প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫২
নওরিন কবির তিশা
নব্য দিনের সূচনা। দেখতে দেখতে তিনটি দিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উড়াল মেঘের ভেলায় সওয়ার হয়ে সময় যেন আজ বড় বেশি চঞ্চল। নীল আর তিহুর পরিণয়-লগ্ন যত এগিয়ে আসছে, অন্দরমহলে ততই বাড়ছে উৎসবের সমারোহ আর তোড়জোড়।যদিও তাদের গহনা থেকে শুরু করে পায়ের জুতা অব্দি সবকিছুই বিশেষ অনুক্রমে তৈরি করা হচ্ছে তবুও হলুদের সাজসজ্জাটুকু তারা নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে কেনাকাটা করবে বলে স্থির করেছে।
সেই উদ্দেশ্যেই আজ নবীনের দল এক অপূর্ব উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। গন্তব্য—খুলনার সবচাইতে অভিজাত শপিং কমপ্লেক্স। দুইখানি গাড়ি বোঝাই একরাশ উচ্ছল তারুণ্য আর কোলাহল। এক গাড়িতে তিহু, পিহু, রাফা, সারা আর তানহা—যাদের হাসাহাসি আর নিরন্তর জল্পনা-কল্পনার তরণী বাইছে রাওফিন। অন্য গাড়িতে সাজ্জাদ, তাজহীর আর তাওহীদের দল; আর বয়োজ্যেষ্ঠদের নিয়ে চলছে বাকি গাড়িগুলো। বয়োজ্যেষ্ঠ বলতে তিহু কাকি আর ফুফুরা।
শপিং কমপ্লেক্সের সম্মুখে পৌঁছাতেই এক ঝলক আধুনিকতার আভিজাত্য চোখ ধাঁধিয়ে দিল তাদের। বিশাল সেই কাঁচের তোরণ যেন নাগরিক সভ্যতার এক রাজকীয় দর্পণ।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ভেতরে প্রবেশ করতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্নিগ্ধ পরশ শ্রান্ত শরীরে প্রশান্তি এনে দেয়। চারিদিকে সুনিপুণ আলোকসজ্জার খেলা—স্বচ্ছ কাঁচের আবরণে সাজানো বিপণিগুলোতে রেশমি বস্ত্রের কারুকাজ আর অলঙ্কারের দ্যুতি মিলেমিশে এক মায়াবী জগতের সৃষ্টি করেছে।
মার্বেল পাথরের মসৃণ মেঝেতে তরুণদলের পদধ্বনি আর গুঞ্জনে চারপাশ মুখরিত। উপরে তাকালে মনে হয় যেন তারার মেলা বসেছে, অগণিত ঝাড়বাতির আলোয় কৃত্রিম দিন নেমে এসেছে সেখানে। কোথাও সুগন্ধির মৃদু ঘ্রাণ বাতাসের সাথে মিশে এক উদাসীন আবেশ তৈরি করছে, তো কোথাও রকমারি সওদার পসরা সাজিয়ে বসে আছে আধুনিক জৌলুস। ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা আর রঙিন বিপণিগুলোর ভিড়ে তিহুদের সেই তারুণ্যের মেলা যেন এক বসন্তের সজীবতা নিয়ে এসেছে।
পরিচিত এক বিপণিবিতানের ভেতর প্রবেশ করল তারা।বিশাল কক্ষের চারিদিকে দেয়ালজোড়া আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্বের মিছিল; মাথার ওপর ঝোলানো ঝাড়বাতির আলো রেশমি শাড়ির জমিনে পড়ে হিরের টুকরোর মতো ঝিকমিক করছে।পিহু, রাফা আর সারা—সবাই মিলে মেতে উঠল সেই রেশমি সমুদ্রের মাঝে।
