Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৯

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৯

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৯
নওরিন কবির তিশা

তপ্ত রোদ্দুরে আবৃত গোটা ধরনী। সোনালী রোদ্দুরের উষ্ণ আভায় কেটেছে ভোরের রেশ। বেলা চড়েছে শুরু হয়েছে কর্মব্যস্ততা। সকলে যে যার মতন বেরিয়ে পড়েছে কর্মস্থলে‌ এদিকে নীল তো মহাব্যস্ত। ব্যবসার রাজনীতি সব মিলে বিশ্রী অবস্থা তার।

পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তিহু আজ ভার্সিটিতে যাবে না। সকাল সকাল খাওয়া দাওয়া সেরে কল লাগালো তাদের তিন বন্ধুর গ্রুপে। সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে জয়েন করলো মাহা-রিশাদ দুজনেই।তিহু কাল বলেই রেখেছিল যে আজ সে ভার্সিটি যাবেনা, তাই মাহা-রিশাদও ছুটি কাটাচ্ছে। অবশ্য আজ যে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোন ক্লাস ছিল তেমনটাও নয়।তাই ইচ্ছাকৃত অবসর নিয়েছে তিনজনে।
ফোন রিসিভ করেই ঘুম ঘুম কন্ঠে রিশাদ বলল,,—’এই বল কি বলবি?
তিহু ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’তুই এখনো ঘুমাচ্ছিলে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রিশাদ আলসে ভেঙে বলল,,—’কি আর করার? সিঙ্গেল মানুষ! তাই পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলাম।
—’লাইক সিরিয়াসলি রিশাদ। আজকে না আমাদের বেরোনোর কথা ছিলো? আর তুই পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস?
তিহু চেঁচিয়ে মাহার উদ্দেশ্যে বললো,,—’আমার হয়ে ওকে একটা লাথি মার মাহু।
মাহা হাই তুলে বলল,,—’কুল ডাউন সুইটহার্ট, নিজের ব্রেন টাকে কাজে লাগাও। তাকে বোঝাও তুমি যেখানে আমিও ঠিক সেখানে। মানে কেউ রিশের কাছে নেই, থাকলে ওর চুল একটাও মাথায় থাকতো না।
তিহু ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,,—’সব কয়টা রা*জাকার শা*লা।

অতঃপর সে রিশাদের উদ্দেশ্যে বলল,,—’তুই ঘুমা পরে পরে। একবারে ম*র। অনেকদিন চল্লিশা খাই না।
অতঃপর সে মাহার উদ্দেশ্যে বলল,,—’তুই কি আসবি? আর ওই শা’লার কথা বাদ দে ও পরে পরে মরার মত ঘুমাক। আমি আর আমার ননদিনীরা আসছি,তুই জলদি জলদি বের হ মাহু।
‘ননদ মানে?’——এক লহমায় ঘুমের সমস্ত রেশ কেটে গেল রিশাদের।
তিহু রেগে বলল,,—’আমার বরের বোনেরা হালা। আর তুই ম*র। একদম আসবি না।
রিশাদ চটজলদি বিছানায় উঠে আলসে ভেঙ্গে দ্রুত কণ্ঠে বলল,,—’আরে তা আগে বলবি না তোর ননদ আসছে? তাহলে তো আমি কখন উঠে যাই।

মাহা বিরক্ত কণ্ঠে বলল,,—’এই তোরা দুজন বকবক কর। আমি গেলাম রেডি হতে।
মাহা বেরিয়ে যেতেই রিশাদ তিহুর উদ্দেশ্যে বলল,,—’তুই তো আমার কলিজার বান্ধবী। রাগ করিস না বান্ধবী আমার, তোর ছোট ননদ টাকে নিয়ে আসিস।ঠিক আছে?
তিহু ফোন কেটে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,—’শা*লা ঢিলা ক্যারেক্টার আনবো না যা।
‘আরে আরে কথাটা তো..!’——তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ফোন কেটে দিল তিহু। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল,,
—’শা*লা ভন্ড!

