Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৬

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৬

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৬
সুমি চৌধুরী

কানাডার সকাল যেন কোনো তুলির এক ফোঁটা রূপালী আর নীল রঙের নিপুণ ক্যানভাস। সেখানে সকাল মানে কেবল নতুন একটা দিন শুরু হওয়া নয়, সকাল মানে যেন প্রকৃতির নতুন করে শ্বাস নেওয়া।
পাইন আর ফার গাছের সারিবদ্ধ পাতার ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো রোদের স্পর্শে একদম হীরের টুকরোর মতো ঝলমল করে ওঠে। হিমশীতল হাওয়া যখন পাইনের স্নিগ্ধ গন্ধ বয়ে এনে মুখে এসে লাগে, তখন শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় এক অচেনা সজীবতা খেলে যায়। ঘরের কাঁচের জানালাগুলোতে জমে থাকা পাতলা বাষ্প আর বরফের নকশার ওপর ভোরের নরম রোদটা এসে পড়ে এক অদ্ভুত উষ্ণতার পরশ দিয়ে যায়।
শহরের রাজপথগুলো তখনও বেশ শান্ত, স্তব্ধ। দূরে কোথাও বরফজমা লেকের ওপর দিয়ে বয়ে আসা কনকনে হাওয়া আর পাইনবনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সোনালী রোদ। এই দুইয়ের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে কানাডার সকালে। চিমনী থেকে ওঠা হালকা ধোঁয়া আর ফুটপাতে ঝরে পড়া রোদমাখা মেপল পাতার রূপালী স্নিগ্ধতায় চারপাশটা থমথমে অথচ ভীষণ মায়াবী এক শান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।

সকাল ঠিক ছয়টটার দিকে রূপার চোখ জোড়া আলতো করে মেলে উঠলো। ঘুম ভাঙতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করলো কারো একজোড়া প্রবল শক্ত ও সুগঠিত বাহুডোরে। ধীরে চোখ মেলে তাকাতেই সামনে ভেসে উঠলো বাঁধনের ঘুমন্ত, পরম মায়াবী মুখ। বাঁধন তাকে একদম বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কোনো নিষ্পাপ বাচ্চার মতো পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
চোখ খোলার পরপরই রূপার মনে ধীরে ধীরে কাল রাতের বাবা-মার সাথে ঘটে যাওয়া সেই তক্ত ও তিক্ত অতীতের কথাগুলো ভেসে উঠতে লাগলো। এক মুহূর্তে মনটা তার গহীন ভারাক্রান্ত হয়ে এলো। এক বুক উদাসীনতা আর মন খারাপ নিয়ে সে বাঁধনের স্নিগ্ধ ঘুমন্ত মুখের পানে চেয়ে রইলো। বাঁধন ঠিক কতটা শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে। দেখে মনেই হয় না এ সেই কঠোর, উদ্ধত পুরুষটি। মনে হচ্ছে কোনো ছোট্ট নিষ্পাপ শিশু গভীর ঘুমে মগ্ন হয়ে আছে।
বাঁধনের ঘুমন্ত মুখটা দেখতে দেখতে রূপার ব্যাকুল মনটার গহীনে যেন অচেনা এক পরম শান্তি নেমে এলো। মনের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো একচিলতে স্নিগ্ধ হাসি। মনে হলো, এই পুরুষটার বুকের মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে তার জীবনের সমস্ত সুখ আর অপার শান্তি।এই শক্ত বুকটার মাঝেই সে যেন নিজের আস্ত একটা পৃথিবী খুঁজে পাচ্ছে।

