প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৯
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
রাত প্রায় দুইটা বাজে।
ইসলাম বাড়ির অতি ভদ্র সন্তানরা বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। তবে পঞ্চাশ হাজার টাকা আদায় করেই ছেড়েছে আবির আর সাফওয়ান এর কাছ থেকে। বেচারা সাফওয়ান আর আবির আজ রাত বাথরুমে বসে কাটিয়ে দিবে তা নিশ্চিত । তাঁদের আর বাসর করা হবে না আজ। কতো শত প্ল্যান করে রেখেছিলো তাঁরা আজ এই রাতের জন্য তা সব ভেস্তে দিয়েছে এই ইসলাম বাড়ির অতি ভদ্র সন্তান গুলো। বাড়িতে এসে যে যার রুমে চালে গেলো। লামিয়া ক্লান্ত পায়ে রুমের দিকে হাঁটতেই পা থেমে গেলো। হামিদা আর লামহার রুম পেরিয়ে তাঁর রুমে যেতে হয়। লামিয়া হামিদা আর লামহার রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে গেলো। চোখ ঘুরিয়ে একবার হাতের বাম পাশের রুমে আর একবার ডান পাশের তাকাতে দেখলো দুটো রুম খাঁখাঁ করছে। রুমের মালিকরা নেই আজ রুমে। বাড়িটাও আজ কেমন খালি খালি লাগছে। কিছু নেই নেই লাগছে ভেবেই লামিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজের রুমে চলে গেলো।
” আআআআ সাফওয়ান পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই??”
বলেই দৌড়াতে লাগলো আবির।
” হ্যাঁ হয়েছি! তোর জন্য শুধু মাত্র তোর জন্য আমি কালকে বাথরুমে রাত কাটিয়েছি।”
চিকন শুকনো একটা বড় বাঁশ হাতে নিয়ে আবির কে মারার জন্য দৌড়াচ্ছে সাফওয়ান। আজকে আবির কে ধরতে পারলে যে এই বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে তাঁর পিঠের ছাল তুলে ফেলবে সাফওয়ান এতে কোনো ভুল নেই।
ওর ভুলের জন্য কালকে সে বাসর ঘরে বউ রেখে বাথরুমে বসে ছিলো সারা রাত।
” ভাই আমি জানতাম না যে ওই প্রাণের শালা শালিরা যে এমন বাঁশ দিবে আমাদের বিশ্বাস কর আমি সত্যি জানতাম না। যদি জানতাম আমি ভুলেও ওদের সাথে পাঙ্গা নিতাম না। ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
” তোকে আমি বার বার নিষেধ করেছিলাম না যে ওদের সাথে লাগিস না ওদের সুবিধার লাগছে না। শুনেছিলি আমার কথা??”
” ভাই আমার ভুল হয়ে গিয়েছে ক্ষমা করে দে ভাই আর কোনোদিন হবে না। ”
” রাখ তোর কোনোদিন হবে না, আমার জীবনে কী আর এই রাত ফিরে আসবে?? উহু কোনোদিন ও আসবে না। শুধু মাত্র তোর জন্য আমার প্রথম রাতের প্ল্যান সব মাটি হয়ে গিয়েছে। ”
” ভাই ভাই ছেঁড়ে দে আর হবে না।” বলেঈ দৌড়াতে দৌড়াতে বাগানে এসে পড়লো আবির। তাঁর পিছনে সাফওয়ান। আর সাফওয়ান এর পিছনে খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা। সবাই বেশ মজা পাচ্ছে তাদের দেখে।
” কী ব্যাপার সাফওয়ান ভাই আবির ভাই ফাস্ট নাইট কেমন কাটলো??” বলেই দাঁত কেলিয়ে হেঁসে উঠলো আরিফ। পাশেই আয়না আরিফের হাতে চিমটি কাটলো।
