প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৫
রাত্রি মনি
জেইনের প্রতিটি শব্দ যেন বিষাক্ত তীরের মতো রিমের কানে বিঁধছিল। রিমের চোখ দুটো তখন জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে; সেই দৃষ্টিতে এমন এক সংহারী তীব্রতা, যা মুহূর্তেই কাউকে ভস্মীভূত করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। জেইন সেই অগ্নিদৃষ্টির গভীরে অতলান্ত ডুব দিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা, হিংস্র হাসি ফুটিয়ে তুলল। এরপর ধীরলয়ে রিমের কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল সে। ঠোঁট কামড়ে হুইস্কির মতো গাঢ় আর নেশাক্ত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
“উফফ্… এভাবে তাকিয়ো না সোনা! ইচ্ছে করে খেয়ে ফেলি!”
রিমের অন্তরে যেন বজ্রপাত হলো। রাগে তার ভেতরটা বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো। চোখে মুখে শুধু তীব্র ঘৃণা আর দহন। কোনো ভাবনা-চিন্তা না করেই হাত উঠে গেলো বিদ্যুতের মতো, ঝাঁকিয়ে বসিয়ে দিলো এক জোরালো চড়।
চড়ের শব্দ ঘরে প্রতিধ্বনির মতো বেজে উঠলো।জেইনের মাথাটা একদিকে হেলে পড়ল, ফর্সা গালে ফুটে উঠল রক্তিম আঙুলের ছাপ। সে নড়ল না; বরং আঙুল দিয়ে সেই আঘাতের জায়গাটা আলতো করে ছুঁয়ে দেখল, যেন সেই আঘাতকে মাপছে, উপভোগ করছে।
অন্যদিকে রিম তখন ক্রোধে ফুঁসছে। বুক ধড়ফড় করছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে, শরীর কাঁপছে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরণের আগে। মনে হচ্ছে, এই মানুষটাকে যদি পারতো, তবে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতো রক্ত মেখে শান্ত হতো তার সমস্ত ঘৃণা।
কিন্তু জেইনের চোখে কোনো অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। উল্টো সেই শীতল নীলাভ দৃষ্টিতে খেলা করছে এক বিকৃত শিকারির উল্লাস।জেইন নেশাগ্ৰস্থের মতো ধীরে ধীরে মাথা তোলে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে ভেসে ওঠে অদ্ভুত নেশার ছাপ নীলাভ দৃষ্টির গভীরে ঝলসে ওঠে এক অমানবিক তৃপ্তি। ঠোঁটে বাঁকা, বিকৃত এক হাসি। থাপ্পরের জায়গায় আঙুল বুলিয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করে দেয় সে, যেন এই যন্ত্রণা তাকে এক অনন্য আনন্দে ভাসিয়ে দিচ্ছে।ঠোঁট কামড়ে আবারও সেই হিংস্র হাসি ছড়িয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে, জীবনে কখনো এতটা পরিতৃপ্তি পায়নি সে।
হঠাৎ জেইন ঝড়ের গতিতে রিমের হাতটা চেপে ধরল। সেই কোমল হাতের মুঠোয় জেইনের আঙুলগুলো যেন লোহার শিকলের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে গেঁথে বসল। রিমের সারা শরীর ঘৃণায় আর আতঙ্কে কুঁকড়ে উঠল। বুক ধক করে ওঠে। ছোঁয়াটুকুতে তার শরীরের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে যা তাকে আরও অস্থির করে তোলে। নিজের উপরই ঘৃণা জন্মায়, মনে হয় এই ছোঁয়া শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিতে পারলে মুক্তি মিলবে।
সে হাত ছাড়িয়ে নিতে মরিয়া হয়ে মোচড়াতে থাকে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, রাগে-ভয়ে চোখ লাল। কিন্তু জেইনের চাপ আরও শক্ত হয়, হাড় পর্যন্ত যেন চূর্ণ হয়ে যাবে।
সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে হঠাৎ জংলি বিল্লির মত নিজের ধারালো ছোট ছোট দাঁত বসিয়ে দেয় জেইনের কাঁধে। তীব্র কামড়ে রক্ত ভেসে ওঠে।
কিন্তু জেইন চিৎকার তো দূরের কথা সুখের যন্ত্রণায় খিঁচে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার ঠোঁট কামড়ে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে। কাঁধ থেকে ধীরে ধীরে করে গরম রক্ত দৃশ্যমান হয়, অথচ তার মুখে শিহরণে ভরা এক অসুস্থ উল্লাস।অস্পষ্ট গলায় ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে আসে শব্দগুলো
“More… I like this pain. You’re taking me to heaven… আরো দাও সোনা… আরও গভীর, আরও বেশি…”
তারপর কাঁপা কণ্ঠে, প্রায় কর্কশ এক স্বরে নিঃশ্বাসের ফাঁকে বলে ওঠে
“চাইলে আমাকে পুরোপুরি শেষ করে দাও। তোমার আগুনে জ্বালিয়ে ছাই করে দাও আমাকে…”
রিমের শরীর ঘৃণায় শিরশির করে ওঠে, যেন প্রতিটি রক্তকণায় বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। সে মরিয়া হয়ে সরে যেতে চায়, কিন্তু জেইনের শিকলের মতো বাহু তাকে আরও শক্ত করে টেনে আনে। হঠাৎই জেইন তাকে পাজাকোলা করে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে দিল। অবস্থাটা যেন বন্দি শিকারীর মতো, মুক্তির কোনো পথ নেই।
রিম উন্মাদিনীর মতো ছটফট করতে থাকে। হাতের ঘুষিগুলো এলোমেলোভাবে ঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে থাকে জেইনের বুকে, কাঁধে, মুখে। প্রতিটি আঘাত রিমের রাগ আর অসহায়তার প্রকাশ।
কিন্তু জেইন সে যেন ব্যথায় নয়, বরং এই উন্মাদ প্রতিরোধেই তৃপ্তি খুঁজে পায়। মুহূর্তেই তার হাত দুটি শক্ত করে চেপে ধরে ফেলে, আঙুলের চাপ রিমের হাড় পর্যন্ত গেঁথে বসে।
ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনে, কানে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে ওঠে সেই আঠালো, মাতাল গলায়,
“উফফ্… এতো দিন কোথায় লুকিয়ে ছিল তোমার এই জংলি রূপটা? ভীষণ মিস করছিলাম আমি… আমার ছোট্ট জংলি বিল্লি!”
