বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৬
রানী আমিনা
অ্যানিম্যাল টাউনের হসপিটালটির সামনের ফাঁকা বেঞ্চ গুলোর একটিতে বসে ফ্যালকন। চোখজোড়া ভয়ানক রক্তিম। সামনে একটি পানির গ্লাস রাখা, তা থেকে এক ফোটা পানিও গলাধঃকরণ করেনি সে৷
বার্ডি নেই বারো ঘন্টা পেরিয়ে গেছে, এখনো পানি খেতে পারেনি ফ্যালকন। বুক জুড়ে পিপাসা, অথচ ওই পানির গ্লাস তার ঠোঁট অব্দি পৌছুতে পারছে না! বার্ডির মৃতদেহ রাখা পাশেই। সাদা কাপড়ে ঢাকা, নিঃসাড়। সেদিকে তাকাচ্ছে না ফ্যালকন, বুকে ভীষণ রকম মোচড় দিচ্ছে তার৷
লিন্ডা বসে ফ্যালকনের বিপরীতে, ফ্যালকনকে বারংবার একটু পানি খেতে অনুরোধ করে চলেছে সে, কিন্তু ফ্যালকনকে গ্রাস করেছে আজ স্তব্ধতা। সে এক দৃষ্টে চেয়ে পানির গ্লাস টার দিকে, চোখের পলক টুকুও যেন পড়ছে না।
ফাতমা, শার্লট আর ব্রায়ান পাশেরই একটি গাছ তলায় বসে৷ ক্লান্ত শার্লট ব্রায়ানের গায়ের ওপর এলিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ফাতমা শুকনো মুখে চেয়ে আছে শূন্যে। স্বল্পদিনের সঙ্গিনী টিকে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে আছে তারা!
পাশে একটি বনফায়ার৷ সেখানে কড়কড় শব্দে খড়কুটো পুড়ছে। ব্রায়ান আগুন করেছে৷ তার শোকাতুর সঙ্গী গুলোর ভালো মন্দের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। আপনিই তুলে নিয়েছে সে, এই সামান্য দায়িত্ব পালন করতে না পারলে অ্যানার সামনে গিয়ে সে কিভাবে দাঁড়াবে? অ্যানা কি তাকে কাপুরষ ভাববে না?
এমন সময় দূর থেকে ভেসে এলো ভারী পদশব্দ, কেউ আসছে, এদিকেই। সতর্ক হয়ে গেলো ব্রায়ান। লিন্ডা হাতে একটি রামদা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তৎক্ষনাৎ, তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে দেখতে রইলো অন্ধকার জঙ্গলের দিকে। এগিয়েও গেলো দুকদম। তখনি ভেসে এলো কোকোর আস্বস্ত করা কন্ঠস্বর,
“আমি, ভয় নেই৷”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পরক্ষণেই অন্ধকার ভেদ করে রেক্সাকে কোলে নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছলো কোকো।
কোকোর কন্ঠস্বর যেন লিন্ডার ভেতর প্রাণসঞ্চার করলো! স্বস্তিতে চোখ মুদে আসা মাত্রই মুক্তোর মতোন দুফোটা পানি আলগোছে গড়িয়ে পড়লো তার চোখ বেয়ে। ফুপিয়ে উঠে রামদাটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে গিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো সে কোকোকে। ডুকরে কেঁদে বলে উঠলো,
“ভাইজান, আমাদের বার্ডি আর নেই ভাইজান… মরে গেছে ও! দেখো, ফ্যালকনও কিছুই মুখে তুলছে না—একটু পানিও খাচ্ছে না ও। তুমি ওকে একটু বকে দাও না ভাইজান, ও কেন এমন করছে? ও যে একদম পানি খাচ্ছে না!”
কোকো থমকালো ক্ষণিকের জন্য, চোখ গেলো তার বেঞ্চের ওপর স্থীর বসে থাকা ফ্যালকনের দিকে, পরক্ষণেই নজরে এলো পাশের বেঞ্চে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি নিথর দেহ।
সন্তর্পণে একটি শ্বাস ছেড়ে একহাতে লিন্ডাকে শক্ত করে আগলে নিলো সে। লিন্ডা অবশেষে একটি ভরসার হাত পেয়ে আলোর প্রদীপ দেখলোযেন! কিছুক্ষণ আগেও বোধ হচ্ছিলো এই পৃথিবীতে ও একা হয়ে পড়েছে, ওর মাথার ওপর আজ আর কারো ছায়া নেই! চারদিকে এত এত মৃত্যু সংবাদ শুনে সে ভেবছিলো এবার বোধ হয় তার কোকো ভাইজানকেও হারাতে হবে। কোকোকে পরিপূর্ণ সুস্থ সবল দেখে ওর রোবোটিক হাতখানা জাপটে ধরে পড়ে রইলো সে।
রেক্সাকে কোকোর কোলে আহত অবস্থায় দেখতে পেয়ে ফাতমা উঠে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে এলো সেখানে। লিন্ডা ফোপাতে ফোপাতে কোকোকে বার্ডি মারা যাওয়ার সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো কোকো। আহত রেক্সাকে লিন্ডা আর ফাতমার দায়িত্বে দিয়ে এসে বসলো ফ্যালকনের পাশে। ফ্যালকন নিশ্চুপ, চোখ জোড়া স্থীর তার। কোকো ডাকলো একবার,
“ফ্যালকন….!”
ফ্যালকন কেঁপে উঠলো সামান্য, কিন্তু কোনো উত্তর এলোনা তার থেকে। কোকো নরম স্বরে বলে উঠলো,
“লাশ থেকে গন্ধ ছড়াচ্ছে ফ্যালকন, সৎকারের ব্যাবস্থা করতে হবে। এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না৷ আমাদেরকে ফিরতে হবে আবার, আমাদের কাঁধে এখন অনেক দায়িত্ব।”
ফ্যালকনের ঠোঁট নড়লো সামান্য, শুকিয়ে যাওয়া চোখ জোড়া আবার ভিজে আসতে শুরু করলো তার!
এমন সময় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সশব্দে কাউকে এদিকে আসতে শুনে সতর্ক চোখে জঙ্গলের দিকে ফিরলো কোকো। মাটি থেকে লিন্ডার ফেলে রাখা রামদাটা নিজের রোবটিক হাতে তুলে নিয়ে সে এগিয়ে গেলো সামনে। ক্ষণ পেরোতেই চোখে পড়লো আনাবিয়ার সফেদ চুলের বাহার, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে শুভ্র চুল নৌকোর পালের মতোন উড়িয়ে ঝড়ো গতিতে এগিয়ে আসছে সে এদিকেই।
কোকো রামদাটা ফেলে এগিয়ে গেলো ছুটে। আনাবিয়া কে দেখে নেমে এলো নিচে। কোকো আনাবিয়ার বাহুবন্ধনীতে আহত লিওকে দেখা মাত্রই আঁতকে উঠে ওকে নামাতে সাহায্য করতে করতে শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে আম্মা লিওর? ও ঠিক আছে তো?”
