মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৭
Tahmina Akhter
মেঘালয়ের চোখ জ্বালা করছে খুব৷ আপন সহোদরের সামনে চোখের জল দেখালে বিষয়টা অস্বস্তি বাড়ায়। তাই মেঘালয় “রাখছি” বলেই কল কেটে দেয়।
মাথার নীচে দু-হাত ভাজ করে ছাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কে আমার? আমার স্ত্রী! আমার অকালমৃত সন্তানের মা! আর কি পরিচয় আছে তোমার?”
কথাগুলো বলতে বলতে মেঘালয় চোখ বন্ধ করে ফেলল৷ মাথার ভেতরে সূচালো ব্যাথা অনুভূতি হচ্ছে। পাশ ফিরে কাত হয়ে শুয়ে পরল। আরেকটা বালিশ তুলে মাথার ওপর চেপে ধরল। কিন্তু ব্যাথা কমছে না। মেঘালয় জানে এই ব্যাথা সহজে কমবে না। তাই সে মাইন্ডের সঙ্গে ট্রিক করবে। নিজের মাইন্ডকে ধোঁকা দেয়ার ট্রিক সে খুব ভালো করেই জানে৷ চোখ বন্ধ করে ফিরে গেল আটবছর আগে। আলো এবং তার বিয়ের তখন মাত্র পনেরো দিন চলছিল।
মেঘালয় আগ্রাবাদ জ্যামে আঁটকে আছে। দুপুরের প্রখর রোদে আপাতত মাথার তালু গরম হয়ে যাচ্ছে। মাথার হেলমেট খুলে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
এমনসময় রাস্তার পাশে ফুলের দোকানের ওপর নজর পরল। আলোর মুখটা চেহারার ওপর ভেসে ওঠল। বাইক ঘুরিয়ে ফুলের দোকানের দিকে চলল। দোকানের সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে মেঘালয় দোকানের ভেতরে ঢুকে পরল। লাল গোলাপের সামনে দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে পরল সে। একটা লাল গোলাপ কিনে নিলো। ফুলের দাম মিটিয়ে বাইক নিয়ে ছুটল মার্কেটে। শাড়ির দোকান ঘুরে একটা লাল রঙের কাতান শাড়ি কিনে ফেলল। ম্যাচিং লাল চুড়ি, লাল টিপ কিনে নিলো। তারপর, বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলো সে। বাড়িতে পৌঁছানোর পর দেখল কেউই নেই। তার মা, কাব্য-ইতি এবং মাশফি-তানিয়া গিয়েছে তাদের মামার বাড়িতে। বাড়িতে একা রয়ে গেছে আলো। আলো যাবে তবে মেঘালয় ফিরে আসার পর এমন কথা বলে গিয়েছে মাহরীন৷ মেঘালয়কে দেখে আলো শ্বাশুড়ির বলে যাওয়া কথাগুলো বলে থামল। মেঘালয় শাড়ির ব্যাগটা, চুড়ির ব্যাগ এবং টিপের পাতা আলোর হাতে দিয়ে বলল,
— দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসবে।
আলো কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল মেঘালয়ের মুখের দিকে। মেঘালয় আলোর দুই কাঁধ ধরে সামনের দিকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে বলল,
— কুইক মিসেস মেঘালয়।
আলো দৌঁড়ে চলে গেল তার শ্বাশুড়ির ঘরে। মেঘালয় চলে গেল তার ঘরে। গোসল শেষ করে টাওয়াল দিয়ে ভেজাচুল মুছতে মুছতে চলে এলো তার মায়ের ঘরের সামনে। দরজায় দু’বার নক করতেই আলো দরজা খুলল। মেঘালয় থমকে গেল। চোখের সামনে যেন এক অপার্থিব দৃশ্য। লাল শাড়ি, কাজল চোখের মেয়েটির রুপ দেখে আপাতত মেঘালয়ের গলা শুকিয়ে গেছে। মেঘালয় একহাত বাড়িয়ে আলোর কোমড় জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে এনে দাঁড় করালো। আলো লজ্জায় কুঁকড়ে গেছে। আলোর দুইহাত মেঘালয়ের উন্মুক্ত ভেজা বুকের ওপর। মেঘালয়ের হাতদুটোর বাঁধনে আটকা পরেছে আলো। আলোর নত মুখটার দিকে তাকিয়ে মেঘালয় নেশাক্ত কন্ঠে বলল,
— আজ মামারবাড়িতে না গেলে হয় না?