তার ঠোঁটে বিকৃত হাসি ছড়িয়ে পড়ে। চোখে পাগলাটে শিকারির নেশা।
“চলো, কামড়াকামড়ি খেলি… তুমি যেমন সবসময় আমার বুকে কামড়ে ধরো… আমিও আজ তোমার কোমল বুকে দাঁত বসাবো।”
রিমের গায়ে যেন শীতল স্রোত বয়ে গেলো। মনে হলো, অন্ধকারে আটকে পড়েছে এমন এক দানবের হাতে, যে ব্যথা আর আনন্দের সীমারেখাই মুছে ফেলেছে।
রিমের শরীরের ভেতর রাগ আর ঘৃণার আগুন তড়তড় করে জ্বলে উঠছে। চোখ দুটো লালচে, দহন থেকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, যেন আগুনের ফোঁটা। সে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় প্রাণী মনে করছে এই মুহূর্তে এই মনস্টারের কোলে বন্দি। তার প্রতিটি ছোঁয়া রিমের কাছে বিষাক্ত দংশনের মতো। ইচ্ছে করছে নিজের চামড়াটাই ছিঁড়ে ফেলে দিক, যাতে সেই জঘন্য স্পর্শ মুছে যায় চিরতরে।
রিম ফুঁপিয়ে উঠতেই তার শরীর আরও কেঁপে ওঠে। কিন্তু জেইনের চোখে সেই কান্না দুর্বলতার নয় অদ্ভুত উত্তেজনার প্রতীক। ধীরে ধীরে তার ঠান্ডা হাত জামার ভেতর ঢুকে মসৃণ পেট ছুঁয়ে যায়। স্পর্শটা ছিল বরফশীতল, অথচ জ্বালাময়। রিম পুরো শরীর থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে। দাঁত চেপে ঠোঁট কামড়ে সবটা সহ্য করে । আঙুলগুলো মরিয়া হয়ে খামচে ধরে বিছানার চাদর।
চোখ-মুখ ফুলে কান্নায় লাল হয়ে গেছে। সেই হাহাকার ভরা সুর, সেই ভাঙা নিশ্বাসের শব্দ জেইনের রক্তে বিদ্যুতের মতো দৌড়ে বেড়ায়। তাকে করে তোলে আরও অস্থির, আরও ক্ষুধার্ত।
সে ধীরে ধীরে রিমের ঘাড়ের কাছে আসে। আঙুল দিয়ে সরিয়ে দেয় চুলগুলো, যেন শিকারের মাংস উন্মুক্ত করছে। তারপর হঠাৎ এক তৃষ্ণার্ত শিকারির মতো মুখ ডুবিয়ে দেয় সেখানে। ঠোঁটের পর ঠোঁট বসতে থাকে তার ঘাড়ে প্রথমে হালকা, তারপর আরও আক্রমণাত্মক। নাক দিয়ে স্লাইড করতে করতে শুষে নিতে থাকে তার সুগন্ধ, প্রতিটি চুম্বন যেন কামড়ে ধরার আগের মুহূর্ত।
রিমের চোখে ঘৃণা আর আতঙ্ক মিশে অন্ধকার আরও গভীর হয়। মনে হয়, সে ধীরে ধীরে গ্রাস হয়ে যাচ্ছে এক দানবের আবেশে…
রিম আর সহ্য করতে পারছে না। ঘৃণায় শরীরটা শিরশির করে কাঁপছে, কান্নার গতি আরও তীব্র হচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে এত জোরে যে মনে হচ্ছে খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। তার চোখে অসহায় অন্ধকার মনে হচ্ছে, পালানোর একমাত্র উপায় মৃত্যু। এই দানবের কোলে বসে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই শান্তি।
কিন্তু জেইনের চোখে এই কান্না দুর্বলতার নয় নেশার মতো এক মাদক। ছোট ছোট চুম্বনে তার ঘাড় ঢেকে যাচ্ছে। আঙুলগুলো যেন অন্ধ শিকারির মতো ছুটে বেড়াচ্ছে শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে। প্রতিটি ছোঁয়া রিমের কাছে বিষাক্ত, প্রতিটি স্পর্শ তার আত্মাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
চুমুর রেখা ঘাড় থেকে উপরের দিকে বেয়ে উঠছে সাপের মতো, ধীরে ধীরে, লালসা মাখানো এক বিষাক্ত খেলার মতো। জেইনের ঠোঁট এসে থামে কানে, সেখানকার নরম লতিতে দাঁত বসিয়ে দেয়। ব্যথার শিহরণে রিম খিঁচিয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। তার হাত দুটো জেইনের বাহুতে শক্ত করে বন্দী, মুক্তির কোনো উপায় নেই। পা দুটো ভয়ে আর ঘৃণায় কুঁকড়ে ওঠে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে বুক ওঠানামা করতে থাকে।
জেইনের ঠোঁট তার কানে লেগে থাকে, আর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় হিংস্র এক ফিসফিস
“এভাবে কেঁদো না, সোনা… It’s driving me crazy. তোমার এই কান্নার শব্দ আমাকে আরও ক্ষুধার্ত করে তুলছে… ইচ্ছে করছে এটাকে আরও তীব্র করতে।”
রিমের চোখ ভিজে ওঠে আগুনে। সে দাঁতে দাঁত চেপে ঘৃণায় কাঁপতে কাঁপতে হিসহিসিয়ে ওঠে
“জানোয়ার… তুই একটা জানোয়ার! তোকে মানুষ বলাটা পাপ। আমি তোকে ঘৃণা করি… মৃত্যুর মতো ঘৃণা করি।
তার কণ্ঠে ছিল দহন, ভয়ের ভেতরে জমে থাকা এক অদম্য ঘৃণার আগুন।
জেইনের ঠোঁটে ভেসে ওঠে শয়তানি হাসি। হঠাৎই সে দাঁত বসিয়ে দেয় রিমের ঘাড়ে এমনভাবে, যেন শিকারী পশু তার শিকারকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে, রক্ত চুষে নিতে চাইছে শেষ ফোঁটা পর্যন্ত।
ব্যথার তীব্রতায় রিম যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। তার নিঃশ্বাস ছিঁড়ে যাচ্ছে বুকের ভেতর থেকে, প্রতিটি মুহূর্তে শরীর কাঁপছে আগুনে পোড়া পাতার মতো। অবশেষে, আর সহ্য করতে না পেরে সে নিজের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ধসে পড়ে জেইনের শক্তপোক্ত বুকে।
জেইনের রহস্যময়ী হাসি আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। শিকারের দুর্বলতায় যেন অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পায় সে। এক হাতে রিমকে আরও শক্ত করে টেনে নেয়, নিজের বুকে এমনভাবে পিষে ধরে, যেন আর কখনো ছাড়বে না।
রিমের চোখ থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। সেই অশ্রুধারা বেয়ে ভিজে যাচ্ছে জেইনের বুকের শার্ট। প্রতিটি ফোঁটা যেন তাকে বিদ্ধ করছে, অথচ সেই যন্ত্রণা জেইনের কাছে এক অদ্ভুত সুখের মতো।
রিম কাঁপতে কাঁপতে, ভাঙা গলায় অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে
“ঘৃণা করি… ঘৃণা করি আমি তোকে… আমি… আমি তোকে…”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু ঘৃণার বিষে ভরা প্রতিটি শব্দ ছুরির মতো বিঁধছিল বাতাসে।
আর জেইনের চোখে সেই ঘৃণাই পরিণত হচ্ছিল বিকৃত নেশায় যেন তার আসল আনন্দ লুকিয়ে আছে এই প্রতিরোধেই।
জেইন ধীরে ধীরে এক আঙুল তুলে রিমের থুতনিতে রাখে। শক্ত করে তার মুখটা উপরের দিকে ঠেলে ধরে, যেন চোখে চোখ রেখে শিকারকে বশ মানাতে চাইছে। তারপর নির্দয় ভঙ্গিতে ঝুঁকে এসে ঠোঁটে বসিয়ে দেয় ছোট্ট এক গাঢ় চুমু যেন কোনো অধিকার ঘোষণা করছে।
পরক্ষণেই সে রিমকে বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে। তার বাহুর বাঁধন এতটাই শক্ত যে মনে হয় হাড়গুলো চূর্ণ হয়ে যাবে। রিম নিঃশ্বাস নিতে হিমশিম খায়, চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে অবিরাম।
জেইনের ঠোঁট নেমে আসে রিমের কানে। তার ভয়ংকর শীতল কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে কেটে যায় রিমের বুকের ভেতর
“জানি… এটাই তো চাই আমি। ঘৃণা করো, যত পারো ঘৃণা করো… As much as you can. কারণ তুমি যত বেশি ঘৃণা করবে… আমাকে আরও তত বেশি অনুভব করবে।”
রিম জেইনের বুকে লুটিয়ে পড়ে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। কান্নায় চোখ দুটো ফুলে উঠেছে, মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। গলা শুকিয়ে মরুভূমির মতো, এক ফোঁটা পানির তৃষ্ণা তার চোখে ভাসছে।
কিন্তু জেইনের ভেতর শান্তি নেই। বরং সে আরও তৃপ্তি খুঁজছে। এক ঝটকায় রিমকে ঘুরিয়ে নিয়ে আবার কোলে বসিয়ে নেয়। তার আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে চোখের জল মুছে দেয়, আর ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত স্নেহ।
“ইশ্… আমার সোনাটা, কান্না করে নিজের কি অবস্থা বানিয়ে ফেলেছো দেখো তো। এভাবে কেউ অকারণে কাঁদে?”
