পজেসিভনেসের কারণে রাগটা সে কন্ট্রোল করতে পারেনি। উজান আলতো করে ঝুঁকে মৌ’য়ের সারা মুখমণ্ডল অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তুলল। কাঁপা কাঁপা হাতে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখল। খেয়াল করল‚ মেয়েটার শরীরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে।
বিকেলে ওই বৃষ্টিতে বেশি ভেজার ফল এটা। রুমের জানালাগুলো খোলাই ছিল‚ সেখান থেকে তীব্র বেগে ঠান্ডা বাতাস এসে বারবার মৌ’কে কাঁপিয়ে তুলছিল। এটা দেখে উজানে’র নিজের ওপর আরও রাগ হলো। সে মৌ’কে ভালো করে কমফোর্টার দিয়ে ঢেকে দিয়ে রুমের সব জানালা লক করে দিল। তারপর আবার এসে প্রিয়তমা’র পাশে ঝুঁকে বসল। কিছু সময় তার নিষ্পাপ মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে উজান নিজের গুনগুন করে গেয়ে উঠল….
তোমার চোখে আকাশ আমার‚ চাঁদ উজার পূর্ণিমা…!!
ভেতর থেকে বলছে হৃদয়…তুমি আমার প্রিয়তমা…!! ২
পথের শুরু থমকে শেষ‚ যাব তোমায় ভালোবেসে‚
বুকে আছে তোমার জন্য অনেক ব্যথা জমা।
তোমার চোখে আকাশ আমার‚ চাঁদ উজার পূর্ণিমা…!”
ভেতর থেকে বলছে হৃদয়…তুমি আমার প্রিয়তমা…!!
এইটুকু গেয়ে নিজের পাগলামিতে নিজেই মৃদু হাসল উজান। মেয়েটাকে সে অসম্ভব রকম ভালোবাসে‚ অথচ মুখে তা স্বীকার করতে তার বড্ড অনীহা। লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখা‚ সামনাসামনি তাকে আড়াল করা। আবার চোখের পলক একটু দূরে গেলেই উজান অস্থির হয়ে ওঠে। মানুষ বলে‚ প্রথম ভালোবাসা ভুলে দ্বিতীয় ভালোবাসা কখনোই নাকি ততটা গভীর হয় না; তবে সেটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
উজানে’র কাছে তার প্রথম ভালোবাসার চেয়েও এই দ্বিতীয় ভালোবাসা অনেক বেশি গভীর ও তীব্র। প্রথম জনের চেয়েও এই দ্বিতীয় নারী তার জীবনে শ্রেষ্ঠ। এই মেয়েটা যদি কোনোদিন জানতে পারে যে‚ প্রফেসর উজান চৌধুরী তাকে পাওয়ার জন্য কতটা পাগলামি করত‚ তবে সে কি নিজেকে সামলাতে পারবে? নাকি খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়বে? পিচ্চি মেয়েটা নিজেও জানে না উজান তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে কী কী করেছে। এসব জল্পনা-কল্পনা ভাবতে ভাবতেই উজানে’র ফোনে একটা মেসেজ এল। সে আর দেরি না করে পরম মমতায় মৌ’য়ের কপালে ও ঠোঁটে আলতো করে ছোঁয়া দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল।
রাত তখন প্রায় নয়টা। ইফাত আর তন্ময় লেকের পাড়ে বসে আছে। বসে আছে বললে ভুল হবে‚ তারা দুজন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে উজানে’র জন্য। এই জায়গাটা তাদের তিন বন্ধুর খুব পছন্দ। বেশির ভাগ সময় অবসরে তারা এখানেই এসে আড্ডায় মেতে ওঠে। হঠাৎই সেখানে উজানে’র আগমন হলো। সে আধঘণ্টা দেরি করে আসায়‚ তন্ময় গুনে গুনে চারটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল তার পিঠে। উজান কোনো প্রতিবাদ না করে চুপচাপ দুজনের মাঝে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। তন্ময় ততক্ষণে চেঁচিয়ে উঠল।
”শালা ভণ্ড এ নাকি বউ মানে না‚ অথচ বউকে রেখে আমাদের কাছে আসতে তার আঠারো ঘণ্টা লেগে যায়। এতক্ষণ কী করছিলি তুই‚ হ্যাঁ?
