প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮
সাইদা মুন
কেটে গেছে আরও এক মাস। এই এক মাসে সবকিছু আগের মতোই অটল, নিরবচ্ছিন্ন গতিতে এগিয়ে চলল। সিলেট থেকে ফিরে আসার পর তালহাও নিজের কাজে একরূপ মনোযোগী হয়ে পড়ল। সবাই যার যার মতোই দিন গুছিয়ে কাটাচ্ছে, শুধু এক জন ব্যতিক্রম, সে হলো মেহরীন। সে ক্ষণে ক্ষণে নিজের অন্তরের সঙ্গে লড়াই করছে।
তার সরল মনের ভেতর নতুন নতুন রঙিন স্বপ্ন কুঁকড়ে উঠছে। সে তালহাকে নিয়ে কতশত স্বপ্ন বোনছে, অগণিত অদৃশ্য গল্প, অনূর্ধ্ববাস্তবের নানা কল্পনা। মাঝে মাঝে তিতলি বেগমের মোবাইলে তাহিয়ার সঙ্গে রিলস দেখার সময়ও, কোনো কাপল ভিডিও চোখে পড়লেই সে ঐ মুহূর্তে নিজেকে আর তালহাকে ভেবে নানা রঙের আঁকিবুঁকি করে ফেলছে।
তবে ওই স্বপ্নগুলো বাস্তবে কখনোপর্যন্ত মিলবে কিনা, সে বিষয়ে তার কোনো চিন্তায় নেই। সেসব বিষয়ে ভাবতেই চায় না, আবেগের বশে যা মেলে, তাই উপভোগ করছে সে। অল্পক্ষণে যে আনন্দ পায়, কাজে লাগিয়ে নিচ্ছে। জানে না তা ভবিষ্যতে কোনো কাল হয়ে দাঁড়াবে কি না।
মেহরীন বসে আছে, ডায়েরিতে কিছু লিখছে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-“১৫.০৯.২০২৫ আজকে আপনাকে নীল শার্টে দেখেছি। কি যে দারুণ লেগেছে, এক কথায় মারাত্মক টাইপের সুন্দর৷ আপনার জিম করা বডিতে হালকা ফিটফাট হয়ে থাকা নীল শার্ট সাথে সেই চিরচেনা গম্ভীর মুখটা। এক কথায় পার্ফেক্ট কম্বিনেশন। তবে মুখের হাসিটা মিসিং ছিলো, কিন্তু ভালোই হয়েছে। এই লুকের সাথে মুখে হাসি থাকলে তো এই মেহরীন আসলেই উল্টোপাল্টা কিছু করেই বসতো। তখন আবার আপনি রেগে যেতেন। আচ্ছা আপনাকে শার্ট ছাড়া কেমন লাগে। ছি ছি মেহরীন বড্ড নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছিস তুই। কিন্তু হলেও বা কি সে তো আমার কবুল বলে বি…”
-“কিরে মেহরীন সেই কখন থেকে ডাকছি শুনছিস না। এতো মুচকি মুচকি হাসছিস আর কি লেখছিস দেখি..”
তাহিয়ার গলা শুনেই মেহরীন হকচকিয়ে উঠে, দ্রুত ডায়েরিটা বন্ধ করে পেছনে লুকিয়ে ফেলে,
-“ক..কই কিছুনা কিছুনা, তুই ডাকছিলি কেনো সেটাই বল।”
তাহিয়া সন্দেহভাজন চোখে মেহরীনকে জহুরি নজরে পরীক্ষা করে। তাহিয়ার এমন লুক পেয়ে সে থমথমে মুখে আবুক মার্কা এক হাসি নিয়ে বলে,
-“আ..আজব তো এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো ভাই..”
