Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭১

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭১

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭১
জান্নাত নুসরাত

রাতের আঁধার কেটে মাত্রই ঝলমলে আলো ফুটেছে৷ সূর্যের রশ্মি ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, ধরণীর বুক আলোকিত করে ফেলল কয়েক মুহুর্তের মধ্যে। হঠাৎ দু-একটা গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে কানে। স্বানন্দে পৃথিবীর বুকে উড়ে চলা পাখিগুলো কিচিরমিচির স্বরে ডেকে উঠছে নিজেদের মতো। মিহি বাতাস বইছে প্রকৃতিতে। গতকাল রাতের বৃষ্টি পর একটু বেশিই সজীব সবকিছু মনে হচ্ছে। শীতল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিয়ে গেল রুমের ভেতর থাকা নুসরাতের গা। মন ভালো হওয়ার মতো আবহাওয়ায়ও মন ভালো নেই তার। সোফার উপর বসে থেকে ঝিমোচ্ছে। বাহিরের এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশে চোখে দেখার সুযোগ হলো না। বিছানার মধ্যে গা ঢেকে শোয়া আরশের জন্য। কথাটা ভাবতেই একবার চোখ তুলে তাকাল। যদি পারত এক্ষুণি একটা লাথি মেরে ফেলে দিত বিছানা থেকে৷ গতকাল হাজারবার বলেছিল কথা শোনার জন্য, শুনেছে? শুনেনি। এবার জ্বর বাঁধিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বেশ হয়েছে। ঘাড়ত্যাড়া মানুষদের এই পরিণতি হয়। ঠিক সময় আজ তার কথা শুনলে বিছানায় শুয়ে কুঁইকুঁই করতে হতো? হতো না! ফিটফাট ঘুম থেকে উঠে ঘুরতে ফিরতে পারত। কিন্তু নুসরাতের ভালো সহ্য হবে কেমনে এই ব্যাটার, তার তো অসুস্থ হয়ে পড়তে হতো। তাই এখন পড়েছে। খুব ভালো হয়েছে। বলেছিল গরম পানি দিয়ে গোসল সারার কথা, কিন্তু কানে কী কিছু তুলেছে। ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে যেভাবে আরশ বলেছিল,’কিছু হবে না!’ নুসরাত সেই কথা মনে করে মুখ ঝামটা মেরে ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলল”কিছু হবে না!’

কথা শেষে মুখ বাঁকাল। বিড়বিড় করল,” এখন দেখাশোনা করবে কে তোর ব্যাটা ম্যান্টা?এমনি কলাগাছের মতো লম্বা হয়েছে, মাথায় কোনো গিলু নেই। পাগল ছাগল সবগুলা। এই পরিবারের একটাও মানুষ হয়নি।
কথা শেষ হতেই হা হা করে হাচ্চি দিয়ে উঠল সে। নাক মুছে টিস্যু ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। আরশ হয়তো তার মধ্যে একবার চোখ খুলেছিল, নুসরাতকে পুরো রুম নোংরা করে রাখতে দেখে চোখের পাতা ঝাপ্টাল। ঝাপসা ঠেকছে সব৷ চোখ পুরোপুরি মেলে তাকাতে তাকাতে নুসরাত তার গোল গোল চোখ গুলো নিয়ে ঝুঁকে পড়ল আরশের দিকে। তা দেখে না চাইতেও হেসে ফেলল। বলল,”রুম নোংরা করছিস কেন?
সে কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না মানবী। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিল। যেন বলছে, আরো একশো বার রুম নোংরা করব, আপনার কী?
বিছানায় শোয়া আরশের গালে হাত ঠেকাল প্রথমে সে। তারপর কপালে,”বিয়ে একটা বকওয়াছ চিজ। বিয়ের মতো বকওয়াছ চিজ পৃথিবীতে দুটো নেইম মানুষ বিয়ের জন্য এত পাগল কীভাবে হয়? কয়েকটা কাপড়ের জন্য বিয়ের পীড়িতে বসে যায় কীভাবে? আমি আমার জীবনে যদি আবার বিয়ের সুযোগ পাই তাহলে বিয়ের সকল জিনিসপত্র নিয়ে মালামাল হয়ে যাব। তবুও বিয়ে করব না।
আরশ হাসছে। অন্য সময় হলে এত হাসত না। জ্বরের ঘোরে থাকায় একটু বেশি হাসতে দেখা গেল তাকে। রুমের ভেতর হিসহিস শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে,”বিয়ের মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস পৃথিবীতে দুটো নেই।