হঠাৎ রূপার দৃষ্টি থমকে গেল বাঁধনের বাম ভ্রুর ওপর। যেখানে স্পষ্ট স্লিট করা কাটা দাগ। ইশ। এই একটা দাগের জন্যই বোধহয় বাঁধনকে দেখতে আরও হাজারগুণ বেশি আকর্ষণীয় লাগে। হালকা হেসে নিজের একটি আঙুল আলতো করে তুলে এনে কাটা দাগটার ওপর ছুঁইয়ে দিল রূপা।আঙুলের স্পর্শ লাগতেই ঘুমের আবেশে একটু নড়েচড়ে উঠলো বাঁধন। তা দেখে রূপা দ্রুত নিজের মাথাটা আবার বাঁধনের চওড়া বুকের গহীনে গুঁজে দিয়ে একদম চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরে রইলো।
নিমিষেই বাঁধনের শরীর থেকে ধেয়ে আসা সেই চেনা, মাতাল করা পুরুষালি ঘ্রাণ রূপার নাসারন্ধ্র পেরিয়ে সোজা গিয়ে তার মস্তিষ্কে গভীর দোলা দিল। এক অদ্ভুত অনাবিল শান্তিতে রূপা নিজের চোখ জোড়া আরও শক্ত করে বুজে নিলো। আজ কত শত দিন ধরে এই ঘ্রাণের মায়াবী সুবাস পায় না। কত কাল এই শক্ত বুকটায় নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমায় না। আজকে যেন সবকিছু ফিরে পেয়ে নিজেকে ভীষণ রকম পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এতদিন ধরে হারিয়ে ফেলা নিজের সবটুকু সুখ সে আজ আবার নতুন করে খুঁজে পেয়েছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর রূপা আবার আলতো করে মাথা তুলে চোরের মতো বাঁধনের দিকে তাকালো। তার স্বামীটা তখনও নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে ডুব দিয়ে আছে। পুরুষটা ঘুমালে যেন সত্যি একটু বেশিই সুন্দর লাগে। ঘুমন্ত স্বামীর অনিন্দ্যসুন্দর মুখের পানে পলকহীন চেয়ে থেকে রূপা একদম ফিসফিস করে স্বগতোক্তির মতো বললো,
—-“আপনি কি জানেন,ঘুমালে আপনাকে ঠিক কতটা মায়াবী আর সুন্দর লাগে? মন চায় আপনার এই ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে আমি অনায়াসে গোটা জীবনটা পার করে দিই।”
কথাটা শেষ করেই রূপা নিজের মুখটা ধীরগতিতে এগিয়ে নিয়ে গেল বাঁধনের ফর্সা গালের একদম কাছে। স্বামীর হালকা দাড়িভরা পুরুষালি গালে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল তার নরম, গোলাপি ওষ্ঠ জোড়া। তারপর একদম কানের কাছে মুখটা নামিয়ে পরম আবেশে ফিসফিস করে বলে বললো,

—-” ভালোবাসি।”
পবিত্র শব্দটা উচ্চারণ করেই রূপা লজ্জায় বাঁধনের বুক থেকে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ানোর উপক্রম করতেই হঠাৎ চোখ মেলে তাকালো বাঁধন।এক নিমেষে রূপাকে সজোরে টেনে নিয়ে আবার নিজের বুকের শক্ত বাহুডোরে আটকে ফেললো সে। রমণীর উন্মুক্ত ঘাড়ে মুখ গুঁজে উন্মাদ ফিসফিসানি কণ্ঠে বললো,
—-” আরেকবার বল না”
তীব্র বিদ্যুৎ স্পর্শ লাগার মতো শিউরে উঠলো রূপার সারা দেহ। তার মানে বাঁধন এতক্ষণ জেগেই ছিল? শুধু চোখ বন্ধ করে ঘুমোনোর ভান ধরে পড়ে ছিল? হায় খোদা। তাহলে কি এতক্ষণের সব কাণ্ডকারখানা, সব কথা সে একদম স্পষ্ট শুনে ফেলেছে?মুহূর্তের মধ্যে ভীষণ লজ্জায় রূপার ফর্সা গাল দুটো আপেলের মতো টকটকে লাল হয়ে উঠলো।রমণীর অনাবৃত ঘাড়ে নিজের নাক ঘষে মাতাল করা আবেশ ছড়িয়ে বাঁধন আবদার করলো।
—-” এই, বল না প্লিজ,আরেকবার বল।”
লজ্জায় থরথর করে কাঁপা গলায় রূপা কেবল এতটুকু শুধানো ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলো না,
—-” আ-আপনি এতক্ষণ জেগে ছিলেন?”
ঠোঁটের কোণে একচিলতে গভীর হাসি ঝুলিয়ে বাঁধন খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিল,

—-” হুম”
লজ্জায় দুই চোখ শক্ত করে বুজে ফেললো রূপা। তার মানে লোকটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব জেনেবুঝে নিঃশব্দে নাটক দেখছিল? সে যে গালে চুমু খেয়েছে, সেটাও বাঁধন খুব ভালো করেই ধরে ফেলেছে।ভীষণ লজ্জায় ছটফট করতে করতে বাঁধনের শক্ত বাহুডোর থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু শুরু করলো রূপা। বাঁধন তাকে ছাড়ার বদলে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পেঁচিয়ে নিল। তারপর রূপার রক্তিম মুখের দিকে তাকিয়ে ভারী, গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

