Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৫

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৫

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৫
শানজানা আলম

ইনানি ছাড়িয়ে আরো কিছু দূরে রিসোর্ট। পাটুয়ারটেকেরও পরে, লাল কাকড়া বীচের কাছে, আশেপাশে আর কোনো কিছুই নেই, এখানে তেমন গেস্ট আসে না মনে হয়, খাওয়া দাওয়া বলতে বলেছিল কথা বলে ব্যবস্থা করতে হবে।
একপাশে সমুদ্র আরেক পাশে পাহাড়, মাঝখানে রিসোর্ট। ছোটো ছোট পড হাউজ।
সাগরলতার বেগুনি ফুলে রাস্তার পাশ ভরে গেছে, সমুদ্দুরের হাওয়া গায়ে লাগতে এহসানের ক্লান্তি কাটতে শুরু করেছে।
রুমটাও একদম সামনে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে।
রুমে ব্যাগটা রেখে এহসান ওয়াশরুম চেক করল, ঠিকঠাক আছে।
তারপর বের হয়ে রিসিপশনে গেল খাওয়ার ব্যবস্থা করতে।
ম্যানেজার ছেলেটা খুবই আন্তরিকতা দেখালো।
রুম পছন্দ হয়েছে স্যার?
এহসান বলল, হ্যা, সুন্দর। আশেপাশে দোকান পাট নেই?
আছে চায়ের দোকান, পাহাড়ি কলা নারকেল পাওয়া যায় এমন৷ বড় দোকান কিছু পাটুয়ারটেকের দিকে আছে, আর একটু সামনেই তো রয়েল টিউলিপ, অটো থাকে সব সময়ই, আপনি যে কোনো সময় যেতে পারবেন।
এহসান বলল, খাওয়ার ব্যবস্থা কি করবেন?

স্যার, আসলে আমাদের যারা গেস্ট আসে, দেখা যায়, দিনে তো কেউ থাকেই না। অর্ডার করলে আমাদের বাবুর্চি রেডি করে দেয়। এমনিতে রেস্টুরেন্ট সারাক্ষণ ওপেন থাকে না।
আচ্ছা। আমি তিন বেলাই খাব, আপনারা একটা মেনু সেট করে ব্যবস্থা করে দিয়েন। প্রায় সাত দিন থাকছি।
স্যার সব বেলায়ই খাবেন? – ম্যানেজার অবাক হলো।
হুম, আমি কোথাও যাব না, এখানে আসেপাশেই থাকব।
আচ্ছা ঠিক আছে স্যার, আমি ব্যবস্থা করছি, আরেকটা গ্রুপ এসেছে, ফ্যামিলি। ওনারাও রান্নার ব্যবস্থা করতে বলেছেন, তাই অসুবিধা হবে না।
মেনুটা আপনি দেখে দিয়েন।
এহসান বলল, একদম স্বাভাবিক বাংলা খাবার, ভাত ডাল ডিম মুরগি, যে কোনো মাছ, যেটা এভেইলাবল থাকবে।
ওকে স্যার, আপনি ফোন নম্বরটা লিখে দিন, আমি কনফার্ম করে নিব।
এহসান বের হচ্ছিল। কয়েকজন মহিলা, কমবয়েসী কয়েকটা মেয়ে, স্কুলের পরা ছেলে এমন একটা গ্রুপ ঢুকলো।

এহসান বুঝতে পারলো, এদের কথাই বলেছে রিসোর্টের ম্যানেজার।
এহসান হাঁটতে বের হলো, বীচে। মাছ ধরা দেখলো কিছুক্ষণ। পা ভিজিয়ে হাঁটল। ভালো লাগছে, বিশাল জলরাশির সম্মুখে কষ্টগুলো ক্ষীণ মনে হচ্ছে।
বীচ থেকে উঠে রাস্তার পাশে ডাব কিনলো, এখানে দামটা তুলনামূলক কম। এতদূরে তেমন কেউ আসে না, পাটুয়ারটেক অবধি এসে থেমে যায়। ভীষণ নিরিবিলি।
এহসান অথৈকে ফোন করতে চাইল তবে এখানে নেট ভালো নয় বোধহয়, দুই তিনটা দাগ দেখাই যায় না।
ঘন্টাখানেক বাইরে থেকে এহসান ফিরলো। শাওয়ার নিয়ে ঘুমাবে কিছুক্ষণ। এই রিসোর্ট পছন্দ করার কারন লো প্রাইস, এত কমে নিরিবিলি জায়গা, আর কোথাও মিলবে না কক্সবাজারে।