তপ্ত দুপুরের কড়া রোদ উপেক্ষা করে তিহু, মাহা ,রিশাদ হাজির হলো ঢাকার অন্যতম বিলাসবহুল শপিং মল কাম ক্যাফে ‘ব্লু-হেভেন’-এ। বিশাল আয়তনের এই ক্যাফেটি শহরজুড়ে পরিচিত তার আভিজাত্য এবং নান্দনিক ইন্টেরিয়রের জন্য। কাঁচের দেয়াল ঘেরা বিশাল বিল্ডিংটির একপাশে রয়েছে নামী-দামী ব্র্যান্ডের শোরুম, আর অন্যপাশে আড্ডার জন্য মনোরম ক্যাফে।
ভিতরে ঢুকতেই এসির হিমশীতল হাওয়া আর মৃদু মিউজিকের শব্দে তিহুর ভেতরটা উচ্ছ্বাসিত হল খানিক।মাহা গল্প করলেও গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে আছে রিশাদ। মাহা ইশারায় তিহুকে দেখালো রিশাদের অবস্থা।তিহু ঠোঁট চেপে হেসে রিশাদ কে খুঁচিয়ে বলল,

—’কি হলো, মুখ গোঁমড়া করে আছিস কেন?
—’তুই না আমাকে বলেছিলে তোর ননদ আসবে?
তিহু সশব্দে হেসে বলল,,—’হালার মদনা তোকে যদি তখন ওটা না বলতাম তুই এখনো আসতি? আর জানিস না আজকে স্কুল ডে ‌। তুই যার কথা বলেছিলি সে এমনিতেও আসতে পারতো না।
রিশাদ অপর পাশ ঘুরলে মাহা আর তিহু ইচ্ছাছে ক্ষ্যাপাতে লাগলো তাকে। তিনটি মিলে এগিয়ে গেল, শপিং কমপ্লেক্স এর দিকে ।

ঘন্টা দুয়েক চলল ধুমধাম কেনাকাটা। জামাকাপড় থেকে শুরু করে প্রসাধনী—কিছুই বাদ রাখল না ওরা। তবে কেনাকাটা মাহা আর তিহুর হলেও, শপিং ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে সবারই তখন নাজেহাল দশা রিশাদের। কেননা ব্যাগগুলো তাকেই বহন করতে হচ্ছে। গরমে গলা শুকিয়ে কাঠ তার; হঠাৎ রিশাদই তাদের উদ্দেশ্যে দিল,,—‘চল কাল না’গিনী’রা, এবার অন্তত কোণার কফি শপটাতে গিয়ে বসি। আহ কি শান্তি! ব্যাগগুলো আমার হাতে আর নিজেরা কি সুন্দর, ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ভাগ্যক্রমে নিস্তার পেল রিশাদ;তিহু ফোন দিতেই ড্রাইভার এসে ব্যাগগুলো নিয়ে গেল। সবাই মিলে ‌এগিয়ে গেল ক্যাফেটেরিয়ার দিকে। ক্যাফেটি ইনডোর প্ল্যান্ট আর নিয়ন আলোয় সাজানো। বসার জায়গাগুলো বেশ প্রাইভেট এবং আরামদায়ক। কিন্তু ক্যাফের ভেতরে পা রাখতেই তিহুর চোখ আটকে গেল একদম কর্নারের একটা টেবিলের দিকে। হঠাৎ করেই ওর পায়ের গতি থমকে গেল।
তাদের অগ্রভাগে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে এক অষ্টাদশী রমনী। আর তার ঠিক সম্মুখে রাওফিন ঝুঁকে বসে।মেয়েটির হাতে হাত রেখে রাওফিন খুব নিবিড় মনে কথা বলছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে রাওফিনের মুগ্ধ দৃষ্টি আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সার্বক্ষণিক হাসি।

হঠাৎ পাশ থেকে রিশাদ বলল,,—‘আরে ঐটা কি রাওফিন ব্রো না? কিন্তু সাথে ওই মেয়েটা কে?’
তার কথায় সম্মুখ পানে চাইলো মাহা। দেখলো রাওফিনের সঙ্গে কোনো এক তরুণীর এমন অবস্থান। কোনো কথা বলতে পারল না সে ।হঠাৎ চোখের কোণে একরাশ বিস্ময় আর অজানা এক অভিমান দানা বাঁধতে শুরু করল ‌তার। মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল এতক্ষণের সমস্ত আনন্দ ।অদ্ভুত বিস্মিত কন্ঠে সে বলল,,—’ওটা রাওফিন?
পাশ থেকে তিহুর ভাবলেহীন উত্তর,,—’হ্যাঁ। হয়তো আমার বড় জা’র সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আচ্ছা চল কাবাব মে হাড্ডি হতে হবে না তার চেয়ে বরং আমরা অন্য ক্যাফেতে যাই।
‘বড় জা’ কথাতো শ্রবণগোচর মাহার সমস্ত যাতনা উবে গেল মুহূর্তেই। বজ্রাহত কোনো রূপসী বিজুরীকন্যার ন্যায় ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সে বলল,,—’বড় জা মানে?

