প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪০
বন্যা সিকদার
বেলা অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছে অথচ মৌ’য়ের ঘুম ভাঙার কোনো নামগন্ধ নেই। সে পরম শান্তিতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। অন্যদিকে উজান অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠে মর্নিং ওয়াক শেষ করে চলে এসেছে। এমনকি শাওয়ার নিয়ে‚ ফ্রেশ হয়ে নিজের ল্যাপটপটা নিয়ে কাজের জন্য বসেও পড়েছে। বাড়ির সবার ব্রেকফাস্ট করা শেষ‚ শুধু উজান আর মৌ বাদে। তবুও মেয়েটা আগের মতোই গভীর ঘুমে নিমগ্ন। এমন ঘুম পাগল মানুষ উজান তার জীবনে খুব কমই দেখেছে।
সকাল থেকে বারকয়েক মৌ’কে ডাকার জন্য বিছানার কাছে গিয়েছে সে কিন্তু মেয়েটার ওই মায়াবী‚ শান্ত মুখটার দিকে তাকাতেই আর ডাকতে ইচ্ছে করেনি। ইসস‚ কতটা নিষ্পাপ আর পবিত্র লাগছে তাকে ঘুমানোর সময়। কিন্তু মৌ এভাবে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকবে‚ এটাও উজান যেন মেনে নিতে পারছে না। কাজের সময় মেয়েটা তাকে এসে বিরক্ত না করলে তার একদম ভালো লাগে না। কী এক অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছে এই পিচ্চি মেয়েটা। শেষমেশ উজান নিজের ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে ফেলল।
উজান ধীরপায়ে আবারও মৌ’য়ের সামনে এসে বসলো। বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় তার শান্ত মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছু সময় তাকিয়ে রইল সে। অতঃপর নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে আওড়াল‚
“তোমার চরণের প্রথম ধূলি যেদিন এ মনে পড়েছিল‚ সেদিন থেকেই আমি মায়ার এক অতল সাগরে নিমজ্জিত। আজও তোমার ওই মায়াবী ছোঁয়ার বৃত্ত থেকে আমি নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি।
কথাগুলো বলতে বলতেই উজান নিজেই মৃদু হেসে উঠল। সে খানিকটা ঝুঁকে মৌ’য়ের নাকের সাথে নিজের নাক আলতো করে ঘষে দিল। মৌ’য়ের কপালের ওপর লেপ্টে থাকা অবাধ্য চুলে নিজের আঙুল বোলাল‚ অতঃপর সেই আঙুলের ভাঁজে নিজের ঠোঁট জোড়া ছোঁয়াাল। ঠিক তখনই‚ আকস্মিক ভাবে বড় বড় চোখ মেলে তাকাল মৌ। উজান প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। মেয়েটা যে আসলে জেগে ছিল এবং তার সব কাণ্ড টের পাচ্ছিল‚ তা সে ধরতেই পারেনি। উজান’কে সামনে পেয়েই মৌ এক ঝটকায় তার শার্টের কলারটা খামচে ধরল। উজানও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আলতো করে মৌ’য়ের পাশে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
“কী ম্যাডাম‚ ঘুম ভাঙল?
উজান চোখের কোণে দুষ্টুমি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল। “হুম তবে….
“তবে কী‚ ম্যাডাম?
”আপনি আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে আমাকে পাপ্পি দিলেন কেন? লজ্জা হয় না আপনার‚ নির্লজ্জ পুরুষ?
মৌ ভান করা রাগ দেখিয়ে বলল। উজান এক গাল হেসে উত্তর দিল‚
“লজ্জা‚ ঘৃণা‚ ভয় এই তিনটা জিনিস স্বামী নামের আসামীদের থাকতে নেই, বুঝলেন ম্যাডাম? আপনাকে ভালো যেহেতু বাসি‚ সেহেতু একটু-আধটু নির্লজ্জ তো হওয়াই যায়। আর আপনি জেগে থাকতে তো আমায় কাছেই ঘেঁষতে দেন না‚ তাই ঘুমের সুযোগটা নিলাম আর কী।
মৌ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উত্তর দিল‚ “অসভ্য পুরুষ একটা।
“তা আমাকে সভ্য পুরুষই বা বানাচ্ছেন না কেন? আমি অলওয়েজ রেডি সভ্য হওয়ার জন্য।
উজান বাঁকা হেসে উওর দিল। মৌ একটা তপ্ত শ্বাস ফেলল। সে একটু স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে চাচ্ছিল কিন্তু এই মানুষটা প্রতিবারই উল্টো সুর ধরে তাকে লজ্জায় ফেলে দেয়। তবে সে এবার বিরক্ত হলো না বরং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে নিজে থেকেই উজান’কে প্রশ্ন করল‚
”খেয়েছেন কিছু?