উজান কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। তার সেই রহস্যময় হাসি দেখে তন্ময় আরও রাগান্বিত হলো। সে ইফাত’কে উদ্দেশ্য করে বলল‚ “ইফাত ওকে হাসতে বারণ কর নয়তো গুলি করে ওর খুলি উড়িয়ে দেব। বিয়ে করে এখন পুরা বউ-পাগল হয়ে গেছে। বাই দ্য ওয়ে‚ ভাবির সাথে রোমান্স করে এলি নাকি? ইসসস কী কপাল তোর। ঘরে বউ থাকা মানে সব টেনশন দূর। আমার কপালে যে কবে একটা বউ জুটবে!
উজান এবার ধমকে উঠে‚ “চুপ কর শালা। এমনিতেই পিচ্চিকে ধমকিয়ে দিয়ে এসেছি‚ আবার রোমান্স মারাস? দূরে গিয়ে মর।
তন্ময় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল‚ “বেচারাকে আবার ধমকেছিস কেন?
“কেন আবার‚ শালি আমাকে রেখে নাকি অন্য পুরুষের সাথে প্রেম করতে চায়। ইচ্ছে করছিল মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলি‚ নেহাত বউটা পিচ্চি তাই কিছু করতে পারিনি।
”প্রেম করতে চেয়েছে বলে তোর এত রাগ হচ্ছিল কেন উজান? তুই তো ভাবিকে ভালোবাসিস না।
কথাটা বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল ইফাত। সে এতক্ষণ স্থির হয়ে পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এখানে বসে আছে ঠিকই‚ কিন্তু তার মনটা বড্ড ভারী। ইফাতে’র এই আকস্মিক প্রশ্নে উজান ভ্রু জোড়া কুঁচকে তার দিকে তাকাল। গম্ভীর কণ্ঠে আওরায়‚ “ভালোবাসি না বলে কি ও যা ইচ্ছে তাই করবে?
“সম্ভাবনা না থাকলে ইতি টানাই ভালো। কারণ সময় মতো থামতে না পারলে ক্ষয়ের পরিমাণ শুধু বাড়তেই থাকে…কিছু সম্পর্ক থাকে। যেগুলোর শুরুটা খুব সুন্দর হয়। কথা‚ হাসি‚ অভিমন সবকিছুতেই একটা আলাদা মায়া থাকে। মনে হয় এই গল্পটা হয়তো অনেক দূর যাবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝে যেতে হয়‚ সব গল্প শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য তৈরি হয় না। কিছু গল্প মাঝপথেই থেমে যাওয়ার জন্যই আসে। তখন জোর করে ধরে রাখলে শুধু কষ্টটাই বাড়ে‚ অভিমান জমতে থাকে‚ আর ধীরে ধীরে সুন্দর স্মৃতিগুলোও ভারী হয়ে যায়। তাই কখনো কখনো সাহস করে থেমে যাওয়াটাই ভালো। কারণ থেমে গেলে অন্তত স্মৃতিগুলো সুন্দর থাকে।
হয়তো তুই বুঝবি না ভালোবাসা কী‚ তবে তোর বিপরীত পাশের মানুষটা ঠিকই জানে নামহীন সম্পর্কে থাকা কতটা কঠিন। না তাকে বুকে জড়িয়ে রাখা যায়‚ আর না তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায়।
এইটুকু বলেই থামল ইফাত। উজান ও তন্ময় দুজনেই স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ইফাত আবারও উজানে’র দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল। ”জানিস উজান‚ আমি আর ভাবি দুজনেই সেম। আমাদের দুজনের গন্তব্যও সেম‚ শুধু মানুষটা ভিন্ন। সে তোকে যতটা চায়‚ আমিও আমার ফুলকন্যাকে ঠিক ততটাই চাই। যদিও ভাবির চেয়ে বড় দুর্ভাগা আমি। সে অন্তত তোর সাথে একই ছাদের নিচে‚ একই রুমে‚ তোর সাথে পাগলামি করতে পারে। তোকে মন খুলে ‘ভালোবাসি’ বলতে পারে কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষটা আমার থেকে শুধু দূরে সরে যায়। যত আমি এগিয়ে যাই‚ সে তত পিছিয়ে যায়। তবে জানিস তো‚ সময়ের মূল্য অসীম। ঠিক সময়ে তাকে নিজের করে না নিলে পরে সারা জীবন আফসোস করতে হবে।
“ইফাত কিন্তু ঠিকই বলেছে উজান। তোর নিজের সম্পর্ক নিয়ে একটু সিরিয়াস হওয়া উচিত। এভাবে তো সংসার টেকে না। বাই দ্য ওয়ে‚ তুই যে একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলি‚ সে কোথায় এখন? মেয়েটি কি এখনো আছে নাকি এতদিনে অন্য কারও ঘরণী হয়ে গেছে?
