প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৩
সাইদা মুন
—নিজেদের মধ্যে এভাবে ঝামেলা করে আদৌ কোনো লাভ আছে…?
কথাটা শুনে ধীরে ঘাড় ঘোরাল তাহসান। লাল টকটকে চোখদুটো ভেজা, অশ্রু নাকি রাগের আগুনে জ্বলে ওঠা জল, বোঝা দায়। তালহা একপলক তার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। এগিয়ে গিয়ে বারান্দার রেলিঙে হেলান দিয়ে পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়াল। রাতের বাতাস নিস্তরঙ্গ, অথচ তাদের মাঝখানে টানটান উত্তেজনা। রাগে হিসহিস করে উঠল তাহসান,
—তুই আমার কেউ না..
তালহা শান্ত স্বরে জবাব দিল,
—তুই মানিস আর না মানিস, তুই আমার ভাই।
—শাট আপ! তুই আমার শত্রু। তোকে ধ্বংস করতে ইচ্ছে করছে, আর করবও!
তালহার ঠোঁটে মৃদু এক হাসি ফুটল। সেই হাসি যেন ইচ্ছাকৃত প্ররোচনা। তাহসানের চোখ আরও জ্বলে উঠল। হঠাৎই তালহা রেলিঙের ওপর উঠে বসল। দু’পা বাইরে ঝুলিয়ে দিল নির্ভীক ভঙ্গিতে। তাহসান নির্বাক তাকিয়ে রইল সেদিকে। তালহা কি করছে তাই দেখছে সে। তালহা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাহসানের দিকে তাকাল, ঠোঁটে একরকম দুষ্টু, নির্লজ্জ হাসি খেলল তার। তারপর আচমকাই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
—হোয়াট আর ইউ ডুয়িং! আর ইউ ম্যাড?
বলতে বলতেই অপ্রস্তুত হয়ে ছুটে গিয়ে তার হাত চেপে ধরল তাহসান। কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক। কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে তালহা। আরেকপা সামনে গেলেই দুতলা থেকে সোজা নিচে পড়বে। নিঃশ্বব্দে তাকাল তাহসানের আঁকড়ে ধরা হাতে। হেসে ফেলল সে,
—পড়ে যাব ভেবে ভয় পেয়েছিস বুঝি?
তাহসান কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। তালহার কথায় হাত ছেড়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে। মুখে কথা নেই, কিন্তু চোখের চিন্তিত ভাব দূর হয়ে রাগ জ্বলে উঠেছে। তালহা সামনের দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল,
—ধ্বংস করতে চাস, আবার বাঁচাতেও দৌড়ে আসিস। ইউ ছ্যাছড়া তাহসান ব্রো…
খোঁচা মারা কথায়ও তাহসান চুপ থাকল। শুধু দৃষ্টি রাখল আগুনের মতো। তালহা সামনের পেয়ারাগাছের ডালটা টেনে আনল। এতে ঝুলে থাকা দুটো বড় পেয়ারা দেখেই সে পাড়তে এসেছে। হাত বাড়িয়ে পেড়ে নিল। আবার রেলিঙ ডিঙিয়ে ভেতরে এসে একটি পেয়ারা নিজের শার্টে মুছতে লাগল, আরেকটি ছুড়ে দিল তাহসানের দিকে। সে নিঃশব্দে ক্যাচ ধরল। এক কামড় পেয়ারায় বসিয়ে তালহা নরম স্বরে বলল,
—মনে আছে? ছোটবেলায় গাছ থেকে এটা-সেটা পেড়ে জামায় ঘষে গাছেই বসে খেয়ে নিতাম।
তাহসানও শার্টে মুছে কামড় বসাল। চোখ তার দূরে কোথাও স্থির। মুখে কোনো জবাব দিল না। তবে তালহা থেমে নেই,
—তারপর খেলতে গিয়ে কেউ ঝামেলা করতে এলে দু’জন মিলে উত্তম-মধ্যম দিয়ে আসতাম।
মাথা নিচু করল তাহসান। তালহার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল,
—বড় মামা একবার একটা চকলেট এনেছিল। আমার মন খারাপ হবে বলে তুই নিজেরটা আমাকে দিয়ে বলেছিলি, তোরটা তুই আগেই খেয়ে নিয়েছিস।
তাহসানের বুক থেকে নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস বেরোল। তালহা একইভাবে আরও বলল,
—নানুর কোলে দু’পাশ থেকে দুজনে মাথা রেখে গল্প শুনতাম মনে আছে? মনে আছে, আম্মু আমাকে রেখে সিলেটে গিয়েছিল বলে তুই কী কান্নাই না করেছিলিস। তোর জেদের কাছে হার মেনে বড় মামা রাতারাতি আমাকে আনতে গিয়েছিল ঢাকা।
স্মৃতিরা মানুষকে দুর্বল করে দেয়। ঠিক সেটাই ঘটল তাহসানের ক্ষেত্রে। রাগের প্রাচীর একটু নরম হলো। তালহা বেশ ভালোই পদ্ধতি কাজে লাগাল তাহসানকে শান্ত করতে। তাহসানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—আব্বু যখন প্রথম আমাদের বাইসাইকেল কিনে দিয়েছিল, তোরটার রঙ বেশি পছন্দ হয়েছিল বলে নিজেরটাই আমাকে দিয়ে দিয়েছিলি। মনে আছে?
