Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২১

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২১

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২১
নওরিন কবির তিশা

ধোঁয়াটে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ।সকাল থেকেই বইছে কিঞ্চিৎ ঝড়ো হাওয়া তবে বৃষ্টির বালাই নেই কোথাও। তবে এই মেঘলা দিনেই ব্যতিব্যস্ত সমগ্র এহসান ভিলা। সিলেট থেকে আসা অতিথিদের পদচারণায় মুখরিত অঙ্গন। আর্যর মাতামহ কুলীন বংশের মানুষ।

আর্যর বড় মামা মোজাম্মেল হক অত্যন্ত রাশভারী মানুষ; তাঁর বড় ছেলে শাহরিয়ার ২৬ বছর বয়সী চৌকষ যুবকটি পেশায় স্থপতি এবং ছোট মেয়ে অষ্টাদশী রাইসা সদ্য কলেজে পা দিয়েছে। মেজো মামা মাজহারুল হকের দুই কন্যা বড়জন যেমন রূপবতী,ছোটজন তেমনি দুরন্ত। দুজন পিঠোপিঠি বোন হওয়ায় বড় মেয়ে অহনার বয়স ২২ আর অরুর বয়স ২০.ছোট মামা মকবুল হোসেনের তিন সন্তান এখনো শৈশবের গণ্ডি পেরোয়নি।
অন্যদিকে আর্যর বড় খালার বিয়ে হয়েছে মৌলভীবাজারে, তাঁর একমাত্র কন্যার বিবাহ হয়ে গেছে। ছোট খালা থাকেন সুনামগঞ্জে, যাঁর দুই পুত্র এখনো বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেনি।আজ এহসান ভিলার বৈঠকখানায় রূপালি তশতরিতে চা-নাশতার পর্ব যখন তুঙ্গে, তখনই মূল প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন বড় মামা মোজাম্মেল হক।
মেজো মামা মাজহারুল হক আর মেজো মামি আসমা বেগমও আজ বিশেষ এক প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। শাহরিয়ারের সাথে অহনার পরিণয় সূত্রের বন্ধন দৃঢ় করতেই তাঁদের এই তড়িঘড়ি আগমন। পারিবারিক এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের লগ্ন স্থির হয়েছে আগামী মাসে। আর এখন মাসের মাঝামাঝি বিদ্যমান।
বৈঠকখানায় তখন চাঁদের হাট বসেছে। সিলেটি টানের কিঞ্চিৎ রেশ আর পারিবারিক আড্ডার গুঞ্জনে এহসান ভিলা আজ যেন উৎসবের রঙে রঙিন। মোজাম্মেল হক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জাহানারা বেগমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা স্বরে বললেন,

-‘বুঝলি জাহানারা, শাহরিয়ার আর অহনার এই বিয়েটা কিন্তু আমাদের আব্বার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল। দুই ভাইবোনের ছেলেমেয়ের মিলন হবে, এর চেয়ে খুশির খবর আর কী আছে?তাই বিয়েটাও সামনের মাসের ১০ তারিখেই ঠিক করি, কী বলিস?
মাজহারুল হক পাশ থেকে সায় দিয়ে বললেন,
-‘একদম ঠিক। আমরাও চাই শুভ কাজটা দ্রুত সেরে ফেলতে। এজন্যই বলছিলাম আপা তুই যদি কালকেই আমাদের সাথে যাস তাহলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয় আম্মাও তোর কথা বলে আর এখন তো আর্যও এসেছে।
জাহানারা বেগম সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন,,

