প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৭
সাইদা মুন
তাহসানকে প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এখন তার চিকিৎসা চলছে। তালহাসহ বাড়ির বড়রা সবাই সেখানে আছে। তাহসানের বাবারা রওয়ানা দিয়ে দিয়েছেন সেই সকালেই। হয়তো ইতোমধ্যেই তারা অর্ধেক পথ পৌঁছে গেছেন। তাহসানের মা একটু পর পর কেঁদে উঠছেন ছেলের জন্য। চোখ বারবার রাস্তার পাশের সাইনবোর্ডের দিকে যাচ্ছে, এখন কোথায় আছে, কত দূর গেল, এই চিন্তায়। আবার একটু পর পরই ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন, ছেলের অবস্থা কেমন? কেমন আছে তার ছেলে? সিলেট থেকে ঢাকার পথ এমনিতেই দীর্ঘ। আবার জ্যামে পড়লে তো তা আরও বেশি ক্লান্তিকর হয়ে উঠে।
এদিকে তালহাও বিরক্ত না হয়ে বারবার ফোন ধরছে, খবর জানাচ্ছে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায়। শান্ত হতে, চিন্তা না করতে, বোঝানোর চেষ্টা করে মামিকে। তবে মায়ের মন শান্ত হওয়ার নয়। ছেলের এই অবস্থায় ছেলেকে চোখে না দেখা পর্যন্ত আর শান্ত হতে পারবে না হয়তো। আবার তিতলি বেগমও কাঁদছেন। ভাই ভাবিকে মুখ দেখাবেন কি করে এই চিন্তায় আরও অস্থির হয়ে উঠছেন। তাহসানের এই অবস্থার কারনে নিজেকে দায় করছেন। তালহা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এক হাতে তাকে আঁকড়ে ধরে আছে। মাকে শান্ত করতে বলছে,
—আম্মু, তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে কি চলবে? বাকিদের সামলাতে হবে তো তোমার।
তিতলি বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলছেন,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—আমি ছেলেটাকে ঠিকমতো রাখতে পারিনি রে বাবা। ভাই ভাবিকে বলে, ছেলেটাকে আমাদের বাসায় আনলাম। তাদের আমানতের হেফাজত করতে পারিনি। আমি কিভাবে মুখ দেখাবো তাদের?
পাশেই তনিমা এতোক্ষন চুপ করে বসে তাদের মা-ছেলের কথোপকথন শুনছিলো। এবার তিতলি বেগমের প্রতিউত্তরে ছটফটে কণ্ঠে তাকে থামিয়ে বলল,
—আহ আন্টি, এভাবে বলে না। তোমার কোনো দোষ নেই। যা হওয়ার ছিল, তা হয়ে গেছে। নিজেকে দোষারোপ করে লাভ কী? এর চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো।
এভাবেই নানান কথা বোঝাতে লাগে। মেয়েটির কথায় তিতলি বেগমও একটু চুপ হয়ে বসেন। তালহা মেয়েটির দিকে একপলক তাকিয়ে হালকা হাসে। আসার পর থেকেই দেখছে, মেয়েটা ভীষণ চঞ্চল স্বভাবের। ফটফট কথা বলে, মুহূর্তেই সবার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আবার কথাতে অপরজনের মনও ভালো করে দিচ্ছে। আশেপাশের অনেক অপরিচিত লোকদের সঙ্গেও পরিচিত হয়ে বসেছে। তাকেও নির্দ্বিধায় ভাই বানিয়ে ফেলেছে।