আলো কথাখানি শুনে বিস্মিত হয়ে তাকালো। মেঘালয় আলোর মুখটা এবার খুব স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে। একহাতে আলোর কোমড় জড়িয়ে রেখে অন্য হাত দিয়ে আলোর কপালের দেয়া বাঁকা টিপ সোজা করে দেয়। আলো চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল লজ্জায়। বিয়ের কদিন হলো মাত্র। এত কাছে দাঁড়িয়ে থেকে মানুষটার চোখে চোখ রাখা তার কাছে বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে কম নয়। মেঘালয় আলোর বন্ধ দুচোখের দুই পাতায় চুমু দিলো স্বশব্দে। আলো কেঁপে উঠল ভয়ে। তার মনে হলো এই ঘরের চারদেয়ালের বাইরে চুমুর শব্দ বেরিয়ে গেছে। লজ্জায় কি আর চোখ খোলা যায়? পরক্ষণেই টের পেলো মেঘালয়ের বাঁধন থেকে সে মুক্ত হয়েছে। তবে মেঘালয় তার চুলে হাত যে রেখেছে টের পেলো।
— আয়নায় দেখে এসো তো।
মেঘালয় কথাটি বলেই মুচকি হাসে। আলো মেঘালয়ের কথা শুনে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। খোঁপায় গুঁজে রাখা লাল গোলাপের ওপর হাত রাখল। তারপর মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ধন্যবাদ, ডাক্তার সাহেব৷
আলোর মুখ থেকে ধন্যবাদ শুনে মেঘালয় দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বলল,
— আমার ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই আলো। তবে ধন্যবাদের বদলে অন্যকিছু দিলে আই অন্ট মাইন্ড।
মেঘালয়ের কথায় বোধহয় আফিম মেশানো ছিল! নয়তো আলোর মাথায় নেশা চড়ে গেল কেন?
সন্ধ্যায় মাহরীন কল করলো আলোর নাম্বারে। মেঘালয়ের বুকে ঘাপটি মেরে বেঘোর ঘুমিয়ে ছিল আলো । আলোর মোবাইল হাতে নিয়ে কল রিসিভ করলো মেঘালয়।
— কি রে তোরা এখনো আসছিস না যে?
—আলোর পেট খারাপ হয়েছে, মা ।
— সে কি! ঔষুধ খাইয়ে দে। আমি ফিরে আসব?
— তোমার ফিরতে হবে না। ওকে ঔষুধ খাইয়ে দিয়েছি আমি।
— আচ্ছা, সাবধানে থাকিস। আমরা আগামীকাল বিকেলে ফিরব।
মাহরীন কল কেটে দেয়ার পর আলো মেঘালয়ের বুক থেকে মাথা তুলে বলল,
— আপনি তো সাংঘাতিক মিথ্যাবাদী! আমার পেট খারাপ হলো কখন?
— তো সত্য বলব! তাহলে মা’কে আমি কল করে জানিয়ে দেই, মা তোমার ছেলে আপাতত বৌয়ের রুপের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের লোকদের খবর দাও। হৃদয়ের দহন বন্ধ করতে পানি ঢালতে হবে তো।
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো নির্বাক হয়ে গেছে। রাগ দেখিয়ে উঠে যাবে ঠিক তখনি মেঘালয় আলোর হাত টেনে ধরল। আলো আছড়ে পরল মেঘালয়ের বুকের ওপর। মেঘালয় মাথা সামান্য উঁচু করে আলোর নাকের ডগায় চুমু খেয়ে বলল,
— নতুন নতুন বিয়ে হলে একটুআধটু মিথ্যা বললে কিছুই হয় না। তাছাড়া আমার বউ তো সাংঘাতিক মিথ্যাবাদী। নাম তার মিথ্যাবতী! আমি না হয় তার স্বামী হিসাবে দুই-চারটা মিথ্যা বলে তার স্বামী হবার যোগ্যতা অর্জন করলাম।
কথাটি বলে মেঘালয় চোখ মারল আলোকে। আলো লজ্জায় মাথা তুলতে পারল না আর। মেঘালয়ের বুকে মাথা রেখে মেঘালয়ের লোমশ বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল,
— একবার মিথ্যা বলেছি বলে আমি মিথ্যাবতী হয়ে গেলাম!
