প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫২
রাত্রি মনি
“Cryo Chamber”
চেম্বারটি ততক্ষণে পরিণত হয়েছে এক হিংস্র কসাইখানায়, যেখানে মানবদেহ কেবলই ছিন্নভিন্ন কাঁচা মাংসের স্তূপ। মেঝের শীতল টাইলস এখন গলিত রক্তের আঠালো হ্রদে ডুবে আছে, যেখানে ভাসছে মাংসপিণ্ড, চর্বির ডেলা এবং সাদা হাড়ের টুকরোগুলো। দেওয়াল থেকে ছাদ পর্যন্ত ছিটকে লেগে আছে কালচে রক্ত, মগজের গুঁড়ো এবং নাড়িভুঁড়ি গলিত অংশ।যা ঠাণ্ডায় জমার আগেই বিকৃত আকার ধারণ করেছে। বাতাস তখন আর অক্সিজেন নয়, তা দমবন্ধ করা উষ্ণ, ধাতব রক্ত, এবং টুকরো হওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উৎকট, বমি উদ্রেককারী গন্ধে ভারী। এই দৃশ্য যেন নরকের সবচেয়ে নোংরা ডাস্টবিন—যা কোন সাধারণ মানুষ দেখলে পাকস্থলী মুচড়ে উঠে সব কিছু গলিয়ে বেরিয়ে আসত।
বরফের আস্তরণের উপর, রক্তের জমাট বাঁধা হ্রদে হাত-পা এলিয়ে পড়ে আছে ইয়াশ। তার শরীর যেন আর তার নিজের নয়, কেবলই ক্লান্ত, অবসন্ন এক ভারী বোঝা। তার মুখে তখন রক্ত আর চোখের জলের এক করুণ মিশ্রণ, যা শুকিয়ে যাওয়া বেদনার এক বিমূর্ত চিত্র তৈরি করেছে। শেষ কবে সে এভাবে পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদেছিল, তা তার মনে নেই। ইশা’র মৃত্যুর সময় যে বিশাল যন্ত্রণার পাথর সে বুকের গভীরে বেঁধে রেখেছিল, সেই বাঁধ আজ হিংস্রভাবে ভেঙে গেছে, আর সেই স্রোতে সে ভেসে চলেছে।
‘ক্রায়ো চেম্বারে’র দরজায় এসে থমকে দাঁড়ালো এলেনা। চেম্বারের ভেতরে যে বীভৎসতা, তা তার জানা। কিন্তু ইয়াশের মতো গোছালো, দৃঢ়-চিত্তের মানুষটিকে এভাবে ভাঙা, এলোমেলো এক টুকরো পাথরের মতো রক্তের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখে তার হৃদপিণ্ড যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সে দ্রুত ইয়াশের পাশে গিয়ে তাকে টেনে তুলতে নিলে, ইয়াশ দুর্বল হাতে বাঁধা দেয় তাকে। তার কণ্ঠস্বরের ফিসফিসানি, ক্ষীণ নিঃশ্বাসের সাথে থেমে থেমে আসছে,
“প্লিজ ডোন্ট ডু দিস। I don’t need anyone’s help. আমি, আমি একা থাকতে…. I want to be alone for a while.”
এই প্রথম ইয়াশের এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহার! এলেনা স্তব্ধ। বুকটা কেন জানি হঠাৎ চিনচিন করে উঠলো। তবুও সে নিজের মনকে শক্ত রেখে শান্ত স্বরে বললো,
“You are unconscious ইয়াশ! নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছো না তুমি। You need help right now.”
তারপর সে একপ্রকার জোর করে ইয়াশকে টেনে তুলে নিজের কাঁধের উপর ভর দিয়ে দাঁড় করালো। ইয়াশের দেহ ভারহীন, নুয়ে পড়ছে। সে বিড়বিড় করতে থাকে, তার চোখে তখনও যন্ত্রণার স্রোত,
“প্লিজ ডোন্ট….. তুমি সব জানতে, না? বলোনি কেন আমায়? কেন গোপন করলে?…..
সে মৃদু হাসলো, এক দুর্বল, তাচ্ছিল্য মাখা হাসি, যা নিজের প্রতিই তার ঘৃণা প্রকাশ করে।
“লিভ মি এ্যালোন… আই নিড সাম পেস। আমি অসুস্থ নই। নিজের সামলানোর মতো এবিলিটি আমার আছে। এতটাও দূর্বল নই আমি। আই’ম ফাইন, আম, আই’ম ফাইন। প্লিজ।”
“ইয়াশ প্লিজ! Don’t overreact. নিজের অবস্থা দেখেছো তুমি! এজন্যই তোমাকে জানাইনি। আমরা শুধু রাইট টাইমের অপেক্ষা করছিলাম। প্লিজ এমন করো না। তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না।”
“ওহ্ ফা*ক ইয়োর সিমপ্যাথি! আই ক্যান হ্যান্ডেল মাই সেল্ফ।”
ইয়াশ নিজের মুখটা দু’হাতে মুছে নিলো। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে সেখানে। সে এলেনাকে ছেড়ে একাই এলোমেলো পা ফেলে রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল সেই নরক-চেম্বার থেকে।
এলেনা তার যাওয়ার পানে চেয়ে রইল, তার চোখে ছলছল করছে জল, যা বাঁধ মানতে চাইছে না। ভেতরটা অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কই, আগে তো কখনো এমন হয়নি! ইয়াশের এই সামান্য অবজ্ঞা, কেন আজ তার বুকে তীব্র সূঁচের মতো বিঁধছে? ইয়াশের ভাঙন কেন তার নিজস্ব যন্ত্রণায় পরিণত হলো? সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, তার এই অদ্ভুত অনুভূতি কিসের— সহানুভূতি, নাকি অন্য কিছু…?
পেন্টহাউজের খোলা বার’টি তখন গভীর বেগুনী আর শীতল নীল আলোর মিশ্রণে ঝলমল করছে। কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে শহরের নিয়ন আলোর ঝিকিমিকি এসে পড়েছে চিকচিকে মার্বেল কাউন্টারে। চারপাশের চাকচিক্যময় বিলাসবহুল আয়োজন যেন এক স্বর্গীয় স্থানের মায়া তৈরি করেছে, কিন্তু সেই স্বর্গের কেন্দ্রে কাউন্টারে হেলান দিয়ে বসে আছে ইয়াশ, তার সামনে হুইস্কি, স্কচ এবং রেড ওয়াইনের কয়েকটি দামি বোতল, যা সে একের পর এক খালি করে চলেছে।
এলেনা তাকে এমন অবস্থায় দেখে পাথর মূর্তির মতো থমকে রইল। ইয়াশ কখনো একসাথে এতটা ড্রিংক করেনি। অল্পতেই তার নেশা হয়ে যায়। কিন্তু আজ সে যেন নিজেকে ধ্বংস করার খেলায় মেতেছে—সে প্রায় চারটি বোতল খালি করে ফেলেছে।
এলেনা আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না। দ্রুত ইয়াশের কাছে গিয়ে সে তার হাত থেকে হুইস্কির বোতলটি ছিনিয়ে নিল।
হঠাৎ কী হলো বুঝতে না পেরে ইয়াশ মাথা উঁচু করে তাকালো। চারপাশের আলোয় তার দৃষ্টি ঝাপসা। পরিষ্কার দেখতে না পেয়ে সে এক হাতে চোখ ডলে নিল।এলেনা দেখতে পেয়ে মাতাল গলায় বললো,
“তুমি?….”
