Home প্রিয় বেলিফুল প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৮

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৮

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৮
উম্মে হাবিবা

​রাতের অন্ধকার মেহতাব ভিলার ওপর যেন এক বিশাল পাথরের মতো চেপে বসেছে। রুদ্র তার স্টাডি রুমের সোফাটায় শুয়ে-বসে ছটফট করছে।” এপাশ-ওপাশ করেও এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করতে পারছে না সে”। হাতঘড়ির সেকেন্ডের কাটার টিকটিক শব্দটা এই নিস্তব্ধ রাতে তার কানের কাছে হাতুড়ির মতো বাজছে।
নিজের হাতের দিকে তাকাল সে—গাঁট ফেটে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে, কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও হাজার গুণ বেশি তীব্র ব্যথা হচ্ছে তার বুকের ঠিক বাঁ-পাশে। রাগের মাথায় সোহাকে বলা প্রতিটি কথা এখন বিষাক্ত তীরের মতো তার নিজের দিকেই ধেয়ে আসছে।

‘চরিত্র নিয়ে কথা বলেছি আমি? সোহার?’—ভাবতেই রুদ্র দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরল। একি করল সে! কেন একটা বারও মেয়েটার কথা শুনল না? সত্যি কি মেয়েটা নির্দোষ? আমার বিশ্বাস কি এতোটাই ঠুনকো ওর প্রতি। রুদ্র আর ভাবতে পারলো না,, যে হাত দিয়ে ও সোহার চোয়াল চেপে ধরেছিলো, সেই হাতটা দিয়েই দেয়াল একের পর এক পাঞ্চ মারতে থাকে হাতের চামড়া ছিলে দেয়ালে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। তীব্র ব্যথা হয় তবে সেটা হাতের ব্যথা না মনে ব্যথা।
রৌদের ঘরের বারান্দায় কাঠের রেলিংটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সোহা। রাতের মধ্য প্রহরে বাতাসটা বড্ড বেশি হিমশীতল, কিন্তু সোহার ভেতরের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির সামনে সেই বাতাস কিছুই না। তার এলোমেলো চুলগুলো গালে-মুখে এসে পড়ছে।
চোখ দুটো এতক্ষণে কেঁদে কেঁদে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে ফুলে গেছে। গালটা এখনো টনটন করছে রুদ্রের শক্ত হাতের আঙুলের চাপে। তবে সেই শারীরিক ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে বাজছে রুদ্রের ওই তাচ্ছিল্যের হাসি আর বিষাক্ত শব্দগুলো__
“ঐদিন তমাল তোমাকে জোর করছিলো নাকি তুমি তাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।” সোহার ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ভালোবাসা!

এই কি তবে রুদ্রের ভালোবাসা? কিসের ভালোবাসার কথা বলছি আমি বার বার? উনি তো বিয়ের পর থেকে এই এক মাসে কখনো শিকার করে উনি আমাকে ভালোবাসে,, তবে আমি কোন ভালোবাসার প্রত্যাশা করছি।
যে মানুষটা বিশ্বাসের প্রথম পরীক্ষাতেই এভাবে তার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলতে পারল, তাকে সে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিল! নিজের গায়ের রঙের জন্য কত মানুষের কত কটু কথা সে নীরবে সয়েছে, ভেবেছিল রুদ্র হয়তো তার সেই কালচে চামড়ার ভেতরের খাঁটি মনটাকে দেখেছে। কিন্তু না, রুদ্রও আর পাঁচটা সাধারণ, সংকীর্ণমনা মানুষের মতোই।
​রৌদ অনেকক্ষণ ধরেই বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল। ভাইয়া আর ভাবির মাঝের ঝড়টা সে পুরোপুরি না জানলেও এটুকু বুঝতে পেরেছে যে, আজ বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে গেছে। ভাবিকে এভাবে মায়ের সাথে নিজের রুমে আসতে দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠেছিল। বিছানা থেকে উঠে ধীর পায়ে বারান্দার দরজার কাছে এসে দাঁড়াল রৌদ। দেখল, সোহা শূন্য চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এক জীবন্ত লাশ।
​রৌদ আলতো করে সোহার কাঁধে হাত রাখল। অত্যন্ত মৃদু ও মায়াবী গলায় ডাকল,