সাফওয়ান আর আবির দৌড় থামিয়ে সোজা ইসলাম বাড়ির দ্বিতীয় তলায় দাঁড়ানো আরিফ এর দিকে তাকালো।
আরিফ কে দাঁত কেলাতে দেখে সাফওয়ান আরো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। আরিফের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবিরের দিকে তেড়ে গেলো সাফওয়ান কে দেখে আবির আবার দৌড়াতে লাগলো।
আরিফ বেশ মজা নিয়ে দু ভাইয়ের দৌড়া দৌড়ি দেখছে। কালকে রাতে সবার আগে তার ভাই বোনরা তাঁর কাছেও এসেছিলো। বেশ শান্ত কন্ঠে সবাই বলেছিলো ত্রিশ হাজার টাকা দিতে আরিফ প্রথমে টাকা দিতে রাজি না থাকলেও ছয়জনের শান্ত রূপ দেখে আরিফ ভয়ে তাদের ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছিলো। তাঁরা টাকা পেয়ে খুশি হয়েছিলো দেখে আরিফ বেশ স্বস্তির শ্বাস ফেলে দুধের গ্লাস টা মুখে দিতেই তায়েবা তা কেড়ে নিয়ে বলেছে এটা খেয়ো না। এটা খেলে আজ রাত বাথরুমে কাটিয়ে দিতে হবে।
আরিফ তায়েবার কথা কিছু বুঝতে না পাড়ায় লামিয়া আরিফ কে বলতেই আরিফ মনে মনে আল্লাহ কে কোটি কোটি শুকরিয়া জানিয়েছে। ভাগ্যিস তাদের কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলো নয়তো তাঁর অবস্থা ও সাফওয়ান আর আবিরের মতো হতো।
ভেবেই আরিফ ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো।
সাফওয়ান আর আবির এর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন আজমেরী বেগম বাড়ি থেকে বের হয়ে দাঁড়ালো বাগানে।
সাফওয়ান বাঁশ হাতে নিয়ে আবির কে দৌড়াচ্ছে দেখে লামিয়া, তায়েবা, তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন , আজমেরী বেগম হিহি করে হেঁসে উঠলো।
তাঁদের দেখে সাফওয়ান আরো রেগে গিয়ে আবির কে বকতে লাগলো।
” ভাই মাফ করে দে! আর কোনো দিন হবে না ভাই।” ব আবির দৌড়াতে দৌড়াতে বললো।
তায়েব হেঁসে সাফওয়ান এর উদ্দেশ্যে বলে উঠলো ” দেও ভাই দাও ওই বাঁশ আবির ভাইয়ের পিছনে ভ*রে দেন জানি সারাজীবন মনে রাখে।”
তায়েব এর কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। সাফওয়ান দৌড়ে আবির কে ধরতেই ধাম ধাম কতো গুলো বাঁশ দিয়ে বারি বসিয়ে দিলো পিঠে। মাহির পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত ভিডিও করে নিলো।
বাঁশের বারি খেয়ে আবির মুখ ভোঁতা করে রাখলো।
সাফওয়ান আবির কে বারি দিয়েও যেনো শান্ত থাকতে পারছে না। ইচ্ছে করছে আবিরকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে।
আরো একটা বারি দিতেই হামিদা সাফওয়ান কে আটকে দিলো। সাফওয়ান হামিদার দিকে অসহায় চোখে তাকালো। হামিদা তাঁর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে সাফওয়ান এর হাত ধরে বললো ” চলুন অনেক হয়েছে।” বলেই হাত ধরে বাড়িতে নিয়ে গেলো।
” বাঁশ বাগানের মাথার উপর সূর্য উঠেছে ওই,
আবির ভাইয়ের হো*গায় বাঁশ, কিন্তু সূর্য গেলো কই?
বলেই পাশে তাকিয়ে তায়েব বললো ” এই এই কেমন হয়েছে রে আমার কবিতা??”
