প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৬
সাইদা মুন
সকাল আটটা বেজে পাঁচ মিনিট,
মেহরীন সবেমাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে। গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে এসে দাঁড়াল আয়নার সামনে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে একবার তাকিয়ে অজান্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে চোখ রাখল। তালহা তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উপুড় হয়ে বালিশটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কোমর পর্যন্ত টেনে রাখা ব্ল্যাঙ্কেট, খালি পিঠ, এলোমেলো চুল কপাল বেয়ে নেমে এসে চোখের কোণ ছুঁয়ে আছে। ঘুমন্ত মানুষটার মুখে এমন এক নিষ্পাপ স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে, যা জেগে থাকা তালহার সঙ্গে একেবারেই মেলে না। মেহরীনের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল সে। মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা, কীভাবে সবার চোখ এড়িয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে সকালবেলা এই ঘরে এসে দাঁড়াত। তখন এই ঘরটুকুও ছিল তার কাছে নিষিদ্ধ কোনো রাজ্যের মতো। অথচ আজ? আজ পুরো রাতটা এই ঘরেই কেটেছে। তাও আবার সবাইকে জানিয়ে, তার নিজের মানুষটার পাশে, তার বুকের কাছেই। ভাবনাটা মনে আসতেই মেহরীনের গালজুড়ে লাজুক হাসি ছড়িয়ে পড়ল। দ্রুত আয়নার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। ভেজা চুলে আরেকবার তোয়ালে ঝাড়া দিতেই চুল থেকে ছিটকে বেরোনো কয়েক ফোঁটা পানি গিয়ে পড়ল তালহার চোখেমুখে। ঘুমের মধ্যেই নাক-মুখ কুঁচকে বিরক্তিতে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল সে।
মেহরীন চুল মুছতে মুছতে আরেকবার তোয়ালে দিয়ে চুল ঝাড়তেই ঠান্ডা পানির কয়েক ফোঁটা গিয়ে পড়ল তালহার পিঠে। এবার ঘুমন্ত মানুষটা আবার এপাশ ফিরল। আধোঘুমে চোখের পাতা কাঁপল। ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই দৃষ্টি আটকে গেল সামনের দৃশ্যটায়। পরক্ষণেই ঘুমের সমস্ত রেশ কেটে গেল। চোখ দুটো পুরোপুরি খুলে গেল তার। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক স্নিগ্ধ মায়াবতী, গাঢ় সবুজ শাড়িতে, ভেজা চুল কাঁধ ছাপিয়ে নেমে এসেছে, মুখটা স্পষ্ট সকালের কোমল আলোয়। সঙ্গে সঙ্গে তালহার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল, পানির ছিটার বিরক্তি নিমিষেই উধাও। মেহরীন আবারও চুল ঝাড়ল। পানির ছিটা ফের এসে পড়ল তালহার মুখে। সে মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে ফেলল, তারপর কয়েক মুহূর্ত পর আবার চোখ মেলে তাকাল মেহরীনের দিকে। বিষয়টা বেশ উপভোগ করছে সে। এবার অবশ্য চোখ সরাল না।
মেহরীন তোয়ালেটা পাশে রেখে ক্রিম হাতে নিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মুখে ক্রিম মাখতে লাগল। এরপর হাতে-পায়ে লোশন মাখল। এরমধ্যে সে খেয়ালই করল না যে বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটা তাকে চুপিচুপি দেখে চলেছে। সবশেষে ভেজা চুল আঁচড়িয়ে পাশে ফিরতেই তালহার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। মেহরীন কপাল কুঁচকে ফেলল,
—উঠে গেছেন?