তাহসান এবার বিরক্ত হয়ে উঠল। উচ্চ স্বরে বলল,
—এত কথা বলছিস কেন?
—আমাদের শৈশব মনে করাতে।
—কেন?
—বোঝাতে চাই আমরা ভাই। নিজেদের মধ্যে এত বিষ জমিয়ে রাখলে লাভ কী?
—ঝামেলা তুই পাকিয়েছিস।
—আমি আগেই সব বলেছিলাম। তুই বিশ্বাস করিসনি, ওটা তোর ব্যর্থতা।
—আমি এখনো তোকে বিশ্বাস করি না।
তালহা হাসল। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে তাহসানের দিকে এগিয়ে দিল। তাহসান তা দেখতেই চোখ কোচকালো। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাতেই তালহা ইশারা করল “খুলে দেখ”। তাহসান ভাজ খুলতে লাগল। কাগজ মেলতেই অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেল তার দৃষ্টি। চুপচাপ পুরোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সে। কাগজটি তালহা-মেহরীনের বিয়ের রেজিস্ট্রি। যত পড়ছে তত চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে, ভিতরে জ্বলতে থাকা আগুন ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। একঝলক আগ্রাসী হাওয়া যেন তার রক্তে নতুন করে সঞ্চারিত হচ্ছে।
মেহরীনের সাক্ষর দেখতেউ হঠাৎ এক টানে কাগজটি দুইভাগ করে ফেলল। তারপর রাগে জেদে ছোট ছোট টুকরো করে ছিঁড়তে লাগল কাগজটা। বলতে লাগল,
—এসব ফেইক! সব ফেইক, ফেইক, ফেইক..
তালহা মাথা নেড়ে বলল,
—ইয়েস, ফেইক। তবে তোর হাতে যেটা দিয়েছিলাম, ওইটা ফেইক। আসলটা তো আমার কাছে, খুব যত্নে আছে।
সঙ্গে সঙ্গে তাহসান তেড়ে আসল। তালহার কলার ধরে ফেলল, চোখে অদ্ভুত তৃষ্ণা আর ক্ষুধা, কণ্ঠে আঁটসাঁট রাগ,
—তুই এত সেলফিশ কেন? একটা জিনিসই তো চেয়েছিলাম, দিয়ে দে না রে। মেহরীনকে আমি অনেক ভালোবাসব, যত্নে রাখব।
তালহার চোখমুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে এল। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল যেন। রাগে এক ঘুষি মারল তাহসানের ক্ষত গালে যেখানে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগানো ছিল। সজোরে ঘুষি লাগতেই আবারও রক্ত বের হতে লাগল সেখান থেকে। আঘাতের ভারে তাহসান চোখ-মুখ কুচকে দু পা পিছিয়ে দেয়ালে হেলান দিল। সারাদিনের সব মিলিয়ে দূর্বল শরীর যেন মিয়িয়ে গেল। প্রতিরোধের শক্তি ফিকে হয়ে গেল। পাল্টা আঘাত দেওয়ার শক্তিটুকুও নেই।
তালহা এবার বিরক্তিতে কলার টেনে রাগে বলল,
—তুই কি এখনও বুঝছিস না? মেহরীন আমার বউ। সি ইজ মাই ওয়াইফ।
তাহসান হঠাৎ ঢুকরে কেঁদে ফেলল। আচমকা কান্নার শব্দে তালহা কিছুটা হতভম্ব। চোখে বিস্ময়, রাগ কিছুটা গলতে লাগল। অবাক হয়ে দেখছে, তাহসান কাঁদছে? এতটা ভালোবেসে ফেলেছে মেহরীনকে? এই চিন্তা মাথায় আসতেই রাগ আরও জোরালো হল। তার মেহরীনকে অন্য কেউ ভালোবাসে, সেটা কল্পনায় ও সহ্য হচ্ছে না।