—-“নড়বি না মাফিয়ার বা’চ্চা
রূপা কোনোমতে মিনতি মাখা গলায় বললো,
—-” ধুর।ছাড়ুন তো, আমি এখন উঠবো।”
রমণীর সংবেদনশীল কানের লতিতে নিজের তপ্ত ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললো পুরুষটি,
—-” ছাড়বো। তার আগে ওই শব্দটা আরেকবার বল না।”
বুকের ভেতর ঢোল পেটার মতো শব্দ হতে লাগলো রূপার। ভয়ে আর আড়ষ্টতায় শুকনো ঢোক গিলে অজানার ভান করে বললো,
—-” কী-কী বলবো?”
ঘুমজড়ানো, আধবোজা চোখে রূপার ফর্সা চেহারার পানে চেয়ে পরম আকুলতায় নেশালো গলায় শুধালো বাঁধন,
—-” একটু আগে যে নিজের মুখে বললি ‘ভালোবাসি’ওই কথাটা আরেকবার বল না, প্লিজ।”
তব্দা খেয়ে যাওয়ার মতো একদম অবুঝ ভান করলো রূপা। হায় খোদা ।লোকটা তাহলে সত্যিই সবটা একদম স্পষ্ট শুনে নিয়েছে। নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে চরম অবাক হওয়ার ভান ধরে তোতলাতে তোতলাতে বললো,
—-” আ-আমি,আমি আবার কখন বললাম ভালোবাসি? ধুর! আমি কিচ্ছু বলিনি, আপনি নির্ঘাত একদম ভুল শুনেছেন।”
রূপার মুখে এমন ডাহা মিথ্যা কথা শোনামাত্রই, এক ঝটকায় নিজেকে রূপার ওপর উঠিয়ে নিয়ে এলো বাঁধন।পাহাড়ের মতো চওড়া আর সুগঠিত পুরুষালি শরীরের ওজনে এক মুহূর্তে যেন চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার মতো দশা হলো রমণীর। গায়ের সেই অনমনীয় ওজনের নিচে পড়ে কুঁকড়ে কেঁদে ওঠার ভঙ্গিতে বলে উঠলো।
—-” উফফ। কি ভার নামুন প্লিজ।”
বাঁধন সরলো তো নাই-ই, বরং নিজের শরীরের সমস্তটা ভার যেন রমণীর ওপর ছেড়ে দিল। বাঁ হাতটা রমণীর পিঠের নিচে গলিয়ে দিয়ে ওকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে পিষে ধরলো। তারপর ডান হাতের আঙুল দিয়ে রমণীর মুখে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো রেশমি চুলগুলো আলতো করে সরাতে সরাতে রসিকতা করে বললো,
—-” আমার সামান্য এটুকু ওজনেই তোর এমন আকুপাকু দশা? তাহলে এর চেয়েও গভীরে গিয়ে আমার এই বেপরোয়া আদর কীভাবে সহ্য করবি বল তো?”

পুরুষটার এমন লাগামহীন, সরাসরি তপ্ত কথায় আক্ষরিক অর্থেই শিউরে উঠলো রমণী।তীব্র লজ্জায় ওষ্ঠজোড়া তিরতির করে কেঁপে উঠলো তার, কান দিয়ে যেন অদৃশ্য ধোঁয়া বের হতে লাগলো। কন্ঠনালী দিয়ে শব্দ ফোটার ক্ষমতাটুকুও হরণ হয়ে গেল নিমিষে।রমণীর সেই কেঁপে ওঠা নরম গোলাপি ঠোঁট দুটো তীক্ষ্ণ চোখ এড়াতে পারলো না বাঁধনের। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের কোণে লেগে থাকা সামান্য হুশটুকুও ধুলোয় মিশে গিয়ে মারাত্মক এক অন্ধ নেশায় রূপ নিল। নিজেকে আর সামান্যতম সামলে রাখতে পারলো না সে। তৎক্ষণাৎ ঝুঁকে পড়ে রূপার কথা বলতে যাওয়া ঠোঁটজোড়া নিজের তপ্ত ঠোঁটের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো।
অতর্কিত ঝড়ে পুরো শরীরটা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠলো রমণীর।বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আসলো সমস্ত দেহখানা। পুরুষটির প্রগাঢ় আবেশ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর কথা যেন মাথা থেকেই উবে গেল রমণীর। চারপাশ ঘিরে ধরলো এক অদ্ভুত, মিষ্টি ভালো লাগার মায়াজাল। মনের অজান্তেই কাঁপতে থাকা দুটো হাত উঠে গিয়ে গলিয়ে গেল পুরুষটির মাথার অবাধ্য ঘন চুলগুলোর ভাঁজে।