” মিন্ড বোয়েলিং দাদু ভাই।” বলেই দাঁত কেলিয়ে হেঁসে উঠলো আজমেরী বেগম। সামনের দাঁত টা পরার কারণে দেখতে বেশ হাস্যকর লাগছে তাকে। লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন হো হো করে হেঁসে উঠলো আজমেরী বেগম এর দিকে তাকিয়ে।
আবির রেগে মেগে চলে গেলো বাড়িতে। এখানে থাকলে ইজ্জতের মোয়া বানিয়ে দিবো এই বেয়াদব গুলো। তাই এখানে থাকার চেয়ে না থাকাই উত্তম।
বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে তায়েবা। লামিয়া তায়েবা কে ডাকতে তাঁকে এইভাবে শুয়ে থাকতে দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে বললো ” তুই এইভাবে শুয়ে আছিস কেনো??”
তায়েবা মাথা তুলে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বুঝলো কোনো কাজে বের হবে হয়তো তাই ডাকতে এসেছে তাকে। তাই বেশ কষ্টে তায়েবা বলে উঠলো ” কোথায় যাচ্ছিস?”
” একটা বই কিনতে যাবো। কিন্তু তুই এইভাবে এখন শুয়ে আছিস কেনো জ্বর এসেছে নাকি?”
” না জ্বর আসে নি, পেটে ব্যথা করছে ভীষণ তাই।”
লামিয়া কিছু আন্দাজ করতে পেরে আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেলো।
আশেপাশে আবির, তায়েব, ইভান, ইমন কেও দেখা যাচ্ছে না। দেখে লামিয়া বেশ বিরক্ত হয়ে বাড়ির বাহিরে যেতেই জ্যাকি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো।
লামিয়া হেঁসে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে গেটের বাহিরে যেতেই জ্যাকি মুখ দিয়ে লামিয়ার উড়না টেনে ধরলো
উড়নায় টান লাগতেই লামিয়া ভ্রু কুঁচকে পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো জ্যাকি লেজ নাড়াচ্ছে। তা দেখে লামিয়া জ্যাকি কে বললো
” কি হয়েছে ? এভাবে ধরে রেখেছিস কেনো? যাবি আমার সাথে?”
জ্যাকি লামিয়ার কথা বুজতে পেরে খুশি তে লাফিয়ে খেউ খেউ করে উঠলো। লামিয়া বুঝলো সে যেতে চায় তাই লামিয়া হেঁসে বললো ” ঠিক আছে তুই এখানে দাঁড়া আমি তোর গলায় বেল্ট নিয়ে আসছি।”
বলেই চলে গেলো বেল্ট আনতে। জ্যাকি লামিয়ার কথা মেনে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। এক মিনিট পর লামিয়া একটা চামড়ার বেল্ট, দুটো কালো চশমা নিয়ে এসে দাঁড়ালো । বেল্ট জ্যাকির গলায় পড়িয়ে দিয়ে, কালো চশমা চোখে পরিয়ে, আরো একটা চশমা নিজের চোখে পড়ে নিয়ে বেল্ট হাতে নিয়ে গেটের বাইরে যেয়ে একটা রিকশায় উঠে রওনা করলো তাদের কর্তব্যে।
” অবশেষে ফ্যালকন আর তার টিমের দেখা পেলাম। আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম খান আর ইসলাম বাড়ির ছেলেদের। তবে সেদিন রাতে তাদের আসল চেহারা দেখে বেশ ভালো লেগেছে। সমাজের চোখে তাঁরা বিজনেসম্যান আর আড়ালে তারা অন্য কিছু। বাহ্ বাহ্ বাহ্ চমৎকার এতো প্রতিভা তাদের ওয়াও।”
বলেই হাতে তালি দিতে দিতে হেঁটে এসে সোফায় বসলো কায়সার।
” কে এই ফ্যালকন? তাঁর আসল পরিচয় কী?” মদের গ্লাস হাতে নিয়ে অন্ধকারে একটা চেয়ারে বসে কায়সার কে জিগ্যেস করলো মধ্য বয়স্ক একজন লোক।
” তাঁর আসল নাম হলো শাহরিয়ার শুভ্র। ” বলেই টেবিল থেকে মদের গ্লাস হাতে নিয়ে চুমুক দিলো কায়সার।
কায়সারের মুখে নামটা শুনে খেক খেক করে কেশে উঠলো মধ্য বয়স্ক লোকটি।
” তুমি ঠিক আছো ড্যাড?” বেশ অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো কায়সার।
” ইয়াহহ, ঠিক আছি আমি।” বেশ শান্ত কন্ঠে বললো মধ্য বয়স্ক লোকটি। তারপর একটু থেমে কথা ঘুরিয়ে কায়সারের দিকে তাকিয়ে বললো ” তুমি যে মেয়েটি কে ভালোবাসো সে মেয়েটা কে তো এখনো দেখালে না।”
কথাটা শুনে কায়সার চোখ মুখ শক্ত করে ফেললো। নিজের হাতের গ্লাস টা শক্ত করে চেপে ধরলো। তারপর বেশ নরম গলায় বললো ” দেখাবো ড্যাড দেখাবো তবে এখন নয় সময় আসুক তারপর একবারে যখন আমার কাছে নিয়ে আসবো তখন দেখো। ”
মধ্য বয়স্ক লোকটি কায়সারের কথায় আর কিছু না বলে অন্য কিছু চিন্তা করতে লাগলো।
রিকশা থেকে নেমে একটা লাইব্রেরীতে প্রবেশ করলো।
চোখের কালো চশমা মাথায় উঠিয়ে তাড়াতাড়ি করে খুঁজতে লাগলো নিজের দরকারি কিছু বই। আজকে আবার হামিদা দের রিসেপশন তাই তাড়াতাড়ি বাড়িতে যেতে হবে।
লামিয়া হাঁটতে হাঁটতে বই খুঁজতে লাগলো তার পিছন পিছন জ্যাকি হাঁটছে। জ্যাকির চশমা টা ও চোখ থেকে মাথায় তুলে দিয়েছে সে। বই খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ কারোর সাথে ধাক্কা খেতেই লামিয়া বেশ বিরক্ত হয়ে রেগে বললো ” ওই মিয়া চোখ কী পিছনে রেখে হাঁটেন নাকি মেয়ে দেখলেই ধাক্কা খেতে মনে চায় কোনটা??” বলেই চোখ তুলে উপরে তাকালো।
তাঁর সামনে শ্যামবর্ণের এক যুবক কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর দিকে তাকিয়ে। গাঁয়ে কালো শার্ট ইন করা ব্রাউন রঙের পেন্ট।
” ওও হ্যালো তেলাপোকার ঠ্যাং রাস্তার থেকে সরে দাঁড়াবেন নাকি জায়গা মতো একটা মেরে সরাবো কোনটা?” বেশ রেগে বললো লামিয়া।
লামিয়ার কথা শুনে যুবকটি বেশ জ্বলে উঠলো। তাঁকে তেলাপোকার মতো দেখতে?? এই পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি মেয়ে বলে কী।
” এক্সকিউজ মি ! আপনি কী বললেন আমি তেলাপোকার ঠ্যাং??”
” কানে শুনতে পাননি আমার কথা?? আর আমি এক কথা দ্বিতীয় বার রিপিট করতে পছন্দ করি না। ”
” জ্বি হ্যাঁ শুনতে পেয়েছি। আপনার মতো পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি মেয়ে আপনি আমাকে বললেন কি না আমি তেলাপোকার ঠ্যাং?? এই আপনি জানেন আমি কে??”
” কেনো আপনি কী দরবারের ল্যাংটা ফকির যে আপনাকে চিনতে হবে??”
” কীহহহহ?? এই মেয়ে আপনি জানেন আমি কে?? আমি ইন্সপেক্টর আরজুন সিং। চাইলে এখনই আপনাকে থানায় নিয়ে আটকাতে পারি।”
” আপনার বাপের ও স্পর্ধা নেই আমাকে অকারণে থানায় নেওয়া।”
” এই মেয়ে বাপ তুলে কথা বলছেন কেনো?? আর আপনাকে থানায় নিতে আমার বাপের স্পর্ধা লাগবে না
আমি একাই একশো।”
” আপনার স্পর্ধার নানিরে কুকুর দিয়ে চু….মাই।”
লামিয়ার এমন কথা শুনে আরজুন ভরকে গেলো। এটা অই গালি দিলো নাকি অন্যকিছু তা সে বুঝতে পারলো না। হঠাৎ জ্যাকির দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো ” চ্যাম্প।”
অতি চিরো চেনা নাম শুনে জ্যাকি জিহ্বা বের করে লেজ নাড়াতে লাগলো। লামিয়া কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে বললো ” কে চ্যাম্প?”
” এই যে এই কুকুর টি।”
” দিন দুপুরে কী গাঁজা টান দিয়ে এসেছেন নাকি?”
” মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ । আমি ইন্সপেক্টর আরজুন তাই হিসেব করে কথা বলবেন।”
” হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি তো, ঘুষ খুর ইন্সপেক্টর ঠ্যাংয়ের সিং ।”
” এই মেয়ে অনেক্ষণ ধরে আপনার আজেবাজে কথা সহ্য করছি তবে আর একটা আজেবাজে কথা বললে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।” আরজুন বেশ ধমকে উঠলো লামিয়ার উপর।
লামিয়া বেশ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আরজুনের কথা শুনলো। আরজুন এর কথা শেষ হতেই পাশ থেকে মোটা বই তুলে আরজুনের মাথা বরাবর বারি বসিয়ে দিলো। আরজুন মাথায় হাত রেখে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লামিয়া বেশ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে যেনো কিছুই হয়নি এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
আরজুন রেগে কিছু বলার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠলো। পকেট থেকে মোবাইল বের করতে করতে লামিয়া কে চোখ দিয়ে শাসিয়ে বললো ” এখানেই থাকুন কথা শেষ হওয়ার পর আপনাকে আমি থানায় নিয়ে যাবো। আর এই কুকুর টা কে ও।” বলেই ফোন নিয়ে সাইডে চলে গেলো।
লামিয়া ও দাঁড়িয়েই থাকলো এই ঠ্যাংয়ের পুলিশ তাঁকে কীভাবে থানায় নিয়ে যায় তা সে দেখে ছাড়বে।
হঠাৎ পিছনে কারোর উপস্থিতি টের পেতেই লামিয়া পিছন ঘুরে তাকাতেই একজন লোক তাঁর মুখ চেপে ধরলো। লামিয়া লোকটির হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করলো কিন্তু ছাড়াতে পারলো না। যখন ই ঘুরে লোকটি কে লাথি দিতে যাবে আর আগেই একজন কালো রঙের পোশাক পড়া একটি মেয়ে এসে লামিয়ার পা ধরে ফেললো।
জ্যাকি বেশ জোড়ে ঘেউ ঘেউ করতে করতে দৌড়ে লামিয়ার কাছে যেতে চাইলো কিন্তু তাঁর আগেই লামিয়া কে তুলে ফেললো কালো গাড়িতে। জ্যাকি দৌড়ে আরজুন এর কাছে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করছে বেশ পাগলের মতো করছে আরজুন কিছু বুঝতে পেরে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখলো লামিয়া কোথাও নেই। জ্যাকি ঘেউ ঘেউ করতেই আরজুন জ্যাকির দিকে তাকিয়ে বললো ” হোয়াট হ্যাপেন্ড চ্যাম্প?”
