প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৭
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
গুটি গুটি পায়ে বাথরুম থেকে বের হয়ে ঘরে আসলো রিত্তিকা। মুখটা থমথমে। মেয়েটার পরনে শুধুমাত্র জিয়ানের নিজের একটা ঢোলা সাদা শার্ট, যা তার হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। শার্টের হাতাগুলো কব্জির কাছে গোটানো, আর ওপরের দুটো বোতাম খোলা থাকায় তার গলার ভাঁজ আর ফর্সা কাঁধের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে। বাথরুমের জলের ছোঁয়ায় তার কোমর ছাপানো লম্বা কালো চুলগুলো ভেজা, পিঠের ওপর সাপের মতো পেঁচিয়ে আছে, আর কিছু অবাধ্য ভিজে চুল তার গালে-মুখে লেপ্টে আছে। পরনের শার্টটা হাঁটু পর্যন্ত নেমে আসলেও লজ্জায় সে বারবার টেনে নিচে নামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। দ্রুত পায়ে সে কাবাডের কাছে গেল। তারপর একবার আয়নার দিকে তাকাতেই নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আর কোনো উপায় না পেয়ে কাবাড থেকে সে জিয়ানের একটা টাওজার বের করল।
জিয়ান এতক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে জরুরি ফোনে কথা বলছিল। কথা শেষ করে সে ঘরে ঢুকতেই রিত্তিকাকে এই অবস্থায় দেখতে পেল। গায়ে শুধু তার ঢোলা টি-শার্ট জড়ানো, আর পা দুটি একদম খালি, নগ্ন। রিত্তিকাকে এমন মাতাল করা রূপ ও আকর্ষনীয় অবস্থায় দেখে জিয়ান শুকনো ঢোক গিলল। মুহূর্তের মধ্যে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মনে হলো ঘরের ভেতরের পুরো বাতাস যেন এক নিমেষে থমকে গেছে। তার চোখের গভীরে ফুটে উঠলো এক আদিম, অপ্রতিরোধ্য নেশা।
রিত্তিকা পেছন ঘুরে তাকে দেখে জিয়ানের সেই তীব্র চাহনি সহ্য করতে পারল না। ভয়ে সে কিছুটা সিঁটিয়ে গেল। তার কণ্ঠ কাঁপতে শুরু করল। অতি কষ্টে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে সে বলল,
— ” কি হয়েছে ?”
জিয়ান রিত্তিকার এই ভয়ার্ত ও নিষ্পাপ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে এক পা, দুই পা করে রিত্তিকার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল।
জিয়ানকে এগোতে দেখে রিত্তিকাও ভয়ে পিছাতে শুরু করল। পিছাতে পিছাতে একসময় তার শরীর গিয়ে ঠেকলো ঘরের কাঠের কাবাডটার সাথে। আর পিছু হটার কোনো জায়গা নেই। জিয়ানের প্রতিটি পদক্ষেপ রিত্তিকার বুকের ভেতর তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। তার হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর ধুকপুক করে আছড়ে পড়ছে।
জিয়ান একদম তার কাছাকাছি চলে এলো। সে রিত্তিকার মাথার ঠিক পাশটাতে কাবাডের গায়ে শক্ত করে নিজের এক হাত রাখল। অন্য হাতটি দিয়ে রিত্তিকার সরু কোমর জড়িয়ে ধরল নিজের দিকে টেনে এনে। রিত্তিকাকে এত কাছ থেকে দেখে জিয়ান আর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না নিজেকে। তার গরম, তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তে লাগল রিত্তিকার ফর্সা মুখের ওপর।
জিয়ানকে এভাবে মাতালের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে রিত্তিকা ভয়ে ও তীব্র লজ্জায় নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। তার মনে হলো দম আটকে আসছে, নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যাবে এখনই। ভয়ে ও আতঙ্কে তার গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে।
রিত্তিকার এই কাঁপতে থাকা ঠোঁট দেখে জিয়ানের আত্মনিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে রিত্তিকার কাঁপতে থাকা লাল ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে এলো। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় উচ্চ স্বরে ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠলো!
মুহূর্তের মধ্যে জিয়ান ঘোর কাটিয়ে বাস্তবে ফিরে এলো। কলিং বেলের বিকট শব্দে রিত্তিকাও ঝট করে নিজের চোখ মেলে তাকাল। একরাশ বিরক্তি আর অসম্ভব গম্ভীর কণ্ঠে জিয়ান বলল,
— “এসব পরে আমাকে সিডিউস করতে চাইছ?”
রিত্তিকা একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
জিয়ান তার শরীর থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়াতেই রিত্তিকা অভিমান আর কাঁপানো গলায় উত্তর দিল,
— “আমি কি ইচ্ছে করে এসব পরেছি নাকি? আপনি আমাকে এখানে এনেছেন, অথচ আমার কোনো পরার জামাকাপড় আনেননি! আমি শাওয়ার নিয়ে এসে তবে কী পরব?”