রমণীর প্রচ্ছন্ন সাড়াটুকু পেতেই বাঁধন যেন এক লহমায় আরও বেপরোয়া ও উন্মাদ হয়ে উঠলো। ঠোঁটের গভীর ছোঁয়া আলগা করে রূপার কাঁধের জামাটা এক টানে কিছুটা নিচে নামিয়ে অনাবৃত করে দিল ধবধবে ফর্সা কাঁধ। সেই উন্মুক্ত ঘাড়ে ও গলায় নিজের ভিজে ঠোঁটের উগ্র পরশ বসাতে লাগলো। স্বামীর এমন আচমকা আবেশ আর উন্মাদনায় রূপা যেন আকাশ থেকে পড়লো।নিজেকে কীভাবে সরাতে হয়, সেই সংজ্ঞাটুকুও তার মস্তিষ্ক ভুলে বসে আছে।স্রেফ এক নির্জীব মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইলো।
কানাডার ভোরের আলো যত ফুটছে, রূপার ওপর বাঁধনের স্পর্শের তীব্রতাও তত গভীর থেকে গভীরতম হচ্ছে। রমণীর নীরব আর মাতাল সায় পেয়ে যেন নিজের আস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে বাঁধন। উন্মাদনায় কী করছে না করছে, তার হুঁশটুকুও যেন নিজের মাঝে অবশিষ্ট নেই।দুই আত্মার ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস যখন ঘরের বাতাসকে উত্তপ্ত করে তুলছিল, ঠিক তখনই বাইরে থেকে ঘরের বন্ধ দরজায় সশব্দে নক পড়লো।

‘ঠক… ঠক… ঠক…’
সেই শব্দে এক মুহূর্তের মধ্যে যেন চেতনা ফিরে এলো বাঁধনের। ঘোর কাটিয়ে চট করে রূপার দিকে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা শক্ত করে দুই চোখ বন্ধ করে হালকা থরথর করে কাঁপছে, আর তীব্র লজ্জায় তার গাল দুটো পেকে যাওয়া টকটকে লাল আপেলের মতো হয়ে আছে।এতক্ষণ রূপার সাথে কতটা গভীরে হারিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরজার টোকায় হুঁশ ফিরতেই বাঁধনের মাথার রগগুলো যেন রাগে রিঅ্যাক্ট করে উঠলো। আর সবচেয়ে বড় কথা রূপা তাকে একটুও ঠেলে সরিয়ে দেয়নি, মেয়েটাও যে তাকে ব্যাকুলভাবে কাছেই চেয়েছিল। ঠিক সেই অপূর্ব মেলবন্ধনের মুহূর্তে কোন হাভাতে এসে দরজায় টোকা মেরে সব নষ্ট করলো? যে-ই হোক, আজকে তার হাড়-মাংস একটাও আস্ত রাখবে না বাঁধন।
এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে সোজা বাঘের মতো গর্জে ওঠার ভঙ্গিতে দরজার দিকে পা বাড়ালো বাঁধন। ওদিকে রূপা চরম লজ্জায় হাত-পা কাঁপিয়ে দ্রুত নিজের এলোমেলো পোশাক আর স্তনাবৃত জামার ভাঁজগুলো ঠিকঠাক করে টেনে নিল।বড় বড় পা ফেলে রাগে রীতির মতো ফুঁসতে ফুঁসতে গিয়ে ‘ধড়াম’ করে দরজাটা এক টানে খুলে দিল বাঁধন।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ওমর৷ ওমরের চোখজোড়া বাঁধনের লাল হয়ে থাকা হিংস্র মুখ আর উসকোখুসকো চেহারার দিকে পড়তেই বুকের ভেতরটা ‘ধক’ করে উঠলো। মুহূর্তে বুঝে গেল নির্ঘাত এমন কোনো চরম রোমান্টিক মুহূর্তে গিয়ে ধাক্কা দিয়েছে, যার মাশুল তাকে চড়া দামে দিতে হতে পারে।বাঁধন একদম আগুনের দৃষ্টিতে ওমরের দিকে তাকিয়ে ঘন ঘন হাঁপাতে লাগলো, যেন এক ফুঁয়ে ওকে উড়িয়ে দেবে। বাঁধনের এমন বিধ্বংসী রূপ দেখে ওমরের পেটের ভেতর আত্মার পানি শুকিয়ে কাঠ!।তবুও নিজেকে বাঁচাতে মুখে মেকি হাসির রেখা টেনে, দাঁত কেলিয়ে হাত দুটো তুলে ফেললো সে,
—-” ভাই আমার কোনো দোষ নেই। আমি আসতে চাইনি। নিচে আকাশ ব্রো এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে পাঠালো। বলল তোদের নাকি কোথায় যাওয়ার কথা আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে তাই তোকে ডেকে তুলতে বলল।”
আকাশের নাম শুনতেই বাঁধনের রাগের আঁচটা যেন থমকে গেল। চোয়াল শক্ত করে একটা দীর্ঘ ও উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে কঠিন গলায় বললো,