“বুলেট লেগেছিলো, বের করা হয়েছে। ব্লাড লাগবে, জঙ্গলের প্রাণী গুলোকে যেখানে রাখা হয়েছে সেখান থেকে ওর গোত্রের কাউকে এখুনি এখানে হাজির কর কাউকে দিয়ে৷ ডক্তার আছে তো এখানে?”
“জ্বি আম্মা, আছেন তিনি। আমি এখনি ব্রায়ানকে পাঠাচ্ছি।”
কোকো লিওকে কাঁধের ওপর তুলে নিতে গেলে আনাবিয়া ওর ডান হাত খানা ছুয়ে কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে বলল,
“তোর হাত…! ব্যাথা আছে?”
“না আম্মা, একদম ব্যাথা নেই, আমি একদম ঠিক আছি। আপনি চিন্তা করবেন না৷”
আনাবিয়ার হাতের ওপর হাত রেখে বলল কোকো। ক্ষণিক বিরতি দিয়ে চাপা, ইতস্তত স্বরে বলে উঠলো,
“আম্মা….! আপনি কি কারো মৃত্যুসংবাদ পেয়েছেন?”
আনাবিয়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো তৎক্ষনাৎ, আঁতকে উঠে শঙ্কিত, উৎকন্ঠিত গলায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধোলো,
“আমাদের কেউ কি……!”
“আম্মা…. আম্মা, শান্ত হোন!”
“কে….?”
শুধোলো আনাবিয়া, চোখ ভরে আসতে চাইলো তার জলে। বুকের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে ভাঙতে রইলো। কোকো চাপা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আম্মা, ফ্যালকনকে…”
কিন্তু তার কথা শেষ করতে দিলো না আনবিয়া, ফুপিয়ে উঠে বলল,
“আমার ফ্যালকনের কি হয়েছে?”
“ফ্যালকনের কিছু হয়নি আম্মা, আমরা….. আমরা বার্ডিকে হারিয়ে ফেলেছি আম্মা! মেশিনগানের বুলেট লেগেছিলো, বাঁচানো যায়নি।”
আনাবিয়ার বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস তীরের মতোন বেরিয়ে এলো যেন। চোখ বন্ধ করে নিলো সে।
এমনটা কিভাবে হতে পারে? সে তো বার্ডিকে বলে এসেছিলো সে যেন যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে তখুনি বেরিয়ে যায়, তবে…. তবে কিভাবে?
আনাবিয়া ঢোক গিলে কান্না আটকে নিলো। কোকো স্বর নরম করে বলল,
“আম্মা, ফ্যালকন ভেঙে পড়েছে একেবারেই। এখনো কিছু খায়নি, পানি পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। বার্ডির মৃত্যুতে প্রচন্ড শক পেয়েছে ও, আপনি ওকে একটু সামলান!”
আনাবিয়া ধীর গতিতে মাথা নাড়ালো দুবার। কোকো লিওকে নিয়ে তখুনি এগোলো ভেতরের দিকে৷ ব্রায়ান ঘুমন্ত শার্লটকে জাগিয়ে দিয়ে আনাবিয়ার কিছু প্রয়োজন হয় কিনা দেখতে বলে এগোলো কোকোর সাথে।
আনাবিয়া ধীর পায়ে এসে বসলো ফ্যালকনের পাশে। নিশ্চুপ ফ্যালকনের পাশে সেও চুপ করে রইলো। তার স্মরণে এলো কয়েক বছর পূর্বে লাইফ ট্রি থেকে বেরিয়ে মীরের মৃত্যু সংবাদ শোনার মূহুর্তটির কথা। সেদিনের কথা মনে এলে আজও বুকের ভেতর ভীষণ যন্ত্রণা হয় তার, দম আঁটকে আসে!
আনাবিয়া নিজের একটি হাত এগিয়ে স্পর্শ করলো ফ্যালকনের চোয়াল। আনাবিয়ার স্পর্শে কেঁপে উঠলো ফ্যালকন, ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে তাকালো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়ার চোখে পড়লো ফ্যালকনের রক্তিম দৃষ্টি; উদভ্রান্ত, শূন্য!
ভীষণ মায়া হলো ওর, চোয়াল থেকে হাত সরিয়ে ফ্যালকনের চুল স্পর্শ করলো সে, পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিলো চুলের ভেতর।
এই ভীষণ শোকের ভেতর হঠাৎ চিরচেনা আদুরে, শান্তিময় স্পর্শ পেয়ে ফ্যালকন এবার যেন ভেঙেচুরে পড়লো, হঠাৎই উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে সে আঁকড়ে ধরলো আনাবিয়াকে, আনাবিয়া আগলে নিলো ওকে মুহুর্তেই। আনাবিয়ার কাঁধের ওপর নিজের ক্লান্ত মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিয়ে ফ্যালকন আর্তনাদের স্বরে চিৎকার করে বলে উঠলো,
“আম্মা…. আমার সব শেষ হয়ে গেছে আম্মা…! এ যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না আমার আম্মা….! আমি সহ্য করতে পারছিনা, আমি আর নিতে পারছিনা….!”
আনাবিয়া শক্ত করে জড়িয়ে রইলো ওকে, ফ্যালকনের কান্নায় ভিজে উঠলো তারও চোখ। ফ্যালকন কেঁদে গেলো, আনাবিয়া কাঁদতে দিলো তাকে, অনেক অনেক ক্ষণ!
কুড়ালের ধারালো চকচকা অংশে লেগে থাকা তাজা রক্ত হতে গরম ধোঁয়া উড়ছে এখনো। মীর সেটাকে নিজের প্যান্টের ওপর ঘষে পরিষ্কার করে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো ওপরে।
রাতের আকাশ পরিষ্কার, আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে তাতে। স্নিগ্ধ আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে চতুর্দিক। যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে এখনো ভেসে আসছে বুলেটের শব্দ, তলওয়ারের ঝনঝনানি। চাঁদের আলোয় মাটিতে ছিটিয়ে থাকা রক্তের চিহ্ন গুলো পরিণত হয়েছে এক রহস্যময় থকথকে তরলে।
মীর পকেট হাতড়ালো, সিগারেট নেই। বিরক্ত লাগলো তার। ছাঁদে পা রাখতেই ছাদের অন্য দিকে দেখলো দাঁড়িয়ে আছে কেউ। পরণে চকচকে সুসজ্জিত আর্মর। পার্পল রঙা চোখ জোড়া তার এদিকেই ফেরানো, তাতে ক্রোধ, ক্ষোভ!
