প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫১
রাত্রি মনি
“ভাইইয়াআ….”
মিষ্টি একটা ডাক। ডাকটি কানে আসতেই ইয়াশের হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা সব যন্ত্রণা যেন মুহূর্তের জন্য জীবন্ত হয়ে উঠলো। বন্ধ চোখের পাতায় বোনের হাস্যোজ্জ্বল, সরল মুখটা ভেসে উঠতেই ইয়াশের ঠোঁটে ফুটে উঠলো কাঁপা হাসি । তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা উষ্ণ জল,সমস্ত চাপা স্নেহ আর হারানোর যন্ত্রণার নির্যাস।
কিন্তু সেই শান্ত মুহূর্তটি বিদ্যুতের আঘাতে চুরমার হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই দৃশ্য— রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, ছিন্নভিন্ন নগ্ন দেহটা। মুহূর্তেই সেই নিষ্পাপ মুখচ্ছবি ছাই হয়ে গেল। সেই দৃশ্য বারুদের মতো জ্বলে উঠলো তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে।
আচমকা খুলে গেল চোখ দুটো। সেই চোখে এখন বছর ধরে বুকে জমে থাকা যন্ত্রণার হিমশীতল স্রোত, যা তার বোনের রক্তাক্ত স্মৃতিতে মুহূর্তে প্রতিহিংসার ভলক্যানিক লাভার মিশ্রণে রূপান্তরিত হলো। সেই অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণায় তার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো এক ক্ষুধার্ত, শিকারীর মতো গর্জন, যা তার হৃদয়ের প্রতিটি রক্তক্ষরণকে ধ্বনিত করল। বরফ শীতল চেম্বারের কাঁচের আস্তরণ কাঁপিয়ে দিল,
“আ-আ-আ-আ-আ-হ্!”
হিংস্র, নির্ভুল এক কোপ। ধারালো কুঠারটা বিদ্যুৎ গতিতে নেমে এলো। চড়াস!—লিওনার্দোর পুরু/ষা/ঙ্গ’টা ছিটকে পড়লো মেঝেতে, উষ্ণ রক্ত বরফের আস্তরণে মিশে সঙ্গে সঙ্গেই জমাট বাঁধতে শুরু করল, যেন কোনো লাল কাঁচের গুঁড়ো।
“আআআআআআহ্…!!”
যন্ত্রণায় ফেটে যাওয়া চিৎকার; যা ছিল আদিম, পৈশাচিক, নরকের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সত্তার আর্তনাদ।
লিওনার্দোর ন*গ্ন, ভারী শরীরটা তখনো ঝুলে আছে।উল্টো। ঠাণ্ডায় তার ঠোঁট শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বরফের গুঁড়ো জমতে শুরু করেছে, ত্বক ধারণ করেছে অস্বাভাবিক, নীলচে বর্ণ। ইয়াশ স্থির দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার প্রশস্ত, পেশীবহুল বুকের ওঠানামা পাগলের মতো দ্রুত। হাতে ধরা কুঠার থেকে চুঁইয়ে পড়া টকটকে লাল রক্ত মেঝেতে গড়িয়ে জমাট বাঁধা রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। চারপাশে পিনপতন নীরবতা—কেবল লিওনার্দোর দুর্বল, শ্বাসরুদ্ধকর ঘড়ঘড় শব্দ।
পাশেই, লেদার চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসে জেইন। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি। যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, মজার কোনো থিয়েটার দেখছে।
ইয়াশের দৃষ্টি তখনো বরফে জমাট রক্তের ওপর স্থির। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে, ধীরে ধীরে ফিসফিস করে উঠলো ইয়াশ। তার কণ্ঠস্বরে যন্ত্রণার সিসা মেশানো,
“আমার ছোট্ট বোন! বাবা-মা একা ছাড়া সেই জন্মের সময় থেকে আগলে রেখেছি ওকে। ছোট্ট দুধের বাচ্চাটাকে নিজের দুহাতে তুলে নিয়েছিলাম… কখনো বাবা-মায়ের অভাব মনে হতে দেই নি। ভালোবাসার কমতি রাখিনি একটুও। নিজের হাতে হাঁটতে শিখিয়েছি। চোখের সামনে একটু একটু করে বড় হতে দেখেছি। কতটা… কতটা… আদরে বড় করেছি জানিস! কত! কত স্বপ্ন ছিল ওকে নিয়ে… জানিস ও সবসময় বলতো, ‘ভাইয়া আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো। তারপর যারা আমার মতো অনাথ, যাদের বাবা মা নেই, সেইসব পথশিশুদের সাহায্য করবো। আমার কাছে তো আমার ভাই আছে, যে আমাকে সবসময় আগলে রাখে। কিন্তু এমন অনেক শিশু আছে, যাদের কেউ নেই।’…”
কথা বলতে বলতে তার চোখ দুটো ভিজে উঠলো। বুকের ভেতরের যন্ত্রণা যেন তার শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে দিচ্ছে। সে শব্দহীন, বিষাদময় এক হাসি হেসে উঠলো। সেই হাসির সাথে দুলতে লাগলো তার গা। আস্তে আস্তে সেই ঠোঁটের হাসি চওড়া হতে হতেই পরক্ষণে মিলিয়ে গেল হঠাৎ। সে বিড়বিড় করতে লাগলো, যেন বিকারগ্রস্ত ,
“আমি পারিনি। আগলে রাখতে পারিনি, আমার ছোট্ট বোনটাকে। পারিনি…”
সে টানা বিড়বিড় করতে লাগলো,
“পারিনি, পারিনি আমি… আমার… আমার …”
তারপর হঠাৎ থেমে, তার ভেতরের পশুটা যেন বেরিয়ে এলো।
সে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠলো,
“অ্যাই!!! কেন মারলি? কেন মারলি বল! আমার ছোট্ট, নিষ্পাপ বোনটাকে! কেন, কেন? কেনওওওও!!!”
সে বুক ফেটে আদিম আর্তনাদ করল,
“কেন মারলি? আআআআআআহ্…!!”
