প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৫
সাইদা মুন
বাংলা প্রথমপত্র ক্লাসে মোটামুটি সবাই বিরক্ত। ফিসফিসিয়ে গল্প চলছে চারদিকেই। কেউ চুপিচুপি হাই তুলছে, কেউ বই খুলে রেখেই দিবাস্বপ্ন দেখছে। আর ফারিন আর রাফি? তারা তো নিজেদের মতো ঝগড়া করছে,
–অনুপমের মামার মতো আমারও যদি এমন একটা মামা থাকতো, এখন স্বর্ণের এই দামের মধ্যে বিয়ে করিয়ে দিলে কোটিপতি হয়ে যেতাম।
রাফির স্বপ্নবিলাসী স্বরে ফারিন মুখ ভেংচি মেরে বলল,
–তোকে তো ফ্রিতেও কেউ মেয়ে দিবে না। ছেড়া খেতায় শুয়ে কোটি টাকার স্বপ্ন দেখিস।
রাফি ভাব নিয়ে বলে উঠল,
–হাহ! তুই কি জানিস আমার জন্য মেয়ের বাপেরা পাগল হয়ে আছে? ডুবাইয়ের শেখ মাহেরাও তার জামাইকে ডিভোর্স দিয়েছে, শুধু আমাকে বিয়ে করার জন্য। এখনও ওয়েট করছে, কবে আমি বড় হবো, কবে বিয়ে করবে।
তাদের কথায় পাশের বেঞ্চের কয়েকজন ফিকফিক করে হেসে উঠল। ক্লাসের একঘেয়েমি ভাঙার জন্য এমন অপ্রাসঙ্গিক কথাও যেন মজার লাগছিল সবার কাছে। কিন্তু এই হাসাহাসির ভেতরেও জানালার পাশে বসে থাকা মেহরীনের মুখে কোনো হাসি নেই। তার সামনে সাদা কাগজে নরম হাতে লেখা চলছে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“১৫.১০.২০২৫
আমাকে কি খুব বেশি খারাপ দেখাচ্ছিলো? আমি তো এই প্রথম আপনাকে দেখাতেই সেজেছিলাম। অথচ আপনি তাকালেনই না। উল্টো আমাকে উপেক্ষা করে চলে গেলেন। জানেন, আপনার সেই ব্যবহারে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। উম… না না, এটা আপনার দোষ না। দোষ আমারই, একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম হয়তো। আপনার অজান্তেই, আপনার অনুমতি ছাড়াই আমি আপনাকে আমার ভেবে ফেলেছিলাম। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি কে। আমি তো এক গ্রামের সাধারণ মেয়ে, যার ঘর-সংসার, স্বপ্ন সবই ছোট্ট সীমায় বাঁধা। অথচ আমি চেয়ে বসেছিলাম আপনাকে। আপনাকে, যে আমার থেকে আলোকবর্ষ দূরে দাঁড়িয়ে। হয়তো এটাই আমার পাগলামি, বামন হয়ে চাঁদ ছোঁয়ার চেষ্টা। তবে জানেন, আমার মনে আপনার প্রতি অহেতুক একটুকরো অভিমান জমেছে। জানি এসব কিছু আপনি খেয়াল ও করবেন না। খেয়াল করার কথাও না। তবে শুনুন তা…”
বাকিটুকু লেখার আগেই মেহরীনের নামে ডাক পড়ে। কলেজের পিয়ন এসে বলল,
–মেহরীন মাহা নামে কে আছে? ব্যাগ নিয়ে আসো, তোমার পরিবারের লোক এসেছে নিতে।
মেহরীন চমকে উঠে। ‘পরিবারের লোক এসেছে’ কথাটা শুনতেই ভীতু হয়ে যায়। চাচা চাচী কেউ আসেনি তো? আশেপাশে তাকিয়ে সে মনে মনে ভাবল, “সত্যি কি তারা এসেছে?”
এদিকে রাফিও মেহরীনের দিকে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল,
–তোর চাচা-চাচী আবার এই অব্দি চলে আসলো না তো?