একটু আগের ঘটনা,
একের পর এক কল আর দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত তালহা মেডিকেল করিডোরের শেষ মাথার জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একটু রিলাক্স হওয়া দরকার চারিদিকের সব দায়িত্ব যেন তার উপর এসে পড়ছে। ঠিক তখনই পিছু পিছু তনিমা মেয়েটি এসে দাঁড়ায়।
—ভাইয়া, আপনার মাথাও কি হ্যাং মারছে সব সামলাতে গিয়ে? আমারও কাল রাতে এমন হয়েছিল। শুধু হ্যাং-ই না, মাথায় পুরো হ্যাং অভার গান বাজছিল।
তার কথায় তালহা মনে মনে হেসে উঠে। তবে নিজেকে নরমাল রেখেই আড়চোখে তাকাতেই তনিমা মনে করে হয়তো বেশি কথা বলে ফেলেছে তাই ধমক দিবে। তাই দ্রুত বলে ওঠে,
—উনার মতো আপনিও কি ধমক দিবেন? না না প্লিজ, এই পাবলিক প্লেসে না ভাইয়া।
কথাটুকু বলেই তালহার দিকে আরেকটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
—আসলে ধমক একটা ডিজগাস্টিং ব্যাপার। আর আমি এখন বড় হয়েছি, বুঝেন না মান-সম্মানের ব্যাপার।
তালহা এবার প্রকাশ্যেই হেসে উঠল। মেয়েটির মধ্যে যেন তাহিয়াকে দেখতে পাচ্ছে। তাহিয়াও এমনই, দোষ করলে আড়ালে যা খুশি বকা দেওয়া যায়, কিন্তু সকলের সামনে দিলেই যেন তার সম্মানে লাগে। সে কি রাগ। সেই ভেবেই নরম গলায় বলল,
—ওকে তাহলে বকছি না। তবে তোমার মতো আমারও একটা ছোট বোন আছে।
একথা বলতেই যেন মেয়েটা আরও আশকারা পেয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছিল। একপর্যায়ে তালহাকে ভাইও বানিয়ে ফেলে। তালহাও কথায় কথায় মেয়েটির ঠিকানা জানতে চাইলে তনিমা কিছুটা থতমত খেয়ে বসে। সে তো নিজের আসল ঠিকানা এখন বললেই তাকে বাসায় দিয়ে আসবে এইটা কনফার্ম। তাই ভেবে তনিমা মিথ্যা বলে বসে।
কন্ঠ খাদে নামিয়ে মিথ্যে কান্নার ভান করে বলেছিল,
—আমি এক হতভাগিনী, আমার বাড়ি বলতে কিছু নেই। যেখানেই রাত হয়, সেখানেই কাত হই। আই মিন যেখানেই রাত হয় সেখানেই থেকে যাই।
তার কথায় তালহার কিছুটা সন্দেহ জেগেছিল তবে এতো মাথায় নেয়নি। তার কথায় সবারই মায়া লেগেছিল। তিতলি বেগম তো সঙ্গে সঙ্গেই বলেছিলেন তাদের সাথেই যেতে। নিজের হাতে খাবারও খাইয়ে দিয়েছেন মেয়েটিকে। তাহসানের জীবন বাঁচিয়েছে, এইটুকু কৃতজ্ঞতা তাদের যেন করতেই হয়।
এদিকে সকলের কথা শুনে তনিমা তো মহা খুশি। তার কাছে যেন এইটা একপ্রকার এডভেঞ্চার এর মতো লাগছে। অপরিচিত পরিবেশে, অপরিচিত মানুষদের সাথে থাকবে। সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেছে। অন্তত এই সুযোগে কয়েকদিন পড়াশোনা থেকে দূরে থাকবে, ছুটি কাটাবে যতোদিন না তার বাবা তাকে খুঁজে বের করতে পারে। এই ভাবনা নিয়ে আনন্দে প্রায় আত্মহারা মেয়েটি। তবে এর জন্য কতো বড় ঝামেলা হতে পারে সেই চিন্তা মাথায় নেই। আনন্দে আনন্দে নিজের জীবন কোন মোড়ে নিয়ে যাবে কেই বা জানে।
