Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৫

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৫

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৫
সাদিয়া সাদু

ভরা হাসপাতালে দিগন্তের গালে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে থাপ্পড় মারে জারুল ।
হাসপাতালের নিস্তব্ধ, শীতল পরিবেশে চড়ের তীক্ষ্ণ শব্দটি যেন বজ্রপাতের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য সমগ্র করিডোর স্তব্ধতায় নিমজ্জিত হলো। চিকিৎসক, নার্স, এমনকি অপেক্ষমাণ রোগীর স্বজনেরাও বিস্ময়াবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের দিকে।
জারুল এর বক্ষ তখন দ্রুত উঠানামা করছে। ক্রোধ, অভিমান, অপমান ও বহু বছরের দহন তার সমগ্র সত্তাকে প্রজ্বলিত করে তুলেছে। তার চোখদুটি রক্তিম, অথচ অশ্রুসজল। মনে হচ্ছিল, বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ের অতল গহ্বরে সঞ্চিত সমস্ত ক্ষোভ আজ এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়েছে।
অন্যদিকে দিগন্ত সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিজের গালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে বিস্ময়, অপমান এবং এক অজ্ঞেয় প্রশ্নের ছায়া। সে বুঝতেই পারছিল না, ঠিক কোন অপরাধের জন্য এই আকস্মিক আঘাত তার প্রাপ্য হলো।
জারুল কাঁপতে থাকা ঠোঁট ধীরে ধীরে নড়ে উঠল।

— ‘যে মেয়েটার পরিচয় জানতে এত ব্যাকুল হয়ে উঠেছ, যে শিশুটির বাবাকে নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখিয়েছ, সেই মানুষটা তুমি, দিগন্ত ! তুমি-ই তার বাবা!’
কথাগুলো উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই
যেন সময় তার গতি হারিয়ে ফেলল।
দিগন্তের দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে স্থির হলো ছোট্ট মেয়েটির মুখে। এতক্ষণ যে সাদৃশ্যটিকে কেবল কাকতালীয় ভেবেছিল, এখন সেটিই নির্মম সত্য হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েটির তার কার্বন কপি । চোখ , ঠোঁট
এমনকি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিটুকুও তার নিজের শৈশবের প্রতিচ্ছবি।
তার মুখের সমস্ত রক্তিম আভা নিমেষেই ম্লান হয়ে গেল। বুকের ভেতর যেন এক অদৃশ্য ভূমিকম্প শুরু হলো। জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য সত্যটি তাকে মুহূর্তের মধ্যে নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ ও নির্বাক করে দিল।
এদিকে জারুল এর হৃদয়েও বয়ে চলেছে আরেক ঝড়।
বহু বছর আগে এই মানুষটিই তাকে ভুল বুঝেছিল, তাকে একাকীত্বের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছিল। সেই থেকে প্রতিটি রাত্রি, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি সংগ্রাম তাকে একাই বহন করতে হয়েছে। মাতৃত্বের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সে দিন পার করেছে, রাত পার করেছে; কিন্তু কোনো দিনও তার সন্তানের কাছে বাবার অনুপস্থিতির শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি।
আজ সেই মানুষটিই তার সন্তানের পরিচয় জানতে চাইছে!
কী নির্মম পরিহাস!
কী নিষ্ঠুর নিয়তি!
জারুল এর চোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেই অশ্রুর মধ্যেও ছিল তীব্র ক্ষোভের দীপ্তি।
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।

_’ আল্লাহর দোহাই লাগে এইবার আমাদের পিছু ছাড়ো তুমি । তুমি তোমার পরিবার আমাকে ভেঙ্গে ছুঁড়ে গুড়িয়ে দিয়েছো এখন আমার মেয়েটাকে কেড়ে নিয়ো না ‌ , আমাদের ভালো করে বাঁচতে দাও ।‌’
কথাগুলো যেন প্রতিটি শব্দে দিগন্তের হৃদয়ে তীক্ষ্ণ শলাকার ন্যায় বিদ্ধ হতে লাগল।
সে এক পা এগিয়ে এল, কিন্তু তার পদক্ষেপে ছিল দ্বিধা, অনুশোচনা এবং অসহনীয় মানসিক বিপর্যয়।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারই রক্তের উত্তরাধিকার, অথচ শিশুটি তাকে চেনে না, তাকে বাবা বলে ডাকে না, এমনকি তার অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়।
এর চেয়ে নির্মম শাস্তি আর কী হতে পারে?
হাসপাতালের সেই শীতল কক্ষটিতে তখন দুটি মানুষের অনুভূতির সংঘর্ষ চলছিল—একজনের বহু বছরের জমাটবাঁধা অভিমান, আরেকজনের আকস্মিক উপলব্ধির নিঃশব্দ বিপর্যয়।
দিগন্ত এক বার আশপাশ ভালো করে লক্ষ্য করে সবাইকে চলে যেতে ইশারা করে।
দৃঢ় পায়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায় । কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খাই । দিয়া ডাগর ডাগর চোখে অচেনা ব্যক্তিকে দেখে ঘাবড়ে মায়ের দিকে তাকায় । চোখেমুখে ভেসে উঠে ভয়ের ছাপ ।
দিগন্ত মেয়েকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার অংশ ।
_’ সরি মা ‌ , আ’ম সরি ‌ ।’
ছোট দিয়া ঠোঁট উল্টে কান্না জোড়ে দেয় । হকচকিয়ে উঠে জারুল আর দিগন্ত ‌ ।
জারুল তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যায় , কিন্তু দিগন্তের বাহু থেকে আলাদা করতে পারে না ।সে আস্তে করে মেয়েটাকে পরখ করে ।
কোমল গলায় বলল

