প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৫
বন্যা সিকদার
“লাভ ইউ বউজান…আই রিয়েলি লাভ ইউ সো মাচ।
মৌ’য়ের চোখের ঘোর যেন কিছুতেই কাটতে চাইছিল না। সে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আগের মতোই ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র দিকে তাকিয়ে রইল। প্রফেসর উজান চৌধুরী সবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাকে এভাবে প্রপোজ করতে পারেন‚ এটা কোনোভাবেই নিজের মনকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না মৌ। কত শত দিন গুনেছে শুধু এই একটা মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়। আর আজ যখন সত্যি সত্যি সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি তার জীবনে ধরা দিল‚ তখন পুরো বিষয়টাই তার কাছে কোনো এক অবাস্তব রূপকথা বা রঙিন স্বপ্নের মতো মনে হতে লাগল। হঠাৎ করেই মৌ’য়ের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল‚ তার শরীরটা সামান্য হেলে একপাশে পড়ে যেতে নিল। কিন্তু উজান তো সদা সতর্ক। সে ত্বরিত গতিতে নিজের এক চওড়া বাহু বাড়িয়ে মাঝরাস্তায় আগলে নিল মৌ’য়ের নরম কোমর। মৌ এক হাত উজানে’র কাঁধে রেখে হতবাক হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা কীভাবে এত নিখুঁতভাবে বোঝে যে কোন মুহূর্তে মৌ’য়ের তাকে সবচেয়ে বেশি দরকার?
উজান প্রথমে কিছুটা রক্তচক্ষু নিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকাল মৌ’য়ের দিকে। এই মেয়েটা সবসময় এমন বেখেয়ালিপনা করে। নিজের শরীরটাকে একটুও কি ব্যালেন্স করে রাখা যায় না? তবে পরক্ষণেই মৌ’য়ের ফ্যাকাশে মুখটা দেখে উজান নিজের ভেতরের রাগটা স্বাভাবিক করে নিল। সে চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করতে করতে নরম সুরে শুধাল।
“পিচ্চি ইউ আর ওকে?
মৌ আলতো করে সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল। এতক্ষণে উজান এক বুক হালকা করে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটার সামান্য একটু ওলটপালট হলেও তার নিজের ভেতরের আত্মাটা কেমন যেন খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়‚ নিজেকে এক পাগল মনে হয়। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের সব কোলাহল ছাপিয়ে মৌ’য়ের কণ্ঠের এক ভীষণ মিষ্টি ও কাঁপা কাঁপা সুর উজানে’র কানে ভেসে এলো।
“প্রফেসর সাহেব আপনি কি সত্যি ভালোবাসেন আমায়?
উজান গভীর দৃষ্টিতে তাকাল মৌ’য়ের দিকে। মেয়েটার ভীতু আর সংশয়ী মুখচ্ছবি দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করা থেকে শুরু করে সবার সামনে আংটি পরিয়ে দেওয়া হলো‚ তবুও এই অবাধ্য মেয়েটার মনে বিশ্বাস জাগানো যাচ্ছে না। আচমকা উজান কোনো দ্বিধা না করে মৌ’য়ের সেই রিং পরিহিত নরম অনামিকা আর কনিষ্ঠ আঙুলগুলো নিজের ঠোঁটের কাছে টেনে নিল এবং সবার সামনেই শব্দ করে এক গভীর চুম্বন এঁকে দিল। অতঃপর কিছুটা ফিসফিসিয়ে তীব্র আবেগে আওড়াল‚
“লাভ ইউ পিচ্চি…আই রিয়েলি লাভ ইউ। এই উজান চৌধুরী তার জীবনে কেবল আপনাতেই পরিপূর্ণ হতে চায়। আপনাকে সীমাহীন‚ অগাধ ভালোবাসে মিসেস চৌধুরী।
উজানে’র এতসব কাণ্ড দেখেও মৌ নিজের ভেতরের সংশয়টা পুরোপুরি কাটাতে পারল না। সে নিজের চোখের জল সামলে অভিমানী গলায় বলে উঠল‚ “আপনি মিথ্যা বলছেন তাই না? আমি জানি‚ আমি আজ চিরতরে বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি বলেই আমাকে এখানে আটকে রাখার জন্য আপনি এই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে ভালোবাসার নাটক করছেন। কেন এমন করছেন আমার সাথে? আমি আপনার এমন করুণা মেশানো মিথ্যে ভালোবাসা একদম চাই না। আপনি তো মনে মনে অন্য একজনকে ভালোবাসেন‚ আমি নিজে দেখেছি। আপনি তাকে নিজের ফোনের ওয়ালপেপার রেখেছেন‚ তার সাথে রোজ নিভৃতে কথা বলেন। এমনকি তাকে নাকি কিসও করেন। তাহলে আজ আমাকে সবার সামনে এই মিথ্যে ভালোবাসার কথা কেন বলছেন?