“কীভাবে?
“বিয়ে হতেই চিৎ হয়ে জামাইয়ের সাথে শুয়ে পড়তে হয়।
একটু থামল সে। জ্ঞান ঝাড়ার সুযোগ পেয়েছে তাই ঝেড়ে নিচ্ছে৷ আরশ জানে সে যদি সুস্থ থাকত, এতক্ষণে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দিত। হয়তো মানবতার খাতিরে কিছু করছে না৷ কানে ভেসে এলো,”একটু বেশি অশ্লীল শব্দ হয়ে যাচ্ছে, তাই না, আরশ ভাই?
আরশ মাথা দোলাতেই সে বলল,”বাসর জিনিসটাই অশ্লীল, তাহলে অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করলে কোনো সমস্যা আছে? আপনার সমস্যা হলে বলুন?
নুসরাতের প্রশ্নে নিভু নিভু চোখে তাকানো আরশ পূর্ণ সমর্থন দিল, অশ্লীল কিছু বললে সমস্যা নেই। সে ভাষণ দেওয়ার ন্যায় বলল,”বিয়ের পর জামাই চুটিয়ে আদর করল স্ত্রীকে, পরে জামাই অসুস্থ হয়ে পড়ল এটা কোথাকার আইন? অসুস্থ হওয়ার কথা তো, স্ত্রীর, স্বামী হবে কেন?
ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে যে তাকে খোঁচাচ্ছে সেটাই বুঝল আরশ, তবুও চুপটি করে শুয়ে নুসরাতের কথায় সহমত পোষণ করল। আরশের সামনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ভাষণ দেওয়া মানবী হঠাৎ থেমে গেল। আঙুল তুলে বিছানায় শোয়া আরশের গা ঘেঁষে বসল৷ বলল,”এক মিনিট, এক মিনিট… আরশ ভাই… আপনি ভদ্রলোকের মতো শুয়ে আছেন কেন?
বিস্ময় মাখা হাসি বেরিয়ে গেল না চাইতেও ঠোঁট দিয়ে আরশের। চোখের পাতা বহু কসরতে খোলা রেখেছে সে। পূর্ণ মনোযোগ নুসরাতের কথায়। মেয়েটা মুখ ঝুঁকিয়ে নিয়ে আসলো। বলল,”গতকাল রাতে এমন ভদ্রলোক হলে তো বিছানায় চিৎপটাং হতে হতো না। বলুন হতো?

আরশ দু-পাশে মাথা দোলাল। নুসরাত বলল,”সবসময় স্ত্রীর কথা শুনবেন। স্ত্রীরা যা বলে দিনশেষে তাই সঠিক বের হয়।
এবার আরশের গলার স্বর শোনা গেল। ভীষণ ক্ষীন,”তুই নিজেকে আমার স্ত্রী মানছিস?
কারেন্টের শক খাওয়ার মতো ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল সে। বলল,”আশ্চর্য, এই কথা আসছে কেন?! মিনি সিস্টার হিসেবে শুধু এডভাইস দিচ্ছি।
আরশ চোখ বন্ধ করে ফেলতেই নুসরাত আঙুল দিয়ে টেনে চোখগুলো মেলল। বলল,”এদিকে তাকান, এদিকে৷ আমার দিকে।
আরশ তাকাল। পূর্ণ দৃষ্টিতে। নুসরাত বুকে ধপ করে থাপ্পড় বসিয়ে বলল,”এখন এভাবেও তাকাতে হবে না, নরমালি তাকান।
থামল। আরশের দৃষ্টি সরল না। জ্বরের জন্য চোখের দৃষ্টি আরো গভীর হয়েছে৷ তার মধ্যে আবার পানি জমেছে। নুসরাত তোয়ালি দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিল। বলল,”বিগ সিস্টার হিসেবে দুটো কথা বলব, মন দিয়ে শুনবেন৷
মুখ মোছানো তখনো চলছে। কপালে রাখা কাপড়টা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিল। বলল,”জীবনে সবথেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কী জানেন?
আরশ জিজ্ঞেস করল না। নুসরাত বলল,”জিজ্ঞেস করুন, জিজ্ঞেস না করলে কীভাবে বলব?
নুসরাতের কথায় মুখ তুলে একবার তাকিয়ে শুধাল,“কী?
“মানুষের জীবনে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিস হলো বিয়ে।
আরশ সামান্য বিস্মিত হওয়ার ভান করল। মুখ দিয়ে না চাইতেও বাক্য উচ্চারণ হলো, “অহ মাই গড, বিয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিস?

নুসরাত মাথা দোলাল।।বলল,” আমার কথা শুনুন, কখনো বিয়ে করবেন না। বিয়ের মতো বকওয়াছ জিনিস, আর কিছুই নেই৷ আমি এই জীবন থাকতে কখনো আর বিয়ে করব না, আপনি করবেন?
আরশ হেসে ফেলল। নুসরাত ধাক্কা দিল গায়ে “ বলুন করবেন?
মাথা দোপাশে দুলিয়ে না করে দিল,”জ্বি না! এমন বকওয়াছ জিনিস একবারই করে আমি তৃপ্ত৷
নুসরাতকে কোনো কথা বাড়াতে দেখা গেল না৷ ডলে ডলে আরশের মুখ মুছিয়ে দিল। কপালে জলপট্টি ও দিল। আরশ সামান্য নড়তে গিয়ে বুঝল, পুরো শরীর জুড়ে তার ব্যথা। মৃদু স্বরে কুঁকিয়ে উঠল,” আ আ..!
মেয়েটা মুখ দিয়ে ত্যক্ত শ্বাস ফেলে বলল,”কাইকুই করছেন কেন? কী করবেন বলুন, আমি করে দিচ্ছি।
আরশ নিজের নাকের দিকে ইশারা করল। নুসরাত এমনভাবে নাক চূড়ায় তুলল, যেন দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজ করার কথা তাকে বলা হয়েছে। চোখের আকার সরু করে সরে যেতে গিয়েও গেল না। মিনমিনিয়ে বলল,”নাকে কী হয়েছে?