ইফাত কপাল কুঁচকে তাকাল। উজান নিজে একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল অথচ সে তার বন্ধু হয়েও কিছু জানে না! সে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল‚ “তুই আবার কাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলি উজান? এই ওয়েট‚ আগে কী করেছিস সেসব নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তবে এসব ঝামেলা যদি এখন তোর মাথায় আসে তবে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।
”আরে ইয়ার‚ ভুলে গেলি? উজান’কে দুবছর ধরে একটা মেয়ে অনবরত বিরক্ত করত না? সেই তো ছিল উজানে’র দ্বিতীয় প্রেম!
”হোয়াটটটট?
ইফাতের তীব্র চিৎকার শুনে উজান তড়িঘড়ি করে তন্ময়ে’র পিঠে একটা জোর কিল বসাল। “হোপ বেডা। তোকে কখন বললাম সে আমার দ্বিতীয় প্রেম ছিল?
তন্ময় পিঠ ডলতে ডলতে উওর দিল‚ “বউ করতে চাওয়া আর প্রেম করা‚ দুটো তো সেম জিনিসই। হু এসেছে আমার সাথে ভণ্ডামি করতে। এবার বল‚ সে কি এখনো তোকে বিরক্ত করে?
“আগের চেয়েও বেশি বাট এখন সেটা আর বিরক্ত নয়‚ এখন সেটা চরম পাগলামি আর তীব্র ভালোবাসা।
ইফাত ভ্রু জোড়া কুঁচকে উজানে’র দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে কিছুটা শঙ্কা। সে গম্ভীর গলায় বলল‚”কী বলতে চাইছিস তুই উজান? তুই কি এনি চান্স মৌ ভাবিকে ইগনোর করে অন্য কাউকে নিজের করতে চাস?
উজান একে একে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক চিলতে হাসল। তারপর নিজের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটা আবছা ছবিতে আলতো করে চুমু খেল। সেই ছবির দিকে পরম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে আপনমনেই বলে উঠল। “আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় সে। যাকে আমি খুব যত্নে রেখেছি নিজের হৃদয়ের আঙ্গিনায়। ভালোবাসি প্রিয়দর্শিনী। উজান চৌধুরী আপনাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসে।
ইফাত এবার রাগ সামলাতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠে‚ “জাস্ট শাট আপ উজান। তুই আমাদের সাথে ফাজলামো করছিস? তোর লাইফে বর্তমান একজন থাকতেও তুই মনে মনে আরেকজনকে ভালোবাসিস? কেন বুঝিস না‚ ভাবিও তোকে কতটা অসম্ভব ভালোবাসে!
ইফাত রাগান্বিত কণ্ঠে বলে থামল। উজানে’র মুখ থেকে এমন দ্বিচারিতার কথা শুনতে তার মোটেও ভালো লাগছে না। ছেলেটা কি সত্যি পাগল হয়ে গেল নাকি অন্য কিছু সেটাই ভাবছে সে। ঠিক তখনই উজান নিজের ফোনের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে ছবিটা বন্ধুদের চোখের সামনে ধরল। ছবিটা কিছুটা আবছা হলেও‚ ওটা যে আর কেউ নয় স্বয়ং মৌ। তা বুঝতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না বন্ধুদের। ইফাত বিস্ময় ভরা চোখে চেয়ে রইল। অস্ফুট স্বরে বলল‚”ত ত ত তুই ভাবিকেই ভালোবাসিস উজান? তাহলে এই দ্বিতীয় প্রেম…..
