Home দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৭

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৭

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৭
আফরোজা আশা

সপ্তাহ খানেক হলো পাটোয়ারী বাড়িতে আছে বেলা। তালুকদার বাড়িতে আসার নাম নেইনি বলে দিগন্তও জোর করেনি। বরং মনে মনে বিশাল ফন্দি এঁটেছে। আর কদিন থাক বাপের বাড়ি মেয়েটা, তারপর পুরো বছর কাছ ছাড়া করবে না।
দুপুরে খেয়েদেয়ে শুয়েছিল দিগন্ত। গতরাত জেগে কাজ করার দরুণ অল্পকিছুক্ষণের মাঝেই গভীর নিদ্রায় ডুবেছে। ঘুমের ঘোরে অনুভব করছে সে বুকের ওপর কিছু একটা নড়াচড়া করছে। কেমন যেন নরম নরম ভাব। এক পর্যায়ে ঝট করে চোখ খুলল দিগন্ত। মাথা হালকা উঁচিয়ে বুকের ওপর ঘাপটি মেরে থাকা প্রাণীকে দেখে লাফিয়ে উঠে বসল। ফলস্বরূপ প্রাণীটা প্রায় বিছানা থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছিল। তাতক্ষনাৎ দুটো হাত তাকে বাঁচালো।
জোরে জোরে দম ফেলে সামনের রমণীর উদ্দেশ্যে হুংকার ছুঁড়ল দিগন্ত,

‘ এটা এখানে কিভাবে এলো? তাড়াতাড়ি ফেল। কামড়াবে, বেলা। ছেড়ে দে তাড়াতাড়ি। ’
বেলা অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল দিগন্তের দিকে। হাতে থাকা নরম পশমের বিড়ালটাকে সন্তপর্ণে কোলের মাঝে নিয়ে বলল,
‘ আপনি আস্তেধীরে উঠবেন না? এখনি তো পড়ে যেত। ব্যাথা লাগত ওর। ’
বিছানা থেকে তড়িঘড়ি করে নামল দিগন্ত। বেলার কোল থেকে সাফেদ গুলুমুলু বিড়ালটাকে টেনে নেওয়ার প্র‍য়াস চালিয়ে বলল,
‘ আমার হাতে দে। বাইরে ফেলে আসি। আছড়ে নিলে ভ্যাক্সিন দিতে হবে, ছাড়। ‘
শরীর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে নিল বেলা। ললাটে বিশাল ভাজ ফেলে আওড়াল,
‘ ফেলবেন কেনো? ও জেনি। আমাদের বাবু। ’
সহসা বেলার কোলে থাকা বিড়ালটার দিকে ক্ষিপ্ততার সহিত চাইল দিগন্ত। কোণা চোখে পরোখ করতে করতে আওড়াল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ কোথা থেকে তুলেছিস এটাকে? ’
‘ আব্বু দিয়েছে। কি সুন্দর তাই না? ’
ত্যাদড় গলায় জবাব দিল দিগন্ত,
‘ ভালো না। যে দিয়েছে তার বাড়িতে রেখে আসবি। হয়তো ইচ্ছা করে এসব আপদ আমার ঘরে পাঠাচ্ছে। আমাকে সময় না দিয়ে ওটাকে নিয়ে পড়ে থাকবি। তোর বাপের মতলব আমি ভালো করে বুঝি। ’
‘ আমার জন্মদিনে চেয়েছিলাম। তখন দিতে পারেনি বলে, কদিন আগে এনে দিয়েছে। আপনি আমার আব্বুকে নিয়ে বাজে কথা বলবেন না। আবার চলে যাবো তাহলে। ’
এতোক্ষণে টনক নড়ল দিগন্তের। বেলার কাছাকাছি এসে প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
‘ আজ আসবি বলিস নি যে। কার সাথে এসেছিস? ’
‘ আব্বু। ’
‘ আমাকে কেন জানানো হয়নি? ’
মুচকি হাসল বেলা। দিগন্তের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ সারপ্রাইজ। ’