-“তুই আমার থেকে কি লুকাচ্ছিস তা কি বলবি? ”
-“ক..কই কি লুকাচ্ছি আন্তাজি কথা বলিস না তো।”
-“তাহলে তোর ডায়েরিটা দে। ”
মেহরীন দ্রুত ডায়েরি নিজের বেগে ঢুকিয়ে নেয়,
-“আরে ওতে এমনি লেখছিলাম, অনেকদিন ধরে লেখালেখি করিনা তো। হাতের লেখা বাজে হয়ে যাচ্ছিল…”
তাহিয়া তাকে থামিয়ে কড়া কণ্ঠে বলে,
-“আমি তোকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর খেতাবে নিয়ে নিয়েছি। আর ফ্রেন্ড শিপে কিছু যদি আড়াল থাকে সেটা মুটেও ফ্রেন্ডশিপ না, ওইটা হয়ে যায় মতলবশিপ। এখন তুই আমাকে আসলে কি ভাবিস তা একান্তই তোর ব্যাপার। এখন নিজের পার্সনাল কথা বললে বলবি না বললে নাই, আই ডোন্ট কেয়ার।”
বলেই নাক ফুলিয়ে হনহন করে বারান্দায় চলে যায়। মেহরীন বসে আছে বেকুবের মতো তাকিয়ে। মেয়েটি ইন্ডিরেক্টলি তাকে ব্ল্যাকমেইল করে গেলো। দ্বিধায় পড়ে যায় সে, তালহা যদি তার ভাই না হতো হয়তো সে আগেই বলে দিতো। কিন্তু তার ভাইয়ের ব্যাপারে এমন কিছু জানলে তাহিয়া রেগে যেতে পারে, এই চিন্তা মাথায় কাজ করল।
নিজের মনের সঙ্গে কিছুক্ষণ লড়াই করে মেহরীন সিদ্ধান্ত নিল, তাহিয়াকে বলবে তবে শুধু ভালোবাসার কথা। তাহিয়া ছাড়া আর কেউ নেই কথা বলার মতো তাকেও হারালে কেমন হবে, তা কল্পনা করলেই ভীত হয়ে ওঠে। পা টিপে টিপে বারান্দায় গেল। সামনেই তাহিয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আহা, মেয়েটি রাগ করেছে। মেহরীন মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
-“ওলে আমার সোনা-বাবু, পাখি-জাদু লাগ কলেছো বুঝি।”
মেহরীনকে সরাতে সরাতে তাহিয়া অভিমানী কণ্ঠে বলে,
-“ছাড় বলছি একদম আদিখ্যেতা দেখাতে আসবি না। আমার এমন ফ্রেন্ড লাগবে না..”
-“কিন্তু আমার তো লাগবে, তুই ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই। তুই আমার বান্ধুবি আমার বোন আমার সব সব সব।”
-“ঢং বাদ দে একদম ইমোশনাল অ্যাটাক করবি না। বলতে পারলে বলবি নাহলে চুপ থাকবি।”
মেহরীন বুঝতে পারছে, এই অভিমান শেষ হবে তার শিকারুক্তি দিয়ে। সে ফুস করে শ্বাস ছাড়ে,
-“আমি তোকে সব বলবো তবে তার আগে আমাকে প্রমিস করতে হবে তুই আমার সাথে কথা অফ করবি না।”
মেহরীনের কথায় তাহিয়া ব্রু কুচকে তার দিকে ফিরে দাঁড়ায়। মেয়েটির মুখ মলিন দেখে তাহিয়া বলে,
-“আচ্ছা প্রমিস, তবে কি এমন কথা যা জানলে আমি রাগ করবো?”
-“আ..আসলে আমি না একজনকে ভা..ভালোবাসি।”
মেহরীনের কথা শুনে তাহিয়া “কিইইইই” বলে চিৎকার করে ওঠে। মেহরীন দ্রুত তার মুখ চেপে ধরে,
-“আরে ভাই আস্তে চিল্লাচ্ছিস কেনো।”
তাহিয়া হাত সরিয়ে এক্সাইটেড হয়ে জিজ্ঞেস করতে শুরু করে,
-“কে সে কোথায় থাকে আগে বলিসনি কেনো এতো বড় কথা।”
মেহরীন মিনিমিনিয়ে বলে,
-“তোর ভাই..”
-“ভাইয়ার কথা পড়ে আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে বা*ল।”
-“আরে সেইটাই তো তোর ভাই..”
