প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৬ (২)
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
মেলার মাঝে গোল করে ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু লোকজন। কেউ কেউ সামনে তাকিয়ে হায় হুতাশ করছে আবার কেউ কেউ মুখ চেপে হাসছে। ইসলাম ও খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা ও দাঁড়িয়ে আছে এই ভীরে। তাদের মুখে কোনো হাই হুতাশ এর লক্ষণ নেই তাঁরা মুখ চেপে হাসছে। এইদিকে শুভ্র নিজের সাথে লামিয়া কে মিশিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া কে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে যেনো জানে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সে।
শুভ্রর সাথে মিশে দাঁড়িয়ে সামনে দৃষ্টি ফেলে মুখ টিপে হাসছে লামিয়া। ছবি কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
সামনেই মাটিতে গম্ভীর মুখ করে বসে আছে লাবিব। একটু আগে ষাঁড়ের গুঁতো খেয়েছে বেচারি। ভাগ্যে ভালো খুব বেশি একটা লাগে নি তার আগেই ষাঁড়ের মালিক এসে ষাঁড় টিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছে।
গম্ভীর মুখ করে লাবিব বসা থেকে উঠে দাঁড়াতেই চেঁচিয়ে উঠলো
” ওমাগো আমার কোমড়।”
লাবিব এর চেঁচানো শুনে সবাই মুখ সবাই আরো মুখ টিপে হাসছে।
ছবি কাঁদো কাঁদো মুখ করে এগিয়ে গিয়ে লাবিব কে ধরে উঠাতে উঠাতে বললো
” খুব বেশি ব্যাথা পেয়েছেন লাবিব ভাই??”
” আআ ছবি বেশি মানে অনেক বেশি লেগেছে। মনে হচ্ছে কোমড়ের সব হাড্ডি ভেঙ্গে গিয়েছে।”
লাবিবের কথা শুনে লামিয়া শুভ্রর পিছন থেকে মাথা বের করে ভাবুক কন্ঠে বললো
” ষাঁড় তো আপনার বামে গুঁতো দিয়েছে।
তাহলে কোমড়ের হাড্ডি কীভাবে ভাঙ্গবে?”
লামিয়ার এমন কথা শুনে লাবিব তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো
” একটা চড় দিয়ে চোপাড় দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব মেয়ে। সব হয়েছে তোদের জন্য।”
” আমরা কী করলাম??” বেশ অবাক হয়ে বললো লামিয়া।
” তোরা কী করছিস জানিস না তোরা?”
” না..!”
” আবার বলিস না।”
লামিয়া কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই রাশেদ তাদের থামিয়ে দিয়ে বললো
” হয়েছে তোদের ঝগড়া?? এখন থাম। চল বাড়ি যাই অনেক তো ঘোরাঘুরি হলো।”
লাবিব কোমড়ে হাত রেখে বললো
” হ্যাঁ হ্যাঁ চল আমিও থাকতে চাইছি না এখানে। ওমা গো কোমড় শেষ মনে হয়।” বলেই পাশ ফিরে ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে উঠলো
” বাসরের আগেই তোর ভাই – বোন আমার কোমড় টা ভেঙে দিয়েছে। ছাড়বো না আমি একজন কে ও ।”
” ছাড়াছাড়ি ধরাধরি সেটা না হয় পরে দেখবেন। এখন আগে নিজের হো*গার চিন্তা করুন।” মাহিরের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলো তায়েব।
লাবিব বিরক্ত চোখে তাদের দিকে তাকালো তারপর তায়েব এর কথার উত্তর না দিয়ে বললো
” বাড়ি যাবো চলো সবাই। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।”
” বাড়ি যাবো মানে?? এখনো কিছু খাওয়াই হয় নি। মেলার খাবারের কেমন টেস্ট তা ও খেয়ে দেখি নি। আমি যাবো না বাড়িতে এখন। বড় ভাই এখন যাবো না। ক্ষুধা লেগেছে আমাদের।” বলেই ঠোঁট উল্টালো তায়েবা।
তায়েবার কথা শুনে লামিয়া, মাহির, তায়েব ও তাঁর সাথে সাঁই দিলো। রাশেদ একবার তাঁর অসহায় ভাই – বোনদের দিকে তাকিয়ে আবার লাবিবের দিকে তাকিয়ে। তা দেখে লাবিব কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই শুভ্র গম্ভীর গলায় বলে উঠলো
” ওকে..! সবাই খেয়েই বাড়ি যাবে একসাথে।”
” তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস?? আমার এ অবস্থায় তু…।”
লাবিবের কথা থামিয়ে দিয়ে শুভ্রর ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো
” তোর এতোটাও ব্যাথা লাগে নি যতোটা তুই দেখাচ্ছিস।”
শুভ্রর কথা শুনে লাবিবের চেহারা চুপসে গেলো। তা দেখে শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সবার উদ্দেশ্যে বললো
” কে কী খাবি তা লিস্ট করে ফেল।”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়ার চোখের চকচক করে উঠলো। শুভ্রর হাত ধরে ঝটপট বলে উঠলো
” ফুসকা, ঝালমুড়ি , তারপর ওইখানে নিমকি, আচার দেখেছি শুভ্র ভাই আমি ওইগুলো সব খাবো।”
লামিয়ার কথা শুনে শুভ্র পাশ ফিরে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে সুক্ষ্ম হাসলো।
সবার সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাই খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্য রোওনা দিলো।
ছবি লাবিবের হাত আঁকড়ে ধরে হাঁটছে।
এদিকে লামিয়া যা যা পছন্দ করছে শুভ্র তাই তাই নিয়ে দিচ্ছে তাঁকে। বেশ কিছুক্ষণ সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে টুকটাক কথা বলতে বলতে হাঁটা ধরলো বাড়ির দিকে।
বেশ ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে পৌঁছালো সবাই। বাড়িতে প্রবেশ করে কেউ আর এক মূহুর্ত কোথাও না দাঁড়িয়ে চলে গেলো নিজেদের রুমে। আজ আর কেউ রাতে খাবে না। তাই ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সবাই।
রাত তিনটা
শীতের রাত, স্তব্ধ চারপাশ। কুয়াশা পড়েছে চারদিকে।
হঠাৎ কারোর চিৎকার এর শব্দ শুনে ঘুম ভাঙলো শুভ্রর। ধরফর করে উঠতে বসতেই শুনতে পেলো কেউ শিস বাজাচ্ছে। শুভ্র কিছু আঁচ করতে পেরে বিছানা থেকে উঠতেই একটা তীর তাঁর পাশ কেটে চলে গেলো। শুভ্র আঁতকে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো।
হঠাৎ বাহির থেকে কারোর চিৎকারের শব্দ পেতেই দৌড়ে বেলকনিতে গিয়ে সামনে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো দৌড়াতে থাকা দুটো মানুষের এর দিকে।
সামনে একটি কালো পোষাক পরা লোক রক্তাক্ত শরীরে নিজের জান বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে জঙ্গলের দিকে। তাঁর পিছনেই একটা বড় রাম দা নিয়ে দৌড়াচ্ছে একটা অবয়ব। পুরো শরীরে জড়িয়ে আছে কালো কাপড়। কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা । যার কারণে মুখ দেখা যাচ্ছে না তাঁর। চোখ দুটো শুধু বের করে আছে।
শুভ্র আর দেরি না করে ড্রয়ার থেকে গান বের করে কোমড়ে গুঁজে, দ্রুত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে লোকটা। নিজের জান বাঁচাতে লোকটা একটা জঙ্গলের মাঝে এসে বুঝলো, পালানোর আর কোনো পথ নেই এখানে। লোকটা নিজের জান বাঁচাতে আশেপাশে তাকিয়ে পাগলের মতো রাস্তা খুঁজতে লাগলো।
হঠাৎ পিছন থেকে শিস বাজাতে বাজাতে কেউ ধীর পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝতে পেরে লোকটা পিছনে ঘুরে তাকাতেই এক কো*প এসে পড়লো লোকটার হাতে। লোকটা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাত চেপে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সামনে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে আকুতি মিনতি করতে করতে বললো
” প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও। আমার ভুল হয়েছে। মাফ করে দাও এবারের মতো।”
লোকটির এমন আকুতি দেখে সামনে থাকা মানুষটি উচ্চ স্বরে হেঁসে বলল
” ছেঁড়ে দিবো?? আচ্ছা..! ঠিক আছে ছেঁড়ে দিবো। তবে আগে বল কে পাঠিয়েছে তোকে?”
