Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৫

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৫

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৫
সাইয়্যারা খান

বাসায় এসেছে থেকে পলককে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে তুহিন। বাসার পরিবেশ ঠিক আগের মতোই। পরিপাটি, গোছানো। কলিকে দেখলো বেশ ভালোই আছে। হাসিমুখে সালাম দিলো তুহিনকে। পলক কেমন আছে তা ঠিকঠাক ভাবে বুঝে উঠতে পারছে না তুহিন তবে বেশ ভিন্ন লাগছে ওকে। এই যে বিগত কয়েকঘন্টা ধরে বুকের মাঝে আছে, তার মাঝে কোন নড়চড় নেই। তুহিন কিছুটা বুঝে তবে আগ বাড়িয়ে সেই বিষয়ে বলতে যায় না৷ তার দোষ ছিলো কিন্তু পরিস্থিতির শিকার ছিলো তুহিন। পলককে দেখলে নিজের ভাইয়ের অসহায় মুখটার কথা বারবার মনে পরতো। না চাইতেও তুহিন তখন উগ্র হয়ে যেতো অথচ তাদের ভালোবাসার শুরুটা কিন্তু এমন ছিলো না৷ বেশ সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিলো। পলকের চুলের গভীরে হাত ডুবিয়ে তুহিন এলোমেলো আঁচড় কাটলো। আস্তে করে সময় নিয়ে মাথায় চুমু খেয়ে ডাকলো,

“পলক?”
পলক ওর বুকে চেপে গেলো আরেকটু। তুহিন একটু অবাক হয় তবে নিজের করা কিছু কাজ মনে পড়তেই শান্ত হয়ে পুণরায় ডাকে,
“পলক, কথা বলবে না জান?”
পলক মাথা নাড়ে। বলবে না কথা। তুহিন সামান্য হাসে। কণ্ঠে রসিকতা এনে বলে,
“কার জন্য এত কষ্ট করে কানাডা থেকে ঠিকঠাক হয়ে এলাম? সে তো না আমার মুখ দেখছে আর না আমার সাথে কথা বলছে। তাহলে কি তোমার ঐ নেশাখোর তুহিনই পছন্দ ছিলো?”
“জানি নাহ্।”
খুব মৃদু শব্দে বললো পলক। তুহিন ওকে ধরে নিজের থেকে আলাদা করে। দুই হাতে গাল ধরে মুখটা তুলে নিজের মুখ বরাবর করলো। পরপর একটু সামনে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,

“ডিড ইয়্যু মিস মি জান?”
“হুঁ।”
“কতটুকু?”
“অনেকটুকু।”
“কোথায়? মনে তো হচ্ছে না। আসছি পর থেকে তো আদরযত্ন পাচ্ছি না।”
পলক অশ্রুসিক্ত চোখে তাকালো। তুহিন ওর চোখ বরাবরই তাকিয়ে। দু’জন বেশ খানিকটা সময় চোখে চোখ দিয়ে রাখলো। বুঝার চেষ্টা করলো। এসময় হুট করে পলক বলে উঠলো,
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আসার আগে ডায়েট করে শুকিয়ে যাব কিন্তু পারি নি৷ আমি অনেক খেয়েছি তুহিন। অনেক খেয়েছি। সারাদিন খেয়েছি। আমার অনেক ক্ষুধা লাগতো। তুমি নেই তাই আমি খুব খেয়েছি। এখন আর শুকাতে পারছি না।”

বলেই অঝড় ধারায় কাঁদতে লাগলো পলক। তুহিন দেখতে লাগলো পলককে। এসেছে থেকে তো সেই ভাবে খেয়াল করে নি ও। মুখটা গোলগাল দেখাচ্ছে শরীরও সামান্য ফুলেছে তবে খারাপ লাগছে না। জিরো ফিগারটা নষ্ট হয়েছে এই যা। তুহিনের খারাপ লাগলো। আগে তো তুহিনকে নিজের বশ করে রাখার জন্য পলক নিজেকে আর্কষণীয় করে রাখতো। তুহিন নিজেও রাগের বশে হোক বা নেশার ঘোরে পলকের সামান্যতম ত্রুটি পেলেও খুঁচিয়ে দিতো। পলকের কান্নার তোপ বাড়তেই থাকলো। তুহিন ওর দেহটা ঝট করে বুকের মাঝে চেপে ধরলো। কপালে পরপর আদুরে চুমু খেলো। পলক এবারে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। অভিযোগ জানালো অনেক,
“আমাকে কেউ দেখে না এখানে। কেউ জিজ্ঞেস করে না কেমন আছি। তুমি নেই তাই কেউ আসে না। আমাকেও ডাকে না৷ আমি নিচে নামলে সবাই সরে যায়। শুধু কাজের লোকদের সাথে ছিলাম আমি৷ কেউ আসে নি। আমাকে সবাই ঘৃণা করে৷ সবাই ঘৃণা করে।”

