Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৪
সাইদা মুন

কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ থেমে গেল তালহা। চারপাশে যেন এক মুহূর্তে নেমে এলো গাঢ় নীরবতা। নিচু, মোলায়েম স্বরে সে বলল,
—চোখ খুলবে না।
কথাটি উচ্চারণ করেই আলতো করে সরিয়ে নিল হাত। মেহরীন অনুগত শিশুর মতো চোখ বন্ধ রেখেই দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই আচমকা তাকে কোলে তুলে নিতেই সে চমকে উঠে দুহাতে জড়িয়ে ধরল তালহার গলা। বিস্মিত, লজ্জাভরা কণ্ঠে ফিসফিস করল,
—আরে.. কী করছেন?
উত্তরে তালহা তাকে থামিয়ে দিল,
—হুশশশ..
এই শব্দেই যেন থেমে গেল তার সব প্রশ্ন। বুকের ভেতর টিপটিপে ধ্বনি, কৌতূহলে ভরা অস্থিরতা, তালহা কী করতে চলেছে? অজানা প্রত্যাশায় কেঁপে উঠছে মন। কয়েক পা এগিয়েই সে আস্তে করে নামিয়ে দিল তাকে। তবু নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানছে মেহরীন, চোখ এখনো বন্ধ।
মৃদু স্বরে তালহা এবার অনুমতি দিল,

—ইউ ক্যান ওপেন ইয়োর আইজ নাউ।
এই বাক্যটির অপেক্ষাতেই যেন স্থির হয়ে ছিল সে। কথাটা শুনতেই, ধীরে ধীরে চোখ মেলতে লাগল। সামনের দৃশ্য স্পষ্ট হতেই বিস্ময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়ে উঠল তার দৃষ্টি। ঠোঁট খানিকটা ফাঁক, শ্বাস যেন আটকে আছে। পলকহীন চাহনিতে চারদিক দেখছে, স্তব্ধ সে।
ছাদের এই প্রান্তর জুড়ে ফুল আর সারি সারি ছোট্ট মোমবাতি দিয়ে তৈরি বিশাল এক হার্ট। সেই হার্টের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে। পায়ের নিচে নরম পাপড়ির স্পর্শ। মোমের আলো দপদপ করে জ্বলছে, হালকা বাতাসে শিখাগুলো দুলে উঠছে বারবার। সেই আলো এসে পড়ছে তার মুখে, চোখে, অবিশ্বাসে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের কোণে। চারপাশ যেন স্বপ্নের আবরণে মোড়া, স্পষ্ট এবং অসম্ভব সুন্দর। অবাক হয়ে চারদিক খুঁটিয়ে দেখার মাঝেই তালহার হালকা গলা ঝাড়ার শব্দে ভাঙল তার ধ্যান। সামনে তাকাতেই বুক ধক করে উঠল।
গাঢ় নীল পাঞ্জাবি পরা মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক সামনেই। তার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। দুহাত পেছনে রাখা, ঠোঁটে চেনা সেই বাঁকা হাসি। চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি। আশেপাশের এসব দেখতে দেখতে তালহাকে যে সে খেয়ালই করেনি। মেহরীনের কণ্ঠ কাঁপল, প্রশ্ন করল,

—এসব কী?
তালহা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
—ছোট খাট এরেঞ্জমেন্ট, ফর মাই বিউটিফুল ওয়াইফ..
কথা শেষ হতে না হতেই এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। মেহরীন যেন বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল। এত চমক! এত অপ্রত্যাশিত কাজকর্ম করছে তালহা। তার বিস্ময়ভরা চোখে চোখ রেখে তালহা নরম স্বরে বলল,
—বিয়ের পাচঁ মাস হয়ে যাচ্ছে, এখন অব্দি আমি তোমাকে প্রপোজই করিনি। এরজন্য হয়তো তুমি আমাকে মনে মনে নিরামিষ ও বলতে পারো। আই নো, প্রতিটি মেয়েরই ড্রিম এরকম একটা প্রপোজাল পাওয়ার। আর আমার বিউটিফুল লেডি তো আরও বেশি ডিজার্ভ করে এমন বিউটিফুল একটা প্রপোজাল। তাই আমি আমার ম্যাডামকে একটু স্পেশাল ফিল করানোর ছোট খাটো প্রচেষ্টা করছি।