মৌ’য়ের মুখে এই অদ্ভূত অভিযোগ শুনে উজান অসহায় চোখে তাকাল। নিজের পরিবারের সকলের সামনে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করার পরেও মেয়েটার মনে এত তীব্র সন্দেহ। এই জেদি মেয়েটাকে সে কীভাবে বোঝাবে যে তার পুরো পৃথিবীটা জুড়েই এখন কেবল একটা মানুষেরই রাজত্ব। উজান আর নিজের রাগ সামলাতে না পেরে সোফায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইফাতে’র দিকে তাকিয়ে রাগে চেঁচিয়ে উঠল‚
“ইফাতের বাচ্চা তোর ভাবি দেখ এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার চরিত্র নিয়ে কীসব আজেবাজে বকছে। ঠিক এই কারণেই আমি সবার সামনে সত্যিটা বলতে চাইনি। শাশুড়ি আম্মার এই অবাধ্য মেয়েকে এত বড় একটা সত্য কথা বুক চিরে বলার পরেও সে আমাকে সন্দেহ করছে।
মৌ ওমনি মুখ ফুলিয়ে উল্টো ধমক দিয়ে বলল‚ “আমি মোটেও সন্দেহ করছি না। তাহলে আপনার ফোনের সেই…
মৌ’য়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই উজান পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে লক খুলে সরাসরি মৌ’য়ের হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। মৌ ধকধক করতে থাকা বুকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল এবং দেখার সাথে সাথেই তার পুরো মুখটা খুশিতে আর চরম বিস্ময়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সে পুরো ফোনটা হন্যে হয়ে ঘেঁটে দেখল‚ সেখানে অন্য কোনো মেয়ের অস্তিত্ব তো দূর বরং পুরো ফোন জুড়ে কেবল সে নিজেই বিরাজ করছে। এমনকি ফোনের পাসওয়ার্ড ও। মৌ যখন রাতে অঘোরে ঘুমাত‚ উজান তখন তাকে জড়িয়ে ধরে হাজারো রকমের ছবি তুলে নিজের ফোনে গোপনে জমা করে রেখেছে। শুধু তা-ই নয়‚ প্রতিটি ছবিতে খুব কাছ থেকে নেওয়া শটে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মৌ’য়ের কপালে‚ মুখে‚ গালে আর নরম ঠোঁটে তার গভীর ভালোবাসার স্পর্শ লেগে আছে। ওয়ালপেপারের সেই আংশিক দেখা যাওয়া মেয়েটি অন্য কেউ নয়‚ স্বয়ং মৌ নিজেই ছিল।
এক পলক মৌ নিজের ফোনের দিকে তাকাল‚ আর পরক্ষণেই উজানে’র সেই গভীর ও নেশাতুর চাউনি দেখে লজ্জায় রাঙা হয়ে একদম নুয়ে গেল। তার ফর্সা গাল দুটো তখন লজ্জায় লাল আপেলের মতো দেখাচ্ছে। ঠিক তখনই‚ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌ হুট করে নিজেকে শূন্যে ভাসতে দেখল। উজান এক ঝটকায় কোনো রকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই মৌ’কে নিজের দুই বাহুতে কোলপাঁজা করে তুলে নিয়েছে। আচমকা এমন হওয়ায় মৌ তড়িঘড়ি করে পড়ে যাওয়ার ভয়ে উজানে’র শার্টের কলারটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল এবং লজ্জায় নিজের চোখ-মুখ খিঁচে শক্ত করে বন্ধ করে নিল। ঠিক পরের মুহূর্তেই প্রফেসরের কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হয়ে ভেসে এলো।
“ডিয়ার ড্যাড এবং রেস্পেক্টেড শ্বশুর আব্বা। আপনাদের এই অতি আদরের কন্যা তো নিচে দাঁড়িয়ে আমার মুখের কথায় বিশ্বাসই করছে না যে আমি তাকে কতটা লাভ করি। সেই জন্য ওকে এখন সোজা নিজের বেডরুমে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে একদম দরজা লক করে ওকে হাতে-কলমে প্রমাণসহ দেখিয়ে দেবো যে‚ আমি আমার শাশুড়ি আম্মার এই অবাধ্য‚ ত্যাঁড়োমুখো মেয়েটাকে সত্যি সত্যি কতটা মারাত্মক লেভেলের লাভ করি।