মেহরীন ঢুক গিলে বলল,
–তাদের তো চিনারই কথা না। আল্লাহ জানে, আগে গিয়ে দেখি।
তাড়াহুড়ো করে ইংলিশ শিটের মাঝে রেখে দেয় অর্ধেক লেখা চিঠিটা। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হালকা কাঁপা পায়ে এগোতে থাকে। মনের ভেতর অস্থিরতা ভরে ওঠে। পা যেনো নিজের ইচ্ছার বাইরে হেঁটে চলছে, সত্যিই কি তার চাচা-চাচী এসেছে?
ক্লাস থেকে বেরিয়ে আশেপাশে কাউকে না দেখে সে পিয়নের দিকে এগিয়ে যায়।
–চাচা কে এসেছে? কাউকে দেখছি না তো।
লোকটি গেটের দিকে ইশারা করে বলল,
–বলেছে গেটের বাইরে অপেক্ষা করছে। তুমি যেতে।
মেহরীনের হৃদয় কেমন যেন ধক করে ওঠে। কিছুটা ভীত, কিছুটা কৌতূহল নিয়ে পা চালিয়ে সে গেটের দিকে এগোতে থাকে। মনে সংকোচ নিয়ে একপা একপা এগোচ্ছিল মেহরীন, ভেতরটা ঘুরছে অজানা ভয়ে। গেট পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই চেনা মুখখানা চোখের সামনে এসে পড়ল। মেহরীন থেমে গেল, তালহা এখানে কী করছে? অফিস থেকেই এসেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে কি তালহাই তার ছুটি নিয়েছে? কিন্তু কেন? মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন নিয়ে সে রাস্তা পার হয়ে তালহার ঠিক সামনে দাঁড়াল।
তালহা তখন ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। হয়তো কোনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে। মেহরীনের উপস্থিতি সে খেয়ালও করেনি। মেহরীন এক পলক তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
–আপনি আমাকে নিতে এসেছেন?
তার কণ্ঠে সে দিকে নজর পড়ল তালহার। তাকে দেখে কোনো উত্তর না দিয়ে, মোবাইলে কথা বলার মাঝেই ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে চোখ দিয়ে ইশারা করল বসতে। মেহরীন বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়ে। দরজা বন্ধ করে তালহা নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসল। কথা শেষ করে তার মোবাইলটা আচানক মেহরীনের কোলের ওপর রাখল।
হঠাৎ এমন আচরণে মেহরীন বিস্মিত হয়ে মোবাইলের দিকে তাকায়, তার পরপর প্রশ্নাত্মক চোখে তালহার দিকে তাকায়। তালহা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তার দৃষ্টি পরখ করে হেসে বলল,
–কেনো, আমি ছাড়া আর কেউ নিতে আসবে নাকি?
মেহরীন বলল,
–পরিবারের লোক বলায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম চাচা-চাচী…
বাকিটুকু বলার আগে তালহা হঠাৎ চোখ-মুখ কুচকে বলল,
–কেনো, তারাই কি শুধু তোমার পরিবারের লোক? আমরা না?
মেহরীন তালহার কথায় মুখ ফিরিয়ে জানালার কাচ ভেদ করে বাইরে তাকাল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বুকটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে। সকালের সেই ঘটনা ফের মাথায় আসে। হঠাৎ নিজের মধ্যে এক অজানা একাকিত্ব অনুভব করছে, মনে হচ্ছে এই দুনিয়ায় তার আপন বলতে কেউ নেই। অথচ সিকদার পরিবারের স্নেহ ও ভালোবাসায় কয়েকঘন্টা আগেও সে এই কথা ভুলেই বসেছিল। নিঃসন্দেহে তারা সবাই খুব ভালো, তবে বাস্তবতা এটাই সে তাদের পরিবারের কেউ না। খাটি ভাষায় বলতে গেলে, সে ওই বাড়ির আশ্রিতা।
তবে শরিয়তের চোখে তার একটা আলাদা পরিচয় আছে, সে তো তালহার বউ। এই কথাটা ভেবে মেহরীন হঠাৎ তালহার দিকে আড়চোখে তাকাল। মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, মাঝে মাঝে ঢুক গিলায় গলার উঁচু অংশটা উঠানামা করছে। হঠাৎ তার নজরে পড়ে সেখানে একটি ছোট তিল আছে। বেশ মনোযোগসহ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে, তবে কিছু একটা মাথায় আসতেই চোখ সরিয়ে নিল। নিজেকে ধাতস্থ করে মনে মনে বলল,
–উনি তোর জন্য নয়, উনি তো প্রথমেই সাবধান করেছে। তাও কিভাবে বেহায়ার মতো আচরণ করছিস, মেহরীন।
ঠিক সেই ভাবনার মাঝে তালহা হঠাৎ বলল,
–হুম, উত্তর দিলে না?