মীরের ঠোঁটের কোণা বাঁকলো, বেশ মিষ্টি দেখালো তার হাসি। যেন সে যুদ্ধ নয়, করতে যাচ্ছে গতানুগতিক ধারার কোনো আলোচনা, সৌজন্য সাক্ষাত!
ইলহানের হাতে একটি ধারালো, নকশাদার তলওয়ার। মুখখানা কঠিন, কিন্তু চোখে শীতল, আত্মবিশ্বাসী হাসি। যেন আগন্তুকের আগমনের অপেক্ষাতেই সে ছিলো৷ মীরকে দেখা মাত্রই ধীর ভারী পায়ে, বুটের শব্দ তুলে এগিয়ে এলো সে, বলল,
“জানতাম তুই এত সহজে হার মানবি না। আমাকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করবি।”
“ওহ আচ্ছা! তাই জন্যই কাওয়ার্ডের মতোন ছাদে লুকিয়ে ছিলি? আমি তোকে খুঁজে পাওয়ার জন্য কতদূর যেতে পারি দেখতে?”
কৌতুকপূর্ণ স্বরে শুধোলো মীর৷ ইলহান নিঃশব্দে বাকা হাসলো।
“এত সংগ্রাম, এত রক্তপাত করে এতদূর ছুটে এলি শুধুই আমার হাতে মরার জন্য। আজ এই ছাদে তোকে আমার হাতেই শেষ হতে হবে, তারপর এই সিংহাসন হবে শুধুই আমার।”
ইলহানের কথায় শব্দ করে হাসলো মীর, তার হাসি বিদ্রুপের মতোন শোনালো ইলহানের কাছে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে সে গমগমে স্বরে বলল,
“কে কার হাতে শেষ হবে সে ফয়সালা আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু এই রক্তের স্রোতের দায়ভার আমার নয়। এর জন্য দ্বায়ী তুই— জাজীব ইলহান দেমিয়ান, এলডার সান অব শান আরহাম দেমিয়ান৷ যাকে তুই নিজের হাতে খুন করেছিলি।”
“অপবাদ দিবিনা, সাবধান করছি তোকে। বাবার মৃত্যুর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আমি বাবাকে কিছুই করিনি, আমি জানতাম না পর্যন্ত! আমি বাবার খুনি নই।”
“অফকোর্স তুই খুনি, বাবার খুনির সকল অপরাধে সাথ দিয়েছিস তুই। সে যতটা অপরাধী, ততটা অপরাধী তুইও। তোর জন্যই বাবা মারা গেছেন, অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই৷ স্বীকার কর, তাহলে তোকে পরপারে পাস করার সময় কষ্ট কম দিবো, প্রমিজ।”
মীরের নির্লিপ্ত ভঙ্গিমার কথাতে দাঁতে দাঁত চাপলো ইলহান। কন্ঠে ক্রোধ এনে জোর গলায় বলে উঠলো,
“আমি যদি বাবার খুনি হয়ে থাকি তবে তুই এই দেমিয়ান পরিবারের অভিশাপ! তুই সিংহাসনে বসেছিলি বলেই…. সিংহাসনের কথা কেন বলছি, তুই জন্মেছিলি বলেই এই পরিবারে ধ্বস নেমেছে। তুই নিজের সাথে করে ধ্বংস নিয়ে এসেছিস এই সাম্রাজ্যের জন্য৷ তুই শেষ করেছিস সবকিছু। আজ এই প্রাসাদ রক্তাক্ত হয়েছে শুধুমাত্র তোর কারণে! তুই সেদিন মরে যাসনি কেন?”
ইলহানের কথায় শব্দ করে হাসলো মীর৷ হাতের কুড়ালটি ঘুরোতে ঘুরোতে দু কদম এগিয়ে হাসি মুখে বলে উঠলো,
“এই সাম্রাজ্যের আসল অভিশাপ সিংহাসন দখল করেছে কিছু বছর আগেই৷ কিন্তু সেই নির্বোধ অভিশাপ জানে না, ক্ষমতা শুধু বংশধারায় নয়, মেধার মধ্যেও প্রবাহিত হতে হয়।
আমার জন্ম এই পরিবারের জন্য কখনোই অভিশাপ ছিলোনা, ধ্বংস ছিলোনা। অভিশাপ ছিলো আমার অস্তিত্বের প্রতি সকলের অস্বীকৃতি, আমাকে করা উপেক্ষা।
আর….. আমি যদি সত্যিই কোনো অভিশাপ হয়ে থাকি তবে এই অভিশাপের জন্মদাতা আমার বাবা, তাই এর পূর্ণতা দেওয়া আমার পবিত্র দায়িত্ব।
আর তুই হবি সেই অভিশাপের প্রথম বলি৷ আজ এই অভিশপ্ত হাতে তোর নিধন হবে, তোর রক্ত দিয়ে আমি আজ এই অভিশাপের ঋণ শোধ করবো!”
কুড়াল ঘুরিয়ে এগিয়ে এলো মীর, ঘাড় বাঁকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার বলল,
“এই মুহুর্তে তোর মতো নির্বোধ, মস্তকহীন পাপেটের হাত থেকে এই শিরো মিদোরি প্রটেক্ট করা আমার সোল রেসপনসেবলিটি।”
বলেই নিজের কুড়ালের ধার টা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে একবার পরখ করে নিলো মীর। ইলহান চোখে ক্রোধ ফুটিয়ে বলে উঠলো,
“পাপেট কাকে বলছিস তুই? আমি কার পাপেট? পাপেটের মতো আমি কি করেছি?”
“এত দ্রুত সব ভুলে গেলি?
তুই ছিলি আজলানের পাপেট! তোর নির্বুদ্ধিতার সুযোগ নিয়ে তোকে দিয়ে নিজের সব পাপকার্য সাধন করিয়ে নিয়েছে। আর তুই? নির্দ্বিধায় তার হাতের পুতুল হয়ে নেচেছিস। বেবোধ কোথাকার! নিজের অযোগ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা আড়াল করতে এখন আমাকে অভিশপ্ত তকমা লাগিয়ে চলেছিস!
কিন্তু এতে তো সত্য বদলে যাবে না বিগ ব্রাদার। এই বিপর্যয়, ধ্বংস, ইভেন আজকের এই সিচুয়েশন ক্রিয়েট হয়েছে শুধুই তোর জন্য। ক্ষমতার প্রতি তোর সীমাহীন লালসা এসবের জন্য দ্বায়ী।”
শান্ত, ভারী গলায় বলল মীর। মীরের এমন শান্ত ভঙ্গিমা ভালো লাগলো না ইলহানের। ক্ষ্যাপা স্বরে বলল,
“আমার লালসা? তুই বুঝি খুব সাধু? তোর বুঝি কোনো ত্রুটি নেই, কোনো অবদান নেই আজকের এই সিচুয়েশনের পেছনে?”