এই বলেই উজান কোলে থাকা লাল শাড়ি পরা বউ’কে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের রুমের দিকে উঠতে লাগল। ওদিকে নিচ থেকে ইফাত তাদের এই রোমান্টিক প্রস্থান দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না‚ সে দাঁতের নিচে আঙুল চেপে এক জোরে ও দীর্ঘ শিস বাজিয়ে উঠল।
উজান মৌ’কে নিজের দুই বাহুতে পরম যত্নে জড়িয়ে ধরে রুমে নিয়ে এলো। দরজাটা সামান্য আটকে দিয়ে সে মৌ’কে আলতো করে বিছানার নরম বেডশিটের ওপর বসিয়ে দিল। মৌ তখনও লজ্জায় নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে হৃদপিণ্ডের দ্রুত ওঠানামা টের পাচ্ছিল। কিন্তু সে কিছু বুঝে ওঠার বা নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই‚ উজান ধীর পায়ে এসে সরাসরি মৌয়ে’র কোলের ওপর নিজের মাথাটা রেখে শুয়ে পড়ল। শুধু তা-ই নয়‚ গভীর এক ভালোবাসার টানে সে মৌ«য়ের লাল বেনারসি শাড়ির সামান্য সরে যাওয়া উন্মুক্ত পেটে নিজের মুখটা গভীর আবেশে গুঁজে দিল।
উজানে’র ঠোঁটের সেই অতর্কিত ও উষ্ণ ছোঁয়ায় সঙ্গে সঙ্গে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল মৌ। এক অদ্ভুত‚ অনাস্বাদিত এবং মাদকতাময় শিহরণ মুহূর্তের মধ্যে বয়ে গেল তার পুরো শরীর জুড়ে। পেটের ভেতরের কোষে কোষে এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো। মৌ’য়ের এমন কাঁপাকাঁপি আর অপ্রস্তুত আচরণ টের পেয়ে উজান মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি হাসল। তারপর আবারও পেটের নরম চামড়ায় মুখ গুঁজে দিয়ে নিজের নাক দিয়ে আলতো করে ঘষতে লাগল।
এবার মৌ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না‚ সে বিদ্যুৎ গতিতে এক ঝটকায় নিজেকে উজানে’র কাছ থেকে সরিয়ে বিছানার অন্য কোণে গিয়ে বসল। উজান এবার বিছানার ওপর সোজা হয়ে বসল। সে বড় বড় পা ফেলে আবারও মৌ’য়ের একদম কাছাকাছি এসে বসল এবং তাদের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। এখন দুজনের মাঝে চুল পরিমাণ দূরত্বেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। মৌ তখনও লজ্জায় আর আবেশে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। উজান মুচকি হেসে নিজের দাড়িভরা শক্ত মুখটা মৌয়ের ফর্সা‚ নরম গালে আলতো করে ঘষতে ঘষতে মাদকতাময় স্বরে বলতে লাগল।
“ভালোবাসি তা নিজের মুখে এতবার বলার পরেও আমায় প্রমাণ করতে দিচ্ছেন না কেন‚ মিসেস চৌধুরী? আপনি যদি এভাবে ছটফট করে বারবার দূরে সরে যান‚ তবে আমি কীভাবে প্রুফ করব যে আমি অনলি আপনারই? কেবলই আপনার প্রফেসর সাহেব।
মৌ চোখ পিটপিট করে ধীরলয়ে তাকাল উজানে’র দিকে। উজানে’র এই মৃদু‚ উষ্ণ স্পর্শ আর গায়ের তীব্র পুরুষালি পারফিউমের সুবাসে তার ভীষণ অস্বস্তি ও এক অদ্ভুত মিশ্রিত অনুভূতি হচ্ছিল। সে এই তীব্র নেশার জগৎ থেকে নিজেকে বাঁচাতে তার থেকে দূরে সরে আসতে চাইল কিন্তু উজান তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। সে এক হাত দিয়ে মৌ’য়ের সরু কোমরটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের চওড়া বুকের সাথে একদম মিশিয়ে নিলো।
উজান এত জোরে তাকে চেপে ধরেছে যে মৌ’য়ের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। সে হাঁসফাঁস করতে করতে মিনতির সুরে বলল‚
”একটু দূরে যান না প্লিজ।