মেহরীন হালকা হেসে উঠল, হাসিটাতে যেন একটু তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া মিশে আছে। তালহা একফাক তাকাল তার দিকে। মেহরীন নিজেকে সামলে কৃতজ্ঞ স্বরে বলল,
–আপনারা তো আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন। আপনার বাড়িতে আমি একজন আশ্রিতা মাত্র। আপনাদের কাছে কোটি কোটি ধন্যবাদ, আমাকে এতো সুন্দর একটি জীবন দেওয়ার জন্য..
মেহরীনের কথা শুনে তালহা হঠাৎ ব্রেক কষল। জুড়েই ব্রেক ধরায় সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। তবে সিট বেল্ট বাধায় নিজেকে সামলে নেয় মেহরীন। একটু ভয়ও পেয়েছে, ভীতু চোখে তালহার দিকে তাকাল। তালহা অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে, যেন তার কথাগুলো বোঝে উঠেনি। কণ্ঠে অবাক ভাব নিয়ে বলল,
–তুমি আমাদের সম্পর্কে এমন চিন্তা রাখো?
মেহরীন চোখে চোখ রেখে বলল,
–চিন্তার বিষয় নয়.. কথা তো ঘুরেফিরে একটাই দাঁড়ায়, তাই না? আমি তো আর আপনার কোনো রক্তের কেউ না, আত্মীয়ও নই। সেই হিসেবে ধরে তো আপনাদের বাড়িতে আশ্রিতা।
তার কথা শুনতেই রাগে তালহার চোখ-মুখ কঠিন হয়ে উঠল। ঝারি দিয়ে বলে উঠল,
–শাট আপ, স্টুপিড! এতো বেশি চিন্তা করতে কে বলেছে? সিকদার পরিবারের সবাই তোমাকে একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখে। কেউ আজ পর্যন্ত আঙুল তুলেছে তোমার দিকে? এমন কিছু বলেছে? খারাপ আচরণ করেছে?
মেহরীন মাথা নেড়ে ‘না’ করল। তা দেখে তালহা ফুঁসে উঠল,
–তাহলে তোমার এই গবেট মাথায় এগুলো কে ঢেলেছে?
মেহরীনের মুখ চুপসে গেল। অসহায় চোখে তাকাল তালহার দিকে,
–কিন্তু এটাই তো সত্যি। বাইরের কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, এই মেয়েটি কে। তখন কী বলবেন, আত্মীয়, পরিচিত, নাকি অন্য কোনো সম্পর্ক? নাকি আশ্রিতা?
শেষ শব্দটা যেন আগুনে ঘী ঢালল। আশ্রিতা এই শব্দটা তালহার কাছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর শব্দ শোনালো। রাগে দাঁত কিরমিরিয়ে বলল,
–এতো এক্সট্রা ভাবনা মাথায় আনতে তোমাকে কে বলেছে?
মেহরীন হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে দুঃখের ঘন ছায়া স্পষ্ট,
–এই যে দেখলেন, উত্তর নেই আপনার কাছে। আমি নিজেও মানি আমি আপনাদের বাড়ির আশ্রিতা। আপনিও বললে সমস্যা নেই।
তালহার যেন বাঁধ ভেঙে গেল। মুহূর্তেই চরম ক্ষেপে উঠে স্টিয়ারিংয়ে জোরে আঘাত করে বসে। মেহরীন ভয় পেয়ে কেঁপে উঠল, চোখ তুলে তাকাতেই আরও ভয় পেয়ে গেল, তালহার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। এভাবে রাগার কারণ বুঝে উঠল না মেহরীন। কঠিন চোখে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
–স্টপ আর উই স্টুপিড? এক কথা বারবার বলছো, বলেই যাচ্ছো। এই তোমার পরিচয় দিয়ে কী করবে, হ্যাঁ? পরিচয় দিয়ে মুড়ি খাবে? নাকি কাউকে খাওয়াবে? বলো…
শেষ কথাটুকু তালহা আর উঁচু সুরে বলল। মেহরীন মাথা নিচু করে ফেলল, এতোটাই যেন মনে হচ্ছে হাঁটুর সঙ্গে মাথা লেগে যাচ্ছে। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
–তো.. কেউ যদি পরিচয় জানতে চায়..
