Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৭
সাইদা মুন

মেহরীনকে নিয়ে নিচে নামতেই তখনকার সেই মেয়েটি তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। পথ আটকানো দেখে তালহা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
–হোয়াট’স ইউর প্রবলেম?
হাফসা একবার তাদের হাতের দিকে তাকিয়ে তালহার চোখে চোখ রেখে বলল,
–আই ওয়ান্ট টু টক উইথ ইউ।
তালহা বিরক্তিমাখা কণ্ঠে উত্তর দিল,
–বাট আ’ম নট ইন্টারেস্টেড।
মেহরীনের সামনে এমনভাবে রিজেক্ট করাটা, হাফসার কাছে বেশ অপমান লাগে। তীক্ষ্ণ চোখে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে আবার তাদের হাতের দিকে দৃষ্টি নামিয়ে কাঠ-কাঠ গলায় প্রশ্ন করল,

–কে এই মেয়ে?
–তা জেনে তোমার কী?
মেয়েটি তেতে উঠে বলল,
–তুমি তো আমার হাত সহজে ধরতে চাইতে না। দ্যান হোয়াই ডিড ইউ হোল্ড হার হেন্ড? হু ইজ সি?
–দ্যাট’স নান অফ ইউর বিজনেস, সাইড প্লিজ…
বলেই তাকে পাশ কাটিয়ে মেহরীনকে নিয়ে চলে আসে তালহা।
মেহরীন এতক্ষণ নিরবদর্শক হয়ে দেখছিলো। মেয়েটার কথায় ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছিলো, “আমি মিসেস তালহা সিকদার।” কিন্তু তালহা যদি ঠাস করে গালে লাগিয়ে দেয়, সেই ভয়েই নিজেকে সংবরণ করেছে। তবে মনে প্রশ্নের দোলাচল থামেনি, কে এই মেয়ে? তালহার সঙ্গে এমন সুরে কথাই বা বলছে কেন, যেন ভীষণ কাছের কেউ।
কে সে জানতে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল তার, আবার ভয়ও করছে, যদি রেগে যায় তালহা। শেষ পর্যন্ত মেহরীনের কৌতূহল তার ভয়কে হারিয়ে দেয়। সাহস সঞ্চয় করে আস্তে করে প্রশ্ন করেই ফেলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

–কে ওই আপুটা?
ভাবছিলো, এবার তালহা নিশ্চয়ই এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিবে। কিন্তু না, তালহা একপলক তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
–ফ্রেন্ড একটার ছোটবোন।
উত্তর শুনে মেহরীনের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসে। মনটা অভিমানে ভরে ওঠে, ফ্রেন্ডের ছোটবোন এভাবে কথা বলবে কেনো আপনার সঙ্গে? কথাটা বলতে চেয়েও বলে না, মুখটা নীরব হয়ে যায়। তালহাও এরপর আর একটি কথাও বলেনি।
আটটার মধ্যে সবাই এসে গেছে, কিছুক্ষণ পরই কেক কাটা হবে। আপাতত সকলে ছবি তুলতে ব্যস্ত। তালহা পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক পাশেই মেহরীন। সামিরা কয়েকবার ইশারায় ডেকেছে তাকে, কিন্তু বেচারি মেহরীন তালহার ভয়ে যায়নি। তার দিকে আড়চোখে চেয়ে নিজে নিজেই বিড়বিড় করে,
–লোকটা কেমন জানি… এই ভালো, এই খারাপ টাইপ…
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তালহা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মেহরীনের দিকে। দু’জনের চোখাচোখি হতেই স্পিকারে বেজে উঠল,

“এই ভালো এই খারাপ,
প্রেম মানে মিষ্টি পাপ,
চলো মানে মানে,
দিয়ে ফেলি ডুব,
তুমি আমি মিলে…”
তালহার তাকানোর সাথে সেই গান, দু’টোর মেলবন্ধনে চমকে ওঠে মেহরীন। লজ্জায় দ্রুত চোখ সরিয়ে মাথা নিচু করে নেয়, তবে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে মিষ্টি হাসি। তালহা কপাল কুঁচকে সামনে ফিরে তাকায়। এর মধ্যে রিতু ডাক দেয়,