” অবশ্যই হয়েছো তুমি। মিথ্যা বললে বলেই তো তোমার বিরক্ততে আমি বাঁধা পরলাম। তোমার আমার দেখা যদি খুব সাধারণ মুহুর্তে হতো তাহলে কি আমি তোমায় ভেবে ক্লান্ত হতাম? কখনোই না। কি এক মিথ্যা বললে! আমি তো তোমার মিথ্যায় বাঁধা পরলাম। মানুষ রুপে, গুনে আটকায়। আমি আঁটকে গেলাম তোমার মিথ্যায়, তোমার বিরক্তিতে। ”
মেঘালয়ের কথাগুলো বলা হলো না আলোকে। বললেই তো লজ্জায় পরতে হবে। দুজনের বিশেষ ঝগড়া হলে তখন আলো তাকে এই কথাগুলো বলে ঝগড়ায় হারিয়ে দিতে পারে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই কথাগুলো সে কখনোই বলবে না। ভালোবাসা কখন, কোন মুহূর্তে এলো তা নিয়ে না হয় আলোচনা হলো না তাদের মাঝে! তাতে কি মেঘালয়ের হৃদয় জুড়ে আলো কতখানি জুড়ে তা তো কোনোদিন মিথ্যে হয়ে যাবে না।
পুরনো ঘটনা ভাবতে ভাবতেই মেঘালয়ের চোখের কোনে জল চল এলো। কল্পনার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছে সেই কখন। এখন আফসোস হয় তার। বলে দেয়া উচিত ছিল সেদিন। হতো ঝগড়া। তবুও তো আলো তার হয়ে থেকে যেতো পাশে। গোপনে রেখে কোনো লাভ হয়নি। উল্টো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
—আলো, আমার মুখ থেকে শুধু একবার “ভালোবাসি” শব্দটা শুনতে চেয়েছিলে না তুমি! অথচ তোমাকে আমি রোজ হাজারবার “ভালোবাসি” বলি। তুমি কি শুনতে পাও?
একটা “ভালোবাসি” শব্দের কাছে আমার হৃদয়ভর্তি ভালোবাসা হেরে গেছে। এমন হার মেনে নেওয়া যায়, বলো?
তোমাকে ভালোবেসে রোজ আমার পৃথিবীতে ভোর হয়, সন্ধ্যা নামে। গত আট বছরে কত কিছুই তো বদলে গেছে। কিন্তু আমার হৃদয়, আমার মস্তিষ্ক, ওরা কেন বদলাতে পারেনি? আমার মতোই ব্যাকডেটেড আমার হৃদয় আর মস্তিষ্ক।
পুরোনো দিনের ধ্যানধারণা নিয়ে, বিনা অজুহাতে তোমাকে ভালোবাসার যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছে আমার মন আর মস্তিষ্ক। আমার শরীরের এই ভালোবাসার যুদ্ধক্ষেত্রে হার আর জিত—দুটোর নামই ভালোবাসা। এখানে কোনো বিপরীত শব্দ নেই।
কথাগুলো বলতে বলতে মেঘালয় নেতিয়ে পরল। আধো জাগরণে মেঘালয় টের পেলো কেউ তার মাথার কাছে এসে বসেছে। তার নরম হাত দিয়ে মেঘালয়ের চুলগুলো আলতো করে টেনে দিচ্ছে। মেঘালয় এই স্পর্শ চেনে। সে অস্ফুটস্বরে বলল….
মেঘালয় কল কেটে দেয়ার পর চট্টগ্রাম এর জামান হাউজের ড্রইংরুমে উপস্থিত সবার পুরো পৃথিবী গিয়ে থমকে যায় দূরদেশে থাকা মেঘালয়ের কাছে। মেঘালয়ের বিরহ দহন যেন প্রত্যেকের হৃদয়ে পোড়া ঘা তৈরি করেছে। সিতারা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। ইতির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আমি বাইরে থেকে হাঁটাহাঁটি করে আসছি।
ইতি মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো সঙ্গে সঙ্গে। তারপর কাব্য’র দিকে তাকিয়ে কি যেন ইশারায় বুঝিয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— শুনলে তো তোমার ডাক্তার সাহেবের কথা! আমার মুখে যদি সবটা বলতাম তুমি বিশ্বাস করতে না আলো।
— এবার আমি কি করব, স্যার?
— তুমি কি চাও?