তারপর ঠোঁট কাছে এনে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে,
“তোমার কান্না করার খুব শখ… তাই না? ঠিক আছে, তোমার সব শখ পূরণ করবো আমি। আগে একটু সুস্থ হও… তারপর বিছানায় যত খুশি কাঁদতে পারবে তুমি। আমি একটুও বাধা দেবো না। তুমি শুধু আমার দেয়া যন্ত্রণাতেই কাঁদবে। তুমি কাঁদবে, আমার সন্তান প্রসব বেদনায়… আর সেই কান্নার সুরেই আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হবো।”
রিমের কাঁধে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে জেইন আবারও ফিসফিস করে
“কিন্তু তার আগে তো তোমাকে তৈরি করতে হবে, সোনা। তোমার শরীরটা এত নরম… একটুও ছোঁয়া দিলে নেতিয়ে পড়ে। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে, জানো তো? কারণ আমি তো ভালো মানুষ না… একবার পেলে আর ছাড়বো না।”
হঠাৎ ঠোঁট কামড়ে শয়তানি হাসি ছড়িয়ে দেয়,
“এখন আসো, তোমাকে একটু খেয়ে দিই…”
তারপর একটু থেমে,
“ওপস্ সরি… মুখ ফসকে ভুলভাল বেরিয়ে গেছে। আসো, তোমাকে খাইয়ে দিই। শরীরে শক্তি বানাতে হবে তো… যাতে আমার সব খেলাগুলো সহ্য করতে পারো।”
বলেই টেবিল থেকে ফলভরা প্লেটটা হাতে তুলে নিল জেইন। চামচে তুলে ওটস এগিয়ে দিল রিমের ঠোঁটের সামনে। সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“চুপচাপ খেয়ে নাও। তারপর যত খুশি কামড়াও, আঁচড়াও, মারামারি করো একটুও বাঁধা দেব না। হা করো লক্ষ্মী…”
রিম এতোক্ষণ শুধু নিশ্চুপ বসে তার কথা গুলো গিলে যাচ্ছিল। তার গা গুলিয়ে উঠছে। হঠাৎ দম ফেটে যাওয়ার মতো ঝটকা মেরে সে পুরো খাবারটা ফেলে দিল। ভারী প্লেট মার্বেল ফ্লোরে পড়ে তীক্ষ্ণ ঝনঝন শব্দে গড়িয়ে গেল। সেই শব্দটা যেন ছুরি হয়ে বাতাস কেটে গেল ঘরে।
জেইন চোখ বন্ধ করে শব্দটা শুনল। ঠোঁট কামড়ে শয়তানি হাসি ছড়িয়ে দিল মুখে। ঘাড় দুপাশে কাত করে টান দিতেই ক্যাড়ক্যাড় শব্দে হাড়গুলো ফেটে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে রিমের দিকে তাকাল নেশাখোর পশুর মতো জ্বলজ্বল করছে তার চোখ।
সে টেবিল থেকে ট্যাবলেটটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিন অন হতেই ভেসে উঠল অন্ধকার ঘরের দৃশ্য হাত-পা বাঁধা এক যুবক, মাথা নিচু, শরীর জুড়ে ক্ষত আর ব্যান্ডেজের স্তর। রক্ত জমাট বেঁধে গেছে সর্বত্র। চেনার উপায় নেই।
রিম প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর কপাল টানটান হয়ে উঠল। কৌতূহল মিশ্রিত ভয় নিয়ে আরও কাছে ঝুঁকে দেখল। আর পরমুহূর্তেই তার মুখে জমে গেল আতঙ্কের বরফ। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ঠোঁট কেঁপে ফিসফিস করে বেরিয়ে এলো,
“রিশাব…!”
সাথে সাথেই জেইনের শিরা ফেটে বেরোনো রাগে হাত উঠে গেল। বজ্রের মতো শক্ত আঙুলে সে রিমের গলা চেপে ধরল। তার নিঃশ্বাস যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। জেইনের দাঁত কষে ওঠা শব্দ কানে খাঁদ রেখে গেল।
ফোঁস ফোঁস করে পশুর মতো নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে সে হিসহিসিয়ে বলল,
“অ্যাই বান্দির বাচ্চা! অ্যাই…!!! কতবার বলেছি, আমার সামনে ওই নামটা উচ্চারণ করবি না!! শুধু আমার সামনে নয় তোকে নিষেধ করছি, তুই কোনোদিন, কোনো সময়, অন্য কোনো পুরুষের নাম মুখে নিবি না। ওরা তোর জন্য হারাম। তুই যদি তাদের নাম নিস তখন শুধু তাদের কবর খুঁড়বো না, তোর কবরও খুঁড়ে রাখবো আমি। তারপর সেই কবরে নিজের অস্তিত্ব ঠেসে বসিয়ে রাখবো। তবুও অন্য পুরুষের ছায়া পড়তে দেব না তোর গায়ে।
সে আরও কাছে ঝুঁকে নিঃশ্বাস গলায় ঢেলে দিল,
“মৃত্যুর পরেও তুই শুধুই আমার থাকবি। আমি ছাড়া তোর কোনো ঠিকানা থাকবে না।”
রিম মরনযন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল। দুহাত দিয়ে নিজের একহাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল। শ্বাস কেটে আসছিল, চোখ দিয়ে অশ্রু অবিরাম পড়ছে। চোখের পাতা ঝিমঝিম করে লাগছে, পুরো শরীর যেন তার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চায়। খুকখুক করে কেশে ওঠতেই জেইন তার হাতের বাঁধন আলগা করল। রিম ঢলে পড়ল তার বাহুতে, যেন হাড়মজ্জায় টুকরো হয়ে গেছে।
জেইন অস্থির, প্রায় পাগলের মতো দিশেহারা হয়ে যায়। বুক ধড়ফড় করে ওঠে, ভিতর থেকে গলা ভেঙে বেরোনো এক ফিসফিসে কেঁপে ওঠে
“সোনা, এই কি হয়েছে তোমার? খুব বেশি লেগেছে? আমি সরিইই… বুঝতে পারিনি। তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে, সোনা?”
