প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৫
সাইদা মুন
ছাদের সিঁড়িসহ নিচ অব্দি খুঁজেছে। প্রতিটি করিডরও নিস্তব্ধ, রুমগুলোর দরজা লাগানো। কোথাও মানুষের কোনো নড়াচড়াও নেই। অথচ সে স্পষ্ট দেখেছে ছায়াটা। কে ছিল ওখানে? বুকের ভেতর অস্থিরতা জমাট বাঁধতে থাকে। ভাবতে ভাবতেই আবার ছাদের দিকে উঠতে শুরু করে সে। মনে বার বার গুঁতো দিচ্ছে, কেউ তো ছিল এখানে। তবে চোখে কাউকে দেখেনি। লাস্ট সিঁড়িতে পা রাখতেই ছাদের দরজার সামনে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনকে চোখে পড়ে।
একদম কাচুমাচু হয়ে, দুই হাত বুকে চেপে ধরে, নিঃসঙ্গ একটা আতঙ্ক মেখে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা।
রাত আড়াইটার কাছাকাছি। চারপাশ নিস্তব্ধ, নিঝুম, ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে অদ্ভুত এক শূন্যতা। অন্ধকার পুরো ছাদটাকে যেন গিলে ফেলেছে। এমতাবস্থায় মেয়েটি তো একা ভয় পাবেই। কথাটা মাথায় আসতেই “শিট, ম্যান!” বলে উঠে। মনে মনে নিজেকে গালি দিয়েই দ্রুত তার দিকে এগিয়ে যায়। তালহা কাছে আসতেই মেহরীন স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে। ধীর পায়ে চুপচাপ পেছন ফিরে হাঁটা শুরু করে। মুখে ভয়, চোখে অনিশ্চয়তা লেগেই আছে। মেহরীনকে দোলনার দিকে এগোতে দেখে তালহাও পিছু নেয়। দোলনার কাছে পৌঁছাতেই পেছন থেকে তালহার নরম, ফিসফিসে কণ্ঠ ভেসে আসে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—ম্যাডাম, ভয় পাচ্ছিলেন বুঝি?
রাতের ঠান্ডা বাতাসে তার কন্ঠটা আরও কোমল ও গভীর শোনালো। মেহরীন এক পলকের জন্য থেমে মুচকি হাসল, তারপর আবার এগোল। দোলনার একপাশে বসতেই হাত বাড়িয়ে ইশারায় তালহাকে পাশের জায়গাটা দেখালো। তালহাও বসে পড়ল, খুব কাছেই। এত কাছে যে দুজনের গা প্রায় ছুঁই ছুঁই। মেহরীন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—উহু, আমি ভয় পাইনি।
তালহা অবাক হওয়ার ভান করে চোখ বড় করে বলল,
—ওহ তাই বুঝি? তাহ আপনার পিছে ওইটা কি?
কথাটা শেষ হতেই মেহরীন হড়বড় করে তালহার দিকে আরও চেপে বসে গেল। নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়া মতো। তালহা তার এই প্রতিক্রিয়ায় মৃদু হেসে ফেলল। তারপর দুইজনের মাঝে নেমে এলো এক মুহূর্তের নীরবতা। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে। চাঁদের লেশও নেই, তারার আলোও মিলিয়ে গেছে। শুধু রাতের কুয়াশা আর ছাদের রেলিং ছুঁয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস।
তালহা চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরেই। মেহরীনও তাকাচ্ছে কিছু দেখার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই অন্ধকার আকাশে দেখার মতো কিছু নেই। তবে তালহা এতক্ষণ ধরে কি এতো দেখছে? অবশেষে আর ধৈর্য ধরতে না পেরে নীরবতা ভেঙে মেহরীন নরম কন্ঠে প্রশ্ন করল,
—কাউকে দেখেছেন তখন?
তালহা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তার চোখের দিকে তাকাল। তারপর আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল দূরের অন্ধকারে। নরম কন্ঠে উত্তর দিল,
—নাহ হয়তো বাতাসে নড়েছিল।
দুজন আবারও চুপ।হয়ে গেল। তালহা কেমন গম্ভীর ভাব নিয়ে বসে আছে। আর মেহরীন মনে অনেক প্রশ্ন নিয়ে বসে। নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে ধীরকন্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল,
—আজকে আসতে এতো লেইট হলো কেনো?
তালহা শান্তস্বরে বলল,
—ফ্রেন্ডদের সাথে ছিলাম তাই।
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে বলল,
—এতো রাত অব্দি ফ্রেন্ডদের সাথে কিসের আড্ডা?