এলেনার বিরক্ত কন্ঠ,
“অনেক হয়েছে, এবার চলো এখান থেকে। অনেক নাটক সহ্য করেছি তোমার!”
ইয়াশ মাথা ঝাঁকিয়ে জোর দিয়ে বললো,
“নাহ্, কোত্থাও যাবো না আমি। আমাকে আমার ড্রিংকের বোতল দাও।”
“দিব না। তুমি চলো আমার সাথে।”
এলেনা তাকে জোর করে টেনে তুলতে গেলে, আচমকা কোনো পূর্ব ইঙ্গিত ছাড়াই ইয়াশ দুই হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে, মুখ গুঁজে দিলো তার পেটে। এমন অপ্রত্যাশিত পুরুষালি হাতের রুক্ষ, মরিয়া স্পর্শ পেয়ে শিরশির করে কেঁপে উঠলো এলেনা। তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসছে, দম যেন ফেটে যাচ্ছে। ইয়াশ তাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে পেটে মুখ ঘষতে লাগলো। তার ভাঙা, করুণ স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আমি খুব খারাপ তাই না এলি… ভাই হিসেবে খুব খারাপ। নিজের বোনকে রক্ষা করতে পারিনি আমি… পারিনি! আমি, আমি একজন ব্যর্থ…”
এলেনা শক্ত করে তার মাথা জড়িয়ে ধরলো
“চুপ! চুপ, একদম চুপ। কে বলেছে তুমি ভাই হিসেবে খারাপ! তুমি ওয়াল্ডের বেস্ট ভাই। তোমার মতো ভাই পাওয়া সকল বোনের ভাগ্য।”
“না তুমি মিথ্যা বলছো, আমি জানি। আমাকে মিথ্যা শান্তনা দিচ্ছো তুমি! তাই না?”
এলেনা সরাসরি তার চোখে চোখ রাখলো।
“তোমার, আমার ওপর বিশ্বাস নেই?”
ইয়াশ তিক্তভাবে হাসলো।
“আমি তো নিজেকেই আর বিশ্বাস করি না।”
এলেনা ধীরে ধীরে ইয়াশকে টেনে তুললো। তার শরীর তখনো কাঁপছে। তারা ধীরে ধীরে বার কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এলো।
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমায়?”
“রুমে চলো। মাত্রাতিরিক্ত নেশা হয়ে গেছে তোমার। ফ্রেশ হতে হবে।”
“না আমি যাবো না।”
তার কন্ঠে বাচ্চাদের মতো আপত্তি।এলেনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো।
“অনেক হয়েছে, অনেক বাচ্চামো সহ্য করছি তোমার, এবার চলো। নয়তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না!”
ইয়াশ বাচ্চাদের মতো মুখ ফুলিয়ে বললো,
“তুমি আমাকে রাগ দেখাচ্ছো কেন?”
“এবার কথা না শুনলে, মার খাবে।”
অন্ধকার করিডোরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল তাদের কন্ঠস্বর।
ওয়াশ রুম থেকে জলের ফোঁটা পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। এলেনা খুব যত্ন করে ধীরে ধীরে ইয়াশকে ফ্রেশ করিয়ে দিচ্ছে। তার শরীরে জমে থাকা রক্তের দাগে ওয়াশ রুমের ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। এলেনা ধীরে ধীরে তার শরীরটা মুছিয়ে দিলো। ভেজা শার্টের বোতামে হাত রাখতেই, ইয়াশ খপ করে চেপে ধরলো তার হাত। তার চোখে তীব্র নেশা ও গভীরতার এক নেশাতুর মিশ্রণ।কন্ঠ গভীর মাতাল করা।
“হেই.. কি করছো? এখন কি নিজের হাতে আমাকে চেঞ্জও করিয়ে দিবে।”
এলেনার হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। সে শুষ্ক ঢোক গিললো। ইয়াশের হাতের অপ্রত্যাশিত রুক্ষ ঠান্ডা স্পর্শে তার পুরো শরীর কাঁপছে, শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে এলো। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের শব্দ যেন খেই হারিয়ে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। সে ইয়াশের কাছ থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। তার মুখটা তীব্র লালে ছেয়ে গেছে।সে ক্ষীণ স্বরে রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করলো,
“আ-আমি ভাবলাম তুমি একা পারবে না, তাই..……”
ইয়াশ মাতালের মতো ঝুঁকে যাচ্ছিল বারবার, কিন্তু পরক্ষণেই সে সোজা হয়ে শরীর টানটান করে বসলো।এলেনার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসলো
“তাই বলে আমার একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে, আমার লজ্জা হরণ করতে চাইছো?”