“খাইয়ে দিয়েছো? স্বামী হই আমি তোমার অথচ সে-সব নিয়ে তোমার কোনো মাথাব্যথাই নেই। ইফাত কাল মাত্র বিয়ে করল অথচ আজ সকাল থেকেই নিজে বউ’য়ের হাতে খেতে শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে আমার ভাগ্যটা দেখো‚ নিজেকেই উল্টো খাইয়ে দিতে হয়।
মৌ চোখের কোণ দিয়ে ছোট করে তাকিয়ে মিনমিন স্বরে বলল‚ “খুব আফসোস হচ্ছে?
“উজান চৌধুরীর ডিকশনারিতে ‘আফসোস’ বলে কোনো ওয়ার্ড নেই‚ বুঝলেন? উজান চৌধুরী ইজ অলওয়েজ আ লাকি পারসন। হোক সেটা শখের জিনিস কিংবা শখের নারী।
মৌ এবার সোজা উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় শুধাল‚ “এত ভালোবাসেন কেন আমায়?
উজান মৃদু হাসল। মেয়েটার এই ছোট ছোট‚ নিষ্পাপ দৃষ্টিতে বলা কথাগুলো তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যায়। সে খানিকটা ঝুঁকে মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“ভালোবাসি বলেই তোমাকে চাই নির্বাক অনুরাগের গভীরতম অনুরণনে। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি সূক্ষ্ম পরতে তোমারই নিবাস হোক। এই ক্ষুদ্র জীবনের বিস্তৃত ভুবনে তুমি হও এক অনন্ত নক্ষত্রমালা‚ যার আলোয় আমার সকল অন্ধকার ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। ভালোবাসি বলেই তোমাকে চাই‚ শুধু প্রাপ্তির প্রার্থনায় নয়। বরং এক অবিনশ্বর অনুভবের নিবিড় বন্ধনে‚ যেখানে আমার সমগ্র সত্তা জুড়ে তোমারই উপস্থিতি হয়ে ওঠে এক চিরন্তন সত্য।
মৌ নিস্পলক ভাবে উজান’কে দেখতে লাগল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগার রেশ কাজ করছে তার। এমন সময় উজান আবারও বলে উঠল‚ “এবার ঘোর কাটিয়ে উঠুন প্লিজ মিসেস চৌধুরী। আমার পেটে কিন্তু প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে।
মৌ উজানে’র মুখোমুখি তাকিয়ে এক গাল হাসল। তারপর ইশারায় তাকে নিজের আরও কাছে ডাকল। উজানও বাধ্য ছেলের মতো মৌ’য়ের দিকে ঝুঁকে আসতেই‚ মৌ চট করে তার গলা জড়িয়ে ধরল। উজানও ততক্ষণে এক হাত দিয়ে মৌ’কে পাঁজ কোলা করে কোলে তুলে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ করাতে। সে নিজেই মৌ’কে বেসিনের ওপরে বসিয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিল। আবারও তাকে কোলে তুলে এনে বিছানায় বসাল এবং অত্যন্ত যত্ন সহকারে তার এলোমেলো চুলগুলো বেঁধে দিল। এরপর আবারও তাকে নিজের বাহুবন্ধনে তুলে নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল সে।
উজান ধীরপায়ে মৌ’কে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে আলতো করে বসিয়ে দিল। মৌসুমি চৌধুরী তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে খাবার সার্ভ করতে লাগলেন। সকালের ব্রেকফাস্ট শেষ হতে না হতেই লাঞ্চের টাইম হয়ে যাবে‚ তাই কিচেন রুমে জোর কদমে দুপুরের রান্নার তোড়জোড় চলছে। মেহেরও নতুন বউ হওয়ার সত্ত্বেও শাশুড়ির সাথে কাজে হাত মিলিয়েছে। এদিকে ইফাত ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ঘাড় বাঁকিয়ে কিচেন রুমের দিকে অনবরত উঁকিঝুঁকি মারছে। এসব দেখে মৌ নিজের ঠোঁট চেপে ফিসফিস করে বলল‚
”প্রফেসর সাহেব‚ একটা জিনিস দেখবেন?