তালহা একটু থেমে বলল,
—ছিল একটু..
তালহার কথায় মেহরীন দুই হাত বুকে গুজে তার দিকে কড়া চোখে তাকাল। তারপর শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,
—কাল থেকে তাড়াতাড়ি আসবেন…
কয়েক মুহূর্তের জন্য তালহা তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটির আদেশ শুনে মেহরীনের মধ্যে বউ বউ ভাব ভেসে উঠল। একদম যেন তার মিষ্টি একটা বউ। মিটিমিটি হাসি ফুটল তালহার ঠোঁটে। সে মাথা নেড়ে বলল,
—যথা আজ্ঞা, ম্যাডাম।
মেহরীন তালহার হাসি দেখে চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। হাসার কারণ বুঝতে পারছে না, সে তো কোনো ফানি কথা বলেনি। নানান চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগল, হাসার কারন নিয়ে। অবশেষে কারণ বের করতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
—এই, আপনি হাসছেন কেনো?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য ছেলের মতো উত্তর দেয়,
—কারণ আপনি বউ বউ আচরণ করছেন।
মেহরীন কপালে ভাজ ফেলে বলল,
—তাই বলে হাসা লাগবে?
—প্রথম প্রথম তো একটু লজ্জা লাগে।
মেহরীন অবাক হয়ে তাকাল,
—আপনাদের বুঝি লজ্জাও লাগে?
তালহা কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করল,
—কেনো, পুরুষের কি লজ্জা নেই?
মেহরীন কিছুটা ভেবে বলল,
—আমি তো জানতাম, পুরুষদের কোনো লজ্জা নেই। তারা বেলজ্জা..
মুহূর্তের জন্য তালহা চমকে তাকালো,
—বেলজ্জা?
মেহরীন ইতস্তত করে উচ্চারণ করল,
—তো লজ্জার বিপরীত বেলজ্জা না?
শোনামাত্রই তালহা ফিক করে হেসে উঠল। হালকা ধমক দিয়ে বলল,
—হপ! লজ্জার বিপরীত হলো নির্লজ্জ।
সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন উঠে বলল,
—ওই একই কথা হলো, বেলজ্জা আর নির্লজ্জ দুটোই ভাই ভাই। একটা বললে অন্যটিও বোঝা যায়।
তালহার শব্দ করে হেসে মাথা ঝাকায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর সে উঠে দাঁড়ায়, ফুল গাছের দিকে এগোয়। মেহরীন বসে থেকেই চুপচাপ তালহার কাজকর্ম দেখছে। তালহা খুঁজে খুঁজে নিচে পড়ে থাকা কয়েকটা ফুল কুড়িয়ে আনে। তারপর আবার মেহরীনের পাশে এসে বসে পড়ল। ফুলগুলো তার হাতে দিয়ে বলল,
—আপনাকে দেবার মতো ফুল পাইনি, আপাতত এগুলোই রাখুন।
মেহরীন হাসল, তার চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো যেন তার হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলছে। চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা, হাওয়ার হালকা ঠাণ্ডা, দূরের আলো, সব মিলিয়ে যেন এক রোমান্টিক আবহাওয়া।
মেহরীন নীরবে হাতে ধরা ফুলগুলো নাকের কাছে নিয়ে বারবার শুকছে। তার চোখে একরাশ কৌতূহল, ঠোঁটে হালকা ভাঁজ। সে চেষ্টা করছে ফুলের সুভাস নেওয়ার। কিন্তু যতই চেষ্টা করছে, ততই হতাশা হচ্ছে। ফুলগুলোয় কোনো গন্ধই নেই।
তা দেখে পাশে বসে থাকা তালহা মৃদু হেসে বলল,
—এগুলোর ঘ্রান পাবেন না ম্যাম।
তার কথায় মেহরীন মাথা কাত করে তাকায়। তার চোখে কেমন যেন কোমল আলো, যেন চাঁদের আলো ছুঁয়ে গেছে। তালহা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একধ্যানে। এই নিঃশব্দ মুহূর্তটাই যেন প্রেমসন্ধিক্ষণ, যে কোণে কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখের ভাষা, হৃদয়ের স্পন্দন এবং প্রেমের নরম ছোঁয়া একসাথে বয়ে চলেছে।
মেহরীন হঠাৎ প্রশ্ন করল,
—ভালোবাসলেই কি ফুল দিতে হয়?