—-” ঠিক আছে, যা আমি নামছি।”
কথাটা শোনামাত্রই ওমর আর এক সেকেন্ডও সেখানে থমকে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সোজা সিঁড়ি দিয়ে এমনভাবে দৌড় লাগাল, যেন খাঁচা থেকে কোনো হরিণ জীবন বাঁচাতে বাঘের হাত থেকে পালিয়ে আসছে।এক নিঃশ্বাসে নিচে এসে সোফায় আছড়ে পড়ে এমনভাবে হাঁপাতে লাগলো যে বুকটা ওপর-নিচ করছিল। ওমরের এই অদ্ভুত হাল দেখে নিক্সি ভ্রু জোড়া কুঁচকে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
—-” কী রে ওমর? এমন হাঁপাচ্ছিস কেন? মনে হচ্ছে ডাকাতি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা খেয়ে দৌড়ে এসেছিস।”
ওমর বুকের ওপর হাত রেখে জিব বের করে বললো,
—-” ধুর ব্যাটি, ডাকাত ধরলেও এত ভয় পেতাম না। তার চেয়েও ডেঞ্জারাস দৃশ্য দেখে এসেছি।”
আকাশ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
—-” কেন কী হয়েছে? বাঁধন উঠেছে?”
সোফায় মাথাটা পেছনের দিকে কাত করে দিয়ে ওমর একদম করুণ মুখে বললো,
—-” চরম ভুল সময়ে দরজায় নক করে ফেলেছি ভাই। মনে হয় ভেতরে রোমান্স চলছিল। দরজা খুলেই বাঁধন যেভাবে চোখ দুটো লাল করে আমার দিকে চণ্ডাল রাগে ফুঁসছিল ভাইরে ভাই, একটুর জন্য আজ আমার জানটা বেঁচে গেছে।”

কথাটা শোনামাত্রই উপস্থিত অ্যান্সি, নিক্সি আর জেইন আর নিজেদের সামলাতে পারল না একসাথে হো হো করে ফিক করে হেসে উঠলো।নিক্সি পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে বললো,
—-” হায় রে ওমর। তুই এতটা অলক্ষুণে আর অভদ্র হয়ে গেছিস? আজকাল মানুষের এত সুন্দর ব্যক্তিগত রোমান্সেও গিয়ে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছিস? ছি ছি ছি, নিজের ওপর নিজের একটুও দয়া-মায়া হয় না?”
ওমর অমনি রাগে রগ ফুলিয়ে চণ্ডাল চোখে নিক্সির দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো,
—-” মুখ সামলে কথা বলবি পেত্নি! আবার যদি খালি উল্টাপাল্টা কথা বলিস, তোকে কিন্তু আমি চিবিয়ে খেয়ে ফেলবো! আমি কি জানি নাকি যে ঘরের ভেতর ওরা সকাল সকাল রোমান্স পাকাচ্ছে? সব এই আকাশ আর তোদের দোষ। তোরা যদি আমাকে জোরাজুরি করে ধাক্কা দিয়ে উপরে না পাঠাতি, আমি কি ওদিকে যেতাম?”

ওদিকে বাঁধন নিচে নামার আগে রূপাকে জলদি রেডি হয়ে নিতে বলেছে। রূপা তাই ক্যান্ডিকে ড্রেসিং টেবিলের পাশে একটা টুলে বসিয়ে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চটজলদি গুছিয়ে নিচ্ছে।রেডি হয়ে ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ির বাইরে আসতেই রূপার চোখ চড়কগাছ।সামনে দাঁড়িয়ে আছে নজরকাড়া চেরি-রেড রঙের Convertible Car, যার ওপরের ছাদটা সম্পূর্ণ খোলা। পেছনের সিটে অ্যান্সি আর নিক্সি বিন্দাস মেজাজে মুখোমুখি বসে একে অপরের সাথে আড্ডায় মেতে আছে। আর ফ্রন্ট ড্রাইভিং সিটে সানগ্লাস চোখে হেলান দিয়ে বসে বিন্দুমাত্র পাত্তাহীন ভঙ্গিতে ফোন স্ক্রল করছে বাঁধন।
বাঁধনকে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে থাকতে দেখেই সকালের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তপ্ত ছোঁয়ার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে রূপার সারা মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠলো। লোকটার মুখোমুখি দাঁড়াতেও কেমন যেন ভীষণ আড়ষ্ট আর লজ্জা লজ্জা লাগছে, এক কদম সামনে এগোতেই পারছে না সে।আড্ডা মারতে মারতে হঠাৎই অ্যান্সির দৃষ্টি গিয়ে পড়লো বেশ খানিকটা দূরে ইতস্তত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার ওপর। সে সাথে সাথে উৎফুল্ল হয়ে হাত ইশারা করে ডেকে উঠলো,