–ভাইয়া, আসো না, আমরা সব ভাই-বোনেরা ছবি তুলবো, প্লিজজ।
রিতু আর ফারহার ডাকাডাকিতে তালহা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় তাদের সঙ্গে। মেহরীন এখনো সেখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। তাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহসান এগিয়ে আসে।
–তুমি ছবি তুলবে না? চলো।
হঠাৎ তাহসানের গলা শুনে মেহরীন পাশ ফিরে তাকায়। তাকে দেখতেই মাথা ডানে-বামে কয়েকবার নাড়িয়ে বলল,
–না না, আপনারা তুলুন।
–আরে আরে, চলো…
বলে যেই না এগোতে যাবে, ঠিক তখনই তালহা সেখানে উপস্থিত হয়। কড়া নজরে একবার তাকিয়ে, মোবাইলের ক্যামেরা অন করে তাহসানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, মেহরীনের হাত টেনে যেতে যেতে বলল,

–সুন্দর করে আমাদের কয়েকটা গ্রুপ ছবি তুলে দে তো।
রিতুদের কাছে যেতেই মেহরীনকে দেখে রিতুর মুখ ভার হয়ে যায়। সবকিছুতে এই মেয়েকে টানতে হবে কেন, তার বিরক্তি চোখেমুখে স্পষ্ট। তা আচঁ করে তালহা মাঝখানে দাঁড়ায়, তার ডান পাশে রিতু, মেহেদি, ফারহা, জান্নাতসহ আরও কয়েকজন। আর বাম দিকে, একটু দূরত্ব রেখে, গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে মেহরীন। হাইটে সে প্রায় তালহার কাঁধসমান। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে,
–একটু বেশিই ছোট হয়ে গেলাম না?
পরমুহূর্তেই আবার ভাবে,
–হিল পড়লে এত খাটো লাগতো না… কিন্তু আমার তো হিল জুতোই নেই!
ভাবনার মাঝেই মেহরীন হাতে হালকা একটা টান অনুভব করে। চমকে তালহার দিকে তাকাতেই সে চোখের ইশারায় পাশে দাঁড়াতে বলে। মেহরীন তার ইশারামতো একটু পাশ ঘেঁষে দাঁড়াতেই তালহা তাহসানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,

–রেডি, তুল…
তাহসান কটমট করে তাকিয়ে আছে, রাগে স্ক্রিনে না দেখেই উড়াধুরা ক্লিক করে চলেছে। পরপর কয়েকবার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলতেই, ছবি উঠেছে বুঝে তালহা সেখান থেকে সরে আসতে নেয়। তবে হঠাৎই তার নজর পড়ে বা’পাশে দাঁড়ানো কয়েকটি ছেলের দিকে। তারা মেহরীনের দিকেই তাকিয়ে আছে, তাকে স্ক্যান করতে করতে হাসাহাসি করছে। তাদের তাকানোর ভঙ্গিমা দেখে তালহার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে একটি ছেলে মেহরীনের দিকে ক্যামেরা তুলে ধরে।

সাথে সাথে তালহা বাম হাতে মেহরীনের বাম বাহু ধরে এক ঝটকায় নিজের সামনে নিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য হাত তার মুখের সামনে তুলে ধরে, তাকে আড়াল করার চেষ্টায়। ঠিক তখনই ছেলেটির ক্যামেরার লাইট জ্বলে ওঠে। তালহাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভড়কে যায়, দ্রুত মোবাইল নামিয়ে নেয়। এদিকে মেহরীন তাকিয়ে ছিলো সামনের তালহার মোবাইলের দিকে, তবে হঠাৎ কি হলো কিছুই বুঝে উঠল না।
তালহার রাগে কপালের রগ ফুলে উঠেছে, ক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে দেরি না করে মুহূর্তের মধ্যে মেহরীনের হাত ছেড়ে সে রাগে ছেলেটির দিকে তেড়ে যায়। গিয়েই খপ করে তার কলার চেপে ধরে গর্জে ওঠে,