“সাধুর প্রশ্ন যদি আসে, আমি অসাধু। আর ত্রুটির প্রশ্ন যদি আসে, তবে আমি ত্রুটি হীন। আসওয়াদ ত্রুটি হতে শত হাত দূরে থাকে।”
ইলহান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো, ক্রুর স্বরে বলল,
“খুব আত্মবিশ্বাস না তোর? তোর আত্মবিশ্বাস আমি আজ এখানে ভেঙে গুড়িয়ে দিবো৷ তোকেও।”
মীর শব্দ করে হাসলো, গমগমে স্বরে বলল,
“তোকে আমি ইতোমধ্যে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছি বিগ ব্রাদার, তুই টের পাসনি। কাওয়ার্ডের মতোন চিপা চাপায় লুকিয়ে থাকলে জানবি কিভাবে?”
“কি বলতে চাইছিস তুই?”
“তোর বুদ্ধি কেন মোটা তার একটা উদাহরণ দেই।”
কুড়ালটি ঘাড়ের ওপর সমান্তরালে রেখে দু বাহুর ভর তার ওপর দিয়ে উঠিয়ে দিলো মীর, মিষ্টি করে হেসে কথার সাথে যোগ করলো,
“নিজের অন্তঃসত্ত্বা সুন্দরী দাসীকে কোন আনন্দে আন্ডারগ্রাউন্ডে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি? যেখানে আমার অবাধ যাতায়াত?”
মীরের মুখনিঃসৃত কথাটি কর্ণগোচর হতেই চেহারার রঙ পালটে গেলো ইলহানের, ফ্যাকাসে চেহারায় সে শঙ্কা নিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি করেছিস তুই ওদের সাথে?”
মীর প্রতিউত্তরে তাকিয়ে রইলো শুধুই, ধীরে ধীরে তার ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হলো, ক্রমে ক্রমে রূপ নিলো তা ক্রুর হাসিতে, নিঃশব্দে সে প্রকাশ করে দিলো ইলহানের সর্বনাশের কথা। ইলহান হতবুদ্ধির ন্যায় অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলো মীরের দিকে। ভ্রু জোড়া অসহায় ভঙ্গিতে কুচকে গেলো তার।
হঠাৎই মুখভঙ্গি পালটে অসহায়, শুভ্র চেহারা লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করলো তার, দাঁতে দাঁত চেপে সে ক্রোধের স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কিভাবে পারলি তুই? আমার নিষ্পাপ সন্তান তোর কি ক্ষতি করেছিলো?”
“যে ক্ষতি সালিম করেছিলো তোর, যে ক্ষতি বাবা করেছিলো।”
“বাবার খুনের সাথে আমার কোনো যোগসূত্র নেই, ছিলোনা! আমি জানতাম না সে আমার বাবাকেও কেড়ে নিতে চাইছে, আমি জানলে কখনোই তার সাথ দিতাম না।
হ্যাঁ, আমি সালিমের খুনের সাথে জড়িত ছিলাম, ছিলাম আমি। কিন্তু বাবার খুনের সাথে নয়! তিনি আমার বাবা, বাবা হতেন তিনি আমার! আমি কিভাবে তাকে খুন করবো?”
কথা গুলো এক প্রকার চিৎকার করে বলল ইলহান৷
এহেন চরম মিথ্যা অপবাদের কারণে পার্পল রঙা চোখ জোড়া ফেটে পানি আসার জোগাড় হলো তার!
মীর কিছুই বলল না, শান্ত, দৃঢ় হয়ে সে দাঁড়িয়ে রইলো ইলহানের সামনে। নিগুঢ় দৃষ্টি রাখলো ইলহানের ক্রোধে রক্তিম বর্ণ ধারণ করা মুখখানার দিকে। এক পৈশাচিক আনন্দে ভরে উঠলো তার মন।
ইলহান এবার রাগে ক্ষোভে কেঁদেই ফেললো, রুক্ষ স্বরে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো,
“এত পাষাণ কেন তুই? আমার সন্তান তোর কি ক্ষতি করেছিলো? যা করেছি আমি করেছি, আমার অপরাধের শাস্তি আমার সন্তান কেন পেলো? কেন ওকে মেরে ফেলেছিস তুই? তোর না খুব আদর্শ বোধ? তবে তুই কিভাবে আমার অনাগত সন্তান, দেমিয়ান সন্তানকে হত্যা করলি? কিভাবে করলি?”
মীর ঠাঁই দাঁড়িয়ে ঘাড় বাকিয়ে দেখে চলল ইলহানের ব্যাথাতুর আর্তনাদ, ইলহানের বুকের ভেতর চুরমার করে চলা যন্ত্রণা যেন সে চোখে দেখছে। ভালো লাগছে তার।
একদিন এভাবেই সব হারিয়ে ছিলো সে, নিজের পরিবার-পরিজন, সবকিছু। কিন্তু তখন তার কেমন লেগেছিলো সেটা স্মৃতির পাতায় খুব একটা ধরা দেয় না। কিছু ছিলো, কেউ ছিলো; যার জন্য তার যন্ত্রণা খুব একটা উপলুব্ধ হতো না। মীরের মস্তিষ্কে চিনচিনে একটা ব্যাথা উঁকি দিলো হঠাৎ। কিন্তু সেটাকে অগ্রাহ্য করে সামনে এগোলো সে।
ওকে এগোতে দেখে ইলহান ভেজা চোখ দৃঢ় ভাবে মুছে নিলো। দাঁতে দাঁত চেপে, চোয়াল শক্ত করে হাতের তলওয়ার উঁচিয়ে সে আহ্বান করলো মীরকে। আজ এই শিরো মিদোরিতে হয় সে থাকবে, নয়তো মীর৷ নিজের সন্তানের খুনির সাথে একই মাটির ওপর দাঁড়ালে তার সন্তানের রুহ তাকে কোনোদিনই ক্ষমা করবে না, আর না সে নিজে ক্ষমা করতে পারবে নিজেকে!
মীর হাতের কুড়ালটি শূন্যে ঘুরিয়ে দক্ষতার সাথে আবার ধরে ফেলে ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“দেমিয়ান রুলস 265, চ্যাপ্টার ওয়ান: সহোদরকে হত্যা মহাপাপ, একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। বাট…… আ’ ডোন্ট কেয়ার এনিমোর।”
ইলহান হিংস্র চোখে তাকিয়ে রইলো মীরের দিকে, অরোরার মুখখানা মনে পড়তেই বুকের ভেতর চুরমার হয়ে ক্রোধের পাল্লা ক্রমশ ভারী হয়ে আসতে রইলো তার৷ হাতের চকচকে, ধারালো তলোয়ার টি শক্ত করে ধরে সে রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠে ছুটে গেলো মীরের দিকে!