এবারও হেলদোলহীন জবাব তিহু,,—’বড় জা মানে বড় জা। মানে আমার ব্রাদারের ব…!
তাকে কথা শেষ করতে দিল না মাহা চিৎকার করে বলল,-—’ও স্টপ স্টুপিড। জাস্ট স্টপ দিস।
—’কিসের আবার স্টপ? মানুষটা আর কতদিন সিঙ্গেল থাকবে হ্যাঁ তোর জন্য? কতদিন ওয়েট করলো, আর যখন ফিরে আসলো তখন তুই তাকে বারংবার রিজেক্ট করলি। তাহলে এখন যদি সে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাহলে দোষটা কি শুধুমাত্র তার?

মাহা নিতে পারল না তিহুর কথাগুলো, এদিকে রাওফিন বারংবার আড়চোখে মাহার দিকে তাকালেও মাহা তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেন অবজ্ঞা করছে তাকে। মাহা আর পারল না, ক্ষিপ্ত বাঘিনীর ন্যায় এগিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা দু’হাতে কলার আঁকড়ে ধরল রাওফিনের।
তার এমন কান্ডে হতবাক রাওফিন সহ উপস্থিত সকলে।রাওফিন দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,,—’হোয়াট ননসেন্স মাহা? কলার ছাড়ো আমার।

মাহা আরও জব্দ করে ধরল কলার। সর্বশক্তিতে তা ঝাঁকিয়ে বলল,,—’ছেড়ে দেবো মানে? ছেড়ে দেব বলে ধরেছি না কি? আর কি বললে? ননসেন্স? এখন তো ননসেন্স লাগবেই!
রাওফিন মুখ কুঁচকে বলল,,—’আস্তে মাহা এটা পাবলিক প্লেস।
মাহা দ্বিগুণ ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,,—’তোর পাবলিক প্লেসের গুষ্টি কিলাই! আগে বল এই মেয়ে কে?
—’মুখ সামলাও মাহা, আরে এই মেয়ে কে জেনে তোমার কি? ও আমার ব….!
তাকে কথা শেষ করতে দিল না মাহা,সপাটে রাওফিনের বাঁ চোয়ালে থাপ্পড় মেরে নিজেই কেঁদে দিলো।ডুকরে ডুকরে কন্দনরত কন্ঠে বলল,,

—’সব শেষ তাই না? দু’দিন পিছন পিছন ঘুরেছো আর আমি পাত্তা দিইনি দেখে সব শেষ? আর আমি? সেই কিশোরী বয়স থেকে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে এসেছি। তবুও হাল ছাড়িনি! তোমার ফেরা না ফেরা আমার সাথে দেখা হওয়া না হওয়া সবটাই যদি বলি কাকতালীয় ছিল। অথচ তবুও তোমাকে খুঁজে ফিরেছে মন।বৃহৎ এই তল্লাটে হাজারো মানবের ভিড়ে এই দৃষ্টি শুধুমাত্র একজন কেই খুঁজে ফিরেছে। হৃদয় যেখানে আটকে আছে বহুকাল ধরে। অথচ তুমি?
কথা বলার এক পর্যায়ে, রাওফিনের বুকে আঁছড়ে পড়লো মাহা। কেঁদে উঠলো শব্দ করে।রাওফিন দ্রুত তাকে বুকে আগলে বলল,,

—’ বহুকাল ধরে এ হৃদয় মরুভূমির ন্যায় খাঁ খাঁ করছিল জানো? আজ তোমার বলা কথাগুলো এক পসলা বৃষ্টি এনে সজীবতা আনল সেথায়।
মাহা মুখ তুলে চাইলেই রাওফিন হেসে তার ভেজা চোখ মুছিয়ে বলল,—’এটা সমস্তটাই একটা প্ল্যান ছিল। তোমার মুখ থেকে, হৃদয়ের কথাগুলো শোনার ফন্দি মাত্র।
মাহা ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’মানে?
রাওফিন হেসে ইশারা করতেই, গলা খাঁকারি দিয়ে মুখ থেকে নিকাব সরালো নাহা। হেসে বললো,,—’কেমন দিলাম বড় বউমনি?

