প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৯
রাত্রি মনি
রোম শহরের গোধূলিবেলা যেন কোনো বিষাদগ্রস্ত কবির কবিতার মতো সুন্দর। সন্ধ্যার ফিকে আলো যখন শহরের প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর ওপর এসে পড়ে, তখন দিন আর রাতের সেই মিলনক্ষণে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
হোটেল অরেলিয়াস প্রাইভ।
শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে কিছুটা দূরে, আভিজাত্য আর নির্জনতার এক মিশেল। হোটেলের বাইরে ছোট ফোয়ারা থেকে ঝরে পড়া পানির রিনিঝিনি শব্দ যেন চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি মোহগ্রস্ত করে তুলেছে। হোটেলের ভেতরে পা রাখলেই অনুভূতির রং বদলে যায়। মেঝেতে বিছানো পাতলা কার্পেট আর দেয়ালে ঝোলানো ধ্রুপদী চিত্রকর্মগুলোর মাঝে মিশে আছে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। হলঘরের মাঝখানে সাজানো সাদা লিলির তীব্র অথচ স্নিগ্ধ সুবাস বাতাসের স্তরে স্তরে মিশে আছে।
বারান্দার কাঁচের দরজাটা আলতো করে সরাতেই এক ঝলক শীতল হাওয়া ঘরে ঢুকে এল। সাদা পাতলা পর্দাগুলো সেই বাতাসে কখনো ফুলে উঠছে, আবার কখনো শান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ছে মেঝেতে। বারান্দার রকিং চেয়ারে একা বসে আছে রিশাব। পরনে তার অ্যাশ রঙের চেক শার্ট আর লুজ ফিটেড ব্যাগি জিন্স। পরিপাটি আন্ডারকাট দেওয়া চুলগুলো এখন অবিন্যস্ত, এলোমেলো। হাতের সিলভার ব্রেসলেটে খোদাই করা ‘R’ অক্ষরটি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝিকমিক করছে। দুই আঙুলে পরানো স্টার্লিং সিলভারের আংটি দুটো সে অন্যমনস্কভাবে ঘোরাচ্ছে।
রিশাবের উজ্জ্বল হলুদাভ ফর্সা চেহারায় এখন খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর চোখে এক গভীর ক্লান্তি। তার কৃষ্ণগহ্বরের মতো কালো চোখ দুটো শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রোম শহরের ইট-পাথরের দেওয়ালগুলোর দিকে। প্রতিটি ইটের আড়ালে যেন আজ এক একটা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস জমা হয়ে আছে। বাইরে থেকে সে যতটা শান্ত, ভেতরের দহন ঠিক ততটাই প্রলয়ংকরী।
তার মনের ভেতর এখন কেবল একটিই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— রিম। তার সেই মায়াবিনী, তার ‘ব্লু ফেইরি’।
সেদিন জঙ্গলে রিমের লোকেশন ট্র্যাক হওয়ার পর রিশাব ভেবেছিল এবার সব অপেক্ষার অবসান হবে। কিন্তু ভাগ্য যেন তার সাথে নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে।
একদিন রিশাব রিমকে একটি ছোট্ট নীল পাথরের পেন্ডেন্ট দিয়েছিল, যার ভেতর অতি সূক্ষ্ম একটি ট্র্যাকার বসানো ছিল—সেই সিগন্যালটাই ছিল তার একমাত্র আশা। জাদের সহকারী এলবো যখন ইতালির সেই রহস্যময় জঙ্গলে সিগন্যালটা পেয়েছিল, রিশাব ভেবেছিল আর মাত্র কয়েকটা প্রহর। কিন্তু মুহূর্তেই সেই সিগন্যাল অদৃশ্য হয়ে গেল। যেন কোনো এক যাদুর চাদর রিমকে দুনিয়ার সব রাডারের আড়ালে ঢেকে দিল।
সিগন্যালটা এখন ‘আউট অফ রিচ’। তবুও রিশাব হাল ছাড়ার পাত্র নয়। ইতালির প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিটি গোপন আস্তানা আর দুর্ভেদ্য জঙ্গলে সে তার চর এবং প্রহরী নিয়োগ করেছে। কিন্তু রিম যেন এক অধরা কুয়াশা, যাকে ছোঁয়া যায় কিন্তু ধরা যায় না। রিশাব বুঝতে পারছে, রিম এমন কোনো এক জায়গায় আছে যেখানে পৃথিবীর সাধারণ কোনো নিয়ম খাটে না।কিন্তু যেভাবেই হোক, এই শহর, এই জঙ্গল কিংবা ওই পাহাড়ের বুক চিরে হলেও সে তার নীলপরীটাকে খুঁজে বের করবেই। এবার যদি দেখা হয়, তবে আর কোনো মুক্তি নেই; এবার শুধুই চিরস্থায়ী বন্ধন।
আচমকা রুমের ডোরবেলের শব্দে দীর্ঘ ধ্যানভঙ্গ হলো রিশাবের। এই অবেলায় কে আসতে পারে তা তার অজানা নয়, তাই বারান্দার রকিং চেয়ারে বসেই নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল,
“কামিং।”
দরজা ঠেলে নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করল মাহিন। সে ধীরপায়ে এসে রিশাবের পেছনে দাঁড়াল। বারান্দা থেকে বাইরের আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, সন্ধ্যার তারাগুলো একে একে ফুটে উঠেছে। রোম শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে রাতের মায়াবী আলো। দূরের গির্জা থেকে গম্ভীর স্বরে ঘণ্টার ধ্বনি ভেসে আসছে, যা পরিবেশকে আরও বেশি বিষণ্ণ করে তুলেছে।
গত চার বছর ধরে মাহিন রিশাবের ছায়ার মতো সাথে আছে। সে তার স্যারকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। এক সময় যে রিশাব প্রাণখোলা হাসিতে ঘর মাতিয়ে রাখত, আজ সে এক জীবন্ত পাথর। কোথা থেকে এক মেয়ে এসে রিশাবের সাজানো জীবনটা ওলটপালট করে দিল। নিজের গর্ভধারিণী মায়ের সাথেও রিশাবের এখন যোজন যোজন দূরত্ব। মায়ের অপরাধ, রিমের পরিবারের সামাজিক মর্যাদা বা ‘স্ট্যাটাস’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা। রিম ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, আর এটাই ছিল রায়হানা জাওয়াদের কাছে অযোগ্যতা। তিনি রিমকে অপমানের পরেই রিশাব পিতৃভিলা ছেড়ে নিজের উপার্জিত ডুপ্লেক্স বাড়িতে উঠে আসে—যে বাড়িটি সে সাজিয়েছিল রিমের সাথে সংসার করবে বলে। সবাই বলে রিম বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে, কিন্তু রিশাবের মন বলে তার ‘ব্লু ফেইরি’ কোনো বিপদে আছে।
“স্যার, আপনার মা কল করেছিলেন,”
মাহিন নীরবতা ভাঙল।
“তিনি জানতে চেয়েছেন আপনি কবে বাংলাদেশে ফিরবেন। ম্যাডাম আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন। আমার মনে হয় তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। আপনি একবার কথা বলুন স্যার, উনি তো আপনার মা!”