–তুই পার্মিশন ছাড়া ছবি তুলছিলি?
চারপাশের মহল মুহূর্তেই বদলে যায়, হৈ-হুল্লোড় সব থেমে পরিবেশ নিরব হয়ে ওঠেছে। সকলে কৌতুহল নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটি তালহার আক্রমনে আঁতকে ওঠে, ভয়ে ঢুক গিলে চোখ বড় বড় করে তালহার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে চুপ দেখে দ্বিগুণ চিল্লিয়ে ওঠে তালহা,
–তোর এতো বড় সাহস কে দিয়েছে, পার্মিশন ছাড়া মেয়েদের ছবি তোলার?
মারতে অগ্রসর হতেই, তালহাকে টেনে ছাড়িয়ে আনে রিতুর খালুরা। ছেলেটি ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে অস্বীকার করে, সে এমন কিছু করেনি। মিথ্যা শুনে যেন তালহার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে যায়। আবার তার দিকে তেড়ে যেতে নিলেই তাকে আটকে দেয়,

–বাবা, শান্ত হও, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে হয়তো। ও আমার বোনের ছেলে, এমন না।
রিতুর খালুর কথায় তালহা রাগচটা স্পষ্টকণ্ঠে বলল,
–এখানে আমার কোনো ভুল হচ্ছেনা, সে ছবি তুলেছে, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর।
কথা কাটাকাটির মাঝেই তাহসান তাদের থামিয়ে বলল,
–এতো কথা না বাড়িয়ে, বরং ওর ফোন চেক করা হোক, তাহলেই তো হয়।
তার কথা শুনে সকলেই রাজি হয়ে যায়। তা দেখে ছেলেটি আতংকে মোবাইল লুকিয়ে ফেলে। এতে যেন সকলের সন্দেহ আরও গাঢ় হয়। জোর করে তার থেকে ফোন ছিনিয়ে নিতেই দেখা যায়, শুধু মেহরীনই নয়, রিতু, ফারহাসহ উপস্থিত আরও অনেক প্রাপ্তবয়সি মেয়েদের ছবি। যেগুলো শরীরের আপত্তিকর অংশের, জুম করে করে তোলা। দেখামাত্রই সকলে ক্ষেপে উঠে। রিতুর খালু রাগে ছেলেটিকে থাপ্পড় মেরে বসে,

–জানোয়ার, তোর হয়ে আমি কথা বলছিলাম এতোক্ষণ, এক্ষুনি বের হবি আমার বাড়ি থেকে।
উনার কথায় তার বোন রেগে উঠে, তার ছেলেকে এভাবে কেন বলেছেন সকলের সামনে। তা নিয়ে তাদের মধ্যে একপ্রকার ঝামেলা লেগে যায়। একপর্যায়ে রেগেমেগে ছেলে নিয়ে চলে যান তিনি।
এসবের মধ্যে তালহা উঠে আসে, চলে যাবে এক্ষুনি। আর এক মুহূর্তও তার বোনদের এখানে রাখবে না। তার কথায় রিতুরাও ভাইয়ের সাথে যেতে উঠে আসে। তবে রিতুর খালু অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে যেতে রাজি করায়। উনার কথামতো, খাওয়ার পরপরই তালহা তাদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তানিয়া বেগমের সেখানে থাকার ইচ্ছে ছিলো, তবে এমন ঘটনায় মেয়েদের নিয়ে সেখানে আর থাকেননি। সেদিন রাত নয়টার মধ্যেই বাড়ি পৌছে যায়।

কেটে যায় আরও এক সপ্তাহ,
দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কাটিয়ে, তাহিয়াও আজ কলেজ যাবে, সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। তাহিয়া যাবে দেখে মেহরীন তো খুশিতে আটখানা। তাহিয়া ছাড়া যেন তাদের ক্লাসে কিছুই জমে না। বাকিরা আসলেও গ্রুপের একজন নেই বলে সবাই কেমন মনমরা থাকতো।
খাওয়া শেষ করে তারা বের হয় তালহার সঙ্গে। আজকাল তালহা নিজের কাজে আগের তুলনায় আরও ব্যস্ত হয়ে গেছে। আগে মাঝে মাঝে টুকটাক কথা হলেও, এখন পড়ার টেবিল ছাড়া তালহার সঙ্গে কথা বলার ফুরসতই যেন নেই। এইযে এখনও সে ড্রাইভ করছে, সাথে ব্লুটুথ কানে লাগিয়ে বক বক করেই যাচ্ছে। তিতলি বেগমের কাছ থেকে শুনেছিল, নতুন একটা প্রজেক্টের কাজ শুরু করেছে, তাই ইদানীং কাজে এত ডুবে আছে।