-‘আচ্ছা বেশ যাব না হয়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রান্নাঘর থেকে বড় এক তশতরিতে জুসের গ্লাস আর নাস্তা নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল তৃষা। ওর ডান হাতটা এখনো পুরোপুরি শক্ত হয়নি, তবুও চঞ্চল মনে সবার সেবা করতে ও মরিয়া। বড়দের কথায় তাল মেলাতে মেলাতে ও মেজো মামি আসমা বেগমের কাছাকাছি পৌঁছাল।
আসমা বেগম তখন তাঁর নতুন টাঙ্গাইল শাড়ির আঁচল ঠিক করতে ব্যস্ত ছিলেন। তৃষা ট্রে-টা নামাতে গিয়ে হঠাৎ কার্পেটের কোণায় ওর পা টা একটু মচকে গেল। টাল সামলাতে না পেরে হাতের ট্রে-টা কিঞ্চিৎ হেলে পড়ল।
-‘ ওমা! এ কী করলো!

তড়িৎ আর্তনাদে আসমা বেগম লাফিয়ে উঠলেন। স্ট্রবেরি জুসের কয়েক ফোঁটা টপ টপ করে ওনার দামি শাড়ির হাতায় আর বুকের কাছে লেপ্টে গেল। পুরো ঘর যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তৃষা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ট্রে-টা টেবিলের ওপর রেখে জিভ কাটল। ওর মুখটা এক লহমায় পাংশুটে হয়ে গেল।
-‘ অ-অত্যন্ত দুঃখিত মামি! আমি আসলে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম…
আসমা বেগম মুখটা বিকৃত করে শাড়ির ওপর হাত বুলিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,,
-‘ জাহানারা আপা! একি মেয়ে এনেছেন ঘরে? একটা জুস দেওয়ার ক্ষমতা নেই যার, সে সংসার সামলাবে কী করে? আমার শাড়িটার বারোটা বাজিয়ে দিল! কাজকর্মে তো বিন্দুমাত্র শ্রী নেই, একদম আনাড়ি! আর্যর মতো ছেলের সাথে কার বিয়ে দিলেন আপা, এ তো দেখছি নিজের পা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে!
আসমা বেগমের এই কড়া কথাগুলো তীরের মতো তৃষার বুকে বিঁধল,ও নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এল আর্য। ও সম্ভবত সবটাই শুনেছে। আর্যর মুখটা থমথমে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি বড্ড শান্ত।ও সরাসরি তৃষার পাশে এসে দাঁড়াল। তৃষার কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত গম্ভীর অথচ স্পষ্ট স্বরে আসমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

-‘ মামি, শাড়ির দাগ কিন্তু সাবানে উঠে যায়, কিন্তু মানুষের সম্মানবোধ একবার দাগি হলে তা আর ধোয়া যায় না। তৃষা আপনার শাড়িটা নষ্ট করতে চায়নি, ওটা স্রেফ একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। আর ও কতটা আনাড়ি বা কতটা দক্ষ, সেটা বিচার করার জন্য ওঁর স্বামী হিসেবে আমি একাই যথেষ্ট। আপনারা এখানে মেহমান হয়ে এসেছেন, আনন্দ করতে এসেছেন। আশা করি ছোটখাটো বিষয়ে কটু কথা বলে এই সুন্দর পরিবেশটা আর তেতো করবেন না।
আর্য এবার তৃষার দিকে ফিরল। ওর কণ্ঠস্বরটা এবার একটু বেশিই মোলায়েম, সবাইকে শুনিয়ে ও তৃষার উদ্দেশ্যে বলল,

-‘ আর তৃষা? তুমি এখানে কেন? তোমাকে কিছু করতে বলা হয়েছে? যাও গিয়ে রেস্ট নাও ইউ আর সিক।অ্যান্ড ডোন্ট এভার থিঙ্ক ইউ’র অ্যালোন ইন দিস। আই’ম রাইট হিয়ার উইথ ইউ, অলওয়েজ।
আর্যর বলিষ্ঠ উত্তর শুনে আসমা বেগম চুপসে গেলেন। বড় মামা মোজাম্মেল হক পরিস্থিতি সামাল দিতে বললেন,,
-‘ আরে বাদ দাও তো! ছোট মানুষ, ভুল হতেই পারে। আর্য ঠিকই বলেছে। চলো আমরা বিয়ের বিষয়ে আলাপ করি।
তৃষা বিস্ময়-বিহ্বল নেত্রে আর্যর পানে চাইল সে দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতার প্লাবন আর নির্ভরতার এক অবর্ণনীয় আবেশ মিলেমিশে একাকার। ও হয়তো ভাবতে পারিনি আর্য ওকে এভাবে সঙ্গ দিবে।অতঃপর আর্যর অভয়বাণী হৃদয়ে মেখে, অবনত মস্তকে ধীর চরণে ও দুই তলার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করল।