তালহা নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। মেহরীন তোয়ালেটা পাশের চেয়ারে মেলে দিতে দিতে বলল,
—ভালো হয়েছে উঠে গেছেন। নয়তো আমি এক্ষুনি ডেকে উঠাতাম।
কথাটা কানে যেতেই তালহা আচমকা মুখটা গম্ভীর করে বলল,
—শিট! মিস করে ফেললাম। কন্টিনিউ কন্টিনিউ, আমি আবার ঘুমাচ্ছি।
বলেই ফট করে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তালহার এমন কান্ডে মেহরীন হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরও যখন কোনো ডাক এল না, তালহা এক চোখের পাতা সামান্য খুলে বলল,
—কী হলো? এখনো ডাকছো না কেন?
মেহরীন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল। তালহা যে চাচ্ছে সে যেন তাকে ডেকে উঠায়, তাই তো তার এমন বাচ্চামি। হাসতে হাসতেই এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে সুন্দর করে ডাকল,
—এই যে, উঠুন। সকাল হয়েছে।
তালহা চোখ বন্ধ রেখেই কপাল কুঁচকে বলল,
—এত নিরামিষ ডাকে আমি বাপের জন্মেও উঠব না।
মেহরীন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তো কীভাবে ডাকব?
—কী জানি! তুমিই জানো।
মেহরীন কিছুক্ষণ ভেবে আবার ডাকল,
—এই উঠুন…
কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকল,
—উঠুন…
তবুও তালহার চোখের পাতা নড়ল না। এভাবে কয়েকবার ডাকাডাকি করেও যখন কোনো লাভ হলো না, মেহরীন শেষমেশ বুঝলো তার সিকদার সাহেব কি চাচ্ছে। মুচকি হেসে তার পাশে গিয়ে বসল। ধীরে ধীরে এক হাত বাড়িয়ে কপাল থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল। আঙুলগুলো চুলের ভাঁজে গুঁজে দিয়ে বিলি কেটে মৃদু স্বরে ডাকল,
—শুনছেন… সকাল হয়েছে। উঠুনননন…
কিন্তু এবারও কোনো সাড়া নেই। মেহরীন ভ্রু কুঁচকালো। এতেও যখন তালহা নড়ল না, তার দিকে চেয়ে থেকে কিছুক্ষণ ভাবলো। হঠাৎ মাথায় কিছু একটা আসতেও সে তৎক্ষণাৎ ঝুঁকে গেল। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে আচমকা ফিসফিসিয়ে বলল,
—জান… সকাল হয়েছে। ঘুম থেকে ওঠো…
পরের মুহূর্তেই ফট করে চোখ খুলে গেল তালহার। গোল গোল চোখে তাকাল মেহরীনের দিকে। সদ্য শোনা একটা শব্দই তাকে সম্পূর্ণ জাগিয়ে তুলেছে। “জান”! তার ওপর আবার “তুমি” বলে সম্বোধন। তালহার মুখ ধীরে ধীরে হাঁ হয়ে গেল। মেহরীন তার এমন রিয়াকশন দেখে হেসে ফেলল। তারপর কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে? এভাবে কী দেখেন?
তালহা ধীরে ধীরে উঠে বসল। চোখেমুখে তখনও অবিশ্বাসের ছাপ। খুব আস্তে করে বলল,
—কী বললে? আবার বলো…
মেহরীন ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল। তারপর ঠিক আগের মতোই মিষ্টি স্বরে বলল,
—জান… সকাল হয়েছে। উঠো।
তালহার চোখেমুখ মুহূর্তেই কুঁচকে গেল,
—আবার বলো, কী সম্মোধন করলে আমাকে?
মেহরীন এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। দুষ্টুমি মেশানো হাসিতে গলা একটু উঁচু করে ডাকল,
—জাননননন…
ব্যস, তালহা সঙ্গে সঙ্গে বুকে হাত চেপে ধরে কাত হয়ে বিছানায় পড়ে গেল। মনে হলো, বুকের ঠিক মাঝখানে কেউ আচমকা সজোরে আঘাত করেছে। চোখ বন্ধ করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,
—হায় ম্যা তো গেয়া!