” জা….জানি না।”
” যদি নিজের ভালো চাস তো বলে ফেল ভালোয় ভালোয়। নয়তো..!” বলেই লোকটার দিকে এগোতেই লোকটা ভয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো
” বলছি বলছি মেরো না আমাকে।”
” গুড..! বলে দ্রুত বল।”
লোকটা ভয়ার্ত গলায় বলতে লাগলো। সব কিছু শুনতেই সামনে থাকা অবয়ব টির চোখ জ্বলে উঠলো।
” আ… আমি সব বলেছি এবার আমাকে দাও। তুমি বলছো সত্যি বললে ছেঁড়ে দিবে আমাকে।”
অবয়বটি বাকা হেঁসে বলল
” বলেছি ছেঁড়ে দিবো। কিন্তু বলিনি মারবো না।”
বলেই হাতের রাম দা উঠিয়ে যেই না কো*প দিতে যাবে তাঁর আগেই পিছন থেকে শুভ্র বলে উঠলো
” থামুন। আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। নয়তো আমি শুট করতে বাধ্য হবো।”
কথাটা শুনে অবয়ব টি রক্ত চোখে পিছনে ঘুরে শুভ্রর দিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র গান তাঁর দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে অবয়ব টি ঘাড় কাত করে শুভর কে দেখে আবার পিছনে ফিরে লোকটি কে মারার জন্য প্রস্তুত হতেই শুভ্র চেঁচিয়ে উঠলো
” আমি অর্ডার করছি। আপনার হাতে থাকা ওই দা ফেলে দিন। আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। নয়তো আমি শুট করবো।”
কথা টা শুনে অবয়ব টি শুভ্রর দিকে ঘাড় কাত করে তাকালো।
তারপর ধীর গলায় গুণগুণ করতে করতে বলে উঠলো
কারো আদেশ মানিনা আমি চির স্বাধীন
আমি না মানি আইন আমি না কারো অধীন
যেন আমি শ্রেষ্ঠশুধু আমিই সঠিক
কেবল আমিই সত্য পুরা দুনিয়া ব্যাঠিক
বলেই হাত উঁচিয়ে আঙুলের সাহায্যে তুড়ি বাজাতেই দূর থেকে একটা তীর লোকটার বুকে এসে বিধতেই লোকটা চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাতারে লাগলো। শুভ্র অবাক চোখে তাকিয়ে আছে কাতরাতে থাকা লোকটার দিকে। তীর টা কোথা থেকে আসলো বুঝতে পারলো না সে। আশেপাশে চোখ বোলাতে লাগলো।
সেই সুযোগে অবয়ব টি রাম দা ফেলে সামনের দিকে দৌড় দিলো। শুভ্র তা দেখে অবয়বটির পিছনে ছুটতে লাগলো। ছুটতে ছুটতে শুভ্র অবয়বটি কে ধরে ফেললো। অবয়বটি নিজেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। এক পর্যায়ে তাদের ধস্তাধস্তি শুরু হলো। শুভ্র অবয়বটির মাথার কাপড়ে হাত রাখতেই অবয়ব টি কোমড় ধরে ছোট্ট একটা ছু*রি বের করে শুভ্রর হাতে এক টান দিলো । শুভ্র রেগে এবার অবয়বটি মাথার কাপড় এক টানে খুলে, অবয়বটির হাত থেকে টেনে ছু*রি নিজের হাতে নিয়ে অবয়ব টির গলয় ধরলো। শুভ্র এখনো মুখ দেখতে পাই নি, তবে এক জোড়া তেজি চোখ ঠিক দেখতে পেয়েছে সে। অবয়বটি বাঁকা হেঁসে হাত বাড়িয়ে নিজের খোঁপায় আটকানো চুলের কাঠি খুলতেই এক গুচ্ছ চুল ঝরঝর করে আঁচড়ে পড়লো তাঁর পিঠে। শুভ্র অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অবয়বটির চুলের দিকে ।
শুভ্র কে অন্য মনস্ক হতে দেখে অবয়বটি শুভ্রর বুক কাঠি দিয়ে আঘাত করতেই শুভ্র ছিটকে দূরে সরে গেলো। সে সুযোগে অবয়বটি আবারো দৌড় দিলো। শুভ্র তা দেখে যেই না অবয়বটির পিছনে ছুটতে যাবে তাঁর আগেই এক সাথে কয়েকটা তীর এসে পড়লো তাঁর পায়ের সামনে। শুভ্র আর এগোতে পারলো না। সে আশেপাশে তাকিয়ে সামনে দৃষ্টি ফেলেতে দেখলো কেউ নেই। তবুও শুভ্র স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো সামনের দিকে। তখনই দূর থেকে শিস এর শব্দ ভেসে আসলো।
প্রিয় রাগিনী ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল
তোমাকে ছাড়া এ আকাশ সাজে না
সহজে তো বাতাসে বাঁশি বাজে না
চলো না আজ এ রূপকথা
তোমাকে শোনাই
সারাটা দিন
ঘিরে আছো তুমি এত রঙ্গীন
হয়নি কখনও মন
সারাটা রাত
আসছে না ঘুম ধরেছি হাত
থাকবো সারাজীবন