ভ্রু কুঁচকে নিল দিগন্ত। বেলাকে টেনে এনে ধুম করে শুয়ে পড়ল। শক্ত বেষ্টনীতে বেঁধে রাশভারি গলায় বলল,
‘ বিড়াল ফিড়াল সাইডে ফেলে চুপচাপ ঘুমা। আরামের ঘুম হয়নি এতোরাত। ’
জেনিকে পাশে রেখে দিগন্তের বুকে দুহাতে ধাক্কা দিল বেলা। দূরত্ব বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে বলল,
‘ ঘুমাবেন মানে? আব্বু এসেছে তো। নিচে চলেন। ’
‘ উঁহুম! তাতে আমার কি? দিহান আছে বাড়িতে। ’
‘ আপনার সাথে দেখা করবে বলে অপেক্ষা করছে। ’
ঘাড় কিঞ্চিৎ নিচে নামিয়ে বক্ষখাঁচায় বন্দি রমণীর মুখপানে তাকাল দিগন্ত। দ্বিধান্বিত স্বরে আওড়াল,
‘ আমার সাথে দেখা করবে? ’
উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল বেলা, ‘ হুম। উঠেন। ’
বেলাকে ছেড়ে উঠে বসল দিগন্ত। বিরক্তিমাখা গলায় বলল,
‘ মেজাজ ভালোই আছে। মতলব কি? আবার খোঁচাতে এসেছে? আমি তোকে আসতে বলিনি, নিজে নিজে এসেছিস। এখন আর যেতে দিবো না কোথাও। ’
‘ আগে নিচে যান। আসার অনেকক্ষণ হলো। আব্বু রেগে যাবে কিন্তু। ’
বেশ ভাব টেনে বলল দিগন্ত,
‘ কারো রাগের ধার ধারে না দিগন্ত তালুকদার। ’
পরক্ষণেই সুরসুর করে বাইরের পানে হাঁটা ধরল। চুলে ব্যাকব্রাশ করতে করতে বেলার উদ্দেশ্যে বলল,
‘ ঘরে থাক। নিচে আসার প্রয়োজন নেই। যদি বলেছে এক-দু বছরের জন্য তোকে ওবাড়িতে রাখবে তবে আজ যুদ্ধ চলবে। ’

বেলা গোল গোল চোখে চেয়ে রইল দিগন্তের যাওয়ার পানে। তখনি জেনি এসে ওর কোলে মাঝে জায়গা করে নিল। দরজার দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে জেনিকে নিয়ে দিগন্তের পিছু পিছু পা বাড়াল সে।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়াল দিগন্ত। কিঞ্চিৎ ঘাড় হেলেনি ধীরস্থির গলায় ডাকল,
‘ মনি। ’
কাপে চা রাখছিল মিতালী। দিগন্তের আওয়াজ পেয়ে সম্মুখপানে তাকাল,
‘ বল। ’
‘ শুনলাম তোমার ভাই আমার খোঁজ করছে? ’
‘ হ্যাঁ। ড্রয়িংরুমে যা। ’
‘ কেনো বলো তো? হঠাৎ এতো গদগদ ভাব। ’
‘ ত্যাড়ামি করবি না দিগু। ভদ্রভাবে কথা বলবি। ’

দিগন্ত সেকথা কানে তুলল না। পকেটে দুহাত গুজে আস্তেধীরে ড্রয়িংরুমে চলে এলো। জয়নাল তালুকদার, দিহান আর রহমান পাটোয়ারী কিছু একটা আলাপ করছিল। দিগন্তের আগমনে তিনজনের দৃষ্টি তার দিকে ঘুরল। রহমান পাটোয়ারীর তীক্ষ্ণ নজর আড়চোখে খেয়াল করল দিগন্ত। ভেতরে ভেতরে বেশ অপ্রস্তুত হলো। উপরের গুরুগম্ভীর স্বভাবখানা ফুটিয়ে রেখে রহমান পাটোয়ারীকে সালাম দিয়ে তার পাশেই বসল। নড়েচড়ে বসল রহমান সাহেব।
মিতালী এসে সবার হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিল। প্রত্যাশাকে নিয়ে দিশাও উপস্থিত হলো সেখানে। দিশার পাশে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল বেলা অবাক লোচনে একবার বাবার মুখের দিকে দেখছে, তো একবার দিগন্তের দিকে। দুজনে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছে। কি শান্ত! কি স্বাভাবিক আচরণ তাদের! অথচ ঘর থেকে এই অব্দি রাস্তাটুকু কত ভাবনা চিন্তা করতে করতে এসেছে বেলা। ভয়ে অন্তর আত্মা এখনো সিটিয়ে আছে যেন।

চা শেষ হওয়া পর্যন্ত রহমান পাটোয়ারী আর জয়নাল তালুকদারের খোশগল্প চলল। এরমাঝে দিগন্তের সাথে কোনো কথা হয়নি তার। ভ্রুঁক্ষেপহীন দিগন্ত কেবল নিশ্চুপ হয়ে ওদের কথা শুনছে আর চায়ে চুমুক দিচ্ছে। চা-নাস্তার পর্ব শেষে উঠে দাঁড়ালেন রহমান। বেলাকে কাছে ডেকে ভালোমন্দ কথা সেরে সবার থেকে বিদায় নিয়ে নিলেন। মিতালী আরো কিছুক্ষণ থাকার আবদার রাখলে হাসিমুখে নাকোচ করলেন তিনি। অতঃপর দিগন্তের সামনে এসে বললেন,
‘ বাইরে আসবেন। ’
ব্যস, এটুকুর অপেক্ষায় ছিল যেন দিগন্ত। কথাটা শেষে রহমান পাটোয়ারী বাইরে গেল। দিগন্ত অবশ্য তাড়াহুড়ো করল না। মিনিট দুয়েক সময় ব্যয় করে তবে বাইরের পানে গেল। এদিকে বেলার কপাল ঘামছে। কুঁনুই দিয়ে দিশাকে ডেকে ভীতি কণ্ঠে বলল,