তুহিন পলকের দুই গাল সামান্য চেপে ধরে। চোখের পানি মুছাতে মুছাতে বললো,
“অথচ তুমি আমার আমানত ছিলে মেঝ ভাইয়ার কাছে। ভাইয়া তো আমাকে যথাযথ আমানত ফেরত দিলো। আর পৌষ তোমার জন্য মাঝেমধ্যেই এটাওটা পাঠাতো। তুমি জানো, মেঝ ভাইয়া নিষেধ করলেও জোর করে পাঠাতো। তুমি কিনা বলছো কেউ দেখে নি তোমাকে?”
“না, দেখে নি।”
“দেখেছে। সব দেখা একরকম হয় না।”
“আমি শুকাতে পারছি না তুহিন।”
“প্রয়োজন নেই তো জান৷ তুমি থাকো যেভাবে তোমার ভালো লাগে।”
“যদি…”
“কি? নেশার ঘোরেই অন্য নারীর সানিধ্যে গেলাম না এখন তো বেজায় সুস্থ আমি।”
পলক তাকিয়ে রয় তুহিনের পানে। কত ভালোবাসার এই তুহিন তার অথচ কত দূরত্ব তৈরী হলো তাদের মাঝে। পলক হাত বাড়িয়ে তুহিনের গাল ধরে। তুহিন সামান্য হাসে। চাপ দাঁড়ি যুক্ত গালটায় হাতের আদর বাড়ালো পলক। তুহিনের হাসি বিস্তৃত হলো। বেশ চোটপাট দেখানো তুহিনটা বউয়ের কাছাকাছি আসতেই নরম হয়ে যায়। আগেও হতো শুধু মাঝখানে আসা ঝড়ে সব উলোটপালোট হয়ে গিয়েছিলো।

হাসপাতালের বিছানায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া পৌষ শুয়ে আছে। হাতে ক্যানোলার সুচ ফুটিয়ে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে৷ এমনিতেই বেশ শুকনো হাড্ডিসার মেয়েটা তারমধ্যে এই দুই দিনের জ্বরে কাহিল হয়ে গিয়েছে। চোখ দুটো গর্তে ঢুকে কালো হয়ে আছে। জ্ঞানহারা সেই বাসা থেকে। এখনও জ্ঞান ফেরে নি। তৌসিফ ডাক্তারের কেবিনে বসা৷ ওর মুখটার দিকে তাকানো দায়। ডাক্তার পরিচিত। তৌসিফের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসতো আগে। রিপোর্ট গুলো নেড়েচেড়ে দেখেই জানালেন,
” সিবিসির রিপোর্ট এসেছে তৌসিফ। প্লাটিলেট পঞ্চাশ হাজারের নিচে। বেশ ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। তাছাড়া যতটুকু দেখলাম গলার দিকে র‍্যাশ উঠেছে। অবস্থা ক্রিটিকেল মনে হচ্ছে আপাতত। অবজারভেশনে আছে। মেডিসিন শুরু হয়েছে অলরেডি। ওর কি ব্লিডিং হয়েছিলো?”