মেহরীন হেসে কুটিকুটি। আর তালহা? সে তখনো বুকের ওপর হাত রেখে এমনভাবে পড়ে আছে, যেন “জান” নামের একটিমাত্র শব্দেই তার হৃদপিণ্ডটা সত্যিই বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তার এই নাটক দেখে মেহরীন হুহু করে হেসে ফেলল। তার বাহুতে মারতে মারতে তাকে টেনে তুলতে লাগল।
—নাটকবাজ, বেশি নাটক শিখেছেন। উঠুন বলছি, উঠুউউউনননন…
তালহা অবশ্য উঠল না। বরং মেহরীনকেই টেনে নিজের কাছে এনে ফেলল। মেহরীন তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আচমকা ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল তালহা। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কি হয়েছে? কোথায় লেগেছে?
তালহা মুখে ব্যথার ভান করে বুকের বাঁ পাশে ইশারা করল,
—এখানটায় খুব ব্যথা করছে।
মেহরীন চিন্তিত মুখে জায়গাটায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
—গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা নয়তো? বিয়ে উপলক্ষে ভাজাপোড়া অনেক বেশি খেয়েছেন আপনি। দাঁড়ান, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিচ্ছি। খাওয়ার আগে খেয়ে নিন।
—আরে না, এই ওষুধে কাজ হবে না। অন্য কিছু লাগবে।
মেহরীন কপাল কুঁচকে তাকাল,
—কি?
তালহার মুখে মুহূর্তেই দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল বলল,
—বউয়ের আদর।
তার কথা বুঝতে মেহরীনের এক সেকেন্ডও লাগল না। সঙ্গে সঙ্গে দুমদাম করে তার বুকে কিল দিতে শুরু করল। বলতে লাগল,
—বেয়াদব লোক আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
তালহা হেসে তাকে বুকের সাথে চেপে ধরল। হাত দুটো থেমে গেল। নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে তালহা মেহরীনের মুখে চোখ রাখল বলল,
—এই সকালটার অপেক্ষায় কত রাত কেটেছে, জানো?
মেহরীনও শান্ত হয়ে গেল চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,
—কি এমন আছে এই সকালটায়?
তালহা মৃদু হেসে এক আঙুলে তার গালে ছড়িয়ে থাকা চিলগুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে বলল,
—এই সকালটায় তুমি আছো।
মেহরীন লজ্জামিশ্রিত হেসে উঠতেই তালহা আরও গভীর স্বরে বলল,
—তুমি আমার মনে আরও হায়াতের চেয়েও বেশি দিন বেঁচে থাকার লোভ জন্মিয়েছো। প্রতিদিন সকালে চোখ মেলেই তোমাকে দেখার জন্য হলেও আমাকে একটু বেশি দিন বাঁচতে হবে। প্রতিরাতে তোমার পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জন্য হলেও আমাকে একটু বেশি দিন বাঁচতে হবে।
মেহরীন বলল,
—আল্লাহ যেন আপনার হায়াত আরও অনেক বাড়িয়ে দেয় দরকার হলে আমার হায়াত কমিয়ে…
বাকিটা বলার আগেই তার মুখ চেপে ধরল তালহা দ্রুত বলল,
—একথা ভুলেও মুখে আনবে না। তুমি আছো বলেই আমার সবকিছু তুমিময় হয়ে থাকে।
মেহরীনের মুখে হাসি ফুটল সে হাতটা সরিয়ে বলল,
—এমন কথা আর বলবেন না। নিজেকে খুব বিশেষ কেউ মনে হয়।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তাহলে তো প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে বলতে হবে।
—তাহলে দেখছি প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে আপনার থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে।
—তাহলে দেখছি মসজিদের বড় মাইকটা ভাড়া করতে হবে।
মেহরীন ফিক করে হেসে ফেলল।
—ধুর, আপনার সঙ্গে কথায় পারি না। এবার উঠুন।
তালহা আবারও গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
—আরেকটু পরে। এত বছর পর কাছে পেয়েছি, এত ছাড়াছাড়ি করো কেন?