মেহরীনের কথায় তাহিয়া বিস্ফোরিত চোখে তাকায়,
-“মানে?”
মেহরীনকে কথা বলতে না দিয়ে তাহিয়া খপ করে ডায়েরিটা নিয়ে তখনকার লেখাটা খুঁটিয়ে দেখে। পড়ে চোখ বড় হয়ে আসে,
-“কিইইই তুই ভাইয়াকে… ”
মেহরীন অপরাধীর মতো হেসে বলে,
-“হু..”
-“ভাইয়া জানে তা..?”
-“না না বলিস না প্লিজ.. ”
-“কিন্তু তুই তো ভাইয়া থেকে অনেক ছোট.. ”
মেহরীন মন খারাপ করে মাথা নাড়ে। তা দেখে তাহিয়া কিছুটা শান্ত হয়ে বলে,
-“ভাই তুই আগে বলিসনি কেনো?”
-“ওইতো তুই রাগ করবি তাই..”
-“সব বুঝলাম ভালোবাসিস ভালো কথা কিন্তু…”
তাহিয়ার কথায় মেহরীন প্রশ্নাত্মক চোখে তাকাল,
-“কিন্তু কি?”
-“নাহ তেমন কিছুনা, আচ্ছা ভাইয়া তোকে ডেকে পাঠিয়েছিলো যলদি যা। আমি ভুলেই গেছিলাম।”
তাহিয়ার কথায় মেহরীনের কপালে খানিকটা চিন্তার ভাজ পড়ে, তালহা তাকে কেন ডাকবে? আবার ভালোও লাগল, একটু কথা হবে ভেবে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে সে তালহার রুমের দিকে এগোতে লাগল।
তাহিয়া দাঁড়িয়ে আছে, তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবছে কিছু একটা,
-“কিন্তু আম্মু তো ফারাহ আপুর সাথে ভাইয়ার বিয়ে দিবে বলেছিলো, যদিও ভাইয়া এই প্রস্তাবে না করে দিয়েছিলো। যেহেতু সিউর হয়ে কেউ কিছু বলেনি এখনো, থাক এই কথা আর মেহরীনকে না বলি। হুদাই মন খারাপ করবে মেয়েটা।”
মেহরীন তালহার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দুইবার নক করেছে কিন্ত রেস্পন্স নেই। ঢুকবে কি ঢুকবে না ভেবে ভেবে সে ঢুকেই গেল। রুমে ঢুকতেই তাকে দেখতে পেল না। হয়তো রুমে নেই, বাথরুমের দিকে তাকাতেও দেখে বাহিরে থেকে বন্ধ। তাই বেড়িয়ে আসতে নেয়, ঠিক সেই সময় নজর পড়ল বিছানায় ফেলে রাখা ব্লাক টিশার্টের ওপর। হঠাৎ এক ফালতু ইচ্ছে জাগল মনে।
তালহার টিশার্টটা চুরি করে নেওয়ার ইচ্ছে। মানে মাঝে মাঝে একটু–আকটু পড়ে নেবে সেই চিন্তা মাথায়। মন-মস্তিষ্কের মধ্যে কিছুক্ষণ লড়াই করে সে এগিয়ে গিয়ে টিশার্টটা হাতে নিল। একটা টিশার্ট নিলেই বা কি সে তো আর বুঝবে না। অনেকগুলোই তো আছে তার কাছে। ভাঁজ করে হাত নিয়ে বেরোতে যাচ্ছিল হঠাৎ পেছন থেকে তালহার গলা ভেসে এলো,
-“সেই কখন ডেকে পাঠিয়েছি মাত্র আসলে?”
মেহরীন ভড়কে দ্রুত টিশার্টটা নিজের ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলে। তালহার দিকে ফিরে বলে,
-“জ..জি ডেকেছিলেন কেনো?”