রিশাব উদাসীন গলায় প্রশ্ন করল,
“তুমি কী বলেছ?”
“আমি বলেছি আমি কিছু জানি না। কিন্তু স্যার, নিজের মায়ের সাথে এভাবে অভিমান করে শুধু শুধু কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই মাহিনের পকেটে থাকা ফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে নাম— ‘মিসেস রায়হানা জাওয়াদ’। মাহিন কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“স্যার, ম্যাডাম নিজেই কল করেছেন। আপনি কথা না বললে আজ সারারাত উনি আমাকে কল করে জ্বালিয়ে মারবেন। ওনার কল দেখলেই আমার কলিজা শুকিয়ে যায়, ডেনজারাস লেভেলের মহিলা উনি!”
রিশাব বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে নিল। কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই অতি চেনা মমতা মাখানো কণ্ঠস্বর,
“বাবু…!”
মুহূর্তেই রিশাবের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। কতদিন পর এই ডাক! ইচ্ছে করছিল মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে— ‘খুব ভালোবাসি মা, আমাকে একটু আদর করে দাও।’ কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বেরোল না। তার নিশ্চুপতা দেখে ওপাশ থেকে রায়হানা জাওয়াদ কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আমার সাথে কথা বলবি না বাবু? বাড়ি ফিরে আয়। তোর বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। তোর জেদের জন্য ভেবেছিলাম ওই মেয়েকে মেনে নেব, কিন্তু দেখ সে তো বিয়ের আগেই পালিয়ে গেল। এখনো তুই ওই মিডল ক্লাস মেয়েটার জন্য মায়ের সাথে অভিমান করে আছিস?”
‘মিডল ক্লাস’ শব্দটা শোনামাত্রই রিশাবের আবেগের দেওয়াল ভেঙে সেখানে রাগের আগুন জ্বলে উঠল। সে কঠোর স্বরে বলল,
“জাস্ট স্টপ মা! কাকে মিডল ক্লাস বলছ তুমি? ভুলে যেও না তুমি নিজেও একদিন সাধারণ পরিবার থেকেই এই বাড়িতে এসেছিলে। আজ জাওয়াদ গ্রুপের মালকিন হয়ে অন্যকে অপমান করার অধিকার পাওনি। হঠাৎ পাওয়া সম্পদ মানুষকে সত্যিই অমানুষ করে তোলে।”
“রিশাব! আমি তোর মা হই… আমাকে এভাবে বলতে পারলি?”
রায়হানা জাওয়াদের কণ্ঠ বেদনায় বুজে এল।
“তুমি পারলে আমি কেন পারব না? আমি তো তোমারই ছেলে। রাখছি, আর আমাকে ডিস্টার্ব করবে না।”
কথাটুকু বলেই রিশাব ফোনটা কেটে দিল। এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল মায়ের সাথে সব মিটিয়ে নেবে, কিন্তু বুঝল এই আভিজাত্যের অহংকার কোনোদিন যাবে না। রিশাবের রাগী চেহারা দেখে মাহিন বিচলিত হয়ে পড়ল।
“স্যার, কী হয়েছে? ম্যাডাম কী বললেন?”
রিশাব দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ওই মহিলার সম্পর্কে আর একটা কথাও আমি শুনতে চাই না মাহিন। উনি কেবল সম্পদ আর স্ট্যাটাস চেনেন, নিজের ছেলের সুখ নয়। উনি আমার মা হতেই পারেন না!”