তালহার চোখের দৃষ্টি আগের তুলনায় আরও নরম হয়ে এলো। মুখে এক চিলতে হাসির রেখা স্পষ্ট, ধীর কণ্ঠে বলল,
—ফুল দেওয়া মানে ভালোবাসাকে হাতে ধরে উপহার দেওয়া। জীবনের ভীড়ের মাঝে বলে দেওয়া, তোমার জন্যই আমার হৃদয়ে নরম একটি জায়গা রেখে দিয়েছি প্রিয়।
কথার গভীরতা যেন মেহরীনের গালে নরম লাল আলো ছড়ালো। তার হাসি গাঢ় হলো। মিষ্টি হেসে সে হাতের ফুলগুলো তালহার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—তাহলে আমিও আপনাকে ফুল দিলাম।
মেহরীনের কান্ডে তালহার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সে মেহরীনের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে তার কানের কাছে গেঁথে দিল। মেহরীন লাজুক হেসে সময়টুকু উপভোগ করছে। এ সময়টুকু যদি এখানেই থেমে যেত মনে মনে কথাটি আওড়াল।
পরের বেশ কিছুক্ষন দুজনেই খোশগল্পে মেতে থাকল। আজ যেন তালহা এক নতুন রূপে। যে তার সামনে মন খুলে পেশ হয়েছে। মেহরীন তো এই তালহাকেই চাচ্ছিলো। অবশেষে, অবশেষে পেয়েছে তাকে।
তালহা কথায় কথায় মেহরীনকে আপনি বলে সম্বোধন করছে। বিষয়টি মেহরীনের হৃদয়ে এক অদ্ভুত আনন্দের উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। বারবার অনুভব হচ্ছে সে যেন তালহার চোখে বিশেষ কেউ, মর্যাদাসম্পন্ন কেউ । আবার হঠাৎ তুমি থেকে আপনি-তে যাওয়ায় লাজুক কম্পনও বুকে নেমে এসেছে, মুখের কোণে হালকা লাজুক হাসি। তালহা যেন তার কথা দিয়েই ছোট্ট মেহরীনকে নিজের দিকে আরও আকৃষ্ট করে ফেলছে। তা কি সে জানে?
কথায় কথায় মেহরীন বলে ওঠে,
—আচ্ছা আপনি আমায় আপনি আপনি করছেন কেনো?
মেহরীনের কথায় তালহা নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল,
—আপনাকে আপনিতেই আপন আপন লাগে তাই।
তার কথায় যেন মেহরীনের মুখে অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো। আলতো করে তালহার কাঁধে মাথা রাখল সে, এই জায়গাটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। একদম নিজের জায়গা। এভাবেই কেটে গেল আরও আধাঘণ্টা। রাত গড়িয়ে তিনটা।
মোবাইলে সময় দেখতেই তালহার মুখে অস্থিরতা ফুটে উঠল। মেয়েটির সঙ্গে থেকে সময় কোনদিকে গড়ালো টেরই পায়নি। এত রাত হয়েছে এখনো মেহরীন সজাগ। তালহা আর বসে না থেকে নিজেই উঠে দাঁড়ায়। মেহরীন যদিও তার সাথে আরও কিছুটা সময় থাকতে চেয়েছিল, তবে তালহা মানা করায় সে আর জোর করল না। থেকেছে তো, এতোটা সময় তালহা থেকে পাওয়াও তার একসময়ের স্বপ্ন ছিল। এতেই তো সে মহাখুশি। চুপচাপ সেও উঠহে দাঁড়াল।
মেহরীন আগে আগে হাঁটছে, আর তালহা ধীর পায়ে তার পেছনে। ছাদের গেটের কাছে এসে ঠিক যখন ভেতরে ঢুকবে, তখনই পেছন থেকে তালহা এক ঝটকায় তাকে টেনে নিল। মুহূর্তটা এত দ্রুত যে বুঝে ওঠার আগেই মেহরীন তালহার বুকে গিয়ে পড়ল। তালহা মেহরীনের দুই বাহু ধরে তাকে আগলে নিল, এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। এদিকে মেহরীণ শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে বিস্ময়।
তালহা নরম গলায় বলল,
—সরি।
মেহরীন অবাক দৃষ্টিতে তাকাল,
—কেনো?