বলতে বলতেই ডান হাতটা এগিয়ে দিক মেহরীনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে নজরে আসে ছোট্ট একটা রিং বক্স। যা খোলা, ভেতরে নরম কালো ভেলভেটের ওপর রাখা একটি ডায়মন্ডের আংটি, যার ছোট্ট সাদা পাথরটা ঝকঝক করছে। বক্সের উপরের পার্টে ছোট নীলচে আলো জ্বলছে, যা সরাসরি আংটিতে পড়ছে। আংটির পাথরটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে। আলোটা এমনভাবে পড়ছে যেন আংটিটা নিজেই আলো ছড়াচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতেই তালহা বাম হাতটাও সামনে আনল। সে হাতে সাদা গোলাপের একটি মাঝারি সাইজের তোড়া। গোলাপগুলো সতেজ, পাপড়িগুলো মোলায়েম আর নিখুঁতভাবে ফুটে আছে। মেহরীন নিরবে পর্যবেক্ষন করছে জিনিসগুলো।
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ধীরে ধীরে কথা শুরু করল,

—জানিনা, লোকে কিভাবে প্রপোজ করে। কিভাবে গুছিয়ে কথা বললে একটা মেয়ের মন গলে যায়, তা আমি সত্যিই জানি না। কথাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সত্যিই আমি জানি না। উড়াউড়ির বয়স থেকেই নিজেকে গম্ভীর করে তুলেছিলাম, কাজে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছিলাম। তাই হয়তো লাভ লাইফ সম্পর্কে আমার এক্সপেরিয়েন্সটা একটু কম। তবে চিন্তা করবেন না, এতে আপনার উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। আপনাকে স্পেশাল ফিল করাতে আমি আমার হান্ড্রেড পার্সেন্ট দেব।
বলেই সামান্য থামল, যেন পরবর্তী কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। মেহরীনের পুরো শরীরে অদ্ভুত এক আনন্দের স্পন্দন ছুটাছুটি করছে। চোখ ভরে দেখছে সে আকুলতায় ভরা তালহার চোখ। মন দিয়ে শুনছে সে তালহার প্রতিটি শব্দ, অপলক তাকিয়ে আছে। তালহার চোখ এবার আরও নরম ভাব ধারণ করল, ধীরস্বরে, কোমল কণ্ঠে বলল,

—শুনুউউন না..
শেষের টুকুটা টেনে বলতেই মেহরীন চোখ বুজে নিল। বুকের ভেতর অনুভূতিগুলো তড়িৎ গতিতে ছোটাছুটি করছে। যা ভীষণ সুরসুরি দিচ্ছে যেন তাকে। তালহা কি তার কথা দিয়েই তাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে? এত সুন্দর করে ডাকছে কেন? সে কি জেনে বুঝেই এমন সম্মোধন করছে? উত্তাল আবেগের মধ্যেই তালহা আবার ডাকল,
—ম্যাডাম, শুনুউউউন..
মেহরীন চোখ ফট করে খুলল। জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল, নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—ব..বলুন।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি চাই, আপনার দায়িত্ববান স্বামী হওয়ার পাশাপাশি একজন পাগল প্রেমিকও হতে। আপনি কি পারবেন আমার বউ হওয়ার পাশাপাশি একজন প্রেমিকা হয়ে উঠতে? প্রেমটা নাহয় সংসারের ফাঁকে ফাঁকে করব। মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রীর রোল থেকে একটু বিরতি নিয়ে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে উঠব।
বলেই সে ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিল, মুঁচকি হাসিতে জিজ্ঞেস করল,

