Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩২

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩২

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩২
সুমি চৌধুরী

পরদিন ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরে বাঁধন। পুরো বাড়িটা তখনও নিস্তব্ধ। ভোরের নরম আলো জানালার ফাঁক গলে রুমের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে।রুমে ঢুকেই শাওয়ার নেওয়ার জন্য কাঁধে তোয়ালেটা তুলে নেয় বাঁধন। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ে।দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসে মেয়েলি এক কণ্ঠ,
—-” আসব, বাঁধন ভাইয়া?”
কণ্ঠটা চিনতে এক সেকেন্ডও লাগে না বাঁধনের।শান্তা।নামটা মাথায় আসতেই বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। ভ্রু কুঁচকে বন্ধ দরজার দিকেই কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—-” আয়।”
ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে শান্তা। আজ তার চোখেমুখে অন্যরকম এক দ্বিধা। দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে কয়েক পা এগিয়ে বাঁধনের সামনে এসে দাঁড়ায় সে।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।তারপর নিচু স্বরে বলে শান্তা,

—-” আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, বাঁধন ভাইয়া।”
বাঁধন একবার কব্জির ঘড়ির দিকে তাকায়। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে তোয়ালেটা কাঁধে ঠিক করতে করতে বলে,
—-” কী বলবি, তাড়াতাড়ি বল। আমি শাওয়ার নেব।”
শান্তা একবার গভীর নিঃশ্বাস নেয়। বুকের ভেতরটা কাঁপছে, তবু সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায় বাঁধনের দিকে।অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলে,
—-” আমার ভালোবাসাটা কোনোদিনও কি আপনি বুঝবেন না, বাঁধন ভাইয়া?”
ভ্রু কুঁচকে শান্তার দিকে তাকায় বাঁধন। তার চাহনিতে স্পষ্ট বিরক্তি। সে আলমারির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে।
—- “আবার একই কথা? আই হ্যাভ নো টাইম ফর দিস নসেন্স। এসব ফালতু কথা বলে আমার সকালটা নষ্ট করিস না।”
বাঁধন আলমারি থেকে একটা শার্ট বের করে বিছানায় রাখে। শান্তা এক পা এগিয়ে এসে কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে।
—- “আমার ভালোবাসা আপনার কাছে ফালতু মনে হতে পারে, কিন্তু এটা আমার কাছে ইমোশন, বাঁধন ভাইয়া। আমি কি কোনোভাবেই আপনার মনের মানুষ হতে পারি না?”
বাঁধন এবার শান্তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখেমুখে তার শীতল কাঠিন্য। সে শান্তার সামনে এসে বেশ গম্ভীরভাবে বলে।

—- “দেখ শান্তা, ইউ আর ক্রসসিং ইয়োর লিমিট। আমি তোকে অনেকবার বলেছি, আমার লাইফে তোর এসবের কোনো জায়গা নেই। দ্যাটস ইট। এবার প্লিজ আমার রুম থেকে বের হ।”
শান্তা একটু দমে যায়, কিন্তু তার চোখে জিদ। সে কিছুটা নিচু স্বরে বলে।
—- “আপনি রূপাকে যতটা গুরুত্ব দেন, আমাকে তার একভাগও দেন না। কেন?”
বাঁধন বাঁকা হেসে শান্তার দিকে এক পা এগিয়ে আসে। খুব নিচু অথচ ধারালো গলায় বলে।
—- “কারণ ও আমার পার্সোনাল চয়েস, আর তুই জাস্ট একজন বিরক্তিকর মানুষ। ডন্ট আস্ক মি এগেইন। এখন যা।”
শান্তা ঠোঁটের কোণে এক বিকৃত, শয়তানি হাসি ফুটিয়ে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলে।
—- “রূপা পার্সোনাল, তাই না? হোল্ড অন, আপনিও দেখুন আপনাকে পাওয়ার জন্য আমি কতটা নিচে নামতে পারি।”
কপালে তিনটে গভীর ভাঁজ ফেলে ভ্রু কুঁচকে শান্তার দিকে তাকায় বাঁধন। তার চোখের দৃষ্টিতে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনের তেজ। শান্তা এক মুহূর্ত দেরি না করে শিকারি বাঘিনীর মতো এগিয়ে গিয়ে রুমের দরজাটা লক করে দেয়। হুট করে রুমের দরজা বন্ধ হতে দেখে বাঁধন গর্জে ওঠে,
—- “হোয়াট দ্য হেল! তুই রুমের দরজা বন্ধ করলি কেন?”
শান্তা শয়তানি হাসতে হাসতে বাঁধনের একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ সে নিজের বুক থেকে ওড়না সরিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়। এই দৃশ্য দেখামাত্রই বাঁধন তীব্র ঘৃণা আর বিরক্তি নিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তার চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে যায়। শরীরের রক্ত যেন রাগে ফুটছে।

—- “শান্তা, কী করার দুঃসাহস দেখাচ্ছিস তুই? আমার রাগের শেষ সীমানা পার করিস না, ভালোই ভালোই বলছি এখনি রুম থেকে বেরিয়ে যা।”
শান্তা এক বিন্দু বিচলিত না হয়ে বাঁধনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলে।
—- “এত তাড়া কিসের বাঁধন ভাইয়া? আসল খেলা তো শুরুই হয়নি।”
বলেই শান্তা তার কাঁধের কাপড়ে হাত রেখে এক হ্যাঁচকায় জামাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলে। নিমেষের মধ্যে জামাটা একপাশে সরে গিয়ে শান্তার কাঁধ ও বুকের কিছুটা অংশ অনাবৃত হয়ে পড়ে। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বাঁধন রাগে কাঁপতে কাঁপতে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। ঘাড়ের শিরাগুলো তার রাগে দপ দপ করে ফুলে উঠছে। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জন করে ওঠে।
—- “আই উইল ফা’ক ইউ, শান্তা,উল্টা পাল্টা কিছু করলে তোকে জ্যান্ত জবাই করে ফেলবো আমি।”
শান্তা কোনো কথার তোয়াক্কা না করে মুহূর্তের মধ্যেই অসহায়ত্বের নিখুঁত এক অভিনয় ফেঁদে বসে। সে তার অগোছালো পোশাক আর উন্মুক্ত কাঁধের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে।
—- “আহ্! বাঁধন ভাইয়া, প্লিজ! আপনি এসব কী করছেন? আমার জীবনটা শেষ করবেন না! আমি আপনার আর আমার সম্পর্কের ব্যাপারে কাউকে কিচ্ছুটি বলব না, দোহাই লাগে আমার সর্বনাশ করবেন না! কে কোথায় আছেন? বাঁচান আমাকে!”