রিসোর্টে ঢোকার সময় দেখলো ওই গ্রুপের সবাই বের হচ্ছে। হইচই করতে করতে। এহসানের মনে হলো, তারও একটা সুন্দর জীবন হতে পারতো। তবে এখনো কি পারে না! অথৈ যদি , নাহ অথৈ কে নিয়ে কিছু ভাববে না এহসান। কোনো ভাবেই না৷ সবাই খারাপটাই বলবে!তবে অথৈকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে, শান্ত লক্ষী মেয়ে একটা। নতুন কেউ হলে ওর মতন নাও হতে পারে। তার চাহিদা অন্যরকমও হতে পারে, রিস্ক নিতে ইচ্ছে করে না এহসানের৷ অথৈ কে যদি বলা যেত! কেন বলা যায় না অথৈ কে সহজ ভাবে!
এহসান রিসিপশনের বাইরের কল থেকে পা ধুয়ে সামনের দোলনায় একটু বসল। বেশি বেলা হয় নি এখনো। সময় থমকে আছে মনে হচ্ছে। রোদ ঝলমলে দিন, ভালো লাগছে আসলে।
হ্যালো- এহসান রিসিপশনের সামনের দোলনায় বসেছিল। একটা মেয়ে এগিয়ে এসেছে।
এহসান বলল, আমাকে বলছেন?

হ্যা, আর তো কেউ নেই এখানে।
জি বলুন?
আপনি একা এসেছেন?
হ্যা।
-আচ্ছা গেস্ট এখন আপনি আর আমরা। ওরা বলল আপনার কথা।
ওহ আচ্ছা।
আপনার নাম এহসান, ফর্মে দেখেছি।
হ্যা।
আমি রুবাই, আমার মা, খালা, খালাতো ভাইবোন সবাই সহ এসেছি।
এহসান বলল, ওহ আচ্ছা। তা আপনারা এত দূরে এলেন কেন? শহরে থাকতে পারতেন!
আসলে এটা আমার প্ল্যান আমাদের অনেকগুলো রুম লাগবে, শহরে বাজেট বেশি হয়ে যেত, আর এখানে একটু নিরিবিলিও।

ওহ আচ্ছা। হ্যা, সেটা ঠিক।
মেয়েটা অকপটে বাজেটের কথাটা বলল দেখে এহসানের ভালো লাগল। ভান নেই, সাদামাটা, সাধারণ।
থাকুন তাহলে, আপনি তো একা, দেখা হবে, আমাদের সাথে জয়েন করতে পারেন। একসাথে ঘোরাঘুরি করা যাবে, যদি বিরক্ত না হোন! আমরা বারবিকিউ করব আর লাইভ মিউজিকও এরেন্জ করতে বলেছি। আপনি একা জেনে ইনভাইট করতে এলাম।
এহসান হেসে বলল, না না, বিরক্ত হবো কেন, দেখা হবে নিশ্চয়ই।
হ্যা, লাঞ্চে আমাদের সাথেই বসুন। সবার সাথে আলাপ হয়ে যাবে।
এহসান বলল, ঠিক আছে, আসব।
আপনি ঢাকা থেকে এসেছেন?