আর্তনাদের সাথে সাথেই শুরু হলো কুঠারের হিংস্র তান্ডব। একের পর এক চূড়ান্ত বিদ্বেষপূর্ণ আঘাত। ধড়াম!— কুঠারের আঘাতে মোটা দড়ি ছিঁড়ে মেঝেতে আঁছড়ে পড়লো লিওনার্দোর ভারী, নীলচে শরীরটা। তার দৃষ্টি ঝাপসা, কথা বলার শক্তি হারিয়েছে অনেক আগেই। তবুও সে কিছু বলার চেষ্টা করল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা কাঁচে আটকানো বাতাসের মতো ফিসফিসানো,
“আ-আমাকে… মে-রে ফেল। কিন্তু তার আগে একবার… শুধু একবার সেই এঞ্জেলের মুখটা, দেখতে চাই। নয়তো মরেও শান্তি পাবো না।”
এই কথাটিই যেন জেইনের ভেতরের দানবটাকে জাগিয়ে তুলল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। চোখ জলন্ত লাভার মতো ফুঁসলে উঠলো। সে বিদ্যুতের গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে এসে তার ভারী মিলিটারি বুট দিয়ে পিষে দিল লিওনার্দোর কাটা
যৌ/না/ঙ্গ স্থান। চপাৎ!—তার পায়ের বুটের সাথে মিশে গেল তরতাজা, উষ্ণ, আঠালো লাল রক্ত। লিওনার্দোর চোখ উল্টে যাচ্ছে। গলা অবশ, চিৎকার করার শক্তি নেই।জেইন ঝুঁকে বসলো তার মুখের সামনে। লিওনার্দোর চোয়াল শক্ত হাতে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে গজগজ করতে করতে বললো,
“অ্যাই!!! অ্যাই তুই কি বললি? কি বললি তুই??? এই শুয়োর*র বাচ্চা! এই তোর সাহস কোথা থেকে এলো? তোর কলিজাটা নিজের হাতে মেপে দেখতে চাই আমি! এই!! তোকে বলিনি, অ্যাই!বলিনি তোকে? ঐ নাম আর এই মুখে উচ্চারণ করবি না! আমার ফায়ারফ্লাই পবিত্র। তোর মতো নোংরা কীটের মুখে ওর নাম মানায় না। মানায় না, শুনতে পেরেছিস তুই? শুনতে পেরেছিস!!! এই কথা বল, কথা বল শুয়ো*রের বাচ্চা! তুই শান্তি চাস না? পাবি না। মৃত্যুর আগে এবং পরে প্রত্যেকটা মুহূর্ত নরক যন্ত্রণা সহ্য করবি তুই। ওকে দেখার স্বপ্ন তোর স্বপ্নই রয়ে যাবে। আজীবন পূর্ণ হবে না। ও আমার! শুধু আমার। আমি ছাড়া আর কারোর অধিকার নেই ওর ঐ পবিত্র মুখ দেখার। তোর তো কখনোই না! তোর মতো নোংরা কিটের জন্য আজ পর্যন্ত কত অসহায়, নিরীহ মেয়ের জীবন নষ্ট হয়েছে! তোর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
লিওনার্দো রক্তাক্ত দাঁত বের করে, শেষবারের মতো সামান্য হাসলো। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সেই হাসি। তার এক চোখ কালসিটে গর্তের মত। অন্য চোখ বুজে গেল ধীরে। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে হেলে পড়লো। নিঃশ্বাস বন্ধ। ইয়াশ বিস্ময়ে স্তব্ধ। ভ্রু কুঁচকে গেল। বুক ধ্রিমধ্রিম শব্দে কাঁপছে। সে অস্থির, নিঃশ্বাস এলোমেলো। চোখের জল বাঁধ মানছে না। হঠাৎ বিস্ময় ভেঙে ফিসফিস করে উঠলো,
“এই… ও-ও কি মরে গেল? বল না! ও কি মরে গেল? এতো, এতো সহজেই মরে গেল? না! না, না, না এটা হতে পারে না। ও মরতে পারে না, এতো সহজে! এতোহ্। এই ওঠ! ওঠ জা*নোয়ারের বাচ্চা, ওঠ! ওঠ বলছি!! চোখ খোল! তুই মরতে পারিস না। মরতে পারিস না তুই!তোর মৃত্যু এতো সহজ হতে পারে না! পারে না, পারে না! আআআআআআহ্…!”
ইয়াশ ক্ষিপ্রভাবে কুঠার উঠিয়ে একেরপর এক এলোমেলো, উন্মত্ত, পৈশাচিক আঘাত করতে লাগলো। সে যেন লিওনার্দোর মৃতদেহ নয়, বরং তার নিজের ভেতরের যন্ত্রণাকে টুকরো টুকরো করছে। চটাস! খচাখচ!—শরীর থেকে মাংস, রক্ত, হাড় ছিটকে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। পেটের ভেতরের সমস্ত কিছু— কলিজা, ফুসফুস, নাড়িভুঁড়ি কুঠারের আঘাতে নোংরা ময়লার স্তূপের মতো গলে গলে ছিটকে পড়তে লাগলো। ইয়াশের হিংস্রতা থামছে না। তার সম্পূর্ণ শরীর রক্তে ভিজে চুপচুপে হয়ে উঠেছে।
জেইন সেখানেই বসে, ছোট্ট বাচ্চার মতো গালে হাত দিয়ে দেখছে এই নরক-দৃশ্য। তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে আছে। তারপর হঠাৎ, সে ফিসফিস করে উঠলো,
“ওয়াও! আমার বউটা কত্তো কিউউট… কি সুন্দর করে ফুটো করে দিয়েছে চোখটা! আমি তো আগে লক্ষ্যই করি নি। ইশ, আমার সোনা বউটা। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গিয়ে ঠাস ঠাস করে দুটো পাপ্পি দিয়ে আসি।”
সে নেশাগ্রস্তের মতো এক হাতে নাক-মুখ ঘষতে লাগলো।
“বউ! উফফ্ বউকে লাগবে আমার। এখুনি লাগবে। থাকতে পারছি না।”
তার কণ্ঠে বিরক্তি মিশে গেল।
“*বা*স্টার্ড! মরতে মরতেও অপরাধ করে গেল। দিলো তো বউয়ের কথা মনে করিয়ে! এখন নিজেকে কন্ট্রোল করবো কি করে!….. ফা*ক!!”
ইয়াশ শেষে কয়েকটা হিংস্র কোপে লিওনার্দোর মাথা ছিন্নভিন্ন করে দিল। চুরমার!— খুলি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো চারপাশে। সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লো মেঝের বরফের আস্তরনের ওপর। তার নিঃশ্বাস ভারী। কুঠারটা ছুড়ে ফেলে, দুই হাঁটুতে হাত ঘষে, ক্ষতবিক্ষত জন্তুর মতো চিৎকার করে উঠল,
“আআআআআআআআহ্…!”
সে বাচ্চাদের মত কেঁদে উঠলো। কান্নার তীব্র তোড়ে তার শরীরটা কাঁপছে। পাগলের মতো করতে লাগলো আর্তনাদ,
“আআ্আ্আ্… কেন? কেন? আমার নিষ্পাপ বোনটার সাথেই কেন? আআ্আ্আ্… ও তো কখনো, কখনো কারো কোনো ক্ষতি করে নি! তাহলে কেন? আআ্আ্আ্! কোথায় গেলে খুঁজে পাবো আমি আমার বোনটাকে? কোথায় খুঁজে পাবো? কে ডাকবে আমাকে ভাইয়া বলে? কে ডাকবে? সেই সরল মিষ্টি ডাক! একজনই তো… একজনই… সেই মিষ্টি আপন স্বরে ডাকতো। কোথা…”
তার হাহাকার বাড়তে লাগলো না। বাড়তে লাগলো বুকের অস্থিরতা। জেইন আজ আর তাকে থামালো না। শুধু নিঃশব্দে বসে বসে দেখে গেল সেই গলা ফাটানো, বুক ফাটা আর্তনাদ। সে জানে ইয়াশ নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না। আজ তাকে তার কষ্ট প্রকাশ করতে দিতে হবে। এতো বছর ধরে এই যন্ত্রণা সে বুকে চেপে রেখেছে। আজ সে তার যন্ত্রণার ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে।
জেইন ইয়াশকে একা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়লো ‘Cryo Chamber’ থেকে। তার শরীরটা রক্তে মাখামাখি, এখন ফ্রেশ ফিল করার জন্য একটা হট শাওয়ার প্রয়োজন। তার মনের মধ্যে এক অস্থির, অগ্নিকুণ্ডের মতো ঝড় বইছে। এখন একটু শান্তি চাই। আর শান্তি যদি কেউ দিতে পারে, সেটা শুধু একজনই পারবে—তার ফায়ারফ্লাই।
সে করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল। পথিমধ্যেই তার সাথে দেখা হয় এলেনার। দু’জনেই থমকে যায়। কারো মুখে শব্দ নেই। এলেনার চোখ দুটো গভীর অদ্ভুত শান্ত। দুজনের মধ্যে এলেনাই প্রথম নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলো,
“তুমি ওকে সবটা জানিয়ে দিয়েছো?”