তালহা বিছানায় বসে মোজা পরছে, এখনই অফিসের জন্য বেড়িয়ে যাবে হয়তো।
-“বিকালে রেডি থেকো তোমাদের গ্রামে যাবো।”
তালহার কথায় মেহরীন হকচকিয়ে তাকায়। গ্রামে যাবে মানে কি তাকে রেখে আসতে? কথাটা মাথায় আসতেই ধক করে উঠল বুক। একবার পালিয়ে এসেছে, আর ফিরে গেলে সবাই মিলে তাকে মেরেই ফেলবে।
আর সে তো তালহার কাছে থাকতে চায়। তবে তালহা তাকে রেখে আসতে চাচ্ছে কেনো। তালহা কি তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে, ডায়েরির লেখা দেখে ফেলেছে। তাই তাকে রেখে আসতে চাইছে? এসব নানা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তালহা তাকে চুপ থাকতে দেখে বলে,
-“শুনেছো?”
তালহার ডাকে ভাবনা থেকে ফিরে মেহরীন ভয়ে দ্রুত বলে,
-“সরি আমি আর এসব কিছু ভাববো না। ডায়েরিতে লিখবো না। জেলাশ হবোনা না, একদমই কুনজরে তাকাবো না। প্রমিস করছি প্লিজ আমাকে ওই গ্রামে রেখে আসবেন না।”
মেহরীনের এহেন কথায় তালহা চোখ কুঁচকে একবার দেখল, মেয়েটির কাদোঁ কাদোঁ মুখ। তালহা গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
-“আজব কাদছো কেনো, আমি কি তোমাকে মেরেছি?”
মেহরীন মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে দিল।
-“তো..? ”
-“আপনি আমাকে গ্রামে রেখে আসবেন।”
মেহরীনের কথায় তালহা বলদ বনে গেলো। সে কখন এমন কথা বলল? সাথে সাতগে ধমক দিয়ে বলল,
-“স্টপ কান্না অফ করো, স্টুপিড। আসলেই মেয়েরা দুই লাইন বেশি বুঝে। আমি কি একবারো বলেছি তোমাকে রেখে আসবো?”
মেহরীন ভেজা চোখে তালহার দিকে তাকিয়ে অসহায় সুরে বলে,
-“তাহলে গ্রামে কেনো নিয়ে যাবেন..”
-“কলেজে এডমিশন নিবে না? কাগজপত্র সব তো তোমার স্কুলেই বললে। তো সেগুলো আনতে হবে না?”
তালহার কথায় মেহরীন চোখ পিটপিট করে তাকায়। তার কথায় মনের উপর থেকে বিশাল এক পাথরের বুঝা যেনো নেমেছে। হুদাই ভুলবাল ভাবছিলো সে। আর একটু হলে সত্যি কথা মুখ দিয়ে বেড়িয়ে যেতো। তখন তো তালহা সত্যি তাকে গ্রামে রেখে আসতো। কথায় আছে না চুরের মন পুলিশ পুলিশ।
মেহরীনকে আবারও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তালহা একবার তাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,
-“রেডি থেকো পেটকাদুরে মেয়ে।”
মেহরীন তালহার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে। মনে মনে পেটকাদুরে শব্দটা উচ্চারণ করে।
-“এটা আবার কেমন নাম একটু রোমান্টিক নামে ডাকলেও তো হতো, এই যেমন বউ, জান, পাখি, জানেমান ডার্লিং।”
কথাটি ভাবতেই আবার নিজের মাথায় নিজেই চাপড় মেরে হেসে উঠল,
-‘হুহ পাগলের সুখ মনে মনে..”
সেদিন বিকেলেই তালহার সাথে রওনা দেয় মেহরীন, চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। জীপেই যাত্রা দেয়, কারে যদি আবার বমি-টমি করে। প্রায় ছয় ঘণ্টা পথ পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছে যায় তারা।
রাত তখন ১০টা,
এইটাই যেনো মোটামুটি গভীর রাত গ্রামবাসীর জন্য। এমন রাতে বড় গাড়ির শব্দ গ্রামে যেন হঠাৎ গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কৌতূহলে ঘুম রেখে একে একে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে সবাই, কে এলো দেখতে। ছোট্ট গ্রাম, এখানে তেমন প্রভাবশালী কারো আনাগোনা নেই। অনেকে আবার আতঙ্কেও কেঁপে ওঠে, ডাকাতের দল এল নাকি।
মেহরীনের দেখানো পথ ধরে তালহা এগোচ্ছে তার শিক্ষিকার বাড়ির দিকে। চাচা-চাচির ভয়ে, পুড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় সার্টিফিকেটসহ সব কাগজপত্র সেখানেই জমা রেখেছিলো সে।
-“বলছি, গাড়িটা এখানেই রেখে পায়ে হেঁটেই গেলে হয় না?”
তালহা কপাল কুঁচকায়,
-“কেন, সমস্যাটা কি? গাড়ি যতদূর যেতে পারবে ততদূর যাই। রাস্তা তো বড়ই।”
মেহরীন নখ কামড়াতে কামড়াতে ভয়ে ভয়ে ভাবে,
-“এতো রাতে গাড়ির শব্দে গ্রামের সবাই জড়ো হয়ে গেলে? তখন যদি আমাকে দেখে ফেলে, কি যে হবে।”
এরই মাঝে গাড়ি আটকে দাঁড়ায় কয়েকজন লোক। হাতে বড় বড় লাঠি, সতর্কতার জন্যই সঙ্গে রেখেছে।
-“এই গাড়ি থামান, মিয়া! কে আপনি? এতো রাতে এই গ্রামে কি করছেন?”
তালহা তাদের দেখে, গাড়ি সাইড করে নেমে আসে। ততক্ষণে গ্রামের পুরুষেরা প্রায় সবাই জড়ো হয়ে গেছে। কুট-প্যান্টে, শৌখিন শহুরে চেহারার মানুষ দেখে গ্রামের মাতব্বর এগিয়ে আসে।
-“দেখে তো শহুরে মনে হচ্ছে। তা, এতো রাতে এই গ্রামে কাকে চান? আপনার কি কোনো দরকার?”
-“জি, আপনাদের স্কুলের ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
-“কিসের জন্য?”
-“উনাকেই ডাকুন, উনার সামনেই বলি।”
তারা আর কথা না বাড়িয়ে একজনকে পাঠিয়ে দেয়। অতিথি এসেছে বলে আরেকজন চেয়ার এনে দেয় বসার জন্য। তবে এদিকে মেহরীন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। একটাই দুশ্চিন্তা, যদি চিনে ফেলে।
কিন্তু যা মানুষ এড়িয়ে যেতে চায়, সেটাই সবচেয়ে দ্রুত ঘটে। হঠাৎ একজন দেখে ফেলে বলে ওঠে,
-“গাড়িতে ওই মাইয়াডা কেডা?”
সবার দৃষ্টি একসাথে গাড়ির দিকে যায়। মেয়ে দেখে চোখে সন্দেহ জাগে, কে সে? কি দরকারে এসেছে এখানে? নাকি মেয়েটাকে নিয়ে নষ্টামি করতে এসেছে শহুরে ছেলেটা।
তাদের কথার মাঝেই উপস্থিত হন ম্যাডাম। বয়সে মাঝবয়সী, মুখে গম্ভীরতা। তালহার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
-“কীভাবে সাহায্য করতে পারি, বাবা?”
তালহা বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে বলে,
-“আসসালামু আলাইকুম। আসলে আমি মেহরীনের সার্টিফিকেটসহ যাবতীয় কাগজপত্র নিতে এসেছি।”
কথা শুনেই চারপাশে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ ফট করে বলে ওঠে,
-“মেহরীন? ওই নষ্টা মাইয়া তো গ্রাম ছেড়ে পালাইছে! ওর কাগজ দিয়ে করবেন কী?”
-“হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি ওর কে হন?”
-“তার খবর জানেন? কোন লাংগের লগে পলাইছে?”
একটার পর একটা প্রশ্নে তালহা বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার চেহারায় বিরক্ত দেখে ম্যাডাম সবার হৈচৈ থামিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
-“আপনি কে? হঠাৎ মেহরীনের কাগজের খোঁজে এসেছেন কেন?”