কেউ তসরের স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে দেখছে, কেউ বা জামদানির সূক্ষ্ম জালের বুননে হারিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে রঙের মেলা।বাসন্তী, কাঁচা হলুদ, আর কমলা রঙের সেই বসনগুলোর মাঝে যেন অকাল বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে।মেয়েদের কলকাকলিতে সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ বিপণিটি হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। হাতে হাত মিলিয়ে তারা একেকটি শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছে আর খুনসুটিতে মেতে উঠছে।
এরই মাঝে চলল আলোকচিত্রের উৎসব। মুঠোফোনের ক্যামেরায় একের পর এক ফ্রেম বন্দি হতে লাগল তাদের সেই উচ্ছল মুহূর্তগুলো।তবে এতসব কোলাহলের মাঝেও তিহু শান্ত হয়ে বসে আছে।সবার অলক্ষ্যে সে নিজের পছন্দের একটি হলুদ রঙের জমকালো শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আয়নার এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। তার লাজুক হাসির আভা শাড়ির রঙের সাথে মিলে এক অপূর্ব দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সে দ্রুত ফোনটি বের করল।
কাঁপাকাঁপা হাতে একটি আলোকচিত্র তুলে পাঠিয়ে দিল প্রিয় মানবটির ঠিকানায়। ছোট্ট করে লিখলো,,
—’দেখুন তো মিস্টার? বউ বউ লাগছে?
অপর প্রান্তের প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় তখন তিহুর হৃদয় ঢিপঢিপ। পাকামি করে মেসেজ তো পাঠিয়েছি কিন্তু উত্তর কি পাবে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ-ই সে দেখল মেসেজের রিপ্লাই না দিয়ে সরাসরি ফোন দিয়েছে নীল। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠল তিহু। বিস্মিত দৃষ্টিতে একবার ফোন পরক্ষণে আশেপাশে তাকালো।
সকলে যে যার মত ব্যস্ত থাকায় চটজলদি সেখান থেকে সরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল সে। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসলো গভীর পৌরুষ কণ্ঠস্বর,,
—’বউ সেজেছেন ম্যাডাম?
তিহু লাজুক হাসলো, ক্ষনকাল পর আনমনে বলল,,—’হু, আপনার বউ।
তিহুর কথাটা যেন নীলের মরুভূমির ন্যায়ের ধুধু মনখানা তে এক পশলা শ্রাবণের অমোঘ বর্ষণের ন্যায় পতিত হলো। জিজ্ঞাসু পুলকিত কণ্ঠে সে বলল,,
—’কি বললেন? আবার বলুন শুনতে পাইনি!
তিহু খুব ভালো করেই বুঝলো নীলের এমন কথার কারণ। লজ্জায় কণ্ঠস্বর আড়ষ্ট হয়ে আসতে চাইলেও তা সামাল দিয়ে তিহু ফের বললো,,
—’আপনার বউ!
নীল চোখ বুঁজে নিল আবেশে। বুকের বাঁ পাশে হাতে রেখে গভীর শ্বাস ত্যাগ করল। ফোনের ওপাশ থেকে তিহুর সেই আধো-লাজুক কণ্ঠের স্বীকারোক্তি—’আপনার বউ’—শব্দ দুটো যেন তীরের মতো বিঁধল তার হৃদয়ে।সে মৃদু হেসে গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল,
—’ইউ নো হোয়াট, মাই অর্কিড?ইউ জাস্ট মেড মাই ওয়ার্ল্ড স্টপ ফর এ সেকেন্ড, অ্যান্ড ড্যাম, আই’ম ফলিং ফর ইউ অল ওভার এগেইন!