তবে তার এত ব্যস্ততায়ও, একটু সঙ্গ পেতে যে কেউ একজন দহনে-পুড়ে, ছটফট করছে, তা সে কি আর জানে। জানলে হয়তো কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু খুঁজ নিতো, একটু কথা বলতো তার ছটফটানি দেখে। মেহরীন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে তালহার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাইরে তাকায়। গাড়ি কলেজের সামনে থামতেই তালহা ইশারায় তাদের নামতে বলে। তারা গেটের কাছে আসতেই তালহা চলে যায় অফিসের উদ্দেশ্যে।

মেহরীন একবার পেছন ফিরে তাকায়। তালহার গাড়িটা যতক্ষণ না পর্যন্ত চোখের আড়াল হয়েছে, সে তাকিয়ে ছিল, যেন মনে মনে কিছু ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তারপর তপ্ত শ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। মানুষ প্রকৃত পক্ষে লোভী, তারা একটু পেলে আরও চায়, আর সেই আরও পেয়ে গেলে, পুরো দুনিয়াটাই চেয়ে বসে থাকে।
মেহরীনের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। তালহার কাছ থেকে সামান্য সাড়া পেয়ে সে নিজেকে যে অদ্ভুত সুখের মধ্যে ভাসতে দেখেছিল, সেই অনুভূতিই এখন তাকে আরও অনেক আশা জাগাচ্ছে। প্রতিদিন সে তার কাছ থেকে ছোট ছোট মনোযোগ, প্রত্যাশা করে বসে থাকে। কিন্তু যখন সেই প্রত্যাশা পূর্ণ না হয়, তখন আশাহত হয়ে বসে থাকে।
গেট পেরিয়ে একটু এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে কেউ দৌড়ে এসে হুড়মুড় করে তাদের উপর পড়ে যায়। আচমকা ধাক্কায় তিনজনই প্রায় পড়ে যেতে যেতে কোনোমতে সামলে নেয়। তাহিয়া ভয়ে বুকে হাত দেয়, সবে তো সুস্থ হয়েছে, এখন যদি পড়ে হাত-পা ছিঁড়ে যেত, আবার সেই বিছানার ধারে যাওয়া লাগতো।
এর মধ্যেই ফারিনের গলা ভেসে আসল,

–দেখে চলতে পারিস না? দেখছিসই যেহেতু পেছন থেকে আসছি, একটু তো সরে দাঁড়াবি, বলদের দল!
ফারিনের কথায় দুজন যেন সত্যিই ‘বলদ’ বনে গেল। তারা সামনে তাকিয়ে হাঁটলে পেছন কিভাবে দেখবে। মেহরীন কোমরে দুই হাত গুজে কপাল কুঁচকে বলল,
–আমাদের পেছনে কি তোর বাপ চোখ লাগিয়ে দিয়েছিলো, যে দেখবো কোন ছাগল আসছে?
তার কথায় ফারিন চুপসে যায়। তবে তাহিয়াকে দেখে খুশিতে পিঠে চাপড় মেরে এক লাফে গলায় ঝুলে পড়ে,
–বান্ধুবি-ই-ই! কতোদিন পর! এখন কেমন আছিস? জানিস কত্তো মিস করেছিইইই।
সবেমাত্র সুস্থ হওয়া শরীরে এমন আটার বস্তা উঠায়, তাহিয়া তাকে সরাতে সরাতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
–কিছুক্ষন আগ অব্দিও ভালো ছিলাম, কিন্তু এখন তুই আধমরা বানিয়ে ফেলছিস। ছাড় ডাইনি ছাড়, গলা চেপে মেরে ফেলবি মনে হচ্ছে।