এভাবেই দেখতে দেখতে ঘণ্টা পার হয়ে যায়। তাহসানের ঘুম ভেঙেছে। একে একে সবাই গিয়ে তাকে দেখতে লাগে। তনিমাও উঁকিঝুঁকি দিয়ে দরজার বাইরে থেকে কয়েকবার দেখেছে। তবে ভেতরে যায়নি, বকুনি খাওয়ার ভয়ে। সবার শেষে তালহা কেবিনে প্রবেশ করে। আস্তে করে দরজাটা ধাক্কা দিতেই খুলে যায়। ধীর পায়ে তাহসানের দিকে এগোয়। মুখে তার বাঁকা হাসি, সামনের টুলটা টেনে আরাম করে বসে বলল,
—তোর দোষমণি আমার সঙ্গে, বাইকের সঙ্গে মেটানোর লজিকটা ঠিক বুঝলাম না।
তাহসান কড়া চোখে তাকিয়ে আছে তালহার দিকে। তালহা যে তাকে ইচ্ছে করেই নাড়ছে। তাকে চুপ দেখে তালহা হেসে উঠল,
—আমি ভাবলাম, তুই আমার কম্পিটিটর, কিন্তু এখন দেখি তুই টুমাচ উইক। চু..চু…এভাবে মজা পাচ্ছি না ব্রো।
এবার তাহসানও সমান তালে হেসে উঠল,
—ট্রেইলার দেখেই হাওয়া ফুস ব্রো? ভাবতেছি ফুল মুভি যখন শুরু হবে, তখন তো তোর ঘাম ছুটবে।
তাহসান যেন জোকস বললো, তালহা শব্দ করে হেসে উঠল,
—নাইস জোকস…
তাহসান সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হেসে এক চোখ টিপে বলল,
—থাম ভাই, বেশি হাসলে আবার দাঁত খুলে পড়ে যাবে। দাঁতহীন সিংহ কি আর শিকার ধরে রাখতে পারে? শক্তি আছে, কিন্তু অস্ত্র নেই, ব্যাপারটা বেমানান। দেখা গেল, নাকের ডগা থেকে শিকার উধাও।
তালহা আয়েশি ভঙ্গিতে এক পায়ের উপর অপর পা তুলে মাথা হালকা কাত করে কটাক্ষভরা কণ্ঠে বলল,
—সিংহের শক্তি দাঁতে নয়, দাপটে। আর সিংহের খাঁচা থেকে শিকার ছিনিয়ে নিবে, বলা যতটা সহজ। শিকার করা ততটাই অসম্ভব। মনে রাখিস, রাজা ঘুমালেও তার দাপট ঘুমোয় না।
তাহসান আর কিছু বলতে যাবে এমন সময় তালহার ছোট চাচ্চু ভেতরে ঢুকেন। এগোতে এগোতে কপাল কুঁচকে বললেন,
—কিরে, কিসের সিংহ আর রাজার কথা চলছে?
চাচাকে দেখে তালহা উঠে দাঁড়িয়ে উনাকে বসতে দিয়ে বলল,
—ওই আরকি, তাহসান রূপকথার গল্প শুনতে চাচ্ছিলো, তাই আমিও শোনাচ্ছিলাম।
তাহসান বিরক্তিচোখে চুপচাপ শুধু দেখছে। আর কিছু বলল না। শরীরের জোর নেই, মুখের জোর দেখিয়েও লাভ নেই। তপ্ত শ্বাস ফেলে চোখ ফিরিয়ে নিল। তালহা তাহসানের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার ব্যান্ডেজ করা হাতে এক আঙুলে গুতো দিলেই ব্যথায় তাহসান চোখ-মুখ কুচকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
—তোর কি চুলকানি উঠেছে?