এলেনা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো। এই মুহূর্তে ইয়াশের সামনে থাকা তার জন্য ছিল অসহনীয় অস্বস্তির। নিজের লজ্জা আর অস্বস্তি ঢাকতে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল ওয়াশ রুম থেকে।
কিছুক্ষণ পর ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলো ইয়াশ। কোমড়ে শুধুমাত্র একটা সফেদ টাওয়াল জড়ানো। এখানে তার পড়ার মতো কোনো পোশাক নেই।
এলেনা রুমের এক কোণে প্রায় গুটিয়ে ছিল। ইয়াশের দিকে নজর পড়তেই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। তার ভেজা, কালো চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে, যা তার মুখমণ্ডলকে আরও পুরুষালি আর আবেদনময় করে তুলেছে। ন*গ্ন, প্রশস্ত, সুগঠিত বুক থেকে চুঁইয়ে পড়া জলের ফোঁটাগুলো তার ফর্সা ত্বকে যেন মুক্তো দানার মতো চকচক করছে।ইয়াশের সেই অবরোধহীন, উন্মুক্ত রূপ এলেনাকে এক গভীর অস্বস্তিতে ডুবিয়ে দিল। আগে কখনোই সে ইয়াশকে এভাবে এত কাছ থেকে দেখেনি।
ইয়াশ ধীরে ধীরে, সচেতনভাবে তার দিকে এগিয়ে এলো। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ছিল এলেনার হৃদস্পন্দনের তালে তালে ফেলা। তার বুকের ভেতর ঢোলের বাদ্যের মতো হৃদস্পন্দনের শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলল, তার সমস্ত চেতনাকে গ্রাস করল।
অবশেষে ইয়াশ তার একদম কাছে চলে এলো। এলেনা শ্বাস আটকে যেন দেয়ালের সাথে মিশে গেল, কিন্তু সে চোখ ফেরাতে পারল না। বুকের কম্পন থামছে না কিছুতেই। ইয়াশের দৃষ্টি তখনো নেশাতুর, ঝাপসা, কিন্তু তার গভীরতা এলেনাকে চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছিল।
ইয়াশ এক হাত তুললো। অত্যন্ত ধীর গতিতে ইয়াশ এলেনার কপালের কাছে পড়ে থাকা সিল্কি ব্রাউন চুলগুলো আলতো করে কানে গুজে দিল। এই সামান্য স্পর্শ এলেনার শরীরে যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ বইয়ে দিল। তার বুক অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে, আর তার উষ্ণ, দ্রুত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে ইয়াশের মুখে।
ইয়াশ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি রাখলো এলেনার কম্পমান ঠোঁটে।সে ধীরে ধীরে, আলতো করে বৃদ্ধাঙ্গুলটি ঠোঁটের ওপর স্লাইড করতে লাগলো।ঘোর লাগা দৃষ্টিতে ইয়াশ ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে গেল। তাদের ঠোঁট প্রায় ছুঁই-ছুঁই, মাঝখানে কেবল এক নিঃশ্বাসের দূরত্ব। এলেনা দ্রুত চোখ বন্ধ করে নিল, যেন কোনো অপ্রত্যাশিত স্পর্শের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।তার হৃদস্পন্দনের তীব্র শব্দ যেন ইয়াশের কানে প্রতি সেকেন্ডে স্পষ্ট বাজছে। সেই চুড়ান্ত মুহূর্তে হঠাৎ—
“তুমি তো পুরো ভিজে গেছো। ঠান্ডা লেগে যাবে। এক কাজ শাওয়ার নিয়ে আসো।”
ঠোঁটের স্পর্শের বদলে ভেসে এলো ইয়াশের কণ্ঠস্বর—নেশাগ্রস্ত, অবুঝ। ইয়াশের অপ্রত্যাশিত বাক্যে চমকে চোখ খুলে তাকালো এলেনা। যেন তীব্র গতিতে ছুটে চলা একটি ট্রেন হঠাৎ থেমে গেল।বুকের কম্পন থামছে না এখনো। লজ্জা আর হতবাক হওয়া অনুভূতির এক মিশ্রণে তার গাল তীব্র লাল হয়ে গেল। নিজের ওপর ভীষণ রাগ হলো। এতক্ষণ কি না কি ভেবে বসছিল সে! ছিহ্! ছিহ্!
নিজের অস্বস্তি সামলাতে না পেরে, সে দুই হাতে ইয়াশকে দূরে ঠেলে দিলো। কোনো দিকে না তাকিয়ে, এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সোজা ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল। ইয়াশ তখনো অবুঝের মতো তার যাওয়ার দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইল, তার চোখে তখনো নেশার ঘোর এবং এক গভীর শূন্যতা।
শাওয়ার শেষে এলেনা টের পেল, তাড়াহুড়োয় সে তার নিজের জামাকাপড় আনতে সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। এই মুহূর্তে সে কী করবে? অন্য সময় হলে হয়তো বাথরোবেই বেরিয়ে যেত, কিন্তু এখন যে রুমে ইয়াশ আছে! সে তার নরম বাথরোবটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল, তবুও এক অস্বাভাবিক, তীব্র অস্বস্তি ঘিরে ধরলো তাকে। হঠাৎ এতো লজ্জা কেন পাচ্ছে! সে তো অন্য মেয়েদের মতো নয়! তাহলে হঠাৎ এতো তীব্র লজ্জার কারণ সে নিজেও বুঝতে পারছে না। তার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ
“ঝংং” কাঁচ ভাঙার তীব্র শব্দ!
“আআআআআআহ্…..”
গলা ফাটানো আত্মচিৎকার। এলেনার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। মুহূর্তের মধ্যে তার সব লজ্জা উধাও। এক ছুটে সে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
ইয়াশ মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাঁচের ধারালো টুকরোগুলো। তার হাতের তালু থেকে চুঁইয়ে পড়ছে তরল, উষ্ণ রক্ত। আতঙ্কে এলেনার বুক কেঁপে উঠলো। দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্সটা টেনে এনে সে ইয়াশের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। কাঁপা হাতে তার ক্ষতবিক্ষত হাতটা নিজের কাছে তুলে নিল। তার কণ্ঠে অস্থিরতা আর যন্ত্রণা মিশে গেছে
“এসব কি? কিভাবে হলো এটা? ইশ্… কতটা কেটে গেছে! একটু সাবধানে চলতে পারো না?”
ইয়াশের কণ্ঠস্বর যন্ত্রণায় ভেঙে এলো, তার চোখ শূন্য, কোথাও স্থির নয়,
“আমি পারছি না। আর সহ্য করতে পারছি না এলি… চোখ বন্ধ করলেই নিজের বোনের সেই রক্তাক্ত দেহ ভেসে উঠছে সামনে। যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে বুকটা। নিজের ছোট্ট বোনটাকে রক্ষা করতে পারিনি আমি।”
তার কণ্ঠস্বর আরও করুণ হয়ে এলো,
“আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না এলি। এতদিন বাঁচার একটা কারণ ছিল। নিজের বোনের মৃত্যুর বদলা নেয়া। এখন তো সেটা পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন আর বেঁচে থেকে কি করবো আমি? কার জন্য বাঁচবো বলো?”