তার গলায় প্রায় কেঁদো কেঁদো স্বর, শ্বাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা আর আতঙ্কের মিশ্রণ।
“প্লিজ, সোনা… চোখ খোলো। আমার কষ্ট হচ্ছে তো। কেন বারবার ঐ নর্দমার নামটা নাও বলোতো? জানো তো, তোমার মুখে অন্য কারো নাম সহ্য করতে পারি না আমি। সোনা… চোখ খোলো সোনা। তাকাও আমার দিকে।”
রিমের চোখের পাতা বন্ধ। নিঃশ্বাস নিঃসৃত, ধীরে ধীরে মিলছে নিঃশ্বাসের সঙ্গে। জেইনের ভেতর অস্থিরতার এক অদ্ভুত ঝড় উঠেছে মনে হচ্ছে, শ্বাস আটকে মরে যাওয়া মাত্র সময়ের অপেক্ষা। সে আর উপায় পায় না। ধীরে ধীরে রিমের মুখের মধ্যে নিজের মুখ ঢুকিয়ে দেয়, আস্তে আস্তে অক্সিজেন দিতে শুরু করে।
বেশ কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস দেওয়ার পরেও রিম একটুও নড়ল না। জেইনের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। হাত ধরে তাকে আরও কাছের কোলে টেনে নেয়, মুখে মুখ লাগিয়ে গভীরভাবে নিঃশ্বাস দেওয়া অব্যাহত রাখে।
হঠাৎ রিম ধক করে ওঠে। চোখের পাতা ধীরে ধীরে খুলে যায়। শরীর কেঁপে উঠে কাঁশতে কাঁশতে, হিমশিমে খুকখুক করতে থাকে। জেইন যেন ঘূর্ণিঝড় এলোমেলোভাবে তাকে বুকে চেপে ধরে, কপালে, চুলে ছোট ছোট চুমু দেয়। তারপর দুহাতের আজলায় মুখ ধরে, ছোট ছোট আদুরে চুমুতে ভরিয়ে দেয়।
রিম শ্বাস আটকে সবটা সহ্য করে। মাথার ভেতর মিলেমিশে আছে ব্যথা, ভয়, অদ্ভুত ঝড় কিন্তু স্বীকার করে নিতে বাধ্য, যে লোকটি এখন তার স্বামী। এই ব্যক্তি তার হক আছে রিমের ওপর।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। চোখে জল জমে, বুক ধড়ফড় করে। তার ভেতরের ছোট্ট শিশুটি চিৎকার করছে , ‘কেন আমার জীবনটা এইভাবে তৈরি হলো? কেন সব যন্ত্রণাই আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? সেই ছোট্ট বেলা থেকেই।’
জেইন রিমের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখতে পেয়ে, চোখে চোখ রেখে মুখের দিকে তাকায়। তার চোখ দুটো যেন নেশার মতো মুদে আছে, গভীর, এবং বিকৃত আবেশে ভরা। রিম সেই চোখে তাকাতে পারে না। শরীরটা শিরশির করে কেঁপে ওঠে। অস্বস্তি, ভয় আর অদ্ভুত উত্তেজনা মিশে এক অনির্ণেয় অনুভূতিতে।
জেইন আস্তে আস্তে তার মুখের কাছে ফিসফিস করে, গাঢ়, আদুরে কণ্ঠে
“বেশি ব্যথা করছে, সোনা? হুম? আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি তো… ঠিক আছে, তুমি… তুমি মারো আমাকে। যত খুশি আঘাত করো।”
জেইন ধীরে ধীরে রিমের গলায় ফু দিতে থাকে, নরম, নাজুক যেন কোনো কোমল ফুল। রিম হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেলে, চোখে অদ্ভুত তাচ্ছিল্য। কণ্ঠে বেরোয় এক তীক্ষ্ণ স্বর,
“হাহ্, আপনি শুধু বাইরের কষ্টটাই দেখছেন! ভেতরে যে যন্ত্রণা হচ্ছে, সেটা কিভাবে দেখাবো আপনাকে? আপনার কি সাধ্য আছে, ভেতরের সেই রক্তক্ষরণ থামানোর?”
রিমের চোখ জ্বলে ওঠে, অশ্রু ভিজে ঝলমল করে। জেইনের বুক চিনচিন করে ওঠে রিমের যন্ত্রণায় তার ভিতরও অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিশ্র অনুভূতি জন্মায়। সে আস্তে রিমের গালে হাত রাখে, চোখের জলকে ঠোঁট দিয়ে শুষে নেয়।
তারপর বুকে মুখ ডুবিয়ে দেয়, ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকে প্রতিটি চুমু যেন রিমের শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে। রিমের বুক ওঠানামা করতে থাকে দ্রুত গতিতে, আঙুলে খামচে ধরে বিছানার চাদর।
জেইন চুমু খেতে খেতে আড় চোখে তাকায়, চোখে সেই নেশা। গাঢ় নেশাক্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“তোমার সকল যন্ত্রণা শুষে নিবো আমি। তোমাকে একটুও কষ্ট পেতে দেবো না। খুব আদর করবো তোমাকে… খুব বেশি।”
রিম কিছু বলে না। বলতে চায়ও না। সে শুধু নিরবে চোখের জল ফেলে। তারা দুজনেই লেপ্টে থাকে একে অপরের বুকে, নিরব কক্ষে কেবল তাদের হৃদস্পন্দনের শব্দ প্রতিধ্বনি করছে।
জেইন আস্তে করে রিমের মুখ উঁচু করে ধরে, চোখে এক মৃদু স্নেহমাখা আলো। দুগালে হাত রেখে কপালের ছোট্ট একটি চুমু দেয়। তারপর নরম, আদুরে কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“তুমি চাও তো রিশাব সুস্থ থাকুক? ওকে বিডিতে পাঠিয়ে দেই? ঠিক আছে, আমি তোমার ইচ্ছে পূরণ করবো। কিন্তু তার আগে, তোমাকে আমার সব কথা শুনতে হবে। বুঝতে পেরেছো।”
জেইন আস্তে করে রিমকে বুকের থেকে ছাড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর আবারও কপালে ছোট্ট চুমু বসিয়ে দেয়।
মেয়েটাকে তার নিজের থেকে আলাদা করতে একেবারেই ইচ্ছে করে না। সবসময় বুকে জড়িয়ে রাখাতে ইচ্ছে করে, প্রতিটি স্পর্শে আদর ঢেলে দেওয়ার তৃষ্ণা কিন্তু কি আর করা যায়? সবসময় তো আর বুকে জড়িয়ে রাখা সম্ভব নয়। সে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, টানটান হয়ে উঠে দাঁড়ায়।
একজন মহিলা সার্ভেন্টকে কল করে ডাকে, ভাঙা কাঁচের প্লেট পরিষ্কার করতে বলে। তারপর নিজেই কিচেনে চলে যায়, রিমের জন্য হালকা কিছু তরল খাবার তৈরি করতে।
রিমের ব্যাপারে জেইন খুব যত্নশীল এবং সতর্কিত। সার্ভেন্টদের ওপর একটুও বিশ্বাস নেই। রিমের যত্ন নিতে, নিজের হাতেই সব করা তার কাছে স্বাভাবিক এবং পছন্দনীয়। যা কিছু অন্য কেউ করতে পারবে না, সে করতে চাইবে ,কারণ রিম তার জন্য শুধুই নিজের।
জেইন কিচেন থেকে বেরোতেই এলেনার সঙ্গে মুখোমুখি হয়। এলেনা একটু হাঁপিয়ে গেছে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে, যেন এতক্ষন সে শুধু জেইনকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সে গভীর শ্বাস টেনে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করে।
জেইন ভ্রু কুঁচকে, সরু চোখে তাকিয়ে আছে। এলেনা শুষ্ক ঢোক গিলে কিছু বলার চেষ্টা করলে, জেইন তার হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয়। তারপর পকেটে দুহাত গুঁজে, গম্ভীর, ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,
“এখন না। যা বলবে, পরে শুনবো। তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে।”
এলেনা চোখে অসহায়তা ভেসে উঠিয়ে তাকায়। কণ্ঠ ক্ষীণ, কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“বাট ইটস্ ভেরি আরজেন্ট।”
জেইন নির্বিকার, ঠান্ডা কণ্ঠে অকপটে বলে,
“যাই হোক না কেন, আমি যখন বলেছি পরে, মানে পরেই শুনবো।”
বলেই সে সামনের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, এলেনা পেছন থেকে অধৈর্য হয়ে, উঁচু গলায় বলে,
“ইটস্ এবাউট মিস… অরিত্রিকা চৌধুরী…!”
এক সেকেন্ডে থমকে যায় জেইনের পা। চোখ বন্ধ করে লম্বা এক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে। কপালের নীল শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ, সমস্ত শিরাউপশিরা দৃশ্যমান। “অরিত্রিকা” নামটা তার কানে বারবার ধ্বনিত হচ্ছে। তার চেহারায় রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ বা আবেগ কোনোটাই বোঝা যায় না। সে ইস্পাতের মতো টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো সামনের দিকে স্থির। তুষারের মতো ঠান্ডা গলায় বলে,
“বলো…”
এলেনা এক মুহূর্ত দেরি করে না। ঝড়ের বেগে চলে আসে জেইনের সামনে।
“আমি ফ্রান্সিসকো থেকেই মাত্র এলাম। এতদিন সকল হসপিটালে খোঁজ নিয়েও কিছু জানতে পারিনি। কিন্তু এবার…”
“বুঝতে পেরেছি, এবারও কোনো সূত্র পাওনি তাইতো?”
“নাহ্। University of California, San Francisco। আগেও সেখানে খোঁজ নিয়ে কিছু পাওয়া যায়নি।”
“এলেনা, তুমি কি নতুন কিছু বলবে? I’m fu*cking tired of hearing this one thing you say.”
“That’s what I mean. আমি সেটাই তো বলতে চাইছি। তুমি তো বলতেই দিচ্ছ না।”
“Alright, tell me what you want to say.”