আরশ তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার দৃষ্টি এক মুহুর্তের জন্য যেন সরল না নুসরাতের থেকে। ড্যাবড্যাব করে সবসময় এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে হয় না। মৃদু শব্দে উচ্চারণ করল,” নাক পরিস্কার করব।
লাফ মেরে সরে যেতে গিয়ে পারল না, তার হাত আরশের মুঠিতে বন্দী,“তো আমি কী করব? আপনার হাত দিয়ে করুন।
“শরীরে, হাতে, পায়ে ব্যথা৷
“হাত দেখুন নাড়াতে পারেন নাকি!
আরশ দোপাশে মাথা দোলাল সে পারবে না হাত নাড়াতে। নুসরাত জানে সব নাটক। তার সাথে নটাংকী করছে এই লোক, তবুও অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,” এখন কী আমার আপনার নাক পরিস্কার করে দিতে হবে?
কথাটা ভেবেই ছি্হ করে উঠল। মুখের বিকৃতি ঘটিয়ে চেহারা সরিয়ে ফেলল। বলল,”পারব না, আরশ ভাই। অন্য কাউকে দিয়ে করান।

আরশের কথা বাড়ানোর মতো শক্তি হলো না। এই কথার বিপরীতে হাজারটা কথা বলতে পারত, আজ আর ইচ্ছে হচ্ছে না, ক্লান্তিরা ভীর করেছে৷ চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল। নুসরাত হাত বাড়াল, আর পিছুল। ঘৃণায় গা ঘিনঘিন করছে তার। মাথা দু-দিকে নাড়িয়ে ঝেড়ে ফেলার বৃথা প্রচেষ্টা চালাল। বিরক্তিতে তিতিয়ে উঠে বলল,” বলেছিলাম, বলেছিলাম, কথা শুনলে তো আজ নাক পরিস্কার করে দিতে হতো না। হয়েছে এখন? বুড়ো ব্যাটার নাক আমাকে পরিস্কার করে দিতে হবে। আপনি আসলেই সমস্যা৷
কথাটা শেষ করে কনিষ্ঠা আঙুল বের করে দিয়ে বলল,” পিংকি প্রমিস করুন কাউকে বলবেন না এই কথা।
আরশ ফট করে তার সরু কনিষ্ঠা আঙুল নিজের আঙুলে প্যাঁচিয়ে নিল। বলল,”প্রমিস।
নুসরাত বাঁ-হাত দিয়ে ভীষণ গাইগুই করে তার নাক পরিস্কার করে দিল। বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিল। আরশ সেটা দেখে না চাইতেও কুটকুটিয়ে হেসে উঠল। এত বছর ধরে জ্বালানোর সব শোধ তুলে নিবে ভাবল আজ একদিনে। তার ভাবনার ভেতরেই ওয়াশরুমে ছুটে যেতে দেখা গেল নুসরাতকে। পানি ছাড়ার শব্দ আসছে। ঘঁষে ঘঁষে হয়তো হাত ধোচ্ছে। ভেতরে দশ মিনিট যাবত চলল নুসরাত হাত ধোয়াধুয়ি। বাহিরে বেরিয়ে এসেই তার নাকের কাছে হাত ঝাড়া মারল।।তারপর নিজের নাকের কাছে হাত নিয়ে শুকতে শুকতে বলল,”গন্ধ করছে এখনো?
নিজে ভালো করে শুকে আরশের নাকের কাছে হাত চেপে ধরল,”দেখুন, গন্ধ করছে কী??
আরশ মানা করল। চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল,”সারাবছর-ই তো তোর সর্দি লেগে থাকে। একবার তো আমার শার্টে নাক মুছেছিলি, আমি কিছু বলেছিলাম?

“আপনি আর আমি এক?
কথা শেষ হতেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আরশ,“ এক না?
“অবশ্যই এক না, আপনি হলেন স্বামী, আমি হলাম স্ত্রী।
কথা বলতে বলতে এসে বিছানার কাছে বসে কপালে হাত রাখল। জ্বর নেমেছে কিনা পরীক্ষা করতে। সেই সুযোগে আরশ নিজের মাথাটা বালিশ থেকে সরিয়ে নুসরাতের কোলে রাখল। বলল,”কী স্বামী স্ত্রী-র গান লাগিয়ে রেখেছিস? হু? আপনি স্বামী, আপনি স্বামী…
নুসরাত কিছু বলতে যাবে আরশ তার শীর্ণ হাতটা টেনে ধরল। কথা বাড়ানোর সুযোগ দিল না। নিজের চুলের উপর হাতটা চেপে ধরে রেখে আদেশ দিল,”চুল টেনে দে। আর একটা কথা না৷ একটু ঘুমাব আমি।
আরশের কথা বিনা বাক্যে মেনে নিল। অন্য সময় হলে হাজারটা কথা বাড়াত সে। নিজের শীর্ণ হাতের লম্বা লম্বা আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিল সিল্কি চুলগুলোর গভীরে। আলগোছে টেনে দিল। সাধারণ দেখতে যতটা লম্বা দেখায় চুলের দৈর্ঘ্য তার থেকে বেশি লম্বা এখন মনে হলো নুসরাতের কাছে। পেটের কাছে গরম নিঃশ্বাস পড়ছে৷ ঘনঘন। একটু পূর্বে শব্দ করে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলেছিল আরশ, তা কানে এসে লেগেছে নুসরাতের। সে নিশ্চুপ বসে টেনে দিল তার চুল।

