প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩২
সাইদা মুন
তালহা ধীরে ধীরে ছাদে উঠে আসে। সেই তখনই মেহরীনকে উপরে আসতে দেখেছিল। মেয়েটার মন খারাপ, তা সে বুঝতে পারলেও তখন কিছু করার উপায় তার ছিল না। কি করবে সে? সে যে তাকে সকলের সামনে বউ হিসেবে পরিচয়ও করাতে পারল না, সে কিভাবে সকলের সামনে তার পাশে দাঁড়াবে। এই ভাবনাই তার বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।
ছাদের দরজার কাছে আসতেই কারো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তালহার পা থেমে যায়। বুকের ভেতর অচেনা ব্যথা জেগে ওঠে। মেহরীন কাদছে, আর সেই কথাটাই মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে দিল। দ্রুত পায়ে আগ বাড়ায়।
সামনে এগোতেই চোখ পড়ে দোলনায় বসে থাকা মেহরীনের ওপর। পা তুলে হাটুতে হাত দিয়ে ভর করে মাথা নিচু করে রেখেছে, অনেকক্ষণ কান্নার ফলে থেকে থেকে হেচকি উঠছে।
তালহা চুপচাপ মেহরীনের সামনে এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেয়ে কান্না থেমে যায় মেহরীনের। মাথা তুলে তাকাতেই সে তালহাকে দেখতে পায়। তার ভেজা, ফোলা ফোলা চোখ, লাল হয়ে যাওয়া নাক-মুখ সব মিলিয়ে এই অবস্থা দেখে তালহার বুক আরও মোচড়ে ওঠে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এগিয়ে গিয়ে মেহরীনের পায়ে হাত দেয়, মেহরীন পা সরাতে গেলে তালহা বাধা দেয়। মেহরীনের দুটো পা একটু তুলে সে তার পাশে দোলনায় বসে পড়ে। নিজের কোলের ওপর মেহরীনের পা’জোড়া রাখে। তারপর সরাসরি দুহাতের আজলায় মেহরীনের মুখ টেনে ধরে, বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
—বেশি খারাপ লাগছে?
তালহার আদুরে কণ্ঠে মেহরীনের কান্না যেন আরও উপচে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সে শরীর ঝাকিয়ে কেঁদে উঠে। কান্নার জোর বাড়তে দেখে তালহা একটানা মেহরীনকে নিজের বুকে আগলে নিল। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল, তবে মেহরীনের কোনো থামার নাম নেই।
শার্ট খামছে ধরে, বুকে মাথা রাখা অবস্থাতেই মেহরীন চোখের জল ফেলতে লাগল। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে হেচকি উঠছে, ফলে পুরো শরীর যেন ঝারা দিয়ে কেঁপে উঠছে বারবার। তালহা চুপচাপ তাকে আগলে ধরে আছে। মেয়েটা যদি কান্না করে একটু হলেও হালকা অনুভব করে, সেই আশায়।
অনেকক্ষণ একধারে কান্না করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে থামল মেহরীন, তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার মুখ তুলে চোখে চোখ রাখল। নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,
—কান্না থেমেছে বউ?
শেষের “বউ” শব্দটা শুনেই মেহরীন চোখ বড় বড় করে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কান্না এক মুহূর্তেই থেমে গেল, যেন হঠাৎ বড়সড় শক খেয়েছে।
তালহা হালকা হেসে মেহরীনের চোখের পানি মুছে গাল টিপে বলল,
—এভাবে তাকাবেন না, আমার কিছুমিছু করতে ইচ্ছে করে…
মেহরীন অবাক হয়ে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করল,
—কি..?
তালহা দুষ্টু হেসে মেহরীনের নাক টিপে বলল,
—বড়দের বেয়াদবি করতে ইচ্ছে করে।
মেহরীন পিটপিট চোখে চেয়ে, বড়দের বেয়াদবির মানে ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
—এর মানে?
তালহা সোজা হয়ে বসে হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে ঘাড় কাত করে তাকিয়ে বলল,
—এর মানে বোঝার জন্য আপনাকে আগে বড় হতে হবে।
—কেনো এখন বোঝানো যাবে না কেনো?
