Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৪

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৪

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৪
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

বিড়ালটা পাওয়ার পর থেকে রিত্তিকা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও কাছছাড়া করছে না। যেন কলিজার টুকরো! বাড়ির আর কেউ যদি বিড়ালটাকে একটু ছুঁতেও চায়, রিত্তিকা একদম বাঘিনীর মতো ফোঁস করে উঠছে। সেই আদরের বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে সোফায় বেশ আয়েশ করে বসে ছিল সে।
​এমন সময় রিহান গুনগুন করতে করতে এসে তার পাশে বসল। রিত্তিকার কোলের বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে লোভাতুর গলায় বলল, “রিত্তি, বিড়ালটাকে একটু দে না রে, একটু আদর করি।”
​রিত্তিকা বিড়ালটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে মুখঝামটা দিয়ে বলল, “যাহ, সর এখান থেকে! আমার মিকুম্মাকে আমি তোকে কক্ষনও দেবো না।”

​”ধুর! দিলে কি এমন ক্ষতি হবে? একটু আদরই তো করব, দে না!” বলেই রিহান যেই না বিড়ালটার দিকে হাত বাড়াল, রিত্তিকা ঠাস করে ওর হাতটা সরিয়ে দিল।
চোখ বড় বড় করে বলল, “বলেছি না দেবো না? তবুও কেন নিতে চাচ্ছিস?”
​রিহানও দমবার পাত্র নয়, সে বিরক্ত হয়ে বলল, “কেন দিবি না শুনি? আমি কি তোর বিড়ালকে আস্ত চিবিয়ে খেয়ে নেবো নাকি?”
​রিত্তিকা বাঁকা হেসে বলল, “হ্যাঁ, নিতেই তো পারিস। তোকে আমি এক ফোঁটাও বিশ্বাস করি না!”
​”একটা সামান্য বিড়ালের জন্য তুই আমার সাথে এমন করছিস? যাহ, লাগবে না তোর বিড়াল!” রিহান মুখ ফুলিয়ে বসে রইল।
​ঠিক তখনই আরিশান ইসলাম গম্ভীর পায়ে এসে রিত্তিকার পাশে বসলেন। আদর মাখা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে মা? তোমরা ঝগড়া করছ কেন?”
​রিত্তিকা তৎক্ষণাৎ বাবার কাছে নালিশ ঠুকে দিল, “দেখো না আব্বু, এই বেয়াদবটা আমার মিকুম্মাকে চাচ্ছে!”
​আরিশান ইসলাম হেসে বললেন, “তো একটু দাও না ওকে, আদর করুক।”
​”নাহ, দেবো না!” রিত্তিকা জেদ ধরে বলল, “তুমি আমাকে ভালোবেসে দিয়েছ, ওকে তো দাওনি যে ও নিয়ে যাবে!”

​বাবা আর কী করবেন, মেয়ের আবদার দেখে বললেন, “আচ্ছা, দেওয়া লাগবে না।”
​এমন সময় ড্রয়িংরুমে এলেন রিত্তিকার মা, শানজাদা ইসলাম। তিনি মেয়ের এই কাণ্ড দেখে কপালে হাত দিয়ে বললেন, “কেন রে রিত্তি, বিড়ালটা দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? ছোট মানুষের মতো কেন করছিস?”
​রিত্তিকা গাল ফুলিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি ছোট, তাই করব!
ও আমার মিকুম্মা!”ইউ আর সো সুইট..!
​শানজাদা ইসলাম এবার আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ সরু করে বললেন, “এই! তুই ‘আম্মা’ বলে কাকে ডাকছিস?”
​রিত্তিকা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “কেন…?”

​”তোর বাপের কি আরেকটা বিয়ে হয়েছে যে তুই কাকে না কাকে আম্মা ডাকছিস? আমাকে ছাড়া এ বাড়িতে আর কোন আম্মা এলো?” মায়ের গলায় তখন সন্দেহের সুর।
​রিত্তিকা মনে মনে দুষ্টুবুদ্ধি ফেঁদে বসল। মুখে একদম সিরিয়াস ভাব এনে বলল, “আল্লাহ! তুমি জানো না আম্মু? আমার বাপে একটু আগে আরেকটা বউ নিয়ে আসলো বাড়ি!”
​শানজাদা ইসলামের তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি রেগে মেগে বললেন, “ইয়ার্কি মারছিস আমার সাথে?”