বাহিরে আবারো ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আরশ তখনো মাথা এলিয়ে শুয়ে৷ নুসরাতের পা অবস হয়ে আসছে সময়ের সাথে। নড়াচড়া ছাড়া এভাবে এক জায়গায় বসে থাকা তার কাছে যুদ্ধের মতো। সর্দির চোটে নাক মুছতে মুছতে লাল হয়ে গেছে। টিস্যুও হাতের কাছে নেই৷ কী করবে বোঝে পেল না, তাই হাতের কাছে থাকা আরশের তোয়ালি দিয়েই নাক মুছল। রুমের ভেতর খুব ধীরে ধীরে একটা গান বাজছে। গুমট ভাব দূর করার জন্য একটু পূর্বে আরশের মোবাইলে বাজিয়ে রেখেছে সে। তার নিজেরই ইচ্ছে করছে ধড়াম করে পড়ে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাতে। আফসোস তা সম্ভব না। আরশের মাথায় আবারো জলপট্টি দিতে গিয়ে চোখে পড়ল মোবাইল অনবরত বাজছে। সাউন্ড অফ থাকায় এতক্ষণ শুনেনি। হাতে তুলে নিয়ে কল পিক করল৷ কানে লাগাতেই অশ্লীল শব্দসহ, বিশ্রীভাবে চ্যাঁচিয়ে উঠল ইরহাম,”মাম্মায়ায়ায়ায়া… তোকে নাকি ছোট ভাইয়া খেয়ে দিয়েছে?
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মোবাইল দূরে সরিয়ে ফেলল নুসরাত। চিৎকার করে কথা বলে হে হে করে হাসছে। মনে হচ্ছে দুনিয়ার সব খুশি সে পেয়ে গেছে। নুসরাত মোবাইল কানে লাগাল না। লাউডে দিয়ে বলল,”তুই কী সৌরভিকে খেয়ে দিয়েছিস, এটা আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছি?
ইরহাম থতমত খেল কিছু সেকেন্ডের জন্য। সে ভুলে গেল কীভাবে, নুসরাতকে কিছু বলবে আর তাকে খালি হাতে ফেরাবে নুসরাত। পরমুহূর্তে খিটমিট করে হেসে উঠে বলল,”জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই বলতাম। জানতে চাস?
নুসরাত জানে ছেলেটা মজা করছে৷ তাই বলল,”ফোন রাখছি।

“রেখে দেখ…”
কথা কেটে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,”কী করবি তুই?
খ্যাক খ্যাক করে বিশ্রীভাবে হেসে উঠল। সৌরভিটার হাসির শব্দ আসছে। দুটো মিলে এই সাত সকালে তাকে জ্বালাতে কল দিয়েছে। ইরহাম শিয়ালের মতো খিকখিক করতে করতে বলল,”ক্যামেরা এক্সেস আছে কিন্তু, সব জাইন্না নিমু, দেইখা নিমু।
কর্কশ গলা ভেসে এলো নুসরাতের,”কী দেখবি তুই?
ইরহাম ভিডিও কল দিল নুসরাতকে। ভ্রু নাচিয়ে বলল,”সব।
“ক্যামেরায় কিছু না পেলে কীভাবে দেখবি তুইম
ভ্রু কুঁচকে বলল,” মানে?
হাত দিয়ে সব সরিয়ে দেওয়ার মতো দেখাল নুসরাত। ধীরে ধীরে, গলা নামিয়ে, ভীষণ গোপনীয়তার সাথে বলল,”সব ফিনিশ।
ইরহামের কথাটার মানে বুঝতে দু-সেকেন্ড লাগল না। সে জানে নুসরাত সব ডিলিট করে দিয়েছে। বিন্দুমাত্র স্কোপ রাখবেনা তাকে জ্বালানোর। কিন্তু ইরহাম তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্র না। চোখ দিয়ে ভালো করে দেখল কিছু পায় কিনা পিঞ্চ করার মতো। ভালোভাবে চোখ দাবিয়ে দেখার পর, হুহু করে উঠে বলে,”ওমায়ায়ায়া, দেখি স্বামী সেবা হচ্ছে।
নুসরাত দু ভ্রুর মাঝখানে ভাঁজ ফেলে বলল,”তোর সমস্যা?