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরের এক কোণে পাথর হয়ে বসে আছে রিম। তার হৃদয়ে আজ কোনো অনুভূতি নেই, নেই কোনো চাঞ্চল্য। জানালার পাশে স্টাডি টেবিলটাকে আঁকড়ে ধরে সে তাকিয়ে আছে বাইরের ধূসর জগতের দিকে। এই ঘরটি আধুনিকতার সর্বোচ্চ শিখরে আসীন, প্রতিটি কোণ বিলাসবহুল আভিজাত্যে মোড়ানো—তবুও রিমের কাছে এটি একটি সুসজ্জিত কারাগার ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে আনন্দ নেই, কোনো রঙিন স্বপ্ন নেই; আছে কেবল এক বিষাক্ত যন্ত্রণা। মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, এই পুরো জীবনটাই হয়তো একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন, যা ঘুম ভাঙলেই মিলিয়ে যাবে। কিন্তু রুক্ষ বাস্তবতা প্রতি মুহূর্তেই তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, এই বন্দিত্বই তার নিয়তি।
জানালার ওপারে গোধূলির আকাশ আজ রক্তিম আভা ছড়িয়েছে। লাল-কমলা রঙের সেই মায়াবী স্রোত যেন নদীর মতো বয়ে গিয়ে সাগরের বুকে আছড়ে পড়ছে। স্টাডি টেবিলের ওপর রাখা সেই পুরনো কালো ডায়েরিটা—রিমের নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র নীরব বন্ধু। ডায়েরির সাদা পাতাগুলোতে সে জমা করে রাখে তার মনের সমস্ত না-বলা কথা, দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো। এটি তার সুখের স্মৃতিগুলো যেমন আগলে রাখে, তেমনি তার চোখের জলকেও ধারণ করে নিঃশব্দে।
আজ সারাদিন অন্ন স্পর্শ করেনি রিম। তার জেদ একটাই—সে এই কক্ষের চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে আর বন্দি রাখতে চায় না। দীর্ঘ তিন মাস কেটে গেছে এই অরণ্যের পেন্ট হাউসে, অথচ বাইরের জগতের সাথে তার সমস্ত যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে গেছে। এখান থেকে পালানো প্রায় অসম্ভব। পুরো জঙ্গলজুড়ে এজের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়; একটি শুকনো পাতা নড়লেও সেই খবর পৌঁছে যায় সেই ‘মনস্টার’-এর কানে। পেন্ট হাউসের চারপাশে বারো ফুট উঁচু দুর্ভেদ্য প্রাচীর, যার মাথায় বসানো আছে ধারালো কাঁচের টুকরো। এই দেয়াল ডিঙিয়ে বাইরের আকাশ দেখার জো নেই।
কিন্তু একবার সে পালাতে প্রায় সফল হতে চলেছিল।আশ্চর্যজনক ভাবে সেদিন পেন্ট হাউসের মেইন গেটটা কোনো এক কারণে খোলা ছিল। সেই সুযোগে নিজের চারটে ওড়না একসঙ্গে গিঁট দিয়ে দড়ি বানিয়ে বারান্দা থেকে নিচে নেমে এসেছিল সে। রক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল জঙ্গল পেরিয়ে। কিন্তু সেই মুক্তি ছিল ক্ষণিকের। বারবার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়েছে। তবে রিম দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। এবার যে করেই হোক পালাতে হবে তাকে। তার জন্যই তো এত নাটক। তার কথা পেন্টহাউসের বাইরে যাবে না। কিন্তু এ ঘর থেকে বাইরে বের হতে দিতে হবে তাকে।
হঠাৎ দরজায় কোনো শব্দ ছাড়াই কক্ষে প্রবেশ করল এক রুশ তরুণী। প্রায় পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির সুউচ্চ গড়ন, দুধে-আলতা গায়ের রঙ আর পিঠ অবধি ছাঁটা বাদামি চুল।এলেনাকে দেখে রিমের ঠোঁটে এক চিলতে মলিন হাসি ফুটে উঠল। এখানে আসার পর থেকেই এলেনাকে দেখছে রিম। তাকে ছোট বোনের মতো স্নেহ করে এলেনা। রিম মনেও তার জন্য রয়েছে বড় বোনের মতো শ্রদ্ধা, কিন্তু বিস্ময় জাগে এটা ভেবে যে—এত স্নিগ্ধ একটা মেয়ে এই অন্ধকারের জগতে পা রাখল কী করে?
মখমলের বিছানায় আয়েশ করে বসে এলেনা মৃদু স্বরে বলল,
“সার্ভেন্টরা জানালো তুমি নাকি সারাদিন কিছুই খাওনি। রিম, তুমি কি এখনো বোঝোনি যে ও তোমাকে কোনোদিন নিজের থেকে আলাদা হতে দেবে না? তবে এই বৃথা জেদ কেন?”
রিম জানালা দিয়ে বাইরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি তো আকাশছোঁয়া কিছু চাইনি! শুধু চেয়েছি এই চার দেয়ালের দমবন্ধ করা বন্দিত্ব থেকে মুক্তি। একটু খোলা আকাশ দেখা কি খুব বড় অপরাধ?”
এলেনা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
“না, অপরাধ নয়। কিন্তু এর আগেও তো তুমি পালানোর চেষ্টা করেছ। মুক্তি পেলে যে তুমি আবারও নিরুদ্দেশ হবে না, তার কী গ্যারান্টি?”
“আমি বুঝে গেছি এখান থেকে পালানোর পথ দুর্ভেদ্য। যে নৃশংস কালো ছায়া আমার পিছু নিয়েছে, তার থেকে নিস্তার কেবল মৃত্যুতে। আমি আর পালাবো না, কারণ আমি জানি তোমরা আমাকে খুঁজে বের করবেই।”
এলেনা ম্লান হেসে রিমের চিবুক ছুঁয়ে বলল,
“রিম, এই বন্দিত্বই হয়তো তোমার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। যেদিন এটা বুঝবে, সেদিন আজকের এই দিনগুলোর জন্য বড় আফসোস হবে তোমার।”
“কক্ষনো না!” রিমের চোখ জ্বলে উঠল।
“যেখানে রাত নামলেই মানুষের আর্তচিৎকার শোনা যায়, যেখানে মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়—সেটা কখনো কারো নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে না। এটা নরক! তুমি একজন মেয়ে হয়ে এই নিকৃষ্ট জীবন কিভাবে বেছে নিলে? তোমার বাবা-মা কি দুশ্চিন্তা করেন না?”
“আমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই, রিম।”
কথাটা শোনামাত্র তড়াক করে মাথা তুলে তাকাল রিম।মনে হলো, সামান্য এই কয়েকটা শব্দের গভীরে এক মহাসমুদ্র সমান বিষাদ আর অপ্রকাশিত যন্ত্রণা লুকানো রয়েছে। এলেনা বলতে লাগল,
“আমার বয়স যখন পনেরো, তখন কার এক্সিডেন্টে ওরা প্রাণ হারান।”
এলেনা থামল। তার গলার স্বরে এক হিমশীতল শূন্যতা। “দুর্ঘটনা বললে ভুল হবে।ওটা ছিল এক সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমার বাবা ছিলেন ইতালির মাফিয়া হান্টারদের প্রধান সহযোদ্ধা; একজন আপসহীন পুলিশ অফিসার।”
রিম বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠে অবিশ্বাসের সুর,
“তুমি একজন ন্যায়নিষ্ঠ পুলিশ অফিসারের মেয়ে হয়েও এই নিকৃষ্ট মানুষটার ছায়ায় আছো?”
এলেনার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক বিষাদমাখা করুণ হাসি।
“ভাগ্যের পরিহাস! দুর্ঘটনার সময় আমি বাবা-মায়ের সাথে ছিলাম না বলে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আজ মনে হয় মৃত্যু সেদিন আমাকে ছেড়ে দিলেও দুর্ভাগ্য ছাড়েনি। বাবার মৃত্যুর পর দেশ তাকে সম্মান দেয়নি, দিয়েছে ‘বিশ্বাসঘাতক’ উপাধি। রটে গেল বাবা নাকি মাফিয়াদের গুপ্তচর ছিলেন। যে মানুষটা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি, তার রক্তমাখা শরীরের ওপর লেপে দেওয়া হলো অপবাদের কালি।এটা কি তাঁর প্রাপ্য ছিল, রিম?”
এলেনার চোখে এক ফোঁটা অশ্রু টলমল করে উঠল। রিম স্তব্ধ হয়ে দেখল, সবসময় কঠিন ও ভাবলেশহীন থাকা এই মেয়েটির চোখেও জল আসে! রিম মৃদু স্বরে বলল,
“তুমি কাঁদছো?”
এলেনা দ্রুত আড়ালে মুছে নিলো চোখের জল। সত্যিই তো কেন কাঁদছে সে? কান্নার বিলাসিতা তাকে মানায় না।সে আবার বলতে লাগল,
“বাবা-মা যাওয়ার পর আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বাড়ি—সব প্রশাসন আর মাফিয়ারা কব্জা করে নিল। আমাকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হলো। ফুটপাতে না খেয়ে দিন কাটাতাম। সেখানেই একদিন মাত্তেও-র সাথে দেখা। ১০ বছরের এক অনাথ শিশু, যে ক্ষুধার জ্বালায় খাবার চুরি করতে গিয়ে দোকানদারের মার খাচ্ছিল। তাকে আমি নিজের কাছে টেনে নিয়েছিলাম।”
এলেনার দৃষ্টি এবার জানালার বাইরের অন্ধকারে স্থির হলো।
“এক বর্ষণমুখর রাতে এক নেশাগ্ৰস্থ ছেলে আমার সাথে জোড়জবড়দস্তি করতে শুরু করে। আগেও অনেকে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সেদিন সে ছিল উন্মত্ত। ছোট্ট মাত্তেও আমাকে বাঁচাতে এলে ওর মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত করে দেওয়া হলো। সেই নির্জন রাতে আর্তচিৎকার শোনার মতো কেউ ছিল না।সেদিন আমি বুঝেছিলাম, নিজেকে রক্ষা করার দায় শুধু আমারই। নিজের চুলের ক্লিপটা গেঁথে দিয়েছিলাম লোকটার চোখে, প্রচণ্ড এক লাথিতে ওকে ভূপাতিত করলাম। হঠাৎ আমার ভেতরটা যেন কোনো হিংস্র পশুর মতো জেগে উঠল। হাতের কাছে পড়ে থাকা লোহার রড দিয়ে ওর পেটে আঘাত করলাম। প্রথমবার আমার দুহাত ভিজে গেল উষ্ণ রক্তে। মুহূর্তেই লোকটা নিস্তেজ হয়ে এল।”
এক মুহূর্ত নিরব থেকে এলেনা আবার বলতে শুরু করল,
“সেদিন ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এজের কালো গাড়িটা। ও সবটা দেখেছিল। সেখান থেকেই ও আমাকে আর মাত্তেও-কে তুলে নিয়ে আসে।তারপর ও আমাদের এমনভাবে গড়ে তুলে যেখানে রক্তমাংস থাকলেও কোনো অনুভূতি নেই, আছে শুধু নৃশংসতা।”
রিম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। নিজের কষ্টের পাহাড়টাকে এতক্ষণ অনেক বড় মনে হচ্ছিল তার, কিন্তু এলেনার জীবনের দহনকালের তুলনায় তা যেন নিছক ধূলিকণা। রিম অন্তত যন্ত্রণার সময় পাশে পরিবারকে পেয়েছে, কিন্তু এলেনা? একাকী এক কিশোরী এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর রাজপথে লড়েছে ক্ষুধার সাথে, হায়েনাদের লোলুপ দৃষ্টির সাথে। রিম বুঝতে পারল, কেউ জন্মগতভাবে হিংস্র হয় না; এই নির্দয় পৃথিবীই মানুষকে একসময় পাথরে পরিণত হতে বাধ্য করে। বারবার আঘাত পেতে পেতে একটা কোমল হৃদয়ও কখন যে বর্মে ঢাকা পড়ে যায়, তা কেউ টেরও পায় না।
নিজের বুকের গভীরে চিনচিনে ব্যথাটা আড়াল করে এলেনা স্বাভাবিক গলায় বলল,
“একটু পর মেইড খাবার নিয়ে আসবে, খেয়ে নিও। শুধু শুধু জেদ করে শরীরটা অসুস্থ করো না। এজে জানতে পারলে ভীষণ রেগে যাবে, আর তার সেই রাগের মাশুল গুনতে হবে অন্য কাউকে। তুমি নিশ্চয়ই চাও না তোমার জন্য কোনো নিরীহ প্রাণ ঝরে পড়ুক?”