— ভাবি?
সোহা চমকে উঠে দ্রুত চোখের জল মুছে ফেলল। ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা জোরপূর্বক মলিন হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল,
— রৌদ? তুমি এখনো ঘুমাওনি ?
​রৌদ সোহার এই ভাঙা গলার স্বর আর চোখের জল দেখে নিজের কষ্টটা ধরে রাখতে পারল না। সে সোহার হাত দুটো টেনে ধরে বলল,
— আমার ওপর কি রাগ করেছ ভাবি? যে আমার সাথে লুকোচ্ছ? আমি জানি ভাইয়ার সাথে তোমার কিছু একটা হয়েছে। ভাইয়া মানুষটা একটু জেদি, রাগ হলে ওর মাথা ঠিক থাকে না। তুমি প্লিজ ভাইয়ার কথায় কষ্ট পেয়ে নিজের শরীরটা খারাপ করো না। তুমি তো জানো, এই বাড়িতে আমি তোমাকে কতটা পছন্দ করি। আমার সাথে একটু গল্প করবে না?
রৌদের এই নিষ্পাপ আর আন্তরিক কথাগুলো সোহার পাথরের মতো জমে যাওয়া মনে একটুখানি উষ্ণতা দিল। সে রৌদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

— না , তোমার ওপর কেন রাগ করব? তোমার ভাইয়া তার জায়গায় ঠিক, আর আমি আমার জায়গায়। তুমি এসব নিয়ে একদম ভেবো না। চলো, অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাবে চলো।
​রৌদ আর কথা বাড়াল না। সে বুঝল ভাবির মনের ভেতর এখন ঝড় চলছে। সোহার হাত ধরে সে ঘরের ভেতরে নিয়ে এল। দুজনে বিছানায় শুয়ে পড়ার পরও ঘরটা নিস্তব্ধ রইল। রৌদ সোহার মন ভালো করার জন্য কলেজের টুকটাক মজার গল্প, বন্ধুদের পাগলামি নিয়ে কথা বলতে লাগল। সোহা শুধু মাঝে মাঝে ‘হুম’, ‘হ্যাঁ’ বলে সায় দিচ্ছিল। একসময় কথা বলতে বলতে রৌদ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কিন্তু সোহার চোখ থেকে ঘুম যেন চিরতরে বিদায় নিয়েছে। সে শুধু ছাদের সিলিংটার দিকে তাকিয়ে বাকি রাতটুকু পার করে দিল।

পরদিন সকাল। অন্য দিনের তুলনায় আজকের সকালটা যেন একটু বেশিই শান্ত, থমথমে। পুরো মেহতাব ভিলা যেন কোনো এক শোকের চাদরে ঢাকা।
ভোরের আলো ফুটতেই সোহা বিছানা থেকে উঠে পড়ল। বাথরুমে গিয়ে অজু করে এসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করল। নামাজের মোনাজাতে সে আল্লাহর কাছে শুধু একটু ধৈর্য আর মানসিক শক্তি চাইল, রুদ্রের জন্য কোনো অভিযোগ বা দোয়া—কোনোটিই আজ তার মুখ থেকে বের হলো না।
​নামাজ শেষে গায়ের জায়নামাজটা ভাজ করে রেখে সোহা ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সদর দরজাটা খুলতেই ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস তার মুখে এসে লাগল।
সে মেহতাব ভিলার বিশাল বাগানটার দিকে পা বাড়াল। এই বাগানটার একপাশে থোকা থোকা ফলের গাছ, আর অন্যপাশে নানারকম ফুলের সমারোহ।

বাগানের ঠিক মাঝবরাবর দুটো বড় আম গাছের সাথে একটা কাঠের দোলনা বাঁধা আছে। সোহা শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে ফুলের বাগানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ডালপালা বেয়ে ওঠা একটা গোলাপ গাছের দিকে চোখ যেতেই দেখল, সেখানে একটা টকটকে লাল গোলাপ সদ্য ফুটেছে।
” কাল রাতের রুদ্রের হাতের সেই চূর্ণ-বিচূর্ণ গোলাপগুলোর কথা মনে পড়ে গেল সোহার।”
​সে হাত বাড়িয়ে গোলাপ ফুলটি বোঁটা থেকে ছিঁড়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে গিয়ে আম গাছের সেই দোলনাটায় বসল। হাতের গোলাপটার দিকে কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সোহা। রুদ্রের সেই রাগী মুখ, আবার তার পাশাপাশি চুলে বেলি ফুল গুঁজে দেওয়ার সেই পাগল করা মায়াবী চাহনি—সবকিছু তার চোখের সামনে ভাসছে। সোহা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গোলাপের একটা পাপড়ি ছিঁড়ল। মৃদু ফিসফিস করে বলল,