সৌরভি পাশ থেকে দেখি দেখি বলে উঁকি দিল। তারপর বলল,’আসলেই, স্বামী সেবা হচ্ছে দেখি।’
এই দু-টোর কথা শোনার ইচ্ছে নুসরাত এই মুহুর্তে বিন্দুমাত্র নেই, তাই বলল,”রাখছি।
ইরহাম উঁহু উঁহু করে উঠল। চুকচুক করে উঠে বলে,”এটা নুসরাত না, নির্ঘাত কোনো পেত্নী ভর করেছে, না হলে নুসরাত, ছোট ভাইয়ের সেবা করবে, অসম্ভব! আমি বিশ্বাস করি না।
খ্যাট করে উঠে নুসরাত বলল,”তোর বিশ্বাসের ধার ধারে কে?
ইরহাম আঙুল তুলে একেবারে মোবাইলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দিল। শাসিয়ে বলল,”একদম আমার সাথে জবান চালাবি না। সম্মান দে, সম্মান৷ বিগ ব্রাদার হই তোর। গণে গণে তেরো দিনে বড়।
নুসরাত বিড়বিড় করে বলল,”তেরোদিন তোর পেছন দিয়ে ভরে দিব, শালা।
সাধারণ কথাবার্তা অন্যদিকে গড়াচ্ছে দেখে সৌরভি মোবাইল কেড়ে নিল। ঠোঁট টিপে হাসল৷ জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিতে কথা বললেও বিটকেলের মতো হাসছে মোবাইলের অপাশের মেয়েটা,”গতকাল রাতে তুই নাকি, ছোট ভাইয়ার সাথে ছিলি?

“তো?
“শুনলাম… উঁহু উঁহু মুরব্বি হয়ে গেছে।
নুসরাতের মুখের বিকৃতি ঘটল। এত টানা হ্যাঁচড়া কেন একটা বিষয় নিয়ে৷ সে তো তাদের এসব বিষয়ে গিয়ে খোঁচাখোঁচি করেনি, তাকে নিয়ে এত হা হা হিহি করছে কেন? দুনিয়ার আর কেউ কী বাসর টাসর করে না? নাকি তারাই একা করে ফেলেছে? পাপ করে ফেলেছে৷ গতকাল রাতে এখানে আসাই নুসরাতের মস্ত বড় ভুল ছিল, এবং দ্বিতীয় ভুল ছিল এই ইরহাম আর সৌরভির ফোন ধরা। দুটোকেই এখন বিষের মতো লাগছে তার কাছে। খ্যাক খ্যাক হাসির শব্দে মাথা ব্যথা করছে৷ তাই মুখের উপর ধপ করে ফোন কেটে মোবাইল রেখে দিল। আরশের গালে ঠাস করে একটা বসাতে গিয়ে বসাল না। অসুস্থতার জন্য ক্ষমা করে দিল। নাহলে আজ টুকরো টুকরো করে বাসিয়ে দিত সে এই লোককে।

আকাশের দিকে স্লান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইসরাত। শূণ্যতায় ভরপুর তার দৃষ্টিতে। আজকাল শূণ্যতাই সবদিকে তাত। যেদিকে তাকায় সেদিকেই মরুভূমির ন্যায় খা খা শূন্যতা। চুপচাপ বসে থেকে বাহিরে তাকিয়ে রইল। স্বাভাবিক স্বাস্থ্য কমে গিয়েছে বহু পূর্বে। দেহের অন্য অংশের তুলনায় পেট সামান্য উঁচু। নাকের ডগায় কিছু একটা হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে কী! অসুস্থতা কাভু করবে শীগগির তাকে। চোখ দুটো জ্বালাপোড়া করছে গতকাল রাত থেকে৷ আগের থেকে দিন দিন আরো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে৷ কারোর সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ রাখছে না৷ ফোন দিলেও ফোন ধরছে না। কেউ যখন জিজ্ঞেস করে কেন কল ধরে না, উত্তর দেয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এরপর আর কোনো কথা বাড়ানোর স্কোপ কেউ পায় না। নুসরাত সেদিন ফোন দিয়ে চোটপাট করল জায়িনের সাথে৷ ইসরাতের দিকে কী নজর রাখছে না সে। এই অবস্থা কেন? লিপি বেগমের চিন্তার শেষ নেই, দিন দিন এমন রোগা হয়ে যাচ্ছে কেন মেয়েটা? দেশ থেকে নিয়ে আসলো সুস্থ স্বাভাবিক, এখানে এসে এই অবস্থা কেন! জায়িনের সাথে কথা বললেও সে বলল,’মানিয়ে নিতে পারছে না।’

হেলাল সাহেবের মতামতে মানিয়ে নিতে পারবে না কেন? উনারা তো আপনজনই। জায়িনের দিকে সন্দেহপ্রবন দৃষ্টিতে এজন্য তাকিয়ে রইলেন। শুধালেন,”তুমি কোনোভাবে এতে জড়িত তো না?
কথার উত্তর না দিয়েই কেটে পড়েছে৷ ইসরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন,”দেশে যেতে চাইলেও বলো, বড় বাবা নিজে নিয়ে যাব।
ইসরাত মানা করে দিল মুখে। ভেতরে ভেতরে যাওয়ার জন্য তৎপর। মুখ ফুটে তবুও টু শব্দটি করল না। সময় এভাবে কাটছে। জীবন তাকে কত রঙ দেখাচ্ছে! ভেবেছিল কখনো এভাবে হবে সব কিছু? মোবাইলে টুং টাং শব্দ আসতেই হাতে মোবাইল তুলে নিল। দেখল ইরহামের পক্ষ থেকে কিছু ছবি এসেছে। বসে বসে দেখা ছাড়া তার কোনো কাজ নেই। রান্নার কাজ লিপি বেগমই করেন। তাকে হাত দিতে দেননা৷ প্রেগন্যান্সির আগেও কোনো কাজ করতে দিতেন না। বলেন,’তোমাকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য নিয়ে আসিনি এখানে।
বিবেকে বাঁধত বলে ইসরাত টুকটাক এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। এখন বিবেকে বাঁধে না এমন ও নয়। একবার সাহায্য করতে গিয়েছিল জোরালো ধমক দিয়েছেন৷ হাতের কাজ ছিনিয়ে নেন। সে চেষ্টা করলেও সেগুলো কার্যকর হয় না। বিকেলের দিকে হাঁটতে বের হোন সামনের স্ট্রিটে তাকে নিয়ে।