শান্তার বিকট চিৎকারে বাড়ির পরিবেশ নিমেষেই থমকে যায়। আর্তনাদ শুনে সবাই এক এক করে বাঁধনের রুমের সামনে জড়ো হতে শুরু করে। রূপারও ঘুম ভেঙে যায় শান্তার কান্নার চিৎকারে। সে এলোমেলো চুলে দৌড়ে ছুটে আসে বাঁধনের দরজার সামনে। আকাশ, আহসান রহমান ওপাশ থেকে দরজায় আক্রোশে ধাক্কা দিতে থাকে। দরজার ওপাশে মানুষের উপস্থিতি টের পেয়েই শান্তা তার অভিনয় আরও গাঢ় করে তোলে। ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে সে চিৎকার করে বলতে থাকে।
—- “আপনি এমনটা করতে পারেন না, বাঁধন ভাইয়া! আমি আপনাকে সত্যি ভালোবেসেছিলাম। হয়তো আপনি আমার সাথে মিথ্যে প্রেমের অভিনয় করেছেন, কিন্তু আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোণ জুড়ে শুধু আপনিই ছিলেন, আর আজীবন থাকবেন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার আর আমার সম্পর্কের কথা কাউকে কোনোদিন জানাব না। কিন্তু দোহাই লাগে, আমাকে ছেড়ে দিন! আমার এই সর্বনাশ করবেন না!”
বলতে বলতে শান্তা নিজের গালে আর হাতে নখের আঁচড় বসাতে শুরু করে। সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপার, বাঁধন চোখ বন্ধ করে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে। কারণ সে শুরুতেই বুঝেছিল, কোনো গভীর অভিসন্ধি নিয়েই শান্তা তার রুমে এসেছে। বাঁধন টু শব্দটিও করল না, কোনো প্রতিবাদ বা চিৎকার করল না তীব্র রাগে সে যেন বরফের মতো জমে গেল।
হঠাৎ আকাশের কাঁধের প্রবল ধাক্কায় দড়াম করে ভেঙে পড়ে রুমের দরজা। মুহূর্তের মধ্যে শান্তা বাঁধনের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। চোখের সামনে ভেসে ওঠা সেই দৃশ্য দেখে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই স্তব্ধ। শান্তা তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে শিল্পী রহমানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। শিল্পী রহমান দ্রুত নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে শান্তার উন্মুক্ত অংশটুকু ঢেকে দিলেন। আহসান রহমান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাঁধনের সামনে এসে গর্জে উঠলেন।

—- “বাঁধন, এসব কী?”
বাঁধন শান্তভাবে চোখ খুলে আহসান রহমানের দিকে তাকাল। শীতল কন্ঠে খুব স্বাভাবিকভাবে বলে।
—- “আমরাই তো একই প্রশ্ন! এটা কোন সিনেমার নাটক চলছে? জি বাংলা, নাকি কোনো সস্তা বাংলা সিনেমা?”
আহসান রহমান রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বললেন।
—- “কী করছিলি তুই শান্তার সাথে?”
বাঁধন এক মুহূর্তের বিরতি নিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে জবাব দিল।
—- “কিছুই করিনি আমি,সকাল সকাল ও আপনাদের সবাইকে সস্তা সিনেমা দেখাচ্ছে।”
শান্তা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অসহায়ের মতো বাঁধনের দিকে তাকায়। তার চোখেমুখে তখন মিথ্যা কান্নার নিখুঁত এক প্রলেপ। সে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে আর্তনাদ করে বলে।
—- “আমি সস্তা নাটক করছি? একটা মেয়ে নিজের সম্মান নিয়ে মিথ্যা বলবে? লজ্জা করে না আপনার এসব বলতে? কিছু সময় আগেই তো জানোয়ারের মতো আচরণ আমার সাথে করলেন, এখন খুব বেশ সাধু সাজা হচ্ছে তাই না।”
আহসান রহমান শান্তার এই আর্তনাদে হতভম্ব হয়ে যান। তিনি শান্তার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে ওঠেন।