মাহা চূড়ান্ত বিস্মিত। অবাক কণ্ঠে বললো,,—’নাহা তুমি?
তিহু এগিয়ে এসে নাহা’র কাঁধে হাত রেখে বলল,,—’ইউ আর দ্য গ্রেট ননদিনী। সুপার সুপার হইছে!
নাহা তিহুর দিকে ফিরে দৃষ্টি বিনিময় করে হেসে উঠলো। মাহা দ্রুত রাওফিনের থেকে সরে গিয়ে,তিহু উদ্যেশ্যে বলল,,—’মানে এতক্ষণ নাটক করছিলি তোরা?
তিহু তাকে ভুল সংশোধন করে দেওয়ার স্বরে বলল,,-—’একদম নয়। কল ইট ড্রামা সুইটহার্ট। নাটক বলে অসম্মান করিস না!

মাহা তার দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,,—’ইউউউউউ….!
তিহু দ্রুত নাহা’র পিছনে লুকিয়ে রাওফিনের উদ্দেশ্যে বললো,,—’তোমার পাগলা প্রেমিকাকে সামলাও ব্রাদার। এত দ্রুত আমার বরকে বিপত্নীক করতে চাচ্ছি না। এই রিশাদ নাহা দ্রুত আয়।
নাহা রিশাদ একযোগে বলল,,—’আসছি।
বলেই সেখান থেকে দৌড়ে পালালো সবকটা।মাহা তাদের পেছনে নিতে যেতেই, রাওফিন পিছন দিকে তার হাত আঁকড়ে বলল,,—’কোথায় পালাচ্ছো লাভলাইন?এখন থেকে তোমার স্থান আমার বাঁ পাশে। একদম তিড়িং বিড়িং করবা না আর। বহুৎ জ্বালিয়েছো আমায়।

খান মহলের বিশাল অট্টালিকাটি আজ যেন এক নিঝুম পুরী। পরিবারের সবাই পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শহরের বাইরে যাওয়ায় থমথমে নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চারপাশ। হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে গেটের সামনে চাকার ঘর্ষণ আর ইঞ্জিনের পরিচিত গর্জন শোনা গেল। নীল ফিরেছে। কালো রঙের পাজেরোটা পোর্টিকোর নিচে থামতেই ড্রাইভার দ্রুত নেমে দরজা খুলে দিল।

গাড়ি থেকে নামল নীল। পরনের সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি গুটানো, টাইটা কিছুটা আলগা করা। সারাদিনের রাজনৈতিক সমাবেশের ধকল আর তপ্ত রোদের ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট।
দরজায় নক না করে সরাসরি ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে তা খুলল নীল। চাবিটা পকেটে পুরে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। তবে আজ বাড়ির ভেতরটা অন্যদিনের মতো নয়। আবছা হলদেটে আলোয় চারপাশটা এক মায়াবী রূপ নিয়েছে।
এদিকে গেট খোলার শব্দে দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখ থেকে উঠে দাঁড়ালো তিহু।সবাই গেলেও বাসায় একমাত্র রয়ে গেছে সে। কারণ একটাই, কর্মস্থলের ব্যস্ততার দরুন নীল যেতে পারবে না। আর যেখানে নীল নেই সেখানে কক্ষনো তিহু থাকতে পারেনা। যদি পারে এগিয়ে চলল সম্মুখ পানে।

বাড়িতে একটা পরিচারিকাকেও না দেখতে পেয়ে ভ্রু গোটালো নীল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যেতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকালো সম্মুখ পানে; যেথায় দাঁড়িয়ে আছে এক রূপসী নীলাঞ্জনা।
ঘন নীল রঙের শাড়ি, হাত ভর্তি রেশমি চুড়ি আর অবিন্যস্ত চুলের ভাঁজে তিহুকে দেখে নীলের ক্লান্ত চোখজোড়া মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল;বড্ড মায়াবী দেখাচ্ছে তিহুকে,যেন শরতের মেঘমুক্ত আকাশে এক চিলতে নীল চাঁদ।
কতক্ষণ অতিবাহিত হলো জানা নেই তবুও নীল চেয়ে থাকল মুগ্ধতায়। হঠাৎ তিহুর কাছাকাছি আসা আর চুড়ির রিমিঝিনি শব্দে ধ্যান ভাঙল নীলের তৎক্ষণাৎ মুগ্ধতা ঢেকে দিয়ে সে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,,