সমগ্র মধ্যাহ্ন জুড়ে চলেছে বর্ষণের প্রবল দাপট। ধরিত্রী যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে অবগাহন করছে।সন্ধ্যা নামার কিছুকাল পরেই বৃষ্টির সেই উন্মত্ততা স্তিমিত হয়ে এল।দ্যুলোক গাত্র হতে ঝরা অবিরল ধারা এখন মৃদু ঝিরঝিরে পবনে রুপ নিয়েছে সেথায় এখন কেবল অলস মেঘের আনাগোনা। ভেজা পিচঢালা পথ আর গাছগাছালির ডগা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়া জলবিন্দুরা জানান দিচ্ছে, এক পশলা ঝড়ের অবসান হয়েছে। শান্ত ধরণী এখন নিস্তব্ধতার চাদর মুড়ি দিয়ে রজনীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
তৃষা ব্যালকনিতে বসে বৃষ্টিস্নাত পরিবেশ উপভোগে ব্যস্ত। ঝিরিঝিরি বাতাস ওর এক গুচ্ছ কেশ নিয়ে অবাধ্য খেলায় মত্ত হয়েছে। আর সেগুলোই থামানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছে ও। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসা পৌরুষ পদধ্বনিতে পিছনে ঘুরে তাকালো ও। আর্য ভেতরে ঢোকার আগে একবার দরজায় টোকা দিতে চেয়েছিল কিন্তু তৃষা তাকাতেই ও সেটা না করে সরাসরি রুমে প্রবেশ করল।
তৃষা ওকে দেখে তৎক্ষণাৎ ভিতরে ঢুকতে গিয়ে আবারো হোঁচট খেয়ে পড়তে গেল তবে এবার আর পরলো না দ্রুত পদক্ষেপে আটকে ধরলেও জানলার শিকটা। আর্য এক ঝলক গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকালো। তৃষার মনে হলো এই বুঝি বকবে লোকটা। কিন্তু এবার আর সেটা ঘটলো না বরঞ্চ আর্য ভরাট কণ্ঠে বলল,,

-‘ রেডি হয়ে নিন। আমরা বের হবো।
তৃষা অবাক হলো।এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবে ওরা? ও প্রশ্নাত্নক দৃষ্টি মেলে বলল,,
-‘ কোথায় যাব?
-‘ শপিংয়ে।
-‘ মানে?
আর্য তাকাতেই ও ফের আমতা আমতা করে বলল,-‘ না মানে এখন কেন?
-‘ আমি বলছি তাই। আর এমনিতেও কাল সকালে জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হব আমরা। কেনাকাটা করার সময় পাবো না আর তাছাড়া আপনার তো এনাফ ড্রেস নেই বোধহয়।
তৃষা ভ্রু গোঁটায়। পর্যাপ্ত পোশাক নেই মানে। এইতো সেদিনও এক গাদা খানিক পোশাক কিনে দিল আর্য ওকে। আবার এক্ষুনি! ও বিরোধিতা করতে গিয়ে বলে,
-‘ আরে সেদিনই না কতগুলো শপিং করলাম! এখন আবার..!
তাকে কথা শেষ করতে দিলো না আর্য বেশ ধমকের স্বরে বলল,
-‘ বড্ড বেশি কথা বলেন আপনি। রেডি হতে বলেছি রেডি হয় নিন।
তৃষা মুখ কাঁচুমাচু করে তাকায়। এবার আর প্রতিবাদ করে না। আর্য আর কিছু না বলে রুম থেকে বের হতে উদ্যত হয়। প্রায় চলে গিয়েছিল দরজার চৌকাঠ বেরোবে ঠিক ততক্ষণই তৃষা ওকে পিছু ডেকে বলে,,