— সে কি আমাকে ভালোবাসে?
​দ্বিতীয় পাপড়িটা ছিঁড়ে বলল,
— নাকি বাসে না?
​সে নিজের অজান্তেই এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠল। একটা করে পাপড়ি ছিঁড়ছে আর নিজের ভাগ্যকে পরীক্ষা করছে।
— বাসে…
— বাসে না…
— বাসে…
​এদিকে রুদ্র সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি। টেবিল থেকে কলেজের একটা দরকারি ফাইল হাতে নিয়ে সে স্টাডি রুমের জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। এই জানালাটা দিয়ে বাগানটা অর্ধেকাংশ একদম স্পষ্ট দেখা যায়। ফাইলটা শক্ত করে ধরে বাইরে তাকাতেই রুদ্রের চোখ আটকে গেল।
​বাগানের দোলনাটায় সোহা বসে আছে। পরনে এখনো কালকে রাতের পোশাক, চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো। দূর থেকে রুদ্র স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, সোহার হাতে একটা লাল গোলাপ। সে একটা একটা করে পাপড়ি ছিঁড়ছে আর তার ঠোঁট দুটো নড়ছে—যেন নিজের মনেই কিছু বলছে। রুদ্রের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। সে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে তীব্র ইচ্ছা জাগল এখনই নিচে ছুটে গিয়ে সোহাকে জড়িয়ে ধরে নিজের সব ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয়।
কিন্তু তার অহংকার আর ভেতরের দ্বিধা তাকে আটকে রাখল।

বাগানে সোহার হাতের গোলাপের আর মাত্র একটি পাপড়িই অবশিষ্ট আছে। সোহা শেষ পাপড়িটা আলতো করে ছিঁড়ে নিল। তার হিসেব অনুযায়ী উত্তর এলো—”রুদ্র তাকে ভালোবাসে।”
পাপড়িটা হাতের মুঠো থেকে ছেড়ে দিতেই সোহার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্য আর উপহাসের হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল,
‘ভালোবাসে? যদি সত্যিই ভালোবাসত, তবে কি কেউ নিজের ভালোবাসার মানুষের চরিত্র নিয়ে এভাবে সবার সামনে কাদা ছুড়তে পারে? যে ভালোবাসায় কোনো সম্মান নেই, কোনো বিশ্বাস নেই, সেই ভালোবাসার শেষ পাপড়িটা ‘হ্যাঁ’ বললেও তা আসলে একটা মস্ত বড় ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়।’
সে দোলনা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং ফুলটির নগ্ন বোঁটাটা মাটিতে ফেলে দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে রুদ্র শুধু সোহার সেই তাচ্ছিল্যভরা হাসিটা দেখল, যা তার বুকে তীরের চেয়েও শক্ত হয়ে বিধল।

নাস্তার টেবিলে আজ বাড়ির সবাই উপস্থিত। পরিবেশটা এতটাই গম্ভীর যে চামচ নাড়ার শব্দও যেন অপরাধ মনে হচ্ছে। রেদওয়ান মেহতাব কাল রাতেই রুনিয়া বেগমের কাছ থেকে রুদ্র আর সোহার মাঝের সব ঘটনা জানতে পেরেছেন। ছেলের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আর নিচ মানসিকতার আচরণে তিনি মারাত্মক ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট। আশরাফ মেহতাবও গম্ভীর হয়ে বসে আছেন, তিনিও আজ রুদ্রের দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না বা কোনো কথা বলছেন না।
রুদ্র টেবিলে এসে বসার পর প্রতিদিনের মতো আজ আর সোহা তার পাশে এসে বসল না। টেবিলে সোহার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটা ফাঁকা দেখে আদিবা মনে মনে ভীষণ খুশি হলো।
সে ভাবল, এটাই সুযোগ। আদিবা চট করে গিয়ে রুদ্রের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল এবং সোহার দিকে একটা বিজয়ী দৃষ্টি ছুড়ে দিল। সে ভাবল, আজ সে সোহাকে রুদ্রের পাশে বসার সুযোগটাই দেয়নি। কিন্তু আসল সত্যিটা যে কী, তা রাজিয়া চৌধুরী কিংবা আদিবা—কারো ধারণাতেই নেই।
রুনিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে এসে সোহার দিকে তাকালেন, তার চোখ দুটো সোহার গালে পড়তেই দেখলেন কালচে দাগটা এখনো বসে আছে। তার ছেলের ওপর নিজেরই ঘেন্না হতে লাগল।