এলেনার বুকটা মুচড়ে উঠলো তীব্র ব্যথায়। কার জন্য বাঁচবে মানে! ইয়াশ কি তার সব কথা ভুলে গেল? সে কি তাকে আর ভালোবাসে না? সে তো বলেছিল সে তাকে ভালোবেসে, সারাজীবন তার পাশে থাকতে চায়। তাহলে কি সেসব প্রতিশ্রুতি মিথ্যে হয়ে গেল? তার ভেতরটা যন্ত্রণায় ফেটে গেলেও, সে মুখে একটা টু শব্দ পর্যন্ত করলো না, শুধু নিস্তব্ধে ফার্স্ট এইড করতে লাগলো।
আচমকা ইয়াশ তাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তার আলিঙ্গন এতটাই জোরালো এবং মরিয়া ছিল যেন মনে হচ্ছে নিজের সমস্ত দহন, সমস্ত যন্ত্রণা সে এলেনার মধ্যে বিলীন করে দিতে চাইছে। এমন আকস্মিকতায় কেঁপে উঠলো এলেনার শরীরটা। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে সেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
এলেনার স্পর্শে ইয়াশ আরও বেশি ভেঙে পড়লো, শিশুর মতো হাহাকার করে উঠলো। সে যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষ।
“তুমি জানো, আমার বোনটা ভীষণ আদুরে ছিল। কখনো আমাকে ছাড়া একা থাকেনি। সেদিন যখন ওকে একা রেখে কাজে যাচ্ছিলাম, ও আমাকে অনেকবার বলেছিল, ‘ভাইয়া আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।’ কিন্তু আমি শুনিনি। শুনিনি ওর কথা। আমার জন্য ও….. আমার জন্য…. আমি কোথায় গেলে ওকে খুঁজে পাবো বলো? কে আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবে? আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে এলি! খুব কষ্ট হচ্ছে।”
তার হাহাকার কান্নায় পরিণত হলো। সে এলেনার কাঁধে মুখ গুঁজে আকুতি জানালো,
“আমাকে একটু জড়িয়ে রাখবে তোমার সাথে? প্লিইইজ। শুধু একটু জড়িয়ে রাখো। আমি একটু শান্তি চাই…”
এলেনা চোখ বন্ধ করে তাকে আরও শক্ত করে ধরলো। সে ইয়াশের পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে লাগলো, যেন তার সমস্ত যন্ত্রণা শুষে নিচ্ছে। মুখে কিছুই বলতে পারলো না। সে জানে না, কিভাবে কাউকে শান্তনা দিতে হয়? কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল নীরবতার গভীর সমুদ্রে। ঘরে শুধু দুজনের উন্মত্ত হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এলেনার উষ্ণ পরশে তার নিরাপদ আলিঙ্গনে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো ইয়াশ।
এলেনা তাকে আলতো ভাবে ছেড়ে দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। কাঁটা হাতটা নিজের কাছে নিয়ে খুব যত্ন সহকারে ব্যান্ডেজ করে দিল। ইয়াশ চুপচাপ ভদ্র বাচ্চার মতো তার কাজগুলো দেখতে লাগলো।
এলেনার পড়নে তখন শুধুমাত্র সেই বাথবোর টা রয়েছে। গলা সামান্য বড় হওয়ায় ঝুঁকে কাজ করার সময় তার বুকের মসৃণ, শুভ্র খানিকটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে। ইয়াশের দৃষ্টি সেখানেই স্থির, এক গভীর নেশায় মত্ত। তার মনে হচ্ছিল যেন সেই উন্মুক্ত উষ্ণতায় মুখ ডুবিয়ে দিলেই তার সমস্ত ক্লান্তি, সকল যন্ত্রণা মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে যাবে। সে একটা শুষ্ক ঢোক গিললো। নেশার তীব্রতায় তার শরীরটা ঢুলছে, মাথাটা কেমন যেন ভারী ভারী লাগছে।
এলেনা ব্যান্ডেজ শেষে বক্সটা হাতে নিয়ে রাখার জন্য উঠতে নিলে, ইয়াশ তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলে। এক হেঁচকায় তাকে ফেলে দেয় নিজের ওপর।এলেনা নিজের ভারসাম্য হারিয়ে সম্পূর্ণ তার ওপর পড়ে গেল। তার হাত থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা মেঝেতে পড়ে বিকট শব্দ করল, কিন্তু সেই শব্দ শোনার মতো অবস্থায় তারা কেউ ছিল না।
দু’জনেই বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল। এলেনার হার্টবিট তখন এতটাই জোরালো যে মনে হচ্ছে খাঁচা ফেটে বেরিয়ে আসবে। ইয়াশের নেশাক্ত চোখ জোড়া তার কম্পমান ঠোঁটের দিকে স্থির। এলেনা অস্বস্তিতে দ্রুত উঠতে চেষ্টা করলে, ইয়াশ মুহূর্তের মধ্যে তার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল।
এক তীব্র, গভীর আকাঙ্ক্ষায় সে তাকে চুম্বন করতে লাগলো। সেই চুম্বন ছিল যেন তার সমস্ত যন্ত্রণার একমাত্র নিরামক।এলেনা প্রথম দিকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে উঠলো। ইয়াশ তখন সম্পূর্ণ ভুলে বসেছে তার চারপাশের জগৎ। ইয়াশের স্পর্শ আরো গভীর থেকে গভীর হলো। তার স্পর্শ এতটাই আদুরে, এতটাই যত্নশীল, এতই কোমল এতই তীব্র ছিল যে এলেনার প্রতিরোধ ধীরে ধীরে গলে গেল। সে এমন এক ঘোরের মাঝে চলে গেল, যে সে নিজেও ধীরে ধীরে তার সাথে রেসপন্স করতে শুরু করল—তাকে আরও কাছে টেনে নিল।
এলেনার এই স্বতঃস্ফূর্ত রেসপন্স পেয়ে ইয়াশ আরও গভীর হয়ে উঠলো। একটু একটু করে চুম্বন করে তাকে নিজের ওপর থেকে এক লহমায় বিছানায় শুইয়ে মুহূর্তের মধ্যে তার ওপর উঠে এলো। গলার খাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে, উন্মত্তের মতো চুমু খেতে লাগল। তার স্পর্শ আরো বেসামাল আরো বেপরোয়া হয়ে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে এক হাতে এলেনার বাথরোবের ফিতেটা টেনে খুলে দিতেই এলেনার মসৃণ, শুভ্র ত্বক তার সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেল। এলেনার চোখের পাতা বন্ধ, বুক ধীরে ধীরে, গভীর আকাঙ্ক্ষায় উঠানামা করছে। সে চাইলেও ইয়াশকে বাঁধা দিতে পারছিল না, যেন কোনো অদৃশ্য, শক্তিশালী বাঁধন তাকে ইয়াশের কাছে টেনে রেখেছে।
ইয়াশ তাকে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মত্ত হয়ে গেল তার মাঝে। নিজের মধ্যে জমে থাকা সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে দিল তার মাঝে। তার প্রতিটা স্পর্শ এলেনার শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ, এক স্বর্গীয় সুখ তৈরি করছিল। সে যেন বাস্তবতা থেকে দূরে,অনুভূতির এক অচেনা নদীতে ভাসছে।
ঘরের মধ্যে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজমান। শুধু ইয়াশের চাপা, গভীর শ্বাস আর এলেনার মৃদু সুখময় শিৎকার ভেঙে দিচ্ছে সেই নীরবতা। বাইরে মেঘের গর্জন যেন তীব্র ঝড় আসার পূর্বাভাস দিচ্ছে। আর ঘরের ভেতরে দুজন নর-নারী—তারা দুজনেই যেন বাস্তবতা থেকে দূরে, একে অপরের মাঝে বিলীন হচ্ছে ধীরে ধীরে, তাদের ভাঙা আত্মা খুঁজে নিচ্ছে শান্তি এবং উষ্ণতার নতুন আশ্রয়।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিশাল মাস্টার বেডে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জেইন। তার চোখে মুখে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত, প্রায় শিশুসুলভ প্রশান্তি। বাইরে ঝলমলে সকালের রোদ জানালা ভেদ করে এসে পড়তেই, সেই তীব্র আলোর প্রবাহ তার চোখে মুখে আঘাত হানলো। সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে, যন্ত্রণায় পাশ ফিরে গেল।শান্তিতে বালিশে মুখ গুঁজে আবারও গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে চাইল।
হঠাৎ—
কান্নার ফ্যাসফ্যাস শব্দ। শব্দটা জেইনের মস্তিষ্ককে বিদ্যুতের মতো সজাগ করে তুললো। সে দ্রুত ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসলো বিছানায়। তার চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে রয়েছে—নেশা আর ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি। মাথার চুলগুলো এলোমেলো, কপালে লেপ্টে আছে।
“ও শিট! ব্লাড কোথা থেকে এলো?”
উঠে বসতেই তার দৃষ্টি গেল বিছানার ওপর।বিছানার শুভ্র, মসৃণ চাদরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাল ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।রিম তার পাশেই, হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে তার ওপর মুখ গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার ন*গ্ন পিঠ আর কাঁধের ওপর দাঁতের গভীর লালচে ছাপগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
রাতের বন্য, নিয়ন্ত্রণের বাইরের কথাগুলো মনে পড়তেই অপরাধবোধের এক তীব্র স্রোত জেইনের শিরায় শিরায় বইতে লাগলো। নিজের ওপর তার ভীষণ রাগ হলো। সে দ্রুত রিমের ন*গ্ন শরীরটা নিজের কোলে তুলে নিল। কপালে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল,
“বেশি কষ্ট হচ্ছে সোনা?”
রিম উত্তর দিতে পারলো না। সে দুর্বল হাতে জেইনের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আরো শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো। তার নীরবতা যেন জেইনের অপরাধবোধকে সহস্রগুণ বাড়িয়ে দিল। জেইন আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না।দ্রুত তাকে কোলে নিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেল ওয়াশ রুমের দিকে।
সূর্য এখন সমুদ্রের দিগন্তে রক্তিম গোলকের মতো নামছে। জানালার কাঁচের ঠান্ডা পৃষ্ঠে বিকেলের নরম, হলুদ আলো যেন এক মুহূর্তের জন্য এক স্বর্গীয় উষ্ণতা এঁকে দিয়েছে। বাইরে থেকে দৃশ্যটা দেখলে মনে হয় যেন কাঁচের ভেতরে কোনো অদৃশ্য অগ্নিশিখা স্থির হয়ে জ্বলছে।
বিছানায় শুয়ে আছে রিম। তার শরীরে এ পর্যন্ত দুটো স্যালাইন ঢুকে গেছে, যা তার দেহের দুর্বলতাকে কিছুটা হলেও দূর করেছে। তার সামনের টেবিলে থরে থরে সাজানো রয়েছে নানা রকমের হেলদি খাবার ও ফলের বাহার। জেইন একটু পর পর জোর করে এটা সেটা খাইয়েই চলেছে তাকে, যেন সে কোনো অসুস্থ শিশু।জেইনের অতি-যত্নে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। সাথে সারাদিন এভাবে বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে প্রচণ্ড বিরক্ত। হঠাৎই যেন তার ভেতরটা তেতে উঠলো, ইচ্ছে করছে চারপাশে সবকিছু ফাটিয়ে ফুটিয়ে দিয়ে এই স্থবিরতা ভাঙতে।
জেইন তার সামনে খাবারের প্লেট নিয়ে বসতেই তার রাগ আরো দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
সকালে জেইন মহিলা ডাক্তারকে ফোন করার পর রিম তাকে অনেকবার বলেছিল, সে ডাক্তার দেখাবে না। এসব গোপন সমস্যার কথা সে কিছুতেই তৃতীয় কাউকে বলতে পারবে না। কিন্তু জেইন যখন বলে উঠলো, এই ‘সমস্যার’ জন্য সে আরো দুবার রিমকে ডাক্তার দেখিয়েছে তার অজ্ঞান অবস্থায়—তখন লজ্জায় অস্বস্তিতে রিমের রাগ যেন আকাশ ছুঁলো।
ডাক্তার মহিলাটিও তার ওপর ভীষণ বিরক্ত হন। আগে একবার তিনি সাবধান হতে বললেও, এবার ডাক্তারও বুঝতে পারছেন, এ ছেলে আর ভালো হবে না। শেষে বিরক্ত হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি এক কাজ করুন, আপনার ওয়াইফের এই সমস্যার জন্য একটা পারমানেন্ট ডক্টরের ব্যবস্থা করে রাখুন।’
জেইন তখন কোনো সংকোচ ছাড়াই নির্দ্বিধায় বলেছিল, ‘তাহলে আপনিই আমার ওয়াইফের পারমানেন্ট ডক্টর হয়ে যান! যেহেতু আপনি আরো দু’বার তার চিকিৎসা করেছেন, তাই আপনিই ভালো বুঝবেন।’
জেইনের এমন কথায় ডাক্তার যেন বিস্ময়ে হতবাক! তিনি ভেবেছিলেন, এমন কথায় জেইনের মধ্যে একটু হলেও অনুশোচনা বোধ জাগবে, কিন্তু হলো তার উল্টো—সে আরো নির্লজ্জের মতো তাকে পার্মানেন্ট হয়ে থাকার কথা বলছে! তার মানে এই ছেলে আবারও এমন ঘটনা ঘটানোর ধান্দা করছে!
অন্যদিকে রিম তখন লজ্জায় তার মুখ লুকিয়ে ফেলেছিল কম্ফোর্টারের নিচে।
এখন সেই সব কথা মনে পড়তেই সে রাগে জেইনের এলোমেলো চুলগুলো শক্ত করে টেনে ধরলো।
“আউচ্! আরে কী করছো? ব্যথা পাচ্ছি তো! ছাড়ো!!”
যন্ত্রণায় জেইন চোখ মুখ কুঁচকে কঁকিয়ে উঠলো। রিম আরো শক্ত করে তার চুলগুলো টেনে ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠলো।
“আহহ্! কী হয়েছে, বলবে তো!”
রিম সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললো,
“আমার রাগ হচ্ছে অনেক! অনেক রাগ হচ্ছে! ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে….”
“কী ইচ্ছে করছে সোনা?”
“তোমাকে কামড়ে খেয়ে ফেলি!”
জেইন ঠোঁট টিপে হাসি চেপে বললো,
“তাহলে কি চটপটা মশলা দিয়ে মাখিয়ে আনবো?”