—একটু ছুঁয়ে দিলাম। ভালো মানুষের হাত লাগলে ব্যথা তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে।
বলেই টেডি স্মাইল দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। এখন বিকেল পাঁচটা বাজে। সিলেট থেকে যারা আসছে, সবাই ঢাকার মধ্যে ঢুকলেও জ্যামে আটকে আছে। এই জ্যাম পার হতে আরও ঘন্টা খানেক লাগবেই।
তিতলি বেগম প্রেসারের রোগী মেডিকেলে আছেন সেই সকাল থেকেই। আবার তাহসানের সঙ্গে যেই মেয়েটি ছিল, সে তো কাল রাত থেকেই এখানে। মেয়েটিরও বিশ্রামের প্রয়োজন। এসব ভেবেই তালহা মাকে আর তনিমাকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য বের হয়।
সিকদার বাড়ির কলিংবেল তিন-চারবার বাজাতেই রিতু তাড়াহুড়ো করে হাতের সামনে যেই ওড়না পেয়েছে তা গলায় দিয়ে বিরক্তিতে কেটকেট করতে করতে নেমে আসে নিচে। তার মা একটু আগে মাত্র ঘুমিয়েছে, তাহিয়া-মেহরীন ও বাড়ির বড়দের অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ছোট চাচীর কোমরে সমস্যা, একবার বসলে আবার উঠতে কষ্ট হয়। তাই তাকেই আসতে হলো। চুল বাঁধতে বাঁধতে দরজা খুলতেই তালহাদের দেখে সাইড হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভেতরে ঢুকতেই পেছন পেছন একটি মেয়ে আসে। গায়ে অ্যাশ কালারের সালোয়ার-কামিজ, কাপড়ের কিছু কিছু জায়গায় ময়লা লেগে আছে। মেয়েটিকে ঢুকতে দেখে রিতু হঠাৎ সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
—এই মেয়ে, বলা নেই কওয়া নেই, হুটহাট কারো বাড়িতে ঢুকতে নেই জানো না?
কথাটা শুনে তনিমা থমকে দাঁড়ায়। ভ্রু কুচকে উপর থেকে নিচ অব্দি তাকে দেখে নেয়। রিতুর গায়ে ঢিলেঢালা গোলাপি রঙের লং টিশার্ট, টিশার্টের কিছু কিছু জায়গায় ছেঁড়া, যা এখনকার ফ্যাশন। আবার গলায় হলুদ রঙের ওড়না ঝুলছে। চুল এলোমেলো। একেক রঙের একেকটা জামা দেখে কিছুটা অবাক হয়ে দেখে। কিছু একটা ভেবে তনিমা বলল,
—সরি খালা, দাঁড়ান।
বলেই চৌকাঠের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো, তারপর ভদ্র ভাবে জিজ্ঞেস করল,
—খালা, মে আই কামিং? ও থুক্কু আপনি তো ইংলিশ বুঝবেন না। আমি কি ভেতরে আসতে পারি খালা…?
রিতু রাগে ভস্ম করে দেওয়ার মতো চোখ করে চেয়ে আছে। চিৎকার করে উঠল,
—হোয়াট? খালা কে?
তনিমা কিছুটা হকচকিয়ে উঠে এমন রিয়েক্টে। কি হলো বুঝলো না তবে বুঝতে পারছে কিছু ভুল বলে ফেলেছে সে। ঘাবড়ে গিয়ে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল,
—ইয়ে মানে.. আপনি বোয়া না?
‘বোয়া’ শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো বাজল রিতুর কানে। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল নিমিষেই, রাগে ফুঁসতে লাগল। ক্ষোভে ভরা গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
—শাট আপ! একটা দেবক কানের নিচে। আমাকে কোন দিক দিয়ে বোয়া লাগে হ্যা..?
রিতুকে রেগে যেতে দেখে তিতলি বেগম হেসে এগিয়ে আসেন। তনিমাকে টেনে ভেতরে এনে বললেন,
—আরে মা, ও রিতু এ বাড়ির বড় মেয়ে। কিসব বোয়া-টোয়া বলছিস?