ধাক্কা দিয়ে তাহসানকে ছেড়ে দিল। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে কপাল চেপে ধরল। আঙুল দিয়ে কপালে স্লাইড করতে লাগল। তাহসান চেয়ারে ধপ করে বসে মাথা নিচু করে রেখেছে। না চাইতেও চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর তালহা নিজেকে সামলে নিল। এগিয়ে গেল, তাহসানের এক কাঁধে হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বলল,
—তোকে আমি প্রথমেই বলেছিলাম, মেহরীন আমার ওয়াইফ। তাও কেন তুই…
তাহসান ভেঙে পড়া কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
—আমি বিশ্বাস করিনি। তোদের সম্পর্ক দেখে মনে হয়নি তোরা ম্যারিড। আমি ভেবেছিলাম, তুই মেহরীনকে পছন্দ করিস, তাই মিথ্যা বলেছিলি। আমি কি জানতাম নাকি এসব সত্য জানলে কি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতাম..?
তালহা তপ্ত শ্বাস ফেলল। ছেলেটার অবস্থা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে, রাগ ও হচ্ছে, আবার মায়াও হচ্ছে। শত হোক, ভাই লাগে। ছোটবেলার সঙ্গী, যার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে কত স্মৃতি, হাসি, কান্না। বাইরের কেউ হলে এতক্ষনে হয়তো ছুড়ে ফেলত। কিন্তু এ তো তারই মানুষ। চাইলেও একে ইগ্নোর করতে পারছে না। ছেলেটার সঙ্গ দিতে না পারুক, ভুলটা তো চোখে ধরিয়ে দেওয়া তার উচিত। সে যা করছে তা যে ঠিক না তা তো তাকে বোঝানো উচিত।
হালকা স্বরে বলল,
—এবার তো বিশ্বাস কর। মেহরীন আমার বউ। তুই কেন এমন লেইম বিহেভ করছিস? তুই কি করছিস ভেবে দেখছিস তাহসান? তুই তো এত লেইম ম্যান্টালিটির না। আবেগে বিবেক খুইয়ে ফেলছিস না তো? ভাইয়ের বউকে নিজের করতে চাইছিস। তোর মাথা ঠিক আছে?
তাহসান মাথা নিচু করে বসে আছে। তালহার প্রতিটি কথা যেন তার মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড় তুলছে। শব্দগুলো শুধু শোনা হয়নি, মনেও গেঁথে গেছে। “ভাইয়ের বউ” এই দুইটি শব্দ যেন বুকের মধ্যে পাথরের মতো চাপা পড়ল। তার মাথার ভেতর বসেছে এক অদৃশ্য আদালত। বিচারক নেই, প্রশ্ন আছে। উত্তর নেই, অপরাধবোধ আছে। সে কি সত্যিই এমন কিছু চাইছে, যা চাওয়া উচিত না? কিন্তু মেহরীনের প্রতি তার অনুভূতিটা তো ঠুনকো না। সে মেহরীনকে মন থেকে চেয়েছে, ভালোবেসেছে। তবে তাকে পাবে না কেন? পেতেই তো হবে। কিন্তু তার জেদ কি তাকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে? নানান হিসাব কষছে মনে মনে। তাহসানকে চুপ দেখে তালহা ফের প্রশ্ন করল,
—কি হলো? বল, তুই সজ্ঞানে আছিস তো?