উজান মৌ’য়ের মুখে আরেক লোকমা খাবার তুলে দিতে দিতে চোখ তুলে তাকাল। মৌ চোখের ইশারায় ড্রয়িংরুমের ইফাত’কে দেখাল। সেই দৃশ্য দেখে উজান নিজেও মৃদু হাসল। তবে নিজেকে গম্ভীর করে মৌ’কে শাসানোর সুরে বলল‚
“আপনি কিন্তু বড্ড পঁচা হয়েছেন‚ মিসেস চৌধুরী। সাইজ তো মোটে এইটুকু‚ তাহলে সারাক্ষণ এদিক-ওদিক নজর যায় কেন‚ হুম? চুপচাপ আমার দিকে ফোকাস দিন। বড়দের দিকে ওভাবে তাকাতে নেই।
মৌ ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তবে মুখে আর কোনো কথা বলল না। শুধু মনে মনে প্রফেসরের এই মিষ্টি শাসনে এক বুক ভালোবাসা অনুভব করল।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে উজান তার পিচ্চি বউ মৌ’কে নিয়ে রুমে চলে গেল কিন্তু ইফাত ডাইনিং রুমের সোফাটায় ওভাবেই বসে রইল। দুই-তিনবার সে কিচেন রুমের দিকে উঁকিঝুঁকি মারল কিন্তু একা একা মেহের’কে ওখান থেকে ডেকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না সে। অবশেষে আর থাকতে না পেরে সে আবারও কিচেন রুমে গিয়ে ঢুকল। সোজা নিজের মা ইমরোজা চৌধুরীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মৃদু ও নিরীহ স্বরে ডাকল‚
“আম্মু এক কাপ কফি দাও না তো?
ইমরোজা চৌধুরী এবার হাতের কাজ থামিয়ে ছেলের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন। মায়ের সেই অগ্নিদৃষ্টি দেখে ইফাত সাথে সাথে বেলুনের মতো চুপসে গেল। ইমরোজা চৌধুরী হাতের খুন্তিটা উঁচিয়ে তেড়ে এসে বললেন‚
“সকাল থেকে এই নিয়ে পাঁচ কাপ কফি খেয়ে নিলি‚ তবুও তোর কফি খাওয়া শেষ হচ্ছে না? আর এক কাপও কফি দেবো না তোকে‚ সর এখান থেকে। আর এক সেকেন্ডও যদি তোকে আমার চোখের সামনে দেখি‚ তবে এই গরম খুন্তির বাড়ি পড়বে তোর পিঠে।
ইফাত অত্যন্ত অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকাল। মুখটা একদম কাঁদো কাঁদো করে বাচ্চাদের মতো অভিমানী সুরে বলল‚ “তুমি আমার আম্মু হতেই পারো না। পঁচা আম্মু একটা।
”হ্যাঁ‚ আমি পঁচাই। এবার বিদায় হ তো এখান থেকে।
ইমরোজা চৌধুরী আবার ধমক দিলেন। ইফাতে’র এমন করুণ দশা দেখে মেহের একপাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট চেপে হাসতে লাগল। ঠিক তখনই তুবা মুচকি হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে ইফাতে’র সামনে দাঁড়ালেন। তিনি পরম মায়ায় মেহেরে’র হাতটা টেনে নিয়ে ইফাতে’র হাতের শক্ত ভাঁজে গুঁজে দিলেন। তারপর মৃদু হেসে রসিকতার সুরে বললেন‚
“যাও ভাই‚ এবার তোমার স্পেশাল কফি তোমাকে দিয়ে দিলাম। আর আম্মুকে বিরক্ত করো না।
তুবার এমন সরাসরি কথায় মেহের লজ্জায় একদম নুয়ে পড়ল। অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত জিনিস হাতে পেয়ে ইফাতে’র মুখ এক গাল হাসিতে ভরে উঠল। সে ভাবির দিকে তাকিয়ে বলল‚ “উম্মাহ ভাবিজান। তুমি কত ভালো। এই তোমার চাচি শাশুড়িমা বুঝেও বোঝে না যে ছেলের নতুন বিয়ে হয়েছে‚ তার তো একটু বউ-টউ লাগে নাকি। আমি যাচ্ছি এবার‚ আর বিরক্ত করতে আসবো না।