তালহা চোখ নামিয়ে অপরাধীর ন্যায় বলল,
—কালকের জন্য, কালকে অভাবে…
কালকের ঘটনা মনে পড়তেই যেন ভেতরের লজ্জা জেগে উঠল। মেহরীন তৎক্ষণাৎ মাথা নিচু করে ফেলল। তার আঙুল তালহার শার্ট খামচে ধরে আছে, মনে হচ্ছে শরীরের নিয়ন্ত্রণ যেন হারিয়ে ফেলছে। তাকে লজ্জা পেতে দেখে মুচঁকি হেসে উঠে তালহা। বুঝে নেয় তা নিয়ে মেহরীনের মধ্যে রাগ নেই। তার নুইয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল গোলাপি ঠোঁটে, শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট যা মেহরীন বারবার জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছে। হঠাৎ তার মন অন্য কথা কয়ে উঠল। আচমকাই সে মাথা ঝুঁকিয়ে ঠোঁটের দিকে এগোতে লাগল। মুখের দূরত্ব কমতে কমতে একদম কাছাকাছি। একদম ঠোঁটের কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল।
মেহরীন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তালহার শ্বাস গরম হয়ে তার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত উত্তাপ, ভয় আর কামনার মিশ্র এক অনুভূতি। তালহা কিছুক্ষণ একইভাবে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখটা সরিয়ে তার কানের কাছে নিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বলল,
—আপনি এতো ছোট কেনো? কিছু করতে গেলেও হাজারবার ভাবতে হয়। আরেকটু বড় হলে কি এমন ক্ষতি হতো?
তার কণ্ঠে একধরনের অসহায়ত্ব ছিল। যেন নিজের আবেগকে আটকে রাখতে বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ সে। মেহরীন তো চোখমুখ খিচে রেখেছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরও তপ্ত শ্বাস ফেলল তালহা। তারপর গম্ভীর, ভারী কণ্ঠে বলে উঠল,
—একটা কথা মনে রাখবেন, ম্যাডাম। আমি আপনার কোনো ক্ষণস্থায়ী কল্পনা নই, আমি আপনার জন্য ক্যানসারের মতো এক মরণব্যাধি সত্য। আমার ভালোবাসা এই রোগের মতোই, লাগলে ছাড়ে না, আর ছাড়াতে গেলে মানুষই শেষ হয়ে যায়। আমাকে পাওয়া যেমন অবাক সহজ, আমাকে ভুলে ফেলা ততটাই অসহ্য কঠিন। আমার থেকে মুক্তি বলতে শুধু একটাই পথ, ধীরে ধীরে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া, তবে অন্যের নয়..!
কথাটুকু শুনতেই ফট করে চোখ তুলে তাকায় মেহরীন। কেমন যেন তালহার চোখে একধরনের হিংস্রতা ভেসে উঠেছে। যা অল্প হলেও মেহরীনকে কাঁপিয়ে তুলছে। তার কেনো যেন মনে হচ্চে এই ভালোবাসা যেমন মিষ্টি হবে, তেমন বিপজ্জনকও।
তালহা মেহরীনকে ছেড়ে তার হাত ধরে নিচের দিকে হাঁটা শুরু করল। আর পেছনে মেহরীন নিঃশব্দে তার পায়ে পা মিলিয়ে চলছে। তার চোখ তালহার পিঠে, আর মাথায় সেই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। তালহা কি তাকে সতর্ক করল? নাকি হুশিয়ার করে গেল, তার থেকে পালানো যায় না, শুধু ডুবে যাওয়া যায়?
রাত তিনটা। ঢাকা শহর অচেনা শান্তির আড়ালে ঢাকা। আগের তুলনায় যানবাহনের চলাচল এখন কম, রাস্তার বুকটা যেন বিশাল ফাঁকা। সবাই হয়তো যার যার ঘরে ঘুমের নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে, আর রাতের এই নীরবতায় শহরকে নিঃসঙ্গতা দিয়েছে।
তবে এরমধ্যে একজন বাইকার, যেন রাতের অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ করছে, ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। একের পর এক গাড়ি ক্রস করছে, সে থেমে নেই, থামার কোনো ইচ্ছে নেই। রাস্তার ধারে শুয়ে থাকা কিছু অসহায় মানুষ তার হর্নের কোলাহলে হঠাৎ চোখ খুলে উঠে, কেউ কেউ হতাশা মিশ্রিত স্বরে বলছে,
—এর কি মরার ভয় নেই,!