তাহসান চুল টেনে ধরল। নিজের প্রতি বিরক্তি, ভিতরের অস্থিরতা সব মিলিয়ে তাকে শেষ করে দিতে চাচ্ছে। নানা চিন্তা, কোনটা উচিত কোনটা অনুচিত, সব মিলিয়ে মাথা ঘুরছে। মন বলছে এক, বিবেক বলছে আরেক। অবশেষে মন বিবেকের বোঝাপড়ায় বিবেককে সাইডে রেখে জেদকে প্রাধান্য দিয়ে বলল
—হ্যাঁ, মাথা ঠিক আছে। আমি ভালোবেসেছি মানে, আমাকে পেতেই হবে। মেহরীন আমার চাই-ই চাই।
তালহা রাগে আবার মারতে যেতেও থেমে গেল। ছেলেটার গাল বেয়ে ছুপছুপ রক্ত বের হচ্ছে এখনও। সে বুঝল, এইভাবে বোঝানো যাবে না তাকে। নিজেকে সংযত রেখে কড়া গলায় বলল,
—চাইলেও পাবি না। তবে আমি তোকে ভাই হিসেবে এটাই বলছি। মেহরীন তোর ভাইয়ের বউ। কথাটা মাথায় রাখিস। জীবন এখনো বাকি, এইসব বাদ দিয়ে নিজের জীবন সুন্দর করার চিন্তা কর। মানুষ মানুষকে ভালোবাসতেই পারে। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভালোবাসলেই যে পেতে হবে, তা কোনো সমাধান না। আমি পুনরায় বলছি, মেহরীন তোর ভাইয়ের বউ, আমার ওয়াইফ। আই হোপ তুই এমন কোনো কাজ ফারদার করবি না যাতে আমি ভুলে যেতে বাধ্য হই তুই আমার ভাই।
বলেই সে চলে গেল। তাহসান বসে রইল, ভেতরে যুদ্ধ চলছে, নুজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সোজা ঢুকল ওয়াশরুমে, নিজের অস্থিরতা চেপে ধরে।
সাওয়ারের ঠান্ডা পানি ঝরে পড়ছে টপটপ করে। শব্দটা একঘেয়ে, তবু আজ যেন প্রতিটা ফোঁটা আলাদা করে আঘাত করছে তাহসানের গায়ে, মুখে, মনে। গালের কাটা জায়গায় পানি লাগতেই তীব্র জ্বালা উঠল। সে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল। দাঁতে দাঁত চেপে রইল। যেন এই শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে ভেতরের অস্থিরতাকে ঢাকতে চাচ্ছে।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে হয়তো নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারত না। তাই মুখ তুলে তাকালই না। মাথা নিচু। পানি গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে, চোখের কোণ ছুঁয়ে, ঠোঁট ভিজিয়ে। বোঝা যাচ্ছে না, এগুলো শুধু সাওয়ারের পানি, নাকি কান্নাও মিশে আছে তাতে। তালহার কথাগুলো আবারও কানে বাজতে লাগল “মেহরীন আমার ওয়াইফ” “ভাইয়ের বউ..” “ভালোবাসলেই যে পেতে হবে এটা কোনো সলিউশন না..”
হৃদপিণ্ডটা যেন কেমন ধুকপুক করে উঠল। মেহরীনকে সে ভালোবেসেছে, এটা কি অপরাধ? ভালোবাসা কি কারও অনুমতি নিয়ে আসে? তার ভেতরে দুটো কণ্ঠ লড়াই করছে। একটা বলছে, “তুই দোষ করিসনি। তুই শুধু ভালোবেসেছিস। তোরও তো অধিকার আছে সুখ চাওয়ার।” অন্যটা ঠান্ডা, নির্মম স্বরে জবাব দিচ্ছে, “অধিকার? কার ওপর? নিজের ভাইয়ের স্ত্রীর ওপর?”