— আমার চাওয়ার কি আছে? আপনি তো জানতেন স্যার আমি ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে। মনের কথা মনে জমিয়ে রাখার অস্বাভাবিক ক্ষমতা আমার আছে। আটবছর আগে আমার বয়স কত ছিল? আব্বা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন নিজের মনের কথা আব্বাকে বলেছি। বা কখনো বলার প্রয়োজন হয়নি। আব্বা কিভাবে যেন টের পেয়ে যেত! সৎ মায়ের কাছে কখনো সাধারণ দুটো কথা বলার সাহস পাইনি আমি।
আব্বা মারা যাওয়ার আমার সৎ মা যেন আমার আপন মা হয়ে উঠল। কিন্তু ততটা আপন হতে পারেনি যতটা আমার আব্বা আমার আপন ছিলেন। আব্বার কাছে যত কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারতাম মায়ের কাছে তা বলতে পারতাম না। আমার জীবনের সকল ব্যর্থতার কারণও হয়তো নিজের মনের কথা কাউকে বলতে না পারা। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে কিংবা আমার চোখে চোখ রেখে কেউ আমার ভালো মন্দ নিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেনি। তাহলে আমি কিভাবে বুঝব আমার নেয়া কোন সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কিংবা সঠিক? আপনার ভাইকে বিশ্বাস করে তার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরলাম আমি। অথচ, সে একবারও আমাকে মুখ ফুটে বলেনি, আলো তোমার জীবনের ভালোমন্দের সিদ্ধান্ত নেয়া অভিভাবক একমাত্র আমি। তুমি যেমন আমি তোমাকে ঠিক এভাবেই চাই।
সে একবারও বলেনি। সে তার হৃদয়ে ভালোবাসা গোপন রেখে আমার সামনে এক আকাশ সমান নীরব ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছে। আমি বোকা তার দেয়া এত এত ভালোবাসাকে করুণা ভেবে দিনরাত কুঁকড়ে ছিলাম লজ্জায়। দিনরাত ভাবতাম আমার শ্বাশুড়ির একটা সিদ্ধান্তের জন্য ডাক্তার সাহেব আমার মতো লো ক্লাস ফ্যামিলির মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমার কি আছে? গায়ের রঙ ময়লা। স্মার্ট না। কথাবার্তা গুছিয়ে বলতে পারতাম না তখন। নিজের পক্ষ নিয়ে দুটো কথা বলার সাহস আমার ছিল না। সেই আমি অতি সাধারণ একটা মেয়ে একজন সূদর্শন, স্মার্ট, অভিজাত পরিবারের ছোট ছেলে যে কিনা তখন ডাক্তার হবার পথে ঠিক তখনি তার স্ত্রী বনে গেলাম। আমার কাছে ব্যাপারটা ছিল সকালের স্বপ্নের মতো।
আলোর কথা শুনে কাব্য চুপ করে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
— তোমাকে অনেক অনেক কথা বলার আছে আলো। তোমার কাছে অনেক কিছু জানার আছে। কিন্তু, আমি সবকিছু তুলে রাখলাম মেঘালয়ের জন্য। তুমি সব কৈফিয়ত মেঘালয়কে দেবে। আমি মেঘালয়কে কল করে বলব সে যেন ইমিডিয়েটলি বাংলাদেশে ফিরে আসে৷ আমার ভাইটা গত আটবছর ধরে কষ্টে আছে। তুমি নামক অসুখে আমার ভাই কত কষ্ট ভোগ করেছে; জানো না তুমি? অথচ, তুমি নামক অসুখের ঔষধ তুমি ছিলে। তোমাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না এত বছর। আমার ভাইয়ের কষ্ট কমাতে পারলাম না। এবার আর তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। তুমি এই বাড়িতে থাকবে। তোমাকে কোথাও যেতে দেব না আমি।
কাব্য উঠে দাঁড়ালো। আলো উঠে দাঁড়ালো। তারপর কাব্যকে বলল, “ আপনার ভাইকে আপনি কিছু বলবেন না স্যার। ”
কাব্য হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, “ কেন এমন করছো, আলো?”