‘ ওরা এখন কি কথা বলবে? আমাকে নিয়ে আবার ঝগড়া-ঝামেলা করবে না তো। কতদিন পর আব্বু আমার সাথে ঠিকঠাকভাবে কথা বলেছে। আবার আগের মতো মুখ ফিরিয়ে নেয় যদি। ’
বলতে বলতে ছলছল হলো বেলার নেত্রপল্লব।
তালুকদার বাড়ির বাইরের ফটকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানব। নিরবতায় ছেদ ঘটিয়ে রহমান পাটোয়ারী প্রশ্ন করলেন,
‘ কাজকর্ম চলছে ঠিকঠাক? ’
শান্ত স্বরে জবাব এলো দিগন্তের,
‘ জ্বি। ’
সূক্ষ্ম নজরে রহমান পাটোয়ারীকে অবলোকন করে পুনরায় বলল,
‘ আপনাকে একটু বেশিই স্বাভাবিক লাগছে। ’
‘ অস্বাভাবিক হলে কি বর্তমান পাল্টানো যাবে? ’
‘ তবে আপনার মেয়েজামাই হিসেবে মেনে নিলেন? ’

‘ নাহ। কেবলমাত্র ছোট মেয়ের স্বামী। তাই থাকবেন। রহমান পাটোয়ারীর মেয়েজামাইরা নম্র,ভদ্র স্বভাবের। আপনার মতো রগচটা নয়, যে বাড়ি বয়ে গিয়ে মেয়ের গায়ে হাত তুলে। ’
ঠোঁট বেঁকিয়ে মৃদু হাসল দিগন্ত। ব্যাঙ্গাত্মক সুরে আওড়াল,
‘ ফয়সাল ভাই আর দিহান তবে আপনার আদর্শ জামাই। বেশ ভালো। কিন্তু দিগন্ত তালুকদারকে মানুষের সামনে কি বলে পরিচয় করাবেন? নাকি পরিচয় না দেওয়ার জন্য মেয়েকেই ত্যাজ্য করবেন? ’
শেষের কথাটা শুনে অন্তোষচিত্ত্বে দিগন্তকে একপলক দেখলেন রহমান সাহেব। অতঃপর পিঠের পিছে দুহাত রেখে রাস্তার দিকে দৃষ্টি করে গম্ভীর গলায় বললেন,
‘ হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। জরুরি আলাপ আছে। ’
দিগন্ত সায় দিল। পাশাপাশি দুজনে হাঁটতে শুরু করল। চোয়ালের তীক্ষ্ণতা প্রায় সমান। কিছুটা দূরে এগিয়ে রহমান পাটোয়ারীর কোনো এক পরিচিত লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। লোকটার সঙ্গে দুটো ভালোমন্দ আলাপ করে দিগন্তকে দেখিয়ে পরিচয় করালেন তিনি,

‘ আমার ছোট মেয়ে জামাই। ’
এতোক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকা দিগন্ত হতচকিত রহমান পাটোয়ারীর দিকে মুখ ফিরালো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে! রহমান পাটোয়ারী তার দিকে না তাকিয়েই ঠান্ডা গলায় বললেন,
‘ আমার চাচা ভাই সে। তোমার চাচাশ্বশুড় হবেন। ’
হতবিহ্বল দিগন্ত লোকটার সাথে কথাবার্তা বলল। মিনিট পাঁচেক পর লোকটা প্রস্থান করল। ললাটে বেশ কয়েক ভাজ ফেলে দিগন্ত প্রশ্ন ছুঁড়ল,
‘ আপনি না মেয়ে জামাই হিসেবে মানেন না। তবে এসব কি ছিল? ’
‘ বাইরের মানুষের সামনে ভেতরকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ করতে নেই। ’
রাশভারি গলায় আওড়াল দিগন্ত,
‘ আমার প্রতি আপনার এতো ক্ষোভ কেনো? ভালোবাসি আপনার মেয়েকে। সুখে রাখব। এতো রাগ, এতো ক্ষোভ মানায় না পাটোয়ারী সাহেব। ’
ম্লান হাসলেন রহমান পাটোয়ারী। অদূরে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বিরস গলায় বললেন,
‘ বাবা হোন, তারপর বুঝবেন। ’

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৬

নিভে গেল দিগন্ত। দুজনের চরণ পুনরায় রাস্তায় চলমান হলো।
এদিকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে আছে বেলা। অদূরে রহমান পাটোয়ারী বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে কিছু একটা নিয়ে দিগন্তের সাথে কথা বলছেন। আস্তে আস্তে বেলার চোখের আড়াল হয়ে গেল তারা। হাত-পা ঘেমে জবুথবু অবস্থা বেলার। ভয়ে বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম শব্দ করছে। না জানি তাদের মাঝে কি কথা হচ্ছে!

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৮