​রৌদ বরাবরের মতোই আশরাফ মেহতাবের পাশের চেয়ারটায় বসল এবং সোহা আজ মুখ নিচু করে এসে রৌদের পাশে গিয়ে বসল। রুদ্র খাওয়ার নাটক করলেও তার পুরো মনোযোগ সোহার দিকে।
সে বারবার আড়চোখে সোহার দিকে তাকাচ্ছে, দেখার চেষ্টা করছে সোহা ঠিক আছে কি না। কিন্তু সোহা অত্যন্ত শান্ত, নিস্পৃহ মুখে একমনে শুধু নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রুটি ছিঁড়ছে। সে একবারের জন্যও চোখ তুলে রুদ্রের দিকে তাকাল না, যেন রুদ্র নামের কোনো মানুষের অস্তিত্বই এই টেবিলে নেই।
রাজিয়া চৌধুরীর তীক্ষ্ণ নজরে পুরো বিষয়টাই ধরা পড়ল। রুদ্রের অস্থির আর গভীর চাওনি আর সোহার এই জমাটবদ্ধ নীরবতা দেখে তার কাছে আজ সবকিছু কেমন যেন অন্যরকম ঠেকল। ডালপালা ছড়ানোর আগেই তিনি পরিস্থিতি হালকা করার জন্য গলা ঝেড়ে রেদওয়ান মেহতাবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ভাই , আমি ভাবছি আজ বাসায় ফিরবো। তবে আদিবা আরও কিছুদিন থাকুক, ওর মামাতো ভাইবোনদের সাথে একটু সময় কাটাক।
রেদওয়ান মেহতাব অত্যন্ত গম্ভীর গলায় শুধু বললেন,

— আচ্ছা,। তোমার যেভাবে সুবিধা হয়।
​নাস্তার পর্বটা এভাবেই অত্যন্ত নিরানন্দভাবে শেষ হলো। সবাই টেবিল থেকে উঠে যাওয়ার সময় রেদওয়ান মেহতাব রুদ্রকে ডেকে বললেন,
— রুদ্র, নাস্তা শেষ করে আমার রুমে এসো। তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।
​রুদ্র মনে মনে ভাবল, বাবা নিশ্চয়ই সোহার বিষয় নিয়েই কিছু বলবেন বা তাকে বকাঝকা করবেন। সে নিজেকে শক্ত করে বাবার রুমে গিয়ে দাঁড়াল। রেদওয়ান মেহতাব তার টেবিলের ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বললেন,
— রুদ্র, আমাদের অফিসের একটা নতুন প্রজেক্টের কাজে আমাকে আগামী কালই কিছুদিনের জন্য দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে। তোমায় আগেও বলেছি অফিসে বসো,, কোম্পানি সামলাও। কিন্তু তুমি শখের বসে শিক্ষকতা বেঁছে নিয়েছো। তাতে আমার সমস্যা নেই।
কিন্তু এই কিছুদিন আমি না থাকা পর্যন্ত তোমাকে কলেজের পাশাপাশি আমাদের মেইন অফিসটাও সামলাতে হবে। কলেজের ক্লাস শেষ করেই তুমি সরাসরি অফিসে চলে যাবে। কাজের যেন কোনো গাফিলতি না হয়।
​রুদ্র বাবার গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে বুঝল, বাবা এখন কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলার মুডে নেই। সে মাথা নিচু করে বাবার আদেশ মেনে নিয়ে বলল,