—বেলা হচ্ছে উঠবেন না? নিচে যেতে হবে তো।
তালহা বিড়বিড় করে বলল,
—আমার বাস চললে তো টানা এক মাস ঘর থেকেই বের হতাম না।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। শাড়িটা ঠিক করতে করতে বলল,
—অসভ্য লোক, উঠুন বলছি।
তালহা মুখটা বেজার করে দুহাত ছড়িয়ে বিছানায় পড়ে রইল। কিছুক্ষণ পর অনিচ্ছাভরে উঠে দাঁড়াল। চুল ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল,
—তোমার নখগুলো কাটতে হবে।
মেহরীন তখন তালহার কাপড় বের করছিল। তার কথা শুনে রাগী চোখে তাকাল,
—মুখে লাগাম দিন।
—যাহ বাবা, খারাপ কী বললাম? আমার শরীরের মায়া কি আমার নেই?
—ইশশ চুপ করুন। এই ধরুন, গোসলে ঢুকুন যান।
তালহা মেহরীনের এগিয়ে দেওয়া টি-শার্টটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—উমম… সেইম সেইম…
মেহরীন কালো প্যান্টটাও তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
—বাট ডিফারেন্ট।
তারপর তালহাকে প্রায় ঠেলেঠুলেই ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে অবশেষে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল মেহরীন। দরজা বন্ধ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল সে। পরক্ষণেই নিজের অজান্তে হেসে ফেলল। এই মানুষটাকে বুঝি এভাবেই প্রতিদিন সামলাতে হবে তাকে? এত পরিপাটি, সময়নিষ্ঠ মানুষটা যে এমন ছন্নছাড়া আচরণও করতে পারে, তা কে জানত। তবে মেহরীনের মন্দ লাগছিল না। বরং অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ছিল মনে। এভাবে প্রতিদিন তাকে সামলাতে হলে, সে তো এক পায়েই রাজি। মুচকি হাসতে হাসতেই বিছানার দিকে এগিয়ে গেল সে। ফুলে ভরা বাসরঘরের সাজ এবার গুছিয়ে নিতে হবে। একে একে বিছানা থেকে ফুলের পাপড়িগুলো সরিয়ে ফেলল। পুরোনো চাদরটা তুলে নতুন চাদর বিছিয়ে দিল। ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলো ঝাড়ু দিয়ে এক জায়গায় করে ডাস্টবিনে ফেলল। সবকিছু গুছিয়ে শেষ করে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় এসে বসল। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
মেহরীন আর বসে রইল না। মাথায় আঁচলটা টেনে দিয়ে উঠে দরজা খুলতেই সামনে মনমরা মুখে তাহিয়াকে দেখতে পেল। মেয়েটার ফ্যাকাসে মুখ দেখে মেহরীনের কপাল কুঁচকে গেল,
—কিরে? রাতে ঘুমাসনি? এই অবস্থা কেন?
তাহিয়া বিরক্ত গলায় বলল,
—জামাইর ঘরেই যখন শিফট হবি, তখন আমার সঙ্গে এতদিন থেকে অভ্যাস বাধিয়েছিস কেন? কাল সারা রাত এপাশ-ওপাশ করে শেষরাতে গিয়ে একটু ঘুমিয়েছি।
মেহরীন ঠোঁট টিপে হেসে তার থুতনিটা ধরে বলল,
—ওলে বাবুলে। দুইদিন যাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাহিয়া অভিমানী চোখে তাকিয়ে বলল,
—হাহ সান্ত্বনা দিচ্ছিস, তাও বলছিস না যে জামাইকে রেখে আমার সঙ্গে থাকবি!