—- “শান্তা, পরিষ্কার করে বল? কী হয়েছিল এখানে?”
শান্তা মাথা নিচু করে, শিল্পি রহমানের শাড়ির আঁচল মুচড়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার প্রতিটি কান্না যেন সাজানো মনে হলেও আশেপাশের মানুষগুলোর কাছে তা এক করুণ দৃশ্য হিসেবে ধরা দেয়। সে ভেঙে পড়া গলায় বলতে থাকে।
—- “চাচা, আমি আর বাঁধন ভাইয়া গত চার মাস ধরে রিলেশনে জড়িয়েছি। তোমরা যখন বাড়িতে আমার বিয়ের কথা তুললে, তখন আমি ওকে বলেছিলাম আমাদের এই সম্পর্কের কথা সবাইকে জানিয়ে দিতে। আমি ভেবেছিলাম ও আমাকে গ্রহণ করবে কিন্তু ও আমাকে সাফ জানিয়ে দেয় যে, ও আমাকে কখনোই ভালোবাসেনি, সবটাই ছিল আমার সাথে একটা নোংরা অভিনয়! আমি বারবার ওর পায়ে ধরেছি, একটু ভালোবাসার জন্য ভিক্ষা চেয়েছি, কিন্তু ও পশুর মতো সব অস্বীকার করেছে। আজ যখন আমি বললাম যে আর সহ্য করতে পারছি না, সম্পর্কের কথা আমি নিজেই বাড়ির সবাইকে বলব তখনই ও উত্তেজিত হয়ে আমার ওপর এমন পাশবিক আচরণ শুরু করে দিল।”
শান্তার মুখে এমন ভয়ংকর অভিযোগ আর সুপরিকল্পিত চক্রান্তের কথা শুনে উপস্থিত সবার পায়ের তলার মাটি যেন মুহূর্তেই সরে গেল।বিশেষ করে রূপা।তীব্র মাথা ঘুরে উঠতেই দিশেহারা হয়ে পড়ে সে। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।বাঁধন এমন?মুহুর্তে বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিক কীসের ব্যথা, সেটা নিজেও বুঝতে পারছে না, শুধু অনুভব করছে বুকের গভীরে অদ্ভুত এক যন্ত্রণা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।
রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বাঁধনের সামনে এগিয়ে আসে আহসান রহমান। এক ঝটকায় বাঁধনের টি শার্টের কলার চেপে ধরে গর্জে ওঠেন,

—- “এসব কী, বাঁধন? এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে আমি? এতটা নিচে নামতে তোর একটুও লজ্জা করল না?”
একবারও চোখ ফেরায় না বাঁধন।তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে শুধু শান্তার ওপর।চোখ দুটো বরফের মতো ঠান্ডা, অথচ ভেতরে যেন জমে আছে প্রচণ্ড ঘৃণা।সে ধীর কণ্ঠে শান্তার দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “তাই,আমার এতই পতন যে তোর মতো একটা মেয়ের সঙ্গে নোংরামি করব? তিরিশ বছর ধরে নিজেকে কন্ট্রোল করে আসছি কি শুধু তোর সঙ্গে এসব করার জন্য?”
শান্তা হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে,
—- “মানে কী বলতে চাইছেন আপনি? দেখুন এখন যতই সত্যিটা লুকানোর চেষ্টা করুন, কোনো লাভ হবে না। সবাই সব জেনে গেছে। আজ যদি আমাকে আপনার সঙ্গে বিয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে আমি নিজের জীবন শেষ করে দেব!”
এক মুহূর্তও দেরি করে না বাঁধন।সাথে সাথে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
—- ” মর তুই, তোর ফৈয়তা খাবো আমি।”
চোখের পানি মুছতে মুছতেই আবার আহসান রহমানের দিকে তাকায় শান্তা।কণ্ঠে অসহায়ত্বের অভিনয়, চোখে হিসেবি জল।

—- “দেখেছেন চাচা? ও আমার সাথে কেমন ব্যবহার করছে? আর হ্যাঁ শুধু তাই নয়, ও আমার জীবন তো নষ্ট করেছেই, রূপার জীবনটাও ধ্বংস করতে চাইছে। ও রূপাকেও পছন্দ করে ভাই হয়ে নিজের সৎ বোনকে ভালোবাসার মতো নোংরা মানসিকতা রাখে ও!”
কথাগুলো যেন দ্বিতীয়বার বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়ে পুরো ঘরের ওপর।চারপাশে নেমে আসে শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা।রূপার মাথাটা আবার ঘুরে ওঠে।পাশের দেয়ালটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলায় সে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, ভয়ংকর কোনো দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে গেছে সে।না এটা সত্যি হতে পারে না।নিজের হাতেই সজোরে একটা চিমটি কাটে রূপা।তীক্ষ্ণ ব্যথায় চোখ ভিজে ওঠে।কিন্তু ব্যথার পরও কিছুই বদলায় না।সামনের নির্মম বাস্তবটা ঠিক আগের মতোই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।আহসান রহমান এবার বাঁধনের দিকে তাকিয়ে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে যেন আগুনের হলকা।
—-” বাঁধন! শান্তা এসব কী বলছে? তুই রূপাকে পছন্দ করিস?”
বাঁধনের চোখে কোনো বিকার নেই। সে যেন এক গভীর নেশায় আচ্ছন্ন। রূপার দিকে একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত উত্তর দিল।

—-” হুম, করি। শুধু পছন্দই করি না, ওকে বিয়ে করবো আমি। আমার অর্ধাঙ্গিনী বানাবো, আমার বাচ্চার আম্মু বানাবো,আরো কিছু জানার আছে আপনার?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই আহসান রহমান নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন বাঁধনের গালে। ‘ঠাস’ শব্দে পুরো ঘরটা যেন কেঁপে উঠল, নিস্তব্ধতায় ভারী হয়ে এল পরিবেশ। রূপা ভয়ে, লজ্জায় আর তীব্র ঘৃণায় নিজেকে কুঁকড়ে ফেলল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে লাগে সে। বাঁধন যে এতটা নিচে নামতে পারে, তা যেন তার কল্পনারও অতীত।আহসান রহমান কাঁপাকাঁপা স্বরে, ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বললেন।
—-” নির্লজ্জ ছেলে! নিজের বোনকে নিয়ে এমন জঘন্য কথা বলতে তোর একটুও লজ্জা করল না?”
বাঁধনের চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে অতি শীতল কণ্ঠে বলে।
—-” না।”
শিল্পী রহমানকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল শান্তা। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সে বলে উঠে।
—-” চাচা, বাঁধন ভাইয়া যদি আমাকে বিয়ে না করে, তাহলে আমি সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করব। আমি বাঁচব না!”
আহসান রহমান রাগে-ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে বাঁধনের দিকে ফিরে তাকালেন। তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার কন্ঠে বললেন।

—- “আমার ভাবতেও ঘৃণা লাগছে যে, তোর মতো চরিত্রহীন, নির্লজ্জ একটা ছেলে আমার সন্তান!”
বাঁধন ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে।
—-” আপনাকে ভাবতে বলছে কে? না আমি আপনার ছেলে, না আপনি আমার বাবা। আমার বাবা তো চৌদ্দ বছর আগেই হারিয়ে গেছে!”
এতক্ষণ আকাশ এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো সব শুনছিল। সে নিজেও যেন বাকরুদ্ধ, থমকে গেছে তার চিন্তা। বাঁধন এতটা নিচে নামতে পারে, এটা সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকেও যেন তার মস্তিষ্ক গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। সে শান্তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শান্তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলে।

—-” শান্তা, তুই আমার আপন বোন, কিন্তু এই মুহূর্তে কেন জানি তোকে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কারণ আমি বাঁধনকে চিনি, গুনে গুনে ১৫ বছর আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। ওর স্বভাব, ওর প্রতিটি আচরণ আমার নখদর্পণে। বাঁধন এমন জঘন্য কিছু করতে পারে এটা কোনোভাবেই আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
শান্তা মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের পানি মুছে ফেলে মিথ্যে কান্নার অভিনয় করে বলে।
—-” ভাইয়া, তুমি এটা বলতে পারলে? তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ? আমি একটা মেয়ে, নিজের মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে কেন নিজের নামে এসব মিথ্যে অপবাদ রটাব?”
আকাশ কঠিন গলায় বলে।
—-” বাঁধনের সাথে তোর রিলেশন ছিল, এটাই কি তুই প্রমাণ করতে চাইছিস?”
শান্তা দ্রুত উত্তর দেয়।
—-” হ্যাঁ।”
আকাশের চোখে আগুনের হলকা, সে গর্জে ওঠে।
—-” প্রমাণ আছে?”

শান্তা এক মুহূর্তও দেরি না করে ফোনের গ্যালারিতে দ্রুত হাত চালাল। স্ক্রিনে আঙুল বোলাতে বোলাতে কয়েকটা ছবি বের করল সে। তারপর একটি ছবি আকাশের চোখের সামনে মেলে ধরে তীব্র স্বরে বলে।
—-” এই দেখো! মিথ্যে বলছি না। কিছুদিন আগে আমি আর বাঁধন ভাইয়া রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। প্রমাণটা ভালো করে দেখো ভাইয়া আমার হাতে চুমু খাচ্ছে!”
ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল আকাশ। তার চোখ দুটো যেন সাথে সাথে কপালে উঠে গেল, রীতিমতো থ হয়ে গেল সে। সত্যি সত্যিই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কোনো এক অভিজাত রেস্টুরেন্টে বসে বাঁধন শান্তার হাতে আদুরে ভঙ্গিতে চুমু খাচ্ছে, আর শান্তা লজ্জামাখা হাসি হাসছে। একে একে সবাই ছবিটা দেখল। শুধু রূপা আর বাঁধন বাঁধে। দুজনেই যেন পাথরের মতো জমে গেছে, দুজনেই একদম স্তব্ধ।আকাশ শান্তার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে হুড়মুড় করে আরও কয়েকটা ছবি দেখতে শুরু করল। একে অপরের সাথে জড়িয়ে ধরা, বিভিন্ন রোমান্টিক ভঙ্গিমায় তোলা ছবি সবই যেন একেকটা জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল আকাশ, গলার ভেতর শব্দগুলো আটকে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই হাজি রহমান কাঁপা পায়ে এগিয়ে এলেন বাঁধনের সামনে। বিপন্নতার সুরে বললেন।

—-” দাদু ভাই, তুইও আমার নাতি, শান্তাও আমার নাতনি। আমি কারো ক্ষতি হতে দিতে পারি না। মান-সম্মানের প্রশ্ন, লোকে জানলে ছি-ছি করবে! তাছাড়া তুই একজন নামকরা এসপি, আমাদের বংশের সম্মান তোর ওপর। দাদু ভাই, হাত জোড় করে বলছি, আমি তোদের বিয়েটা দিয়ে দিতে চাই। তুই প্লিজ না করিস না, আমাদের মাথাটা সামাজিকভাবে নিচু করিস না।”
বাঁধন বাঁকা চোখে শান্তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল।
—-” কিন্তু কেন আমি ওকে বিয়ে করব? আমার অপরাধটা কী? কেন এই নির্লজ্জ মেয়েকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছেন আপনারা?”
বাঁধনের মুখের ওপর এ কথা শুনেই শান্তা যেন বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলল। সে তার অভিনয় চালিয়ে গিয়ে দম্ভের সাথে বলল।
—-” কী করেছেন মানে? আপনার আর আমার গভীর সম্পর্ক ছিল, তার প্রমাণ তো সবার সামনেই আছে! এখন কোন মুখে আপনি অস্বীকার করছেন?”

বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে প্রচণ্ড ক্রোধে গর্জে উঠে শান্তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ধমক দিয়ে বলে।
—-” আরেকটা কথা যদি মুখ থেকে বের করেছিস, তাহলে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি।”
পুরো ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। এই পরিস্থিতির মাঝে শিল্পী রহমান বাঁধনের দিকে তাকিয়ে তাঁর দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। ভগ্ন কণ্ঠে তিনি বললেন।
—-” তোকে আমি নিজের বড় ছেলের মতোই দেখতাম, বাঁধন। ভেবেছিলাম আমার দুটো ছেলে তোর আর আকাশের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর সেই তুই আমার নিজের ছেলের মতো হয়ে আমারই মেয়ের এত বড় সর্বনাশ করে দিলি?”
বাঁধন বিষাদগ্রস্ত চোখে শিল্পী রহমানের দিকে তাকিয়ে আর্জি জানায়।
—-” কাকিয়া, ইউ অলসো ডোন্ট ট্রাস্ট মি? ট্রাস্ট মি কাকিয়া, আই ডিড নাথিং।”
আকাশ বাঁধনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঠান্ডা গলায় বলে।
—-” বাঁধন, মানলাম তুই মুখে বলছিস কিছু করিসনি, কিন্তু এই ছবিগুলো? এগুলো কি মিথ্যা? এগুলো কি এডিট করা? প্রতিটি ছবি এত ঘনিষ্ঠ যে অস্বীকার করার উপায় নেই।”
পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে বিষিয়ে উঠল। আহসান রহমান চিৎকার করে হাজি রহমানের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন।