“এবার যখন আমি UCSF Medical Center যাই, সেখানকার একজন সিনিয়র ডক্টর, ফিলিপ জুভিন (Philippe Juvin)-এর সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি গত ১৪ বছর যাবত সেখানে নিয়োজিত আছেন। আমি অনেক রিকোয়েস্ট করার পর তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন। প্রথমে তিনি কারো পার্সোনাল ইনফরমেশন শেয়ার করতে চাচ্ছেন না। এটা তাদের রুলসের বাইরে। পরে আমি আমার স্টাইলে বোঝানোর পর সে রাজি হয়। সেখানকার পুরোনো ফাইলের সূত্র থেকে জানা যায়, “অরিত্রিকা চৌধুরী” নামে একজন পেশেন্ট ভর্তি ছিলেন সেখানে। প্রায় ১২ বছর আগে উনাকে এডমিট করা হয়েছিল।”
জেইনের চোখ মুহূর্তেই আগুনের মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। হিংস্র, বিকৃত পিশাচের মতো রূপ নিয়ে সে ঝাপিয়ে পড়ে এলেনার দিকে। এলেনা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, তারপর আতঙ্কে দুই কদম পিছিয়ে যায়।
জেইন ফোঁস ফোঁস করতে করতে গর্জন করে বলে ওঠে,
“তাহলে কোথায় সে? বলো আমায় কোথায় আছে? আই ওয়ান্ট টু নো!”
এলেনা শুষ্ক ঢোক গিলে ফেলে। এই মুহূর্তে জেইন তার কাছে একেবারেই নর-পিশাচ রূপী জানোয়ার মনে হচ্ছে। এলেনা যতবার রেগে যেতে দেখেছে জেইনকে, এতটা হাইপার, এতটা বিকৃত হিংস্রতা সে আগে কখনো দেখেনি।
জেইনের চোখ দাবানলের আগুনের মতো জ্বলছে। চোখের পলকের নরমি নেই, ঠোঁটগুলো সঙ্কুচিত, দমবন্ধ করা শ্বাসে ফোঁসফোঁস করে। পুরো শরীর মাংসপেশি, শিরা, হাত সবই উত্তেজনার প্রলেপে গা ছমছম করছে। সে যেন শুধুই রাগ, হিংসা আর ভয়ঙ্কর আবেশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এলেনা মনে মনে বুঝতে পারে, রিম হারিয়ে যাওয়ার সময় যা দেখেছে, আজও তার সামনে তা আবার জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেইন স্রেফ জেইন নয়, সে এখন এক অমানবিক, বিকৃত হিংস্রতার অবতার।
এলেনা বুঝতে পারছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জেইন যেকোনো মুহূর্তে যা খুশি ঘটিয়ে ফেলতে পারে। সে শুষ্ক ঢোক গিলে,ধকধক করা বুক নিয়ে বলে,
“Clam down. আমি তোমাকে সবটা বুঝিয়ে বলছি। প্লিজ একটু শান্ত হও।”
কিন্তু জেইন দাঁতে দাঁত চেপে, চোখে আগুন জ্বলে উঠে, ফোঁসফোঁস করতে করতে চিৎকার করে,
“How…haw can I calm down? Tell me how. আই কান্ট… জাস্ট কান্ট এনি মোর!”
এলেনা তাকে শান্ত ভঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করে,
“ফিলিপ জুভিন আমাকে বলেন যে, ঠিক দেড় বছর আগে কেউ একজন কোনো যুবক, নিজেকে মিসেস চৌধুরীর পুত্র পরিচয় দিয়ে, হসপিটাল থেকে সমস্ত রুলস মেনে ডিসচার্জ করে নিয়ে গেছে। আর মিসেস চৌধুরী যে যুবকটির মা সেই সমস্ত প্রমাণও দিয়েছে যুবকটি। আর ডক্টর যখন বলেছিল যে উনাকে আইসিইউতেই রাখতে হবে, ডিসচার্জ করা যাবে না। তখন সেই যুবকটি বলেছিল সে নিজেও একজন ডাক্তার। তার নিজস্ব হসপিটালও আছে। সে সেখানেই তার মায়ের চিকিৎসা করবে। যুবকটি সমস্ত ডকুমেন্টস দেখিয়েই মিসেস চৌধুরীকে নিয়ে গেছে।”
এটুকু এক নিঃশ্বাসে বলে, তারপর একটু থামে এলেনা।
কিন্তু জেইন ধৈর্য্যহীন, বন্য পশুর মতো হয়ে যায়। করিডোরের ধারে রাখা বড় ইতালিয়ান ফ্লাওয়ার বাজটা এক নিমিষেই লাথি মেরে ফেলে। ধ্বংসের শব্দে পুরো করিডোর যেন ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। এলেনা কেঁপে ওঠে, শরীর জমে যায়।
শব্দ শুনে হুড়মুড়িয়ে দৌড়ে আসে মাত্তেও।
জেইন পশুর রূপে, চোখে আগুন, দাঁতে দাঁত চেপে তৎক্ষণাৎ থমকে যায়। পা কাঁপছে, শুষ্ক ঢোক গিলে ফেলে, সামনে এগোবার সাহস নেই।
হঠাৎ সে হিংস্র বাঘের মতো গর্জে ওঠে, চোখের আগুন পুরো করিডোরে ছড়িয়ে যায়, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ।
“কে সে? আই ওয়ান্ট টু নো হূস দ্যাট বা*স্টার্ড? হুস দ্যা হেল ইজ দিস গায়? কে নিয়ে গেছে তাকে?”
তার গর্জনের শব্দ পুরো করিডোর কাঁপিয়ে দেয়। দমবন্ধ করা নিঃশ্বাসে সে আরও জোরে গর্জন করে,
“টেল মিইইইইইইইই!!!!!!!……”
জেইনের পুরো শরীর শিরা, পেশি, চোখ—পশুর রূপে উত্তেজনা, রাগ এবং হিংসার আগুনে ভর করে। এলেনা অদৃশ্য ভয় অনুভব করে, পা জায়গায় জমে যায়। সে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে। বুকে সাহস সঞ্চার করে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে,
“আরাত্রিক জেইন চৌধুরী….”
ঠিক সেই মুহূর্তে থমকে যায় জেইন। পুরো শরীর স্তব্ধ, চোখ সরু করে ভ্রু কুঁচকে তাকায় এলেনার দিকে। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে ঠিক কি শুনেছে। তার দৃষ্টিতে আগুনের সঙ্গে অবিশ্বাসের মিশ্রণ। কণ্ঠে কম্পন আর ধ্বনি ঝাঁপিয়ে পড়ে,
“হোয়াট? হোয়াট ডিড ইউ জাস্ট সেইড?”
