ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৯
নওরিন কবির তিশা
—‘আ-আন্টি আমি তৃষা। ঐযে কা-কালকে রাতে আপনি যার সাথে কথা বললেন না?আমি সেই।
তৃষার ভয়ার্ত কন্ঠে সম্মুখে থাকা জাহানারা বেগমের হাতে বিদ্যমান ঝাঁটাটা অবহেলায় মেঝের মার্বেল পাথরে পড়ে গিয়ে এক তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল। জাহানারা বেগম বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন।তৃষা ততক্ষণে আর্য দীর্ঘ দেহবয়বের পিছনে গিয়ে লুকিয়েছে।
আর্যর বাবা, আফজাল সাহেব, ড্রয়িংরুমের মাঝখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখের কোণে জল টলমল করছে কাঞ্চিৎ, কিন্তু ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য তখনো অটুট। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকলেন,,
—‘আর্য? তুই… তুই সত্যি এসেছিস বাবা?
আর্য কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল অবনত মস্তকে নিজের অপরাধবোধের ভারে নুয়ে পড়ল। জাহানারা বেগম ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে তৃষার দিকে এক ধাপ এগিয়ে এলেন। নরম কন্ঠে শুধালেন,,
—‘তুমি মাহেরিন নও?
তৃষা ভীত স্বরে বলল,,—‘নাতো।
—‘ তাহলে?
জাহানারা বেগমের এহেন প্রশ্নের জবাবে কিছুটা চুপসে গেলো তৃষা। যথার্থ প্রত্যুত্তর খুঁজতে ব্যর্থ হয়ে বলতে গেলো,,—‘ আমি টুইংকেল এর বা..।
তবে তাকে কথা শেষ করতে দিল না আর্য।ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তৃষাকে সামনে নিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,,
—‘মা, ও তৃষা। আমার ওয়াইফ।
তৃষা বিস্ময়-বিস্ফোরিত নয়নে আর্যর দিকে তাকিয়ে রইল। হৃৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর যেন ড্রাম বাজাচ্ছে। ‘আমার ওয়াইফ’—শব্দ দুটো আর্যর গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত হওয়ার পর ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তৃষা তো বলতে চেয়েছিল ও টুইংকেলের বানি, স্রেফ একজন বন্ধু! কিন্তু আর্যর এই বলিষ্ঠ পরিচয় দান তৃষার সমস্ত যুক্তিকে যেন এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিল।
জাহানারা বেগম নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তৃষার সেই মায়াবী আর নিষ্পাপ মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রইলেন। মাহেরিনের সেই উগ্রতা আর দম্ভের লেশমাত্র নেই এই মেয়েটির মধ্যে। বরং একরাশ স্নিগ্ধতা যেন ওর অবয়ব ঘিরে আছে। জাহানারা বেগম কাঁপা কাঁপা হাতে তৃষার চিবুক ছুঁয়ে ধরা গলায় বললেন,,
—‘তৃষা? তুমিই তৃষা?
তৃষা কিঞ্চিৎ হেসে সম্মতিসূচক মাথা ঝাকালো।হঠাৎ ঘুমন্ত টুইংকেল চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। ঘুমের আবেশে ওর গোলুমলু মুখটা একটু ফোলা, আর চুলগুলো অবিন্যস্ত। ও আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে অবাক হয়ে চারপাশটা দেখল। তারপর আর্য আর তৃষার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে নিজের আধো-আধো বুলিতে কড়া গলায় বলল,,
—‘পাপা! বানিকে নিয়ে তুমি কার সাথে ঝগড়া করছো? আর ওই দাদিয়াটা কেন আমার বানিকে ছুঁয়ে কাঁদছে? তুমি কি আবার বানিকে বকেছো?
আফজাল সাহেব আর জাহানারা বেগম দুজনেই যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো টুইংকেলের দিকে তাকালেন। আফজাল সাহেবের চোখের জল এবার বাধ মানল না। তিনি দুই হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ে দুহাত বাড়িয়ে দিলেন টুইংকেলের দিকে। তাঁর গলার স্বর কান্নার ভারে বুজে আসছে,,
—‘ আমার নাতনি? দাদুন ভাই, এদিকে আসো তো দাদুভাই!
টুইংকেল প্রথমে একটু থতমত খেল। ও বড়দের দিকে একবার দেখল, তারপর তৃষার ওড়নাটা শক্ত করে খামচে ধরল। ও বেশ বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে আফজাল সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,,
—‘তুমি কে? আমার পাপা বলেছে দাদুনরা নাকি অনেক চকলেট আর স্টোরি বুক রাখে। তোমার পকেটে কি চকলেট আছে? না থাকলে কিন্তু আমি তোমার কোলে যাব না, বলে দিলাম!
জাহানারা বেগম এবার প্রশস্ত হাসলেন। আনন্দের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে তাঁর চোখের জলগুলো যেন মুক্তার দানার মতো ঝরতে লাগল। তিনি টুইংকেলকে কোলে তুলে নিয়ে ওর কপালে সহস্র চুমু এঁকে দিয়ে বললেন,,
—‘ আমার সোনাটা! চকলেট কেন, তোমার জন্য তোমার দাদুন পুরো একটা চকলেটের দোকান কিনে রেখেছে। তুমি এসো তো আমার কাছে, আজ তোমাকে একশ একটা রূপকথার গল্প শোনাব।
আর্য এতক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। মাতৃভক্ত ছেলেটির এতদিন পর নিজের মাকে সামনে দেখে বুকটা হঠাৎ হু হু করে উঠছে। এতক্ষণ শান্ত থাকলেও এবার নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়ছে আর্যর। ও জানে মাও ওকে ছুঁতে চাইছে তবে কোন এক অজানা কারণে কাছে আসতে পারছেন না তিনি। তবে এবার আর কোন বাধা মানলো না আর্য একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে বলল,,
—-‘তুমি রেগে আছো মা? মাফ করোনি এখনো।
কথাগুলো বলার সময় ওর কন্ঠটা ধরে আসছিল। জাহানারা বেগম চোখের পানি ছেড়ে দিলেন অশ্রু সিক্ত নয়নে ছেলেকে জড়িয়ে কপালে চুমু একে বললেন,,
—’আমি তো তোর উপর কখনো রাগই করিনি বোকা ছেলে।
মায়ের এক একটা দীর্ঘ স্নেহপরশে আর্য আবদ্ধ হচ্ছে। তৃষা মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে, টুইংকেলও চুপিসারে দেখছে বাবা আর দাদিয়ার কান্ড। মায়ের সাথে এক দীর্ঘ বাক্যালাপ শেষ করে আর্য ধীর পায়ে আফজাল সাহেবের সামনে গিয়ে বসল। তাঁকে সালাম করতে গিয়ে আর্যর নিজেরও দুচোখ ভিজে এল। সে ধরা গলায় বলল,,
—‘বাবা, আমি বড্ড দেরি করে ফেলেছি। কিছু বি’ষাক্ত অনুভূতি আমার বিবেককে অন্ধ করে দিয়েছিল। আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি।মাফ করে দিও আমায়।
আফজাল সাহেব আর্যকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিলেন। এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো আগলে রাখা সেই পিতৃস্নেহ আজ আর্যর সমস্ত অপরাধবোধ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। তিনি আর্যর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,,
—‘ভুল তো মানুষই করে রে খোকা। কিন্তু সেই ভুল স্বীকার করে শেকড়ে ফিরে আসাই বড় বীরত্ব। তুই আজ শুধু নিজে ফিরে আসিসনি, তুই আমাদের ঘরের লক্ষ্মী আর এই চাঁদের কণা নাতনিটাকেও নিয়ে এসেছিস। আজ থেকে এই শূন্য বাড়ি আর খাঁ খাঁ করবে না।
তৃষা একপাশে দাঁড়িয়ে এই পুনর্মিলনের দৃশ্যটা দেখছিল। ওর বুকের ভেতরের সবটুকু জড়তা যেন উধাও হয়ে গেছে।