​”ওমা! তোমার সাথে ইয়ার্কি কেন মারবো? আমি কি বানিয়ে বলছি?”
​”তাহলে বলছিস কেন তোর বাপে বিয়ে করে আনছে?”
​রিত্তিকা আরও তেল দিয়ে বলল, “সবাই দেখছে আমার বাপের সুন্দরী নতুন বউকে, শুধু তুমি বাদে!”
​শানজাদা ইসলামের বুকটা ধক করে উঠল। তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “তাহলে তোর বাপে… বিদেশ থেকে আরেকটা বিয়ে করে আনছে সত্যি সত্যি?”
​রিত্তিকা মাথা নেড়ে বলল, “হুম!”
​ব্যস, আর যায় কোথায়! শানজাদা ইসলাম আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। ড্রয়িংরুমের ফ্লোরে ধপাস করে বসে হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলেন, “আমার বর আমাকে আর ভালোবাসে না রে! আরেকটা বিয়ে করে নিয়ে আসছে, ও আব্বা গো!”

​এদিকে রিত্তিকার অবস্থা তখন দেখার মতো। সে নিজের পেটে হাত দিয়ে হাসছে। কী একটা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলল, আর তার মা সেটাকে একদম ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করে ফ্লোরে বসে কান্নাকাটি শুরু করে দিল! রিত্তিকা হাসতে হাসতে সোফা থেকে গড়াগড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
​মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনে বাড়ির বাকি সবাই হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন। রিত্তিকার দাদু, সাদমান ইসলাম সবার আগে এসে বললেন, “কি হয়েছে বউমা? তুমি এভাবে মাটিতে বসে কান্নাকাটি করছ কেন?”
​শানজাদা ইসলাম কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “আব্বা! আপনার গুণধর ছেলে আরেকটা বিয়ে করে এনেছে!”
​সাদমান ইসলাম চোখ গোল গোল করে বললেন, “কি বলো কি তুমি! আরিশান বিয়ে করেছে মানে?”
​”হ্যাঁ আব্বা, একদম সত্যি বলছি আমি!”

​আরিশান ইসলাম নিজের স্ত্রীর মুখে এই অপবাদ শুনে তো পুরো থ মেরে গেলেন! তিনি বোকার মতো নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন—আমি নাকি আরেকটা বিয়ে করেছি, অথচ আমি নিজেই জানি না! তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, “কি বলছ কি শানজাদা? আমি আবার কখন বিয়ে করলাম?”
​শানজাদা ইসলাম চোখ রাঙিয়ে বললেন, “এই, একদম মিথ্যা বলবে না বলে দিচ্ছি! রিত্তি আমাকে সব সত্যি বলে দিয়েছে।”
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইফাত এতক্ষণ সব শুনছিল। সে মাথা চুলকে বলল, “রিত্তি জানে, কিন্তু আমরা বাড়ির কেউ জানি না এসব আজব কথা? ও নিশ্চিত মিথ্যা বলছে।”

​”না, ও মিথ্যা বলেনি!” বলেই শানজাদা ইসলাম আর ক্ষোভ ধরে রাখতে পারলেন না। ফ্লোর থেকে এক ঝটকায় উঠে হাতে থাকা খুন্তিটা নিয়ে তেড়ে গেলেন স্বামী আরিশান ইসলামের দিকে!
​বাড়ির সবাই তো হা করে জ্যান্ত নাটক দেখছে। আরিশান ইসলাম প্রাণভয়ে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “আরে বাবা! সত্যি বলছি আমি কোনো বিয়ে-শাদি করি নি। রিত্তি মা, তুই তোর মাকে কি বলেছিস বল না !
​রিত্তিকা তখনো হাসতে হাসতে কূল পাচ্ছে না। সে বলল, “আব্বু, আমি তো মিকুম্মার কথা মাকে বলছি। আমি বলেছি ও আমার মিকুম্মা আর কিছুই না তো!”
​শানজাদা ইসলাম খুন্তি উঁচিয়েই বললেন, “দেখছিস? ও আবার কাকে মা বলে ডাকছে!”
​ইফাত এবার কপালের চাপড়ে হেসে উঠল, “আরে মা! মিকুম্মা তো ওর নতুন বিড়ালটার নাম!”
​এক মুহূর্তের জন্য পুরো ড্রয়িংরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শানজাদা ইসলাম খুন্তি নামিয়ে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিহ! তাহলে রিত্তি তুই ওভাবে ঘুরিয়ে মিথ্যা কেন বললি?”