— আচ্ছা বাবা, আমি সামলে নেব। আপনি নিশ্চিন্তে যান।
রুদ্র রুমে আসার আগেই,,, সোহা নিজের প্রয়োজনিও কিছু জিনিস নিয়ে বেরিয়ে,, সোজা রৌদের রুমে চলে গিয়েছে। সে রুদ্রের রুমে আর এক সেকেন্ডের জন্যও পা রাখতে চায় না। সে কলেজে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বই-খাতা সব বের করে নিল।
​রুদ্র যখন নিজের রুমে এসে ঢুকল, সে ভেবেছিল সোহা হয়তো এতক্ষণে রুমে এসেছে বা আসবে। কিন্তু পুরো রুমটা খা খা করছে। বিছানার দিকে তাকাতেই তার নজর গেল টেবিলের উপর সোহার বই খাতা কলেজের ব্যাগ কিছুই নেই। আলমারিটা খুলতেই রুদ্র দেখল, সোহার নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো সব উধাও। রুদ্রের ভেতরের শূন্যতাটা এক ধাক্কায় আরও অনেক বেড়ে গেল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হয়ে কলেজের জন্য তৈরি হতে লাগল।
​তৈরি হয়ে গাড়ি নিয়ে যখন রুদ্র পার্কিং লট থেকে বের হলো, সে গাড়িটা মেইন গেটের সামনে স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মন বলছিল, সোহা নিশ্চয়ই এখন বের হবে কলেজে যাওয়ার জন্য। প্রতিদিন তো সে রুদ্রের গাড়িতেই যায়। সে সোহার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
​ঠিক তখনই রৌদ নিজেও কলেজের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিল। রুদ্রকে এভাবে গেটের সামনে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে রুদ্রের জানালার পাশে এনে থামাল।
— কী ব্যাপার ভাইয়া? এখানে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন? কোনো সমস্যা?
​রুদ্র একটু ইতস্তত করে শুকনো গলায় বলল,

— না… মানে, সোহার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। ও কি রেডি হয়েছে?
​রৌদ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
— ভাবির জন্য? ভাবি তো একটু আগে বেরিয়ে গেলো লোকাল রিকশা নিয়ে ! তুমি জানো না?
​কথাটা শুনে রুদ্রের বুকের ভেতরটা যেমন চড়াত করে উঠল, তেমনই একটা তীব্র রাগ মাথার চাঁদি ছুঁয়ে গেল। সে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে চাপ দিল। মনে মনে ভাবল,_
আমার সাথে এক গাড়িতে যাবে না বলে এত সকাল সকাল একা একা চলে গেল? আমি কি সত্যিই অনেক বেশি বলে ফেলেছি কাল? কিন্তু আমার বলার পেছনেও তো কারণ ছিল! ছবিগুলো তো মিথ্যা ছিল না!
রাগের সাথে সাথে এক অদ্ভুত অভিমান আর মন খারাপের অনুভূতি নিয়ে রুদ্র গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল
কলেজে পৌঁছানোর পর সোহার মনটা আরও বেশি বিষিয়ে উঠল। সে সোজা ক্লাসরুমে গিয়ে পেছনের একটা বেঞ্চে বসল। একটু পরেই রাইসা হন্তদন্ত হয়ে ক্লাসে ঢুকল। সোহাকে দেখেই সে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল,