তাহসান হঠাৎ দেয়ালে মুঠো মেরে আঘাত করল। ব্যথা পেল। তবু থামল না। আবারও জোরে শ্বাস নিতে লাগল। তার মাথায় একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে, মেহরীনের হাসি। মেহরীনের চোখে তালহার প্রতি ভরসা। তালহার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীন। সে কি কখনও ভেবেছে, মেহরীন তাকে সেই চোখে দেখেছে কিনা? নাকি সে নিজেই কল্পনায় একটা গল্প বানিয়ে নিয়েছে?
তার বুকের ভেতর চাপা কান্না জমে আছে। আচমকা দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের ওপর। পানি এখনো ঝরছে। জামাকাপড় ভিজে চুপচুপে। সে ফিসফিস করে বলল,
—আমি কি সত্যিই ভুল করছি..?
এই প্রশ্নটার উত্তর সে এড়িয়ে যাচ্ছিল এতদিন। আজ আর পারছে না। তালহার কথাগুলো ভীষণভাবে ভাবাচ্ছে। ভালোবাসা মানেই কি শুধু পাওয়া? না তো, কখনও কখনও ভালোবাসা মানে পিছিয়ে যাওয়া। ভালোবাসা মানে সম্মান করা। এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার কি উচিত সরে দাঁড়ানো? পারবে নিজের ভালোবাসাকে তার ভালোবাসার সঙ্গে দেখতে? পারবে কি নিজের ইগো, নিজের জেদ, নিজের চাওয়া, সব চেপে রাখতে? সরে আসতে?
পানি ঝরতে ঝরতে হঠাৎ সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। গভীর শ্বাস নিল। চোখ মুছে ফেলল হাতের পিঠ দিয়ে। তার ভেতরের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু প্রথমবারের মতো সে নিজের ভুলের সম্ভাবনাটা স্বীকার করতে শুরু করেছে। হয়তো আজই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে না। আবার হয়তো জেদ জেগে উঠতেও পারে। ভালোবাসা নিজের করার জেদ।
শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিতেই মোবাইলটা অফ করল তাহিয়া। যেন এক বিশাল দায়িত্ব শেষ করেছে, এমন ভঙ্গিতে পিছিয়ে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় ঢলে পড়ল। বুকভরা ক্লান্তি মিশে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো,
—বাপরে বাপ শাড়ি পড়ানো এত ঝামেলা।
মেহরীন মৃদু হেসে হাতের চুড়িগুলো পরতে লাগল। তাহিয়া সত্যিই অনেক পরিশ্রম করেছে। গুনে গুনে আধাঘণ্টা ইউটিউব ভিডিও দেখে শাড়ির প্রতিটি ভাঁজ ঠিকঠাক বসিয়েছে, সুন্দর করে পড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রথম কাউকে শাড়ি পরিয়েছে মেয়েটি, তাই স্বাভাবিকভাবেই একটু হিমশিম খেতে হয়েছে। তবে যত্নে কোনো কমতি রাখেনি। কি সুন্দর করে পড়িয়ে দিয়েছে।
চুড়ি পরা শেষ করে কানের দুল পরতে পরতেই মেহরীন নরম স্বরে বলল,
—বলেছিলাম কোনোরকমে পড়িয়ে দিলেই চলবে। এত কষ্ট করতে কে বলেছে?
তাহিয়া উঠে বসল। কপাল কুঁচকে, চোখ বড় বড় করে প্রতিবাদ জানাল,
—বাহ রে আমার বান্ধুবি ডেটে যাবে আর আমি তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিব না?
“ডেট” শব্দটা কানে যেতেই মেহরীনের ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। পেছন ফিরে বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল,
—ডেট?
তাহিয়া ততক্ষণে উঠে এসে চিরুনি হাতে তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। যত্ন করে চুল আচড়াতে আচড়াতে বলল,
—হ্যা তোদের ডেটই তো। দেখি খোপা বাধব নাকি চুল ছেড়ে রাখব?
মেহরীন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে খানিক ভেবে নিল। পরপর ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল,
—ছাড়াই থাক, খোলা চুল উনি পছন্দ করেন বেশি।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে টিটকারি মারল,
—বাহ বাহ জামাইর পছন্দ অপছন্দ সব দেখি জানা হয়ে যাচ্ছে।
লজ্জায় মেহরীনের গাল রাঙা হয়ে উঠল। মুচকি হেসে জবাব দিল,
—আমার জামাই আমি জানব না?