রিম ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলল,
“ওই মানুষটা একটা নিকৃষ্ট জানোয়ার। মানুষের প্রাণ নেওয়া ওর কাছে নিছক একটা খেলা!”
এলেনা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
“উহু, তুমি যেমনটা ভাবছো তেমনটা নয় রিম। মানুষ জন্ম থেকে দয়ামায়া বিসর্জন দেয় না। আমার যেমন একটা অতীত আছে, ওরও তেমন একটা গল্প আছে। হয়তো সেটা আরও বেশি রক্তঝরা, আরও বেশি মর্মান্তিক।”
“পরিস্থিতির দোহাই দিও না এলেনা।তোমরা চাইলেই আলোর পথ বেছে নিতে পারতে। কিন্তু তোমরা অন্ধকারের নেশায় বুঁদ হয়ে আছো। কারোর অতীত খারাপ মানেই এই নয় যে তাকেও হিংস্র হতে হবে।”
এলেনা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“তুমি এজেকে কখনো বোঝার চেষ্টাই করোনি। এজে হলো কালো মলাটে মোড়ানো এক বন্ধ ডায়েরি; যার বাইরেরটা দেখে ভেতরের হাহাকার বোঝার কোনো উপায় নেই। যদি সাহস করে একবার পাতাগুলো উল্টে দেখতে, তবে প্রতি পাতায় এক নতুন রূপ আবিষ্কার করতে। পুরো পৃথিবীর কাছে ও নিষ্ঠুর হলেও তোমার কাছে ও ভীষণ কোমল। আমি দেখেছি, তুমি যখন ছিলে না, ও তখন ছিল এক জীবন্ত পাষাণ মূর্তি। কিন্তু তুমি আসার পর সেই পাথরটাও স্পন্দিত হতে শুরু করেছে। যাকে দেখলে মানুষের আত্মা কেঁপে ওঠে, তুমি তার চোখে চোখ রেখে কথা বলো, রাগ দেখাও, এমনকি গায়ে হাতও তোলো—অথচ ও নির্লিপ্তভাবে সব সহ্য করে নেয়। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে পৃথিবীর মাটি থেকে তার চিহ্ন মুছে যেত। তুমি কি জানো, কাল সারারাত দু চোখের পাতা এক না করে ও তোমার সেবা করেছে?”
রিম বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুমি কি ওই লোকটার হয়ে সাফাই গাইছো?”
“না আমি শুধু বাস্তবটা বলছি। ওকে যদি এই অমানুষের খোলস থেকে কেউ বের করে আনতে পারে, তবে সেটা একমাত্র তুমি। ও ভালোবাসার কাঙাল রিম, একটু ভালোবেসেই দেখো না!”
“ওনার মতো জানোয়ারকে ভালোবাসা যায় না,যায় কেবল ঘৃণা করা।”
এলেনা এবার করুণ হেসে ধীর গলায় বলল,
“হাহ্! আজ এই কথা বলছো। ঘৃণা করো তো। দেখো এমন দিন যেন না আসে, যেদিন আজকের এই অবহেলার জন্য তোমাকে আফসোস করতে হয়। হয়তো একদিন তুমি নিজেই এই মানুষটাকে পাওয়ার জন্য, তাকে একটু ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। কিন্তু সেদিন হয়তো তাকে হাতের নাগালে পাবে না।”
“এমন দিন কোনোদিন আসবে না।”
রিমের ত্বরিত জবাব কক্ষের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় মৃদু করাঘাত করে একজন মেইড। তার হাতে সযত্নে সাজানো খাবারের ট্রলি। মেইডের ঠিক পেছনেই ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে এজে। তার অবয়বে এক দুর্ভেদ্য গাম্ভীর্য, চোখেমুখে আভিজাত্যের ছাপ। এক হাত পকেটে গুঁজে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; পরনে সেই চিরচেনা কালো স্যুট। দেখে মনে হচ্ছে, বাইরের কোনো জরুরি কাজ বা অন্ধকার জগতের কোনো সিদ্ধান্ত সেরে এইমাত্র পা রাখল সে।এজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এলেনা নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। কিন্তু দরজার চৌকাঠ পেরোনোর আগেই এজের বজ্রকঠিন কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দিল,
“কাল সকালের মধ্যে যেন আলেস্সান্দ্রোর কাছে ওর ‘স্পেশাল গিফট’টা পৌঁছে যায়।”
এলেনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“পৌঁছে যাবে। এজ সুন এজ পসিবল।”
এক মুহূর্তের জন্য দুজনের দৃষ্টির বিনিময় হলো, যার আড়ালে লুকিয়ে রইল কোনো এক ভয়াবহ পরিণতির সঙ্কেত। এরপর এলেনা দ্রুতপায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল। মেইড ট্রলি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো।যথাস্থানে রেখে নিঃশব্দে ত্যাগ করল কক্ষ। এজে তখনো দরজায় কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, সে এবার ধীরৈ, মাপা কদমে রিমের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক অদ্ভুত শিকারি আভিজাত্য। এজে যতই কাছে আসছে, রিমের বক্ষপিঞ্জরের ধুকপুকানি ততই তীব্র হচ্ছে। এক অজানা আশঙ্কায় মেয়েটা যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। এজে রিমের এই অস্থিরতাটুকু তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করল, তারপর ঠোঁটের ফুটে উঠল এক রহস্যময় বাঁকা হাসি।
“উফ্! আমাকে দেখে এত অস্থির হচ্ছ কেন বলতো? এখনো তো কিছুই করলাম না। যদি কিছু করি তাহলে তো…… বাট তোমার এই ছটফটানি… আই লাইক ইট!”