“বমির সাথে এসেছিলো।”
“বুঝতেই পারছো তাহলে। আমরা আজ সারারাত অবজারভেশনে রাখছি ওকে। সকালে দেখি কি হয়।”
“ও তাকাবে কখন?”
“এখনও তো বলা যাচ্ছে না তৌসিফ।”
তুরাগ তৌসিফের কাঁধে হাত রাখলো। তৌসিফ অসহায় বোধ করলো। জিজ্ঞেস করলো,
“ঠিক হয়ে যাবে না?”
ডাক্তার ওর দিকে তাকিয়ে একটু ভাবুক হলেন। তৌসিফকে চিনেন তিনি। বেশ শক্তপোক্ত পুরুষ সে৷ স্ত্রীর করুণ অবস্থায় সে খেই হারিয়ে ফেলেছে। তৌসিফ ঠোঁট কামড়ে ধরলো। পরপর বলে উঠলো,
“ডেঙ্গুতে তো মানুষ মারা যায় তাই না?”
প্রশ্নটা করে তৌসিফ নিজেই বোধহারা হলো। বেশ অপ্রকৃতস্থ হয়ে বলতে লাগলো,
“এখানে চিকিৎসা হবে? আমি কি হাসপাতাল বদলাবো ডাক্তার? দেশের বাইরে নিব? সিঙ্গাপুর নিয়ে চলি তাহলে? এক কাজ করুন আপনি সিফ্ট করার ব্যবস্থা করুন৷ এখানে রাখার প্রয়োজন নেই।”
তুরাগ দেখলো তৌসিফ উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে। হাতটা চেপে ধরে আশ্বাস দিতে বললো,
“সকাল হোক। আগে দেখ কি অবস্থা হয় তারপর নাহয় ভাবা যাবে।”
“বড় ভাই, আমার মনে হচ্ছে খারাপ কিছু হবে।”
হাতটা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো তৌসিফ। কিছুটা উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে ওকে। ডাক্তার নিজেও দাঁড়ালেন। তৌসিফকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন,

“অপেক্ষা করুন তৌসিফ। এখন ঐ অবস্থায় নেই পেশেন্ট যে ট্রান্সফার করব।”
তৌসিফ দাঁড়ালো না। ও দ্রুত পা ফেলে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলো। ডাক্তার যে বললো গলার দিকে র‍্যাশ দেখেছে তা তো তৌসিফ দেখে নি। ছুটন্ত পা দুটো টলতে লাগলো যেন। নার্স পৌষের স্যালাইন চেঞ্জ করছে। তৌসিফ পেছন থেকেই রাগী স্বরে বলে উঠলো,
“কি করছেন?”
নার্স হঠাৎ ডাকে ভড়কে তাকালেন। তৌসিফকে দেখে বিনয়ী ভাবে বললেন,
“স্যালাইনে মেডিসিন দিচ্ছি স্যার।”
“ডক্টর দেখেছে?”

“জি, কিছুক্ষণ আগেই রাউন্ডে এসেছিলেন। এখন তিন তলায় আছেন। একটু পর আসবেন দেখা করতে।”
তৌসিফ শুনলো তবে প্রতিত্তোরে নিশ্চুপ রইলো। পরিচিত ডাক্তার এখানে হায়ার করে আনিয়েছে ও। এক পলক বেডে তাকালো তৌসিফ। বুকটা হুঁহুঁ করে উঠলো ততক্ষণাৎ। অবিন্যস্ত ভাবে বসলো বেডের পাশে রাখা টুলটাতে। শরীর থেকে সামান্য চাদর সরিয়ে গলাটা দেখলো। লাল লাল ছোপ ছোপ দাগ। তৌসিফ ওর পরিহিত পোশাক সামান্য টেনে নামালো। বুকের দিকেও গুটিগুটি দাগ ছোপ। বুকটা নিমিষেই ভেঙে আসে তৌসিফের। পৌষের বুকে হঠাৎ মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠে তৌসিফ। অস্পষ্ট স্বরে উঠে,

“আম্মু।”
পেটানো দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছে ওর। পৌষের দেহটা গুটিয়ে এতটুকু হয়ে আছে। তৌসিফের অবস্থা ওকে দেখে ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। তৌসিফ সামান্য মুখ তুলে পৌষের গলায় মুখ গুঁজে ডেকে উঠলো,
“পৌষরাত, উঠো না তোতাপাখি। আমার অস্থির লাগছে ভীষণ। তোমাকে একটুও ভালো লাগছে না। তুমি এভাবে চুপচাপ কেন পৌষরাত? তুমি না আমার তোতাপাখি? তোতারা কি চুপ থাকে? তোমার এই চুপচাপ ভাব আমাকে মেরে ফেলবে পৌষরাত। একদম মেরে ফেলবে। প্লিজ উঠে পড়ো। আমরা বাসায় চলে যাই।”
পৌষের দেহটা নড়ে না। তৌসিফের বাম চোখ গড়িয়ে দু ফোঁটা পানি পড়লো। পাতলা ঠোঁটটা কাঁপলো তিরতির করে। পৌষের গালে হালকা চুমু খেয়ে বললো,