তাদের অবস্থা দেখে মেহরীনও দুজনের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এভাবেই হাসি-ঠাট্টা করতে করতে তারা ক্লাসে ঢোকে। কিন্তু ক্লাসে ঢুকতেই সবার ভ্রু কুঁচকে যায়। তাদের চোখ যায় লাস্ট বেঞ্চের দিকে। সেখানে রাফি মাথা গুঁজে বসে আছে। আজ সবার আগে এসেছে, অথচ তাদের জন্য গেটের কাছে অপেক্ষা করেনি। সঙ্গে সঙ্গেই একে অপরের দিকে চোখাচোখি হতেই তারা দুষ্টু হেসে উঠে। যার অর্থ অপেক্ষা না করার শাস্তি দিতে যাচ্ছে। তারা সাবধানে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়।
হাতের ইশারায় ওয়ান…টু…থ্রি বলতেই হঠাৎ তার পিঠের উপর ধুমধাম করে তিনটা কিল একসঙ্গে পরে। একসাথে চেঁচিয়ে উঠল,

–সারপ্রাইজ..
আচমকা আঘাতে রাফি হকচকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে পিঠে হাত বুলিয়ে কুঁকড়ে যায়,
–উইমা-ই-ই-ই-ই-ই কোন আজরাইল রেএএএ!
মুহূর্তেই মেহরীনরা দূরে সরে যায়। কারণ জানে, পাল্টা মার না দিয়ে সে ছাড়বে না। কিন্তু কিছুক্ষণ যেতেও রাফির কোনো পাল্টা রিয়েকশন না দেখে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। এগিয়ে এসে সামনের বেঞ্চে বসল। রাফি পিঠ ঘষতে ঘষতে হতাশ কণ্ঠে বলে,

–ধুর! এভাবে কেউ মারে? ভয় পেয়ে গেছি। ভেবেছিলাম আপু এসেছে, এখনই হাড্ডি অ্যাটাক হতো।
তার আজগুবি কথায় তাহিয়া কিছুক্ষন ভেবে গালে হাত দিয়ে প্রশ্ন করল,
–হাড্ডি অ্যাটাক আবার কেমনে হয়? প্রথম শুনলাম তো!
তার কথায় পাশে বসা ফারিন হেসে মাথায় হালকা টোকা মেরে বলল,
–ওরে গাধা, ওটা মজা করে বলেছে!
কথার মাঝে রাফি হতাশ গলায় বলল,
–আজ আমার মন ভালো নেই…
মেহরীন চোখ পিটপিট করে তাকায়, সত্যিই ছেলেটার মুখটা মিয়িয়ে আছে কেমন মনমরা। কি হলো হঠাৎ এর মনে প্রশ্ন জাগতেই জিজ্ঞেস করল,

–কিরে, কান্দস কেন?
রাফি মুখ কুঁচকে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,
–ব্রেকাপ করে ফেলছে এ্যাএএ…
তার কথায় তাহিয়া নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
–তো কান্নার কি আছে? তোর কি আর একটা গফ..?
রাফি নাক টানার নাটক করে বলে,
–ঘটনা এইটা না এ্যাএএ…
তার এই ন্যাকা কান্না দেখে ফারিন ধমকে উঠে,
–হপ! বেইট্টা গো মতো পেন পেন না করে বল, কাহিনী কি?
রাফি ঠোঁট ভেঙে উত্তর দেয়,

–আপুর ২৫০০ টাকার লিপস্টিক চুরি করে গিফট করছিলাম। এখন ব্ল্যাকমেইল করতেছে, ওর নতুন বফরে পাচঁ হাজার টাকা না দিলে আপুকে বলে দিবে…এ্যাএএ।
শুনেই তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে একসাথে বলে উঠল,
–এ তো চোরের উপর বাটপারি!
পরক্ষণেই ক্লাস কাঁপিয়ে হাসিতে মেতে৷ উঠে। তিনজনের হাসি যেন থামছেই না, বেঞ্চে বেঞ্চে ঠুসঠাস করে করে হাসছে। এতে আশেপাশের অনেকেই বিরক্ত হচ্ছে। তবে তারা “ডোন্ট কেয়ার”। রাফির মুখচোখ আরও চুপসে যায়, দুঃখে বলে,