আলো জবাব দেয় না। মাথা নীচু করে ফেলে। পরক্ষণেই সে মাথা উঁচু করে বলল, “ আমার দশদিন পর London – এ যাওয়ার ফ্লাইট। ডাক্তার সাহেব লন্ডনে আছে? তাকে আমি তার জীবনের সেরা সারপ্রাইজ দেব। আপনার কাছে একটাই অনুরোধ রইল স্যার। আপনি আর কাউকে এই ব্যাপারে বলবেন না।”
কাব্য অতি বিস্ময়ে আলোকে জিজ্ঞেস করলো, “লন্ডনে কেন যাবে?”
আলো তার চোখের কোনে জমে থাকা আনন্দ অশ্রু মুছতে মুছতে বলছে পুরনো কথা।
–দুপুরের অস্বাভাবিক নীরবতা পুরো ঘরে বিরাজ করছিল। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাইরে রোদের তেজ নেই, অথচ আকাশের দিকে তাকালে চোখ জ্বালা করছিল।
টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপটা আমি অনেকক্ষণ অপেন করে রেখেছি । সেদিন একটা মেইল আসার সম্ভা্ব্য তারিখ ছিল। হঠাৎ একটা নোটিফিকেশন শব্দ। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে স্ক্রিনটা অন করি। একটা আনরিড মেইল।
প্রেরক: London Medical Institute.
আমার বুকের ভেতর কোথাও যেন খুব হালকা একটা চাপ পরল। কারণ আমার এতবছরের স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপের খুব কাছে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে ক্লিক করি না। মেইলের সাবজেক্ট লাইনটা পড়ি “Offer of Admission”
শ্বাসটা অকারণে আটকে আসে। চেয়ারে বসে পরি আমি। চোখ দুটো স্ক্রিনে স্থির হয়ে ছিল কিন্তু লেখাগুলো ঝাপসা দেখছিলাম। আমি একবার চোখ বন্ধ করি। তারপর চোখের পাতা খুলে আবারও পড়তে শুরু করি। আমার হাতটা একটু কাঁপছিল। আমি নিজেও খেয়াল করি না কখন আমি মেইলের নিচে শহরের নামটায় এসে আটকে গেছি। “London”
আমি তখন বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছি। কারণ, আমার উদাসী হৃদয়টা বারবার চট্টগ্রাম শহরে ফিরতে চাইতো। আমি তো আপনার প্রোফাইলে শেয়ার করা ডাক্তার সাহেব এবং মাশফি ভাইয়ার স্ত্রীর ছবি একসঙ্গে দেখে উল্টো ভেবে বসে ছিলাম। তাই চট্টগ্রামে ফিরতে আমার আপত্তি ছিল। তাই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাব ব্যাপারটায় সাময়িক আনন্দ অনুভব করেছি।
কিন্তু আমি আবার দুঃখী হয়েছি বটে। মা ব্যাপারটা জানতে পারলেন পরদিন। আমার আব্বার জন্য খুব কাঁদলেন সেদিন। আব্বা বেঁচে থাকলে নাকি আমার জন্য খুব প্রাউড ফিল করতেন।
আমি যখন এতকিছুর আয়োজন করছিলাম তখন আমার জীবনে একজন ম্যাজিশিয়ান এলো। সেই ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিকের প্রভাবে আমি ডাক্তার সাহেবের শহরে ফিরতে বাধ্য হয়েছি স্যার। ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে আমার আবারও দেখা হবে। কারণ আমার সৃষ্টিকর্তা এবং তার সৃষ্টিকূল চাইছে আমি যেন আবারও ডাক্তার সাহেবের কাছে ফিরে যাই। নয়তো, লন্ডনের মতো একটা শহরের বেস্ট মেডিক্যাল থেকে আমার মতো অতি নগন্য মানুষের জন্য ডাক আসবে কেন?
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৬
কথাগুলো বলতে আলো সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলল। কাব্য এগিয়ে এসে আলোর মাথায় হাত রেখে স্বান্তনার বাণী শোনাতে এগিয়ে এলো না। আজ যত ইচ্ছে কাঁদুক। মেঘালয়ের কাছে ফিরলে কাঁদার সু্যোগ পাবে না।
আলোর আজকের এই কান্নায় কোনো দুঃখ নেই। আছে সুখের সুমিষ্ট স্বাদ। ডাক্তার সাহেবের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ মিশে আছে। যেই সংসারকে একদিন ভুল বুঝে ফেলে রেখে গিয়েছিল সেই সংসারটাকে আবারও নিজে হাতে সাজিয়ে রাখার সুযোগ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এত সুখ সুখ লাগছে কেন আজ?