—কারণ এটা প্র্যাক্টিক্যালি বোঝাতে হয়। আর এজন্য আপনাকে বড় হতে হবে।
মেহরীন কিছুই বুঝল না, শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে তালহার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বোকা চাহনিতে মনে মনে হেসে উঠল তালহা। বিরবিরিয়ে বলল, “আমার অবুঝ বউ”। তারপর তালহা প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল,
—এখন ঠিক লাগছে?
মেহরীন মাথা নেড়ে হ্যা বোঝাল। তালহা মেহরীনের ডান হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। হাতের সঙ্গে খেলতে লাগে সে। তা দেখে মুচকি হাসি ফুটল মেহরীনের মুখে। তালহা তার কাজ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই মেহরীনের চোখে চোখ রাখল,
—মনের মধ্যে কি চলছে?
মেহরীন নজর রেখেই কণ্ঠস্থ করল,
—আপাতত আপনি…
তালহা শব্দ করে হেসে উঠল। মেহরীনও মনোযোগ দিয়ে সেই হাসি দেখছে।
তালহা আবারও জিজ্ঞেস করল,
—তার আগে কি চলছিল?
মেহরীন তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—তেমন কিছু না।
তালহা এবার গভীর চোখে চেয়ে আছে মেহরীনের চোখের দিকে। মেয়েটির চোখই যেন তার মনের কথা বলছে। সে ঠিক নেই ভেতরে কিছু গোলমেল হচ্ছেই। হাতটা ছেড়ে মেহরীনের পেছন দিয়ে নিজের এক হাত নিয়ে তার এক বাহু জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
—চাইলে শেয়ার করতে পারো, শেয়ার করলে মনটা হালকা হবে।
মেহরীন মাথাটা তালহার বাহুতে রেখে কয়েকটা গভীর শ্বাস নিল। তারপর ধীরে বলল,
—একটু খারাপ লাগছিল। হঠাৎ আব্বু-আম্মুকে মিস করছিলাম। যদিও জন্মের পর থেকে মা-বাবার মায়া কী জিনিস বুঝিনি। তাদের আদর পাইনি। তবে তখন নিজের অজান্তেই একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। চারিদিক কেমন যেন ফাঁকা লাগছিল, আমার কাছে কেউ নেই এমন অনুভূতি হচ্ছিল।
মেহরীনের প্রতিটি শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনছে তালহা। শুনতে শুনতে নিজের ভেতরই ভীষণ অপরাধবোধে ডুবে যাচ্ছে সে। মেয়েটার প্রয়োজনে তাকে পাশে পায় না। তালহা চাইলেও থাকতে পারে না। সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে। বাড়ির সবার কাছে “বেস্ট ছেলে”, “বেস্ট ভাই” এর খেতাব মেইনটেইন করতে গিয়ে, স্বামী হিসেবে সে যেন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু করবেই বা কি? সে তার ক্যারেক্টার এমনভাবে সকলের সামনে প্রেজেন্ট করেছে যে, হঠাৎ করে এত বড় সত্য কারো সামনে আনা অসম্ভব হয়ে গেছে। একটা ভয় প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করে বেড়ায়, যদি মা সত্যিটা জেনে কষ্ট পান? যদি ছোট বোনটার ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে? আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর চিন্তা, মেহরীনের প্রতি সবার যেই সম্মান, যেই স্নেহ, যেই ভালোবাসা, তা যদি এক লহমায় ফিকে হয়ে যায়?