–হাসো হাসো, সময় তোমাদেরই। আমি তো আতঙ্কে আছি। আপু যদি খালি একবার জানে, আমার হাড্ডি-পাছলি ভেঙে দিবে৷ দুলাভাই দুই দিন আগে খালি এনে দিছে…
তাদের হাসা-হাসির মাঝেই স্যার ক্লাসে আসেন। সবাই কোনো মতে চুপচাপ বসে ক্লাসে মনোযোগ দেয়। আবার ফাঁক পেলেই রাফিকে খোঁচায়। মেহরীন লেখার মাঝে মাঝে রাফিকে শুনিয়ে বলে উঠে,
–জানিস সেদিন উনি আমাকে বারোটা লিপস্টিক কিনে দিয়েছেন। চুরির কিন্তু না, নিজের টাকার।
পাশ থেকে তাহিয়া বলে,

–হ্যা হ্যা শেডগুলো অনেক ভালো ছিলো।
ফারিন পেছনে হেলান দিয়ে বলে,
–কিন্তু আমাদের রাফি ভাইয়ের লিপস্টিক থেকে ভালো না৷ আমাদের রাফি ভাই কিন্তু তার এক্স নাগিনকে সব থেকে বেস্ট লিপস্টিকই গিফট করেছিল। কি বলেন রাফি ভাই?
তাদের ফুসুর ফুসুর আড্ডার মধ্যে কখন যে স্যার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, কেউ টেরই পায়নি। হঠাৎ বেঞ্চে জোরে একটা বাড়ি মেরে তিনি ঝাড়ি দিলেন,
–এই চারজন! উঠে দাঁড়াও। কী নিয়ে এত গল্প করছিলে, আমিও একটু শুনি দেখি।
স্যারের আচমকা আগমনে সবাই ভয়ে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। স্যার আবারও কড়া গলায় বললেন,
–বল, কী আলোচনা চলছিলো?
তাহিয়া ভয় আর নার্ভাসনেসে মুখ ফসকে বলে ফেলল,
–স্যার… লিপস্টিক…

তার কথাটা শেষ হতেই বাকি তিনজন খেয়ে ফেলব লুকে তাকায়। এই মেয়ে অসময়ে মুখ খুলে বিপদে ফেলে। স্যারের চোখ কটমট করে উঠল।
–কি! ক্লাসে লিপস্টিক নিয়ে গল্পগুজব? তোমরা কি পড়তে আসো না সাজগোজ করতে? আজকালকার ছেলে-মেয়েরা একদম নষ্ট হয়ে গেছে। আজই তোমাদের অভিভাবকদের ডেকে আনবো দাড়াও।
স্যারের এমন হুমকি শুনে চারজনের মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ফারিন তড়িঘড়ি করে নিজেদের বাঁচানোর জন্য কাঁপা গলায় বলল,
–ন..না স্যার! আপনি যেটা ভাবছেন, তা একদমই না। আসলে… আসলে ব্যাপারটা হলো…
স্যার ভুরু কুঁচকে বললেন,
–কথা স্পষ্ট করে বলো!
হতভম্ব ফারিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ মাথায় যা আসলো তাই বলে ফেলল,

–আসলে স্যার, আমাদের বন্ধু রাফি… তার নাকি মেয়েদের লিপস্টিক ঠোঁটে মাখতে মনে চায়। এখন আপনি-ই বলুন স্যার, এটা কি ছেলেদের মানায়? আমরা তাই ওকে বোঝাচ্ছিলাম যে, এসব করা ঠিক না।
তার কথা শেষ হতে না হতেই রাফির চোখ বড় বড় হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে কেশে উঠল বেচারা। মুহূর্তেই পুরো ক্লাস ফেটে পড়ল হাসিতে। কেউ হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে, কেউ চুপিচুপি গড়িয়ে পড়ছে বেঞ্চে। বেচারা রাফি রাগে-লজ্জায় মুখ লাল করে তাকিয়ে রইল ফারিহার দিকে, যেন চোখ দিয়েই আগুন ঝরাচ্ছে।
স্যার সবাইকে চুপ করিয়ে রাফির কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলেন। এবার কণ্ঠে অদ্ভুত নরম সুর,

