ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৫১
শানজানা আলম
এহসান আজ তাড়াতাড়ি ফিরে অথৈ কে বলল, রেডি হও, বাইরে থেকে খেয়ে আসি।
অথৈ বলল, রান্না করেছি তো৷
থাকুক, চলো খেয়ে আসি৷
অথৈ বলল, আজ মনটা ভালো লাগছে না।
সকালে ঐশি ঝামেলা করল বলে?
হুম, মায়ের কথা এড়িয়ে গেল অথৈ।
এহসান বলল, বাদ দাও তো, এটা ওর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। আমার কোনো ইস্যুতে ওর কিছু আসে যায় না, নোংরা লোভী একটা মেয়ে।
অথৈ বলল, আজ একটু নার্ভাস লাগছিল। বুয়াও কথা বলল, বিশেষ করে আপু যে রাত করে কারো সাথে ফিরত, বিষয়টা গার্ড, বুয়া সবাই আলোচনা করত।
হ্যা, আর সে তো লুকিয়ে কিছু করত না। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছিল। অথৈ, আজ বেড রুম চেইঞ্জ করব। মাস্টার বেডে শিফট করব।
অথৈ বলল, আগে কেন এই রুমে ঢুকলে না?
এহসান অথৈকে জড়িয়ে ধরে বলল, আসলে আমি বুঝতে পারি নি, আমাদের কাছে আসা এত সহজ হবে।
চলো, ঘুরে আসি, বাসায় না হয় ডিনার করলাম, মনটা হালকা হবে।
আচ্ছা চলো।
অথৈ তৈরি হয়ে বের হলো৷ এহসান বলল, লিস্ট করেছ?
নাহ, কি লিস্ট করব, সেটাই বুঝে উঠতে পারি নি।
আচ্ছা, তোমার কি লাগবে? সালোয়ার কামিজ, শাড়ি, জুতা,ব্যাগ, এগুলোই তো?
অথৈ বলল, এত খরচ করছ, তুমি না বললে তোমার কিছু ক্রাইসিস চলছে?
এহসান বলল, আমার একটা ল্যান্ড শেয়ার ছিল বড় ভাইয়ার সাথে, সেটা সেল করেছি৷
অথৈ হা হা করে উঠল, কেন! এইসব কেনার জন্য! আমি কি বলেছি এগুলো আমার লাগবে? একটা সলিড প্রোপার্টি নষ্ট করে ফেললে!
প্রোপার্টি গেলে প্রোপার্টি আবার করব কপালে থাকলে, কিন্তু এই সময়ে আমার টাকাটা দরকার। কিছু লোন করা ছিল, এই টাকা শোধ করা দরকার ছিল, কলিগের কাছ থেকে নেওয়া। আর মোহরানা দিতে হয়, এটাই নিয়ম, ঐশির টাকা এজন্যই পরিশোধ করেছি। গোল্ড কিনব এজন্যই।
অথৈ বলল, এখন আমার খুব খারাপ লাগবে, এত ঝামেলা শুধু আমার জন্য!
এহসান বলল, ঝামেলা শেষে তোমাকে পেয়েছি, এটাই কি বড় পাওয়া নয়?
-আমাকেই এত দরকার কেন হলো?
-অথৈ, জানি না সঠিক, সম্ভবত আমার এবসেন্ট মাইন্ড রিস্ক নিতে চায় নি লাইফ নিয়ে। তোমার মত কাউকে চেয়েছি সব সময়, সেটা তো মন জানত! ঐশি সেরকম ছিল না। পুরোটা ওর দোষও না আসলে, আমার মনের মত ঐশি কখনো হয়ে ওঠেনি। ও এরকম নয়।
বাসা থেকে বের হয়ে রিক্সা নিলো এহসান। এলোমেলো কিছুক্ষণ রিকশায় ঘুরল দুজন। অথৈ এর মনটা হালকা হলো। বাসায় ফিরে এহসান বলল, বসো, আজ আমি খাইয়ে দিই!
অথৈ বলল, এত যত্ন হজম হবে না আমার।
এহসান শুনলো না। প্লেটে খাবার নিয়ে বলল, প্রিয় জিনিস যত্নে রাখতে হয়। তাই যত্ন করছি।
অথৈ হাসতে হাসতে বলল, তাহলে চুলও বেঁধে দিও।
ডিনার শেষে এহসান সত্যিই চিরুনি নিয়ে বসে পড়ল সোফায়।
অথৈ, এদিকে এসো তো।
অথৈ বলল, কি হলো!
বসো চুল বেঁধে দিই!
অথৈ হাসিমুখে বসে পড়ল। চুল আঁচড়ে দিতে দিতে এহসান বলল, অথৈ, ভাবছি একটা ছোট করে প্রোগ্রাম করব। আমাদের কিছু ছবিও তোলা হবে, রিসিপশনের মতন। কোনো ফ্যামিলির কাউকে ডাকব না। অফিস কলিগ আর বন্ধু বান্ধব নিয়ে। সবাই জেনেও যাবে।
অথৈ বলল, না, প্রোগ্রাম করলে দুই পরিবারে ইনভাইট করে করব। কেউ যদি নাও আসে, তাহলেও।
এহসান বলল, আসলে আমি ছোট করে করতে চাইছি, কলিগদের এমনিতেও খাওয়াতে হবে। ছবি তুললাম আমরা আউটডোরে, তারপরে কোনো চাইনিজে খাইয়ে দিলাম। ফ্যামিলি মানে একশ ঝামেলা। একশ রকম কথা। আমার রিলেটিভ এখন বিরক্ত লাগে।
অথৈ বলল, ঠিক আছে, জানিও আমার আব্বু আম্মুকে। দাওয়াত না করলেও।
অথৈ এর মনে সূক্ষ্ণ আশা, বাবা হয়তো মেনে নিয়ে এহসানের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেবে। ওর জন্য কেনা কাটা করবে।
আচ্ছা দেখি-
অথৈ এর হাতে তেমন টাকা পয়সা নেই, কোনোদিন টাকা লাগে নি। বাবার কাছে টাকা চাইলেই পাওয়া যেত৷ জমানো হয় নি, মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ের আগে মেয়েদের একাউন্টও করা হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।
অথৈ এর একটা একাউন্ট আছে, সেখানে কোনো টাকা নেই। ঈদে পাওয়া সালামি বা বিভিন্ন জনের দেওয়া গিফট তো খরচ করে ফেলেছে, একটা ব্যাগে সামান্য কিছু টাকা আছে। হয়তো দশ পনের হাজার হবে, আর ছোট ছোট কিছু গোল্ডের আংটি, কানের দুল, চেইন। এগুলো অথৈএর কাছেই আছে, অথৈ কি এগুলো সেল
করে এহসানের জন্য কেনাকাটা করবে?
সত্যি বলতে ছোটবেলা থেকে ব্যবহার করা জিনিসগুলো প্রতি মায়াও আছে, সেল করতে মন টানে না।
অথৈ এহসানকে বলল, আমাদের দিক থেকে কিছুই কেনা হবে না তোমার জন্য! এটা আমার জন্য ভীষণ কষ্টের। আমার কিছু নিতে ইচ্ছে করছে না।
এহসান বেণী শেষ করে অথৈ এর কপালে চুমু খেলো।
তারপর বলল, আমাদের বিয়েটা তো ইউজুয়াল বিয়ে হয় নি, কিভাবে কেনাকাটা করা হবে বলো, সময় ঠিক হলে সব হবে একদিন, দেখো।
অথৈ বলল, আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারব না মনের মতন!
এহসান বলল, একটা জিনিস দিতে পারো। তুমিই পারবে, তবে সাহস পাচ্ছি না বলার। কারন সময় হয় নি এখনো তোমার জন্য।
অথৈ বুঝতে না পেরে বলল, কি বলো তো? এমন কি আছে, যেটা দিতে পারব, কিন্তু সময় হয় নি?
এহসান বলল, অথৈ কে কাছে টেনে ফিসফিস করে বলল, আমি বাবা হতে চাই অথৈ। তবে তুমি সময় নাও।
আমি তোমাকে কোনো প্রেশার দিচ্ছি না। আমার একটা ভরা সংসার চাই।
অথৈ হঠাৎ লজ্জা পেয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি এহসান বাবা হতে চাইছে তার কাছে! হয়তো ভবিষ্যত নিশ্চয়তার জন্য, হয়তো ভাবছে, অথৈ যদি মন বদলে চলে যায়!
অথৈ চুপ দেখে এহসান বলল, ভয় পাইয়ে দিলাম!
অথৈ বলল, আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে আসিনি এহসান।
এহসান কথাটার মানে বুঝতে পেরে বলল, বুঝতে পেরেছি তবে আমি সেজন্য বলি নি, সত্যিই চাই বলে বলেছি। তুমি সময় নাও। যখন তুমি চাইবে, তখনি সব হবে।
অথৈ বলল, এখনো কেউ মেনে নেয় নি আমাদের, চারপাশে এত কথা!
এহসান বলল, চারপাশের কথা বাদ দাও তো!
অথৈয়ের দ্বিধা দেখে এহসান একটু মন খারাপ করে। এত তাড়াতাড়ি অথৈকে বলা ঠিক হয় নি।
অথৈ কিচেনের কাজ শেষ করে বেডরুমে ঢুকল।
এহসান লাইট নিভিয়ে অন্য দিকে ফিরে শুয়ে পড়ল। অথৈকে ওই কথাটা না বললে হয়তো কাছে টেনে নিতো। এখন দ্বিধা লাগছে। কি দরকার ছিল বলার! সম্পর্কটা একটু জমাট হতো আগে! একবারে পেয়ে গেছে বলে কি সব হয়!
কিছুক্ষণ পরে অথৈ উঠে এহসানের দিকে ঝুঁকে বলল, কি হলো তোমার, ওদিকে ফিরে শুয়ে থাকলে বাবা কিভাবে হবে?
এহসান লাফ দিয়ে উঠে বসল! তুমি রাজী?
অথৈ ঘাড় নাড়ল!
সিরিয়াসলি? সত্যিই?
অথৈ আবারও মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যা বলল। এহসান খুশিতে অথৈকে জড়িয়ে ধরল।
তারপরে আবার রাত নেমে এলো ওদের ঘরে , স্নিগ্ধ জুঁইফুল রাত!
ঐশি ঘুমিয়ে পড়েছিল।শেষ রাতের দিকে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠল। ওর মনে হলো, এহসানের সাথে ওর কথা বলা উচিৎ। নাসিরের এই বন্দিশালা থেকে ওকে বের হতে হবে। এহসানের কাছে ফিরতে হবে, এহসান নিশ্চয়ই ওকে এখনো ভালোবাসে, হয়তো ওর প্রতি শোধ তুলতে অথৈকে বিয়ে করেছে। ঐশি ফিরতে চাইলে সব আগের মতন হয়ে যাবে। অথৈ ও নিশ্চয়ই বুঝবে, এহসান ঐশিকেই ভালোবাসে।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৫০
অনেকক্ষণ ভেবে, ঐশি এহসানকে টেক্সট করল, একবার দেখা করতে চাই। প্লিজ, না করো না। একটু সময় দিও, জরুরি কথা আছে। রাত তিনটা বাজে।
এহসান টেক্সট দেখল না এত রাতে।