—-” এই যে রূপা! ওখানে কাঠপুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো এসো, তাড়াতাড়ি গাড়িতে এসে বোসো।”
অ্যান্সির গলা পেয়ে ফোন থেকে কেবল এক পলকের জন্য নীলচে চোখ জোড়া তুলে রূপার দিকে তাকালো বাঁধন। কিন্তু এক মুহূর্তেই নজর সরিয়ে নিয়ে আবারও উদাসীন ভঙ্গিতে ফোনের স্ক্রিনে মন দিল।রূপা ধীর পায়ে, সংকোচে দু-পা পিছিয়ে আবার এগিয়ে কোনোমতে হেঁটে এসে গাড়ির পাশে এসে জড়সড় হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু সামনে আর পেছনে সিটগুলো দেখে সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না কোথায় গিয়ে বসবে।ক্যান্ডিকে কোলে চেপে ধরে বোকার মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।তা দেখে পেছনে বসা নিক্সি একগাল হেসে তাগাদা দিয়ে বলল,

—-” আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন বলতো? উঠে পড়ো।”
রূপা একটু আমতা আমতা করে, ভীষণ ইতস্তত কণ্ঠে ভেজা গলায় শুধালো,
—-” ইয়ে, মানে আমি ঠিক কোথায় বসবো?”
অ্যান্সি রূপার হাবভাব দেখে হেসেই আকুল। হাত নেড়ে রসিকতা করে বললো,
—-” এটা আবার কেমন কথা রূপা? কোথায় বসবে মানে? তোমার হিরোকে কি চোখে দেখছ না? চুপচাপ আর ইতস্তত না করে তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে বসে পড়ো তো।”
রূপা আড়ষ্ট হয়ে আমতা আমতা করে বললো,
—-” আসলে আপু, আমি বরং তোমাদের সাথেই পেছনে গিয়ে বসি?”
অ্যান্সি ভ্রু দুটো নাচিয়ে বলল,
—-” পেছনে আবার কোথায় বসবে শুনি? কার কোলে চড়বে? পেছনে তো মাত্র দুটোই সিট, আর সেখানে অলরেডি আমরা দুজন জাঁকিয়ে বসে পড়েছি।”

রূপা এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখল সত্যি তো।গাড়ির পেছনে দুটো ছাড়া আর কোনো খালি সিটই নেই, আর সেগুলোতে অ্যান্সি আর নিক্সি জায়গা দখল করে বসে আছে। চরম অসহায় হয়ে মাথা নিচু করে নিজের পায়ের জুতো দেখতে লাগল রূপা। বাঁধনের ঠিক পাশের সিটটায় গিয়ে বসতে ভাবলেই তার হাত-পা লজ্জায় কাঁপছে, চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না।
আড়চোখে রূপার লাল টকটকে হয়ে যাওয়া থরথরে মুখটার দিকে তাকাল বাঁধন। চট করেই বুঝে ফেলল তার ওপর রেগে নেই বউটা, সকালের উত্তপ্ত মুহূর্তগুলোর কথা ভেবে কেবল লজ্জায় মরে যাচ্ছে। নিমিষে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু হাসিটা চেপে নিয়ে মুখটা ভীষণ গম্ভীর করে ফেলল সে। ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে রূপার দিকে তাকিয়ে রূঢ় গলায় বললো,

—-” নাটক না করে গাড়িতে উঠে বোস।”
গম্ভীর আদেশের সুরটা কানে যেতেই রূপার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। লজ্জার পারদ যেন এক লাফে শতগুণ বেড়ে গেল।মন চাইছে এই মুহূর্তে মাটি ফাঁক হলে সে সোজা ভেতরে সেঁধিয়ে যায়। কোনো উত্তর দিল না সে, আর গাড়িতে উঠতেও পারল না। চুপচাপ মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইল।রূপার এই অনড় অবস্থা দেখে বাঁধন একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর পেছনে অ্যান্সির দিকে তাকিয়ে রূপাকে ক্ষেপানোর জন্য স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বললো,
—-” অ্যান্সি, তুই এক কাজ কর, সামনে এসে বোস। রূপা তোর জায়গায় পেছনে গিয়ে বসুক।”
কথাটা শোনামাত্রই রূপার ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। বাঁধনের ঠিক পাশে এসে বসবে অ্যান্সি? না না। অ্যান্সি যতই ভালো মেয়ে হোক, কিংবা বাঁধনের যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন। নিজে স্বামীর পাশের সিটে অন্য কোনো মেয়ে বসবে, তা রূপা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না।কখনোই না।সব লজ্জা-সংকোচ এক মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল। ঝট করে মাথা তুলে জেদের সুরে বলে উঠল।

—-” না”
কথাটা বলা মাত্রই আর এক সেকেন্ড দেরি না করে রূপা ঝড়ের বেগে গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল টেনে বাঁধনের পাশের সিটে ধপ করে বসে পড়ল। রূপার কাণ্ড দেখে পেছনের সিটে বসে থাকা অ্যান্সি আর নিক্সি আর নিজেদের সামলাতে পারল না। একসাথে ফিক করে হেসেই গড়িয়ে পড়ল। ওদের এই বাঁধভাঙা হাসির শব্দে রূপার মনে হলো ইস, লজ্জায় নিজের গালে নিজেই চড় মারি এখন।
বাঁধন রূপার দিকে ঝুঁকে এলো। সীট বেল্টটা টানতে টানতে রমণীর কানের একদম কাছে মুখ এনে মাতাল ফিসফিসানিতে বললো,

—-” সকালে যেটা হলো, ওটা তো স্রেফ ট্রেইলার ছিল পাখি! সামান্য এটুকুতেই তোর যদি এমন কাঁপাকাঁপি হাল হয়, তবে যেদিন পুরো পিকচার শুরু হবে সেদিন তো মনে হয় লজ্জায় আর কোনোদিন ঘর থেকেই বেরবি না!”
লজ্জার প্রচণ্ড এক তীব্র ঢেউয়ে রূপার দুটো কান যেন ঝাঁঝাঁ করে উঠলো! ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তে অদৃশ্য কোনো চাদরে নিজেকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলি।সিট বেল্টটা আটকে দিয়ে বাঁধন একটা লম্বা শ্বাস ফেললো, তারপর গাড়ি স্টার্ট দিল। ধীর গতিতে চাকা গড়িয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা রাজপথে উঠে এলো লাল রঙের কনভার্টিবলটা।কিছুক্ষণ চুপচাপ যাওয়ার পর হুট করেই রূপার মাথায় আকাশ, জেইন আর ওমরের কথা মনে পড়ে গেল। সে পেছনে ঘুরে অ্যান্সির দিকে তাকিয়ে শুধালো,
—-” আচ্ছা আপু আকাশ ভাইয়া, জেইন আর ওমর ভাইয়াদের তো দেখছি না? উনারা কোথায়?”
অ্যান্সি মুচকি হেসে বলল,
—-” ওরা তো অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। তোমাকে দারুণ একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার চক্করে পড়েছে তিনজন, সেটাই রিসিভ করতে গেছে।”

কানাডার এপ্রান্তের একটা ঘরে স্টাডি টেবিলে শুয়ে উদাস মনে ডায়রিতে আঁকাবাঁকা দাগ কেটে চলেছে বৃষ্টি। গত কটা দিন ধরে তার কোনো কিছুতেই একদম মন বসছে না। এত মায়াবী কানাডা শহরে এসেও কোথাও বেরোতে ইচ্ছে করছে না তার। সারাক্ষণ নিঃসঙ্গ ঘরে একা একা বন্দি হয়ে আছে।
বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে তার। প্রাণপ্রিয় বেস্টি রূপাকে বড্ড বেশি মনে পড়ছে, মেয়েটার সাথে একটু মন খুলে কথা বলতে পারলে যেন প্রাণটা বাঁচতো।
আর এই সবকিছুর মাঝে বুকের গহীন হৃদপিণ্ডে একটা পুরুষের তীব্র অনুভূতির জন্য অবিরাম হাহাকার করে মরছে বৃষ্টির অবাধ্য মন।আর সেই পুরুষটি আর কেউ নয়, স্বয়ং আকাশ! কানাডায় পা রাখার পর থেকেই অবিশ্বাস্য রকমভাবে মনে পড়ছে আকাশ স্যারকে। তীব্র ইচ্ছে করছে একবার লোকটার গলার আওয়াজ শুনতে, এক নজর ওই চেনা রাগী মুখটা দেখতে!

কেন এই লোকটাকে নিয়ে মনের গহীনে এত ব্যাকুলতা? আগে তো কখনও এমনটা হতো না! তবে এত শত মাইল দূরে এসে কেন বুকের ভেতর এত হাহাকার? কোনো প্রশ্নের সমীকরণ মিলাতে পারছে না বৃষ্টি কষ্টে, অননুভূত যন্ত্রণায় বুকটা যেন ফেটে ছড়িয়ে যাচ্ছে।হঠাৎ খাতার পাতার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো সে! হিজিবিজি আঁকাবাঁকা দাগগুলোর চেয়ে সে অজান্তেই খাতার পাতায় অসংখ্যবার ‘আকাশ’ নামটা লিখে ফেলেছে! এতগুলো নাম একসাথে দেখে যেন তীব্র একটা শক খেল বৃষ্টি। বড় বড় চোখে পলকহীন তাকিয়ে রইলো নামটার দিকে।এসবের মানে কী? কেন এই অজানা অনুভূতি, কেনই বা এই অবুঝ হাহাকার? তবে কি সে আকাশকে ভালোবেসে ফেলেছে? ভাবতেই ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে বিড়বিড় করলো,