মীর শান্ত, চোখে মুখে তার ভয়ানক দৃঢ়তা। কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার, ইলহান শারীরিক ভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিলো তাকে, ইলহানকে সে মানসিক ভাবে দুর্বল করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তার বড় ভাইটা বুঝেনি, তার দেওয়া ওই সামান্য শারীরিক যন্ত্রণা মীরের দেওয়া মানসিক যন্ত্রণার নিকট ঠিক কতখানি দুর্বল!
ইলহান সবেগে ছুটে এলো মীরকে আঘাত করতে, নিজের সমস্ত দক্ষতা, বাবার হাতে ধরিয়ে শেখানো শিক্ষা টুকুর সমস্ত সে এই মুহুর্তে ঢেলে দিলো মীরকে ধরাশায়ী করতে। ক্রোধে অন্ধ হয়ে আহত সিংহের ন্যায় গর্জন তুলতে তুলতে এলোপাতাড়ি আঘাত করার চেষ্টা করতে রইলো সে মীরকে।
মীর বিদ্যুৎ বেগে, নির্বিকার ভঙ্গিতে ঠেকিয়ে চলল ইলহানের একের পর এক করে চলা আঘাত৷ তার কুড়ালের সাথে ইলহানের তলোয়ারের মুহুর্মুহু আঘাতে বিকট ধাতব শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠতে রইলো প্রাসাদের ছাদ টুকু, দুই প্রচন্ড শক্তিশালী ধাতুর আঘাতে বারংবার ছিটকে বেরিয়ে আসতে রইলো আগুনের ফুলকি!
ইলহান ক্রমশ বাড়িয়ে দিলো নিজের আঘাতের জোর, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে তুখোড় দক্ষতায় ঝড়ো গতিতে তলোয়ারের আঘাত করতে রইলো মীরের ওপর। মীর নিজেও এবার ডিফেন্ড ছেড়ে দিলো, আর পরমুহূর্তেই কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করলো ইলহানের ওপর৷
দুজনের অস্ত্রের মুহুর্মুহু আঘাতের শব্দে সচকিত হতে উঠলো প্রাসাদের পাদদেশে যুদ্ধ করতে থাকা সৈন্যরা। যুদ্ধক্ষেত্রে তখনো আলফাদ, ওকামি, হাইনা আর জোভি উপস্থিত ছিলো।
হঠাৎই সুউচ্চ প্রাসাদের ওপর থেকে বারংবার ভেসে আসতে থাকা বিকট আওয়াজ খেয়াল করে তারা থামিয়ে দিলো যুদ্ধ, স্থীর হয়ে সকলে তাকিয়ে রইলো প্রাসাদের ছাদের পানে। দুই ভয়ানক যোদ্ধা দৃষ্টিগোচর না হলেও তাদের প্রতিটি মুভমেন্ট, প্রতিটি তুখোড় আঘাতের ভয়াবহ শব্দ কর্ণগোচর হলো সকলের। সেই সাথে কানে এলো ইলহানের ক্রোধিত চিৎকার।
যুদ্ধক্ষেত্রের সকলে ক্ষণিকের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেলো সম্পুর্ণ, তাদের নিস্তব্ধতায় প্রাসাদের ছাদ হতে ভেসে আসা তুখোড় শব্দ গুলো এবার কানের পর্দায় এসে বাড়ি খেতে শুরু করলো যেন। কিসের একটা ভয়, শঙ্কা ঘিরে ফেললো তাদের৷ হয়তো দেমিয়ান ইতিহাসে এই-ই প্রথম, যখন দুই সহোদর সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে নেমেছেন, সিংহাসনের জন্য!
কিন্তু তাদের নিস্তব্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা, দুই পক্ষের দুই দলনেতার ভেতরকার যুদ্ধ যেন তাদের ভেতর এবার যুগিয়ে দিলো আরও সাহস, আরও শক্তি, আরও ক্রোধ! মুহুর্তেই দ্বিগুণ বেগে তারা ঝাপিয়ে পড়লো প্রতিপক্ষের ওপর।
হাইনা আর আলফাদ চিৎকার দিয়ে তাদের সৈন্যদের উদ্দ্যেশ্যে বলল ইলহানের একটি সৈন্যও যেন আজ প্রাণ নিয়ে এই যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে যেতে না পারে। তাদের দুজনের বজ্রকন্ঠ কানে যাওয়া মাত্রই উচ্ছাসে, শক্তিতে ফেটে পড়লো তাদের পক্ষের সৈন্য আর রেড জোনের প্রাণীরা! দ্বিগুণ উৎসাহে তখুনি আবার শুরু হলো ভয়ানক লড়াই!
মীর ক্রমশ ভারী পড়ছে ইলহানের ওপর। ইলহানের প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছে নিজেকে শক্ত রাখার, কিন্তু বারংবার অরোরা আর তার ঢাউস পেটটিই চোখের সম্মুখে ভেসে উঠছে, রাগ চড়ছে দ্বিগুন! কিন্তু মীরের সামনে টিকে থাকা তার পক্ষে কষ্টকর! মীরের লক্ষ্য ইলহানের বক্ষ, তার হৃৎপিণ্ড।
মীরের কুড়ালের আঘাতে তলোয়ারটিতে ইতোমধ্যে চিড় ধরে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ওই কুড়ালের আঘাতে প্রাণ খোয়াতে বেশি সময় লাগবে না তার৷
হঠাৎই মীরের থেকে পিছিয়ে এলো ইলহান, মীর এগিয়ে যেতে নিলেই ইলহান হঠাৎ দ্বিগুণ বেগে ছুটে এসে আচমকা মেঝে থেকে শূন্যে ঘুরে উঠে সবেগে কোপ বসালো মীরের মুখ বরাবর। মীর আচমকা ইলহানের এমন আক্রমণে থমকালো, পরমুহূর্তেই কুড়ালের আঘাত বসালো ইলহানের তলোয়ারের ওপর। কিন্তু তার আগেই তলোয়ারের অগ্রভাগ পৌছে গেলো মীরের চোখের নিকট, মুহুর্তেই ধারালো অগ্রভাগ আঘাত করলো তার ভ্রুর ওপর, তৎক্ষনাৎ চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো মীর, নিমিষেই একটি উলম্ব গভীর ক্ষত সৃষ্টি হলো তার কৃষ্ণবর্ণের মুখের ওপর, ভ্রু হতে শুরু করে চোখের নিচের চোয়ালে গিয়ে থামলো তা, পরক্ষণেই ছিটকে গিয়ে তলোয়ারটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়লো ছাদের মেঝেতে। মেরুণ রঙা রক্তের স্রোতে লাল হয়ে ভিজে উঠলো মীরের মুখের একাংশ!