কথাটা শুনতেই তনিমা জিভে কামড় দিয়ে বোকা হেসে বলল,
—অপ্স, সরি সরি গালতি সে মিস্টেক। দেখে ভেবেছিলাম…উহুম ইয়ে মানে।
রিতু যেন রাগে ফেটে পড়ছে। ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে তাকিয়ে আছে তনিমার দিকে। তার তাকানো দেখে মনে হচ্ছে আক্রমণ করেই বসবে। তা দেখে ভয়ে তনিমা তড়িঘড়ি তিতলি বেগমের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়,
—আন্টি, আপুকে মেভি মাঞ্জুলিকা ভর করেছে। কিভাবে ফুঁসছে…
—শাট আপ! আর একটা কথা বললে থাপ্পড় মেরে গাল সত্যি ফাটিয়ে দিবো। বেয়াদব মেয়ে!
রিতুর এমন ধমকে ভয় পাওয়ার বদলে যেন তনিমা আরও ক্ষেপে উঠল। আজ অবধি তাকে এভাবে কেউ বলেনি। আর এই মেয়ে কিনা তাকে ধমকাচ্ছে। এখানে তার বাবা থাকলে সে ব্যান্ড বাজিয়ে দিতো এক্ষুনি। তবে আপাতত কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেল। নিশ্চুম রইল। তিতলি বেগম রিতুকে থামিয়ে বললেন,
—রিতু, কি হচ্ছে? এভাবে কাউকে বলতে নেই।
—আর ওই মেয়ে যে আমাকে যা-তা বলে যাচ্ছে, ওসব?
—তোর অবস্থা তুই নিজে দেখেছিস? যে কেউই তো বলবে। বাদ দে ছোট মানুষ।
বলেই তিতলি বেগম মিটিমিটি হেসে ফেললেন। রিতু কঠিন চোখে তাকাল তনিমার দিকে। জিজ্ঞেস করল,
—এই মেয়ে কে, বড় মা?
তিতলি বেগম সোফায় বসে তনিমাকেও পাশে বসতে দিয়ে বললেন,
—তাহসানকে কাল রাতে ও-ই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। নাম তনিমা। মেয়েটা ভীষণ ভালো।
রিতু তনিমার দিকে তিক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
—সে তনিমা না ফনিমা হোক৷ সে আমাদের বাড়িতে কি করছে?
—মেয়েটা অসহায়, কেউ নেই। আমাদের এতো বড় উপকার করেছে, তাই ভাবলাম আমাদের কাছেই রাখি কয়েকদিন।
রিতু নাক উঁচু করে, কোমড়ে হাত দিয়ে অসহ্য কণ্ঠে বলল,
—এটা কি আমাদের বাড়ি নাকি চ্যারিটি ফান্ড? দুদিন পরপর যাকে তাকে নিয়ে আসো সাহায্যের নামে। বাড়িটা কি আশ্রিতায় ভরে যাবে?
কথাটুকু তনিমার গায়ে বেশ লেগে গেল। তাদের বাকিদের ব্যবহার অনেক ভালো, কিন্তু এই মেয়ের ব্যবহার কেন এমন? কয়েকটা কড়া কথা শোনাতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। তবে কথা ছেড়ে দেবার পাত্রি নয় সে। সঙ্গে সঙ্গে আলতো হেসে পাল্টা উত্তর ছুড়ল,
—আপু, আমরা আমরাই তো সমস্যা, কি!
রিতু তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
—আমরা আমরাই মানে?
তনিমা খোঁচা মেরে সোজাসাপ্টা বলল,
—সিম্পল, আপনিও আশ্রিতা, আমিও আশ্রিতা। হেহে।
কথাটুকু বলেই সে জোরপূর্বক হেসে উঠল, যেন কোনো জোকস শুনিয়েছে। তা শুনতেই রিতু রেগে চেচিয়ে উঠে,
—হোয়াট! আমি আশ্রিতা? এই মেয়ে, তোমার সাহস তো কম না। এতো বড় কথা..