উজান মৌ’য়ের মুখের দিকে না তাকিয়েই। নিজের চোখের তীব্র নেশাক্ত দৃষ্টি দেওয়া ওই লাল টুকটুকে ঠোঁটের ওপর স্থির রেখে উত্তর দিল। “এমন পঁচা কথা একদম মুখে আনবেন না‚ মিসেস চৌধুরী। অনেক দিন‚ অনেকগুলো রাত আপনার থেকে দূরে থেকেছি‚ বাট আর একটা সেকেন্ডও নয়। উজান চৌধুরী এখন থেকে প্রতিটা মুহূর্তে আপনার সাথে এভাবেই মিশে থাকবে‚ আমাদের মাঝে আর কোনোদিন চুল পরিমাণ দূরত্ব রাখার সুযোগ দেবে না।
মৌ পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা যেন কোনো এক অচেনা ভয়ে ধকধক করতে লাগল। উজানে’র এমন তীব্র অধিকারবোধের কথা শুনে তার ছোট্ট শরীরটা বারবার মৃদু কাঁপনি দিয়ে উঠছে। এর মাঝেই প্রফেসরের কণ্ঠ থেকে এক তীব্র আকুতির স্বর ভেসে এলো।
“আপনি কি আজ আমায় নিজ হাতে মার্ডার করতে চান‚ মিসেস চৌধুরী? এই সময় এমন অপ্সরার মতো লাল টুকটুকে নতুন বউ সেজে আমার সামনে আসতে কে বলেছিল‚ হ্যাঁ? আপনি জানেন না আপনার এই লাল শাড়ির রূপের সামনে উজান চৌধুরী কতটা ডিসপারেট হয়ে পড়ে? সে তার এই মিষ্টি বউ’কে লাল বেনারসিতে এভাবে দেখে কোনোভাবেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারছে না। তার বড্ড ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে আপনাকে নিজের করে পুরোপুরি পেয়ে যেতে…এখন কী হবে বলুন তো‚ মিসেস চৌধুরী?
মৌ লজ্জায় একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল। তার বুকের ভেতর ধকধক করে কেঁপে উঠছে বারবার। উজান তার ডাগর ডাগর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা পরিকল্পনা করে মুচকি হাসল। সে বুঝতে পারছিল মেয়েটা বড্ড ঘাবড়ে গেছে‚ তাকে কিছুটা সময় দেওয়া দরকার। তাই সে মৃদু স্বরে আওড়াল‚
“মিসেস চৌধুরী‚ রোমান্স তো সারারাত ধরে হবে। তার আগে আমার জন্য এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আসুন তো? গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেছে।
পানির কথা শোনামাত্রই মৌ যেন খাঁচাছাড়া পাখির মতো প্রাণ ফিরে পেল। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে তড়িঘড়ি করে বেড থেকে নেমে তড়িৎ গতিতে কক্ষ ত্যাগ করল। তাকে ওভাবে ভয়ের চোটে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখে উজান নিজের রুমের ভেতর শব্দ করে হো হো করে হেসে উঠল। মৌ’য়ের মনে যে চরম অস্বস্তি আর লজ্জা কাজ করছে‚ এটা উজান খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। সে আপাতত বিছানায় আরাম করে হেলান দিয়ে একটা বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজের উত্তাল হয়ে ওঠা শরীর ও মনকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নিল। কিছুক্ষণ পর মৌ ডাইনিং রুম থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে ধীর পায়ে উজানে’র সামনে এসে দাঁড়াল। উজান এক পলক তার রাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে মৌ’য়ের হাত থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে পুরোটা খেয়ে নিল। পানি খাওয়া শেষ হতেই গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে‚ সে আবারও এক টান মেরে মৌ’কে নিজের শক্ত বুকের ওপর ফেলে দিল।
মৌ কিছু বুঝে ওঠার আগেই উজান ওনার মসৃণ থুতনিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াাল এবং ফিসফিস করে বলল‚
“লাভ ইউ মাই ওয়াইফি!