রিম আর সহ্য করতে না পেরে ন্যাকা স্বরে কান্না জুড়ে দিল,
“এএএ্য্য্য্য্য্য্য্য…. আমি বাইরে যাবো! এভাবে ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছে না!”
আচমকা জেইন কোনো কথা না বলে তাকে কোলে তুলে নিলো। রিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। শুকনো ঢোক গিলে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার গলা। ভ্রু জোড়া কুঁচকে বললো,
“কী হলো? আমাকে কোলে নিলে কেন?”
জেইন ফিসফিস করে গভীর কামুক স্বরে বলল,
“তুমি যে বললে বাইরে যাবে তাই। তুমি তো এখন হাঁটতে পারবে না। ডাক্তার তোমাকে বেড রেস্টে থাকতে বলেছে। কিন্তু আমার বউয়ের যেহেতু বাইরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে, তাই আমি তাকে কোলে করেই নিয়ে যাচ্ছি।”
রিম মুখ ফুলিয়ে বললো,
“তুমি খুব পঁচা।”
জেইন ঠোঁট কামড়ে ক্রূর, মোহাচ্ছন্ন হাসলো।
“ইয়েস, বাট ওনলি ইয়োরস্।”
রিম লজ্জায় আর কথা বলতে পারলো না, সে জেইনের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেললো। জেইন সেই নরম ভার সামলে সন্তর্পণে এগিয়ে চললো দড়জার দিকে।
ড্রয়িং রুমের বিশাল সোফায় রিম এখন পূর্ণ মহারানীর মেজাজে বসে আছে। হাত-পা ছড়িয়ে, গালে হাত দিয়ে সে গভীর মনোযোগে ‘শিনচ্যান’ কার্টুন দেখছে।
অন্যদিকে, জেইন, শাস্তি স্বরূপ, গত আধঘণ্টা ধরে কান ধরে উঠবস করছে। তার অপরাধ? রিম তাকে শিনচ্যানের মতো অভিনয় করে দেখাতে বলেছে, কিন্তু ‘মাফিয়া বস’ তাতে একটুও অভিনয় ম্যাচ করতে পারেনি!
আচমকা ড্রয়িং রুমে কারো পদাঘাতের শব্দ শুনতে পেয়ে জেইন এক ঝটকায়, বিদ্যুতের মতো সোজা হয়ে দাঁড়ালো। রিম চোখ-মুখ কুঁচকে তাকালো—তার মেজাজ তখন তুঙ্গে। ঝাঁঝালো কণ্ঠে সে নির্দেশ দিল,
“থামলে কেন তুমি? আমি তোমাকে থামতে বলেছি? আজকে সারারাত এভাবে উঠবস করবে তুমি।”
জেইন কান ধরে দাঁড়িয়েই,
“ঠিক আছে মাই লিটেল অ্যাংরি বার্ড….”
সে করুণ চোখে রিমের দিকে তাকালো।
“কিন্তু এখানে না, রুমে প্লিজ। এখানে এভাবে কেউ আমাকে দেখলে কি হবে বুঝতে পারছো! নিজের হাবির প্রেস্টিজের কথাটা অন্তত একটু ভাবো। After all, I am the sole boss of the mafia world.”
রিম নাক ফোঁস করে বললো,
“সে তুমি পুরো ওয়াল্ডের মাফিয়া বস হও আর যাই হও না কেন! এই মুহূর্তে আমার জন্য তুমি আমার Personal servant. যে সারাক্ষণ আমার কথায় উঠবস করবে, বুঝেছো?”
তারপর সে গালে এক আঙুল দিয়ে ঠকঠক করে গভীর চিন্তা করার ভান করলো।
“আচ্ছা ঠিক আছে এখন আর উঠবস করতে হবে না। কিন্তু…..
রুমে গিয়ে সারারাত উঠবস করতে হবে তোমায়।”
“যো আজ্ঞা মহারানী।”
হঠাৎ জেইন রিমের খুব কাছে ঝুঁকে এলো। রিম ভড়কে গিয়ে পেছনে ঝুঁকে সোফার সাথে একদম মিশে গেল। আচমকা জেইনের কাছে আসাতে তার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেল। বুকের কম্পন তখন দ্রুতগামী।জেইন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে হুইস্কির মতো গাঢ় স্বরে ফিসফিস করলো,
“উঠবস তো আমি সারারাত ধরেই করতে পারবো, শুধু… নিচে যদি তুমি থাকো।”
জেইনের কথার অর্থ বুঝতে রিমের এক সেকেন্ড সময় লাগলো। সে লজ্জায় রাঙা হয়ে চোখ নামিয়ে ফেললো।জেইনের ঠোঁট বারবার রিমের কানের লতিতে স্পর্শ করছিল।যা এক তীব্র শিহরণ জাগাচ্ছিল। রিম কাঁপতে কাঁপতে শ্বাস আটকে সোফার চাদর খামচে ধরলো। জেইন আড় চোখে সেটা লক্ষ্য করলো। রিমের কম্পন বাড়িয়ে দিতে সে রিমের কানে নিজের উষ্ণ জিভ ছুঁয়ে দিলে, রিম শিরশির করে উঠলো। কাতরতায় কান্না চলে আসার উপক্রম হলো তার।জেইন এক হাত তার গালে রেখে ধীরে ধীরে ঠোঁটের কাছে ঝুঁকে পড়লো। চোখে ঘোর লাগা নেশা, তার সমস্ত মনোযোগ এখন রিমের ঠোঁটে। সে রিমের ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটে পুরে নিবে, ঠিক তখনই—
“স্যার…”
রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তটা ভেঙে গেল এক তীক্ষ্ণ নারীকণ্ঠে।
সঙ্গে সঙ্গে রিম চিৎকার করে জেইনকে দু’হাতে ঠেলে ফেলে দিল মেঝেতে! এক সেকেন্ড! জেইন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বসে রইল মেঝেতে। পরক্ষণেই ড্রয়িংরুমে কারোর উপস্থিতি পেয়ে বিদ্যুতের মতো সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো।
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ফিমেইল নার্স। আর তার ঠিক পাশে একজন সৌম্য, গম্ভীর ভদ্রমহিলা।পরনে সাধারণ সালোয়ার-স্যুট। রিম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে আগে কোথায় যেন দেখেছে। মনে পড়তেই তার কপালের ভাঁজ চওড়া হয়ে গেল। হ্যাঁ! সেই পুরোনো অ্যালবামে দেখেছিল! কিন্তু ইনি কে?সে কৌতুহলে উঁচু গলায় সরাসরি প্রশ্ন করলো,
“উনি কে?”
জেইন একবার ভদ্রমহিলার দিকে তাকালো—তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নির্বিকার, শান্ত গলায় বলল,
“Your mother in law Mrs Arittrika Chaudhary.”
রিমের চোখ বড়বড় হয়ে গেল। কপাল চওড়া।
“ওয়াওওও আমার শাশুড়ি এই বয়সেও এতো হট এন্ড স্লিম! তাইতো বলি পোলা এমন আগুনের গোলা কেন?”
রিমের কন্ঠে অবাক করা বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস। মুখ ফসকে যে, বেফাঁস কথাটা সে বলে ফেলেছে, সেটা হয়তো তার ঘোর কাটেনি বলে নিজেও জানে না! জেইন তার কথাটা সম্পূর্ণ বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকালো
“কি বললে তুমি?”
রিম থতমত খেয়ে গেল, লজ্জিত ও হতভম্ব! তুতলিয়ে, জোরপূর্বক সামান্য হেসে বললো,
“ক-কিছু না! আ… আমি বলছিলাম উনি খুব সুন্দর! মানে আমার Mother in law.”
ড্রয়িং রুমের সোফায় দু’পা ভাঁজ করে পুরোনো ডাইরিটা কোলে নিয়ে বসে আছে রিম।বিশেষত, সে তার শাশুড়ি অরিত্রিকা চৌধুরীকে সেই ডায়েরির ভেতরের পুরোনো ছবিগুলো দেখাচ্ছে। জেইন এখন নেই—সে সিক্রেট রুমে আছে। অনেকদিন বিজনেসের কাজ করা হয়নি, হয়তো সে সেই সংক্রান্ত কাগজপত্রই দেখতে গেছে।
তার কাছ থেকেই রিম জানতে পেরেছে, সেদিন রাতে সে মিশনে তার মাকেই উদ্ধার করতে বেরিয়েছিল। যখন সে জানতে পারে অরিত্রিকা মা মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ডাক্তার তাকে বিশেষ অবজারভেশনে রাখতে ও পুরোনো স্মৃতি মনে করাতে বলেছেন, তখন রিমের মাথায় সেই ডায়েরির কথাটাই সবার প্রথমে আসে।এরপর জেইনকে দিয়ে সেটা আনিয়ে নেয় সে।দু’জনেই এখন বেশ আগ্রহ নিয়ে ছবিগুলো দেখছেন।
অরিত্রিকা চৌধুরী রিমকে সবগুলো ছবি দেখিয়ে সেগুলোর পেছনের হাসি-কান্না মাখা ঘটনাগুলো বর্ণনা করে বলছেন। রিম বেশ কৌতূহল নিয়ে মনোযোগ দিয়ে সব কাহিনী শুনছে। শাশুড়ি-বৌমার এই সহজ সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় রিমের কাছে মনে হচ্ছে, অবশেষে সে একজন মায়ের আশ্রয় পেয়েছে।
হঠাৎ রিম এক মুহূর্ত থমকে গেল—আর পরক্ষণেই খিলখিল করে হেসে উঠলো! তার হাসি এতো তীব্র যে সে হাসতে হাসতে একেবারে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা! হাসির দমকে তার গাল চাপা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। তার দেখাদেখি মিসেস অরিত্রিকা চৌধুরীও হেসে উঠলেন।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ছোট্ট জেইন প্যান্টে হিসু করে সাদা টাইলসের ফ্লোর ভিজিয়ে রেখেছে। আবার বসে বসে ডানহাতে সেই হিসু নাড়ছে, সেইসাথে বা-হাতটা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে চুষছে!
তাদের হাসি মজার মধ্যে সময়টা বেশ ভালোই কাটছে।হঠাৎই রিমের চোখ দুটো থমকে যায় ডায়েরির একটি ছবির পাশে। যেখানে একটা তারিখ লেখা:
১২. ১২. ১৯৯৫।
রিম ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো ,
“এটা কিসের তারিখ?”
অরিত্রিকা চৌধুরীর চোখে এক স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল আলো ফুটে উঠলো। তিনি আবেগে রিমের হাতটা ধরলেন,
“আমার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন এটা। এই দিন আমার আরু আমার কোল আলো করে এসেছিল। ভোরের প্রথম আলোয় সেই মুখটা প্রথম দেখেছিলাম আমি। একটা ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা!”
রিমের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। তার হার্টবিট দ্রুত বাজতে লাগলো। সে ঠোঁট কামড়ে মৃদু, লজ্জা মিশ্রিত হাসলো। তারপর একটু হিসেব করে দেখলো: আজকের তারিখটা ৯ তারিখ। তার মানে আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই তার ‘হাবি’ ত্রিশ বছর বয়সে পা রাখতে চলেছে।
সে অবাক হলো—যাকে সে বাইশ-তেইশ বছরের তাগড়া যুবক ভেবেছিল সে আসলে একটা বুড়ো! কই, দেখে তো একটুও বোঝা যায় না!শেষমেষ তার কপালে একটা জোয়ান দেখতে বুড়ো জুটলো! মা-ছেলে দু’জনেই একরকম। রিম মনে মনে ভাবলো, হয়তো পুরো বংশটাই এমন! কিন্তু তার মনে তখন একটাই চিন্তা, আর মাত্র তিন দিন বাকি, তারপরেই তার ‘আরাত্র’-র জন্মদিন!
চার্চের ঘণ্টা বহু আগেই থেমে গেছে, রাত এখন অনেক গভীর। ইতালির প্রাচীন সিমেতেরো (Cimitero)-এর পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ নীরব, যেন সময় এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আকাশ মেঘে ঢাকা, চাঁদ নেই, তাই সেই পুরোনো স্থাপত্য আর উঁচু সাইপ্রেস গাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে কোনো রূপালী আলো প্রবেশের সুযোগ পায়নি। চারিদিকে কেবল জমাট অন্ধকার, যা এই কবরস্থানের বিষণ্ণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
হাওয়ায় ভেসে আসছে শীতল, আর্দ্র এক গভীর গন্ধ—বহু যুগের পুরোনো পাথর, টাটকা ভেজা মাটি, আর মার্বেল পাথরের স্মৃতিস্তম্ভের ফিসফিসানি। নুড়ি-পাথরের পথগুলো এখন যেন নিস্তব্ধতার একমাত্র সাক্ষী; পায়ে চাপা পড়লে মৃদু খসখস শব্দ হয়, যা এই গভীর শূন্যতাকে আরও প্রকট করে তোলে।
সেখানে, সেই জমাট অন্ধকারেও, একটি সমাধি আবছাভাবে জ্বলে উঠেছে—ধবধবে সাদা কারারা মার্বেল দিয়ে তৈরি। কবরের শিয়রের দিকে বসানো মসৃণ পাথরের ফলকে উৎকীর্ণ নাম: Eisha Richi তার নিচে সুন্দর বাঁকানো অক্ষরে খোদাই করা জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ – (2005-2022) আর নামটির ঠিক উপরেই একটি ছোট ব্রোঞ্জের ক্রস।
সেই কবরের শীতল পাথরে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে ইয়াশ। তার গলার স্বর ভেঙে যাচ্ছে, প্রতিটা শব্দে যেন জমাট বাঁধা একরাশ কষ্ট,
“আমি শাস্তি দিতে পেরেছি ইশা তোর খুনিকে তার যোগ্য শাস্তি দিতে পেরেছি। এবার তোর আত্মা শান্তি পেয়েছো নিশ্চয়ই।”
তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে এলেনা, তার চোখে কোনো ভাবান্তর নেই, কেবল শীতল কাঠিন্য। আকাশে হঠাৎ এক তীব্র বিদ্যুৎ চমকে উঠলো, যা এক মুহূর্তের জন্য কবরস্থানের সব আবছায়া দূর করে দিল—যেন এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। পরক্ষণেই ঘন মেঘের গর্জন। এলেনা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে ইয়াশকে দু’হাতে ধরে টেনে তুলল।শান্ত গলায় বললো,
“এবার চলো রাত হয়েছে অনেক। সেই কখন থেকে এখানে বসে রয়েছো! ঠান্ডা লেগে যাবে।”
ইয়াশ কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মাঝে মিশে ছিল এক গভীর শূন্যতা । হঠাৎই সেই শূন্যতাকে ছাপিয়ে বিস্ফোরিত হলো এক অপ্রত্যাশিত বাক্য,
“Will you marry me?”