ইসরাত ছবিগুলো দেখা শেষে চোখ আটকাল নুসরাতের চেহারার দিকে৷ নুসরাত গিয়েছে চট্টগ্রাম সেটা কখন? মাথায় চাপ দিল, তার মনে পড়ল না। কপাল কুঞ্চিত হলো। নাকি গিয়েছে ওদের সাথে? সে কী আজকাল ভুলে যাচ্ছে সবকিছু? হাতের পাশে রাখা চশমাটা চোখে আটল। চোখ বোলাল ভালো করে মুখটায়। স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে ইরহাম। মুখ চোখ মেকি গম্ভীর করে রেখেছে। হয়তো ইরহাম বিরক্ত করছিল এজন্য। মেয়েটা ক্যামেরা এমনভাবে ধরেছে যেন তাকে পুরোপুরি দেখা যায়৷ কোলের উপর থাকা আরেকটা মাথা দেখতে পেল। চোখের আকার সরু হয়ে আসলেও, তা নিমেষেই কেটে গেল। আরশ ভাইয়া ছাড়া আর কেউ হবে না। এই পিকচার এর নিচে ইরহাম লিখেছে,”স্বামী সেবা করছে, বেচারি।
হেসে ফেলল৷ ইরহামকে মেসেজের রিপ্লাই দিল,”তো তোর কী হয়েছে?
“আমার কী হবে?
“ তাহলে পিঞ্চ মেরে কথা বলছিস কেন?
“পিঞ্চ করব না? ও আমাদের কখনো জলপট্টি দিয়েছিল?
ঠোঁট টিপে মুচকি হেসে লিখল,”চট্টগ্রাম থেকে এসে তুই ও অসুস্থ হওয়ার নাটক শুরু করে দিস, তাহলে তোকেও সেবা করবে।

“আমি সেবা পাওয়ার ভুখা নই।
ইসরাত ইমোজি দিল। ইরহাম আবার লিখল,”শোনো, নুসরাত ক্যামেরার সাথে ছ্যাঁড়ছাড় করেছে।
“কেন ছ্যাঁড়ছাড় করেছে?
“সে লজ্জার বিষয়, আমি বলতে পারব না।
“বললে সমস্যা কোথায়?
“আমি লাজুক একটা ছেলে, এসব বলতে পারব না৷
ইসরাত বিস্ময় প্রকাশ করতে গিয়ে হেসে ফেলল। ক্ষীণ শব্দ হলো রুমের ভেতর। সেই শব্দে বিছানায় শোয়া জায়িনকে সামান্য নড়তে চড়তে দেখা গেল। পাশ ফিরে শুয়েছে। উঠতে না দেখে আবারো চোখ ফিরিয়ে নিল মোবাইলের দিকে ইসরাত। লাজুক ছেলে লিখাটা চোখে ভাসলেই তার দমবন্দ হাসি এসে ঠোঁটে ভীরতে থাকল। ইরহামকে মেসেজের রিপ্লে দিতে যেতেই গোৎ গোৎ করে উঠল মোবাইল। চোখ বুলাতেই দেখল আহান কল দিয়েছে। ভিডিও কল। কল ধরতে সময় নিল। চোখের সামনে ধরতেই, কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল ছেলেটা। চোখ দাবিয়ে দেখল বোনের চেহারাটা। জিজ্ঞেস করল,”অসুস্থ তুমি?
দু-পাশে মাথা দুলিয়ে না করতেই আহান বলল,”মিথ্যা বলবে না। এই যে আমি দেখতে পাচ্ছি, তোমার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, অসুস্থ তুমি। মেডিসিন নিয়েছ?
কথা বলল না ইসরাত। হ্যাঁ বলতে যাবে, আহান বলল,”আবার মিথ্যা বলো তুমি, মেডিসিন নিলে এমন লাগছে কেন দেখতে?