তিহু লাজুক ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে কলের অপর প্রান্তে। এদিকে কেবিনে নীলের ক্লায়েন্টগুলো হতভাগ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা নীলের দিকে। আসলে নীল এতক্ষণ অফিসের কনফারেন্স রুমে ছিল, সামনে বসে ছিল একদল বিদেশি ডেলিগেট। কিন্তু তিহুর মেসেজ দেখা মাত্র সে কোনো কিছুর পরোয়া না করে সটান উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দায় চলে এসেছে।
ক্লায়েন্টরা জানত দেশীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ আর দায়িত্ববান ব্যবসায়ী নীল । যিনি একা হাতে রাজনীতি আর পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছেন। অথচ আজ কোটি টাকার দামের একটা প্রজেক্ট এর মিটিং ছেড়ে হুট করে তার এমন বাইরে চলে যাওয়া বড্ড বেমানান ঠেকছে তাদের কাছে।
ডেলিগেটদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়েছে।তাদেরই একজন বেশ বিরক্ত হয়ে আইয়াজকে উদ্দেশ্য করে নিচু স্বরে বলল,,
—’এক্সকিউজ মি, মি:আইয়াজ! মিস্টার ওয়াহাজ কি ঠিক আছেন? মিটিংটা কিন্তু খুব ক্রুশিয়াল। আপনি কি একটু তাকে ডেকে আনতে পারবেন?
আইয়াজ কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীলের দিকে তাকাল। নীল তখন ফোনের ওপাশে তিহুর কোনো এক কথায় হালকা হাসছে—যে হাসিটা আইয়াজ খুব কমই নীলকে হাসতে দেখেছে। সে মুচকি হেসে ক্লায়েন্টের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,,
—’দুঃখিত মিস্টার স্মিথ, এই মুহূর্তে স্যারকে ডাকার মত সাহস আমার অন্তত নেই। স্যার এখন এমন একজনের সাথে কথা বলছেন, যার কাছে এই কয়েক কোটি টাকার প্রজেক্ট নেহাতই তুচ্ছ। সোজা কথায় বলতে গেলে, তিনি এখন তার ‘পৃথিবীর’ সাথে কথা বলছেন। আর স্যার যখন তার পৃথিবীর কক্ষপথে থাকেন, তখন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তাকে সেখান থেকে নামানোর সাধ্য কারও নেই। ডাকলে তিনি আসবেন তো না-ই, উল্টো মাঝখান থেকে আমার চাকরিটা নিয়ে নিতে পারেন!
আইয়াজের কথা শুনে ক্লায়েন্টরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল স্তব্ধ হয়ে। নীলের মতন দায়িত্বপরায়ণ আর গুরুগম্ভীর একটা মানুষ ও সামান্য একটা নোটিফিকেশনের দরুন এতটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছুটতে পারে সেটা হয়তো তাদের জানা ছিল না। এদিকে তাদের এমন গুঞ্জন হার নীলের তিহুতে মগ্ন থাকতে দেখে আইয়াজ মনে মনে বলল,
—’ স্যার?প্রেমে পড়লে যে পুরো দুনিয়া ভুলে যেতে পারেন, সেটা আপনাকে আজ না দেখলে হয়তো কক্ষনো বিশ্বাস হতো না আমার।
এদিকে তিহু ফোনের ওপাশ থেকেই বুঝতে পারল আশেপাশে বিদেশি মানুষের গলার আওয়াজ আর আইয়াজের মিনতি মাখা কথা। সে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল নীল কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে আছে। তিহুর গলার স্বরে হঠাৎ-ই শাসনের সুর নামল। সে একটু গম্ভীর হয়ে বলল,,
—’মিস্টার পলিটিশিয়ান?আপনি কি মিটিং ছেড়ে আমার সাথে কথা বলছেন? এটা একদম ঠিক না। আমি জানি আপনি খুব ইম্পর্ট্যান্ট কোনো ক্লায়েন্টের সাথে ছিলেন। এক্ষুনি ফোনে রাখুন আর ভেতরে যান! যতক্ষণ না মিটিং শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ আমার সাথে আর একটা কথাও বলবেন না। যান বলছি!