মীর তৎক্ষনাৎ হাত চাপা দিলো চোখের ওপর, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো চাপা গোঙানির ন্যায় শব্দ! তার সাঁড়াশির ন্যায় আঙুলের ফাঁক বেয়ে উপচে পড়তে রইলো রক্ত। ইলহান নিজের দ্বিখন্ডিত তলোয়ারটির দিকে একবার তাকিয়ে মীরের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম। হাতের কুড়ালটির দিকেও নজর রাখতে ভুললো না৷
মীর ক্ষণিক পরেই ধাতস্থ করে নিলো নিজেকে। দাঁতে দাঁত চেপে গেলো তার, নিজের সুদর্শন মুখশ্রীর ক্ষতের কারণে নাকি ইলহানের অস্ত্রের আঘাতের কারণে তা বোধগম্য হলোনা। কিন্তু তৎক্ষনাৎ চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে ইলহানের পানে তাকালো সে। ঘোর আঁধারের ভেতর রক্তে রঞ্জিত মুখশ্রীর ওপর স্বর্ণাভ চোখ জোড়া হতে যেন আগুন ছুড়তে রইলো।
ইলহান ভড়কালো সামান্য, কিন্তু বুঝতে দিলোনা মীরকে। নিজের বাহ্যিক দৃঢ়তা বজায় রাখলো আগের মতোই। মীর ওর দ্বিখণ্ডিত তলোয়ারটির দিকে একবার দৃকপাত করে নিজেও ছুড়ে ফেলে দিলো কুড়াল। ক্ষতস্থান হতে রক্ত গড়িয়ে পড়তে রইলো চোখের দুপাশ হতে, সেটুকু হাতের তালুর সাহায্যে মুছে নিলো। তারপর হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে দু আঙুলের ইশারায় আহবান করলো ইলহানকে।
ইলহানের দম পড়ছিলো ঘন ঘন। সে ভেবেছিলো মীর নিচ হতে যুদ্ধ করতে করতে ছাদ পর্যন্ত পৌছতে পৌছতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, মীরকে সে সহজেই হারিয়ে দিবে৷ কিন্তু এই মীর যেন আরও শক্তিশালী, আরও তুখোর! এত কিছুর পরও তাকে কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না।
এখন শেষ সম্বল তলোয়ারটিকেও সে হারিয়ে বসলো। মীরের সাথে শারীরিক শক্তিতে পেরে ওঠা তার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার, কোনো ভাবেই এই মীরকে সে দুর্বল করতে সক্ষম হবে না, ধরাশায়ী করা অনেক দূরের ব্যাপার!
মীরের চোয়াল দ্বয় শক্ত, ইলহানের মুখভঙ্গি খেয়াল করলো সে, ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে সে আরেকবার মুছে নিলো তার দৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটাতে চাওয়া রক্তের স্রোত। ইলহান ওর হাসিতে স্পষ্ট ব্যাঙ্গর উপস্থিতি টের পেলো যেন। কাল ক্ষেপন না করে সেও দাঁড়ালো কমব্যাটের ভঙ্গিতে।
মুহুর্তেই শুরু হলো দুজনের তুমুলযুদ্ধ!
মীর ক্ষতের রক্ত হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো ইলহানের ওপর। একের পর ওক নিজের বজ্রমুষ্ঠি হানলো সে ইলহানের ওপর। ইলহান নিজেকে প্রথমটাতে কোনো রকমে বাঁচাতে সক্ষম হলেও ক্রমে ক্রমে মীর ভারী পড়তে শুরু করলো তার ওপর, পালটা আক্রমণ করা তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠলো ক্রমশ!
মীরের ভারী শরীরের প্রচন্ড শক্তিশালী আঘাতে জর্জরিত হতে শুরু করলো সে! বিদ্যুৎ গতিতে একের পর এক আঘাত করে চলেছে মীর, তার আঘাতের গতিপথ নির্ণয় করাও সম্ভব হচ্ছে না ইলহানের পক্ষে।
কয়েকবার চেষ্টা করলো সে মীরের চোখের ক্ষতস্থানে আঘাত করার, সফলও হলো একবার৷ কিন্তু তাতে মীরকে দুর্বল করা গেলোনা, উপরন্তু আরও হিংস্র হয়ে উঠলো সে৷ ক্ষণে ক্ষণে চাপা গর্জন বেরিয়ে আসতে রইলো তার মুখ থেকে।
পিছিয়ে যেতে শুরু করলো ইলহান! নাক ফেটে রক্ত পড়ছে তার, ঠোঁটের কোণা চিরে গেছে, সেখান হতে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। চোয়ালের কয়েক জায়গায় কালসিটে, চোখের পাশে মীরের হাতের আংটির আঘাতে হওয়া গভীর ক্ষত। সেখানের রক্ত শুকিয়ে আসছে, চামড়ার সাথে টান ধিরে যন্ত্রণা দিচ্ছে!
ইলহান পিছিয়ে যেতে শুরু করলো আরও, শরীরের বর্মটা কোনো কাজে দিচ্ছেনা, উলটো সেটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তার! মীরের আঘাতে ভেঙেচুরে ভগ্নাংশ গুলো শরীরের ভেতর ঢুকে যাওয়ার উপক্রম!
মীরের মুখে ক্রুর হাসি। ইলহানের ভীতসন্ত্রস্ত, অসহায় চেহারা তার কাছে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য! ইলহানকে পিছিয়ে যেতে দেখে সে চাপা গর্জে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“পালাচ্ছিস বুঝি? কিন্তু আজ তো তোকে পালাতে দেবোনা আমি বিগ ব্রাদার!”
পরমুহূর্তেই মীর ক্ষিপ্র বেগে ছুটে গিয়ে শূন্যে উঠে ঝড়ো বেগে ঘুরে নিজের ইস্পাত দৃঢ় পায়ের শক্তিশালী আঘাত হানলো ইলহানের ঠিক হাটুতে।
তীব্র পদাঘাতে মুহুর্তেই ছিড়ে গেলো ইলহানের পায়ের লিগামেন্ট। তার তীব্র চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো তৎক্ষনাৎ!
কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়ে আঘাত প্রাপ্ত হাটুর ওপর হাত রেখে ইলহান আর্তনাদ করতে করতে পা টেনে টেনে ছুটে পিছিয়ে গেলো! মীর এগোলো ধীরে, ইলহানের যে আর যাওয়ার জায়গা নেই! কোথায় যাবে সে?
পেছাতে পেছাতে ছাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো ইলহান, তীব্র যন্ত্রণায় গোঙাতে শুরু করলো সে। যন্ত্রণার তোপে চোখ বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম, মাথার ভেতর ঘুরছে, এখুনি বোধ হয় জ্ঞানলুপ্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে সে!