রিম রাগী চোখে কটমট করে তাকাল। তার দ্রুত নিঃশ্বাসের ওঠানামা করছে।ভেতরে ভেতরে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে। এজে রিমের ক্রোধটুকু বেশ মজার সাথেই উপভোগ করছে। সে আবার শয়তানি হেসে বলল,
“উফ্! রাগলে তোমাকে যা লাগে না! ইচ্ছে করে…”
বলেই নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল এজে।
“থাক, বলব না। পরে আবার তুমি লজ্জা পাবে।”
এই লোকটার লাগামহীন কথা আর উদ্ধত আচরণ রিমের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে এই জানোয়ারটাকে এখনই কুপিয়ে শেষ করে ফেলতে, কিন্তু সেই শক্তি তার নেই। রিম কোনোমতে বিছানার চাদরটা মুচড়ে ধরে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। অবচেতনেই সে দাঁত দিয়ে নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। এটা তার অভ্যেস। রেগে গেলে ঠোঁট কামড়ে ধরে। যার কারণে তার ঠোঁটের নিচে থাকা সেই ছোট্ট কুচকুচে কালো তিলটা আরও বেশি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠল।
রিমের এই রণচণ্ডী রূপ কামড়ে ধরা ঠোঁট আর তার নিচের তিল! মুহুর্তেই নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো এজের। সে এক লম্বা শুকনো ঢোক গিলল, যার সাথে তার গলার অ্যাডামস অ্যাপলটা একবার ওঠানামা করল।ঠোঁটদ্বয় সামান্য ফাক করে আবারো টেনে নিল শ্বাস। যেন নিজের ভেতরে বাড়তে থাকা আগ্নেয়গিরিটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে তারও। উফ্! বুকের ভেতরে কিছু একটা জ্বলছে। এই মেয়েটার অবুঝ প্রলোভন তাকে জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দিচ্ছে। আর কতদিন নিজেকে এভাবে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়? তার সহ্যের সীমা যে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।এজে গাঢ় স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
“এভাবে নিজের ঠোঁট বাইট করো না বেবিগার্ল। ‘ইউরজেস টু টাচ’… নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে!”
রিম ভ্রু কুঁচকে, ঘনঘন পলক ফেলে একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকাল। তার এই অদ্ভুত জিজ্ঞাসু চাহনি, সহজাত সারল্য,যা তাকে এই মুহূর্তে ভীষণ ‘বাচ্চা বাচ্চা’ আর মায়াবী করে তুলেছে। এজের মাথা ঝটকা মেরে উঠলো। তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো যেন ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে। এই মেয়েটা প্রতি মুহূর্তে তাকে নতুন করে দেওয়ানা বানাচ্ছে।
মেয়েটা কি জানে তার এই চোখের পলক ফেলা, এই মোহনীয় দৃষ্টি এজের কলিজায় কতটা দহন সৃষ্টি করছে? না জানে না। জানলে হয়তো তাকে এভাবে পোড়াতো না! রিম যখন দূরে ছিল, তখন তাকে একটু কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এজে জ্বলেছে প্রতি মুহূর্তে; আর এখন, এত কাছে পেয়েও তাকে আপন করে ছুঁতে না পারার যন্ত্রণা তার চেয়েও সহস্র গুণ বেশি পীড়াদায়ক। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল।
গলায় কিছুটা কাঠিন্য এনে বলল,
“সারাদিন খাওনি কেন? চুপচাপ খেয়ে ওষুধগুলো নিয়ে নাও। কাল সারারাত তো আমায় জ্বালিয়ে মেরেছ, আজও কি তেমন কোনো প্ল্যান আছে নাকি?”