ইফাত মেহেরে’র হাতটা শক্ত করে ধরে টানতে টানতে কিচেন রুম থেকে বের হতে লাগল। দরজার কাছে গিয়ে সে আবার একটু পেছন ফিরে মুখ বাঁকিয়ে আওড়াল‚ “পঁচা আম্মু। ছেলের বউকে ছেলের কাছে না দিয়ে নিজের কাছে আঁচলের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। একদম ভালো নও তুমি‚ তোমার স্বামী বাসায় ফিরুক‚ আজই সব বিচার দেবো হু।
এই বলে এক প্রকার টেনে হিঁচড়েই সে মেহের’কে কিচেন রুম থেকে নিজের রুমে নিয়ে এলো। রুমে ঢুকেই খটাশ করে দরজাটা লক করে দিল সে। তারপর বিছানায় গিয়ে বেশ আরাম করে বসল। ইফাতে’র এই ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব দেখে মেহের রাগে গজগজ করতে করতে দুই হাতে কোমর চেপে ধরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
”আপনি আম্মুর সামনে ওমন বেহায়াপনা কেন করলেন বলুন তো? আম্মু মনে মনে কী ভাবল আমাদের নিয়ে?
মেহের কৃত্রিম রাগ দেখাল। হৃদস্পন্দনের ঝড়ে
মেহেরে’র কথার জবাব না দিয়ে ইফাত এক মলাট হেঁচকা টানে মেহের’কে সোজা নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। মেহের কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইফাত তার গলার ভাঁজে নিজের মুখ গুঁজে দিল। আকস্মিক এই স্পর্শে মেহেরে’র পুরো শরীর মুহূর্তেই শিউরে উঠল। মেহেরে’র এই কেঁপে ওঠা দেখে ইফাত আলতো করে হাসল। সে মেহেরে’র কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্বরে আওড়াল‚
“কে কী ভাবল আই ডোন্ট কেয়ার। আর ঘরে যদি আসমানের জ্বলজ্বলে চাঁদ চোখের সামনে ওমন করে ঘুরে বেড়ায়‚ তবে কোনো পুরুষ কি সভ্য থাকতে পারে বল? এমনিতেই ইফাত চৌধুরী তার শখের নারীর কাছে বড্ড দুর্বল‚ তার ওপর সে আবার শাড়ি পরে চোখের সামনে ঘুরঘুর করছে। এই অবস্থায় নিজেকে কীভাবে কন্ট্রোল করি‚ বল তো?
মেহের যেন মুহূর্তেই বরফের মতো জমে গেল। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা তীব্র বিদ্যুৎ গতিতে লাফাচ্ছে। বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। তার পুরো শরীর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে লাগল। আর মেহেরে’র এই নীরবতার মাঝেই ইফাতে’র স্পর্শ ধীরে ধীরে আরও গভীর হতে লাগল। ইফাত মেহেরে’র ঘাড়ে এক গভীর ও মায়াবী চুমু এঁকে দিল। তার অবাধ্য হাতটি শাড়ির আঁচল ভেদ করে মেহেরে’র উন্মুক্ত পেটের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। ঠিক তখনই মেহের এক অজানা আতঙ্কে কাঁপাকাঁপা হাতে ইফাতে’র হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আটকে দিল। মেহেরে’র এই বাধা দেওয়া দেখে ইফাত কিছুটা থমকে গেল‚ তবে সে মেহের’কে নিজের বুক থেকে সরাল না। সে কুম্ভকর্ণের মতো এক পরম আকুল ও অসহায় স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল।
“ফুলকন্যা তোমাকে চাই…একদম নিজের করে চাই। ঠিক ততটাই নিজের করে পেতে চাই‚ যেখানে আমাদের দুজনের মাঝে আর কোনো দূরত্বের দেয়াল থাকবে না। আমি সত্যিই নিজের ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি‚ এখন কি করব আমি?