মীর ঠোঁটের কোণে বাক ফেলে এগিয়ে এলো, দুহাত একত্র করে সামনে তুলে টেনে প্রস্তুত করে নিলো, কটকটিয়ে শব্দ হলো তার আঙুলের প্রতিটি সংযোগ স্থলে!
ইলহান এক হাতে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত হাটু চেপে ধরে তাকিয়ে রইলো মীরের দিকে, মৃত্যুভয় পেয়ে বসলো তাকে তৎক্ষনাৎ। পেছনে আর কেউ নেই, কিছু নেই! কোথায় পালাবে সে?
মীর এগিয়ে আসছে তার দিকে। ইলহান কাঁপা হাতে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ালো, নিভু নিভু চোখে চেয়ে দেখলো মীরকে। এরপরেই মীরকে চমকে দিয়ে আহত পা নিয়ে আচমকা সুউচ্চ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লো নিচে!
যুদ্ধক্ষেত্রের তুমুল লড়াইয়ের ভেতর হঠাৎই বিপ বিপ শব্দে কেঁপে উঠলো হাইনার লিসনিং ডিভাইস, হাতের রাইফেল টা দিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে বুলেট ছুড়তে ছুড়তে সে লিসনিং ডিভাইসে টাচ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো আনাবিয়ার কন্ঠস্বর,
“হাইনা, আপডেট বল।”
“শেহজাদী, আমাদের ভেতর পাঁচ জন আহত হয়েছে, দুজনের অবস্থা গুরুতর। তবে কেউ মারা যায়নি। আমাদের কাছে অ্যামো অনেক কিন্তু লোকবল কম, তাছাড়া কোকো ভাইজান না থাকায় সৈন্যরা খাপছাড়া হয়ে যুদ্ধ করছে।”
“বেরিয়ে আয়।”
“জ্বি…?”
“যেখানে যে আছে সবাইকে নিয়ে ওয়ার জোন থেকে বেরিয়ে আয়, শত্রুপক্ষ যেন কোনোভাবেই বুঝতে না পারে তোরা বেরিয়ে যাচ্ছিস।”
হাইনা আনাবিয়ার কথার অর্থ না বুঝলেও আদেশ পালন করলো৷
“আপনার যেমন আদেশ শেহজাদী।”
আনাবিয়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেই হাইনা একে একে যোগাযোগ করতে শুরু করলো সকলের সাথে। আর তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে যেতে শুরু করলো ওয়ারজোন ছেড়ে। ভোরের আলো ফুটতে বেশি সময় বাকি নেই। গত দুদিন ধরে রাতদিন এক করে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছে। খেয়েছে কি খায়নি সেটা দেখার সময় হয়নি কারো।
এখন শেহজাদীর আদেশ পেতেই ওরা পিছিয়ে যেতে শুরু করলো। শত্রুপক্ষের এত এত সৈন্যকে এখনো জীবিত রেখে ওরা কেন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বোধে এলো না হাইনার। তবুও শেহজাদীর আদেশ পালন করে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ওরা বেরিয়ে গেলো যুদ্ধক্ষেত্র হতে।
আনাবিয়া দাঁড়িয়ে সমুদ্র পাড়ে। আঁধারের ভেতর সফেদ তারকার ন্যায় ঝলমল করছে চোখ জোড়া। সুদীর্ঘ খোলা চুল উড়ছে বরফ শীতল বাতাসে। হাইনারা নিরাপদে বেরিয়ে গেছে জানা মাত্রই নিজের হাত বাড়িয়ে ধরলো সে শূন্যে, মাটির নিচ দিয়ে কম্পন তুলে সামনে এগিয়ে চলল কাঁটা যুক্ত বিশাল বিশাল ধারালো ডালগুলো। মুহুর্তেই সমুদ্রের তলদেশ বেয়ে তারা গিয়ে পৌছোলো রামাদি সামাতে, সেখানের অজানা, রহস্যময় গুহাগুলোর তলদেশে৷
ক্ষণিক পরেই তীব্র শব্দে কেঁপে উঠলো রামাদি সামা, তার অনুরনন এসে স্পর্শ করলো অন্য সকল দ্বীপকে! আর তার পরেই ভয়াবহ ধাতব শব্দ তুলে গুহার প্রবেশমুখ ভেদ করে বেরিয়ে এলো দুটি বিশাল আকৃতির ধাতব শেকলের তৈরি রোবটিক পাইথন। গুহা থেকে বেরিয়েই বিদ্যুৎ গতিতে তারা ছুটে চলল শিরো মিদোরি অভিমুখে!
চলার পথে থাকা গাছপালা, ঝোপঝাড়, প্রাণী সকল কিছুকে মাড়িয়ে পিষে দিয়ে তারা নেমে পড়লো সমুদ্রে, পানি বয়ে ঝড়ো গতিতে এগোলো সফেদ প্রাসাদের পাদদেশে বয়ে চলা যুদ্ধের উদ্দ্যেশ্যে।
আনাবিয়া দূর হতে দেখলো তাদের আগমণের চিহ্ন, সমুদ্রের পানিতে সুনামির মতোন বিশাল এক ঢেউ তুলে এগিয়ে আসছে দুটি যান্ত্রিক সরীসৃপ! তাদেরকে দেখতে পাওয়া মাত্রই আনাবিয়া এগোলো মসভেইলের দিকে।
ইলহান ছুটছে, ছুটছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খোড়া পা নিয়ে প্রাণপণে ছুটে চলেছে সে৷ মুখের ভেতরে কোথাও গভীর জখম হয়েছে, সেখান থেকে অনবরত রক্ত পড়ে চলেছে, রক্তের নোনতা স্বাদ ঠেকছে জিভে৷ থু মেরে সেটা বাইরে ফেলে দিচ্ছে বারংবার, আবার এসে জমা হচ্ছে।
চোখের সামনে আঁধার ঘনিয়ে আসার জোগাড়, কয়েকবার আছড়ে পড়েছে ইতোমধ্যে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। ঝোপঝাড়ের আঁচড়ে ছিড়ে গেছে শরীরের অনেক স্থান, বর্মটি স্থানে স্থানে খুলে পড়েছে অনেক আগেই।
কোথায় যাবে সে? এই জঙ্গল সে চিনেনা, কখনো এই জঙ্গলের তার ঘুরতে আসা হয়নি, নিজের মতো বেড়ানো হয়নি। ঠিক যে পথটুকু প্রয়োজন সে পথ টুকুই সে চিনে, তার বাইরে কিছুই না৷ এখন চেনা পথে যাওয়ার মতো স্পর্ধা তার নেই, তবে সে কোথায় যাবে?