জেইন ক্ষীণ, শীতল স্বরে বলল,
“হুম… He’s broken. He needs to break to heal. Now you have to take care of him. হি নিডস ইউ এট দিস টাইম।”
চারপাশে লেপটে আছে ঘন, দুধসাদা কুয়াশার মতো এক আস্তরণ, যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ব্যক্তিগত কোণ। সেই কুয়াশার ধূসরতা ছাপিয়ে হঠাৎই ভেসে উঠলো এক যুবকের তীক্ষ্ণ, দৃঢ় চোয়ালরেখা। বাথটাবের ধূমায়িত, উষ্ণ জলে নিমজ্জিত; জেইন। জলীয় বাষ্পের ঘন চাদরে তার মুখমণ্ডলের অর্ধেকটা ঢাকা, বাকি অংশে ফুটে উঠেছে এক অসহনীয় প্রশান্তির ছাপ।
মাথাটা টাব-এর কিনারে হেলিয়ে দিয়ে সে চোখ বুজে আছে শান্তিতে। গরম জল যেন শুধু ত্বককেই নয়, তার ভেতরের প্রতিটি ক্লান্ত শিরা-উপশিরা কেও আলতো করে ম্যাসাজ করছে। মনে হচ্ছে, এই জলের মধ্যে সে তার অস্তিত্বের সমস্ত ভার, তীব্র ক্লান্তি ধুয়ে মুছে ফেলতে চাইছে। কিন্তু এই আরাম যেন এক ছলনা। তার ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই দূর হচ্ছে না, বরং জলের উষ্ণতা সেই আগুনকে আরও উসকে দিচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ সেভাবেই এক স্থবিরতা নিয়ে পড়ে থাকার পর, ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল সে। জল ঝরছে তার শরীর থেকে, যেন শীতল ইস্পাতের ন্যায় মসৃণ ত্বক বেয়ে মুক্তোর মতো গড়িয়ে পড়ছে জলের কণা। মোছার বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো নেই। সে একখানা বাথরোব নিজের শরীরে আলগোছে জড়িয়ে নিল। শরীরটা সম্পূর্ণ ভেজা, রোব-এর সাদা কাপড় নিমেষেই ভিজে সিক্ত হয়ে গেল। কপাল থেকে টুপটুপ করে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে জলের ফোঁটা।
সেই ক্লান্ত, ভারাক্রান্ত শরীরটা নিয়ে সে চলে এলো রুমে। এটা একটা সিক্রেট রুম, তার ব্যক্তিগত অভয়ারণ্য। তার ঘরে এই মুহূর্তে রিম গভীর তন্দ্রায় তলিয়ে আছে। সে তার রক্তাক্ত শরীর নিয়ে সেখানে আর যায়নি। নিজের এই বি*স্ট রূপ রিমকে আর দেখাতে চায়নি। জানে রক্তে রিমের ফোবিয়া।
নিজের এই বিশাল, ভারী শরীরটা সে ধপাশ করে ছুঁড়ে দিল বিছানার নরম তোষকের ওপর। তোষকটি একটি গভীর গর্ত তৈরি করে তার ভার গ্রহণ করল। বেশ কিছুক্ষণ একই ভাবে শুয়ে থাকার পরেও শান্তি এলো না। বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা, অস্থির, যন্ত্রণায় মোচড় দিচ্ছে। সবকিছুতেই এক অসহনীয় ছটফটানি।
হঠাৎ করেই সে উঠে বসলো, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে তুললো। আলমারির পাল্লা খুলে সে তড়িঘড়ি একটা গাঢ় রঙের টি-শার্ট আর ক্যাজুয়াল ট্রাউজার বের করে দ্রুত গায়ে চাপিয়ে নিল। তার ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও বেশি করে ধরা পড়ল। এরপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, সে দ্রুত পায়ে সেই গোপন রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল, যেন কোনো এক অচেনা গন্তব্য তাকে পাগলের মতো আকর্ষণ করছে।
“আমার আরু, ও কোথায়? ওকে এনে দাও না। তোমরা তো বলেছিলে আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাবে। তোমাদের স্যার আমাকে বলেছিল, আমার আরুকে আমার কাছে এনে দেবে। আমি আমার আরুর কাছে যেতে চাই। নিয়ে যাবে আমায়?……”
মায়ের জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দকৃত রুমের সামনে, লোহার মতো সটান, পকেটে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে জেইন। তার মুখাবয়ব এখন কঠিনতায় মোড়া, চোয়াল দুটি যেন ইস্পাতের মতো তীক্ষ্ণ। সে নির্বিকার, শীতল দৃষ্টিতে সামনের দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করছে—যেখানে দুজন প্রশিক্ষিত মহিলা কর্মী মিলেও ভদ্রমহিলাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মহিলার আকুতি, আর কর্মীদের প্রচেষ্টা; সবটাই জেইনের চোখে ধরা পড়ছে, কিন্তু তার অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন নেই। সে যেন এক নিরেট পাথরের মূর্তি।
ধীরে ধীরে, অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে, জেইন এগিয়ে গেল সামনে। তার উপস্থিতি যেন ঘরে একটা নিস্তব্ধ শীতলতা নিয়ে এলো। তাকে দেখতে পেয়ে ভদ্রমহিলার বিচলিত চোখে এক ঝলক আলো ফুটলো। একরাশ উৎফুল্লতা নিয়ে তিনি বললেন
“এইতো তুমি এসোছো! আমার আরু, ও কোথায়? এখানে আসার পর আমি একবারও আমার আরুকে দেখতে পাইনি। ওকে একটু এনে দেবে আমায় কাছে? আমি থাকতে পারি না ওকে ছাড়া।”
পরের মুহূর্তেই, কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই, জেইন আচমকা নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে ধরল মহিলাকে। এতো প্রবল, গভীর প্রায় মরিয়া আলিঙ্গনে মহিলা যেন এক মুহূর্তে হতবাক হয়ে গেলেন, তবে বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুভব করলেন এক অদ্ভুত, মাতৃত্বপূর্ণ উষ্ণ টান। কাঁপা কাঁপা দুটো হাত অজান্তেই জড়িয়ে ধরল জেইনের পিঠ। পরম মমতায় মাথায় বুলিয়ে দিলেন হাত।
“কি হয়েছে বাবা? মনে হচ্ছে তোমার ভেতরে অনেক কষ্ট, অনেক মেঘ জমা হয়ে আছে। তুমি চাইলে আমাকে বলতে পারো তোমার সমস্যাগুলো। এতে তোমার মন হালকা হবে, কষ্ট কিছুটা হলেও কমে যাবে।”
জেইনের কণ্ঠস্বর মৃদু কম্পিত, যন্ত্রণায় যেন ভেঙে আসছে তার স্বর,
“আমি… আমি কি তোমায় মা বলে ডাকতে পারি? একবার প্লিজ। শুধু একবার…”
তার শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল, প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে যেন গলার কাছটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। মহিলা যেন মুহূর্তের জন্য এক ঘোরের মাঝে চলে গেলেন, স্মৃতি আর বিভ্রমের মাঝে হারিয়ে যাওয়া সেই মাতৃত্ববোধ তাঁকে আচ্ছন্ন করল। অজান্তেই ফিসফিস করে বললেন,
“বুঝতে পেরেছি, তোমার মায়ের কথা মনে পড়ছে তো। ঠিক আছে বাবা, এখন থেকে তুমি আমাকে মা বলেই ডাকতে পারো। তুমি তো আমার ছেলের মতোই… আমার ছেলেটাও বড় হলে ঠিক তোমার মতো হবে।”
ভেঙে যাওয়া, রুদ্ধ কন্ঠে জেইন উচ্চারণ করল সেই দুটি শব্দ, যা সে বহু যুগ ধরে নিজের হৃদয়ে চেপে রেখেছিল,
“মাহ্… ম-মা….”