–দেখো বাবা, তুমি ছেলে মানুষ। মেয়েদের জিনিসের প্রতি এমন আকর্ষণ থাকা ঠিক না। হয়তো তোমার ভেতরে কিছু মানসিক দ্বন্দ্ব আছে, পরিবারকে বলতে সংকোচ বোধ করছো। কোনো সমস্যা নেই, কাল তোমার অভিভাবকদের নিয়ে এসো, আমি বুঝিয়ে বলব। পরিবার আর আমাদের সহায়তায় তুমি ঠিক হয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
স্যারের কথা শুনে রাফি থ বনে গেল। হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল, তাকে যে এরা পরোক্ষভাবে হি*জড়া বানিয়ে দিয়েছে, ছি ছি। লজ্জায় মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে। আর অন্যদিকে বাকিরা? তারা তো হেসে কুটিকুটি৷
ছুটি হতেই মাঠে সবকটা এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছে। রাফি একেকটাকে তাড়া করছে। তার পুরুষত্ব নিয়ে কথা বলেছে এমনি এমনি ছেড়ে দিবে নাকি সে।

বেশ কিছুক্ষণ পর হাঁপিয়ে সবাই ক্যান্টিনে গিয়ে বসে। তাদের হাসি-ঠাট্টা গল্পের মাঝে মেহরীনের চোখ হঠাৎ পড়ে পাশের টেবিলে বসা এক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার দিকে। দু’জনেই কলেজের ছাত্র, হয়তো সমবয়সী সম্পর্ক। মেয়েটি ছেলেটিকে পিজ্জা খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে মেহরীনের হঠাৎ তালহার কথা মনে পড়ে যায়, তাদেরও যদি এমন মুহূর্ত হতো। ভাবতেই মনটা কেমন করে ওঠে। তালহার সাথে তো এখন কথাই হয় না ঠিকমতো, এমন মুহূর্ত তো দূরের কথা। মনটা নিমিষেই অন্ধকারে ঢেকে যায়।
সবার আড্ডার ফাঁকে হঠাৎ মেহরীন মুখ ভার করে বলে ফেলে,
–নাপা খেলে কি মনের ব্যথা কমে…?
তার প্রশ্নে মুহূর্তেই সবাই চুপ। একে অপরের মুখ দেখে একসঙ্গে হেসে ওঠে। রাফি হাসতে হাসতে বলল,
–লাল পানি খা, সব ভুলে যাবি।
ফারিন দুই আঙুল মুখের সামনে তুলে স্মোকিং এর মতো করে বলল,

–আরে আকিজ বিড়ি খা, প্রতি টানে টানে সব ব্যথা ভ্যানিশ!
তাহিয়া বার্গারে এক কামড় দিয়ে বলে,
–এক কাজ কর, বিষ খা! সারাজীবনের মতো সব ব্যথা চলে যাবে, সাথে তুইও..!
মেহরীন চোখ পাকিয়ে তাদের দিকে চেয়ে থাকে, তার মনের দুঃখে তারা যেন মজা খুঁজে পেয়েছে। মুখ বাঁকিয়ে চুপচাপ খেতে থাকে সে। শা*লার হারামিরা, কোথায় স্বান্তনা আশা করেছিলো উল্টো মজা উড়াচ্ছে। মনে মনে ভেংচি মারে “হুহ আমারও সময় আসবে “।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৬

তাদের খাওয়ার মাঝে হঠাৎ কেউ একজন ফারিনের প্লেট থেকে আস্ত বার্গারটা ছিনিয়ে নেয়। আকস্মিক কান্ডে ফারিন ফট করে উঠে দাঁড়ায়। পেছন ফিরে দেখে, স্যুট-পরা, ফরমাল গেটআপের সুদর্শন দেখতে এক ছেলে বার্গারটা হাতে ধরে আছে। রাগে ফারিন দাঁত চেপে এক খাবলায় ছিনিয়ে নিয়ে ধমকে ওঠে,
–এই মিয়া! দেখে তো ভদ্রলোক মনে হয়, কিন্তু স্বভাব এমন চোরের মতো কেন…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৮