তালহা দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেয়,
-“আমি তালহা সিকদার। মেহরীনকে কলেজে ভর্তি করাতে এই কাগজপত্রগুলো দরকার। তাই এসেছি।”
কিছুটা বিস্মিত হয়ে ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন,
-“মেহরীন, আপনার কাছে?”
-“জি।”
চারপাশে আবার কানাঘুষা শুরু হয়। মেহরীনের চাচাদের খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যেই। ম্যাডাম চুপ থাকলেন কিছুক্ষণ, তারপর দৃঢ়ভাবে বললেন,
-“দুঃখিত, আমি নিশ্চিত নই আপনার উদ্দেশ্য ভালো না খারাপ। মেহরীন আপনার কাছে আছে কিনা তাও জানি না। তাই কাগজ আপনাকে দিতে পারবো না। এগুলো তার কঠোর পরিশ্রমের ফল, কেবল তার হাতেই দেবো।”
তালহা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ির দিকে যায়। মেহরীনের হাত ধরে টেনে নামায়, যদিও সে নামতে চাইছিল না। তালহার চোখের আশ্বাসে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে।
মুহূর্তেই গ্রাম ফুসে ওঠে। কেউ বলে,
-“মুখপুরি, কোন মুখে আবার এলো!”
-“নিশ্চয় এই ছেলের সাথেই পালিয়েছিলো!”
-“দুশ্চরিত্রা মাইয়া, এক্ষুনি গ্রাম ছাড়!”
গালিগালাজ, বিষাক্ত কথা, সব মেহরীনকে নিয়েই বলছে একেকজন। তালহার রাগে হাত মুঠিবদ্ধ হয়ে ওঠে। এতগুলো মানুষ মিলে একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে আক্রমণ করছে দেখে তার আর ধৈর্য থাকে না। গর্জে ওঠে সে,
-“চুপ! একদম চুপ সবাই, জানোয়ারদের ভিড়ে মেহরীনকে রাখতে আসিনি আমি। যেই দরকারে এসেছি, সেটা হলেই তাকে নিয়েই চলে যাবো।”
‘জানোয়ার’ শব্দে অনেকেই ফুঁসে ওঠে, তবে তালহার চিল্লানোতে কিছুটা মুখ বন্ধ হয় তাদের। তালহা সরাসরি ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“এই যে, মেহরীনকে দেখে নিশ্চয়ই চিনেছেন। এবার দ্রুত ওর কাগজগুলো দিন। এমন ঘৃণ্য পরিবেশে আর এক মুহূর্ত থাকা সম্ভব নয়।”
মেহরীনকে দেখে শিক্ষিকার চোখ ছলছল করে ওঠে। বুকের ভেতর তীব্র টান জাগে, যেন ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে বুকে টেনে নিতে। মেহরীন ও তাকিয়ে আছে প্রিয় শিক্ষিকার দিকে। নিজের সন্তানের মতোই তো ভালোবাসতেন তাকে। তবুও আবেগ দমন করে দ্রুত ভেতরে যান কাগজ আনতে। তিনি জানেন, এই গ্রামে মেহরীনের বেশিক্ষণ থাকা মোটেই নিরাপদ নয়।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭
পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি ফিরে আসেন। মেহরীন তখন তালহার আড়ালে, বিড়ালছানার মতো দাঁড়িয়ে। তালহা যেন ঢাল হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষিকার ঠোঁটে অশ্রুসিক্ত হাসি ফুটে ওঠে,
“যাক, মেয়েটা অন্তত কাউকে পেয়েছে, যে তার বিপদে ঢাল হয়ে দাড়াচ্ছে।”
তালহা তার হাত ছেড়ে শিক্ষিকার দিকে এগিয়ে যায় কাগজ নিতে। কিন্তু মাত্র দু’পা এগোতেই হঠাৎ মেহরীনের আর্তনাদ কানে আসে। ভড়কে গিয়ে দ্রুত ঘুরে তাকায় সে….