এলেনা দৃঢ় গলায় বলে,
“হ্যা, ঠিক শুনেছো তুমি। চাইলে ফাইলগুলো দেখতে পারো। এখানে সাই…”
কিন্তু বিদ্যুৎগতিতে এলেনার হাত থেকে ফাইলগুলো ছিনিয়ে নেয় জেইন। তার চোখ, চোখের কোণ, পুরো রূপ এক ধরণের বিকৃত হিংস্রতা আর তীব্র আগ্রাসন।
ঘটনাটা এতোটাই দ্রুত ঘটে যে এলেনা বুঝতে পারে না ঠিক কি হলো। ফাইলগুলো এখন জেইনের হাতে, এবং তার স্বভাব পশুর মতো হিংস্র, নিয়ন্ত্রণহীন।
জেইন ফাইলগুলো হাতে নিয়ে সবগুলো পাতা এক এক করে উল্টে দেখে। চোখ খাপ খাপ হয়ে যাচ্ছে, মাথা যেন এক মুহূর্তের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
সবগুলো পৃষ্ঠায় পেশেন্টের বাড়ির লোকের জায়গায় লেখা আছে—”Aratrik Zain Chaudhary”, এবং সেই সাথে তার নিখুঁত সাইন। যেন সে নিজেই স্বাক্ষর করেছে। কোনো খুঁত নেই, কোনো অমিল নেই।
এই মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক থমকে গেছে কিভাবে সম্ভব? জেইন চোখ মুড়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়ায়। তারপর ধূর্ত এক হাসি ছিঁড়ে বের হয়, ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেলে, যেন নিজের মাথায় সব রহস্য এক মুহূর্তে ঝলসে গেছে।
হঠাৎ সে ফাইলটা এলেনার হাতে ধরে তুলে দেয়। এলেনা অবুঝের মতো তাকিয়ে থাকে চোখে বিস্ময়, মনে প্রশ্নের ঝড়।
জেইন তার দিকে তাকিয়ে দুপাশে ঘাড় কাত করে কড়মড় করে রগগুলো ফুটিয়ে তোলে। তার চোখে রহস্য, ঠোঁটে ধূর্ত হাসি। এরপর দুহাত দিয়ে নিজের মসৃণ, বড়বড় সিল্কি চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে, এবং ঠান্ডা, স্থির কণ্ঠে ফিসফিস করে,
“ডোন্ট ওয়ারি, এই ফাইলের আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই। আমার যা জানার ছিল, জেনে গিয়েছি। আ’ম প্রাউড অফ ইউ। ইউ ডিড অ্যা গ্ৰেট জব।”
বলেই সে নিঃশব্দে চলে যায়। এলেনা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে।
রিম বিছানায় শুয়ে হাঁসফাঁস করছে। বন্ধ কক্ষের ঘন বায়ু তার শ্বাস আটকে দিচ্ছে। শরীরটা কাঁপছে, চোখে পানি জমে আছে। পালানোর যে ইচ্ছে তার, সেটাও দম বন্ধ লাগছে এখানে।
ঠোঁটের কাছে এক হালকা শব্দ দরজা খোলার টানটান শব্দে তাকায় সে। ঘন ঘরে পদচারণার আওয়াজ আসে, সে তাকায় সেদিকে এবং সাথে সাথেই চোখে আগুন ঝলসে ওঠে, জেইন খাবারের ট্রলি হাতে এগিয়ে আসছে।
রিমের প্রতিটি নড়াচড়া তার কাছে স্পষ্ট, তার চোখ লাল ফুলে ওঠেছে, নাকের পাটা ফুলে গেছে, কান্নার ছোঁয়া সবকিছুই জেইনের হৃদয় চেপে ধরে।
জেইন ট্রলি বিছানার পাশে রাখে, ধীরে ধীরে। তারপর নরম ভঙ্গিতে, রিমকে বিছানার পাশে তুলে বসায়। রিম গায়ে ফোসকা পড়ার মতো ছ্যাত করে ওঠে।
জেইন ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হেসে ফেলে। ঝুঁকে রিমের নাকে নাক ঘষে নেয়, ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে নরম গলায় ফিসফিস করে,
“উঠে পড়ো। খাবার খেয়ে ওষুধ খেতে হবে। আমার কথার অবাধ্য হলে, তোমার কোনো ক্ষতি হবে না ঠিক, কিন্তু সেই ঝড়টা বেয়ে যাবে বেচারা রিশাবের ওপর। এখন চুপচাপ খেয়ে নাও, তারপর তোমার সব কথা শুনব আমি।”
রিম হুড়মুড় করে উঠে বসে। দমফাটা কক্ষের মধ্যে তার ছোট্ট শরীর যেন আরও নাজুক হয়ে ওঠে। সে জেইনের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বাচ্চাদের মতো করে ফিসফিস করে বলে,
“আমি খাবো। তাহলে আপনি আমার সব কথা রাখবেন? বলুন না।”
জেইন তার গালে আলতো হাত ছুঁইয়ে চোখে চোখ রাখে। চোখে অদ্ভুত নেশা। হালকা মাথা নাড়িয়ে মুচকি হেসে সে বোঝায়, হ্যাঁ, আমি রাখব।
রিমের চোখ খুশিতে চিকচিক করে ওঠে। সে ধীরে ধীরে জেইনের দিকে এগিয়ে আসে, অসহায় চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
“তাহলে বলুন আমাকে আমার পরিবারের কাছে দিয়ে আসবেন। বলুন না। আমার না, এখানে আর ভালো লাগছে না।”
জেইনের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। রাগের আগুন ছড়ায়, হৃদয় দম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।সে কিছুতেই বুঝে পায় না যে মানুষ গুলো তাকে সহ্যই করতে পারে না মেয়ে বলেই মানে না। তাদের জন্য কিসের এতো অস্থিরতা এই মেয়েটার!
একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে, ঠান্ডা গলায় বলে,
“কক্ষনোই না। তোমাকে সারাজীবন এখানে, আমার সাথেই থাকতে হবে, বুঝতে পারেছো? তোমার সব ইচ্ছে পূরণ করতে পারলেও এই একটা ইচ্ছে কখনো পূরণ হবে না। তোমার বাড়ি এটাই। আর এটাই তোমার ডেসটিনি। সো নিজের ভবিতব্যকে মেনে নাও।”
রিম পাগলের মতো ছটফটিয়ে ওঠে। এলোমেলোভাবে ঘুষি ছুড়ে দেয় জেইনের বুকে। চোখে মুখে, পুরো শরীরে। জেইন মুখ শক্ত করে চোখ বুজে সবটা সহ্য করে, নিঃশ্বাস গহীর।
রিম তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। অপ্রকৃস্থের মতো জোর গলায় চিৎকার করে,
“কিছুতেই না! থাকবো না আমি এখানে। আপনার মতো জানোয়ারের সাথে কক্ষনোই না।”
পালাতে চাইলেই জেইন মুহূর্তে খপ করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। এতটাই শক্ত করে চেপে ধরেছে যেন রিমের শরীরের সমস্ত হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাবে। রিম ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। চোখের কোণে জল জমে।
জেইন নেশায় ডুবে, এক হাতে রিমের পুরো শরীরে এলোমেলোভাবে ছুঁয়ে দেয়, গায়ের প্রতিটি মসৃণ অংশে স্পর্শ ছড়িয়ে দেয়। হাত স্লাইড করতে থাকে, ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে ছোট ছোট নরম চুমুতে ভরিয়ে দেয় চারপাশ।
রিম শ্বাস আটকে রাখে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। জেইনের আঙুল হঠাৎ রিমের ঘাড়ের পেছনের দিকে চলে যায়, যেখানে ছোট্ট একটি তিল। সে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আলতো করে বুলিয়ে দেয় সেটা। ফর্সা ঘাড়ে তিলটি চকচক করছে, জেইনের চোখ লালচে নেশার আলোয় জ্বলে ওঠে।
অচেনা এক তৃষ্ণা নিয়ে জেইন আচমকা হিংস্র জন্তুর মতো কামড় বসিয়ে দেয় রিমের ঘাড়ের সেই তিলের উপর।
রিম ব্যথার যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে। মুখ থেকে মৃদু “আহ্” জাতীয় শব্দ বের হয়। সে ছটফট করে ওঠে, নিজের শরীরকে জেইনের হাত থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু শক্তপোক্ত, সুঠামদেহী জেইনের কাছে সে একেবারেই নিতান্তই ক্ষুদ্র এক চুলও নড়াতে পারছে না। ফুঁপিয়ে ওঠা তার শ্বাস জেইনের নেশার ধ্বনি হিসেবে বাজে।
জেইনের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। সে তাকে আরও শক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে ধরে। হাত চলে যায় রিমের ঘাড়ে, যেখানে কামড়ে ধরেছে এমনভাবে যেন রক্ত চুষে নেওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য।
রিমের সহ্যসীমা শেষ হয়ে যায়। সে নিজের শরীরের সমস্ত জোড় খাটিয়ে জেইনের ঊরুতে খামচে ধরে বড়বড় নখগুলো ঢোকায়। জেইনের চোখে এক অমায়িক, বিকৃত তৃপ্তি জ্বলজ্বল করে। সে আস্তে আস্তে রিমের ঘাড় থেকে দাঁত উঠিয়ে নেয়, নখের খোঁচা অনুভূতি নিয়ে সেই জায়গায় ছোট ছোট ভেজা স্পর্শ এঁকে দেয়।
রিম এখনও তার নখগুলো শক্তভাবে ধরে রেখেছে। সিল্কের প্যান্ট যেন রক্তে ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু জেইনের কাছে একটুও ব্যাথার ছায়া নেই। তার মুখে তৃপ্তি, চোখে উন্মাদনার ঝিলিক। সে মুখটা আস্তে করে রিমের কানের কাছে নিয়ে যায়। প্রায় ঠোঁট স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে আঠালো কণ্ঠে বলে,
“উফ্… এতটুকু শরীরে এত আগুন? কোথা থেকে আসে বলোতো… উমম, নটি গার্ল! You are too wild! আই লাইক ইট। আমিও দেখবো তোমার শরীরের কোথায় কোথায় ঠিক কতটুকু শক্তি আছে। আর সেই শক্তি তুমি ঠিক কি কি কাজে লাগাতো পারো। তোমার মতো জংলি বিল্লির সাথে বেডে এডাল্টস্ গেম খেলতে আলাদা একটা থ্রিল আর এক্সাইটমেন্ট পাওয়া যাবে, নো? That’s why I chose you.”