মেহের একটা শুকনো ঢোক গিলল। সে কী বলবে বা কীভাবে নিজের মনের অবস্থা প্রকাশ করবে‚ তা ভেবে পাচ্ছে না। এই মানুষটাকে কী কথা বললে সে কষ্ট পাবে না‚ মেহের শুধু সেটাই ভাবছে। একই সাথে তার মনের ভেতর পাঁচ বছর আগের সেই অভিশপ্ত‚ ভয়ংকর স্মৃতির কালো মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। একদিকে তার ভালোবাসার এই মানুষটা‚ আর অন্যদিকে মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সেই গভীর ক্ষত। কোন দিকে পা বাড়াবে সে?
মেহেরে’র এই নীরবতার মাঝেই ইফাত আবার বলে উঠল‚
“ফুলকন্যা তোমার কি ভয় হচ্ছে? আমি বুঝতে পারছি কিন্তু তোমার কি মনে হচ্ছে আমার এই স্পর্শে কোনো ঘৃণা লুকিয়ে আছে?
মেহের স্তব্ধ হয়ে সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেল। তার ভীষণ ভয় করছে সত্য কিন্তু ইফাতে’র এই ভালোবাসাময় ছোঁয়াকে তার কোনোভাবেই ‘ঘৃণিত ছোঁয়া’ মনে হচ্ছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে সে কীভাবে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেবে‚ সেটাই সে বুঝতে পারছে না। মেহের’কে এভাবে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ইফাত এক চরম কাতর স্বরে আওড়াল‚
“সত্যিই কি তোমার মনে হয় আমার স্পর্শ বাজে? আই সোয়্যার ফুলকন্যা‚ তোমার মনে যদি এমন কোনো ভাব আসে‚ তবে আমি কখনোই এই ছোঁয়া দিয়ে তোমাকে কষ্ট দেবো না।
আশ্বাসের অটুট বন্ধন। মেহের তবুও কোনো কথা না বলে নিঝুম হয়ে রইল। তা দেখে ইফাত একটা দীর্ঘ ও তপ্ত শ্বাস ফেলল। সে আর জোর না করে ধীরে ধীরে নিজেকে মেহেরে’র কাছ থেকে গুটিয়ে নিতে চাইল। ইফাত যখন মেহেরে’র কোমর থেকে হাত সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে যেতে চাইল‚ ঠিক তখনই মেহের তড়িঘড়ি করে ইফাতে’র হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সে আগের মতোই মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় উত্তর দিল।
”আ আ আ আপনি কি আমার উপর রাগ করে চলে যাচ্ছেন?
ইফাত মেহেরের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন এক বুক মায়া। “রাগ আর ফুলকন্যা? ওহু এমনটা নয়। তাছাড়া আমার এই ফুলকন্যাকে রেখে আমি কোথায় যাব‚ বলো তো? জাস্ট নিজেকে একটু স্বাভাবিক করতে কিছুটা টাইম নিচ্ছি। আর তোমার মনে তো এখন আমায় নিয়ে দ্বিধা হচ্ছে তাই…
মেহের আর চুপ থাকতে পারল না। সে ঝাপসা চোখ তুলে সরাসরি ইফাতে’র চোখের দিকে তাকিয়ে আকুল সুরে প্রতিধ্বনিত করে।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৯
“আমি কখন বললাম যে আপনার স্পর্শ আমার কাছে ঘৃণা লাগে?
ইফাত মেহেরে’র মুখের দিকে চেয়ে একটু উদাসীন ভাবে হাসল।
“ঘৃণা লাগেনি এটাও তো তুমি মুখে বললে না‚ ফুলকন্যা। তবে তুমি নিজে থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত না হলে…..