ছেলেটি গাড়ি চালাচ্ছে, জানে না গন্তব্য কোথায়। মনে আছে শুধু, যেখানে ক্লান্ত হবে, বা যেখানে এক্সিডেন্ট ঘটবে, সেখানেই তার পথের অবসান। হয়তো জীবনেরও অবসান। গাড়ির হর্ন, টায়ারের শব্দ, সবই যেন তার ভেতরের অস্থিরতা আরও ঘনীভূত করছে। চোখের কোণে ভাসছে একটি মুহূর্ত। নিজের কল্পনার একটি ক্ষুদ্র জগৎ, একটি কিশোরি মেয়ে এবং তার প্রতিচ্ছবি। মেয়েটিকে নিয়ে সে কত স্বপ্ন বুনেছিল, নিজের হাতে গড়ে তুলেছিল কল্পপনায়। কিন্তু বাস্তব কেনো এইরকম? কেনো মেয়েটির মনে অন্য কারো নাম। নিজেকে সে খুঁজে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সব কিছুর বোঝা তার কাঁধে চাপা পড়ে গেছে। নিঃসঙ্গতা, শূন্যতা, আর এক হতাশার ছায়া, সব কিছু মিশে গিয়ে তার মনকে ছন্নছাড়া করে তুলছে।
এদিকে মাঝরাতে মহিলা হোস্টেলের পেছন দিক থেকে পালিয়ে আসা এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের উপর। বাতাসে তার চুল উড়ছে, চোখ-মুখ কান্নার ফলে ফুলে উঠেছে। রেলিঙের উপর দাঁড়িয়ে। সামনে নদীর কালো জল আর সে, এক পা এগোয় লাফ দেবার জন্য। আবার ভয়ে পিছিয়ে আসে। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে এমনই দ্বিধা চলছেই। একবার মরবে বলে এগোয়, আবার ভয়ে পিছিয়ে আসে। মেয়েটার মনটা এলোমেলো। মাথার ভেতর বিশৃঙ্খলা। মরতে চায়, তবু যেন মরতেও ভয়। ঠিক তখনই কানে আসে গাড়ির শব্দ। এতক্ষণ ধরে এই ব্রিজ দিয়ে কোনো গাড়িই তো যায়নি। হঠাৎ এখন কে যাচ্ছে? জানতে উৎসুক চোখ ডান দিকে ঘুরতেই হেডলাইটের তীব্র আলো এসে তার চোখে লাগে। ফুল স্পিডে ছুটে আসা বাইকটা সোজা তার দিকেই। মূহূর্তেই মেয়েটি হতবাক, এক ধাক্কা লাগলেই সরাসরি নদীর জলে পড়বে সে। আতঙ্কে দ্রুত রেলিঙের দুদিকে দুই পা রেখে শক্ত করে ধরে চিৎকার করে ওঠে,
— নাউজুবিল্লাহ! আল্লাহ মরার নাম মুখে নিতেই তুমি কি আজরাইল পাঠাই দিলা।
এবার হাত নাড়িয়ে, কাঁদো কাঁদো গলায় আরেকটু জোরে চিল্লাতে লাগে,
— হেই বড় ভাইইইইই, এদিকে না, এদিকে না। আমি মরতে চাই না। আই লাভ মাই জীবন, পিলিজ ডোন্ট কিল মি। পিলিজজজ।
তার চিৎকারের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারানো বাইক সোজা এসে তার পায়ের পাশ দিয়ে ব্রিজের রেলিঙে সজোরে লাগে। বেঁকে গিয়ে রাস্তার একপাশে ছিটকে পড়ে বাইকার। রাত তিনটার নীরব রাস্তায়, কেউ দেখারও নেই। বাইকের সামনের অংশ ড্যামেজ, আর ছেলেটির হাত-পায়ে চোট লেগেছে। কপালেও ক্ষত হয়েছে।
বাইক হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় খালি রাস্তায় নিয়ে এসেছিল সে, যাতে কারো কোনো ক্ষতি নাহয়। কিন্তু এখানেও একটি মেয়ে। মেয়েটির এভাবে হাত নাড়ানো তাকে আরও বিভ্রান্ত করে ফেলে। ব্যস এখানেই সংঘর্ষ। বাম হাতে তীব্র ব্যথা। তবুও হতভম্ব চোখে ছেলেটি চারপাশ দেখছে। খুজছে কাউকে। মেয়েটি কোথায়? এই তো এখানেই ছিল। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারিদিকে দেখে, কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। হৃদয়ে হঠাৎ ঠান্ডা একটা শঙ্কা। তাহলে কি, ভুল দেখেছি? মেহরীনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কি ভুল দেখেছি? কিন্তু না, ও তো নড়ছিল, চিৎকারও করছিল। তাহসান দ্রুত হেলমেট খুলে উঠে দাঁড়ায়। চিৎকার করে ডেকে উঠে,
— এনিওয়ান ইজ হেয়ার?