​রিত্তিকা নিষ্পাপ মুখ করে বলল, “আমি কোথায় মিথ্যা বললাম? তোমরা ভুল বুঝলে আমার কি দোষ!”
​সাদমান ইসলাম এবার ধমক দিয়ে উঠলেন, “আরে থামো তোমরা! আর বউমা, তুমি ভাবলে কি করে আমার ছেলে এই বয়সে আরেকটা বিয়ে করবে? যতসব পাগলামি!”
​শানজাদা ইসলাম লজ্জিত মুখে বললেন, “আসলে আব্বা…”
​”থামো তুমি, আর নিজের কাজে যাও। আর যে যার ঘরে যাও, এখানে তামাশা বন্ধ করো,” দাদুর কড়া নির্দেশে সবাই যে যার ঘরে চলে গেল। কিন্তু রিত্তিকার হাসি তখনও থামেনি। সে সোফায় গড়াগড়ি খেয়ে হাসতেই লাগল।

​বিকেলের দিকে রিত্তিকা সুন্দর করে রেডি হয়ে জিয়াদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। দুইদিন ভার্সিটি যাওয়া হয়নি, তাই জিয়ার কাছ থেকে নোটসগুলো নেওয়া খুব জরুরি।
​জিয়াদের বাড়িতে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে দেখা হয়ে গেল জিহাদের সাথে। জিহাদ একগাল হেসে বলল, “আরে রিত্তিকা! কেমন আছো?”
“ভালো, তুমি কেমন আছো?” রিত্তিকা মিষ্টি করে হেসে জবাব দিল।
“আমিও ভালো আছি। ভাইয়া জিয়া ঘরেই আছে, তুমি ভেতরে যাও,” জিহাদ বলতেই রিত্তিকা ভেতরের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটল এক অভাবনীয় কাণ্ড!
​খোলা দরজা দিয়ে কোত্থেকে যেন একটা মাঝারি সাইজের বানর হুট করে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ল। আর বানরটাকে দেখে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার কলিজা যেন শুকিয়ে গেল!
​”ওরে বাবারে! বানর” বলে এক বিকট চিৎকার দিয়ে জিহাদ সোজা ডাইভ মেরে সোফার ওপর গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদিকে ঘর থেকে ছুটে আসা জিয়া আর জেসমিন কোনো কিছু না ভেবে এক লাফে ডাইনিং টেবিলের ওপর উঠে পড়ল। আর রেনিয়া ও রিহানা কায়সার সোফায় পা দুটো একদম গুটিয়ে, কুশন বুকে চেপে ধরে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

​জিহাদ টেবিলের ওপর থেকে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আরে, কেউ একজন লাঠি আনো! বানরটাকে তাড়াও!”
রিহানা কায়সার চেঁচিয়ে বললেন, “বানর কিভাবে বাসায় ডুকলো? সিকিউরিটিকে ডাকো!”
রিত্তিকা বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি নিয়ে ধীরপায়ে বাঁদরটার দিকে এগিয়ে গেল। বাঁদরটাও যেন রিত্তিকার শান্ত রূপ দেখে একটু থমকে দাঁড়াল। রিত্তিকা একদম সামনে গিয়ে নিচু হয়ে বসল এবং পরম মায়াভরে বাঁদরটার মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগল। বাঁদরটা কোনো রকম দুষ্টুমি না করে লক্ষ্মী ছেলের মতো চোখ বন্ধ করে রিত্তিকার আদর উপভোগ করতে শুরু করল।
সবাই টেবিল আর সোফার ওপর থেকে হা করে এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখছিল। জিহাদ ফিসফিস করে বলল, “জিয়া, তোর এই বান্ধবী কি জংলি নাকি রে? বাঁদরকে ওভাবে আদর করছে!”
চুপ করো তো।

ঠিক এই মোক্ষম সময়েই জিয়ান ওপর থেকে নিচে নামছিল কোনো একটা কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই সে ড্রয়িংরুমের এই অদ্ভুত দৃশ্যটা খেয়াল করল। সবাই টেবিল-সোফার ওপর চিল চিৎকার করছে, আর রিত্তিকা মেয়েটা কোনো রকম ভয়ডর ছাড়া, পরম শান্তিতে একটা জ্যান্ত বাঁদরকে কোলে নিয়ে আদর করছে!

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৩

চোখের সামনে দৃশ্যটা সে আর নিতে পারল না। হঠাৎ করেই জিয়ানের চোখ দুটো উল্টে গেল এবং কোনো কিছু বোঝার আগেই সে ধপাস করে ড্রয়িংরুমের মার্বেল ফ্লোরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল!
​”ধপাস!” শব্দটা শুনে পুরো ড্রয়িংরুমের সবার নজর গেল পেছনের দিকে।
জিয়ান !” বলে রিহানা কায়সার সোফা থেকেই চিৎকার করে উঠলেন।
​জিয়া টেবিল উপর থেকে উঁকি মেরে বলল, “ভাইয়া তো শেষ! বাঁদর দেখে হার্ট অ্যাটাক করল নাকি!”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here