কথা বলার শব্দ পেল না৷ এর মধ্যেই দুটো মেসেজ এসেছে ইরহামের তরফ থেকে৷ সামান্য দেখেছে ইসরাত৷ দেখেই বুঝে ফেলল কী শুধিয়েছে,”অসুস্থ তুমি? এখন জিজ্ঞেস করো না কীভাবে জানলাম? মেসেজের রিপ্লে দেওয়া দেখেই বোঝে গেছি।
আহান এখনো চেয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে। ইসরাত তাই বলল,”নিয়ে নিব৷ কী বলতে ফোন দিয়েছিস, সেটা বল?
আহান সময় নিল। গলার আওয়াজ নিচে নামাল একদম। ফিসফিসিয়ে বলল,”পরনিন্দা বহু আগে ছেড়ে দিয়েছে জানো তো সেটা, কিন্তু এমন জায়গায় পড়েছি পরনিন্দা না করে পাড় পাওয়া যাচ্ছে না৷
আরেকটু স্বর খাদে নামল,”একটু বলি, বলার মতো এখানে কাউকে পাচ্ছি না৷ আপু, আমরা তো তোমাদের নানারবাসায় গিয়েছি, সৌরভি আপুর নানুবাড়ি গিয়েছি, আবার আরশ ভাইদের নানাবাড়িতে ও গিয়েছি। উনারা ও তো মুরগী, হাঁস, গরু পালে, এত দূর্গন্ধ ছিল? না, কিন্তু এখানে এত দূর্গন্ধ, আমার ভেতরটা গুলিয়ে উঠছে৷ এত খাচ্চর, এত খাচ্চর মানুষ আমি আমার বাপের জন্মেও দেখিনি।
আহান আরো কিছু বলত আমিরা তার দিকে এগিয়ে এসেছে। তার মতো করেই বলল,”আপনি আবারো এসব বলছেন?

আহান খ্যাক করে ওঠল,”তো বলব না, খাচ্চোর মানুষদের পরিস্কার বলব?
ইসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,”জানো আপু, ওর ভাইয়েরা কি করেছে, আমার মাথার উপর একটা ঘটাং ঘটাং করা ফ্যান ছিল, ওইটা আত্মসাৎ করে নিয়ে গেছে৷ এই গরমে আমি, রিচ আহান, এভাবে আছি।
ক্যামেরা তুলে দেখাল সিলিং ফ্যান যে নেই। আমিরা বলল,”তো কী হয়েছে, একদিন ফ্যান ছাড়া থাকলে কী হবে? আমি তো হাতপাখা দিয়ে আপনাকে বাতাস করেছি।
উউ বলে নাক চূড়ায় তুলল সে,”বাতাস করেছ? সারারাত হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়েছো। খেয়াল আছে কিছু? আমি বাতাস করেছি তোমাকে।
মুখ ছোট হয়ে গেল আমিরার। ইসরাত দু-জনের ঝগড়া দেখছে৷ আহান থামল। হঠাৎ চোখ সরু হয়ে আসলো তার। বলল,”এক মিনিট একমিনিট,…
ক্যামেরার দিক থেকে তার চেহারা ঘুরল। কঠোর স্বরে শুধাল,”তুমি আমার মুখে মুখে তর্ক করছ? সাহস দেখি দিন দিন বাড়ছে তোমার।
মুখ গোঁজ করে আমিরা,”আপনি শুধু বলবেন, আমি বললেই তর্ক হয়ে যায়?
“জবান ফুটেছে দেখি তোমার? কাঁচির মতো ক্যাচ ক্যাচ করে চলতেই আছে তো আছে।
“ তো ফুটবে না৷

ইসরাত গালে হাত ঠেকিয়ে তাদের ঝগড়া দেখতে লাগল। দু-জন পাল্লা দিয়ে ঝগড়া করছে। একটুও ছাড় দিচ্ছে না। আমিরার মুখটা রাগে টসটস করে উঠছে৷ আহান নিজেও দেখা যাচ্ছে রাগে, ক্ষোভে হিসহিস করছে। এদের মধ্যে আরশ নুসরাতের প্রতিচ্ছবি দেখল সে। আমিরা চোখ রাঙাতেই আহান বলল,”চোখ নিচের দিকে, একদম আমার উপরে তুলবে না৷ আজ চোখ রাঙাচ্ছো, কাল ঠ্যাং মাথায় তুলতে দ্বিধা করবে না৷ চোখ নিচে।
আমিরা হিসহিস করে ইসরাতের দিকে তাকাল। বিচার দিল,”দেখুন আপু, দেখুন, সবসময় আমার সাথে এমন করে। আপনাকে বলে রাখলাম, এর বিচার আপনি করবেন৷
কথা শেষ করে ছলছল চোখে বেরিয়ে গেল পা দাপিয়ে। ইসরাত আহানকে জিজ্ঞেস করল,”ওকে এত জ্বালাস কেন? বাচ্চা মানুষ!