কথা শেষ করে সে এক চোখ টিপে বাঁকা হাসল।রিম রাগে দাঁত কিড়মিড় করে ভেতরের আক্রোশ চেপে ধরল।
“আমি মুক্তি চাই।
মুহূর্তেই এজের চোখের মণি দুটো রক্তাক্ত বর্ণ ধারণ করল। সে চোখ বুজে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। এই মুহূর্তে সে রিমের সামনে রুদ্রমূর্তি ধারণ করতে চায় না। হিমশীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
“পাবে না।”
“আমি পেন্টহাউস ছেড়ে চলে যেতে চাইনি। শুধু এই দমবন্ধ করা ঘরের দেয়াল থেকে বের হতে চাই।”
এজে এক মুহূর্ত কিছু একটা ভাবল, তারপর গম্ভীর স্বরে জানাল,
“ঠিক আছে। এখন থেকে তুমি এই ঘরের বন্দী জীবন থেকে মুক্ত। আজ থেকে তুমি পুরো পেন্টহাউসেই ঘুরে বেড়াতে পারবে।”
রিমের ভেতরে তখন আনন্দের হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি এই পাষাণ হৃদয় মনস্টারটা এত সহজে রাজি হয়ে যাবে। তার মানে পালানোর রাস্তা এখন আরও প্রশস্ত হলো। এজে বাঁকা হেসে তারপর বললো,
“তবে মনে রেখো, এবার যদি পালানোর চেষ্টা করো, তবে এমন ভয়াবহ শাস্তি দেব যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলতে পারবে না তুমি।বারবার তোমাকে ছেড়ে দেব না বার্বি ডল। আমি কোনো ভালো মানুষ নই, আই এম আ ব্যাড বয়!”
“জানি।
রিমের তৎক্ষণাৎ জবাব। এজে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
“তোমার থেকে ভালো কেউ চেনে না আমায়। এই জন্যই তো ফিদা তোমার উপর আমি। তোহ্ তোমার শর্ত তো মেনে নিলাম। এবার চুপচাপ খেয়ে নাও। আর আমাকে একটু শান্তি দাও।”
রিম খাবারের ট্রলির দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
“এসব খাব না আমি। এইসব বিদেশি খাবার ভালো লাগেনা আমার। বমি পায়।”
এজে যেন আগে থেকেই জানত এমনটা হবে। সে সহজ স্বরে বলল,
“ওকে, খেতে হবে না। আমি তোমার পছন্দের বিরিয়ানি নিয়ে আসছি।
রিম এবার সত্যিই অবাক হলো,
“আপনি কী করে জানলেন বিরিয়ানি আমার প্রিয় খাবার?”
এজের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে রিমের খুব কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“শুধু বিরিয়ানি নয়, তোমার ব্যাপারে এমন অনেক কিছুই আমি জানি যা হয়তো তুমি নিজেও জানো না।”
রিমের বুকের ধুকপুকানি কেন জেনো বেড়ে গেল। সে বিস্ময়ে বিড়বিড় করল,
“মানে?”
“নাথিং। তুমি অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুনি আসছি।”
এজে বেরিয়ে যেতেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল রিম। জ্বরের কারণে সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকতে হয়েছে তাকে। শরীরটা যেন নিজের নয়—ভেতরটা ফাঁকা, দুর্বলতায় কাঁপছে। সন্ধ্যার দিকে একটু অস্থির লাগছিল বলে ডায়েরি খুলে বসেছিল, কিছু লিখলে হয়তো মাথার ভেতরের ভারটা হালকা হবে—এই আশায়।
কিন্তু সারাদিন গোসল করা হয়নি। শরীরটা ভারী, আঠালো লাগছে। এই অবস্থায় রাতে ঘুম আসবে না, সে জানে।
শেষমেশ সমস্ত শক্তি জড়ো করে হাঁটি হাঁটি পায়ে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের দিকে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে মুখ বেঁকিয়ে উঠছে তার—পায়ের ক্ষতগুলো এখনো শুকায়নি। ব্যান্ডেজের নিচে চাপা ব্যথা যেন নতুন করে জেগে উঠছে। তবু থামে না সে।কোনোমতে ওয়াশরুমে ঢুকে ঝর্ণার নিচে দাঁড়ায়। শীতল পানির ধারা গায়ে পড়তেই শরীরটা একটু কেঁপে ওঠে। দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে রিম। মনে হয়, সবকিছু ভেসে যাক—ব্যথা, ভয়, ক্লান্তি, স্মৃতি। ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে ঠান্ডা ফ্লোরে। জলের স্রোত গড়িয়ে পড়ছে তার চুল, কাঁধ, শরীর বেয়ে—কিন্তু সে নড়ছে না।সময় যেন থমকে গেছে।
বিশ মিনিট… পঁচিশ… প্রায় ত্রিশ মিনিট হতে চলল।
সে সেই একইভাবে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। একসময় জ্বরের ঘোরে অবশ হয়ে আসা মাথাটা আস্তে আস্তে একপাশে হেলে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই নিস্তেজ দেহটা লুটিয়ে পড়ে ওয়াশরুমের ফ্লোরে।
এদিকে, রুমে ফিরে রিমকে দেখতে না পেয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে এজের। হাতে তার গরম বিরিয়ানির প্লেট—নিজের হাতে বানিয়েছে। একসময় একা থাকাকালীন নিজের জন্য নিজেই রান্না করত সে। বিরিয়ানিটাও ভালোই বানাতে পারে। বিশেষ একজনের জন্যই শিখে রেখেছিল এই রেসিপি।ওয়াশরুম থেকে ভেসে আসা অবিরাম পানির শব্দ শুনে এজে বুঝতে পারল রিম ভেতরে। সে বাইরে শান্ত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু সময়ের কাঁটা যখন বিশ মিনিটের ঘর ছুঁল, তখন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মনে শঙ্কা জমে; কোনো বিপদ হয়নি তো? অস্থির পায়ে সে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