“একটু রিল্যাক্স হ ভাই। আমি আমার ওই ‘মৌ পাখি’কেই ভালোবাসি। তোদের কী মনে হয়? এই উজান চৌধুরীকে বাড়ির লোক একটা অচেনা-অজানা মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে‚ আর সেটা উজান চৌধুরী মুখ বুজে মেনে নেবে? জাস্ট ইম্পসিবল! যেখানে আমার নিজের শার্ট পছন্দ না হলে আমি ওটা টাচ পর্যন্ত করে দেখি না‚ সেখানে একটা মেয়ে! অবশ্য আমার পাথুরে মনে ভালোবাসার অনুভূতি নতুন করে জন্ম দিয়েছে ওই পিচ্চি মেয়েটাই।
জানিস দুবছর আগে যখন হুট করে ফেসবুকে একটা মেয়ের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসল‚ তখন প্রথমে তেমন পাত্তা দিইনি। কিন্তু যখন দেখলাম সেই একই আইডি থেকে রিকোয়েস্ট ক্যানসেল করে বারবার রিকোয়েস্ট পাঠানো হচ্ছে তখন একটু অবাক হলাম। আইডিটা ঘেঁটে দেখলাম কিন্তু একসেপ্ট করলাম না। এরপর ফেসবুকে আমার কোনো ছবি আপলোড হলেই‚ কমেন্ট বক্সে কোনো মেয়ে যদি আমাকে নিয়ে কিছু বলতো‚ অমনি আমার এই পিচ্চি পাগলিটা গিয়ে তাদের সাথে ঝগড়া বাধিয়ে দিত! অথচ তখন সে আমায় সামনাসামনি ঠিক করে চেনেও না। যেদিন ওর সাথে ইনবক্সে আমার ফার্স্ট মেসেজ আদান-প্রদান হয়।
সেদিন আমি প্রচন্ড ক্ষোভ আর রাগ নিয়ে ওকে বকতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটার সাথে কথা বলতে বলতে কেমন যেন একটা অন্যরকম ফিলিংস কাজ করত। যদিও শুরুতে সেসব পাত্তা দিইনি। তখন উজান চৌধুরী ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকেই তীব্র ঘৃণা করত। যেহেতু মেয়েটার বয়স তখন অনেক অল্প ছিল‚ তাই আমি ওটাকে সাময়িক আবেগ ভেবেই ইগনোর করতাম। কিন্তু একটা অচেনা ছেলের পেছনে না ছুটে‚ তাকে সরাসরি না দেখেও একটা আইডির জন্য টানা দুবছর ধরে পাগলামি করা এটা মোটেই কোনো সস্তা আবেগ ছিল না। আমি রোজ নিয়ম করে তার মেসেজ পড়তাম বাট কখনো রিপ্লাই দিইনি। বেশ ইন্টারেস্টিং আর অদ্ভুত ছিল মেয়েটা।
অবশ্য একটা দিন ও মেসেজ না দিলে আমার নিজের ভেতর প্রচন্ড রাগ আর অস্থিরতা হতো। অথচ মজার বিষয় দেখ তাকে আমি পারসোনালি তখনও চিনতাম না! একদিন ও হুট করে গায়েব হয়ে গেল। অনেক খোঁজখবর নিয়ে পরে জানতে পারলাম মেয়েটা ভীষণ অসুস্থ। অথচ এমন অসুস্থ শরীর নিয়েও‚ রাত এগারোটার দিকে সে কষ্ট করে আমাকে মেসেজ করল। আমি সেদিন সত্যি খুব অবাক হয়েছিলাম। এটা সাধারণ কোনো পাগলামি ছিল না‚ এটা ছিল এক অদ্ভুত টান। এরপর ওর এই মিষ্টি পাগলামি সহ্য করতে করতে কখন যে আমার ওই পাথুরে মনটা একটা নরম ফুলে রূপান্তরিত হলো‚ তা আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।
তারপর গোপনে লোক লাগিয়ে রোজ ওকে ফলো করাতাম। ও কিচ্ছু বুঝতে পারত না কিন্তু আমি রোজ দূর থেকে ভিডিও কলে ওকে দেখতাম। ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে। তবে সব ছেলেদের ওপর ক্রাশ খাওয়াটা ছিল ওর একটা মস্ত বড় রোগ‚ এটা ছিল আমার জন্য বড় ঝামেলা! তবে ও আমি ব্যতীত অন্য কোনো ছেলের সাথে কথা বলত না। এরপর মনে মনে ভেবেই নিলাম‚ একা একা যেহেতু সারাজীবন বেঁচে থাকা যায় না। সেহেতু ওই পিচ্চিটাকেই নিজের ঘরের বউ বানাব। যদিও কাজটা একটু টাফ ছিল।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২২
কারণ আমাদের বয়সের পার্থক্যটা অনেক বেশি। এরপর আব্বু আর ভাইয়া যে আমাকে মিথ্যা কথা বলে‚ অসুস্থতার নাটক করে দেশে আসতে বলল সেটা তো তোরা জানিসই। কিন্তু যখন দেশে এসে জানতে পারলাম আমার সেই চেনা ‘মৌ পাখি’র সাথেই আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে‚ তখন মনে মনে যে কতটা হ্যাপি হয়েছিলাম‚ তা তোদের মুখে বলে বোঝাতে পারব না। আমার সেই কাঙ্ক্ষিত ‘প্রিয়দর্শিনী’কে নিজের করে পেতে উজান চৌধুরীকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। খুব সহজেই পিচ্চিকে পেয়ে গেলাম।
সঙ্গে সঙ্গে……