— কিরে সোহা! কাল হঠাৎ কল কেটে দিলি কথা শেষ না করে! তুই ঠিক আছিস তো? তোর ফোন বন্ধ কেন রে? আমি কতবার ট্রাই করেছি!
সোহা রাইশার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি দিল। রাইসা কালকের রাফিন স্যারের কথা, রাইশার বাড়ির লোকেদের নিয়ে স্যারের খোঁজখবর নেওয়া—সবকিছু একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল। কিন্তু সোহার কান পর্যন্ত সেসব কথা পৌঁছাচ্ছিলই না। সে একদম অন্যমনস্ক হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
​যথারীতি ক্লাসের সময় হতেই রাফিন স্যার রুমে ঢুকলেন। ক্লাসে ঢুকেই তার চোখ সবার আগে সোহাকে খুঁজল। সোহাকে পেছনের বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে সে একটু আশ্বস্ত হলেও খেয়াল করল সোহার মুখটা আজ অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে এবং তার চোখ দুটো ফোলা।
ক্লাসের পুরোটা সময় রাফিন লেকচার দিলেও সোহার দিকে কড়া নজর রাখছিল। কিন্তু আজ সোহা একবারের জন্যও স্যারের দিকে তাকাল না, বইয়ের পাতার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রাফিন সোহার এই অবস্থা ঠিক বুঝে উঠে পারলো না। কিন্তু ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টদের সামনে সে কিছু বলল না।
​ক্লাস শেষ হতেই সোহা ঝটপট নিজের ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল। রাইসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— কিরে, এখন তো আরও ক্লাস আছে, তুই উঠছিস কেন?
সোহা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বলল,
— আমার আর ক্লাস করতে ভালো লাগছে না রে রাইসা। মাথাটা কেমন যেন ফেটে যাচ্ছে। আমি একটু লাইব্রেরিতে গিয়ে বসব। শান্তিতে থাকা দরকার।
রাইসা সোহার অবস্থা দেখে বলল,
— আচ্ছা চল, আমিও তোর সাথে লাইব্রেরিতে যাই। একা একা ভালো লাগবে না।
​কিন্তু তারা দুজনে ক্লাসরুমের দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগেই করিডোর দিয়ে রুদ্র আসছিল। রুদ্রকে সামনে দেখে রাইসা দমে গেল। রুদ্র অত্যন্ত কড়া এবং গম্ভীর চোখে সোহার দিকে তাকাল। সোহার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। রুদ্র রাইসাকে জিজ্ঞেস করল,
— ক্লাস ফেলে তোমরা দুজন এখন কোথায় যাচ্ছ?
রাইসা আমতা আমতা করে বলল,
— স্যার… মানে সোহার শরীরটা একটু খারাপ, তাই লাইব্রেরিতে…
​রুদ্র রাইসাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে ধমকের সুরে বলল,

— শরীর খারাপ হলে কমন রুমে গিয়ে রেস্ট নেবে, নয়তো ক্লাসে বসবে। কলেজের মাঝপথে এভাবে করিডোরে ঘুরে বেড়ানোর কোনো নিয়ম নেই। তোমরা দুজনেই এখনই ক্লাসরুমে গিয়ে বসো!
​রুদ্রের এই রুক্ষ ব্যবহারে সোহা মনে মনে চরম অপমানিত বোধ করল। সে রুদ্রের দিকে জীবনের সবচেয়ে শীতল ও ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকাল, তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে আবার ক্লাসরুমে গিয়ে বসে পড়ল। পুরো ক্লাসের সময়টাতে রুদ্র বারবার সোহার দিকে তাকাচ্ছিল, তার চোখ দিয়ে যেন অনুশোচনা আর অধিকারবোধ একসাথেই ঝরে পড়ছিল। কিন্তু সোহার পাথুরে মন আজ গলেনি। সে একবারও রুদ্রের চোখের দিকে চোখ মেলালো না।
ক্লাস শেষ করে রুদ্র নিজের কেবিনে ফিরে গেল। কিন্তু তার মন টিকছিল না। সে সোহার সাথে একান্তে কথা বলতে চায়, কালকের ছবিগুলোর একটা স্পষ্ট জবাব চায়। ছবি গুলো তো আসল, সে এক্সপার্ট দিয়ে চেক করিয়েছে । সে চট করে তার কেবিনের বেল বাজিয়ে কলেজের পিয়নকে ডেকে পাঠাল।

— শোনো, পেছনের ক্লাসরুম থেকে সোহা মেহতাবকে একটু আমার কেবিনে আসতে বলো। বলো যে আমি ডেকেছি।
​পিয়ন সোজা ক্লাসরুমে গিয়ে সোহাকে বলল,
— এখানে সোহা কে?
সোহা দাঁড়াতেই পিয়ন বললো__
, রুদ্র স্যার আপনাকে উনার কেবিনে ডেকে পাঠিয়েছেন। জরুরি দরকার।
​রাইসা সোহার দিকে তাকিয়ে বলল,
— রুদ্র স্যার তোকে ডাকছে কেন রে? কোনো প্রবলেম হয়েছে?
সোহা পিয়নের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রাইসাকে বলল,
— চল রাইসা, কলেজ থেকে বের হই। আমার এখানে দম বন্ধ লাগছে।
​রাইসা অবাক হয়ে বলল,
— কিরে, স্যার তোকে ডাকল, আর তুই না গিয়ে চলে যাচ্ছিস?
সোহা কোনো কথা না বলে গটগট পায়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে কলেজের মেইন গেটের বাইরে চলে এল। পিয়ন দূর থেকে সোহার চলে যাওয়া দেখল এবং সে লক্ষ্য করল সোহা কলেজের ঠিক পাশের বড় কফি শপটার দিকে যাচ্ছে।
​রাইসা সোহাকে টেনে নিয়ে সেই কফি শপটায় ঢুকল। সে বুঝতে পারছে সোহার মনের ভেতর বিশাল কোনো ঝড় চলছে, যা সে লুকাচ্ছে। দুজনে একটা কর্নারের টেবিলে গিয়ে বসল এবং রাইসা দুটো কোল্ড কফি অর্ডার করল।