তালহা মুহূর্তেই ফের গর্জে উঠল,
–আবার সেই পরিচয়! এই মেয়ে তোমার সমস্যা কি? তুমি এখন আমাদের পরিবারের একজন। আর তার চেয়েও বড় কথা, তুমি আমার ব…
রাগের মাথায় লাস্টটুক বলতে যেয়েও হঠাৎ থেমে গেল। যখন বুঝতে পারল, সে কী বলতে যাচ্ছিল। একরাশ দ্বিধা, হাসফাস শুরু হলো ভেতরে ভেতরে, চোখ সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি ঘুরালো।
এতক্ষণ মাথা নিচু করে থাকা মেহরীন হঠাৎ মাথা তুলে তাকায়। চোখে কৌতূহল, গলায় অবাক সুর,
–আমি আপনার কি?
তালহা এদিক-ওদিক তাকিয়ে, গভীর এক নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
–তুমি আমার দায়িত্ব। আর তালহা সিকদার কখনো নিজের দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যায় না।
কথাটা বলেই সে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি এগোতে লাগল নীরব রাস্তায়। মেহরীন চুপচাপ বসে রইল। নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আফসোসের নিশ্বাস বেড়িয়ে আসলো। মনটা চেয়েছিল, ওটা যেন “বউ” বলত তালহা। তবে পরে আবার নিজের ওপরই রাগ উঠল, কেনো সে তালহার কাছে এতটা আশা করে? দুনিয়ায় কি আর কোনো ছেলে নেই?
পরমুহূর্তেই মন আবার ঘুরে ফিরে একই জায়গায়। তালহাই তো তার জীবনের প্রথম ভালো লাগার মানুষ। আর তার চেয়েও বড় সত্য, তালহা সেই পুরুষ, যার সঙ্গে সে হালাল সম্পর্কে বাঁধা। একটা তপ্ত শ্বাস ফেলল মেহরীন। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবল তার জীবনটা এমন না হলেও পারত। মা-বাবার ভালোবাসা পায়নি, দাদি ছিলেন তিনিও চলে গেছেন। এখন ভালোবেসে বসেছে এমন একজনকে, যে তার হবার নয়। মাঝেমধ্যে ভীষণ ইচ্ছে করে বলতে,
“আমাকে একটু ভালোবাসুন তলহা। বেশি না, একটু খানি।”
গাড়ি এসে থামলো শপিংমলের সামনে। দরজা খুলে নেমে এলো তালহা, গম্ভীর মুখে। মেহরীন জানালার বাইরে তাকিয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত, বুঝতে পারছে না এখানে আসার উদ্দেশ্য কী। তালহা দরজা খুলে সামান্য ইশারা করতেই সে প্রশ্ন মনেই ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামে। কাঁধে ব্যাগ, হাতে খানিকটা দোটানা। তালহা চুপচাপ এগিয়ে এসে ব্যাগটা খুলে নেয়, নিঃশব্দে গাড়ির পেছনের সিটে রেখে দরজা লক করে দেয়। কোনো কথা না বলেই সে হাঁটা শুরু করে মলের দিকে। মেহরীন অবাক হয়ে তাকিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে অবচেতনে পিছু নেয় তালহার।
চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে দু’জন উপরে উঠছে। চারিদিকে চোখ বুলাতেই ঝিলমিল করে সাজানো গুছানো বিভিন্ন শোরুমগুলো চোখে পড়ে। জায়গাটা তার কাছে অপরিচিত, এই প্রথম এসেছে সে। দু’তলায় উঠেই তালহা সোজা হাঁটা দেয় ‘গার্লস কর্নার’ এর দিকে।