তিতলি বেগম হতাশ হয়ে বসে আছেন। রিতু ছোট বেলা থেকেই কিছুটা দেমাগী, কিছু যে বলবেন সে উপায়ও নেই। কিছু বললেই মনে গেথেঁ বসে থাকে। আবার তনিমাও নতুন এসেছে, তাই তাকেও কিছু বলতে পারছে না। এদিকে তনিমা দ্রুত কথার পালা ঘুরাতে বলল,
—আরে আপু, আপনি আশ্রিতা ইন এ গুড ওয়ে। মানে, আপনি অধিকারপ্রাপ্ত আশ্রিতা।
রিতু কটমট চোখে তাকিয়ে। এই মেয়ে একে তো যা খুশি বলেই যাচ্ছে, উপরন্তু উল্টো পালটা কিসবও বকছে। রিতু ধমকে জিজ্ঞেস করল,
—কি যা তা বকছ?
—আপু আমরা মেয়ে মানুষ। আর মেয়ে মানুষের নিজের বাড়ি বলতে কিছু হয় না। ছোট থেকে বাপের বাড়ি, বড় হলে জামাইর বাড়ি, আর বৃদ্ধ হলে ছেলে-মেয়ের বাড়িতে থাকব। কথা কি ঠিক?
তনিমা দুজনকেই জিজ্ঞেস করল। তিতলি বেগম মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালেন। কিন্তু রিতু শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে, হ্যাঁ না কিছুই বলছে না। নিরবতাকে সে সম্মতির লক্ষ্মণ ভেবে ফের বলল,
—সো, সেই হিসেবে আমরা সকল মেয়েরাই যে যার জায়গায় আশ্রিতা। তাই আপনিও এই বাড়ির আশ্রিতা। তবে লিগ্যাল আশ্রিতা, কারণ এটা আপনার বাবার বাড়ি।
রিতু অসহ্য চোখে চেয়ে। এসব কোন ধরনের লজিক। মেয়েটা এসেছে ধরেই তাকে কথায় কথায় অপমান করছে। একে কথা শুনিয়ে মজা পাচ্ছে না সে। অন্যদিকে মেহরীনকে এত কথা শুনিয়েছে, অথচ পাল্টা মেয়েটি আজ পর্যন্ত তেমন কিছু বলেনি। আর এই মেয়ে কিনা চেটাংচেটাং কথা শুনিয়েই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বলল,
—এই মেয়ে মেন্টাল নাকি?
তনিমা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
—আমি মেন্টাল না, আমি উইমেনশর্ট।
উদ্ভট শব্দ শুনে রিতুর মাথা গুলিয়ে উঠল। এই শব্দের অর্থ ভেবেও বুঝলো না। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—উইমেনশর্ট কি?
তনিমা সোফায় বসে হেসে উত্তর দিল,
—আমি ম্যান না, উইমেন। আর টলও না, একটু শর্ট আছি। তাই উইমেনশর্ট।
রিতু আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। এ মেয়ে পাগল বানিয়ে ফেলবে আর কিছুক্ষন দাড়ালে। ছ্যাতছ্যাত করতে করতে নিজের রুমে চলে গেল। সে চলে যেতেই, খিলখিলিয়ে হাসির শব্দে তনিমা সিড়ির দিকে তাকায়। দেখল একটি মেয়ে হাসতে হাসতে নেমে আসছে। দেখতে পাতলা গড়নের, সুন্দর মেয়েটি। ভালো করে লক্ষ্য করতেই মাত্র যাওয়া মেয়েটির সাথে চেহারা কিছুটা মিলল।
ফাইজা হাসতে হাসতে নেমে তাদের পাশে এসে বসল। তার হাসি যেন থামছেই না। তিতলি বেগমও সাথে হাসছেন। তাদের দুজনের হাসি দেখে তনিমাও খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
—বড়মা কে গো, এই পিচ্চি? আপুর তো একদম বালতি বান্দ কার দিয়া।
বলেই আবারও শব্দ করে হেসে উঠল। তা দেখে তনিমা বলল,
—আপু, একদম কড়াক টাইপের ছিল না?