হ্যা। আপনারা?
আমরাও, তবে ঢাকার সাইডে, সাভারে থাকি আমরা।
আচ্ছা আচ্ছা।
রুবাইকে বিদায় দিয়ে এহসান নিজের ঘরের দিকে গেল। এতক্ষণ নেটওয়ার্ক ছিল না, অথৈ টেক্সট করেছে কয়েকটা। ওর কি টেনশন হচ্ছে এহসানের জন্য! এহসান কল ব্যাক করল।
-কোথায় ছিলেন? টেক্সট সিন হচ্ছিল না।
-এখানে নেটওয়ার্ক একটু ডাউন।
-ওহ আচ্ছা। পৌঁছেছেন তো ভালো ভাবে?
-হ্যা, একদম ঠিকঠাক। টেনশন করছিলে?
-তা একটু করছিলাম।

এহসান হঠাৎ জানতে চাইল, অথৈ, ঐশি কি ফিরেছে ব্যাংকক থেকে?
অথৈয়ের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এক মুহূর্তে যেন ওদের মাঝখানে একটা প্রাচীর তৈরি হয়ে গেল৷ এতবার কথা আগে কখনো বলা হয় নি আর এর মাঝে আপুর বিষয়টিও সামনে আসে নি।
এহসান যেন বুঝতে পেরেই বলল, আসলে আরো একবার ওকে টাকা পাঠাতে হবে। এজন্য খোঁজ নিচ্ছিলাম, এরেন্জ করতে হবে তো, কক্সবাজারেও তো কতগুলো টাকা বিল হবে।
অথৈ বলল, আমি সিওর না, আমার সাথে কথা হয় নি।
ওকে, নো ইস্যু, সময় হলে নিজেই কল করে টাকা চাইবে।
অথৈ বলল, লাঞ্চ করে নিয়েন সময় মত।
ওক্কে! এখন শাওয়ার নিব, তারপর একটু গা এলিয়ে শুয়ে থাকব, ঘুম পাচ্ছে।
অথৈ বলল, লাঞ্চ মিস হয়ে যাবে, একবারে খেয়ে এসে শুয়ে পড়ুন।
এত খেয়াল রেখো না অথৈ, অভ্যাস হয়ে যাবে।
অথৈ বলল, এটা তো খুব সাধারণ একটা কথা, আপনি না চাইলে আর বলব না।
অভ্যাস ছাড়তে কষ্ট হয় ভীষণ!

অথৈ হেয়ালি করে বলল, আপনার এমন কোনো অভ্যাস হয় নি যেটা ছাড়তে হয়েছে।
এহসান বলল, সেটা অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছ। তবে কি, মনটা বড্ড লোভী হয়ে ওঠে প্রতিদিন, এক বুক তৃষ্ণা, আজলা ভরা জল সামনে কিন্তু জল স্পর্শ করার উপায় নেই!
আপনি কাব্যিক হয়ে যাচ্ছেন!
সম্ভবত, নিজেকে লুকাচ্ছি না।
ঠিক আছে, এখন বাস্তবে ফিরুন, শাওয়ার নিন, লাঞ্চ সারুন তারপরে ঘুমিয়ে উঠে আমাকে ফোন করবেন।
অথৈয়ের লিস্ট দেওয়া দেখে এহসানের মনে হলো, কেউ থাকুক না জীবনে, জোর করার মত, জোর করে নিয়মে বেঁধে ফেলুক জীবনটাকে!
এহসান বলল, ছবি পাঠাচ্ছি, হোয়াটসঅ্যাপ চেক করো।
ফোন রেখে অথৈ ছবি দেখতে বসল। এহসান বেশ কিছু ছবি তুলেছে বীচ ফটোগ্রাফার নিয়ে। রিসোর্টের ছবি, রুমের ছবি প্রায় চল্লিশটা ছবি অথৈ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। অথৈয়ের মা ডাকছেন, দরজায়। অথৈ দরজা খুলে ইতস্তত বোধ করল। যেন নিষিদ্ধ কিছু করছিল।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৪

কার সাথে কথা বলছিলি?
অথৈ বলল, কেউ না।
শুনলাম তো কথা বলছিস!
ওহ, একটা ক্লাশমেট কল করেছিল।
অথৈ ডাহা মিথ্যা কথা বলে দেয় মাকে! কেন বলল, সেটা অথৈ জানে না৷

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৬