জ্যাকি ঘেউ ঘেউ করতে করতে লাইব্রেরীর বাহিরে আবার দৌড় দিলো। আরজুন কিছু বুঝতে পেরে জ্যাকির পিছন পিছন যেতেই দেখলো তিনটা গাড়ি এক সাথে ফুল স্পীডে চলে যাচ্ছে।
পিছন ফিরতেই দেখলো লামিয়ার হাতের ফোন আর বই পড়ে আছে। আরজুন কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে ফোন আর বই তুলতেই লামিয়ার ফোন বেজে উঠলো। আরজুন তাকাতেই স্ক্রিনে বিড়ালের আব্বা লেখা দেখতেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ বেশ অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো ” মিস কোথায় আছেন আপনি? আপনি ঠিক আছেন তো? হ্যালো মিস আমার কথা শুনতে পারছেন, মিস জবাব দিন হ্যালো।”
আরজুন গলা পরিষ্কার করে বললো ” হ্যালো।”
পুরুষের গলা শুনতেই শুভ্র বেশ সাবধান হলো। তবে ভিতরে ভিতরে ভয় করছে তার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর কন্ঠে বললো ” আপনি কে? আর যার ফোন সে কোথায়?”
” আমি ইন্সপেক্টর আরজুন সিং। তবে আপনি এই ফোনের মালিকের কে হন?”
আরজুন সিং এর নাম শুনতেই শুভ্র বেশ অবাক হলো।
তারপর আবার নিজের শান্ত রেখে বললো ” আমি ওর বাড়ির মানুষ। আপনি ফোনের মালিকের কাছে ফোনটা দিন।”
” ফোনের মালিক নেই।”
” নেই মানে?? কোথায় সে?” বেশ চিন্তিত গলায় জিগ্যেস করলো শুভ্র।
” তাঁকে হয়তো কেউ কিডন্যাপ করেছে।”
” কীহহ?” বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো শুভ্র।
” প্লিজ আপনি শান্ত হন এতো উত্তেজিত হবেন না। আপনি থানায় আসুন আমি সব কিছু বলছি। আর এখানে ওই মেয়েটার কু…”
আর বলতে পারলো না। শুভ্র তার আগেই ফোন কেটে দিয়েছে। শুভ্রর কেমন অস্থির লাগছে , নিজেকে পাগল পাগল লাগছে তাঁর। শুভ্র টিশার্ট পরে আলমারি থেকে চকচকে একটা পিস্তল বের করে কোমড়ে গুঁজে নিলো।
দ্রুত পায়ে হেঁটে নিচে আসতেই দেখলো রাশেদ অস্থির হয়ে তাঁর কাছেই আসছে। রাশেদ শুভ্র কে দেখে বুঝতে পারলো শুভ্র খবর পেয়েছে তাঁর আগেই।
শুভ্র কোনো কথা না বলে দৌড়ে চলে গেলো বাড়ির বাহিরে। পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করে বাইক নিয়ে ছুটলো সে থানার দিকে।
শুভ্র কে এভাবে বের হতেই বাড়ির কর্তিরা বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। রাশেদ কে জিগ্যেস করতেই রাশেদ বলতে চাইলো না । লতিফা বেগম আশেপাশে তাকিয়ে সবাইকে দেখতে পেলেও লামিয়া কে দেখতে না পেয়েই
তাঁর ভিতর মুচড়ে উঠলো। তাঁর কেনো জানি মনে হচ্ছে তাঁর মেয়ের কিছু হয়েছে। নয়তো শুভ্র এমন অস্থির হয়ে দৌড়াতো না। লতিফা বেগম ভেবেই হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো।
” আব্বা রে ওও আব্বা আমার লামিয়া কোথায়? আব্বা আমার লামিয়ার কিছু হয়নি তো আব্বা। ওও আব্বা কও না।” বলতে বলতে রাশেদ এর সামনে যেয়ে দাঁড়ালো। রাশেদ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে ছলছল চোখে।
চার মায়ের মুখের দিকে তাকালো রাশেদ। উপায় না পেয়ে সব বলে দিতেই মা চাচি রা সবাই ভেঙে পড়লো। রাশেদ তাদের শান্ত হতে বললো। বাড়ির কর্তারা তখন হল রুমে উপস্থিত হতেই সব কিছু শুনলো। তাঁরা চুপচাপ বসে আছে। আজমেরী বেগম হঠাৎ হেঁসে উঠলো। তাঁর হাঁসি দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকালো তাঁর দিকে। লতিফা বেগম রেগে বললো ” ছিঃ আম্মা আমার মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে আর আপনি হাসছেন?”