জিয়ান তার মুখের কথা শুনে শক্ত চোয়াল আরও শক্ত করল। গম্ভীর আর কঠোর গলায় বলল,
— “যাও এখান থেকে! আমি তোমার জন্য জামা অর্ডার দিয়েছিলাম, সেটাই হয়তো পার্সেল হয়ে চলে এসেছে।”
কথাটা বলেই জিয়ান দরজার দিকে গেল। কিছুক্ষণ পর পার্সেলটা নিয়ে রুমে ফিরে এসে সে রিত্তিকার হাতের দিয়ে বলল,
— “কাছে গেলেই তো কই মাছের মতো লাফাতে থাকো, ইডিয়ট!”
কথাটা বলেই সে ঘর থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে পাশের রুমে চলে গেল।
রিত্তিকার মনে প্রচণ্ড রাগের সৃষ্টি হলো। লোকটার আচরণে সে স্তম্ভিত। মনে মনে গাল দিয়ে বলল, “খচ্চর প্রফেসর একটা! এই ভালো তো আবার এই খারাপ! সবসময় শুধু শুধু রাগ দেখায় আমার ওপর!”
এদিকে অন্য রুমে এসে জিয়ান নিজের গায়ের শার্টটা টান দিয়ে খুলে মেঝের ওপর ছুড়ে মারল। তার চোখ দুটো রাগে রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। প্রচণ্ড রাগে আর হতাশায় সে নিজের মাথার চুলগুলো নিজে খামচে ধরল।
মনে মনে জ্বলতে জ্বলতে ভাবল, “যখনই আমি ওই মেয়েটার কাছে যাই, তখনই ও অদ্ভুত সব আচরণ শুরু করে। আমার স্পর্শ কি এতটাই খারাপ যে ও এভাবে দূরে সরে যায়? আবার যখনই একটু কাছে গিয়ে নিজের করে নিতে যাই, তখনই কেউ না কেউ এসে ডিস্টার্ব করবে! যেন দুনিয়ার যত ঠাডা আর ঝামেলা আছে, সব বউয়ের কাছে গেলেই পড়তে হবে!”
রাত তখন প্রায় ১০টা বাজে।
জিয়ান এতক্ষণ পাশের ঘরেই কাটালো, একবারের জন্যও এই রুমে আসেনি। রিত্তিকাও সাধ সাধতে তার সামনে যায়নি—কেনই বা যাবে ওই খচ্চরটার সামনে যে শুধু কারণে-অকারণে চিল্লাচিল্লি করে!
কিছুক্ষণ পর জিয়ান ঘরে ঢুকে দেখল রিত্তিকা বিছানায় বসে চরম মনোযোগ দিয়ে নিজের ফোন দেখছে। সে খেয়াল করল, মেয়েটা কখনো এভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে না! জিয়ান নিঃশব্দে এগিয়ে এসে বিছানায় তার একদম মুখোমুখি বসল।
জিয়ান এবার মুখে এক চিলতে রহস্যময় মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর খুব নিচু আর মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে বলল,
— “চলো, প্ল্যানিংটা করেই ফেলি…!” জিয়ান মুচকি হেসে বলল।
রিত্তিকা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কিসের প্ল্যানিং করব? ”
— “উমম… বেবি নেওয়ার প্ল্যানিং!”
— “হুমম, ঠিক আছে! চলুন তাহলে, একদম ১ ডজনই নিয়ে নিই।”
জিয়ান যেন চোখ কপালে তুলল, “কী! পারবে তুমি সামলাতে…?”
রিত্তিকা একটু দুষ্টুমির হাসি হেসে জবাব দিল,
__”হ্যাঁ, পারব না কেন? আপনিই তো আগে ৩ ডজনের কথা বলছিলেন, সেখানে আমি মাত্র ১ ডজন বললাম! আমার তো আস্ত একটা ফুটবল টিম চাই। কিন্তু আপনি পারবেন তো সামলাতে? ”
জিয়ান রিত্তিকার এই হঠাৎ মতিগতি ঠিক বুঝতে পারল না। তবে আর বেশি না ভেবে, আলতো হেসে রিত্তিকার একটু কাছে ঘেঁষে এলো। তারপর যেই চোখ দুটো বন্ধ করে রিত্তিকার ঠোঁটের দিকে ঝুঁকল—ওমনি রিত্তিকা পাশে থাকা পাউডারের ডিব্বাটা তুলে জিয়ানের মুখে পুরো ছিটিয়ে দিল!
পরমুহূর্তেই পুরো ঘর ভাসিয়ে এক মিষ্টি খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল রিত্তিকা। জিয়ানকে ওভাবে ফেলে রেখে সে দ্রুত দৌড়ে ঘর থেকে পালিয়ে গেল!
এদিকে জিয়ান মুখের ওপর ধবধবে সাদা পাউডার মেখে একদম ভূত হয়ে হতভম্বের মতো বিছানায় বসে রইল! তার এখন মন চাইছে দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে তুলে সোজা নিচে আছাড় মারতে! কিন্তু নিজের ওপর তার কোনো জোর নেই, সে তা পারছে না।
রাত তখন প্রায় ৩টে বেজে গেছে।
রিত্তিকা পাশের ঘরে গিয়ে আরামে ঘুমে কাদা হয়ে গেছে। জিয়ান এতক্ষণ বিষণ্ণ মনে ল্যাপটপে বসে অফিসের কাজ করছিল। কাজ শেষ করে সে ঘরে ঢুকে দেখল রিত্তিকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
জিয়ান নরম পায়ে তার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। রিত্তিকার নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার গালে, কপালে আর ঠোঁটে অজস্র আলতো চুমু একে দিল। কিন্তু এতেও তার ভেতরের সুপ্ত তৃষ্ণা মিটল না, বরং কাজ উল্টো হলো—সে আবারও নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে লাগল।
শেষে কোনো উপায় না পেয়ে জিয়ান রিত্তিকার পাশ থেকে উঠে দ্রুত বেলকনিতে চলে গেল।
বেলকনির ঠাণ্ডা হাওয়ায় চেয়ারে গিয়ে বসল জিয়ান।
চাঁদের দিকে তাকিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বললো,
— “ইডিয়ট একটা! কিচ্ছু বোঝে না! আবার সব বুঝেও না বোঝার ভান করে বসে থাকে!”
পরদিন সকাল ৮টা বাজে।
রিত্তিকা একটা হালকা রঙের সুন্দর থ্রি-পিস পড়ে আয়নার সামনে বসে আপন মনে চুল আঁচড়াচ্ছে। ঠিক এমন সময় জিয়ান ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর বসে পড়ল।
রিত্তিকাকে অপলক চোখে দেখে সে জিজ্ঞেস করল,
— “এত সাজগোছ করছ কেন?”
রিত্তিকা আয়নার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে গাল ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
— “কোথায় সাজলাম? শুধু চুলগুলো তো আঁচড়াচ্ছি!”
জিয়ান মুচকি হেসে রিত্তিকার দিকে একটু ঝুঁকে বলল,
— “উমম… তাতেই আমার বউটাকে এত সুন্দর লাগছে কেন?”
রিত্তিকা ভেঙচি কেটে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
— “নাটক না করে সরুন তো সামনে থেকে!”
জিয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— “এত রাগ করছ কেন সারাক্ষণ?”
রিত্তিকা চোখ পাকিয়ে উত্তর দিল,
— “আমি তো রাগ করতেই পারি না, শুধু আপনি একা পারেন!”
জিয়ান রিত্তিকার ফর্সা গালের দিকে তাকিয়ে একটু দুষ্টুমি করে বলল,
— “আসো বউ, দুটো চুমু খাই! তাহলেই সব রাগ একদম পানি হয়ে চলে যাবে!”
জিয়ানের এমন খোলামেলা কথা শুনে লজ্জায় রিত্তিকার দুই গাল একদম টকটকে লাল হয়ে গেল! মনে মনে ভাবল, জীবনে এমন ঠোঁটকাটা বেহায়া মানুষ সে আর একটাও দেখেনি!
সে শক্ত গলায় বলল,
— “চুপ করুন নির্লজ্জ!”
রিত্তিকা স্থান ত্যাগ করে উঠে চলে যেতে চাইলে জিয়ান এক টানে তাকে ধরে আবার আয়নার সামনে বসিয়ে দিল। তারপর তার দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলল,
— “বলো, কী করলে তোমার রাগ কমবে?”
রিত্তিকা এবার চুপ করে রইল, কোনো কথা বলল না। মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
জিয়ান কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,
— “চলো, তোমাকে শপিংয়ে নিয়ে যাই! শুনেছি শপিং করলে নাকি মেয়েদের সব রাগ কমে যায়!”
কথাটা শোনামাত্রই রিত্তিকার চোখ দুটো সন্দেহে ছোট হয়ে এলো। সে চট করে জিয়ানের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল,
— “আপনি এত কিছু কীভাবে জানেন? ওই এনিকে নিয়ে যেতেন নাকি শপিং করাতে, ও রাগ করলে?”
জিয়ান রিত্তিকার মুখে ওই নামটি শোনামাত্রই মেজাজ হারিয়ে ফেলল। তার চোখ দুটি হিংস্র হয়ে উঠল। সে গর্জে উঠে বলল,
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৬
— “শাট আপ, স্টুপিড! আর একটা ফালতু কথা বললে থাপ্পড় মেরে গাল লাল করে দেব!”
খানিকটা থেমে জিয়ান নিজের স্বর একটু নিচু করে আদেশ সূচক কণ্ঠে বলল,
— “রেডি থাকবে। আমি এসে তোমাকে বাইরে নিয়ে যাব। আর রিমেম্বার… ফারদার এমন কোনো বাজে কথা যেন তোমার মুখ থেকে না শুনি!”