—’তুমি যাওনি?
তিহু কিছুটা লাজুক লাজুক হয়ে বলল,,—’কেমন লাগছে আমায়?
নীল জবাব দিল না পাশ ঘুরে উঠে গেল দোতলায়। তিহু মুখ কুঁচকে কোমরে হাতে দিয়ে দাঁড়ালো; মুখ বাঁকিয়ে বলল,,
—’মিস্টার গুরু গম্ভীর পলিটিশিয়ান! এত ঢং না কেন আপনার হ্যাঁ? আজ যদি আপনার ঢঙের দফা-রফা না করেছি তো আমার নামও…!
কথা শেষ না করেই দোতলার উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে।

কক্ষে প্রবেশ মাত্র তিহু বুঝলো নীল ওয়াশরুমে। শাওয়ার নিচ্ছে বোধ হয়! ওয়াশ রুমের টুপটাপ পানি পড়ার শব্দ সেটারই প্রমাণক।তিহু দীঘল আয়নায় তাকিয়ে নিজের ঠোঁটে লেগে থাকা রঞ্জকটা আরেকটু গাঢ় করলো।
মুহূর্ত কয়েকের মাঝে ওয়াশরুম থেকে বেরুলো নীল।বের হতেই নীলের চোখ গেল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে। আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে তিহুর প্রতিচ্ছবি। যে খুব নিবিষ্ট মনে ঠোঁটে গাঢ় লাল রঞ্জক দিচ্ছে। সিক্ত চুলের মাথা থেকে চুইয়ে পড়া এক ফোঁটা পানি নীলের গলার কাছে এসে থামল, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার সমস্ত মনোযোগ এখন ওই নীল শাড়িতে মোড়ানো চঞ্চলা মেয়েটির দিকে।
নীলকে বের হতে দেখে তিহু আয়না থেকেই একটা বাঁকা হাসি দিল। হাত বাড়িয়ে কানের ঝুমকোটা একটু ঠিক করে নিয়ে আলতো স্বরে বলল,

— ‘উফ মিস্টার পলিটিশিয়ান! আপনার নজর তো একদম হাই-ভোল্টেজ ক্যামেরার মতো। এভাবে স্ক্যান করলে তো আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাব! কেন, নিজেকে সামলাতে খুব কি কষ্ট হচ্ছে?
নীল দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আলমারি থেকে নিজের শার্টটা নিতে নিতে গম্ভীর গলায় বলল,,
—’শাট আপ স্টুপিড, আর তুমি এখানে কী করছ? সবার সাথে গেলে না কেন?
তিহু ধীর পায়ে নীলের সামনে এসে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে একটুখানি সরে গিয়ে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। সে নীলের খুব কাছে গিয়ে আদুরে কন্ঠে বলল,,

—’ আমার বরটা একা বাসায় থাকবে আর আমি কি না বাইরে ফুর্তি করব? আমি কি অতটাই খারাপ,বলুন?
নীল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তিহুর গায়ের মেয়েলী পারফিউমের তীব্র সুবাস আর চুড়ির টুংটাং শব্দে তার ভেতরের গাম্ভীর্যের দেয়ালটা যেন বালির বাঁধের মতো ভাঙতে শুরু করেছে। অথচ সে তা প্রকাশ করতে পারছে না। তিহু বুঝতে পারছে নীলের অবস্থা। সে ইচ্ছা করেই আরেকটু ঘনিষ্ঠ হলো নীলের, এদিকে তার এমন কাছাকাছি আসাতে বেহাল দশা নীলের সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

— ‘নুর!
তিহু এক পা পিছিয়ে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল,,
—’ওমা! এমন করছেন কেন মিস্টার?আমাকে দেখে কি সব ক্যালকুলেশন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে?আপনার চোখ তো বলছে আপনার হার্টবিট বেশ ফাস্ট হয়ে গেছে। যাই হোক বলুন তো আমায় কেমন লাগছে?
নীল এক পলক তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। মনে মনে বলল, নীলাঞ্জনা!কিন্তু মুখে বলল,
— ‘মোটেই না। সঙের মতো লাগছে। যাও তো, চেঞ্জ করে ঘুমাও গিয়ে।
তিহু এবার নীলের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার দু-গালে হাত রাখল। কাজল কালো ডাগর চোখের দীর্ঘ অক্ষিপল্লভ বারংবার ঝাপ্টে বলল,,