—’আপনার থেকে বেশি ইমপর্টেন্ট নয়।
—’উফ মিস্টার! আপনি বড্ড কথা বলেন, যান গিয়ে নিজের কাজ করুন।
নীল একটু অবাক হয়ে হাসল। তিহুর এই ছোট ছোট অধিকার খাটানো শাসনগুলো তার ভীষণ প্রিয়। সে আর কথা না বাড়িয়ে বলল,,
—’ওকে মাই লেডি, আপনার নির্দেশ শিরোধার্য। তবে মিটিং শেষ করেই কিন্তু আমি আসছি।
ফোন রেখে তিহু যখন ফিরে এল, তখনই তার চোখ গেল প্রবেশদ্বারের দিকে। তার বিস্ময়ের সীমা রইল না যখন দেখল সেখানে মাহা আর রিশাদ দাঁড়িয়ে! সে কিছুটা পুলক দীপ্ত কণ্ঠে তাদের দুজনের উদ্দেশ্যে বলল,,
—’তোরা!আর এখানে?
মাহা-রিশাদ একে অন্যের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল। ঠিক যতটা তিহুকে চমকে দেবে ভেবেছিল ততটাই চমকে গিয়েছে তাদের প্রিয় সখী। তারা দুজনেই এবার তিহুর দিকে চেয়ে বলল,,
—’সারপ্রাইজ মিসেস ওয়াহাজ খান।
মাহা আর রিশাদকে এই ব্যস্ততার মাঝে দেখে তিহুর মনটা খুশিতে ভরে উঠল। বলা বাহুল্য তাদের দুজনকেই খুব মিস করছিল সে। এদিকে পিহু, রাফা আর সারাও এখন মাহাকে পেয়ে যেন নতুন করে আড্ডার রসদ খুঁজে পেয়েছে। আর রিশাদ যোগ হলো রাওফিনদের দলে।
অন্যদিকে, নীল কনফারেন্স রুমে ফিরে আসতেই আইয়াজ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নীল আবার তার আগের পেশাদারী গাম্ভীর্য নিয়ে নিজের আসনে বসল। মিটিংয়ের শেষের দিকে মিস্টার স্মিথ কৌতূহল সামলাতে না পেরে হেসেই জিজ্ঞেস করলেন,
—’মিস্টার ওয়াহাজ, কিছু মনে করবেন না। কিন্তু মাঝপথে আপনার ওইভাবে চলে যাওয়াটা আমাদের বেশ অবাক করেছে। তখন কি এমন হয়েছিল যে আপনাকে যেতেই হলো?
নীল ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে মিস্টার স্মিথের দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো তিহুর সেই লাজুক কণ্ঠের রেশ। সে অত্যন্ত শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল,,
—’আসলে তখন এক সেকেন্ডের জন্য আমার পুরো দুনিয়াটা থমকে গিয়েছিল। তার এক টুকরা হাসির মূল্য আমার কাছে বহু গুণ বড়। তাই মাত্র এই কয়েক কোটি টাকার চুক্তির জন্য আমি আমার দুনিয়াটাকে থমকে রাখতে পারি না নিশ্চয়ই?
নীলের মুখে এমন নিখাদ প্রেমের কথা শুনে পুরো কনফারেন্স রুম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল,,
—’আই থিঙ্ক দা লেডি ইজ ভেরি লাকি।
নীল তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে বলল,,—’নো আই এম লাকি।বিকজ আই হ্যাভ হার।
কেনাকাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। সকলেই পছন্দের জিনিসপত্র ও ক্রয় করেছেন ইচ্ছামত। একে একে প্রস্থানের সময় হচ্ছে। সকলেই বেরিয়ে যেতেই মাহা পা বাড়াতে গেলেই রাওফিন আটকালো তার পথ। মাহা আশেপাশে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,,
—’হোয়াটস রং রাওফিন? এভাবে পথ আটকে দাঁড়ালে কেন?
—’পুরোটাই তো রং লাভলাইন। তোমার জন্যই তো কিছু কেনাকাটা করা হলো না।
মাহা ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’আন্টিরা তো কিনলো আমাদের সবার জন্য।
—’কিন্তু আমি তো কিনে নি লাভলাইন।
—’উফস রাওফিন সরো তো ঢং করার সময় নয় এখন।
মাহা যখন বেশ বিরক্তিতে রাওফিনের কথাগুলোর জবাব দিচ্ছে তখনই ভেসে আসলো তিহু ছোট চাচী নিশাত মজুমদারের কণ্ঠস্বর,,
—’মাহা মা? তোমরা যাবে না?
মাহা তার দিকে তাকিয়ে প্রত্যুত্তরে কিছু বলার আগেই রাওফিন তার মুখের কথা এক প্রকার কেড়ে নিয়ে বলল,,
—’ কাকিমনি তোমরা এগোয় আমরা আসছি।
নিশাত মজুমদার বরাবরই বাড়ির নবীন গুলার সাথে একটু বেশিই বন্ধুত্বপূর্ণ। সামান্য ইশারাতেই তিনি বুঝলেন রাওফিন এর কথার মানে। তিনি মুচকি হেঁসে প্রস্থান করলেন। এদিকে তিনি চলে গেলেও সেখানে উপস্থিত হলো বাড়ির নবকুড়ি গুলো।রাওফিন মাহাকে নিয়ে খুশি মনে সামনের দিকে যেতে গিয়েও তাদের দেখে থামলো।রাফা দাঁত কেলিয়ে হাসছে।রাওফিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল,,
—’তোরা?
তাজহীর বরাবরের ন্যায় দুষ্টু কন্ঠে বলল,,—’কাকিআম্মু তোমার উপর নজর রাখতে বলেছে।
রাওফিন ভ্রু কুঁচকে বলল,,,—’তোদের কাকিআম্মু কে গিয়ে বল আমার উপর নজর রাখা লাগবে না।
—’ উহু ভাইয়া তাতো হবে না।
ততক্ষণে সেখানে তিহুও এসে হাজির। মাহা লাজুক হেঁসে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চললেও বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে রাখলো রাওফিন।আর তার অমন বাংলার পাঁচের মতো মুখে শব্দ করে হেসে উঠল সবগুলো।
শপিং কমপ্লেক্সের কাছেই ‘দি রয়্যাল ডাইন’ রেস্তোরাঁ। ঝকঝকে আধুনিক আসবাব আর মৃদু ধ্রুপদী সংগীতের মূর্ছনায় চারপাশটা বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। কেনাকাটার বিপুল ক্লান্তি মেটাতে সবাই প্রবেশ করেছে এখানেই।এক বড় টেবিল ঘিরে বসল সবাই—তিহু, মাহা, রাওফিন, রিশাদ আর বাকি সব ছোটরা। মেনু কার্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি আর পছন্দের খাবারের ফরমায়েশ দিতে দিতে আড্ডা জমে উঠল তুঙ্গে।
মাঝে মাঝেই হাসির রোল উঠছে টেবিল জুড়ে। রাওফিন আর মাহার মধ্যকার খুনসুটি থামার নাম নেই। তিহু শান্ত হয়ে সবার কাণ্ড দেখছিল আর মৃদু হাসছিল। ঠিক সেই সমৈ্আয় তার মুঠোফোনটি সশব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে এক অপরিচিত নম্বর দেখে তিহু ভ্রু কুঁচকাল। প্রথমবার ধরল না, দ্বিতীয়বারও না। কিন্তু যখন বারবার একই নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করল, তখন সে কিছুটা বিচলিত বোধ করল।
আড্ডার গোলমালে কিছু শোনা যাচ্ছে না দেখে তিহু আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সবার উদ্দেশ্য করে নিচু স্বরে বলল,,
—’একটা কল আসছে বারবার। তোমরা একটু বসো আমি একটু ওপাশ থেকে কথা বলে আসছি।
বলেই বেরিয়ে গেল সে।
রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে নির্জন করিডোরের এক প্রান্তে গিয়ে তিহু ফোনটা রিসিভ করল। ওপার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শুনতেই তার দুশ্চিন্তার রেখা কপালে স্পষ্ট হয়ে উঠল। কোনো এক অপরিচিত ব্যক্তি তাকে এমন কিছু তথ্য দিল যা শুনে তিহু স্তম্ভিত হয়ে গেল। ফোনের ওপারের কথাগুলো যেন তার বুকের স্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,,
—’এটা কীভাবে সম্ভব? আপনি সত্যি বলছেন?