মৌ উজানে’র বুকে মিশে থেকেই নিজের ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে উজানে’র মুখের দিকে তাকাল। আর ঠিক তখনই তার ছোট্ট মাথায় এক চরম দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সে নিজের ফর্সা আঙুলগুলো দিয়ে উজানে’র ডান হাতের আঙুলের ভাঁজে আঙুল চালিয়ে মিটিমিটি হেসে আদুরে গলায় বলল‚
”এই খুশিতে তাহলে প্রশ্ন আউট করে দেন।
উজানে’র মুখের স্বাভাবিক ভাব এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সে একদম চমকে গিয়ে বিষম খাওয়ার মতো করে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। এই মেয়েটা যে এত বড় একটা গভীর‚আবেগময় আর স্পর্শকাতর মুহূর্তেও পড়াশোনা আর পরীক্ষার ‘প্রশ্ন আউট’ করার মতো ফালতু কথা তুলতে পারে তা তার কল্পনারও অতীত ছিল। একজন প্রফেসরের সামনে এসে প্রশ্ন ফাঁসের আবদার। উজান মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে রাগে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল‚
“কু*ত্তার লেজ আর শাশুড়ির মেয়ে কোনোদিন সোজা হবে না। শয়তান ছেমড়ি দূরে গিয়ে মর। আসছে প্রশ্ন আউট করতে হু।
উজানে’র মুখ থেকে ‘কু*ত্তার লেজ’ আর ‘মর’ শব্দ দুটো শোনামাত্রই মৌ’য়ের ভেতরের অভিমানী চণ্ডী রূপটা আবার জেগে উঠল। সে এক ঝটকায় উজানে’র বুক থেকে উঠে তার সামনে গিয়ে সটান দাঁড়িয়ে গেল। নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের কোমরটা শক্ত করে চেপে ধরে অত্যন্ত চড়া ও কর্কশ কণ্ঠে আওড়াল‚
“কী বললেন আপনি? আপনি আমাকে একটা কু*ত্তার লেজের সাথে তুলনা করলেন‚ প্রফেসর সাহেব? তাও আবার ডাইরেক্ট ‘তুই’ বলে সম্বোধন করলেন? আবার আমাকে মরতেও বললেন? ওকে ফাইন‚ থাকব না আমি আপনার মতো এক খিটখিটে বুড়ো মানুষের সাথে। করব না আমি আপনার সংসার! আমি আজই‚ এখনই বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছি।
এই বলে মৌ রাগে গটগট করে এক কদম এগিয়ে যেতেই‚ উজান নিজের বিছানা থেকে বিদ্যুৎ গতিতে নেমে এসে এক টানে মৌ’য়ের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তার চোখে তখন একরাশ চরম অসহায়তা। সে কাঁচুমাচু মুখ করে বলে‚
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৪
“সরি পিচ্চি‚ প্লিজ শান্ত হও। আমি ওভাবে মন থেকে বলতে চাইনি। ওটা জাস্ট কথার কথা ছিল ব্যস। রাগ করো না বউ প্লিজ।
”কথার কথা মানে কী? আমি সামান্য একটা প্রশ্ন আউট করে দিতে বলেছি বলে আপনি আমাকে কু*ত্তার সাথে তুলনা করে মরতে বলছেন। আর এখন বলছেন এটা কথার কথা? থাকব না আমি আপনার সাথে। আপনি কথার কথা নিয়ে থাকুন।