—হবেন কি?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে মাথা উপর-নিচু করল। যার অর্থ হ্যা। তোড়াটা হাতে নিল আস্তে করে। মুখে হাসি লেগেই আছে মেয়েটার, যেন জয়ের আনন্দের এক আলোকবর্তিকা। আবেগমাখা কণ্ঠে বলল,
—হ্যা হতে চাই, হতে চাই আমি আপনার সব। আপনার সবকিছুতে শুধু আমি থাকতে চাই, সবজুড়ে।
বলতে বলতেই একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল চোখ বেয়ে। অশ্রুটা আনন্দের। ফুলের তোড়াটা বুকে জড়িয়ে ধরল, নাকের কাছে এনে তাতে নাক ডুবাল। চোখ বুজে মন ভরে ঘ্রাণ নিতে লাগল। তালহা মুচকি হেসে দেখছে প্রিয়তমাকে। মন থেকে বেরিয়ে এল শান্তির দীর্ঘশ্বাস। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে বলল,

—হেই, বিউটিফুল, আপনি কি আমার এই ছোটখাট উপহারটাও গ্রহণ করবেন?
মেহরীন চোখ খোলল৷ তালহার হাতের রিং টা দেখে সঙ্গে সঙ্গে ডান হাত বাড়িয়ে দিল। হাসিমুখে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তালহাও সযত্নে হাতটা ধরল। ধীরে ধীরে রিংটি মেহরীনের অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল সেখানে। একেঁ দিল গভীর এক চুম্বন। মাথা তুলল এবং বলল,
—ভালোবাসি বউ, ভীষণ ভালোবাসি। তুমি আমার জীবনের এক অপ্রত্যাশিত পাওয়া, কিন্তু সেই অপ্রত্যাশিততার মধ্যেও সবচেয়ে মূল্যবান ও জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। মাঝে মাঝে ভাবি, যদি সেদিন আমি তোমাকে না পেতাম। ভাবনাটা মনে আসতেই বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠে। তোমাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও কাটানো অসম্ভব। ছেড়ে থাকার কথা ভাবতেই কেমন পাগল হয়ে যাই। আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে পাশে চাই, মেহরীন। থাকবে তো?
মেহরীন ঠোঁট কামড়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করল। এক হাতে তালহাকে টেনে তুলে দাঁড় করাতে চাইল, তা বুঝে তালহা নিজেই উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন তালহার বুকে ঝাপটে পড়ল। মুহূর্তে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। কাঁদতে কাঁদতেই বলল,

—আমিও ভালোবাসি আপনাকে ভীষণ, ভীষণ ভালোবাসি। নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।
তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে তালহা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেহরীনকে। চুলের ভাজে হাত ঢুকিয়ে মাথাটা বুকে চেপে ধরল। শান্তি-শান্তি অনুভব হচ্ছে। চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল,
—এটা তোমার জায়গা, শুধুই তোমার।
প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তারা একে অপরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশব্দ ছাদের মাঝে কেবল তাদের হৃদস্পন্দনের ধকধক শোনা যাচ্ছে। একে অপরকে অনুভব করছে নিরবে। মেহরীন তালহার বুকে কান ঠেকিয়ে শোনছে ধকধক শব্দটা, মনে হচ্ছে ধড়ফড়ানি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মাথা তুলে এবার ডান হাতটা রাখল ঠিক সেখানে। হালকা স্বরে বলল,

—এই জায়গাটা একটু বেশিই ধকধক করছে।
তালহা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—ধকধক না, মেহরীন মেহরীন করছে। ভুল শুনছো।
মেহরীন ফিক করে হেসে ফেলল। তালহাকে ছেড়ে দাঁড়াল। আবার চারপাশের ডেকোরেশন খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সিম্পল কিন্তু মনকাড়া। হাতে থাকা ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখছে, প্রতিটি পাপড়ি যেন নিজের সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। কি সুন্দর দেখাচ্ছে। চাঁদের আলোয় যেন সাদা গোলাপের রূপ আরও বাড়ছে। মুগ্ধ স্বরে বলল,
—ফুলগুলো ভীষণ সুন্দর।
তালহা প্রতিউত্তরে বলল,
—তবে আমার ফুল থেকে কম।
মেহরীন আড়চোখে তাকাতেউই তালহা হালকা চোখ টিপে দিয়ে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিল। মেহরীন কপাল কুচকে বলল,
—মশাই, দুষ্টু হয়ে যাচ্ছেন।
তালহা পকেটে হাত গুঁজে ঠোঁট উল্টে বলল,