আহান চোখ টিপে হাসল। ইসরাত বলল,”তোর সাথে পরে কথা বলছি। আমি একটু শোব। শরীরটা ভালো না।
আহান মাথা দোলাল৷ বলল,”মনে করে ওষুধ খেয়ে নিও। রাখছি। আল্লাহ হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম!
দীর্ঘ এক সালাম দিয়ে ফোন রাখল আহান। ইসরাত উঠে যখন দাঁড়াল, মাথা ঘুরিয়ে উঠল। আশপাশ সব ঝাপসা হয়ে গেল। পা হড়কে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলাল। এত বড় দূর্ঘটনা ঘটে যেত, সেটা ভেবে চিৎকার করার কথা ছিল, তবুও সে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল, নিজের জন্য বরাদ্দ জায়গায়৷ এরপর কতক্ষণ কেটেছে তার হিসেব নেই ইসরাতের কাছে। যখন চোখ মেলে তাকাল তখন চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা। জায়িনের চেহারাটা ভাসছে একয়ু আধটু৷ স্ক্রিনে ভাসার মতো আধো আধো আলো। ঠোঁট দুটো টেনে হা করানোর চেষ্টা করছে। ইসরাত মুখ খুলল না। ঠোঁট, দাঁত চেপে ধরে রইল। জোরাজুরি কেন করছে? সেটা ভাবার সময় নেই তার, চোখ আবারো নিভে আসছে, কানের কাছে ভোঁ ভোঁ করে বাজছে,”চোখ খোলা রাখুন, ইসরাত৷ দয়া করে বন্ধ করবেন না। হা করুন, হা করুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি সব ঠিক করে দিব।
আওয়াজ বের হয় না মেয়েটার মুখ দিয়ে। ভাঙা উচ্চারণ হলো,”কে এএ এন?
জায়িন উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় আছে বলে মনে হলো না। হেলাল সাহেব তাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলেন, সে সরল না। চ্যাঁচাল,”হা করুন, ইসরাত। হা করুন। পাপা, ওকে বলুন মুখ খুলতে।
কানে ভেসে আসছে গুঞ্জন,”তুমি নিজে কী করছ তা খেয়ালে আছো? বাচ্চাটা মরে যাবে৷ এন্টিবায়োটিক খাইয়ে ফেলছ ওকে৷
গলার স্বর শোনা গেল জায়িনের। জালিমের মতো,”মরে যাক, ওকে বলুন হা করতে। চোখ খুলতে পারছে না। অবস্থা দেখছেন আপনি?

“তুমি আগে শান্ত হয়ে বসো।
“ শান্ত হবো কীভাবে? জ্বর দেখছেন? হুঁশ নেই। গত চার ঘন্টা যাবত পড়ে আছে এভাবে?মাত্র এসেছে, আবার চলে যাবে। তাড়াতাড়ি এটা খাওয়াতে হবে।
জায়িনের হাত চেপে ধরে ধাক্কা মারতে দেখা গেল বড় বাবাকে। শক্ত সামর্থ্য ছেলেকে সরাতে বেগ পোহাতে হলো তাকে। জায়িনের চেহারাটা বিমর্ষ। ছেলেকে ধমকাতে শোনা গেল,”নিজের হুঁশে আসো, বাচ্চা মারা যাবে। হেভ ইউ এনি সেন্স, নিজের বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছ তুমি? ইসরাত প্রেগন্যান্ট, তোমার বাচ্চা মরে যাবে।
জায়িনকে দাঁড়াতে দেখা গেল। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,”বাচ্চা কার? আমার না? আমাকে তাহলে বুঝতে দিন। বাচ্চা মরুক, বাঁচুক, আই ডোন্ট কেয়ার। ওর মুখ খোলান। নাহলে ও নিজে মরে যাবে। আমি বাঁচব কীভাবে ওকে ছাড়া পাপা? বোঝার চেষ্টা করুন। মুখ খোলান, প্লিজ। দয়া করে! বাচ্চা একটা গেলে দশটা আসবে, ইসরাত গেলে ইসরাত আর আসবে না। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব, এই মুহুর্তে আপনি শুধু ও’কে হা করান শুধু, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।

হেলাল সাহেব বললেন,”তুমি সামনে থেকে সরো। বুদ্ধি সব খুঁইয়ে ফেলেছ৷ নিজের মধ্যে আছো কিনা তার ঠিক নেই। আমি দেখছি, তুমি বের হও এখান থেকে। মানুসিক ভারসাম্যহীনের মতো আচরণ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। একটা জান এভাবে মেরে ফেলা এত সহজ? অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা আমি দেখছি।
জায়িনকে সরিয়ে দিতে চাইলেও তার সাথে পেরে উঠলেন না হেলাল সাহেব৷ কেচোর মতো প্যাঁচিয়ে বসে রইল ইসরাতকে। বাবা মায়ের বাঁধা মানল না, জোরজবরদস্তি করে মুখের ভেতর ওষধ ঢুকিয়ে দিতে চাইল। ইসরাতের ভেতর সামান্য জ্ঞান ছিল। তাই চেপে যখন মুখে ঢুকিয়ে পানি খাইয়ে দিতে চাইল তখন থু থু করে ফেলে দিতে চাইল।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭০

জ্বরে চেপে ধরা নরম শরীর কুলিয়ে উঠতে পারল না জায়িনের সাথে, আবারো চোখ বন্ধ করে ফেলল। অতঃপর জায়িনের হাজার ডাকে বিন্দুমাত্র সারা দিল না। সময় যত গড়াল তার অবস্থা ততো শোচনীয় হলো। রুমে দাঁড়িয়ে থাকা জায়িনের পায়চারি বাড়ল যেন আরো। মুখে হাত ঢুকিয়ে পাগলের মতো শুধু ছুটল। হেলাল সাহেব ততক্ষণে ডাক্তার আনতে ছুটেছেন। লিপি বেগম নিজেও পায়চারি করছেন জায়িনের সাথে। শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরল মাথায়, হঠাৎ করে এত জ্বর বাঁধাল কীভাবে মেয়েটা?

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here