মেহরীন আমতা আমতা করে বলল,
—বিয়ের পর জামাই ছাড়া থাকে নাকি কেউ?
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়ি দিয়ে উঠল,
—তুই জামাই ছাড়া থাকবি না, সেটা বল। অন্যদের টানছিস কেন?
ঠিক তখনই পেছন থেকে তালহার কণ্ঠ ভেসে এলো,
—কোন ঘষেটি বেগমরে আমার বউয়ের কানে কানপড়া দিচ্ছে?
তাহিয়া ফুঁসে উঠে উঁকি দিয়ে পেছনে তাকাল,
—এই ভাইয়া, এমনিতেই আমার মন ভালো নেই। টেম্পারেচার হাই, বেশি কথা বলবে না, নয়তো এই ঘরে বম মেরে উড়িয়ে দেব। চুপচাপ নিচে আসো, সবাই খেতে ডাকছে।
বলেই ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেল সে। তালহা আর মেহরীন দুজনেই হেসে ফেলল। প্রায় তিনটা বছর একসঙ্গে কাটিয়েছে তারা। হঠাৎ করে আলাদা হয়ে গেলে একটু খারাপ তো লাগবেই। মেহরীনের নাহয় তালহা আছে, কিন্তু তাহিয়া? বেচারিটা তো একেবারেই একা হয়ে গেল। অবশেষে দুজনেই একসঙ্গে নিচে নেমে এলো। সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করতেই তনিমারা মেহরীনকে ঘিরে ধরল। শুরু হলো একের পর এক অপ্রস্তুত প্রশ্ন। মেয়েদের খোঁচাখুঁচিতে মেহরীনের গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। শেষমেশ পার্লারের মেয়েরা এসে পৌঁছাতেই তাদের সেই দুষ্টুমি কিছুক্ষণের জন্য থামল।
আজ তাদের রিসিপশন। মেহরীনের সাজটাও তাই একটু ভিন্ন। এ্যাশ রঙের সুন্দর কারুকাজ করা শাড়ি। পুরো নেটের শাড়িজুড়ে সূক্ষ্ম নকশার সঙ্গে ছড়িয়ে আছে পাথরের ঝিলিক। পার্লারের মেয়েরা সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে দিল। একই রঙের দোপাট্টাটা মাথায় সুন্দর করে জড়িয়ে দেওয়ার পরই ভারী সাজের শেষ ছোঁয়া পড়ল। তারা সরতেই মেহরীন উঠে দাড়াল। পায়ে এ্যাশ কালারেরই উঁচু হিল। আজকের সব তালহার কেনা, পা থেকে মাথা অব্দি সব সেইম রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে সে। মুচকি হেসে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মেহরীন নিজেই কিছুক্ষণ থেমে রইল। সকলেই তাকে দেখে বেশ প্রশংসা করছেন। বাড়ির গিন্নিরাও ছেলের বউকে একফাঁক করে দেখে গেছেন।
এবার বাকিরাও নিজেদের সাজগোজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওদিকে তালহাও মেহরীনের সাজের সঙ্গে মিল রেখে পরেছে এ্যাশ রঙের থ্রি-পিস স্যুট। হাতে সিলভার ঘড়ি, পায়ে কালো বুট। চুল জেল দিয়ে একেবারে ফিটফাট করে নিয়েছে। আয়নার সামনে শেষবারের মতো নিজের চুলটা ঠিক করে তালহা মুচকি হাসল।
এরমধ্যেই হঠাৎ তালহার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ফারাহ নামটা ভেসে উঠতেই কলটা রিসিভ করল সে। ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
—আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কনগ্র্যাচুলেশন!
তালহা হেসে জবাব দিল,
—ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী অবস্থা তোর? কেমন আছিস?
—এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালোই। তুমি কেমন আছো?
—আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো। সজিবের কী অবস্থা? ভালো আছে তো?
—হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ ভালোই। অফিসে গেছে। আসলে পরে তোমাকে কল দেবে। মেহরীন কোথায়? ওর সঙ্গে একটু কথা বলব। এখনো তো বিবাহের শুভেচ্ছাটাই জানানো হয়নি।
তালহা মুচকি হেসে বলল,
—ও সাজগোজ করতে ব্যস্ত। দাঁড়া, ডেকে দিচ্ছি।
কথাটা বলে কলে রেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তালহা। তাহিয়াদের ঘরের দরজায় টোকা দিতেই তনিমা দরজা অল্প ফাঁক করে মাথাটা বের করল,
—কী চাই দুলাভাই?
তালহা মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—মেহরীনকে দিও। ফারাহ কল করেছে।
তনিমা মাথা নেড়ে ফোনটা নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। মেহরীনের হাতে ফোনটা পৌঁছাতেই সে উঠে বারান্দায় চলে গেল। কানে ফোন ধরেই মিষ্টি হেসে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম আপু। কেমন আছেন?
—ওয়ালাইকুম আসসালাম। এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
—আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো।
—বিয়ের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
মেহরীন মুচকি হেসে বলল,
—ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি বিয়েতে এলেন না, এতে কিন্তু অনেক কষ্ট পেয়েছি।
ফারাহ ওপাশ থেকে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—দেশে থাকলে একমাস আগেই এসে হাজির হতাম। ভাই-বোন, পুরো পরিবারের সঙ্গে এমন একটা সুন্দর মুহূর্ত কে না কাটাতে চায় বলো? কিন্তু বিদেশে থাকি, চাইলেই তো আর ছুটে আসা যায় না। তোমার দুলাভাইও ছুটি নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, পায়নি। আমাকে একা দেশে আসতে বলছিল। কিন্তু স্বামীকে রেখে একা বিয়েতে আসাটাও কেমন যেন লাগে, তাই না?
মেহরীন নরম গলায় বলল,
—জ্বি আপু, বুঝতে পারছি। বিয়ের পর তো স্বামী-সংসারই মেয়েদের জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে যায়। তবে দেশে তাড়াতাড়ি আসবেন। তখন আপনাদের জন্য বড় একটা পার্টি দেব।
—হ্যাঁ হ্যাঁ, বিয়েতে আসতে পারিনি তো কী হয়েছে। দেশে কিন্তু খুব শিগগিরই আসছি।
তাদের কথার মাঝেই রিতু এসে উপস্থিত হলো। মেহরীনকে ফারাহর সঙ্গে কথা বলতে দেখে সেও বারান্দায় এল। কথা বলবে বলে মোবাইলটা নিয়েই ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
—এই বেয়াদব, তোকে সকাল থেকে কয়টা কল করেছি, বল তো? একটা কলও ধরিসনি কেন?
আচকমমা ঝাড়ি শুনে ফারাহ কান থেকে ফোনটা একটু দূরে সরিয়ে নাকমুখ কুঁচকে রইল। রিতুর কথা থামতেই আবার কানে ধরল,
—আরে বাবা, এত হাইপার হচ্ছিস কেন? শান্ত হ। এই অবস্থায় এত উত্তেজিত হলে চলে?
—তো হাইপার হবো না? তোকে কতগুলো কল করেছি জানিস?
—ঘুম থেকে উঠেই সুপারমার্কেটে গিয়েছিলাম। জানিসই তো, তোর দুলাভাইয়ের অফিস থাকে। তাই সকাল সকাল আমাকে নিয়ে গিয়ে বাজার করিয়ে দিল। বাজার করে ফিরে এসে দুজনে মিলে সব গুছিয়ে রাখতে রাখতেই সময় চলে গেল। তার ওপর আবার রান্না…
রিতু সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিয়ে বলল,
—রান্নার বাহানা দিবি না। রান্না তোর জামাইই করে, আর তুই বসে বসে খাস, তা আমার অজানা নয়।
ফারাহ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
—কেটেকুটে তো দিই, সঙ্গে সঙ্গে একটু উঁকিঝুঁকিও দিতে হয়। নাহলে কেমন লাগে বল? জামাই দিয়ে সব কাজ করানো যায় নাকি।
—হু হু, তা এখন কোথায় তোমার গুণধর স্বামী?