—-” বাবা, ওকে আপনিই বলুন! ও যেন আজকেই শান্তাকে বিয়ে করে নেয়। নাহলে আমি আইনের সাহায্য নিতে বাধ্য হব। আমি মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে শান্তার জীবন নষ্ট হতে দিতে পারি না!”
বাঁধন এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের, ধারালো হাসি। সে শান্তভাবে নিজের ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে বলে।
—-” ফ্যান্টাস্টিক ডিসিশন! আমি এখনই থানায় ফোন করছি। আপনারা সবাই মিলে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিন, আমার কোনো আপত্তি নেই। লোকচক্ষুর সামনে আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাক, তবুও আমি শান্তার মতো নির্লজ্জ মা”গি-কে কোনোভাবেই বিয়ে করব না। ইট’স রিডিকিউলাস!”
বাঁধন দ্রুত অখিলকে কল করে কিছু পুলিশ সদস্য নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অখিল তার টিম নিয়ে হাজির হয়। সব ঘটনা শোনার পর অখিলের যেন জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। সে গম্ভীরমুখে শান্তার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত পেশাদার ও কড়া স্বরে বলে।
—-” মিস শান্তা, আর ইউ সিরিয়াস? তুমি কি সত্যিই বলতে চাইছ বাঁধনের সাথে তোমার রিলেশন ছিল, আর ফ্যামিলিকে সম্পর্কের কথা জানাতে বলায় বাঁধন তোমার সাথে নোংরামি করেছে?”
অখিল কে দেখে শান্তার বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। বারবার ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলে।
—-” ইয়েস স্যার, ট্রাস্ট মি। আমি যা বলছি সব সত্যি।”

অখিল এবার ধমক দিয়ে ওঠে। তার কণ্ঠস্বর অফিসিয়ালি কঠোর।
—-” শান্তা, স্টিল দেয়ার ইজ টাইম। যদি অভিনয় করে থাকো তবে এখনো সময় আছে স্বীকার করো। ইউ আর ফরগেটিং দ্যাট, তুমি একজন এসপির ওপর এত বড় অপবাদ দিচ্ছো। যদি অপবাদটা মিথ্যে প্রমাণিত হয়, তবে কনসিকোয়েন্সেস কী হবে তা কি তুমি জানো? তোমার ক্যারিয়ার ও লাইফ দুটোই হেল হয়ে যাবে।”
শান্তা ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ভয় পেলেও বাঁধনকে পাওয়ার জেদ তার মাথা থেকে নামল না। সে অখিলের চোখের দিকে তাকিয়ে মরিয়া হয়ে বলে।
—-” স্যার, আই অ্যাম নট লায়িং। আমি সত্যি বলছি, স্যার! আমি প্রমাণও দিয়েছি, সবাই তা নিজের চোখে দেখেছে।”
শান্তার এই একগুঁয়েমিতে বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে তাচ্ছিল্যের হাসিতে মুখ বাঁকিয়ে অখিলের দিকে তাকিয়ে বলে।
—-” ওহ কাম অন অখিল! লেট হার প্রুভ ইট। আমি জানি ও কি করেছে। ইট ইজ সো ডিসগাস্টিং! ওর সাহস কত বড় সেটা আজ আমি দেখে নেব। আই উইল নট স্পেয়ার হার, দিস ইজ টোটালি ইনসেন!”
বলেই বাঁধন শান্তার হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেয়। সে দ্রুত স্ক্রিনে চোখ বোলায়, তার মুখের ভাব মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। অখিলও কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসে এবং বাঁধনের কাঁধের ওপর দিয়ে ফোনের ছবিগুলো দেখে।
হঠাৎ ছবিগুলো দেখে বাঁধন অট্টহাসি হেসে ওঠে। সেই হাসিটা ছিল শ্লেষ আর ব্যঙ্গমাখা। সে শান্তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে।

—-” ফ্যান্টাস্টিক এডিট! খুব সুন্দর কাজ করেছিস তোরা। ইশ্‌, আমাকে তো দারুণ কিউট লাগছে ছবিতে! তবে , এডিটিংয়ে মনে হয় একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। আমার বাম চোখের ভ্রুর ওপরে স্লিক করে কাটা দাগটা এই AI জেনারেটেড ছবিতে সেটা দিতে বোধহয় ভুলে গেছে। এটলিস্ট এটা দেওয়া উচিত ছিল!”
বাঁধনের এই কথা শুনে শান্তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল, তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তার মুখের সব রক্ত মুহূর্তেই উবে গেল। পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা, সবাই অবাক দৃষ্টিতে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে আছে।অখিল নিজেই তখন ফোনের প্রতিটি ছবি মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর বারবার বাঁধনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ছবির চেহারার সাথে বাঁধনের হুবহু মিল আছে, কিন্তু একটা বড় পার্থক্য শান্তার এডিট করা ফোনে তোলা ওই ছবিগুলোতে বাঁধনের বাম ভ্রুর ওপরের ওই বিশেষ কাটা দাগটা নেই। ভ্রুটা একদম নিখুঁত, দাগের কোনো চিহ্নমাত্র সেখানে নেই।অখিল হতবাক হয়ে যায়। সে গম্ভীর গলায় বলে।