​ঠিক তখনই কফি শপের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন রাফিন স্যার। তিনি হয়তো এমনিই এসেছিলেন, কিন্তু টেবিলে রাইসা আর সোহাকে একসাথে বসে থাকতে দেখে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিশেষ করে সোহার ওই মলিন মুখটা তাকে টেনে নিয়ে এল। রাফিন ধীর পায়ে তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল এবং অত্যন্ত ভদ্রভাবে হাসিমুখে বলল,
— মে আই জয়েন ইউ গার্লস? যদি তোমাদের কোনো আপত্তি না থাকে।
​সোহা পুরোই চুপচাপ রইল, সে কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু রাইসা তো মনে মনে রাফিন স্যারকে পছন্দ করে, সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
— আরে স্যার! আপত্তির কী আছে? আসুন, বসুন প্লিজ!
​রাফিন চেয়ার টেনে সোহার ঠিক মুখোমুখি বসল। সে সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম ও চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
— সোহা, আর ইউ ওকে? ক্লাসেও দেখলাম তুমি খুব অন্যমনস্ক ছিলে। তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ? বা কোনো সমস্যা হয়েছে? আমাকে বলতে পারো।
​সোহা কোনো রকমে চোখের পলক ফেলে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক গলায় বলল,
— না স্যার, কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি। থ্যাংকস ফর আস্কিং।
এদিকে রুদ্র তার কেবিনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছিল। দশ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন সোহা এলো না, তখন রুদ্র রেগে গিয়ে আবার পিয়নকে ডেকে পাঠাল।
— কী ব্যাপার? ওকে আসতে বললাম, ও এখনো এলো না কেন?
পিয়ন ভয় পেয়ে হাত জোড় করে বলল,

— স্যার, আমি তো ওনাকে বলেছিলাম। কিন্তু উনি আপনার কেবিনে না এসে কলেজের বাইরে চলে গেছেন। আমি উনাদের ওই পাশের কফি শপটায় ঢুকতে দেখেছি।
​”কফি শপ?”—শব্দটা শুনতেই রুদ্রের মাথার রগ দপদপ করে উঠল। তার চোখের সামনে আবার কালকের ছবিগুলো ভেসে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও চিন্তা না করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং হনহন করে কফি শপের উদ্দেশ্যে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।
​রুদ্র যখন কফি শপের মেইন গেটের সামনে পৌঁছাল, ঠিক তখনই কোথা থেকে তানিয়া এসে হাজির। তানিয়া রুদ্রকে দেখে একগাল হেসে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলল,
— ওহ রুদ্র! আপনি এখানে? কী ভালো হলো বলো তো! চলেন না দুজনে একসাথে বসে একটু কফি খাই? আমার একটা বিষয় নিয়েও কথা ছিল আপনার সাথে…
​রুদ্র তানিয়ার কোনো কথার উত্তর দিল না, তার পুরো মনোযোগ তখন কফি শপের ভেতরের কাঁচের ওপারে। সে তানিয়াকে একরকম তোয়াক্কা না করেই কফি শপের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল এবং তানিয়াও সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে রুদ্রের গা ঘেঁষে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে ঢুকেই রুদ্রের চোখ যেখানে আটকালো, সেই দৃশ্য দেখে তার ভেতরের সমস্ত রক্ত যেন এক সেকেন্ডে মাথায় চড়ে গেল। ভেতরের একটা টেবিলে সোহা বসে আছে, আর তার ঠিক সামনেই বসে আছে রাফিন! দুজনে মুখোমুখি বসে কথা বলছে! রুদ্রের মনে হলো কাল রাতের সেই ভয়ংকর আগুনটা আবার তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। তার চোখ দুটো রাগে রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।
​সে কোনো কিছু চিন্তা না করে, আশেপাশের মানুষ বা তানিয়া কে কী ভাববে তার পরোয়া না করে, ঝড়ের গতিতে টেবিলটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সোহা, রাইসা আর রাফিন তিনজনই রুদ্রের এই আকস্মিক উপস্থিতিতে চমকে উঠল।