—কোথায় আবার? অফিসে গেছে।
—আর তুই কী করছিস?
—সবজি কাটছি। রাতের খাবার সে আসার আগেই রান্না করে রাখব। নাহলে আবার অফিস থেকে ফিরে নিজেই রান্না করতে বসবে।
রিতু হেসে বলল,
—যাক সুখে আছিস তাহলে।
ফারাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিষ্টি হেসে বলল,
—অনেককক, মাশাল্লাহ মনের মতো একজন মানুষ পেয়েছি। মনেই হয় না যে জামাইর সংসার করছি। এত সুন্দর, আর এত আরাম আরাম একটা সংসার পেয়েছি।
—মাশাল্লাহ। কারও যেন নজর না লাগে।
হঠাৎ ফারাহর কণ্ঠটা একটু নরম হয়ে এলো,
—জানিস রিতু, আমি আজ বড্ড খুশি।
—কী নিয়ে এত খুশি শুনি?
ফারাহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমি আজ খুশি, কারণ আমি তালহা ভাইকে চেয়েও পাইনি। পেয়ে গেলে হয়তো এই মানুষটার অফুরন্ত ভালোবাসাটা হারাতাম।
একটু থেমে আবার বলল,
—আল্লাহ আমার ধৈর্যের ফল এত মিষ্টি দিয়েছেন যে নামাজে বসে শুকরিয়া আদায় করেও শেষ করতে পারি না। সত্যি বলছি, জীবনে দারুণ একজন মানুষ পেয়েছি।
রিতু মৃদু হেসে বলল,
—আল্লাহ যা নেন, তার থেকেও দ্বিগুণ ভালো কিছু ফিরিয়ে দেন বুঝলি। কারও জন্য কারও জীবন থেমে থাকে না। সবার জীবনেই ভালো থাকার মতো একজন মানুষ আসে।
এরমধ্যেই বাইরে থেকে তাহিয়ার গলা ভেসে এলো,
—রিতু আপু! দুলাভাই এক গ্লাস দুধ দিয়ে গেছে। বলেছে, এক্ষুনি খেতে হবে।
রিতু সঙ্গে সঙ্গে নাকমুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠল,
—ইস! আমি বলেছিলাম খাবো না। দুধের গন্ধেই তো বমি আসে।
ঘরের বাইরে থেকেই রায়হানের গলা শোনা গেল,
—তাহিয়া, তোমার আপুকে বলে দিও দুধটা না খেলে আমিও দুপুরের খাবার খাব না।
রিতু হতাশ মুখে গ্লাসটা হাতে নিয়ে ফারাহকে বলল,
—আচ্ছা রাখছি। পরে কথা বলব।
ফারাহ হেসে বলল,
—আচ্ছা রাখছি। আর দুধটা খেয়ে নিস। নিজের জন্য না খাস, আমার সোনামণিটার জন্য অন্তত খা। বাবুটার পুষ্টির দরকার।
রিতু অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৫
—হু, খাচ্ছি।
কল কেটে দিয়ে নাক চেপে ধরে কোনোরকমে দুধটুকু শেষ করল রিতু। তারপর খালি গ্লাস হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে স্বামীর সামনে ধরল গ্লাসটা,
—এই যে, দেখুন শেষ করেছি।
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
—এইতো গুড গার্ল। এবার চলো রুমে। একটু রেস্ট নেবে। একটু পর আবার নিচে নামতে হবে তো।
রিতু মুখ বাঁকিয়ে স্বামীর সঙ্গে চলল…