—-” দ্যাটস রাইট! একদম ঠিক ধরেছিস। আমি বাঁধনের চোখের দিকে ভালো করে দেখছি, এখানে কাটা দাগটা একদম ক্লিয়ারলি বোঝা যাচ্ছে। বাট এই ফোনের ছবিগুলোতে ভ্রু একদম স্মুথ, কাটার কোনো দাগই দেখছি না।”
আকাশ আর দেরি না করে দ্রুত এগিয়ে আসে। সে নিজের চোখে ছবিগুলো আবার দেখে এবং বাঁধনের ভ্রুর দিকে তাকায়। বাঁধনের ভ্রুতে লম্বা একটা কাটা দাগ স্পষ্ট ফুটে আছে, যা যেকোনো মানুষের চোখে পড়বে। কিন্তু ফোনে থাকা ছবিগুলোতে ওই দাগের ছিটেফোঁটাও নেই।পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে থমথমে হয়ে যায়। অখিল পরিস্থিতি সামলাতে নিজের ফোন বের করে। সে দ্রুত ছবিগুলো নিজের ফোনে ট্রান্সফার করে নেয়। এরপর সে তার অফিসের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এক দক্ষ অফিসারকে কল করে।
—-” হ্যালো রিয়াজ, লিসেন টু মি। আমি একটা ছবি পাঠাচ্ছি। ইট ইজ আর্জেন্ট। তুমি ইমিডিয়েটলি চেক করে বলো এটা কি কোনো মানুষের রিয়েল ছবি, নাকি এআই দিয়ে ম্যানিপুলেট বা এডিট করা হয়েছে? আই নিড দ্য রেজাল্ট নাও!”
অখিল ফোনটা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁধনের দিকে তাকায়। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। কয়েক মিনিট পর অখিলের ফোনে একটা মেসেজ আসে। সে মেসেজটা পড়তেই তার চোখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হতে থাকে। সে সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে।

—-” ইট ইজ কনফার্মড। সাইবার টিম বলছে, এই ছবিগুলো কোনোভাবেই রিয়েল না। এগুলো জাস্ট এআই দিয়ে এডিট করা। শুধু ফেস টা বডির সাথে বসানো হয়েছে ডিপফেক টেকনোলজি ইউজ করা হয়েছে এখানে।”
কথাটা শুনেই শান্তার মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়তে লাগল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, বুকের ভেতরটা ধকধক করে কাঁপছে। শুকনো ঠোঁট জোড়া বারবার ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারছে না। ঘরের ভেতর উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের দৃষ্টি তখন তার দিকেই স্থির। সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা, ক্ষোভ আর অবিশ্বাসের আগুন স্পষ্ট জ্বলছে। রাগে চোয়াল শক্ত করে শান্তার দিকে তাকিয়ে থাকে আকাশ। চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে, হাতের রগগুলো পর্যন্ত ফুলে উঠেছে। অবশেষে দাঁতে দাঁত চেপে বলে।

—-” শান্তা, সত্যিটা স্বীকার করবি, নাকি মেরে মেরে সত্যিটা বের করবো।”
ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে শান্তা। মাথাটা আরও নিচু হয়ে আসে। বুকের ভেতরটা যেন ধসে যাচ্ছে। কিছু বলার শক্তিও পাচ্ছে না। সব শেষ হয়ে গেছে। ছবিগুলো যে এআই দিয়ে এডিট করা, সেটা সে জানে। তৃষার কাকাতো ভাই-ই বাঁধনের ছবি ব্যবহার করে সব এডিট করে দিয়েছিল। কিন্তু বাঁধনের ভ্রুর কাটা দাগটার কথা এতটাই মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল যে সেই ভুলটাই আজ তার সমস্ত সাজানো নাটক ভেঙে দিল।ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ এক হাসি ফুটে ওঠে বাঁধনের। চোখে-মুখে কোনো উত্তেজনা নেই, বরং অদ্ভুত এক স্থিরতা। শান্ত গলায় বলে।

—-” ওয়েট আরেকটা দারুণ ফ্রিতে সিনেমা দেখাই সবাইকে।”
কথাটা বলেই টেবিলের ওপর রাখা তার ল্যাপটপটা টেনে নেয় বাঁধন। অন করে দ্রুত কিবোর্ডে আঙুল চালাতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটা ভিডিও ফুটেজ বের করে সবার সামনে ঘুরিয়ে ধরে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে।
—-” নিন, দারুণ একটা সিনেমা। না দেখলে মিস করবেন। সবাই তো বলে, অভিনয়েরও একটা শিল্প আছে। আজ দেখে নিন, কেউ কতটা নিখুঁত অভিনয় করতে পারে।”
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস আটকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, শান্তা নিজেই রুমে ঢুকছে, বাঁধনের সঙ্গে কথা বলছে, তারপর নিজের হাতেই দরজা লক করছে। কয়েক মুহূর্ত পর নিজেই নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলছে, তারপর বুকফাটা চিৎকার শুরু করছে। পুরো ঘটনাটা এক সেকেন্ডও বাদ না গিয়ে স্পষ্ট ধরা পড়েছে ফুটেজে।দৃশ্যটা শেষ হতেই আকাশের শরীর রাগে কাঁপতে শুরু করল। চোখের সামনে নিজের বোনের এমন নোংরা ষড়যন্ত্র দেখে রক্ত যেন ফুটতে লাগল তার। ভাই হয়ে আজ তাকে এসব দেখতে হচ্ছে। আর নিজেকে সামলাতে পারল না সে। ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল শান্তার গালে। থাপ্পড়ের শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে বলে।

—-” ছিঃ! তুই এতটা খারাপ? এতটা নির্লজ্জ? ভাবতেও আমার ঘৃণা লাগছে। একটুও লজ্জা করলো না তোর এমন নোংরা কাজ করতে?”
শিল্পী রহমান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে শান্তাকে মারতে শুরু করলেন। চোখের পানি থামছেই না তার। অন্যদিকে আহসান রহমানের মাথাটা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে গেল। বুকের ভেতর অপরাধবোধটা কুরে কুরে খেতে লাগল। যে মেয়েটা এতক্ষণ ধরে অভিনয় করে গেছে, সেই অভিনয়কে সত্যি ভেবে নিজের ছেলেকেই এত অপমান করলেন তিনি।ঠিক তখনই অখিল এগিয়ে এসে শিল্পী রহমানকে থামিয়ে শান্তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলে।

—-” মিস শান্তা, এখন কি সত্যিটা স্বীকার করবে, নাকি অন্য ব্যবস্থা নেবো?”
আর লুকিয়ে রাখার মতো সাহস থাকে না শান্তার। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কান্নায় গলা ভেঙে আসে। চোখের পানি মুছতে মুছতেই কাঁপা কণ্ঠে বলতে শুরু করে।
—-” বলছি আসলে আমি বাঁধন ভাইয়াকে ভালোবাসি। এই কথাটা ভাইয়াকে বলেছিলাম। কিন্তু ভাইয়া কিছুতেই আমার ভালোবাসা বুঝতে চায়নি। কারণ ভাইয়া রূপাকে পছন্দ করে। এতে আমার আরও রাগ হয়। ভাইয়াকে পাওয়ার নেশায় অন্ধ হয়ে আমি তৃষার ভাইকে দিয়ে ভাইয়ার ছবি ব্যবহার করে এই কাপল ছবিগুলো এআই দিয়ে এডিট করাই। তারপর সবাইকে দেখাই, যাতে সবাই আমাকে ভাইয়ার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়।”
কথাগুলো শেষ হতেই আতিক রহমান আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলাতে পারলেন না। এগিয়ে এসে সজোরে আরেকটা থাপ্পড় মারলেন শান্তার গালে। রাগে তার বুক ওঠানামা করছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ক্ষোভে চিৎকার করে বলেন।

—-” ছিঃ! তুই এতটা নিচে নামতে পারলি? একটুও লজ্জা করলো না তোর? তোকে আমার মেয়ে বলতেও আজ ঘৃণা লাগছে। তুই আমার মেয়ে হতেই পারিস না। আমার কোনো মেয়ে নেই। আজ থেকে আমার মেয়ে মরে গেছে।”
কথাগুলো বলেই এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়ালেন না। ভারী পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।ঘরের ভেতর আবারও ভারী নীরবতা নেমে এলো। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও আহসান রহমানের বুকের ভেতর নতুন এক ঝড় বইতে শুরু করেছে। শান্তার মিথ্যা ধরা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মাথার ভেতর এখন অন্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। রূপাকে পছন্দ করে? ছেলেটার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? রূপা যে তার সৎ বোন, এটা কি বাঁধন জানে না?আহসান রহমানের ভাবনার মাঝেই ধীর পায়ে এগিয়ে আসে বাঁধন। মুখে অদ্ভুত এক তিক্ত হাসি। চোখে জমে আছে অপমানের বহু বছরের হিসাব। আহসান রহমানের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলে।

—-” একটু আগে কী যেন বলেছিলেন? আমি নির্লজ্জ, চরিত্রহীন একজন ছেলে তাই না? আচ্ছা, নির্লজ্জ চরিত্রহীন কাকে বলে, জানেন?”
অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন আহসান রহমান। কণ্ঠে আর আগের সেই কঠোরতা নেই। ভারী গলায় বলেন।
—-” না জানি না।”
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বিদ্রূপের হাসি ফুটে ওঠে। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে।
—-” ঠিক আছে আজ আমি আপনাকে দেখাচ্ছি, নির্লজ্জ আর চরিত্রহীন কাকে বলে।”
কথাটা বলেই এক মুহূর্তও দেরি করে না বাঁধন। মুখের তিক্ত হাসিটা মিলিয়ে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, চোখদুটো হিমশীতল হয়ে জমে থাকে। দীর্ঘ পায়ে সোজা এগিয়ে আসে রজনীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার দিকে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ঘরের নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলছে।
হঠাৎ করেই বাঁধনকে নিজের একেবারে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে রূপার। মুহূর্তের মধ্যে শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে যায়। বাদামি চোখ দুটো বিস্ময় আর আতঙ্কে বড় হয়ে ওঠে। অজান্তেই এক পা পেছাতে চাইলেও সুযোগ পায় না সে।এক ঝটকায় রূপার নরম কব্জিটা নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করে ফেলে বাঁধন। তার মুঠোর দৃঢ়তায় রূপা বুঝে যায়, আজ ইচ্ছে করলেও নিজেকে ছাড়াতে পারবে না।গভীর, ভারী কণ্ঠে বলে,

—-” চল।”
আতঙ্কে শুকিয়ে যায় রূপার মুখ। মরিয়া হয়ে বাঁধনের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
—-” কোথায়? আমি কোথাও যাব না। ছাড়ুন আমার হাত ছাড়ুন।”
রূপার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওষ্ঠজোড়া শক্ত করে কামড়ে ধরে বাঁধন। চোখেমুখে ফুটে ওঠে ভয়ংকর এক কঠোরতা। পরের মুহূর্তেই কোনো রকম দ্বিধা না করে সবার সামনেই এক ঝটকায় রূপাকে নিজের কাঁধে তুলে নেয়।সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে কেউ বাধা দেওয়ার সুযোগই পায় না।মুহূর্তের মধ্যেই উল্টো হয়ে ঝুলে পড়ে রূপা। লম্বা এলোমেলো চুলগুলো নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। দুই হাত দিয়ে মরিয়া হয়ে বাঁধনের পিঠে আঘাত করতে থাকে সে। পা দুটো ছটফট করছে অবিরাম। ছোট্ট শরীরটা প্রাণপণে ছটফট করলেও বাঁধনের শক্ত বাহুর বাঁধন থেকে নিজেকে একচুলও ছাড়াতে পারে না।চারপাশে উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। কেউ যেন বুঝতেই পারছে না, ঠিক কী ঘটছে।কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অখিলের সামনে এসে দাঁড়ায় বাঁধন। একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে শান্ত, অথচ আদেশের সুরে বলে,

—-” শান্তাকে নিয়ে যা।”
অখিল এক সেকেন্ডও দেরি করে না। সঙ্গে সঙ্গে শান্তার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়। হ্যান্ডকাফের ঠান্ডা লোহা কব্জিতে লাগতেই চমকে ওঠে শান্তা। হিস্টিরিয়ার মতো চিৎকার শুরু করে দেয়।
—-” না আমি যাব না! আমাকে ছেড়ে দিন! প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দিন,আমার ভুল হয়ে গেছে আমাকে মাফ করে দিন। আম্মু দাদু প্লিজ ওদের বলো আমি যাবো না।”
কিন্তু এবার তার কান্না কিংবা চিৎকার কারও মন গলাতে পারে না।ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকের চোখেই তখন ঘৃণা আর তীব্র হতাশা।নিজের কাজের শাস্তি শান্তাকে পেতেই হবে।অখিল আর কোনো কথা না বলে শান্তাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।বাঁধন এবার মাথা ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। কণ্ঠে আগের মতোই স্থিরতা।
—-” রূপার মাকে বল, রূপার জন্মনিবন্ধন, এবং উনার আইডি কার্ড আর রূপার বাবার আইডি কার্ড বের করে দিতে। তারপর সেগুলো নিয়ে আমি যে লোকেশন পাঠাব, সেখানে চলে আয়। আর হ্যাঁ, ওর ফ্রেন্ড বৃষ্টিকেও কল করে আসতে বল।”
কথাগুলো বলেই আর একবারও কারও দিকে তাকায় না বাঁধন।কাঁধে রূপাকে নিয়েই দীর্ঘ পায়ে সদর দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে।কাঁধে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা অবস্থাতেই হাত-পা ছুড়ে ছুড়ে ছটফট করতে থাকে রূপা। এলোমেলো চুলগুলো বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে। আতঙ্কে কণ্ঠ কেঁপে ওঠে বলে।

—-” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”
একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না বাঁধন।পদক্ষেপে কোনো দ্বিধা নেই, কণ্ঠেও নেই কোনো আবেগ।শুধু বরফশীতল স্বরে বলে,
—-” নির্লজ্জ আর চরিত্রহীন কাকে বলে সেটারই প্রমাণ দিতে নিয়ে যাচ্ছি।”
বলেই বাঁধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল কেউ তাকে বাধা দেওয়ার সাহস পেল না।বাঁধনের দৃঢ় মুঠোয় আটকে থাকা রূপাকে নিয়ে সে সোজা কাজী অফিসের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল। বাঁধনের ইস্পাতসম শক্তির কাছে রূপার প্রতিটি চেষ্টা যেন ঝড়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া এক অসহায় তৃণখণ্ড।কাজী অফিসের জরাজীর্ণ পরিবেশ দেখে রূপার পা থমকে গেল। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে বাঁধনের দিকে ফিরল সে কন্ঠস্বর তার কাঁপছে,
—-” আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন?”
বাঁধনের নির্বিকারভাবে উত্তর দিল,
—-” তোকে আজ বিয়ে দিবো।”
রূপার কণ্ঠস্বর বিস্ময়ে ক্ষীণ হয়ে এল। সে শুধাল,
—-” মানে?”
বাঁধনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে ধমকের সুরে বলল,

—-” মানে মানে করবি না। চুপচাপ থাক, নতুবা আমার মেজাজ হারালে ভালো হবে না।”
বাঁধন রূপাকে শক্ত করে ধরে অখিলকে ফোন করে আসতে বলল, এরপর লোকেশন পাঠাল আকাশকে। অল্প সময়ের ব্যবধানে আকাশ ও বৃষ্টির উপস্থিতিতে প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠল। পরিস্থিতি অনুধাবন করে আকাশ বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল,
—-” কী হয়েছে বাঁধন? তুই রূপাকে হঠাৎ কাজী অফিসে নিয়ে আসলি কেন?”
বাঁধন আকাশের দিকে তাকিয়ে নিরুত্তর রইল, কেবল আদেশ দিল,
—-” তোকে যা আনতে বলেছিলাম, এনেছিস?”
আকাশ তার পকেট থেকে রূপার জন্মনিবন্ধন এবং তার বাবা-মায়ের পরিচয়পত্র বের করে বাঁধনের হাতে তুলে দিল। বাঁধন সেগুলো গ্রহণ করল। এরপর নিজের পকেট থেকে নিজের প্রয়োজনীয় নথিপত্র বের করে সবগুলো কাগজ কাজী সাহেবের টেবিলের ওপর সশব্দে রাখল। এরপর দৃঢ়কণ্ঠে কাজী সাহেবকে নির্দেশ দিল,

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩১

—-” এই নিন সব কাগজ। কালক্ষেপণ না করে বিয়ের প্রক্রিয়া শুরু করুন।”
বাঁধনের এমন আকস্মিক ও কঠোর নির্দেশনায় কাজী সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। রূপার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল বিয়ে! এসব কী বলছে বাঁধন?বিয়ে মানে?কাজী সাহেব বাঁধনকে পূর্বেই চিনতেন শহরের এসপি হিসেবে তার প্রভাব সবার জানা। চশমাটা কিঞ্চিৎ নামিয়ে, সভয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
—-” স্যার, আপনি বিয়ে মানে? কার বিয়ে, কিসের বিয়ে?”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here