আকাশ চিরে নেমে এলো ভারী এক বজ্রপাত, যেন প্রকৃতিও এই প্রশ্নের আকস্মিকতায় কেঁপে উঠলো। আর তার পরমুহূর্তেই শুরু হলো ঝমঝম করে টিপটিপ বৃষ্টি।
ইয়াশের দিক থেকে এমন বাক্য শুনে এলেনার চোখে একমুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ চমকে গেল, যা দ্রুতই আবার এক শীতল মুখোশে ঢেকে গেল। ইয়াশ বৃষ্টিভেজা, মরিয়া গলায় আবার বললো,
“লেটস্ গেট ম্যারিড। কথা দিচ্ছি, সারাজীবন আগলে রাখবো তোমায়।”
এলেনা কোনো অনুভূতি প্রকাশ না করে কাটকাট, পাথুরে গলায় উত্তর দিল,
“এটা সম্ভব নয়।”
ইয়াশের পা নড়ে উঠলো,এই প্রত্যাখ্যান যেন তার সব হিসেব উল্টে দিল।
“কিন্তু…. কেন?”
“যতদিন না নিজের বাবা মায়ের খুনিকে শাস্তি দিতে পারছি ততদিন নিজের জীবনের সাথে কাউকে জড়াতে চাই না।সম্পর্ক তৈরি করা সহজ। কিন্তু সেটা টিকিয়ে রাখা কঠিন। সেখানে দুজন বিপরীত ব্যক্তির একেঅপরের প্রতি অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়।”
“আমি সব দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত।”
“কিন্তু আমি পারবো না।”
“কিন্তু কেন?”
“কারণ আমার জীবনের লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা!”
“লক্ষ্য, লক্ষ্য, লক্ষ্য! তুমি কি ভালোবাসো না আমায়? আমার জন্য কি তোমার মনে একটুও ফিলিংস নেই?”
এলেনা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে।বৃষ্টির জল তাদের দু’জনকেই ভিজিয়ে একাকার করে দিচ্ছে।ইয়াশ তার বাহু দু’টি তীব্রভাবে ঝাঁকিয়ে বললো ,
“চুপ করে আছো কেন? বলো!”
“না নেই!”
এক মুহূর্তের শীতল নীরবতার পর এলেনা চরম নির্লিপ্ততায় উত্তর।
যেন ইয়াশের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। এলেনা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির জল তাদের দুজনের চোখের জল হয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকলো।
ইয়াশের কণ্ঠস্বরে গভীর যন্ত্রণার ফিসফিসানি।
“যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে কাল রাতে সেসব কি ছিল? আমার তো হুশ ছিল না। কিন্তু তুমি…… আটকালে না কেন আমায়!”
“ইটস্ এন্ড এক্সিডেন্ট! যা হয়েছে ভুলে যাও। মনে রাখার মতো ততটাও স্পেশাল কিছু ছিল না!”
“এক্সিডেন্ট!…… ভুলে যাবো….. এতো, এতো সহজেই ভুলে যাবো? সত্যিই স্পেশাল কিছু ছিল না!”
ইয়াশের মুখটা বিস্ময় আর যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো সামান্য তাচ্ছিল্য মাখা হাসি। সে হাসির সাথে তার শরীরটা দুলে উঠলো, যেন তীব্র মানসিক ধাক্কায় সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। বৃষ্টির জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল তার চোখের জল। সে পড়ে যেতে নিলে এলেনা দ্রুত তাকে আগলে নিতে চাইলে ইয়াশ হাত উঁচু করে তাকে ইঙ্গিত দিয়ে থামিয়ে দিল।
“পাগলামি কোরো না ইয়াশ। চলো এখান থেকে। তুমি জানো আমি যতদিন না, নিজের বাবা মায়ের খুনিকে…..”
“খুনি, খুনি, খুনি…”
ইয়াশ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলো।
“আমি তো বলছি আমি তোমার পাশে আছি, থাকবো, আর সারাজীবন থাকতে চাই। তাহলে কিসের এতো দ্বিধা তোমার?”
এলেনার চাপা, ভারী স্বরে সে বললো,
“সত্যিটা জানলে হয়তো তুমি আর আমার পাশে থাকবে না।”
“কিসের সত্যি? কি এমন সত্যি যা জানলে সবকিছু উল্টেপাল্টে যাবো! জানতে চাই আমি। আমি ওয়ান্ট টু নো।”
তার চিৎকারের আজ যেন বিদ্যুৎও গর্জন করে উঠছে।
“সত্যিই জানতে চাও?”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫১
“হ্যাঁ হ্যাঁ জানতে চাই। কে তোমার বাবা মায়ের খুনি? কে সেই ব্যক্তি? যাকে নিয়ে এত লুকোচুরি!”
এলেনা চোখ তুলে ইয়াশের চোখে চোখ রাখল। বৃষ্টির জল তার মুখের কাঠিন্য ধুয়ে মুছে দিতে পারলো না। দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক নীরবতার পর তার ঠোঁট নড়ে উঠলো, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সেই শব্দটি পাথরের মতো ভারী
“AJ. উরফ্ আরাত্রিক জেইন চৌধুরী……”
ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশে গর্জে উঠলো চরম ভারী এক বজ্রপাত, যেন প্রকৃতির বুক ফেটে গেল। তার পরেই চারপাশ ডুবে গেল এক নিস্তব্ধতায়।