-‘ এইযে শুনুন?
আর্য ঘুরে তাকায়,-‘ হুম?
-‘ টুইংকেল কোথায়? না মানে ও যাবে না?
-‘ না বৃষ্টির ভিতর ওকে নিব না।
-‘ এ মা সে কি? কেন? ও আচ্ছা বৃষ্টির জন্য তো।
-‘ হুম।
-‘ আচ্ছা।
কথা শেষ করে, আর্য যেই না বের হবে আবারো তৃষা ওকে ডাকলো,
-‘ আচ্ছা শুনুন?
আর্য ফের ঘুরে তাকায়।
-‘ ওকে না নিয়ে গেলে কান্নাকাটি করবে না।
-‘ না, ও ওর দাদিয়ার কাছে থাকবে।
-‘ আপনি বলেছেন ওকে?
-‘ হুম।
-‘ আচ্ছা!
আর্য এবার প্রস্থান প্রস্তুত। দ্রুত বের হয়েই গাড়ি বের করবে ও। কিন্তু ওই যে আবারো ডাকলো তৃষা ওকে,

-‘ শুনুন না?
আর্য আবারো ঘুরে তাকালো। তবে এবার কিঞ্চিৎ ভ্রু গোঁটানো। এদিকে বারবার ডাকায় কিছুটা ইতস্তত তৃষা নিজেও। জোরপূর্বক হেসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে ও। কিছু বলার আগেই আর্য ওরদিকে এগিয়ে আসলো। তৃষা ভাবল এই বুঝি লোকটা ধমক দেয়। তবে এবার আর তেমন কিছুই হলো না। আর্য সোজা এগিয়ে এসে বিছানার উপর বসে বলল,,
-‘ বলুন? আগে আপনার সব কথা শুনি। তারপরে যাব না হয়। একে একে সব কথা শেষ করবেন আপনি। দেখি ঝুলিতে কত কথা জমা আছে।
আর্যর এমন অতর্কিত শান্ত আত্মসমর্পণে তৃষার হৃদস্পন্দন এক লহমায় অবাধ্য হয়ে উঠল; ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর কম্পিত ওষ্ঠাধরে এক লাজুক বিহ্বলতা খেলে গেল।আর্যর এই প্রশান্ত ভঙ্গি দেখে তৃষা বড্ড অপ্রস্তুত বোধ করল। ও ওড়নার কোণটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে আলতো হেসে বলল,

-‘ ইয়ে মানে আমি বলছিলাম।
-‘ হুম বলুন? শোনার জন্যই তো বসে আছি।
-‘ আসলে…!
-‘ হুম?
তৃষা এবার সমস্ত সাহস এক লহমায় সঞ্চয় করে বলেই ফেলল,,
-‘ আচ্ছা আপনি আবার আমাকে আপনি করে কেন বলছেন?
-‘ মানে?
-‘ না মানে একবার আপনি একবার তুমি শুনতে কেমন জানি লাগে।
আর্য চোখ সরু করে বলল,-‘ তাহলে এখন সলিউশন কি?
-‘ অলওয়েজ তুমি করে বলবেন।
-‘ হুম?
হঠাৎ মুখ ফোসকে এমন কথা বলে নিজেও কিছুটা বিভ্রান্ত তৃষা। ওর অস্বস্তি দূর করতে আর্য তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল, বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