—-” তবে কি আমি আকাশ স্যারকে ভালোবেসে ফেললাম?”
কথাটা মুখ দিয়ে বের হতেই নিজের জিভে নিজেই কামড় বসালো সে। স্বগতোক্তি করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
—-” ছিঃ ছিঃ। আমি এসব কী হাবিজাবি ভাবছি? বৃষ্টি, এসব কিচ্ছু না।ওই হিটলার আকাশকে তুই কিছুতেই ভালোবাসতে পারিস না, কিছুতেই না।”
অদ্ভুত লজ্জায় ও আবেশে খাতার সেই নাম লেখা পাতাটা এক টানে ছিঁড়ে ফেললো বৃষ্টি। নিমিষে কাগজটা হাতের তালুতে পিষে একটা গোল বলের মতো বানিয়ে রাগের মাথায় দরজার দিকে ছুড়ে মারলো।আর ঠিক তখনই সেই কাগজের গোল বলটা সোজা গিয়ে আঘাত করলো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কারো মাথার ওপর।তড়িৎ গতিতে দরজার দিকে তাকাতেই বৃষ্টির চোখ যেন একদম কপাল আর কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম! বুকের ভেতরের পুরো স্পন্দনটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য একদম থমকে স্তব্ধ হয়ে গেল, আর পর মুহূর্তেই হার্টবিট হাজার গুণ গতিতে লাফাতে শুরু করলো।

দরজার ফ্রেমে পরম আবেশে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খোদ আকাশ।সে বেশ কিছুক্ষণ আগেই এসেছে। নিঃশব্দে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রমণীর প্রতিটা ছোটখাটো পাগলামি আর কাণ্ডকারখানা প্রাণ ভরে দেখছিল।কিন্তু এই মুহূর্তে দরজায় আকাশকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বৃষ্টির মনে হলো সে নির্ঘাত চরম কোনো অলীক স্বপ্ন দেখছে। এই ধড়িবাজ লোকটা কি শেষমেশ তাকে স্বপ্নেও ছাড়বে না? স্বপ্নে এসেও এভাবে পিছু তাড়া করে বেড়াবে? দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র রাগ আর ব্যাকুলতা নিয়ে বিড়বিড় করলো,
—-” উফফ। এই লোকটা নিজেকে কী ভাবেন বলতো? স্বপ্নের মাঝেও কীভাবে স্পষ্ট আর জলজ্যান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

মাথায় এসে লাগা কাগজের গোল বলটা এক হাতে নিপুণভাবে লুফে নিল আকাশ। ভ্রু জোড়া কুঁচকে একবার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে চট করে কাগজটার ভাঁজ খুলতে শুরু করলো।সাথে সাথে চোখ দুটো একদম ছানাবড়া হয়ে গেল বৃষ্টির! হায় হায়, এই লোকটা স্বপ্নে এসেও তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না? খাতার ছেঁড়া পাতায় যে সারা পাতা জুড়ে উনার নামটাই থরে থরে লেখা আছে, সেটা দেখে ফেললে তো জীবনটাই একদম শেষ। তৎক্ষণাৎ বৃষ্টি ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে অতিষ্ঠ হয়ে বলে উঠলো,

—-” স্যার! পাতাটা একদম খুলবেন না, জলদি ওটা দিয়ে দিন! আপনি আমার স্বপ্নে এসে আমার জিনিসপত্র এভাবে হাতাতে পারেন না, একদম না।”
বৃষ্টির এমন আজব আর অবিশ্বাস্য কথা শুনে একদম তব্দা খেয়ে গেল আকাশ।কপালে পড়ে গেল সূক্ষ্ম চিন্তার খাঁজ। মেয়েটা কী ভুলভাল বকছে? সে স্বপ্নে এসেছে মানে? তার মানে বৃষ্টি তাকে সত্যি সত্যি চোখের সামনে দেখেও স্রেফ একটা অবাস্তব স্বপ্ন ভেবে বসে আছে?

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৫

কাগজের ভাঁজ খোলা ওখানেই মুলতবি রেখে দিশেহারা রমণীর ব্যাকুল চোখের পানে একদৃষ্টে চেয়ে আকাশ ধীর, গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
—-” ফোকাস বৃষ্টি। নিজেকে একটু সামলাও। এটা কোনো স্বপ্ন নয়, আমি সত্যি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here