“তুমি আমার দ্বিতীয় প্রিয় নারী পৌষরাত। আম্মু তো আমাকে ছেড়ে চলে গেলো, প্লিজ তুমি যেও না। প্লিজ পৌষরাত। এবারে আমার জন্য বেঁচে থাকা কষ্ট হয়ে যাবে।”
পলকহীন ভাবে তাকিয়ে রইলো তৌসিফ। সময় গড়িয়ে ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটতে লাগলো। আদিত্য আর তুরাগ বাইরেই বসা। আদিত্য অবশ্য একবার ভেতরে এসেছিলো। এই পর্যন্ত দুইবার ডাক্তার এসে দেখে গেলো। অবস্থার উন্নতি নেই। তৌসিফকে ধীরে ধীরে ভয় আঁকড়ে ধরছে। মাথাটাও ঠিকঠাক কাজ করছে না। চোখ দুটো এক করতে পারে নি ও। আদিত্য তখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। সকাল দশটার কাছাকাছি। তুহিন জেনেছে পর ছুটে এসেছে ভাইয়ের কাছে। এসেছে থেকে হুমকিধামকির উপরে রাখছে সবাইকে। এটাই ওর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আদিত্য ডাকলো তৌসিফকে,

“মেঝ চাচ্চু, খাবে এসো।”
“বাসায় যা তুই।”
“ছোট চাচ্চু এসেছে। এসেছে থেকে বাইরে গ্যাঞ্জাম করছে। তুমি এসো একটু।”
“ক্ষুধা নেই আদি।”
“পুষি উঠে খুব রাগ দেখাবে।”
“দেখাক। আমি তো চাই সে রাগ দেখাক। অন্তত এভাবে পড়ে না থাকুক।”
চোখ ভিজে উঠে তৌসিফের। মাত্র দুই দিন। দুই দিনে কি হালত হলো ওর পৌষরাতটার। আদিত্য হঠাৎ চাপা স্বরে চেঁচালো,
“মেঝ চাচ্চু, পুষি!”
তৌসিফ তাকালো। পৌষ নড়াচড়া করছে। আদিত্য ছুটে বেরিয়ে গেলো ডাক্তার ডাকতে। তৌসিফ হুড়মুড় করে পৌষের উপর ঝুঁকলো৷ ডাকতে লাগলো অস্থির হয়ে,

“পৌষরাত? পৌষরাত? এই যে আমি।”
“ব্যথা, ব্যাথা হচ্ছে… ”
বলতে বলতে পৌষ অস্বস্তি নিয়ে নড়াচড়া শুরু করলো।
“ক..কোথায়? কোথায় ব্যথা হচ্ছে, বলো আমাকে? পৌষরাত! তাকাও তো আমার দিকে।”
ডাক্তার এসেছে ততক্ষণে। পৌষকে দেখছে। পৌষ বাম হাত দিয়ে গলা চুলকাচ্ছে। বারবার এদিক ওদিক করছে। মুখে একই কথা,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৪

“ব্যথা হচ্ছে আমার।”
তৌসিফ ডাক্তারের দিকে না তাকিয়ে পৌষের হাত চেপে ধরলো। জোড়ালো ভাবে বললো,
“ব্যথা, ব্যথা কমিয়ে দিন ডক্টর। ডু ইট ফাস্ট।”
নার্স ইনজেকশন তৈরী করে দিতেই তা পুশ করেন ডাক্তার। পৌষ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো ধীরে ধীরে। এদিকে তৌসিফ দাঁড়িয়ে রইলো একবুক হাহাকার নিয়ে। ওর পৌষরাতটার কি হলো? কেন হলো?

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৬