-‘ দ্রুত আসুন। কুইক।
ও বেরিয়ে যেতেই তৃষা কোমরে হাত বেঁধে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-‘ মিস্টার খাইস্টাউদ্দিন কোথাকার! স্বাভাবিক কথার ভিতরে সিরিয়াসলেস নিয়ে চলে আসতে হয়!
“*
বৃষ্টিধৌত খুলনার রাজপথ তখন এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। পিচঢালা কালো পথের বুকে ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো পড়ে এক দীর্ঘ ছায়া-বিলাসের সৃষ্টি করেছে। আর্যর গাড়িটি যখন শিববাড়ী মোড় পেরিয়ে নিউ মার্কেট অভিমুখে ছুটছে, তখন চারপাশের বাতাসে ভেজা মাটির সেই সোঁদা গন্ধ আর কামিনী ফুলের মৃদু সুবাস এক অপার্থিব আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বাজারের আধুনিক বিপণিবিতানগুলোর কাঁচের দেওয়ালে বৃষ্টির শেষ বিন্দুগুলো তখনো মুক্তোদানার মতো জমে আছে, যা নাগরিক জৌলুসের মাঝেও এক স্নিগ্ধ বিষণ্ণতা ফুটিয়ে তুলেছে। বর্ষণ-পরবর্তী এই নিস্তব্ধ শহরে জনসমাগম আজ কিঞ্চিৎ বিরল হলেও,শপিং মলের উজ্জ্বল আলোকসজ্জায় তৃষার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড়। আর্য অত্যন্ত শান্ত পায়ে ওর পাশে হাঁটছে। ভিড় এড়াতে আর্য বারবার তৃষাকে নিজের বাহুর ঘেরাটোপে আগলে রাখছে, যাতে কেউ ধাক্কা না দেয়।
একটি নামী পোশাকের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আর্য ভেতরে প্রবেশ করার ইশারা করল। সেলস গার্ল এগিয়ে আসতেই আর্য নির্বিকার গলায় বলল,

-‘ উনাকে লেটেস্ট ডিজাইনের কিছু শাড়ি আর সালোয়ার কামিজ দেখান। কালার যেন একটু সলিড আর এলিগ্যান্ট হয়।
তৃষ আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। সেলস গার্লটা বিনম্র হেসে ওকে নিয়ে ভিতরে গেল।
সেলস গার্ল যখন একের পর এক জমকালো শাড়ি আর সালোয়ার কামিজ আর বাহারি পোশাকের পসরা মেলে ধরছিল, তৃষা তখন দামের ট্যাগ দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠছে। ও আর্যর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-‘এই যে মিস্টার, আপনি কি ব্যাংক লুট করে এসেছেন? একটা সাধারণ কামিজের দাম যা দেখাচ্ছে, তাতে আমার পুরো মাসের পকেট মানি চলে যাবে। চলুন এখান থেকে!
আর্য নির্বিকার ভঙ্গিতে একটি গাঢ় ল্যাভেন্ডার রঙের জর্জেট কামিজটা পরখ করতে করতে বলল,
-‘ ব্যাংক লুট করতে হয়নি, নিজের উপার্জিত টাকা খরচ করছি। আর বেশি কথা না বলে, জাস্ট পিক হোয়াট ইউ লাইক।
তৃষা ঠোঁট উল্টে বলল,,