নরম স্বরে বলল,
“ফায়ারফ্লাই… ভেতরে কী করছো তুমি? ওপেন দ্য ডোর।”
কোনো শব্দ নেই।এবার ভয়টা রীতিমতো চেপে বসে।
উন্মাদের মতো দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে সে।
“তুমি যদি না বের হও, আমি কিন্তু দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়বো।”
তবুও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। এজের ভয় প্রতি সেকেন্ডে বাড়তে থাকে। সে উন্মাদের মতো দড়জায় আঘাত করে লাগলো। শেষমেষ উপায় না পেয়ে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় দরজাটা খুলে যায়।চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।রিম পড়ে আছে ওয়াশরুমের ফ্লোরে। ঝর্ণার পানি ঝিরঝির করে পড়ছে তার নিস্তেজ শরীরের ওপর।ভিজে রিমকে এক অদ্ভুত অসহায় শ্বেতশুভ্র মূর্তির মতো লাগছে। মাথার ভেতর যেন সবকিছু ফাঁকা হয়ে যায় এজের।এই মেয়েটা এমন কেন? এত হেয়ালিপনা কেন তার?আসলেই একটা বাচ্চা। বড় হলেও কোথাও যেন বড় হয়নি।দু’পায়ে এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নেয় তাকে।রিমের গায়ের তপ্ত ছোঁয়া এজের বুকে লাগতেই, তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। কান দুটো লাল হয়ে উঠল, নিঃশ্বাস হয়ে এল প্রগাঢ়। মেয়েটা যেন অবুঝের মতো তার সমস্ত ইন্দ্রিয়তে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।একদিন সত্যিই অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে সে। ঝাপসা চোখে তাকায় রিম। ঠোঁট কেঁপে ওঠে। অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিস করে বলে,
“ছুঁবেন না আপনি আমাকে… ছাড়ুন…”
এজের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
“চুপ! একদম চুপ!আর একটা কথা বললে এখানেই আসল কাজ সেরে ফেলবো বলে দিলাম। বুঝেছ? অনেক সহ্য করেছি। আর না!”
রিম কিছু বলতে চায়, কিন্তু মুখ দিয়ে আর শব্দ বের হয় না। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।এজে ঝর্ণা বন্ধ করে তাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে।নিজেও ভিজে গেছে সে—কিচেন অ্যাপ্রন জড়ানো শরীরে। ভেজা অবস্থাতেই বিছানার পাশে আধশোয়া করে শুইয়ে দেয় রিমকে। ওয়াকি-টকি তুলে ডাকে মহিলা সার্ভেন্টকে।ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢোকে সে। হাতে এখনো ব্যান্ডেজ বাঁধা।
“ওর ড্রেস চেঞ্জ করে শরীর মুছিয়ে দাও।”
কথাটা শুনে মহিলা আত্মা শুকিয়ে গেল।এই লোকটা নিজেই ড্রেস চেঞ্জ করতে বলে, আবার নিজেই শাস্তি দেয়, ছোঁয়ার অপরাধে। মাথায় আসলেই সমস্যা আছে।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড? আমি কী বললাম শুনতে পাওনি? চেঞ্জ হার ড্রেস।”
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে চমকে ওঠে মহিলা।
“আমার হাতে ব্যান্ডেজ, স্যার… অন্য কাউকে…..”
এজে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাতেই তার বাকি কথা টুকু গিলে ফেলে সে।ড্রেস চেঞ্জ করলে হয়তো ছোটখাটো শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু কথা না শুনলে এর চেয়েও ভয়ংকর শাস্তি পেতে হতে পারে, এমনকি মৃত্যুদণ্ড। মহিলাটি কাঁপা কন্ঠে বলে,
“ঠিক আছে স্যার। আপনি বাইরে যান আমি করে দিচ্ছি।”
এজে বেরিয়ে যায়। নিজের রুমে গিয়ে ঢিলেঢালা ট্রাউজার আর টিশার্ট পরে নেয়। ফিরে এসে দেখে—রিমের পোশাক পাল্টানো, শরীর মুছিয়ে দেওয়া হয়েছে।তাকে দেখামাত্রই দৌড়ে বেরিয়ে যায় সার্ভেন্ট।
রিম আধশোয়া হয়ে বসে আছে বিছানায়। চোখ খুলে তাকানোর শক্তিও নেই।এজে এসে বসে তার পায়ের কাছে।
“এই রাতে এভাবে ভেজার কী দরকার ছিল?”
কোনো উত্তর নেই।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরিয়ানির প্লেট তুলে নেয় এজে।
“হা করো।”
“খাব না…”
“খেতে হবে। না খেলে ওষুধ খেতে পারবে না।”
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৮
ধীরে ধীরে হা করে রিম। তর্কে জড়ানোর শক্তি নেই।তাড়াছা খাওয়া হয়নি সারাদিন। ক্ষিদে পেয়েছে প্রচুর।
দু’নিবালা যাওয়ার পর তৃতীয়বারে পেট উলটে আসে। গরগর করে বমি করে দেয়—সোজা এজের বুকের ওপর। সদ্য পরা টিশার্ট নষ্ট। মুখে বিরক্তি ভাব ফুটে ওঠে এজের।বাচ্চা জন্ম না দিয়েই বাচ্চা পালাতে হচ্ছে তাকে।
নিপুণ হাতে সব পরিষ্কার করে রিমকে ওষুধ খাইয়ে দিল এজে। রিম ভারী কমফোর্টারের নিচে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। তার মুখাবয়বে এখন সেই স্নিগ্ধতা, যা ভোরের আলোর চেয়েও পবিত্র। রিম তো ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু সে কি জানে—একজনের বুকের ভেতর দাবানল জ্বালিয়ে দিয়ে এই নিশ্চিন্ত নিদ্রায় মগ্ন সে? সারারাত হয়তো আর ঘুম আসবে না এজের।…………..