লোকটি তাকে হুট করে রেস্তোরাঁ থেকে কিছুটা দূরে পার্কিংয়ের পেছনের গলিটায় আসতে বলল। জানালো, সেখানে তার জন্য জরুরি কোনো প্রমাণ রাখা আছে। উত্তেজনায় আর চিন্তায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তিহু কাউকেই কিছু না বলে দ্রুত কদমে সেদিকে পা বাড়াল। তার অবচেতন মন বারবার বলছিল নীলকে একটা ফোন করতে, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে সে সময়টুকুও পেল না।
শপিং কমপ্লেক্সের পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার আর নির্জন। তিহু যখন গলির মোড়ে পৌঁছাল, তখন চারপাশটা অস্বাভাবিক নীরব। হুট করে একটা কালো রঙের ভ্যান তার ঠিক সামনে এসে ব্রেক কষল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেতর থেকে এক সুঠামদেহী পুরুষ নেমে এল।
লোকটি দ্রুত এগিয়ে এসে তিহুর মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করতেই তিহুর বোধোদয় হলো যেন। সে বুঝতে পারল তাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। লোকটি তাকে স্পর্শ করতে আসতেই তিহু আর এক মুহূর্ত দেরি করল না; সর্বশক্তি দিয়ে ডান হাতের মুষ্টি পাকিয়ে লোকটির নাকে সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল।
আকস্মিক এই প্রতিঘাতে লোকটি অপ্রস্তুত হয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। তার নাক ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে সে এক হাত দিয়ে নিজের নাক চেপে ধরল। লোকটা কল্পনাও করেনি এই সাধারণ চেহারার মেয়েটার হাতে এত জোর থাকতে পারে! কিন্তু ব্যথায় সে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। অন্য হাতে পকেট থেকে দ্রুত একটা ক্লোরোফর্ম ভেজানো রুমাল বের করে আনল সে।
রক্তাক্ত অবস্থায়ই সে পশুর মতো হিংস্রতায় তিহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিহু নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু লোকটার পেশিবহুল শরীরের শক্তির কাছে সে পেরে উঠল না। এক ঝটকায় তার মুখ চেপে ধরা হলো সেই রুমাল দিয়ে। তীব্র ঝাঁঝালো সেই গন্ধে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিহুর শরীর নিস্তেজ হয়ে এল। মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করতে শুরু করল, ঝাপসা হয়ে এল চারপাশ।
অচেতন তিহুকে পাঁজাকোলা করে দ্রুত গাড়ির ভেতর টেনে তোলা হলো। লোকটির ফাটা নাক থেকে ঝরা কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়ে রইল পিচঢালা কালো রাস্তায়।মুহূর্তের মধ্যে ইঞ্জিন গর্জে উঠল আর গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে উধাও হয়ে গেল শহরের ব্যস্ত সড়কের ভিড়ে।
কিছুক্ষণ আগে পরিবেশনকৃত ধোঁয়া ওঠা মুখরোচক খাবারগুলো রেস্তোরাঁর টেবিলেই পড়ে রয়েছে অবহেলায়। সময়ের কাঁটা যত এগোচ্ছে, মাহার বুকের ভেতর ধুকপুকানি ততই বাড়ছে। টেবিলের মাঝখানে রাখা জলের গ্লাসে আঙুল দিয়ে ছন্দহীন টোকা দিতে দিতে মাহা হঠাৎ উৎকণ্ঠিত স্বরে বলে উঠল,,
—’দশ মিনিট হয়ে গেল, একটা ফোন ধরতে তিহুর এতক্ষণ লাগে?
মাহার কথা শুনে সাজ্জাদ মেনু কার্ডটা পাশে সরিয়ে রাখল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। চারপাশটা একবার দ্রুত পর্যবেক্ষণ করে সে গম্ভীর গলায় বলল,
—’আসলেই তো, শপিং কমপ্লেক্সের ভেতরে নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকলে ও তো ভেতরেই আসত। বাইরে যাওয়ার তো কথা নয়। মাহা, তুমি কি ওর ফোনে ট্রাই করেছো?
মাহা মাথা নাড়ল,
—’তিনবার করেছি। রিং হচ্ছে কিন্তু তুলছে না। আমার কেন জানি ভালো ঠেকছে না ভাইয়া।
রাওফিন এতক্ষণ মাহার সাথে খুনসুটিতে ব্যস্ত থাকলেও এখন বেশ সোজা হয়ে বসল। তার তীক্ষ্ণ নজর দরজার দিকে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রাগী স্বরে বলল,,
—’আরে ধুর! আমরা এখানে বসে জল্পনা-কল্পনা করছি আর ও একা বাইরে? এই ভিড়ের মধ্যে আজকালকার দিনে কাউকে বিশ্বাস নেই। রাফা, তুই আর পিহু ওয়াশরুমের দিকটা দেখ। আমি আর সাজ্জাদ মেইন এন্ট্রান্সের দিকে যাচ্ছি।
পুরো টেবিলে মুহূর্তেই এক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল। পিহু আর রাফার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। সাজ্জাদ দ্রুত পায়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—’এক্সকিউজ মি, কিছুক্ষণ আগে একটা মেয়েকে কি ফোন কানে দিয়ে এদিকে বের হতে দেখেছেন? পরনে
ডার্ক ব্লু ড্রেস।
কাউন্টারের লোকটি মাথা নাড়ল। পাশের সিকিউরিটি গার্ডটি এগিয়ে এসে বলল,,
—’হ্যাঁ স্যার, একটা মেয়েকে বেশ তাড়াহুড়ো করে পেছনের এক্সিট দিয়ে বের হতে দেখেছি। মনে হলো খুব জরুরি কিছুতে যাচ্ছিলেন।
পেছনের এক্সিটের কথা শুনে রাওফিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে চিৎকার করে বলে উঠল,,
—’পেছনের দিকটা তো পার্কিং আর গলির জঙ্গল! ও ওখানে কেন যাবে? সামথিং ইজ ভেরি রং!
রেস্তোরাঁর ভেতর তখন হট্টগোল শুরু হয়ে গেছে। রিশাদ দৌড়ে ফিরে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,,
—’কোথাও নেই! পুরো ফ্লোর খুঁজে ফেললাম। তিহুর কোনো পাত্তা নেই!
মাহার হাত থেকে গ্লাসটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,
—’রাওফিন, নীল ভাইকে একটা ফোন দাও। আমার হাত কাঁপছে। তিহু… তিহুর কোনো বিপদ হলো না তো?
রিশাদ ধমক দিয়ে উঠল,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫১
—’আজেবাজে কথা বলিস না তো! আর আমরা সবাই সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার ব্যবস্থা করছি। আমাদের চোখের সামনে থেকে তিহু এভাবে হাওয়া হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না!
আশঙ্কার কালো মেঘে ঢেকে গেল আনন্দঘন মুহূর্তগুলো। একদল তরুণ-তরুণীর সেই বসন্তের মেলা যেন পলকেই এক বিভীষিকাময় শীতে পরিণত হলো।