-‘ বললেই হলো? আপনি তো আমাকে পুরো ফ্যাশন প্যারেডে নামিয়ে দিচ্ছেন!
আর্য তৃষাকে কিছু না বলে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে নিজের ব্ল্যাক কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে সেলস গার্লকে নির্দেশ দিল,
-‘ শুনুন, এই ল্যাভেন্ডার জর্জেট আর ব্ল্যাক সিকুয়েন্সটা ছাড়াও ওই যে কর্নারে রাখা নেভি ব্লু পিওর সিল্কের শাড়িটা, কাঞ্চিপুরাম স্টাইলের ওটা আর ওই পিচ কালারের হ্যান্ড-এমব্রয়ডারি করা থ্রি-পিসটাও প্যাক করুন।
তৃষা এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে আর্যর হাতের ওপর হাত রেখে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
-‘ থামুন! আপনি কি এই পুরো দোকানটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন? একটা নেভি ব্লু সিল্কের দামই তো চব্বিশ হাজার টাকা! আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?
তবে আর্য ওর কথার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না বরং বেরিয়ে যেতে যেতে সেলস ম্যানের উদ্দেশ্যে বললো,,
-‘ সবগুলো হোম ডেলিভারি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
ব্যাস বেরিয়ে গেল ও আর পেছনে ফুঁসতে ফুঁসতে এক পর্যায়ে বেরিয়ে গেল তৃষাও।

তবে কেনাকাটার পর্ব সেখানেই শেষ হলো না। আর্য যেন আজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তৃষাকে আপাদমস্তক বদলে দিতে। জুতো থেকে শুরু করে ম্যাচিং পার্স—কিছুই বাদ গেল না। এরপর আর্য ওকে নিয়ে ঢুকল এক অভিজাত জুয়েলারি শপে। কাঁচের শো-কেসে রাখা স্বর্ণ আর হীরের অলঙ্কারের ঔজ্জ্বল্যে তৃষা এক নজরেই বুঝে নিল, এখানে পা রাখা মানেই বিপত্তি। ও বেশ সতর্কভাবে আর্যর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আর্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ওকে থামিয়ে দিল,
-‘ কোথায় যাচ্ছেন? এদিকে আসুন।
তৃষা বিড়বিড় করে বলল,
-‘ আসলে আমার কোনো গয়নার প্রয়োজন নেই। যা কেনা হয়েছে, তা দিয়েই তিন চারটে বিয়ে বাড়ি অনায়াসেই পার করে দেওয়া যাবে। চলুন এবার ফিরে যাই।
আর্য কোনো উত্তর দিল না। ও সরাসরি কাউন্টারের সেলসম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলল, ,
-‘ সিম্পল ডায়মন্ডের কিছু কানের দুল আর একটা স্লিক নেকপিস দেখান। খুব বেশি জমকালো হবে না, কিন্তু রুচিশীল হতে হবে।

সেলসম্যান বেশ কয়েকটা ট্রের পসরা সাজিয়ে ধরল। তৃষা পাশ থেকে বারবার না করার ইশারে করলেও আর্যর দৃষ্টি ছিল স্থির। সে অত্যন্ত সূক্ষ্ম চোখে প্রতিটি নকশা পরখ করছিল। হঠাৎ ওর নজর কাড়ল একটি অতি সাধারণ অথচ অসম্ভব মার্জিত ডায়মন্ডের লকেট—যার ঠিক মাঝখানে একটি নীলকান্ত মণি সমুদ্রের গভীরতার ন্যূ নীল হয়ে আছে।
আর্য ইশারায় তৃষাকে কাছে ডাকল। তৃষা কাছে আসতেই আর্য কোনো ভূমিকা ছাড়াই লকেটটি হাতে নিয়ে তৃষার গলার কাছে ধরল। ওর ঠান্ডা আঙুলের ছোঁয়া তৃষার ত্বকে লাগতেই ও আড়ষ্ট হয়ে গেল।তৃষা বাধা দেওয়ার স্বরে বলল,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২০

-‘ দেখুন, এসবের কোনো মানে হয় না। আমি এত দামি জিনিস সামলাতে পারব না।
আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে লকেটটা রেখে দিয়ে বেশ ভারি গলায় বলল,,
-‘ সামলানোর দায়িত্ব আপনার নয়, ওটা আমার। আর আমি যেটা দিচ্ছি সেটা নিতে শিখুন।
তৃষা আর কোন কথা বলতে পারল না। নিশ্চুপ নির্বাক ভঙ্গিমায় চেয়ে রইল আর্যর দিকে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২২