—দুষ্টু আর হতে দিল কই? বউকে সাথে নিয়ে থাকতে দিবে না। থাকলে নাহয় আরও কিছুমিছু দুষ্টুমি দেখাতাম।
কথা বলতে বলতেই তালহা ধীরে ধীরে মেহরীনের দিকে ঝুঁকে এলো। মেহরীন হালকা ধাক্কা দিয়ে সরে দাঁড়াল, চোখ-মুখ কুচকে বলল,
—বড্ড নির্লজ্জ হচ্ছেন।
তালহা চুল ঠিক করতে করতে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—লজ্জা নারীর ভোষণ, পুরুষের নয়।
মেহরীন তার কথায় আর কান দিল না। গোলাপের পাপড়ি আর ছোট ছোট ক্যান্ডেল দিয়ে তৈরি হার্টের ঠিক মাঝ বরাবর মেঝেতে বসল সে। চারপাশে নিঃশব্দের রাজ্য, শহরের আলো দূরে ঝাপসা হয়ে গেছে। মাথার ওপরে অন্ধকার আকাশে ঝিকিমিকি করছে চাঁদ আর তারারা। হালকা বাতাসে ঠান্ডার স্নিগ্ধতা, মৃদু শীতলতা।
মেহরীন এবার তালহার পাঞ্জাবির কোনা ধরে টানল। তাকে বসতে ইশারা করতেই তালহাও পাশে এসে বসল। দুহাত পেছনে রেখে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল, মনে গভীর প্রশান্তিরা ঢেউ তুলছে। তাদের ঘিরে থাকা মোমবাতিগুলোর নরম আলো জ্বলছে, ছোট ছোট শিখা হালকা বাতাসে দুলছে। কয়েকটা নিভে গেছে, বাকি কয়েকটা আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলো সরাসরি এসে তালহার মুখে নরম দীপ্তি ফেলছে, যা তালহাকে মেহরীনের চোখে আরও মায়াময় করে তুলেছে।

গভীর মনোযোগে মেহরীন পরখ করছে তার শ্যামপুরুষকে। এই মানুষটা শুধুই তার। কথাটা যত ভাবছে, ততই ভালো লাগছে। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন আসত, তালহার এত ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য কি সে? কিন্তু তালহা সে প্রশ্ন মনে গেঁথে রাখার উপায় রাখছে না। তার আচরণ, যত্ন, স্পর্শ সবকিছুতে তাকে অনুভব করায় সে ভীষণ স্পেশাল। হঠাৎ মেহরীনের দাদির কথা মনে পড়ছে অনেক। একবার অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েছিলেন তিনি। তখন বলেছিলেন,
—দেখিস মেহরীন, তুই অনেক সুখী হবি। এত অবহেলায় তোর বাকিজীবন যাবে না। তোর জীবনে অনেক সুখ আসবে। এমন কেউ আসবে যে তোকে আগলে নিবে।
মুখে প্রশান্তির হালকা হাসি ফুটল। ইচ্ছে হচ্ছে, দাদিকে কবর থেকে তুলে সামনে বসিয়ে বলতে,
—দাদি দেখো, অযত্নে ঝরে পড়া ফুলটাকে এই মানুষটা কত যত্ন করে তুলে নিয়েছে। তোমার মেহরীন ভীষণ ভালো আছে।
নানান ভাবনার মাঝেই তালহা ফিরে তাকাল। এক ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল,

—কি দেখ?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে নির্দিদ্বায় উত্তর দিল,
—আপনাকে….
তালহা মৃদু হেসে ফেলল। মেহরীনের চোখে চোখ রেখে সে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল,
—দেখার মতো কি আছে?
মেহরীন একটু থামল। চোখ সরাল না। মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
—বর্ণনা করে কুলাতে পারবো না। আপনি খুব আকর্ষণীয়, চুম্বকের মতো।
তালহার ঠোঁট আরও প্রসারিত হলো। চোখ পিটপিট করে বলল,
—ফ্লার্ট করছেন ম্যাডাম?
মেহরীন এবার সোজা হয়ে বসল। তার ভঙ্গিতে একফোঁটা অস্থিরতাও নেই। ধীরে ধীরে তালহার এক বাহু জড়িয়ে ধরল, কাঁধে মাথা রেখে নরম স্বরে বলল,
—দেখুন, আমি তো আমার মনের কথাই বলেছি। বাকিটা আপনি যা মনে করেন।
তালহা মৃদু হাসল, তবে আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। কখনও কখনও ভাষা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। নীরবতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গভীর সংলাপ। সেই স্তব্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক আকাশসম প্রশান্তি। দুজনেই তাই চুপ। কথা নয়, অনুভূতিই আদান-প্রদান হচ্ছে। দৃষ্টির ভেতর দিয়ে, শ্বাসের ছন্দে, স্পর্শে, হৃদস্পন্দনের অনুচ্চারিত সুরে তারা একে অপরকে আবিষ্কার করছে।
হঠাৎ সেই নিরবতা ভেঙে তালহা নরম স্বরে আবদার করল,

—একটা গান শোনাও না, বউ।
মেহরীন কিছুটায়া থমকাল বউ ডাকটা শুনে। পরক্ষণেই মুখে আলতো হাসি ফুটল। মাথা নেড়ে বলল,
—উঁহু, আমি পারি না।
তালহার গলায় জেদ দেখ দিল,
—না, পারবে।
মেহরীন একটু ভেবে বলল,
—গাইব, তবে আপনাকেও গাইতে হবে।
চাপা হাসিতে সম্মতি জানাল তালহা,
—যা হুকুম।
মেহরীন আরও আরাম করে মাথা রাখল তার কাঁধে। বাহুটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, সে ধীরে ধীরে সুর তোলে,
“ভাবিনি কখনো,
এ হৃদয় রাঙানো,
ভালোবাসা দেবে তুমি।
দুয়ারে দাঁড়িয়ে,
দু’বাহু বাড়িয়ে,
সুখেতে জড়াব আমি..”
শেষ শব্দটি মিলিয়ে যেতেই তালহা আলতো করে তার মাথা নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে বুকে টেনে নিল। কাঁধে ভিজে উষ্ণতা টের পেয়ে বুঝল, মেয়েটার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পরম মমতায় তাকে আগলে রাখল সে। মেহরীনের চুলে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল বেশ কয়েকবার, যেন আশ্বাস দিচ্ছে প্রতিটি স্পর্শে।
কানের কাছে মুখ এনে মৃদু ঠাট্টায় বলল,

—বাচ্চা বিয়ে করার এই এক ঝামেলা, কথায় কথায় কেঁদে ফেলে।
সঙ্গে সঙ্গে কথাটা মেহরীনের গায়ে লাগল। হাতের ছোট্ট মুঠোটা ধপ করে পড়ল তালহার বুকে। কিল বসিয়েই অভিমান মেশানো স্বরে বলতে লাগল,
—তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন? বড় কাউকে করলেই তো পারতেন। ছাড়ুন আমায়..
তালহার উচ্চ হাসি ছড়িয়ে পড়ল রাতের নীরবতায়। হাতের বাঁধন নরম হলো না, বরং আরও দৃঢ় হলো। মেহরীনকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। সেই আঁকড়ে ধরা উষ্ণতার মাঝেই সে গেয়ে উঠল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৩

“বন্ধে মায়া লাগাইছে,
পিরিতি শিখাইছে,
দেওয়ানা বানাইছে..
কী জাদু করিয়া গো বন্ধে,
মায়া লাগাইছে..”
গানের সুরে, স্পর্শের নিশ্চয়তায়, ভালোবাসার নিশ্চুপ অঙ্গীকারে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল মেহরীন। তালহার বুকে মুখ লুকিয়ে স্থির হয়ে রইল সে, যেন এটাই তার নিরাপদ পৃথিবী, এটাই তার আশ্রয়। খোলা আকাশের নিচে, মোমের ক্ষীণ আলো আর নেই। নিভে গেছে সেই কবেই। এখন আছে কেবল চাঁদের আলো আর ফুলের গন্ধ মিশে আছে বাতাসে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৫