—হু হু জানো জানো তবে বান্ধুবির পছন্দেও একটু খেয়াল রেখো। তোমার জামাইকে আমার জন্য আইসক্রিম আনতে বলো। মেলা কষ্টে সাজিয়েছি, এর বদলে কিছু না পেলে দুক্কু পাবো।
মেহরীন খিলখিল করে হেসে উঠল,
—ওকে ওকে বলবো বলবো।
সিঁড়ির কাছে পৌঁছতেই মেহরীনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে। প্রতি তিন সিঁড়ি পর পর সিঁড়ির কর্নারে ছোট ছোট মোমবাতি জ্বলছে। হালকা বাতাসে শিখাগুলো দুলছে, নিভে যাবে যাবে ভাব হয়েও আবার জ্বলে উঠছে। মুহূর্তেই বুঝে গেল, এ তালহারই কাজ। তার ওঠা যেন সহজ হয়, আঁধারে পা হড়কে না যায়, সেই ভাবনাতেই এমন আয়োজন। অকারণেই বুকের ভেতর উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। এক প্রশান্তি হাসি খেলে গেল মুখে। শাড়ির কুচিগুলো হালকা তুলে সাবধানে পা ফেলতে লাগল। ধীরে ধীরে মেপে মেপে এক পা, তারপর আরেক পা। তালহার জারি করা আদেশ সে লাইন বাই লাইন পালন করছে।
শেষ সিঁড়িতে পৌঁছেই চোখ পড়ল দরজার মাঝ বরাবর ঝুলে থাকা একটি ধরিতে। তাতে আটকানো একটা কাগজ। কাগজে কিছু লেখা দেখে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে পড়ল,
“দরজার মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে এতে ধরে টান দিন ম্যাডাম।”
চোখে বিস্ময়ের রেখা নিয়েই নির্দেশ মতো দাঁড়াল সে। আলতো করে ধরিটা ধরে নিচের দিকে টান দিতেই উপর থেকে ঝরে পড়তে লাগল গোলাপের পাপড়ি। মুহূর্তেই লালচে পাপড়ির বৃষ্টি নেমে এলো তার উপর। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মেহরীন। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট জুড়ে ফুটে উঠল পরিপূর্ণ এক হাসি। দুহাত বাড়িয়ে কয়েকটি পাপড়ি ধরল। হাতটা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিল। তাজা ফুলের পাপড়ি। তালহা কি রাতে বেরিয়েছে? নানান কথা ভাবতে ভাবতে চুলে, শাড়িতে লেগে থাকা পাপড়িগুলো সরিয়ে নিয়ে এক পা এগিয়ে ছাদে পা রাখল।
ছাদে পা রাখতেই অন্ধকারের ভেতর মৃদু হলুদ আলো চোখে পড়ল। আলোটা নরম, উষ্ণ, কিন্তু কিসের আলো তা সে বুঝল না। আলোটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। সে কৌতূহলী দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাতে লাগল। এগিয়ে গিয়ে বাম দিকের পুরো ছাদে চোখ বুলিয়ে ডান দিকে যেতে নিতেই হঠাৎ পেছন থেকে দুটো হাত এসে তার চোখ বন্ধ করে দিল।
অপ্রস্তুত হয়ে সামান্য চমকে উঠেছিল সে, কিন্তু পরক্ষণেই সেই স্পর্শ চিনে ফেলল। শরীরের সমস্ত টান ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। এ যে তালহা, এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মেহরীন হাত তুলে আলতো করে তার হাত স্পর্শ করল। ততক্ষণেই কানের কাছে উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ পেল। গা ছমছমে এক শিহরণ বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে।
তালহার ধীর, মোলায়েম কণ্ঠ ভেসে এলো,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫২
—ভয় পেয়েছেন ম্যাডাম?
মেহরীন মাথা নেড়ে বলল,
—উহু
তালহা মুখটা আরও কাছে আনল, কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে নরম স্বরে বলল,
—তাহলে চলুন…