নব প্রভাতের স্নিগ্ধতার ছাপিয়ে এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় মত্ত হয়েছে পুরাতন জমিদারি ধাঁচের এহসান ভিলা নামক খুলনার সুবৃহৎ বাড়ির আঙিনা। পার্শ্ববর্তী বাগান থেকে ভেসে আসা পাখির কিচিরমিচির গুঞ্জনে সবে তন্দ্রা টুটলো তৃষার।আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক বিস্তর বনেদি কক্ষে। শ্বেতপাথরের শীতল মেঝে, বিশাল কাঠের কারুকাজ করা পালঙ্ক আর সিলিংয়ে ঝুলন্ত ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের ঝাড়লণ্ঠন।
কালকের সফর ক্লান্তি আর দীর্ঘ রাত অব্দি জাগার দরুন নিদ্রার সময়কাল দীর্ঘ হয়েছে তার। বাইরে রৌদ্রের প্রখরতা দেখে বেলার পরিমান টা কিঞ্চিৎ আঁচ করতে পারল তৃষা তৎক্ষণাৎ আড়মোড়া ভেঙে ওঠে বসলো বিছানায়। দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক ধ্বনি সকাল দশটার জানান দিচ্ছে, ও দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল।
কিছুক্ষণ পর তৃষা দ্রুত পায়ে তৈরি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল, ওর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে। বাড়ির নতুন পরিবেশে প্রথম সকালে এত দেরি করে ওঠাটা নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তার কানে এল এক প্রাণবন্ত হাসির রোল। ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই তৃষার চোখের সামনে এক অপূর্ব দৃশ্য ভেসে উঠল।
বিশাল কারুকাজ করা সেগুন কাঠের সোফায় আয়েশ করে বসে আছেন আফজাল সাহেব। আর তাঁর কোলের ওপর আধশোয়া হয়ে টুইংকেল মহা উৎসাহে হাত-পা নেড়ে কোনো এক কাল্পনিক যুদ্ধের গল্প শোনাচ্ছে। আফজাল সাহেব পরম মমতায় নাতনির চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর থেকে থেকে হেসে উঠছেন। দৃশ্যটা এতই নির্মল যে তৃষা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে তেলের ছ্যাঁতছ্যাঁত শব্দ আর মশলার ঝাঁঝাল ঘ্রাণ ভেসে এল। তৃষা বুঝতে পারল জাহানারা বেগম সকাল থেকেই ব্যস্ত। সে অপরাধী মুখে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে আফজাল সাহেবের গুরুগম্ভীর অথচ দরাজ কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
—‘আরে মা, উঠে পড়েছো? ঘুম ঠিকঠাক হলো তো? নতুন জায়গা, হয়তো একটু অস্বস্তি হয়েছে তোমার।
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে আফজাল সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাথাটা সামান্য নিচু করে লাজুক স্বরে বলল,
—‘আসলে বাবা, কালকের জার্নিটার পর শরীরটা একটু বেশিই ছেড়ে দিয়েছিল। আমার অনেক আগে ওঠা উচিত ছিল, মা হয়তো একা সব কাজ করছেন…।
আফজাল সাহেব হাত তুলে ওকে আশ্বস্ত করে হাসলেন। তাঁর চোখেমুখে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বেশ রসিকতার সুরে বললেন,
—‘আরে না না! তোমার মায়ের তো আজ ঈদের আনন্দ। চব্বিশ ঘণ্টা রান্নাঘরে থাকলেও ওর ক্লান্তি নেই আজ। তুমি বরং এখানে বসো তো মা। এই বুড়ো মানুষটার সাথে একটু গল্প করো। আর্য তো চিরকালই একটু কম কথা বলা ছেলে, ছোটবেলাটাও ও তো কেবল হুঁ-হ্যাঁ করেই কাটিয়ে দিল। তোমার মুখ থেকে ওর কিছু বদনাম শুনি!
তৃষা অবাক হয়ে দেখল এই গম্ভীর মানুষটি কতটা সহজভাবে তাকে আপন করে নিয়েছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘর থেকে হাতা-খুন্তির শব্দ থামিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন জাহানারা বেগম। কপালে সামান্য ঘাম, পরনে সুতি শাড়ি, কিন্তু চোখেমুখে এক আকাশ তৃপ্তি। তিনি তৃষার বিচলিত মুখটা দেখে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে হাসলেন,,
—‘আরে আর্যর বাবা, মেয়েটাকে সকালেই জেরা শুরু করলে নাকি? দেখছো না ও কতটা অপ্রস্তুত হয়ে আছে! তৃষা মা, তুমি একদম চিন্তা করো না তো। এই বাড়িতে কোনো নিয়ম নেই যে সকালেই তোমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে হবে। আজ আমি আমার মনের মতো করে তোমাদের সবার জন্য রান্না করছি। তুমি বরং তোমার শ্বশুরের সাথে একটু গল্প করো মা।
তৃষা আফজাল সাহেবের পাশের সোফাটায় বসল। আফজাল সাহেব স্নেহের দৃষ্টিতে তৃষার দিকে চেয়ে এক দরাজ হাসি দিলেন। তৃষার জড়তা কাটাতে তিনি বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে বললেন,
—‘জানো মা, এই বাড়িটা দীর্ঘ ছয়টা বছর একদম নিথর হয়ে পড়ে ছিল। আমি আর তোমার মা কেবল দেয়ালের ছবিগুলোর সাথে কথা বলতাম। আজ সকালে তোমার আর টুইংকেলের হাসির শব্দে মনে হচ্ছে প্রাণহীন ইটের পাঁজরে কেউ প্রাণ ফুঁকে দিয়েছে। আর্যর মতো একটা খ্যাপাটে ছেলেকে তুমি সামলাচ্ছো কী করে, সেটাই আমার মাথায় খেলছে না!
তৃষা হেসে ফেলে লজ্জিত মুখে উত্তর দিল,
—‘বাবা, উনি তো সারাক্ষণই ক্যাপ্টেনগিরি করেন। সারাদিন শুধু ‘এটা করো না, ওটা করো না’। ওনার শাসনের চোটে আমার জান যায় যায় অবস্থা!
আফজাল সাহেব হোহো করে হেসে উঠলেন,,
—‘একদম ওর দাদুর মতো হয়েছে! তবে শোনো মা, বাইরের ওই শক্ত খোলসটা দেখে ওকে বিচার করো না। ও ভেতরে ভেতরে বড্ড নরম। তুমি এসেছো বলেই হয়তো আজ ও নিজের শেকড় খুঁজে পেয়েছে। এখন থেকে এই বুড়ো মানুষটার টিম হলো তুমি আর টুইংকেল। আর্য যদি বেশি শাসন করে, সরাসরি আমাকে রিপোর্ট করবে। এই বাড়ির সব অর্ডারের ওপর আমার ভেটো পাওয়ার আছে, মনে রেখো!
তৃষা পরম শ্রদ্ধায় আফজাল সাহেবের দিকে তাকাল। একজন শ্বশুর যে প্রথম দিনেই বাবার মতো এতটা সহজ হয়ে উঠতে পারেন, তা যেন ওর কল্পনাতীত ছিল।
প্রাতরাশের সময় পেরিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজের সময় হয়েছে বলা যায়। টেবিলটা খাবার বাড়া হচ্ছে। সকালে উপস্থিত থাকলেও একমাত্র আর্য অনুপস্থিত। তৃষা কিঞ্চিৎ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে খুঁজতে তৎপর আর্যকে তবে সেটা বড্ড অগোচরে। সকলের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারলেও জাহানারা বেগমকে ফাঁকি দিতে ব্যর্থ হলো তৃষা। জাহানারা বেগম টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে তৃষার উদ্দেশ্যে বললেন,,
—‘আর্য গার্ডেনে।
জাহানারা বেগমের কথায় ধ্যান ছুটলো তৃষার। অপ্রকৃতস্থের ন্যায় সে বলল,,—’আমিতো মানে এমনি।
জাহানারা বেগম কিচেনের উদ্দেশ্যে যেতে যেতে মৃদু হেসে বললেন,,—‘আমিও এমনিই বললাম । গার্ডেন টা বাড়ির উত্তর সাইডে।
জাহানারা বেগমের অর্থপূর্ণ হাসির সামনে তৃষার গাল দুটো আপেলের মতো রাঙা হয়ে উঠল। সে আর বাক্যব্যয় না করে ওড়নাটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চলল বাড়ির উত্তর পার্শ্বে,বাগানের উদ্দেশ্যে।
এহসান ভিলার এই বাগানটি যেন এক টুকরো অরণ্যের রূপকথা। প্রাচুর্যময় সবুজের সমারোহে ঘেরা এই প্রাঙ্গণে রোদ-ছায়ার আলপনা আঁকা। বিস্তৃত বৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় এক মায়াবী নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। মাটির সোঁদা গন্ধ আর বুনো ফুলের তীব্র সুবাসে চারপাশটা আমোদিত। দুপুরের তপ্ত রোদ্দুর গাছের পাতার ফাঁক গলে চুইয়ে চুইয়ে মাটিতে পড়ছে, যা দেখতে অনেকটা সোনালি সুতোর বুননের মতো। কোথাও বেলি ফুলের শুভ্রতা, আবার কোথাও বা রক্তজবার ঔদ্ধত্য।
তৃষা সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছিল। হঠাৎ তার নজরে এল আর্যকে। এক বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আর্য একা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার শ্বেতশুভ্র শার্ট আর কালো ট্রাউজার। সে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিল, সম্ভবত নিজের শেকড়ে ফেরার সেই বিচিত্র অনুভূতিগুলোকেই ডিকোড করছিল সে।
তৃষা চুপিসারে এগিয়ে যাচ্ছিল চঞ্চল পদক্ষেপে। তবে বাগানের ওই দিকটার একটা কোণটায় শিউলিতলার পাশের মাটিটা বড্ড চ্যাটচ্যাটে আর শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল ছিল। অসতর্কভাবে বেখেয়ালি মনে তৃষা পা বাড়াতেই অনুভব করল মাটির ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে,
—‘আআহ্!
ক্ষীণ এক আর্তনাদ করে তৃষা যখন পেছনের দিকে আছড়ে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই একজোড়া লৌহকঠিন হাত ওকে শূন্যে থাকতেই হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে টেনে নিল। আর্যর বলিষ্ঠ বুকের সাথে তৃষা সজোরে ধাক্কা খেয়ে থমকে দাঁড়াল। ভয়ে তৃষা আর্যর শার্টের কলারটা খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
পরমুহূর্তেই আর্যর সেই অতি পরিচিত তপ্ত নিঃশ্বাস ওর কপালে আছড়ে পড়ল। আর্য ওকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর অথচ উদ্বেগময় স্বরে ধমক দিয়ে উঠল,,
—‘আর ইউ ক্রেজি তৃষা? আপনার কি দুপায়ে হাঁটার কোনো সমস্যা আছে? নাকি যেখানেই যান, সেখান থেকে ভূমিশয্যা নেওয়ার শপথ করে বের হন?
তৃষা পিটপিট করে চোখ মেলে দেখল আর্যর চোখে সেই মরণাত্মক রাগ আর এক আকাশ চিন্তা। সে আমতা আমতা করে বলল,
—‘আমি… আমি আসলে আপনি কি করছেন সেটা দেখতে আসছিলাম। মাটি যে পিচ্ছিল ছিল সেটা বুঝিনি।
–‘বুঝবেন কী করে! আপনার মগজে তো সারাক্ষণ দুষ্টামি ঘোরে। স্যরি টু সে তৃষা বাট ইউ আর মোর চাইল্ডিশ দ্যান টুইংকেল। এই যে এক হাত এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি, এর মধ্যে যদি আজ আবার আছাড় খেয়ে কোনো হাড় ডিসপ্লেসড হতো, তবে কি হতো?
তৃষা আরজের এতগুলো কথা শুনে মুখ কুঁচকে গোমড়া করে বলল,,
—‘আপনি কি জানেন আপনি অনেক বেশি রুড!
—‘ইয়েস আই নো আ’ম রুড বাট নট এ ফর এভরিঅন।
আর্য কিছুটা নিচুস্বরে কথাটা বলায় তৃষা সঠিক বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মেলে বললো,,
—‘কি বললেন?
—‘নাথিং। আর এখনো তো সকালের খাবার খাননি তার মানে মেডিসিন টাও নেন নি নিশ্চয়ই।সো কুইক খাওয়ার পরপরই মেডিসিন আছে আপনার।
সে দ্রুত ভিলার দিকে এগিয়ে যেতে ফের আরেকবার পিছন ঘুরে তাকালো,,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৮
—‘কি হলো এখনো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? দ্রুত আসুন।আর লিসেন, এই গার্ডেনে এরপর থেকে একা পা বাড়ালে কিন্তু আপনাকে হুইলচেয়ারে বন্দি করে রাখব। ডিক্টেশনটা ক্লিয়ার?
—‘হু।
—‘তো চলুন।
আর্য সোজা হাঁটা শুরু করল।তৃষা আর্যর পিছন পিছন যেতে যেতে ঠোঁট উল্টে বিড়বিড়িয়ে বলল, —‘হনুমান এক একটা!