মহিলার মুখে ফুটে উঠলো এক আশ্চর্য, স্বর্গীয় হাসি—এক নিদারুণ প্রশান্তি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, আচমকা, তাঁর শরীরটা জেইনের আলিঙ্গনের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে গেল। যেন এক গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেলেন তিনি।
জেইনের হাতে তখনও ধরা একটি ব্যবহৃত সিরিঞ্জ। সে অপরাধীর মতো ফিসফিস করে বলল,
“আই’ম সরি মা। এই মুহূর্তে তোমার সুস্থতার জন্যই এমনটা করতে বাধ্য হলাম।”
জেইন অতি যত্নের সঙ্গে ভদ্রমহিলাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর আলতোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল তার কপালে—একটি নীরব চুম্বন। চাপা, প্রায় অশ্রুসিক্ত কন্ঠে সে আবার ফিসফিস করল,
“তুমি সুস্থ হয়ে আমাকে দূরে ঠেলে দিবে না তো? আমাকে ক্ষমা করে দিবে তো? ঘৃণা করবে না তো? তোমার ঘৃণা আমি সহ্য করতে পারবো না, মা। আমি জানি আমি যে ভুল করেছি, তার কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু তবুও আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। পারবে তো আমাকে ক্ষমা করে দিতে?”
তখনই একজন ফিমেইল নার্স বলে উঠলেন,
“থ্যাংকস, মিস্টার চৌধুরী। আমরা সবাই এতক্ষণ চেষ্টা করেও যে কাজটা করতে পারিনি, আপনি সেটা মুহূর্তের মধ্যেই করে দেখালেন। আমরা এখন স্যালাইন আর প্রয়োজনীয় ইনজেকশনগুলো দিতে পারব।”
জেইন উঠে দাঁড়াল, পকেটে দু’হাত গুঁজে আগের সেই কাঠিন্যতায় ফিরে এলো। তার কন্ঠস্বর যান্ত্রিক,
“থ্যাংকস বলতে হবে না। পেশেন্টকে দেখে কী বুঝলেন? আপনারা তো এসেছেন অনেকক্ষণ।”
সামনে এগিয়ে এলেন একজন Specialist Doctor, ফাইল হাতে।
“দেখুন, মিস্টার চৌধুরী, পেশেন্টের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ক্লিনিক্যালি বলতে গেলে, উনি তীব্র ট্রমা-জনিত সাইকোসিসে ভুগছেন, যার ফলে উনি নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। তবে সমস্যাটা এখানেই শেষ নয়। আমাদের প্রাথমিক ধারণা, কেউ ওনাকে দীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু সেডেটিভ (Sedative) বা সাইকোট্রপিক ওষুধ দিয়েছে, যার ওভারডোজ বা ভুল প্রয়োগে ওনার এই সমস্যা এখন বিকট আকার ধারণ করেছে।”
জেইন কপালে একটা হালকা ভাঁজ ফেলল।
“সুস্থ হওয়ার চান্স?”
“বাস্তববাদী হতে হবে। এই ধরনের ক্ষেত্রে রিকভারি চান্স খুব কম। আমরা আশা করতে পারি, তবে ডেটা অনুযায়ী, ১০০ শতাংশের মধ্যে মাত্র ১০-১৫ শতাংশের চান্স আছে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার। এখন আমরা যে উন্নত ট্রিটমেন্ট শুরু করব, তাতে আমরা আশা করছি উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। তবে কতদিন সময় লাগবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমরা এটাকে লং-টার্ম অবজার্ভেশন কেস হিসেবে দেখব।”
ডাক্তার ফাইল বন্ধ করে বললেন,
“উনাকে এখন থেকে নিরীক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ওনার পুরনো স্মৃতিগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। পুরনো দিনের কথা, ছবি অ্যালবাম, কোনো প্রিয় স্মৃতি—যা দেখলে ওনার পুরনো ব্যক্তিত্ব বা স্বাভাবিক চিন্তাগুলো মনে পড়বে। এটাই রিকভারির চাবিকাঠি।”
জেইন একবার মায়ের বিষণ্ণ, ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি তখনো কঠিন।
“এতো কিছু জানতে চাই না। আপনি শুধু মন দিয়ে উনার চিকিৎসা করুন। আমি উনাকে সুস্থ দেখতে চাই। সেটা যেকোনো ভাবেই হোক।”
আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না জেইন। বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে পড়ল রুম থেকে। গন্তব্য—নিজের রুম।
“আআআআআআহ্…”
একটি জোরালো, হিংস্র লাথি! শব্দটা যেন পশুর ক্ষিপ্ত গর্জন। ঝংং! কাঁচের টি-টেবিলটা যেন কোনো দুর্বল শিকারের মতো উল্টে গিয়ে গড়ালো মেঝেতে। মুহূর্তেই চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইলো ভাঙা কাঁচের অসংখ্য তীক্ষ্ণ টুকরো, আলোর প্রতিফলনে যা ঝিকমিক করছে।
হিংস্র পশুর মতো গর্জন করতে করতে হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়লো জেইন। উন্মত্তের মতো সে টানতে লাগলো নিজের মাথার চুলগুলো। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, মনে হচ্ছে কেউ যেন ভারী হাতুড়ি দিয়ে অনবরত আঘাত করে চলেছে তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে। তার ভেতরের অস্থির ঝড় যেন আর কোনো বাঁধ মানছে না—সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিতে চাইছে। সে ফ্লোরে ছটফট করতে লাগলো, যেন শ্বাস নিতে পারছে না।
হঠাৎই ফ্লোর থেকে উঠে সে পাগলের মতো ঘরের প্রতিটি কোণে এলোমেলোভাবে হাতড়ে খুঁজতে শুরু করল কিছু একটা। তার চোখদুটো যেন শিকার খুঁজে ফেরা ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো জ্বলছে। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা না পেয়ে তার হিংস্রতা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তর্জনী দিয়ে নাকের নিচেটা দ্রুত ঘষে সে আবারো পাগলের মতো, মরিয়া হয়ে খুঁজতে লাগলো।
অবশেষে, তার উন্মত্ত হাত খুঁজে পেল সেই অভীষ্ট বস্তু—একটা প্লাস্টিকের ছোট্ট বক্স। বক্সের ভেতরে রয়েছে কতগুলো সিরিঞ্জ আর ছোট ছোট সিল করা প্যাকেট। প্যাকেটের ভেতর সাদা পাউডারের মতো গুঁড়ো জাতীয় কিছু। সে আর দেরি করল না। যেন এক ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার পেয়েছে, সে দ্রুত একটা প্যাকেট ছিঁড়ে হাতে ঢেলে নিল সবটা।
এক নিমিষে, প্রবল টানে নাক দিয়ে টেনে নিল সেই গুঁড়ো।মাথা ঝটকা দিল একটা। মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে গেল শান্তিতে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে বেরিয়ে এলো এক অস্বাভাবিক, প্রশান্তির হাসি—যা ভয়ঙ্কর তৃপ্তির মত। পরমুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। পর্যাপ্ত নয়! সে আরো কয়েকবার একই ভাবে তীব্র টানে নাকে টেনে নিল সেই গুঁড়ো। কিন্তু কোনো লাভ হলো না, ভেতরের আগুন শান্ত হলো না।
দু’পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে সে নেশাগ্ৰস্থের মতো নিজের মুখ ঘষতে লাগলো। তার নিঃশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে চলছে, যেন কোনো দৌড় শেষে হাঁপিয়ে উঠেছে।
এবার সে হাতে তুলে নিল একটি সিরিঞ্জ। হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেই দৃশ্যমান হয়ে ফুলে উঠলো নীলচে, শিরাগুলো। দ্বিধাহীন হাতে ইনজেকশনটা পুশ করে দিল সোজা হাতের শিরায়। একটি তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠলো তার গোটা শরীর। নিঃশ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠলো। বুক ওঠানামা করছে অস্থির, দ্রুত গতিতে। কিন্তু শান্তি নেই। ভেতরটা যন্ত্রণায় অদ্ভুত ভাবে জ্বলছে।
এখন তাকে থামানোর কেউ নেই—না মাত্তেও, না ইয়াশ। একের পর এক সিরিঞ্জ পুশ করে চললো সে নিজের হাতের শিরায়। তার উন্মত্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সে হয়তো নিজেও জানে না এভাবে কতগুলো সিরিঞ্জ হাতে পুশ করেছে।
তবুও শান্তি মিললো না।
শেষমেশ, সে তার সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর মাঝেই মেঝেতে পড়ে রইলো সেভাবেই। তার শরীর নিস্তেজ, কিন্তু মুখের ভঙ্গিমায় তখনও এক ভয়ংকর ছাপ। যেন নরকের আগুন সে বাইরে নয়, নিজের ভেতরেই জ্বালিয়ে দিয়েছে।
রাত এগারোটা পেরিয়েছে। বাইরে বাতাসের তীব্রতা বেড়েছে, যার ফলে জানালার পর্দাগুলো উন্মত্তের মতো দোল খাচ্ছে, ঘরের আবছা আলোয় তৈরি করছে চলমান ছায়া। ঘরের একমাত্র উৎস, ডিম লাইটের হালকা, সোনালী আভা, বিছানার এক কোণে সীমাবদ্ধ।
কম্বলের নরম আশ্রয়ে আরামে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে রিম। গত দুদিন ধরে ওষুধের প্রভাবে তার ঘুম আরও গভীর হয়েছে, যেন কোনো সুরক্ষিত গুহায় আশ্রয় নিয়েছে। জানালার ফাঁক গলে আসা চাঁদের আলো তার মুখের ওপর পড়েছে, তৈরি করেছে এক স্নিগ্ধ, মায়াবী, অতিপ্রাকৃত রূপ।
আচমকা! নিজের তুলতুলে উদরে এক উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ অনুভব করতেই একটা তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠলো রিমের শরীরটা। সে কুকরে গেল, কিন্তু চোখ খুলতে পারলো না। সেই স্পর্শ ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠলো। একটা ভেজা, আঠালো ভাব তলপেটে অনুভব হতেই তার শরীরটা শিরশির করে উঠলো। শিহরণ টা কিসের বুঝে ওঠার আগেই—
আচমকা সেখানে বসে গেল দাঁতের হিংস্র কামড়!
“আআআহ্!”
একটা তীব্র, কন্ঠ বিদীর্ণ করা চিৎকার! ছিটকে উঠে বসলো রিম। তার হৃদপিণ্ড ধড়ফড় করে লাফাচ্ছে, আতঙ্কে বুকটা ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভয়ে সে গুটিয়ে, পিছিয়ে মিশে গেল বিছানার শেষ প্রান্তে।
ডিম লাইটের আবছা আলোয় সে দেখতে পেল এক ছায়ামূর্তি। তার মুখটা স্পষ্ট দৃশ্যমান নয়, কেবল তার ভারী উপস্থিতি রিমকে হিম শীতল করে দিচ্ছে। কাঁপতে কাঁপতে, প্রায় ফিসফিস করে সে বলল,
“ক-কে? কে তুমি? আমার থেকে দূরে থাকো প্লিজ। আমার কাছে আসবে না!”
তার এই আকুতি যেন সেই যুবকের কানে গেল না। রিমের বলা মাত্রই, যুবকটি বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে এসে তার মুখ চেপে ধরল। রিম তীব্রভাবে ছটফট করে উঠলো, কিন্তু তার শক্তি যেন এই বন্য শক্তির কাছে কিছুই না।যুবকটি নেশাক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে গভীর, কামুক স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“হেই… ভয় পাচ্ছো কেন? ইটস্ মি, ইয়োর ম্যান, ইয়োর, ওয়ান এন্ড অনলি পার্সোনাল হাবি।”
থমকে গেল রিমের ছটফটানি। এক মুহূর্ত সে তাকিয়ে রইলো যুবকের মুখের দিকে। আবছা আলোয় এবার দৃশ্যমান হলো তার সুদর্শন, তীক্ষ্ণ চোয়ালরেখা, আর পরিচিত নীলাভ চোখের গভীরতা।
রিমের চোখ ছলছল করে উঠলো। ভয়ের বাঁধ ভেঙে গেল। সে বাতাসের ঝাপটার মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার প্রাণপ্রিয় পুরুষটিকে। নাকে ভেসে এলো কড়া, অপ্রাকৃতিক পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে কেমন এক ঘোর লেগে গেল রিমের। সে ফুঁপিয়ে ওঠে নাক টেনে টেনে বলল,
“এটা তুমি… আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম
আবারো কেউ…..”
জেইন, আলতো করে রিমের চুলের মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। তার কণ্ঠস্বর গভীর হাস্কি,
“Shhh…. তোমাকে বলেছি না… আমি ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারবে না তোমায়।”
জেইনের কথায় রিম কিছুটা শান্ত হলো। তবে তার শরীরে তখনও এক তীব্র শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে জেইনকে ছেড়ে দিয়ে তার চোখের দিকে তাকালো।জেইনের গভীর নীলচে চোখ দুটো এখন টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। তার শরীরটা অদ্ভুতভাবে ঢুলছে। দেখতে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। রিম ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
”তোমাকে এমন লাগছে কেন?”
তারপর সে কাছে ঘেঁষে জেইনের গলার কাছের টিশার্টটা উঁচু করে গভীর ঘ্রাণ টেনে নিল।চোখ কুঁচকে গৃহিণীর মতো শাসনের সুরে বলল,
“তুমি আবার ড্রিংক করেছো?”
জেইন ছোট্ট বাচ্চার মতো দু’পাশে মাথা নাড়ল, তার চোখদুটো ঢুলুঢুলু। রিম দ্বিগুণ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে ঝুঁকে পড়ল। মুখের কাছে মুখ নিয়ে গভীর করে ঘ্রাণ শুঁকে নিল।
তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন প্রায় ন্যানো সেন্টিমিটার। রিমের নিঃশ্বাসের উষ্ণ, মিষ্টি সুবাস জেইনের মুখে আছড়ে পড়লো। জেইনের নিঃশ্বাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠলো—যেন অক্সিজেন কমে আসছে। এতক্ষণ ড্রাগস দিয়ে হাজার চেষ্টা করেও যেই নেশা হচ্ছিল না, এখন রিমের এই স্বল্প উপস্থিতি, সামান্য ঘ্রাণ—তাতেই সে যেন তীব্র নেশায় বুঁদ হয়ে গেল।
সে নিজের ঠোঁট সামান্য ভিজিয়ে রিমের ঠোঁট স্পর্শ করতে নিল, কিন্তু তার আগেই রিম বলে উঠলো,
“যদি ড্রিংক না করে থাকো, তাহলে এটা কিসের স্মেল?”
জেইনের কন্ঠস্বর মাতাল, হুইস্কির মতো গাঢ়, নেশাতুর। মুখটা নিষ্পাপ বাচ্চার মতো করে বললো,
“ড্রিংক করি নি তো, ট্রাস্ট মি… শুধু একটু, এই যে এক্কটু ড্রাগস নিয়েছিলাম।”
নিজের কন্ঠমনিতে দুআঙুল ছুঁইয়ে বলল, তার বলার ভঙ্গিমা একদম ছোট্ট বাচ্চার মতো সরল। রিমের রাগ হলো প্রথমে, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি ফুটে উঠলো। তার হাবি এত্তো কিউট! কই, আগে তো জানতো না।
জেইন আবারো একই ভাবে বললো,
“তুমি জানো, অনেক চেষ্টা করেছি নেশা করার, কিন্তু একটুও হয় নি। অথচ এখন, তোমাকে দেখেই নেশায় ডুবে যাচ্ছি আমি! কী মিশিয়ে রেখেছো বলোতো তোমার এই তুলতুলে শরীরে? যা মাদকের শক্তির চেয়েও ভয়ঙ্কর! পাগলের মতো টানছে আমায়, নিজেকে সামলাতে পারছি না!”
লজ্জায় লাল টকটকে হয়ে গেল রিমের মুখ। কিন্তু নিজের লজ্জা ভুলে সে জেইনের কলার দুহাতের মুঠোয় ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। শুষ্ক একটা ঢোক গিলে, গলার কন্ঠমনিতে ছোট্ট করে একটা আলতো চুমু এঁকে দিয়ে, ফিসফিস করে বললো,
”এখন থেকে আর ড্রাগস নিবে না তুমি, কথা দাও।”
জেইনের চোখ পিটপিট করছে।
“না নিলে থাকতে পারি না। পাগল পাগল লাগে নিজেকে। সামলাতে কষ্ট হয়।”
“আমি আছি তো। আমি সামলে নিব তোমাকে। আমার জন্য পারবে না?”
জেইন তার দিকে আরও ঝুঁকে গেল। তার এলোমেলো নিঃশ্বাস রিমের মুখে আছড়ে পড়ছে। সে মাতাল,গলায় বললো,
”নিব না, আর কক্ষনো নিব না! সব নেশা বাদ দিয়ে দিব। শুধু একটু আমাকে তোমার কাছে আসতে দাও—প্রমিস, পৃথিবীর সব নেশা বাদ দিয়ে রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা তোমাতেই ডুবে থাকবো।”
রিম আর কোনো কথা বলল না। সে যেন উত্তর দিল তার শরীরের ভাষায়। এক লহমায় উঠে বসলো জেইনের কোলে, দুপায়ে কোমর, দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার গলা। টাইট করে একটা গভীর চুমু বসিয়ে দিল জেইনের গালে।
নিজের শরীরের ওপর রিমের তুলতুলে, উষ্ণ শরীরটা চেপে বসতেই, নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো জেইন। তার মাদকতা এখন শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু তা কোনো রাসায়নিকের প্রভাবে নয়—কেবলই রিমের স্পর্শের নেশা। সে শুষ্ক ঢোক গিললো।নেশাগ্রস্তের মতো মুখ গুঁজে দিল রিমের ঘাড়ে। আলতো করে জামার অংশ সরিয়ে উষ্ণ ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে শুরু করল এলোমেলো তীব্র আকুতিতে ভরা চুম্বন।
রিমের নিঃশ্বাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠলো। এই স্পর্শ, এই উন্মাদনা—প্রতিবারই যেন তার কাছে প্রথমবার, নতুন মনে হয়। তার শরীরটা শিরশির করে উঠলো, সে অস্থিরভাবে কাঁপতে লাগলো। জেইনের হাতগুলো এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার শরীরের প্রতিটি সংবেদনশীল , স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে, প্রতিটি ছোঁয়ায় রিমের গভীরে এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলছে।
জেইন পুরোপুরি রিমের নেশায় ডুবে আছে। সে রিমের ঘাড়ে একের পর এক ছোট ছোট চুমু দিতে দিতে হঠাৎই হালকাভাবে দাঁত বসিয়ে দিল। ব্যথা আর সুখের এক অদ্ভুত মিশ্রণে রিম যন্ত্রণায় খিঁচিয়ে উঠলো। সেই মুহূর্তে সে জংলি বেড়ালের মতো জেইনের ঘাড়ে একটি তীক্ষ্ণ, বন্য কামড় বসিয়ে দিল।
জেইন খিঁচিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।তীব্র যন্ত্রণার ঝলক তার মুখাবয়বে ফুটে উঠলো। সে ধীরে ধীরে, দমবন্ধ করা নিশ্বাসে রিমের কামড়ের ধাক্কাটা সামলে নিল। রিমের দেওয়া কামড় এতটাই জোরালো ছিল যে, জেইনের ঘাড়ে সামান্য রক্ত বেরিয়ে এলো।
একসময় রিম ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে তাকে ছেড়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে তখনো রক্ত লেগে আছে। সে ক্রোধে ফোঁস ফোঁস করে তাকিয়ে আছে জেইনের দিকে। যেন তাকে গিলে খাবে এখুনি।
জেইন ঠোঁট কামড়ে ক্রূর হাসলো । তার কন্ঠস্বর গাঢ়, তীব্র কামনায় ফিসফিস করে বলল,
“হেই! তুমি কি ভ্যাম্পায়ার নাকি? রক্ত চুষে খাবে আমার?”
“তোমার ঘাড় মটকে খাবো আমি! রাক্ষস একটা! ছুঁবে না আমাকে, দূরে থাকো!”
“সেটাই তো পারছি না। তুমি আমার ধ্বংস, জানা সত্বেও বারবার তোমার কাছেই চলে আসি—ধ্বংস হতে।”
রিম তার অবুঝ, টলটলে চোখদুটো মেলে তাকিয়ে রইলো। জেইন তখন তার সমস্ত শরীর নিয়ে আরো কাছে ঘেঁষে এলো। সে শক্ত করে রিমকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ ডুবিয়ে দিতেই রিম থরথর করে কাঁপতে লাগলো। সে ছাড়া পেতে মরিয়া হয়ে ছটফট করতে শুরু করলে, জেইন তার গাঢ়, মাতাল, মোহাচ্ছন্ন কন্ঠে ফিসফিস করে উঠলো,
“উমম্ ছটফট করো না সোনা…”
তারপর একটু থেমে বুকের ঘ্রাণে নাক ডুবিয়ে দিয়ে কাতর স্বরে ফিসফিস করে উঠলো,
“একটু ‘আদর’ করবে আমায়? আমার তোমাকে ভীষণভাবে প্রয়োজন… খুউউব… খুব কাছে। যতটা কাছে পেলে নিজের অস্তিত্বটাই ভুলে যাবো আমি! ভুলে যাবো পৃথিবীর সমস্ত গ্লানি, সমস্ত বিষাদ, সকল আঘাত। আমি বিলীন হতে চাই তোমাতে—তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে, তোমার স্পর্শে, তোমার নিঃশ্বাসে, তোমার উষ্ণতায় মিশে যেতে চাই চিরতরে।”
‘দূর থেকে ভেসে এলো এক গভীর মাদকতা ভরা ঘোর লাগানো কন্ঠস্বর’,
~~Elomelo joto lukochuri
chol ses Kori ay…
Isharey bola boli bodle jak
Aj kothay…..
More nebo toke adore,
valobasay…
Ude jabe pakhi Akash,
Kore paay…..
Ooo…ooo….🎶
Amay ador kor…ooo…ooo….
Uriya sukher Jhor~~🎶
রিমের ছটফটানি থেমে গেলেও তার বুকের কম্পন যেন উন্মত্ত ড্রামের মতো বাজতে লাগলো, তার নিঃশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ভারী। কী ছিল সেই কন্ঠে? তা যেন কোনো নিষিদ্ধ মাদক, যা রিমের সমস্ত প্রতিরোধকে ভেঙে চুরমার করে দিল। রিম যেন এক গভীর ঘোরের মাঝে চলে গেল।
সে দু’হাতে জেইনের মুখটা উঁচু করে ধরলো, তার চোখ দুটো স্থির, নেশাচ্ছন্ন। সে জেইনের সম্পূর্ণ মুখেই ছোট ছোট ভেজা চুম্বনে ভরিয়ে দিল—কপাল, চোখ, নাক এবং গালের তীক্ষ্ণ চোয়ালে। সেই তুলতুলে ঠোঁটের আর্দ্র স্পর্শ জেইনের প্রতিটি স্নায়ু অনুভব করতে লাগলো।
রিম একটু থেমে জেইনের শুষ্ক, খয়েরী ঠোঁট দুটো আলতো করে পুরে নিল নিজের তুলতুলে ঠোঁট দ্বারা। ধীরে ধীরে শুষে নিতে লাগলো, আশ্লেষে। একটু একটু করে গভীর চুমু দিয়ে ঠোঁট চু-ষতে লাগলো। একহাতে সে শক্ত করে জেইনের গলা আঁকড়ে ধরে, অপর হাতে তার সিল্কি চুলগুলো মুঠোয় চেপে ধরলো। নিজের সমস্ত ভার জেইনের ওপর ছেড়ে দিয়ে সামান্য উঁচু হয়ে, উন্মত্তের মতো অস্থিরভাবে তীব্র চুমু খেতে লাগলো তার লা’লাযুক্ত ঠোঁটে।
জেইন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের জিভ ঢুকিয়ে দিল রিমের মুখে। রিম শিরশির করে উঠলো, তার শরীর যেন বিদ্যুতের সংস্পর্শে এলো। দুজনের মুখের লা’লা মিশে একাকার হলো, যেন তারা একে অপরের অস্তিত্বের নির্যাস পান করছে। একে অপরের তপ্ত শ্বাস তীব্র গতিতে ঢুকে যাচ্ছে ফুসফুস ভেদ করে। রিম শিরশিরিয়ে কাঁপতে কাঁপতেই জেইনের ঠোঁট গভীর থেকে গভীরে শুষে নিতে লাগলো। যেন আজ সে থামতেই পারছে না।
জেইনের হাতগুলো এলোমেলোভাবে ঘুরে চলেছে রিমের শরীরে। তার হাত নরম, স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে ধীরে ধীরে বুলিয়ে আলতো চাপ প্রয়োগ করছে, প্রতিটি স্পর্শে রিমের শরীরে আগুনের রেখা এঁকে দিচ্ছে। জেইন রিমের নিচের দিকের নরম অংশে তীব্র চাপ প্রয়োগ করতেই, রিম যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে তার ঠোঁটে শক্ত করে একটা কামড় বসিয়ে ছেড়ে দিল। ঠোঁট ছেড়ে রিম ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো।
হঠাৎ জেইন কোনো স্পর্শ না পেয়ে চোখ খুলে তাকালো। তার কণ্ঠস্বরটা ছিল গভীর কামুক, নেশাতুর,
“থামলে কেন? আমার আরও চাই। আরো, অনেক, অনেক বেশি আদর… এতো…”
আচমকা রিম পূর্বাভাস ছাড়াই, তার টিশার্টের ভেতর ঢুকিয়ে দিল জেইনের মাথাটা। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। রিমের উষ্ণ বুকের ঘ্রাণ জেইনকে মুহূর্তেই মাতাল করে তুললো। সে যেন বেপরোয়া উন্মাদ হয়ে উঠলো, তার জিভ আর ঠোঁট রিমের ব*ক্ষে লালা সিক্ত চুম্বনে ভিজিয়ে দিল। সে ক্ষুধার্তের মতো একপাশ থেকে অন্য পাশে চুমু দিয়ে জিভ দিয়ে লেহন করতে লাগলো সেই স্থান।
ধীরে ধীরে আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠলো সে। অধৈর্য হয়ে দ্রুত দু’হাতে টেনে খুলে ফেলল রিমের টিশার্টটা। রিম তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল। তার ফর্সা শরীরে এখন শুধু একটি গাঢ় লাল রঙের ইনার, যা ডিম লাইটের মৃদু আলোয় জেইনের চোখে আগুন হয়ে জ্বলজ্বল করে উঠলো। রিমের ব*ক্ষ ধীর, অস্থির গতিতে উঠানামা করছে—যেন আসন্ন ঘটনার পূর্বাভাস।
জেইন রিমকে নিজের কোলে আরো কাছে টেনে নিল। তার শরীরের সংবেদনশীল অংশ বারবার রিমের শরীরের সাথে স্পর্শ করছে। একধরনের তীব্র শিহরণ বয়ে যাচ্ছে তার শরীরে। সে রিমের ঘাড়, গলায় এবং বুকে উন্মাদের মতো এলোমেলোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। রিম কাঁপতে কাঁপতে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, তার গরম, দ্রুত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে জেইনের ঘাড়ে। রিমের হৃদস্পন্দনের তীব্র শব্দ যেন জেইনের কানে বাজছে।
জেইন আর অপেক্ষা করতে পারলো না, রিমকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার উপর উঠে এলো। এক টানে নিজের টিশার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেললো দূরে। রিমের শরীরের ওপর নিজের সমস্ত ভার ছেড়ে সে ঝুঁকে গেল তার দিকে, তাদের ত্বক একে অপরের উষ্ণতা বিনিময় করছে।
তার কণ্ঠস্বর গভীর মাদকের মতো ফিসফিসানি, যা সরাসরি রিমের আত্মায় প্রবেশ করলো,
“I want you a little more close today, You just have to cooperate with me a little… Let me lose myself completely in you. Let us melt.”
রিমের শ্বাস ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে, তার মুখটা তীব্র লালে ছেয়ে গেছে—যেন কোনো সূর্যাস্তের রঙ। সে মুখে কিছু বলতে পারলো না বটে, কিন্তু তার স্বেচ্ছাপূর্ণ নীরবতা জানান দিল: আজ সেও এই পুরুষটিকে খুব করে কাছে পেতে চাইছে। দুদিনের এই সামান্য দূরত্বে তার মনটাও অস্থির হয়ে উঠেছে জেইনকে কাছে পাওয়ার জন্য। এই পুরুষের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া যন্ত্রণাগুলোও তার কাছে স্বর্গ সুখের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
জেইন ধীরে ধীরে তার সম্পূর্ণ শরীরেই চুম্বনের ছাপ বসিয়ে দিতে লাগলো। নিচে ঝুঁকে গিয়ে রিমের পায়ের পাতায় শব্দ করে একটি চুমু খেল। তার চুমুর রেখা সর্পিল গতিতে উপরের দিকে উঠে আসতে লাগলো, সেই সাথে পরনের প্লাজো।তার প্রতিটি স্পর্শে যেন রিমের শরীর শিহরিত হচ্ছে।
রিমের পুরো শরীরটা লালচে ছোপ ছোপ দাগে ভরে উঠলো—জেইন চুম্বনের পাশাপাশি দাঁতের হালকা ছাপ বসিয়ে দিচ্ছে। রিম অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁপতে লাগলো। এই যন্ত্রণা এখন তার কাছে এক মধুর কাতরতা।
জেইন তার বুকের লালচে, খোদাই করা ‘A’ অংশটায় ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় চুমু দিয়ে একটি তীব্র কামড় বসিয়ে দিল। যন্ত্রণায় রিম দু’হাতে খামচে ধরলো জেইনের পিঠ। জেইন এক হেঁচকায় রিমকে উল্টো ঘুরিয়ে সম্পূর্ণ পিঠেই চুম্বনে ভরিয়ে দিল পাগলের মতো। তার ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ, উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে রিম থরথর করে কাঁপতে লাগলো। জেইন তার ইনারের হুক খুলে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিতেই রিমের বুক সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেল জেইনের সামনে। সেই নিষিদ্ধ সৌন্দর্যে চোখ ধাঁধিয়ে গেল জেইনের। বুক ধকধক করতে লাগলো তীব্রভাবে। নিঃশ্বাস আরো ভারী। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে এল জেইনের। সে ভিভ দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে বুকের নরম জায়গায় একেরপর এক চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে তুললো। রিম শক্ত করে নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে রেখেছে জেইনকে। অসহ্য সুখে তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা নোনা জল।
জেইন তার বক্ষের চারপাশ জিহবা দিয়ে লেহন করতে লাগলো। রিম এবার আর সহ্য করতে পারছে না। একহাতে জেইনের চুল খামচে, অপর হাতে পিঠ আঁচড় কেটে চলেছে—তার এই ছোট্ট প্রতিক্রিয়া জেইনের নেশাকে আরো বাড়িয়ে তুললো।
জেইন ধীরে ধীরে হিংস্র হয়ে উঠলো। তার কোমল, আদুরে স্পর্শ মুহূর্তে বদলে গেল এক তীব্র, যন্ত্রণাদায়ক উন্মাদনায়। রিম যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠছে বারবার, তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসছে চাপা শিৎকারের শব্দ। জেইনের এই হিংস্রতা আজ ক্ষণে ক্ষণে বেড়েই চলেছে।
সে রিমের উদরে মুখ ডুবিয়ে সেখানে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে জিভ ছোঁয়াতে লাগলো। রিম ছটফট করে উঠলো, তার শরীর যেন আর সইতে পারছে না। জেইন চুমু খাওয়া অবস্থায় একই সাথে দুই হাতে চাপ প্রয়োগ করছে রিমের বুকের নরম উঁচু চূড়ায়। রিমের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে মৃদু, তীব্র শিৎকার। তারপর হঠাৎ-
“আআহহ্…”
রিমের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটা তীব্র, যন্ত্রণাময় গোঙানির শব্দ—এক অসহ্য শারীরিক কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। জেইন আজ নিজের মধ্যে নেই। রিমের কষ্ট হচ্ছে কি না, সেকথা সে সম্পূর্ণ ভুলে বসেছে।
নিজের কাজে মত্ত জেইন, সেই তীব্রতার মধ্যেই রিমের ঠোঁট দুটো একটু একটু করে আশ্লেষ করতে লাগলো। রিমের নিঃশ্বাস এখন ধীর, অনিয়মিত। শরীর খিঁচে উঠছে একটু পর পর—আজ একটু বেশিই কষ্ট হচ্ছে তার। জেইনের স্পর্শগুলো আজকে সম্পূর্ণ অন্যরকম, বন্য, যন্ত্রণাদায়ক। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, হঠাৎ তার পুরুষটি এত হিংস্র হয়ে উঠলো কেন!
রাত যত বাড়ছে, রুমে তত শোনা যাচ্ছে কেবল রিমের গুঙিয়ে ওঠার শব্দ আর জেইনের ভারী শ্বাসের চাপা স্বর। রিমের চোখ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে—যা তার সুখ বা যন্ত্রণার স্পষ্ট পার্থক্য রাখছে না।
তখন প্রায় ভোররাত। কিন্তু জেইনের ক্ষুধা যেন মিটছেই না; সে তখনো রিমেতে মগ্ন, তার ভেতরে বিলীন। রিম তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে সবটা। একটু পর তীব্র একটা খিঁচুনি দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠলো তার ছোট্ট শরীরটা।শরীরে এখন অসহ্য চিনচিনে ব্যথা ছড়িয়ে পড়েছে। হাত-পা যেন অবস হয়ে আসছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত চিহ্ন তৈরি হয়েছে, যা জেইনের চরম উন্মত্ততার প্রমাণ। তার ঠোঁট দুটো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, এক কোণে রক্ত জমাট বেঁধে আছে।
জেইন তার রক্ত জমাট ঠোঁটে শব্দ করে একটা দীর্ঘ, গভীর চুমু খেলো। তখনই তার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠে সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিয়ে মুখ গুজে দিল রিমের উষ্ণ বুকে। জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।তার ভারী নিঃশ্বাস তখন আছড়ে পড়ছে রিমের বুকে।
শীতের সকালের মিষ্টি রোদ আজ যেন বড়ই তীব্র। জানালার ফাঁক গলে সেই সোনালী আলোকরশ্মি এসে পড়েছে ঘরের মাঝখানে থাকা বিশাল, রাজকীয় মাস্টার বেডটির ওপর। সেখানে, ক্লান্ত, বিষণ্ণ দেহ নিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দুজন নর-নারী।
রোদের তীব্র প্রবাহ চোখ-মুখে এসে পড়তেই তৎক্ষণাৎ কুঁচকে গেল ইয়াশের মুখ।কপাল চেপে ধরে সে ধীরে ধীরে উঠে বসলো। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। মনে হচ্ছে, গত রাতে সে যতটা গ্রহণ করেছে, হ্যাংওভারটা তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। চোখ খোলার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই।
অতিকষ্টে, সে ধীরে ধীরে তার ভারী চোখের পাতা দুটো সামান্য ফাঁক করার চেষ্টা করলো। কিন্তু চোখ খোলার পরই—
“ওহ্ শিট!”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫০
একটা চাপা, কিন্তু তীব্র বিস্ময়সূচক ধ্বনি বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠ থেকে। তার চারপাশের পরিবেশ, সিল্কের চাদর, ঘরের সাজসজ্জা সব, অন্য কারোর।সে নিজেকে আবিষ্কার করলো, এলেনার রুমে! ইয়াশ বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল। এলেনার কাঁধের ওপর থেকে কম্ফোর্টারটি সামান্য সরে যাওয়ায় দৃশ্যমান হলো তার মসৃণ ত্বক। ইয়াশ দেখলো, তাদের দুজনের কারো শরীরেই একটাও সুতোর উপস্থিতি নেই। ইয়াশের গলা শুকিয়ে কাঠ। তার মস্তিষ্ক থেকে রাতের ঘটনাগুলো মুছে গেছে। সে জোর করে স্মৃতি হাতড়ালো, কিন্তু কেবলই অন্ধকার।
তাহলে কি রাতে ভুল কিছু……….