মেয়েটা তো জন্ম থেকেই অনাদর-অপমানের জীবনে বড় হয়েছে। তার জীবনে আবার কষ্ট বাড়ানোর মানুষ সে হতে চায় না। সে তো চায় সবদিক সামলে নিতে, কিন্তু সামলাতে গিয়ে যেন আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে প্রতিনিয়ত।
হঠাৎ তালহা উঠে দাঁড়াল। তারপর মেহরীনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তার দু’হাত আলতো করে ধরে মেহরীনের দিকে চাইল। হঠাৎ নিজের পায়ের কাছে তালহাকে বসতে দেখে মেহরীন হকচকিয়ে গেলেও, তালহার করুন চোখ দুটো দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
—কি হয়েছে আপনার? আপনাকে ঠিক লাগছে না…
তালহা চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল। তারপর ভারি কণ্ঠে বলতে লাগল,
—আমার উপর তোমার পূর্ণ অধিকার থাকার পরেও যখন তুমি সেই অধিকার খাটাতে পারো না, প্রয়োজনে আমাকে পাশে পাও না, শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয় তোমাকে। তখন না, আমার নিজের উপর ভীষণ ঘৃণা হয়।
তালহার অসহায় দৃষ্টি দেখে মেহরীন মাথা দুদিকে নেড়ে উঠল,
—এভাবে বলবেন না, আমি তো বুঝি। আপনার অবস্থা বুঝি…
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহরীনের হাতদুটো এক করে নিজের ঠোঁটের কাছে এনে হালকা ছুঁয়ে বলল,
—তুমি বউ হয়ে তোমার সেরাটাই দিচ্ছো। চেষ্টা করছো আমাকে বুঝতে। কিন্তু আমি? আমি স্বামী হয়ে তোমায় কি দিতে পেরেছি? তোমার প্রাপ্য অধিকার দিতে পারছি না… তোমার যোগ্য সম্মানটাও দিতে পারছি না… নিজেকে কেমন কাপুরুষ মনে হয়…
শেষ কথাটুকু বলতেই মেহরীন দ্রুত নিজের এক হাত ছাড়িয়ে তালহার মুখ চেপে ধরল।
—হুস, আর এমন ধরনের কথা বলবেন না। আপনি আমার চোখে সুপুরুষ। পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাহিরে। তাই হয়তো সামনে আরেকটু বেগ পোহাতে হবে। তবে চিন্তা করবেন না, আমি ধৈর্য ধরে আছি আপনার পাশে। একদিন না একদিন তো প্রকাশ্যে বলতে পারব, আমি মিসেস তালহা সিকদার।
তালহা মেহরীনের মায়াভরা মুখে আলতো হাত বুলিয়ে দিল। মেহরীনও তার হাতের ওপর হাত রেখে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তালহা দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
—আমি তোমাকে প্রমিস করছি মেহরীন। আমি তোমাকে সসম্মানে, সকলের সামনে মিসেস তালহা সিকদার হিসেবে নিয়ে আসবো। তবে এর জন্য আমাকে একটু সময় দিতে হবে। পরিস্থিতি সামলে আমি তোমাকে আগলে নিবো বউ। আর কিছুদিন, শুধু একটু কষ্ট সহ্য করো। চিরকালের জন্য আমার বুকে তোমাকে নিয়ে আসবো আমি, বিন্দুমাত্র একা অনুভব করতে দিবোনা তোমাকে।
মেহরীনের চোখ-মুখ চকচকে করে ওঠে আনন্দে। তালহার এই কথাগুলো বলাতেই যেন সে ভীষণ সুখ সুখ অনুভূতি অনুভব করছে। আর যখন সে পুরোপুরি তালহার হয়ে যাবে তখন কেমন সুখ পাবে। ভাবতেই মুখের হাসি আরও গাঢ় হয় মেহরীনের। সে তালহার হাতের দিকে চোখ রাখে তারপর ফের তালহার দিকে। এই মানুষটাই তো তার মানুষ, তার কাছে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ। এই তালহার সঙ্গ থাকলে যে যেকোনো বাধা, যেকোনো কষ্ট সহজেই সহ্য করে নিতে পারবে।
চোখ-মুখের হাসি নিয়েই মেহরীন বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩১
—আপনি পাশে থাকলে সব সহ্য করতে পারব। পুরোপুরি আপনার নাম নিজের নামে জুড়তে হলে যদি অপেক্ষা করতে হয় তবে তাই করবো।
দুজনের মুখে প্রাপ্তির হাসি, চোখে চোখে বুনছে অদৃশ্য কথা। নিজেদের দুনিয়ায় তারা ডুবে আছে, এমন মুহূর্তে কারো গলা পেয়ে দুজনই হকচকিয়ে উঠে। মুহূর্তেই সব প্রশান্তি ছিন্নভিন্ন। তালহা দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পেছন দিকে চেয়ে কে এসেছে তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা। মেহরীনের হৃদয়ও হঠাৎ ধক ধক করে উঠল, এভাবে ধরা পড়ল?
মেয়েটি আবারও বলে উঠল,
—তালহা ভাই তোমরা এখানে কি করছিলে..?