রিমের শরীরে রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ সবই একসাথে মিশে যায়। অতিরিক্ত রাগে তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরে পড়ছে। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা তার কাছে তুচ্ছ মনে হচ্ছে। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছে করছে, কিন্তু সেটাও যেন একটা পাপ।
ঠিক তখনই জেইন এক হেঁচকায় তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। রিমের জামা ভেদ করে মসৃণ কোমরে ঘর্ষণ করে জেইনের পুরুষালি, খড়খড়ে ঠান্ডা হাত। রিম যেন জমে যায়, নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
জেইন এক আঙুল তার থুতনিতে রেখে লাল হয়ে ওঠা নাকে ছোট্ট করে চুমু বসিয়ে দেয়। রিম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সে যেন কোনো জীবন্ত পুতুল, মৃতপ্রায় দেহ।
জেইন এক টানে তাকে কোলে তুলে নেয়। কানের কাছে মুখ নিয়ে, তীব্র উন্মাদনায় ফিসফিস করে বলে,
“শক্তি খুব বেড়ে গেছে না তোমার? আজ তারই পরীক্ষা হবে। দেখবো, ঠিক কতটা জোর খাটাতে পারো তুমি…তোমাকে এমন ভাঙব, এমন হাল করব যাতে বেড থেকে উঠেই আর দাঁড়াতে না পারো। পালানোর কথা ভাবাটাও তোমার জন্য হবে একধরনের বিলাসিতা। তোমার রুহ পর্যন্ত আমি কাঁপিয়ে দেবো… আয়নায় নিজের দিকে তাকাতেও ভয় পাবে তুমি।”
রিম নিশ্চুপ। তার কানে যেন জেইনের কোনো কথাই পৌঁছায় না। নিস্তব্ধতার মধ্যে, জেইন ধীরে ধীরে তাকে বিছানার দিকে নিয়ে যায়। একেবারে সাবধানে বসিয়ে দেয়, যেন ভঙ্গুর কোনো কাঁচ।
“অনেক মেলোড্রামা হয়েছে… এখন আর না। পরে খেলবো তোমার সাথে। তোমার মতো বাচ্চার সাথে দৌড়ঝাঁপ করতে করতে কবে জানি নিজেই বুড়ো হয়ে যাব, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার আগেই। কি কপাল আমার, বাচ্চা জন্ম না দিয়েই বাচ্চা পালতে হচ্ছে!”
জেইন আবার রিমের দিকে তাকায়। চোখে মিশে আছে অদ্ভুত কৌতূহল। তারপর বাচ্চাদের মতো আদরভরে, ঠোঁটের ধারে ফিসফিস করে বলে,
“দেখো… এখন আর দুষ্টুমি করবে না। চুপচাপ লক্ষী বাচ্চার মতো আমি যা বলবো সব শুনবে।”
তার চোখে ঝিলিক, রিমের প্রতিক্রিয়া দেখতে। কিন্তু রিম নিশ্চুপ। কোনো চোখের নড়াচড়া নেই, কোনো অসহায়তারও ঝিলিকও নেই যেন এ জগৎ থেকে তার অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
জেইনের বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। তার হৃদয়ে এক ধরনের অচিন্ত্য ব্যথা। এই শান্ত, মাটিতে নামানো রিমের রূপ সহ্য করতে পারে না সে। সে চায় মেয়েটা রাগুক, চিৎকার করুক, তাকে উত্তেজিত করুক। কিন্তু এভাবে নিশ্চুপ বসে থাকলে মেয়েটার এই নিস্তব্ধতা তার বুকে গভীর খিঁচুনি জাগায়। কাউকে বোঝানো সহজ নয়, জেইনের জন্য এই চুপচাপই সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক।
জেইন ধপ করে রিমের সামনে বসে পড়ে। চোখে ঝলক, শরীরে এক ধরনের অচেনা তৃষ্ণা। খাবারের ট্রে হাতে তুলে নেয়, মুখের কাছে ধরে ফিসফিস করে বলে,
“খেয়ে নাও, বার্বিডল। এভাবে না খেয়ে থাকলে শরীর আরও অসুস্থ হবে তো।”
রিম দাঁতে দাঁত চেপে, ক্ষুব্ধ গলায় ফিসফিস করে বলে,
“তোর খাবার তুই খা!”
জেইন ঠোঁট কামড়ে ছোট একটা হাসি ফেলে। তারপর আস্তে করে ঝুঁকে আসে, চোখে অদ্ভুত নেশার ঝিলিক। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রিমের শরীরটা স্ক্যান করতে থাকে রিমের বুকে ওড়না নেই, লাল জামাটা ফর্সা শরীরে যেন আগুন ছড়াচ্ছে। বুকের খাঁজগুলো স্পষ্ট, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে রিমের বুকের ওঠা-নামা জেইনের ভেতরে এক মাতাল করা ঝড়ের সৃষ্টি করল।জেইন শুষ্ক ঢোক গিলে নেয়। হার্টবিট বেড়ে যায়। শরীর কাঁপতে থাকে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। এক মুহূর্তে সে নিঃশব্দে রিমের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট ফাঁক হয়ে আসে, ক্ষীণ, নরম স্বরে ফিসফিস করে বলে,
“আমার ফেভারিট ডিশ তো তুমিই… তোমাকেই খাবো আমি। You’re mine… my personal sweet dessert in the whole damn world. Once I taste you, I won’t stop… not until I finish every bit of you.”
রিমের শরীর হঠাৎ জমে যায়। হৃৎপিণ্ড দ্রুত ধুকছে, চোখে আগুনের ঝিলিক। জেইন রিমের আরও কাছে ঝুঁকে আসে। হঠাৎ অচেতনভাবে কোনো এক অদৃশ্য টানে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করে, রিমের তুলোর মতো নরম স্পর্শকাতর ব*ক্ষ বিভাজিকায়। তাত্ক্ষণিকভাবে রিম তার গালে ঠাস করে থাপ্পর বসিয়ে দেয়। জেইন হালকা ঠোঁট কাঁপিয়ে, হাতে গাল আছড়ে মাথা নিচু করে ফেলে।
রিমের চোখ জলমাখা, রাগ আর ঘৃণার অশ্রুজলে ভরা। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, হেঁচকি দিয়ে গলায় ফিসফিস করে বলে,
“জানোয়ার!! তুই… তুই একটা জানোয়ার!! লজ্জা করলো না আমাকে এভাবে ছুঁতে? ছিঃ! তুই শুধু জানোয়ার না, তুই একটা নোংরা, জঘন্য লোক। আমি থাকবো না… কিছুতেই তোর সাথে থাকবো না!”
রিমের গলায় চিৎকার, চোখে আগুন। সে হাওয়ায় উঁচু গলায় ধ্বনি তোলে,
“আমাকে যেতে দে! যেতে দে এখান থেকে! কিছুতেই থাকবো না তোর সাথে!”
রিম ছটফট করতে থাকে, হাত-পা লাটমাট করছে, পুরো শরীর হাহাকার করছে। জেইন সঙ্গে সঙ্গে তাকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে। ঠোঁট দিয়ে কপালের ছোট্ট চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“তোমাকে বলেছিলাম না, এখন লক্ষী বাচ্চার মতো থাকবে। আগে খেয়ে ওষুধ খাও। তারপর যা ইচ্ছে করবে, আমি কিছু বলব না।”
রিম ফুঁপিয়ে ওঠে, তার কন্ঠে কান্না আর হতাশার মিশ্রণ। চিৎকার করে,
“নাআআ, ছাড় আমাকে!! আআআআ… আ… হা… হা… হা… আমি আর পারছি না! আমি মুক্তি চাই!… আমি মুক্তি চাইইইইইইইই… আআআআ…”
জেইনের চোখে লালচে আগুন জ্বলে। সে ফিসফিস করে বলে,
“চুপ!!!! একদম চুপ! আমি কাঁদতে বারন করেছি না! আর একবার কাঁদলে, তোমার মা আর বোনের সাথে যা হবে, তার জন্য তুমি নিজেই দায়ী থাকবে।”
সাথে সাথেই রিম ক্ষ্যাপা বাঘিনীর মতো কামড়ে ধরে জেইনের ঘাড়। জেইন চোখ বন্ধ করে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিছানার চাদর খামচে সবটা সহ্য করে। হাত ধীরে ধীরে হিলছে, সেই রিম আবার পালাতে নিলেই জেইন খপ করে ধরে বিছানায় ফেলে দেয় শব্দ করে, দ্রুত তার ওপর উঠে বসে পড়ে, দুপা রিমের দুই পাশে ভাঁজ করে রেখে।
রিম ছটফট করছে, হাত দিয়ে জেইনের শরীর আঘাত করছে। কিন্তু জেইন এক হাতে তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে, অন্য হাতে শক্ত করে আঙুল দিয়ে ধরে রাখে রিমের চাপা। এতটাই শক্তি যে মনে হয় রিমের গালের মাংস ভেদ করে জেইনের লম্বা আঙুল ঢুকে যাবে তার মুখে। রিম ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। কিন্তু জেইনের মনে কোনো দয়া নেই।
সে সম্পূর্ণ হিংস্র রূপ ধারণ করেছে। চোখ লাল, ভ্রু কুঁচকে, নিঃশ্বাস ফোঁসফোঁস করছে। জলন্ত আগুনে তার মুখ যেন বিকৃত হয়ে গেছে। ফিসফিস করে বলে,
“পালানোর খুব শখ না… এখনও আমার হিংস্র রূপ দেখাইনি তোকে। আহ্লাদ দিয়েছি বলে মাথায় চড়ে গিয়েছিস? তোকে মাথা থেকে আছড়ে ফেলতে আমার ন্যানো সেকেন্ডও লাগবে না! আমার হিংস্র রূপটা বের হতে বাধ্য করিস না! তোর ভালোর জন্য বলছি। কলিজাটা খুব বড় হয়ে গেছে না তোর! তোর ঐ কলিজা টেনে বের করে কুঁচি কুঁচি করতে আমার হাত একটুও কাঁপবে না!”
রিমও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। তার শরীর জেইনের চাপে ফেটে যেতে বসেছে। হাতের চাপে মুখ জ্বলে যাচ্ছে, নাড়াতে পারছে না একটুও, তবুও সে বহু কষ্টে ভাঙা ভাঙা শব্দ উচ্চারণ করে,
“তোও্ .. মেএ্..রে ফেহ্.. ফেল ছিঁড়ে নে কলিজা। ভেবিছিস ভয় পেয়ে যাবো আমি। এখন আর তোর মতো জানোয়ারকে ভয় পাই না। কিহ কর..বি কর!”
জেইন মুহূর্তেই তার দিকে আরও ঝুঁকে পড়ে। মুখ একেবারে মুখের কাছে নিয়ে আসে। রিম সাথে সাথেই মুখ শক্ত করে ঘুরিয়ে দেয়, কিন্তু জেইন থেমে না। তার চাপা হাত আরও শক্ত হয়ে যায়, রিমকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনে।
দুজনের নিঃশ্বাস ভারী, বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। জেইনের চোখ লালচে, উন্মাদনার ঝিলিক, আর রিমের চোখে রয়েছে রাগ, ঘৃণা আর হাহাকার মিলেমিশে এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করছে।
জেইন তার মুখটি রিমের মুখের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“দেখতে চাস কি করবো আমি? huh! স্টুপিট গার্ল… ইচ্ছে তো করছে কাঁচা খেয়ে ফেলি… ইডিয়ট!”
রিম তার হাত জেইনের কাছ থেকে ছাড়ানোর জন্য সমস্ত শক্তি দিয়ে মোচড়াতে শুরু করে। তার কব্জি লাল হয়ে এসেছে, অথচ সে থেমে নেই।
অবশেষে জেইন বুঝতে পারে এখন হাত ছাড়লেও রিম দূর্বল শরীরে কিছুই করতে পারবে না। সে নিজেই বাঁধন আলগা করে দেয়।
হাত ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিম তার বড় বড় নখ দিয়ে জেইনের মুখে এলোমেলো আঁচড় কাটতে থাকে। রিমের চোখে জ্বলজ্বলানি, উগ্র রাগ, আর ভয় মিলেমিশে এক অদ্ভুত উন্মাদনা তৈরি করছে।
জেইনের একটুও রাগ হয় না , কিন্তু তার বিরক্তি বেড়ে হিংস্র হয়ে যায়, সে হুমকির সুরে বলে,
“এই মেয়ে, অনেক হয়েছে আর একটা ভুল পদক্ষেপ নিলে তোমার জীবনটা আজকে জাহান্নাম বানিয়ে ছাড়বো আমি!”
রিম দমবন্ধ করে নেয়, চোখে জ্বালা, গলায় শুষ্ক ফিসফিস নিয়ে বলে,
“আর কি জাহান্নাম বানানোর বাকি রেখেছিস তুই!!… তুই তো আমার পুরো জীবনটাকেই জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছিস। আজ আমি যতটা কষ্ট পাচ্ছি তার দ্বিগুণ কষ্ট ফেরত পাবি তুই! ধুঁকে ধুঁকে একাকিত্বে মরবি! তবুও কাউকে কাছে পাবি না। এই আমি অভি-শাপ দিলাম তোকে।”
জেইন বিকৃত হাসিতে কিটকিটিয়ে উঠল। তার এই হিংস্র হাসিতে রিমের বুক ঢিপঢিপ করতে থাকে, হার্টবিট অচেনা রকমে দ্রুত। জেইন নিজের হাসি থামিয়ে হাড় কাঁপানো স্বরে ফিসফিস করে বলে,
“যেখানে আমি নিজেই একটা অভিশাপ… সেখানে আমাকে অভিশাপ দিয়ে আদৌ কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় তোমার? তোমার এই ফা*কিং অভিশাপে ভয় পাই না আমি। অভিশাপের জন্মই হয়েছে আমার থেকে। আর আমি সেই অভিশাপ হয়ে থাকবো তোমার জীবনে। বার্বিডল……”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৪
হঠাৎই জেইন তার ওপর থেকে উঠে বসে। এতে যেন রিম অবাক হয়ে যায়। এতো সহজেই তাকে ছেড়ে দিল! সে উঠে বসার চেষ্টা করতেই হাতে ঠান্ডা, ভারী কোনো বস্তুর টান অনুভব করে। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়, তার হাত জেইনের হাতের সঙ্গে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধা।
রিমের চোখ বিস্তৃত হয়ে যায়। জেইনের মুখে ক্রুর হাসি, চোখে লালচে উন্মাদনার ঝিলিক। রিমের শ্বাস চেপে আসে, বুকের ওঠানামা অচেনা তীব্রতা নিয়ে। হঠাৎ রিম দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে ওঠে,
“জানোয়ারর্!!!!!……”