ছুটতে ছুটতে হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হলো একটি ধ্বংসস্তুপ। ইলহান ছুটে গেলো সেদিকে। মনে পড়লো এইখানে সে ফার্ম হাউজ তৈরি করতে চেয়েছিলো, কিন্তু আনাবিয়া এসে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিলো তার সাধের ফার্মহাউজ। তারপর থেকেই সব ভাঙতে শুরু করেছে তার, আজ তার হৃদয় ভগ্ন, তার বা পাটাও বোধ হয়! ইলহানের কান্না পেলো হঠাৎ! কিচ্ছু নেই আর, কিছুই না! তার সন্তান, তার অরোরা! কিছুই নেই।
হঠাৎই পেছন দিকে শব্দ পেয়ে ইলহান দ্রুতই লুকিয়ে পড়লো ধ্বংসস্তুপের ভেতরে। হাটতে অপারগ সে এইমুহূর্তে, এক প্রকার হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরের একটি ছোট্ট কুঠুরি সদৃশ স্থানে গিয়ে বসে রইলো।
শ্বাস পড়ছে ঘন ঘন, হাঁফাচ্ছে সে৷ শব্দ হচ্ছে প্রচন্ড। ইলহান চেষ্টা করলো নিজেকে শান্ত করতে, কিন্তু হৃৎপিণ্ড যে কথা শুনতে চায়না! ভয়ে, উত্তেজনায়, ছোটাছুটিতে সেটি ভয়ানক গতিতে ওঠানামা করতে শুরু করেছে যে! পায়ের যন্ত্রণায় ইলহানের ভেঙেচুরে কাঁদতে মন চাইলো, পায়ের নিচের অংশ অনুভব করছে না সে একটুও। এবার বুঝি পাটাই খোয়াবে সে!
গা থেকে টেনে টেনে খুলে ফেললো বর্মের অবশিষ্ট অংশ গুলো। সারা শরীরে অজস্র ক্ষত! অথচ নিখুঁত শরীর ছিলো তার, এতটুকু আঘাতের চিহ্ন ছিলোনা তাতে! বহুবছর পূর্বে মীরের সাথে কুরো আহমারে এক চোট মারামারি করে অল্পস্বল্প আঘাত বসেছিলো শরীরে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মিইয়ে গেছিলো তা৷ এখন কি হবে? এত এত আঘাতের চিহ্ন সে কিভাবে মুছবে?
বাইরে কারো দ্রুত, ভারী পদশব্দ কর্ণগোচর হচ্ছে। ইলহানের বুঝতে বেগ পেতে হলোনা পদধ্বনিটি ঠিক কার৷ হাঁফাতে হাঁফাতে দেয়ালের সাথে নিজের শরীর এলিয়ে দিলো সে, পিপাসা পেয়েছে ভীষণ। একটু পানি পেলে ভালো লাগতো তার। থুতু গিলে গলা ভেজানোর উপায় নেই, তাতে রক্তের নোনতা স্বাদ!
ইলহান শুনতে পেলো ধ্বংসস্তুপ টিকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে দিতে এগিয়ে আসছে সে এদিকেই! ইলহান চোখ জোড়া বুজে নিয়ে বিড়বিড়িয়ে অসহায় স্বরে বলে উঠলো,
“আমার একটু বিশ্রাম চাই, একটু খানি। পিপাসা পেয়েছে ভীষণ, আমার একটু পানি চাই।”
দম পড়লো তার জোরে জোরে৷ পরক্ষণেই শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে উঠালো সে৷ এইভাবে তার জীবন শেষ হতে পারে না! কিছুতেই না! দুর্বল ভঙ্গিতে হামাগুড়ি দিয়ে একটু একটু করে এগোতে এগোতে বেরিয়ে গেলো ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে। অঁসাড় পাটিকে টেনে আনতে গিয়ে দম বেরিয়ে গেলো তার।
প্রাণপণ চেষ্টার করে নিশ্চুপে ভাঙা ইটের স্তুপ পার হতেই পেছন থেকে ভেসে এলো মীরের শান্ত, দৃঢ় কন্ঠস্বর,
“পালা যেদিকে মন চায়, কতদূরে যেতে পারিস আমিও দেখবো৷”
ইলহান চমকে তাকালো পেছন দিকে। হেটে আসছে মীর, মুখে তার চিরাচরিত লেগে থাকা গুরুগম্ভীর, শান্ত ভঙ্গিমা—যেন এতক্ষণ পর্যন্ত এই শিরো মিদোরি তে কিছুই হয়নি, রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়নি সে।
আঁধারের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসা বিশাল শরীরের মীরের স্বর্ণাভ চোখ জোড়াতে বিরাজমান এক শীতল হিংস্রতা। শান্ত, অথচ ভয়ঙ্কর! আতঙ্কিত হয়ে উঠলো ইলহান, দ্রুত নিজের আহত পা টিকে টেনে নিয়ে ছুটে চলে যেতে চাইলো মীরের দৃষ্টির আঁড়ালে। কিন্তু আর এতটুকু এগোতে চাইলোনা তার শরীর!
রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠে পা টেনে টেনে প্রাণপণে এগিয়ে চলল সে সামনের দিকে।
ঠিক সেই মুহুর্তেই নিস্তব্ধ জঙ্গলের ভেতর হতে ইঞ্জিনের ক্ষীণ শব্দ শুনে চমকালো ইলহান, পরমুহূর্তেই একটি সুপারকার বিদ্যুৎ বেগে এসে থামলো ইলহানের নিকট, ভেতর থেকে একটি মেয়েলি কন্ঠ চিৎকার করে বলে উঠলো,
“চাচাজি……! উঠে আসুন!”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৫
পরক্ষণেই দরজা খুলে গেলো গাড়ির। ইলহান বিস্ময়ে হকচকিয়ে উঠে পরক্ষণেই কোনো কিছু না ভেবে গাড়ির দরজায় ভর দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টায় উঠে পড়লো গাড়ির ভেতর। আনাবিয়া ওকে দ্রুত হাতে ভেতরে টেনে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে, মিটারের গতি তুঙ্গে তুলে মুহুর্তেই ছুটে পালালো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে৷ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ঝলমলে দৃষ্টি রাখলো মীরের দিকে, পরক্ষণেই উধাও হয়ে গেলো সে জঙ্গলের ভেতর!
মীর অবাক হওয়ার সময় টুকু পেলোনা, সামনে থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যাওয়া গাড়িটির দিকে হতবাক চোখে চেয়ে তার মুখ থেকে আপনিই বেরিয়ে এলো,
“হোয়াট দ্যা ফ্…..!”
পরক্ষণেই তীব্র ক্রোধে উন্মাদ হয়ে গর্জন তুলে ছুটলো সে গাড়িটির পেছনে।