তার কথায় আরও জুড়ে হেসে মাথা ঝাকায়। এর মধ্যে পরিচয় করালেন রিতুর ছোট বোন ফাইজার সাথে তনিমার। মেয়েটি ফাইজার সাথে বসে গল্প জুড়ে দেয়। প্রতিটা কথাতেই হাসতে হাসতে বেহুশ প্রায় ফাইজা সহ তিতলি বেগমও। একপর্যায়ে তিতলি বেগম তাকে থামিয়ে বললেন,
—হয়েছে, অনেক হাসি ঠাট্টা। ফাইজা মা, তাকে তাহিয়ার ঘরে দিয়ে আয় তো। আর বলিস, তাহিয়া একসেট জামা দিতে, মেয়েটা গোসল করে নিবে।
ফাইজা মাথা নেড়ে তনিমাকে নিয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগে। মেয়েটিকে বেশ পছন্দ হয়েছে ফাইজা। অনেক হাসিখুশি, প্রানবন্ত। দুতলায় উঠতেই মেহেদির মুখোমুখি পড়ল তনিমা। ছেলেটা কেবল ঘুম থেকে উঠেছে। ফাইজার ঘরেই ঘুমাচ্ছিল। ফাইজাকে দেখে সে চোখ কচকাতে কচলাতে বিরক্তি কন্ঠে বলল,
—তোমার মোবাইল এতো ম্যা-ম্যা করে কেন? আমার ঘুমটাই নষ্ট করে দিয়েছে।
ফাইজা জিজ্ঞেস করল,
—কল দিয়েছে কেউ?
মেহেদি মাথা নাড়তেই ফাইজা তাড়া দিয়ে বলল,
—মেহেদি, ও হলো তনিমা, ওকে তাহিয়াদের ঘরটা দেখিয়ে দে। আপু আসছি একটু দরকার আছে।
ফাইজা যেতেই, মেহেদি তনিমাকে স্ক্যান করতে লাগল। মেয়েটিকে নতুন দেখে সন্দিহান চোখে চেয়ে আছে। তনিমাও সমান তালে তাকিয়ে আছে। মেহেদি একসময় কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—লিসেন, আমি এই বাড়ির ছোট সাহেব। সবাই আমার কথায় চলে, বুঝলে? তাই তুমিও আমার কথায় চলবে।
তনিমা মেহেদির কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলল। তাকে হাসতে দেখে মেহেদি গাল ফুলিয়ে বলল,
—এই হাসছ কেন? হ্যা হ্যা?
তনিমা হাসি আটকে মেহেদির কাঁধে হাত দিয়ে বলল,
—আরে, হয় হয়, এসব ধাপ্পা আমিও মারতাম। বাড়িতে নতুন সদস্য আসলেই নিজের পাওয়ার দেখাতাম। কিন্তু আসলে জিরো পাওয়ার ছিল।
কথাটা শুনে মেহেদির হাওয়া বেরিয়ে গেল। চোখ-মুখ ছোট করে বলল,
—যাহ, তুমি জানলে কিভাবে?
তনিমা কানে কানে বলল,
—সিক্রেট।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৬
মেহেদি গাল ফুলিয়ে সামনে হাঁটতে লাগল। বেচারার ইগোতে লেগেছে ব্যাপারটা, ভাব ও দেখাতে পারল না। তাহিয়াদের দরজাটা দেখিয়ে, নিচে দাদির ঘরে ছুটে গেল। দাদিকে জানাতে হবে, নতুন একটি মেয়ে এসেছে। এ হলো, এই বাড়ির সাংবাদিক, কিছু না হতে না হতেই পুরো বাড়ি ছড়িয়ে দেয়। তনিমা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সামনের দরজার দিকে আগ বাড়ায়। সামনের ঘরের দরজা হালকা ধাক্কা দিতেই মেলে যায়। রুমের ভেতর তাকাতেই দেখে জানালা পর্দা লাগিয়ে রুম অন্ধকার করে রেখেছে। এ রুমে কি আধো কোনো মানুষ আছে নাকি ভূত-প্রেত তা ভেবে ভয়ে ভয়ে আগ বাড়ায়। কয়েক কদম ফেলে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ……