আজমেরী বেগম হাসতে হাসতে বললো ” হাসুম না তো কী করুম?? ওরা জানে না ওরা কারে তুইল্লা নিয়া গেছে। ওরা ইসলাম বাড়ির ডাকাতের সর্দারনী, আমগো শুভ্রর প্রাণ ভ্রমরা রে নিয়া গেছে। তোমরা কি মনে করছো মেজ বউ শুভ্র ওই বেডা গো ছাইড়া দিবো?? উহু একদম ই না। আর আমাগো শুভ্র লামিয়ার গাঁয়ে একটা আচর লাগতে দিবো না। শুভ্র যদি বনের রাজা হয় তাইলে মনে রাইখো আমগো লামিয়া কিন্তু সেই বনের রানী। শুভ্র লামিয়া রে যেই ট্রেনিং দিছিলো ওই ট্রেনিংয়েই লামিয়া চলে। তাই এতো চিন্তা কইরো না। এতোক্ষণে দেহো গা ওই কিডন্যাপার গো অবস্থা খারাপ হইয়া গেছে গা।”
সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আজমেরী বেগম এর দিকে। অবশ্য ভুল বলে নাই আজমেরী বেগম।
লামিয়া মারামারি তে বেশ ট্রেনিং প্রাপ্ত । নিজেকে রক্ষা করতে পারে সে। আর শুভ্র পাতাল থেকেও লামিয়া কে খুঁজে বের করবে তাও সবাই জানে। আল্লাহ জানে ওই কিডন্যাপার দের অবস্থা কেমন আছে। ভেবেই সবাই বেশ চিন্তায় পড়লো।
ফুল স্পীডে বাইক চালাচ্ছে শুভ্র। শুভ্র যে আজ মারাত্মক রেগেছে তা তাঁর মুখেই প্রকাশ পাচ্ছে। আজকে ওই লোকগুলো কে কতো গুলো পি*স করবে তা সে জানে না। তবে এইটুকু জানে এর পিছনে যেই থাকুক না কেনো আজ তাঁকে জিন্দা পুঁতে রাখবে সে।
” নিহিড় ফাস্ট গাড়ি বের করো।” বেশ চিৎকার করে বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নামলো কায়সার।
নিহিড় তা শুনে দ্রুত গাড়ি বের করতেই কায়সার সিটে বসলো। নিহিড় গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বললো ” কী হয়েছে বস কোনো সমস্যা? আপনাকে এতো অস্থির লাগছে কেনো?
কায়সার চোখ মুখ শক্ত করে বললো ” ওই বাস্টার্ড আমার বুলবুলি কে কিডন্যাপ করেছে। ছাড়বো না আজকে আমি কাউকে এর শেষ আমি দেখে নিবো আজ।”
নিহিড় আর কথা না বলে দ্রুত চলে গেলো মন্তব্যের দিকে।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৮
” বস আপনার তুষার রানী কয়েক ঘন্টা পর ই আপনার কাছে এসে উপস্থিত হবে।” বলেই চলে গেলো লোকটি।
” তুষার রানী, তুষার রানী, তুষার রানী। তাড়াতাড়ি চলে আসো বেবি। আমি যে আর ওয়েট করতে পারছি না।এই দিনটার জন্য আমি কতোদিন অপেক্ষা করছি তুমি কী জানো তুষার। তোমাকে দেখেছিলাম সেই তুষার পাতে। তোমার সেই তেজি চোখ আমাকে এখনো ঘুমাতে দেয় না তুমি কী জানো। না না না তুমি কিছুই জানো না, তবে আজ আমি তোমাকে জানাবো। আজকে রাতে তোমার বুকে মাথা রেখে সব বলবো তোমাকে। আর কয়েক ঘন্টা তারপর তুমি আমার, শুধু আমার, সারাজীবনের জন্য আমার। ”
বলেই হো হো করে হেঁসে উঠলো মার্কাস।