মেহরীন বিস্ময়ে এগোচ্ছে, চারপাশে যেন মেয়েদের জগত, রঙিন কাপড়, জুতা, পারফিউম আর কসমেটিকসে ভরা সব তাক। তালহা গিয়ে দাঁড়ায় কসমেটিকস সেকশনে। দুই হাত পকেটে গুঁজে, ঠান্ডা গলায় এক স্টাফকে বলে,
–ভালো কোয়ালিটির লিপস্টিক দেখান।
কথাটা যেন মেহরীনের কানে হঠাৎ বাজ পড়ে। লিপস্টিক? তার চোখ গোল হয়ে যায়, ভ্রু কুঁচকে তাকায় তালহার দিকে। এই মানুষটা কি লিপস্টিক নেবে! কিন্তু কেনো? সে কি মেয়েদের মতো সাজবে নাকি তাই! ভাবতেই নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয়, ছি কিসব ভাবছে। তালহা মেয়েদের মতো সাজতে যাবে কেনো।
তার এই এলোমেলো চিন্তার মাঝেই তালহার শান্ত, গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
–চুজ করো।
মেহরীন থতমত খেয়ে বলল,
–কী?
–লিপস্টিক।
–আমি?
–হুম। ফাস্ট দেখো, কোনটা ভালো লাগে।
তালহার চোখে তখন অদ্ভুত এক স্থিরতা। মেহরীন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মেহরীনের অবাক মুখটা দেখে তালহা নড়েচড়ে দাঁড়ায়। তারপর সরাসরি বলল,
–আম সরি মেহরীন। সকালের ওই আচরণটা আমার করা উচিত হয়নি। তবে নেক্সট টাইম থেকে কলেজে অভাবে সেজে যাবেনা,স্টুডেন্ট স্টুডেন্ট এর মতোই যাবে।
মেহরীন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে। তালহা তাকে সরি বলছে? তার মানে তালহা তার রাগ-অভিমান খেয়াল করেছে। নিমিষেই সকালের সেই অভিমান, মন খারাপ, সবকিছু যেন মুছে যায়। মনে অজানা আনন্দের আবির্ভাব ঘটে। তালহা তার চোখে সেই বিস্ময় দেখে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
–এবার চুজ করো, কোনটা ভালো লাগে নিয়ে নাও।
শব্দটা যেন মেহরীনের হৃদয়ে মিষ্টি এক ছোঁয়া দিলো। মুহূর্তেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সব রাগ গলে গেলো পানির মতো। অশান্ত মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠে। যেন সকালের ঝড়ের পর বিকেলের রোদ উঠেছে হালকা কুয়াশা মেখে। তালহা তাকে লিপস্টিক কিনে দিতে নিয়ে এসেছে, এই ভাবনাতেই যেন গাল ভরে উঠল হাসিতে।
সে তখনই ব্যস্ত হয়ে গেল কালার বেছে নিতে। একটার পর একটা লিপস্টিক হাতে নিচ্ছে, কালার দেখছে, আবার ফিরিয়ে রাখছে। চোখমুখ কোচকাচ্ছে, ঠোঁট বাঁকাচ্ছে, কখনো ভাবছে “এইটা ভালো হবে না,”আবার পরেরটা তুলছে। তালহা পাশেই দাঁড়িয়ে সব দেখছে নিঃশব্দে। তার দৃষ্টি স্থির, কিন্তু মুখে হালকা প্রশান্তি, এই মেয়েটাকে এমনভাবে খুশি হতে দেখে ভালো লাগছে, তাও আবার তার নিজের কারণে।
হঠাৎ মেহরীনের মুখে চিন্তার ছায়া পড়তেই তালহার সেই হাসিটা মুছে গেলো। সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
–এনি প্রবলেম?
তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক কোমলতা কিছুটা চিন্তিত। মেহরীন একবার তালহার দিকে তাকায়, আবার হাতের দিকে। মুখটা খানিকটা কুঁচকে, অনুতপ্ত স্বরে বলল,
–হাতে এপ্লাই করে কালার দেখতে যেয়ে সাদা হিজাবে লেগে গেছে।
তার মুখের সেই বাচ্চা বাচ্চা ভাব, ঠোঁট হালকা উলটে রেখেছে, চোখে হালকা অস্থিরতা, এসব তালহার চোখ এড়িয়ে যায় না। মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। কিছু না বলে হঠাৎ বাম হাতের হাতাটা গুটিয়ে, সেই হাতটা সামনে বাড়িয়ে দেয়,
–নাও, এখানে এপ্লাই করে দেখো।
মেহরীন হকচকিয়ে তাকায়,
–আপনার হাতে?
তালহা শান্ত গলায় বলে,
–হুম।
এক মুহূর্তের জন্য মেহরীন স্থির হয়ে যায়। তবে পরমুহূর্তে এতো না ভেবে একেকটা লিপস্টিক হাতে নেয়, তালহার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে অল্প করে লাগিয়ে দেখে নেয় রঙটা কেমন। এদিকে শপের দুই-একজন সেলসগার্ল তাদের দেখে মিটিমিটি হাসছে।
মেহরীন একটার পর একটা লিপস্টিক ট্রাই করে,
প্রায় দশ-বারোটা দেখার পর অবশেষে তিনটা রঙ পছন্দ করে। তালহা কোনো কথা না বলেই সেই শেড এর সবগুলো নিয়ে নেয়,বারোটার বারোটাই। মেহরীন চমকে বলল,
–এত্তোগুলা কেন? দরকার নেই তো এতো!
তালহা স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দেয়,
–তাহিয়াও ইউজ করবে।
মেহরীন আর কিছু বলার আগেই সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায় পেমেন্ট দিতে। তখন পাশের এক সেলসগার্ল মেহরীনের কাছে এগিয়ে এসে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
–হাসবেন্ড নাকি আপনার?
প্রশ্নটা শুনে মেহরীনের মুখ মুহূর্তেই গোলাপি হয়ে ওঠে, চোখ পলকে তালহার দিকে যায়, ভেতরে কোথাও এক অচেনা অনুভূতির ঢেউ এসে টোকা দেয়। তালহা তখন অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে, কাউন্টারের কাছে। মেহরীনের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে। চোখ নামিয়ে নিয়ে নরম কণ্ঠে জবাব দেয়,
–জি।
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গেই মুগ্ধস্বরে বলে ওঠে,
–অনেক লাকি আপনি। স্যার খুব কেয়ারিং, মাশাল্লাহ…নজর না লাগুক।
কথাটা শুনে মেহরীন কিছুটা লজ্জা পায়। হৃদয়ের কোথাও একটা জায়গা যেন নরম উষ্ণতায় ভরে ওঠেছে। তার দৃষ্টি অনিচ্ছায় আবারও তালহার দিকে যায়, এই মানুষটা সত্যিই তার প্রতি এতটা কেয়ারিং? নাকি সে শুধু এই মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছে তাদের?
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৪
ঠিক তখনই তালহা কাউন্টারের দিক থেকে এগিয়ে আসে, হাতে শপিং ব্যাগ। দু’জনের চোখ একবারের জন্য মিলতেই তালহা ইশারা করে সাথে চলতে। মেহরীন তার পেছন পেছন পায়ে পা ফেলে বেরিয়ে আসে।
বাইরে দুপুরের রোদটা নরম হয়ে এসেছে, বাতাসে হালকা উষ্ণতা। ফেরার পথে কেউ আর কথা বলেনি। গাড়ির ভেতরে শুধু হালকা পারফিউমের গন্ধ আর এক অদ্ভুত নীরবতা ছিল। বাসায় পৌঁছাতে প্রায় দুইটা বাজে।
বাসায় এসে জানতে পারে, আজ বিকেলেই সবাই যাবে রিতুর খালার বাসায়। তার খালাতো বোনের জন্মদিন, সেই উপলক্ষেই ছোটখাটো পার্টি হবে। মেহরীন কিছুটা খুশি হয় তালহার দেওয়া লিপস্টিক তাহলে আজকেই পড়বে। আজকের দিনটা তার অন্যরকম গেল, খারাপ ভালো সবমিলিয়ে বেশ ভালোই।