_’ কোথাও ব্যথা পেয়েছো ?’
দিয়া ফোঁস ফোঁস করে কান্না কান্না ভাব নিয়ে বলে ‘না’ ।
দিগন্ত মুখটা কাঁদো কাঁদো করে ফেললো।
_’ তোমার মা আমাকে মারে এ্যাঁ এ্যাঁ । ‘
এতো বড় লোক কে এইভাবে পানি ছাড়া কান্না করতে থেকে হতবাক ছোট দিয়া ।
পাশ থেকে জারুল চ সূচক শব্দ করে , খানিক টা লজ্জাও পায় । দিগন্তের ফর্সা গাল লাল হয়ে আছে , পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট।
দিয়া এইবার অচেনা ব্যক্তিকে কান্না করতে দেখে শান্তনা স্বরুপ বলল ‌
_’ আমালেও মালে । তাক কাননা কোরো না।’
দিগন্ত এইবার মেয়েকে কোলে তুলে নেই ।
অসুস্থ মেয়েকে কোলে তুলে নেওয়ার ঘাবড়ে যায় মা মেয়ে দু’জন ।
দিয়া দিগন্তের পুরো মুখ ছোট ছোট হাতে স্পর্শ করে বলে ‌ ।
_’ তুমি কি আমাল পাপা ? ‘
দিগন্ত অবাক ‌ ‌। তাকে ছিনল কি করে ‌! তাকে তো চিনার কথা না ‌। সে তো ভেবেই নিয়েছে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে মেয়েকে পাপা ডাক শিখানোর জন্য, সে ঘাড় ঘুরিয়ে জারুল এর দিকে তাকা। সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ‌ ।
দিগন্ত এইবার একটু হাসে যাক মেয়েটা এতো কিছুর পর ও তাকে তার সন্তানের চোখে খারাপ বানাই নি । তার হৃদয় হিমালয়ের পাদদেশের মতো ঠান্ডা হয়ে গেলো ।
দিগন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে জরুল চর হাত চেপে ধরে ‌ ‌ হাঁটা ধরে ।

_’ কোথায় যাচ্ছি? ‘
_’ আমার বাড়িতে । ‘
জারুল হাত ছাড়তে ছাড়তে বলল ‌
_’ সরিই ওই বাসায় আমি আর কাজ করবো না । ছাড়ুন । ‘
দিগন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল জারুল এর দিকে । শান্ত চাহনি ‌ ‌। গম্ভীর মুখে বলল
_’ দেখো মেয়ের সামনে অতীতের কিছু বলতে চাচ্ছি না । যা বলছি চুপচাপ করো ।‌’
জারুল ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলল ‌।
_’ সময় হলে আমার জায়গা আমি বুঝে নিবো । ‘
হনহনিয়ে বেরিয়ে আসে জারুল ।
দিগন্ত তার দিকে একবার তাকিয়ে আবারো মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ।
_’ তোমার মা আমাকে বকে এ্যাঁ এ্যাঁ। ‘
দিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে ।
_’ আমালেও এ্যাঁ এ্যাঁ। ‘
জারুল নাক মুখ কুঁচকে বাপ মেয়ের দিকে তাকাল একবার ।

এসি করা বিশাল ড্রয়িংরুমের মার্বেল ফ্লোরে খট খট করে হেঁটে বেড়াচ্ছেন ৭৫ বছরের জহুরা খান । তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে জিসা ‌। চোখেমুখে রয়েছে কান্নার চাপ , গালে রয়েছে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ ‌ ।
জাহুরার পরনে দামি জামদানি, গায়ে সোনার গয়না। কিন্তু চোখে-মুখে রাজ্যের অস্থিরতা। তাই মাথায় চেপে বসিয়েছেন মোটা আইস প্যাক। দামি ফ্রিজের বরফ গলে গলে পানি হয়ে কপাল বেয়ে নামছে। মাথার রগগুলো টনটন করছে টেনশনে।
অস্থিরতায় ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে পায়চারি করছেন। পায়ের নিচে দামি কার্পেট, হাতে হীরার আংটি, কিন্তু শান্তি নেই এক ফোঁটা।
আইস প্যাকের ঠান্ডা আর টেনশনের গরমে শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। মুখে বিরবির করে কী যেন বলছেন।
_’ নানুমনি , দিগন্তকে সব কিছু বলার আগে আমাদের রাস্তা থেকে এই ভিখারির বাচ্চাকে সরাতে হবে । দেখো আমাকে আজ চ*ড় মেরে কি করেছে ?’
জহুরা পাইকারি থামিয়ে বাঁকা হাসলো ।
মুখ বেঁকিয়ে বলে ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৪

_’ বললেও লাভ নাই । ওই মেয়েকে ধরতে পারবে না । কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি তার হাত ছাড়া হবে । এক টাকাও আমি তাকে দিবো না । আশা করি দিগন্ত এতো বোকামি করবে না । ‘
জিসা একটু এগিয়ে আসলো । ন্যাকামি করে বললে ‌ ।
_’ আমাকে যে চড় মারলো তুমি কিছু করবে না নানুমনি? ‘
_’ করবো তো । পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। তার পাখা আমি কেটে ফেলবো । জাস্ট ওয়েট এন্ড সী ‌ ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here