তখনি মেয়েলি গলা ভেসে আসে,
—প্রেজেন্ট প্রেজেন্ট।
প্রেজেন্ট শব্দে সে চমকে উঠে চারদিকে ফের তাকায়। কেউ নেই। তবে আবারও গুঙানি-মেশা মেয়েলি আওয়াজ ভেসে আসে,
— আরে ভাই, ভেবলার মতো না দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে উঠান। আমি পড়লে শেষ। আম্মা, না আমি বাঁচতে চাই। প্লিজ হেল্প মি….
মেয়েটির বকবক শুনে বিরক্ত হয়ে তাহসান ঝারি মেরে বলল,
— এতো বকবক না করে বলবে তো কোথায় আছো, ইডিয়েট?
— আরে কানা নাকি! আমি এইতো আপনার সামনেই ব্রিজে ঝুলে আছি। প্লিজ ভাইয়া হেল্প করেন। আমি আর জীবনেও মাঝ রাতে রাস্তায় আসবো না, মরার নাম মুখেও নিবোনা। প্রমিস!
মেয়েটির কথায় বিরক্ত হলেও সে দ্রুত ব্রিজের দিকে এগোয়। আরেকটু সামনে এগিয়ে নিচের দিকে উঁকি দিতেই দেখে একটা মেয়ে সত্যিই রেলিঙে ঝুলছে। নিচের দিকে তাকিয়ে, রেলিঙ ধরে হাওয়ায় দুলছে। হাত ছুটলেই সরাসরি পানিতে।
তাহসান দ্রুত হাত বাড়ায়,
—হাত ধরো।
তার গলা শুনেই মেয়েটি মুখ তুলে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠে মেয়েটির ভীতু, কান্নায় ভেজা, অসহায় মুখ। তাকিয়েই সে ঠোঁট উল্টে বলে উঠে,
— বিশ্বাস করুন, আমি শুধু মরতে চেয়েছি কিন্তু মরতে চাইনি…
মেয়েটির এমন অদ্ভুত যুক্তিতে তাহসান থমকে যায়। মাথা কি গেছে মেয়েটার? কিন্তু এখন এসব যুক্তি দেখার সময় না, সে তাকে কোনোমতে টেনে তুলে রেলিঙে দাঁড় করায়। উঠে দাঁড়িয়েই মেয়েটি নড়াচড়া শুরু করে। মেয়েটি যে প্রচুর পরিমাণে চঞ্চল তা তার হাবভাবেই বুঝতে পারছে তাহসান। এ যে পড়তে পারে সেই চিন্তাও নেই। হুশিয়ার করতে যাবে তার আগেই মেয়েটার পা আবার ফসকে যায়। তাহসান দ্রুত হাত বাড়িয়ে টেনে নেয়।
সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে।
তাহসান ব্যথায় কাত, হাত, কপাল, পা সব জায়গায় যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সেখানেই হাত পা মেলে চোখ বুঝে নেয়। আর শক্তি এই উঠার তার। এদিকে মেয়েটিও কনুইয়ে আঘাত পেয়েছে, ছুলে গেছে। বিরবির করতে করতেই সে উঠে বসে। পাশ ফিরে তাহসানকে কিছু বলতে নিবে। অমনি ছেলেটির চোখ বন্ধ, নড়াচড়া নেই দেখে ভয় পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি উঠে তার মাথার কাছে গিয়ে বসে কাঁপা হাতে মুখের সামনে হাত নেড়ে পরীক্ষা করে বেচেঁ আছে নাকি।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৪
— লোকটা কি মরে গেল? এখন সব দোষ কি আমার ঘাড়েই? ঠিক এভাবেই তো খবরে দেখেছি, যে ঘটনাস্থলে থাকে তাকেই অপরাধী বানায়। ইয়া আল্লাহ মরতে চেয়েছি বলে অপরাধ করেছি মানলাম। তাই বলে তুমি কি আমাকে জেলে পাঠাবা নাকি? এখন কি হবে রে তোর তনিমা?”
তার এফোঁড়-ওফোঁড় বকবক শুনে হঠাৎ চোখ খুলে জোরে ধমক দিয়ে ওঠে তাহসান,
— স্টপ! আর একটা কথা বললে৷ এক ধাক্কায় ব্রিজ থেকে ফেলে দিবো এবার..