রুদ্র সোহার দিকে এক মুহূর্ত তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে, কোনো ওয়ার্নিং না দিয়ে সোজা সোহার হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল এবং টেনে সিট থেকে দাঁড় করিয়ে দিল।
​সোহা রুদ্রের এই বর্বরোচিত আচরণে চরম স্তব্ধ আর রাগান্বিত হয়ে গেল। সে নিজের হাতটা ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে চাপা গলায় বলল,
— ছাড়ুন আমাকে! আপনি এটা কী করছেন? সবার সামনে আমার হাত ছাড়ুন!
কিন্তু রুদ্রের হাত যেন লোহার শিকল। সে সোহার কোনো আকুতি বা রাগ কানেই তুলল না। সে সোহার হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে কফি শপের দরজার দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
কফি শপের ভেতরে বসে থাকা রাইসা, রাফিন আর রুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তানিয়া—তিনজনই এই দৃশ্য দেখে পুরোপুরি হতভম্ব, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পুরো কফি শপের মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
​রাফিনের চোখের সামনে এভাবে একটা মেয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়াটা সে মেনে নিতে পারল না। তার ভেতরেও এক তীব্র পুরুষালি রাগ আর ক্ষোভ জন্ম নিল। সে রুদ্র আর সোহার সম্পর্কের গভীরতা বা পরিচয় কিছুই জানে না।

সে রুদ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো __
আপনি এই ভাবে কাউকে জোর করে তুলে নিয়ে যেতে পারেন না। মিস্টার রুদ্র মেহতাব।
রুদ্র রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকায় রাফিন এর দিকে। রাগান্বিত স্বরে বলে উঠে___
আমি কি পারি আর কি পারি না সেটা আপনি এখনো জানে না মিস্টার রাফিন। আর আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় আপনার মাথা না ঘামালেই ভালো হবে।
ব্যক্তিগত মানে,, আপনি এই ভাবে একটা মেয়েকে জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন আর বলছেন ব্যক্তিগত?
Definitely a personal reason, she’s my wife.
তাই তাকে টেনে নিয়ে যাবো নাকি কোলে তুলে নিয়ে যাবো সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যপার।
রাফিন জেনো স্তব্ধ হয়ে গেছে।সাথে রাইশা তানিয়া তারাও।
রুদ্র সোহাকে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।
রাফিন অত্যন্ত রাগান্বিত দৃষ্টিতে রাইসার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
তুমি এসব আগে থেকে জানতে?

— স্যার… আমি… আমি সত্যি জানি না। আমি ওনাদের ব্যাপারে কিছু জানি না স্যার!
স্যার… আপনি সোহাকে নিয়ে এত ভাবছেন কেন? ওর জন্য আপনার এত চিন্তা হচ্ছে কেন স্যার?
রাফিন আর কোনো রকম ভনিতা বা লুকোছাপা করার প্রয়োজন মনে করল না। সে সোহার চলে যাওয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে এক বুক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ভারী গলায় বলল,
— কারণ আমি সোহাকে ভালোবেসে ফেলেছি রাইসা। আই লাভ হার।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৭

​রাফিনের মুখ থেকে এই “ভালোবাসি” শব্দটা শুনতেই রাইসার পায়ের তলার মাটি যেন এক নিমেষে সরে গেল। তার বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে মানুষকে সে নিজের মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছিল, সে কিনা তার নিজেরই পরম বান্ধবীকে ভালোবাসে! রাইসা দু-পা পিছিয়ে গেল, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিল। সে রাফিনের দিকে তাকিয়ে এক অবর্ণনীয় কষ্টের হাসি হাসলো

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here