—’তাই নাকি? তাহলে এমন সঙ সেজে থাকলে যদি কেউ অমন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তাহলে আমি সার্বক্ষণিক এমন সঙ সেজেই থাকতে চাই।
তিহুর এমন দৃষ্টিতে আর নিজেকে সামলাতে পারল না নীল,তিহুর কবজিটা হ্যাঁচকা টানে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখন নেই বললেই চলে। নীলের তপ্ত নিঃশ্বাস তিহুর কপালে আছড়ে পড়ছে। সে নিচু স্বরে বলল,

—’বেশি বাড়াবাড়ি করছ নুর, এর ফলাফল ভালো হবে না কিন্তু…!
তিহু তেমনি নিবিষ্ট দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,—’আমি চাই সে ভয়ংকর ফলাফল টা দেখতে…!
বাইরে তখন নিঝুম রাত, আকাশের কপালে রুপোলি চাঁদের টিপ। জানলার ঝিরঝিরে পর্দা ঠেলে এক ফালি স্নিগ্ধ জোছনা চোরের মতো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। সেই মায়াবী আলোর মাঝে এক জোড়া কপত-কপতি। তিহুর শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে চাঁদের আলো লুটিয়ে পড়ছে, আর নীলের চোখে খেলা করছে এক গভীর প্রশান্তি মেশানো দহন। ঘরের দেয়ালজুড়ে তাদের ছায়া দুটো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, যেন দুই বিবাগী মনের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল এই নিভৃত লগ্নে।
বাতাসের হিল্লোলে তিহুর চুলের সুবাস আর রেশমি চুড়ির ক্ষীণ ধ্বনি সেই নিস্তব্ধতাকে আরও নিবিড় করে তুলল। প্রকৃতির এই মোহিনী মায়া আর হৃদয়ের অদম্য টান—সব মিলেমিশে এক অলৌকিক আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে রইল ঘরটি, যেখানে শব্দরা আজ মৌন, কেবল অনুভবেরা কথা বলছে নিরন্তর।

রাতের প্রহর তখন আরও গভীর হয়েছে। জানলার বাইরে রূপালি চাঁদটা এখন ঠিক মাথার ওপর। ঘরের ভেতরে আধো-অন্ধকার, কেবল কোণের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেওয়ায় ঘরজুড়ে এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে পড়েছে। ল্যাম্পের নিচ থেকে বিচ্ছুরিত নীলাভ নিয়ন আলোটা তিহুর ঘুমন্ত মুখের ওপর আলতো করে এসে পড়েছে, আচ্ছা তার সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

নীল ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে বসল। তিহু অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমের ঘোরে ওর কপালের ওপর অবাধ্য একগুচ্ছ চুল এসে পড়েছে, যা নিয়ন আলোর ছোঁয়ায় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। নীল নিবিষ্ট দৃষ্টিতে এক মনে চেয়ে রইল ঘুমন্ত অপরূপার পানি। আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভাবলো, সারাদিন এই মেয়েটা কী পরিমাণ যন্ত্রণা দেয় তাকে। অথচ ঘুমের ঘোরে ওকে দেখলে মনে হয় জগতের সবটুকু সারল্য যেন ওর এই শান্ত মুখচ্ছবিতেই লুকিয়ে আছে।
তিহুর সেই দুষ্টুমি ভরা কথাগুলো আর চঞ্চলতা নীলের মনের গহিনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল। ওর ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। নিয়ন আলোর সেই মায়াবী আবহে নীলের মানে হলো, এই মুহূর্তটুকু চিরকাল স্তব্ধ হয়ে থাকুক। সে মুগ্ধ নয়নে তিহুর দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে এক সুরের রাজ্যে হারিয়ে গেল…

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৮

🎶 এই মন শুধু তোমার…..
তুমি শুধু আমার….
খুঁজে ফিরি আজও…
তোমাকে বারে বার….
ভালোবাসি তোমায় ভালোবেসে যাবো….🎶

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪০