Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩১

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩১

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩১
সাইদা মুন

হঠাৎ কান্না মিশ্রিত কাঁপা কণ্ঠে ভাইয়া ডাক শুনতেই দুজনই থেমে যায়। আরমান ততক্ষণে তাকিয়ে দেখতে পায় তনিমাকে। আর এক মুহুর্ত ও দাঁড়িয়ে না থেকে এক ছুটে গিয়ে বোনকে আঁকড়ে ধরে বুকে টেনে নেয়।
—তুই কোথায় গিয়েছিলি তনু? ঠিক আছিস তো জান আমার? জানিস ভাইয়া কতোটা টেনশনে ছিলাম। ভাইয়ার কথা একবারও ভাবলি না?

বলতেই তনিমার দু’গাল হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে চুমু খায় আরমান। বোনকে আঁকড়ে ধরে বারবার শ্বাস নিচ্ছে সে। চোখে পানি চকচক করছে। বোঝায় যাচ্ছিল, বোনকে হারিয়ে সে কতটা ভেঙে পড়েছে। তনিমাও কাদছে, কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না। সোহেল হোসেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছেলে-মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
সিকদার বাড়ির সবাই অবাক, কেউই পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না। তনিমার কেউ নেই তা জানে তারা। তবে এরা কারা। তবে কি মেয়েটা মিথ্যা বলেছে?
বিল্লাল সাহেব এগিয়ে এসে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,,
—তনিমা, এরা কি তোমার বাবা-ভাই?
তনিমা ভাইকে ছেড়ে চোখ মুছে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—জ্বী..

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কথাটুকু শুনতেই সবাই রেগে যায়। মেয়েটা এভাবে তাদের ঠকালো। তালহা গরম গলায় চেঁচিয়ে উঠে,
—তো, মিথ্যা বললে কেনো আমাদের? তোমার একটা মিথ্যায় কত বড় গন্ডোগোল হয়েছে, সে খেয়াল আছে কি? তোমার কারণে আমাদের বাড়ি বয়ে অপমানিত হতে হচ্ছে।
তনিমা ভয়ে আরও মিয়িয়ে যায়। আরমান তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে রাগী কণ্ঠে বলল,
—এই সাবধানে কথা বল। এভাবে চেচাচ্ছিস কেনো?
তালহা চেচিয়ে ওঠে,
—তোর বোন কি কান্ড করেছে, তাকেই জিগা!
আরমান বোনের দিকে তাকায়, চোখে প্রশ্ন, কিন্তু তনিমা মাথা নিচু করে আছে। সোহেল হোসেন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

—কি হয়েছে, কিছু বলছো না কেনো?
তনিমা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—ওদের কোনো দোষ নেই। আমি নিজেই ওদের সাথে এসেছি।
আরমান পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল,
—মানে?
তানিয়া বেগম এগিয়ে এসে বললেন,
—আমি বলছি কীভাবে আপনার মেয়ে আমাদের মিথ্যা বলে এতো বড় ঝামেলায় ফেলেছে।
তারপর পরশুদিন থেকে আজ পর্যন্ত ঘটনার পুরো বিবরণ শোনালেন। শেষে বললেন,
—মানলাম, আপনার মেয়ে আমাদের অনেক বড় উপকার করেছে। তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব। তবে তাই বলে এমন মিথ্যা বলবে? আমাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিবে?
সোহেল হোসেন রেগে মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে এক ঝাপটা মেরে তার হাত ধরে বললেন,

—কি এসব! কি শুনছি, তনিমা! এসব কি সত্যি?
তনিমা মাথা নাড়তেই মুহূর্তের মধ্যে সোহেল হোসেনের হাত উঠে আসে। ঠাস করে এক থাপ্পড় লাগে তনিমার গালে। থাপ্পড়ের শব্দে করিডোরটা থমকে যায়। তনিমা চমকে উঠে দুহাত দিয়ে গাল চেপে ধরে। পরের সেকেন্ডেই কেঁদে ওঠে জোড়ে জোড়ে।
আরমান দ্রুত এগিয়ে এসে বোনকে টেনে আড়াল করে নেয় বাবার সামনে থেকে। সোহেল হোসেনের কণ্ঠ রাগে কাঁপছে,
—বেশি আদর করি বলে যা ইচ্ছে তাই করবে? হোস্টেল থেকে পালিয়ে এতো বড় ঘটনা ঘটিয়ে বসে আছো! একবারও ভাবলে না যদি কোনো খারাপ লোকের হাতে পড়ে যেতে? যদি এই পরিবার আজ তোমাকে না পেত? কি হতো তোমার? একবারও ভেবেছ? তুমি হোস্টেল থেকে কেন পালালে? আমি কি এই শিক্ষা দিয়েছিলাম?
তার একের পর এক হুংকারে,সবাই চুপ। সবার দৃষ্টি তনিমার দিকে। এতোক্ষণ চুপ থাকা তনিমা এবার আরমানের হাত ছাড়িয়ে বাবার সামনে এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি ভেজা, তীব্র অভিমান মেশা। নিজের অন্য গালটা পেতে ধরে তীব্র কণ্ঠে বলল,

—মারবে আমায়? মারো! আরও মারো। এই যে গাল পেতে রেখেছি, মারো না..
তার কথায় সোহেল হোসেন থমকে যান। রাগ আর অপরাধবোধের মাঝখানে কেমন আটকে যায় তার চোখ। উপরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীন, তাহিয়ারা ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যায় মেয়েটার এই ভাঙা অবস্থায়। খারাপ লাগে তার জন্য। দ্রুত তারা নেমে আসে। ফাইজা-রিতুরাও এগিয়ে আসে, সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোহেল হোসেন গভীর শ্বাস ফেলে বলেন,
—দোষ করে আবার উল্টো গলা বাজাচ্ছো? তোমার মায়ের কি অবস্থা হয়েছে জানো? আমি সারারাত টেনশনে ঘুমাইনি। তোমার ভাই কাল থেকে পাগলের মতো অলিগলি ছুটে বেড়াচ্ছে!
তার কথার মাঝখানেই তনিমা রাগে-আঘাতে তাকে থামিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
—হ্যাঁ! দোষ করেছি, আবার চেঁচাচ্ছিও। তোমরা খালি আমার ভুল দেখো, কিন্তু কেনো করেছি সেটা দেখছো না। টেনশন করো ঠিকই, কিন্তু আমাকে ভালোবাসো না। তোমরা সবাই ভীষণ স্বার্থপর। আমার দিক কেউ দেখে না, কেউ না।
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু কথা থামছে না।

—আমি হোস্টেলে থাকতে চাই না। আমি থাকতে চাই আমার নিজের বাড়িতে। মানুষের মাঝে থাকতে চাই!
আমি মুক্ত পাখি, আমাকে খাঁচায় ভরে রাখলে এমনটা হবেই।
আরমান বোনের হাত ধরে টেনে কাছে নিল,
গলায় উদ্বেগ কিন্তু চোখে তার স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।
—কি বলছিস তনু, উই লাভস ইউ সো মাচ, এভাবে বলছিস কেনো।
কিন্তু তনিমা কেমন যেন ছটফট করতে করতে আরমানের হাতটা ঝারি মেরে সরিয়ে দিল। চোখের কোণে জমে ওঠা জল আর চেপে রাখা অভিমান মিলেমিশে মুখটাকে আরও শক্ত, আরও ক্ষতবিক্ষত বানিয়ে তুলেছে।
সে কেঁপে ওঠা গলায় বলল,

—না না তোমরা আমাকে ভালোবাসো না। ভালোবাসলে অন্তত আমাকে ছাড়া দিনের পর দিন থাকতে পারতে না। আমাকে তোমাদের থেকে দূরে রাখতে পারতে না। আমাকে তোমরা মোটেও ভালোবাসো না, আমাকে একটুও সময় দাও না, আমাকে একটু বুঝো না। সবাই খালি নিজেদেরটা দেখো। কেউ আমারটা দেখো না।
ঘরের সবাই থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কথায় সকলেই অসহায় চোখে চেয়ে আছে মেয়েটার দিকে। সোহেল হোসেনের গলা নরম হয়ে আসে, চোখেমুখে আতঙ্ক। তিনি যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না এটা তার মেয়ে বলছে। মেয়েটার মনে এতো অভিমান জমে আছে।

—মা এভাবে বলে না। আমরা তোমার ভালোর জন্যই তো হোস্টেলে দিয়েছি। এর মানে এই না যে আমরা তোমাকে ভালোবাসি না। কলেজ হোস্টেলে থাকলে মনোযোগ সহ পড়াশোনা করতে পারবে। তাই তো…
তার বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই তনিমা তার কথা কেড়ে নিল, আরো তীব্র, আরো ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
—কচু ভালোর জন্য! বলো তোমাদের স্বার্থের জন্য। তোমাদের ভালো রেসাল্ট লাগবে তাই জন্য এমন ব্যবস্থা করেছো। আমার ভালোর জন্য না। তোমরা আমার ভালোই চাও না। না আমাকে চাও। এই যে দেখছ এই পরিবারকে?

সে হাত তুলে তালহাদের দিকে দেখায়। চোখে তখন শুধু তুলনা নয়, ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা যন্ত্রণা।
—ওরাও আমাদের মতোই যৌথ পরিবারের লোক। ওদের বাড়ির ছেলেরাও ব্যস্ত থাকে, বড় বড় বিজনেসম্যান, সারাদিন কাজ কামে থাকে। তবুও দিনশেষে পরিবারকে সময় দেয়। ওই যে দেখছ তাহিয়া?
সে এবার সরাসরি তাহিয়ার দিকে দেখিয়ে, আবার আরমানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরমান যেন কিছু বলার আগেই তনিমা তার আঘাতগুলো উজাড় করে দিতে লাগল,

—ও হলো তাহিয়া, আর এইযে তালহা ভাইয়া। সে তাহিয়ার ভাই। তাহিয়াকে ভালোবাসতে একটুও কমতি রাখেনা। সারাদিন পর এসে বোনকে, পরিবারকে, সময় দেয় উনি। তাহিয়ার কিছুর আবদার করার হলে ডিরেক্ট গিয়ে তার ভাইয়ের কাছে বলে। পড়াশোনাতেও তাহিয়া অনেক ভালো বাসায় থেকেই। তার ভাই সারাদিন কাজ সেরে দিনশেষে এসে বোনকে পড়ায় নিজেই। কারণ অন্য টিচার্সদের উপর উনার ভরসা নেই। আরও কতো কি গল্প শুনেছি তাহিয়ার থেকে তার আর তার ভাইয়ের। তাহিয়া তার ভাইকে নিয়ে প্রাউড ফিল করে। তাহিয়ারর তো তার ভাইকে নিয়ে গল্প শেষই হচ্ছিল না। আর আমি? আমি তোমাকে নিয়ে বলতে গেলে কয় লাইন বলতে পারব? শুধু তুমি আমাকে ভালোবাসো, আর আমি তোমার বোন। এই দুই লাইন ছাড়া আর কিছু? বলার আছে?
শেষ কথাটা বলার সাথে সাথে তনিমার গলা ভেঙে আসে। সে যেন নিজের দম আটকে আসা কষ্টটাকে সামলে নিতে একটু থামে। তারপর আরও গভীর কণ্ঠে বলল,

—না কোনোদিন তুমি আমাকে সময় দিয়েছো। সেই ছোট থেকেই দেখে এসেছি। যখন কলেজ ভার্সিটি ছিলে তখন বাসায় থাকলে পড়ার বাহানায় একাই এক রুমে বসে থাকতে। আমি বলতাম ভাইয়া একটু খেলো আমার সাথে, তোমার সময়ই হতো না। বড় হওয়ার পর তুমি হলে বিজনেসম্যান, সঙ্গে আরও মহা বিজি হয়ে উঠলে। আমি তোমার কাছে কিছু চাইতে গেলেও বলো হরি কাকাকে বল এনে দেবে। আর নয়তো হাতে টাকা ধরিয়ে দিতে। কখনো আমার পড়ার সময় এসে খোঁজ নিলে না, পড়ছে কিনা। তবে রেজাল্টের সময় ঠিকই খোঁজ নিতে। তুমি-আব্বু দুজনেই। তোমরা আমাকে কোনো কিছুর অভাব দাওনি। কিন্তু আমাকে সময়ের অভাব দিয়েছো, ভালোবাসার অভাব দিয়েছো। ওহ সরি, ভুল বললাম… ভালোবাসো তোমরা, আমি জানি আমি তোমাদের জান। তবে সময় হয়ে উঠেনা সেই জানকে সময় দেওয়ার। জানের যত্ন করার।

শেষ লাইনটা যেন পুরো ঘরটাকে নিস্তব্ধ করে দিল।
আরমান, সোহেল কারোর মুখেই শব্দ নেই। হঠাৎ তাদের কাছেও যেন নিজেদের ভুলগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সোহেল হোসেন এতটা সময় যে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মানুষটা হঠাৎ ভেঙে পড়লেন।
তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেয়েকে টেনে বুকের মধ্যে চেপে ধরলেন। যেন ভয় পাচ্ছেন এই কাঁপতে থাকা মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে যাবে, সেই ভয়। তার চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল পড়ে তনিমার কাঁধে।
কাঁপা, অপরাধবোধে ভরা কণ্ঠে তিনি বললেন,

—আব্বুর উপর তোমার এতো অভিমান? আব্বু তো ভুল করেছে মা। তুমি না আমার মা লাগো। মা হয়ে ছেলেকে কি একটু মাফ করা যায় না? প্রমিস করছি আমার মাকে আর একা রাখব না। অনেক অনেক সময় দেবো।
তনিমা বাবার বুকে মুখ গুঁজে ঠিক ছোট্ট বাচ্চাদের মতো হেঁচকি তুলে কাঁদছে। এতদিনের জমে থাকা সব কষ্ট যেন এই কান্নার স্রোতেই ধুয়ে বেরিয়ে আসছে। উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, সকলের চোখের ভেতর পানি থইথই করছে। মাহাদী তো আবেগ সামলাতে না পেরে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠল। আফতাব সাহেব তৎক্ষণাত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। রিতু আর ফাইজাও নিজের বাবার দুই পাশে দু’হাত জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখেও পানির ঝাপটা জমে উঠেছে।

তাহিয়া দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। অসহায় চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখছে। সবাই আছে বাবার বুকে, সবাই বাবার বুকে নিরাপদ। কিন্তু সে? তার বুকটা হঠাৎ করেই হু হু করে ওঠে। তার বাবা থাকলে এখনই তো তাকে বুকে টেনে নিতেন। মুহূর্তেই নিজেকে এতিম মনে হতে থাকে তার। চোখ বেয়ে ধারার মতো পানি নেমে আসে।
তালহা বোনের দিকে তাকাতেই দ্রুত এগিয়ে যায়। বোনকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। এতক্ষণ শক্ত থাকার চেষ্টা করা তাহিয়া ঠিক তখনই হেঁচকি তুলে কাঁদতে শুরু করে ভাইয়ের বুকে। তালহা দাঁত চেপে আছে। তার ভেতরও যে একই রকম ব্যথা, একই রকম শূন্যতা, তবুও সে ভেঙে পড়তে পারছে না। তাকে শক্ত থাকতে হবে, বোনের জন্য হলেও।

মেহরীন একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। সেও দাঁতে দাঁত চেপে রাখতে হচ্ছে । সবার মাঝে নিজেকে হঠাৎই সবচেয়ে বেশি একা, সবচেয়ে বেশি অসহায় মনে হতে লাগে তার। না আছে মা, না আছে বাবা। না আছে এমন কেউ যার বুকে মুখ গুঁজে সে কাঁদতে পারবে। ভেতরটা শূন্যতায় ভরে উঠে যেন। এখানে দাঁড়ানোও যেন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
ধীরে ধীরে পেছাতে পেছাতে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে যায় সে। সে কারো নজরে না পড়তে চায় না। তাই চুপচাপ ছাদে গা ঢাকা দেয়। সেখানে গিয়ে অবশেষে তার ভিতরের ভাঙাচোরা অনুভূতিগুলো বেরিয়ে আসে।
নিচে উপস্থিত সবাই তখনো নীরব। পরিবেশটা এতটাই ভারী যে কেউই ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর সোহেল হোসেন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রেখেই ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন বিল্লাল সাহেবের সামনে। দু’হাত জোড় করে অপরাধী কণ্ঠে বললেন,

—ভাইজান, মাফ করবেন। আপনার সাথে ওমন খারাপ ব্যবহার করার জন্য। আসলে নিজের মধ্যে ছিলাম না, বিবেক কাজ করছিল না মেয়েকে না পেয়ে। আপনারও তো সন্তান আছে, আপনি নিশ্চয়ই বুঝবেন সন্তান হারানোর ভয় কেমন।
বিল্লাল সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তার হাত দুটো ধরে নিচে নামিয়ে বললেন,
—কি যে বলেন ভাইজান! আমি কিছু মনে করিনি। বরং আপনার অবস্থা বুঝেই তো চুপ ছিলাম। এভাবে হাতজোড় করবেন না, আমি সত্যিই কিছু মনে করিনি।
তাদের কথার মাঝে তনিমা বাবার বুক থেকে মুখ তুলে, চোখ মুছতে মুছতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভাইয়া, তুমিও সরি বলো তালহা ভাইয়াকে। হুদাই তুমি ওনাকে মেরেছো। উনি কতো ভালো জানো? আমাকে ঠিক তাহিয়ার মতোই স্নেহ করেছে।
বোনের কথায় আরমানের মুখ একটু বেঁকে গেল। খুব ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও অনিচ্ছুক গলায় বলল,

—সরি..
তালহা খানিকটা ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভঙ্গিতে তনিমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—তার দরকার নেই। তুমি বলো, আর এমন করবে? এভাবে মিথ্যা বলবে?
তনিমা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়তে থাকে, তারপর কানে ধরে তালহার সামনে এসে দাঁড়ায়।
—সরি ভাইয়া.. আর এমন করবো না। আমি ইচ্ছে করে মিথ্যা বলিনি। যদি সত্যি বলতাম তাহলে তোমরা আমার পরিচয় জানতে চাইতে। বাসায় দিয়ে আসতে। আর আব্বুরা আমাকে আবার হোস্টেলে পাঠাতো। আমি আর ওই হোস্টেলের বন্দি জীবনে ফিরে যেতে চাই না।
তালহা এবার তনিমার মাথায় হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলল,

—তাই বলে এতো বড় রিস্ক নিবে? ভালো লাগছে না সেটা তুমি তোমার আব্বুকে, ভাইয়াকে আর নয়তো পরিবারের কারো না কারো কাছে বলতে। কাল যদি আমাদের হাতে না পরে অন্য কারো হাতে পরে যেতে? তারা যদি তোমার সাথে খারাপ কিছু করত? তখন কি আর তোমার পরিবারের কাছে যেতে পারতে? তুমি কি তাদের ছাড়া থাকতে পারতে আজীবন?
তনিমা কান্নাকান্না কণ্ঠে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—একদমই না..
—তাহলে?
তনিমা নিচু গলায় বলল,
—আর এমন করবো না..

তারপর দুই পরিবারের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি ভেঙে কিছুক্ষণের মাঝে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুধু তালহা আর আরমান ব্যতীত। তনিমারা চলে যেতে উদ্যত হলে সবাইই অনুরোধ করে, অন্তত খেয়ে যেতে। কিন্তু সোহেল হোসেনের জরুরি কাজ থাকায় তারা আর থাকতে পারেননি। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি হাসিমুখে বলে গেলেন, “একবার সময় নিয়ে অবশ্যই আবার আসব।” সবার মুখেই তখন হালকা হাসি।
তনিমারা গাড়িতে উঠতেই তালহা শেষবারের মতো তনিমাকে সাবধান করে দেয়, এমন বাচ্চামো যেন আর না করে। এরপর সে তনিমার বাবাকেও ভদ্রভাবে বোঝায়, মেয়েকে যেন সামান্য হলেও সময় দেন। মেয়ে কি চায় তা যেন বোঝেন। সবসময় নিজেদের ইচ্ছে চাপিয়ে না দিতে। কারণ সন্তানের ভুলের পেছনে অনেক সময়ে থাকে পরিবারের অদৃশ্য চাপও।

তনিমা বিদায়ের আগে আরেকটা আবদার করে বসে। সে নাকি তাহিয়াদের কলেজেই পড়বে। বাবার চোখে আবার সেই হারিয়ে ফেলার ভয় জেগে ওঠে। তাই এবার তিনি একটুও আপত্তি করেন না। যেন মেয়েকে হারানোর আতঙ্ক তাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন তার কাছে মেয়ের ইচ্ছাই যেন শেষ কথা।
কিছু কিছু সময় মা-বাবারা সন্তানের ভালো চাইতে গিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। যা উল্টো ক্ষতি ডেকে আনে। তনিমার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছে। মানলাম তার এমন বাচ্চামো করা উচিত হয়নি, কিন্তু এর পেছনে যার বড় হাত আছে, তা তার নিজের পরিবারের। সন্তানের মতামতকে অগ্রাহ্য করে যেকোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে শেষে এমনই বিপর্যয় ঘটে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩০

শুধু টাকা দিয়ে সন্তানকে ভালো রাখা যায় না। টাকা নিরাপত্তা দেয়, কিন্তু সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে রাখে না। পরিবারের বন্ধন, বোঝাপড়া, কথোপকথন, এসবই আসল ভিত্তি। যখন সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, তখন সন্তানও ভুল পথে হাঁটে, আর পরিবারও অজান্তে সেই ভুলকে ঠেলে দেয় আরও সামনে। মা-বাবার সন্তানের ভালো চাওয়ার পাশাপাশি তাদের ভালোটা আসলে কিসে সেটাও বোঝা উচিত।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩২