বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৭
রানী আমিনা
একতলা বাড়িটির ভেতরে এসে আনাবিয়া যখন দাঁড়ালো তখন রাতের শেষ প্রহর। কোন এক অজানা আশঙ্কায় হৃদযন্ত্রটি হঠাৎই দ্রুত গতিতে ওঠানামা শুরু করেছে তার। জমাট বাঁধা আধারের ভেতর একা দাঁড়িয়ে সে, সম্মুখের সারি সারি কামরা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে তৈরি। ঠিক কোনটিতে সে প্রবেশ করবে বুঝতে পারলনা।
আচমকা সশব্দে খুলে গেলো ডানদিকের একটা কামরার দরজা৷ একজন সাদা পোশাকের নার্স বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে, আঁধারে দাঁড়ানো আনাবিয়াকে দেখতে পেলনা সে৷ নার্সটি চোখের আড়াল হতেই ধীর, নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেলো সে কামরার দিকে।
ভেতরে মৃদু নীলচে আলো, বেডে শুয়ে আছে কেউ। ঢাউস পেট! লাল রঙা চুলগুলো মলিন, উষ্কখুষ্ক। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, স্যালাইন চলছে, পাশেই স্ক্রিনে বয়ে চলেছে তার হার্ট রেট। আনাবিয়ার শ্বাস আঁটকে এলো, দম বন্ধ করে সে একপা দু’পা করে এগিয়ে গেলো কাছে।
কাছাকাছি হতেই নজরে এল এক পরিচিত মুখ! কিন্তু চিনতে যেন বেশ বেগ পেতে হল আনাবিয়ার। মুখখানা কঙ্কালসার, চোয়ালের চামড়া কুচকে ঢুকে গেছে ভেতরে, চোখ জোড়ার চতুর্দিকে গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ। নিঃসাড়! ধীর গতিতে শ্বাস নিচ্ছে বুক টেনে।
আনাবিয়া কঙ্কালসার মুখখানার দিকে ক্ষণিক তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল,
“বাহার…..!”
এমন সময়ে পেছন থেকে নার্সটি ভর্ৎসনার কন্ঠে চেচিয়ে বলে উঠল,
“কে আপনি? অনুমতি ছাড়া ভেতরে এসেছেন কেন?”
আনাবিয়া ধীর, ক্লান্ত ভঙ্গিতে ফিরে তাকালো তার দিকে। নার্সটি তাকে দেখে কিছুটা দমে গিয়ে সমীহ মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ক্ষমা করবেন, আপনি কি রাজপরিবারের কেউ?”
আনাবিয়া শ্রান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল ওপর নিচে। মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,
“বাহারের শরীর কেমন এখন? বাচ্চা সুস্থ আছে?”
“জ্বি, ছোট্ট শেহজাদা মায়ের পেটে বেশ সুস্থই আছেন। তাকে সুস্থ রাখার জন্য হিজ ম্যাজেস্টি সব কিছুই করছেন। তবে… বাহারের কথা বলতে পারিনা, উনি খুব ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে আছেন। শেহজাদা ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। কখন কি হয় বলা যায়না।”
আনাবিয়া নিরবে দেখল বাহারকে, প্রায় অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কত মাস চলছে?”
“এই তো, পাঁচ মাসে পড়ল। কিন্তু এর ভেতরেই মেয়েটা ভীষণ রকম অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বেশি সমস্যা হলে প্রিম্যাচ্যুর সিজার করতে হবে, এমনটাই জানিয়েছেন হেকিমেরা। এখন শুধু অপেক্ষার পালা।”
উৎফুল্ল স্বরে বলল নার্সটি, বোধ হয় আরও কিছু বলতো, কিন্তু তার আগেই ধীর, দুর্বল পায়ে বাড়িটি থেকে বেরিয়ে এল আনাবিয়া। বাইরে এসে খোলা বাতাসে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিল একবার। নার্সটি বিদায় জানাতে বেরিয়ে এল তার পেছন পেছন। আনাবিয়া পেছন ফিরে তাকে শুধলো,
“ইমার্জেন্সি অ্যাবর্শন পিল পাওয়া যাবে এখানে?”
নার্সটি থতমত খেলো, আমতাআমতা করে বলল,
“য্-যাবে কিন্তু…. সেটা প্রেসক্রিপশন ছাড়া হস্তান্তর করা গুরুতর অপরাধ….. জানেন নিশ্চয়! আমার চাকরি চলে যাবে!”
“কিছু হবে না, আমি সব ম্যানেজ করে নিবো। কেউ জানবেনা।”
নার্সটি অপ্রস্তুত দাঁড়িয়ে দোনোমোনো করলো কিছুক্ষণ, কিন্তু আনাবিয়া তাড়া দিলে সে ভেতরে গিয়ে লুকিয়ে এনে দিলো একটি কৌটা। তার মুখের অসহায়ত্ব খেয়াল করে আনাবিয়া আবার অভয় দিলো তাকে। তারপর বাড়িটি থেকে বেরিয়ে বাইক নিয়ে এগোলো শিরো মিদোরির উদ্দ্যেশ্যে।
“জায়ান ভাইজান, আপনি একজন ধাইমাকে প্রস্তুত রাখবেন। বাহার মেয়েটা বেশিদিন বাঁচবে বলে মনে হয়না৷”
সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে কথাটি বলল মীর৷ বহির্বিশ্ব হতে ঘুর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে তীরে এসে ভিড়েছে এক বিরাট মালবাহী জাহাজ, সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ লোকজনে ভর্তি সম্পুর্ন এরিয়া। কোকো তার মিলিটারি ফোর্স নিয়ে জাহাজটিকে পরখ করতে নেমেছে সেখানে৷ বাকিরা দাঁড়িয়ে তীরেই।
সমুদ্রের লোনা বাতাসে উড়ছে মীরের ঘাড় বাবরি ঝাকড়া চুলগুলো, ঝড়ো বাতাসের কারণে কুচকে আছে দৃষ্টি। তার কথায় জায়ান আনুগত্যের সাথে জিজ্ঞেস করল,
“ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি? কিন্তু বাহারকে কি কোনোভাবেই বাঁচানো যাবেনা?”
“সম্ভাবনা ক্ষীণ। পূর্বের দাসীগুলো এমব্রায়ো ট্রান্সফারের তিন-চার মাসের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছে। সেখানে বাহারের এখনও টিকে থাকাটা একপ্রকার অলৌকিক ব্যাপার। তার ওপর, ক্রমাগত অত্যাচারে তার শরীর ভেঙে গেছে। বারবার এগ কালেকশন এবং প্রথমবার এমব্রায়ো ট্রান্সফারের দুই সপ্তাহের মাথায় গর্ভপাত তার শারীরিক অবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে। পরবর্তী ট্রান্সফারের সময় বয়স্ক ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের জন্য তাকে বড় ধরণের অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সার্জারির ধকল প্লাস বাহারের বয়স, সব মিলিয়ে অনাগত শেহজাদার শারীরিক জটিলতা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তাই আমাদের সবকিছুর জন্যই আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।”
ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়ল মীর। জায়ান ক্ষণিক চুপ থেকে বলে উঠল,
“এবার…. শেহজাদীকে কিভাবে মানাবেন?”
“সেটাই ভাবছি। ইচ্ছে ছিল ওকে সাথে নিয়ে আসব, বাহারের সাথে দেখা করাব, তারপর ঠান্ডা মাথায়, নিরিবিলিতে সবটা বুঝিয়ে বলব। কিন্তু সে কিছুতেই আসতে চাইলনা। আমিও আর জোর করিনি।”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে মীর আবার বলল,
“ওর আচরণে আজকাল এক রহস্যময় পরিবর্তন ঘটেছে, মেজাজ সবসময় তুঙ্গে থাকে, ভয়েই নিয়ে আসিনি। এমনিতেই তার যে তেজ! এসব দেখলে আমার ওপর দিয়ে টর্নেডো বইয়ে দিবে। তখন আমার কোনো যুক্তি, কোনো কথাই তার মন গলাতে পারবেনা।”
“এখন কি করবেন?”
“আপাতত কিছুই করবনা। ওর মেজাজ ঠান্ডা হোক। ফোনটা আছড়ে ভেঙেছে, যোগাযোগের কোনো উপায় নেই, উপায় সে রাখবেও না। এমনিতেই সন্দেহ করছে, নজরদারি করতে কিমালেব পর্যন্ত চলে এসেছে। এখন সবটা এক্সপ্লেইন করতে গেলে ভেবে বসবে আমি মিথ্যা বলছি, ভুল বোঝাবুঝি বাড়বে৷”
“আপনার তবে দ্রুতই প্রাসাদে ফেরা উচিত, আপনি কাছাকাছি থাকলে তিনি অন্তত ঠান্ডা মেজাজে থাকবেন। খুব বেশি উগ্র হবেন না৷”
“ভেবেছিলাম সব ঝামেলা মিটিয়ে দ্রুতই প্রাসাদে ফিরবো, কিন্তু এই জাহাজের নিষ্পত্তি সহজে হবে বলে মনে হচ্ছে না। বহির্বিশ্ব থেকে কেউ জাহাজের সন্ধানে চলে এলে নতুন বিপদ জুটবে। কি ধরণের মালামাল আছে সেটাও চিন্তার বিষয়। ওদিকে এখন যুদ্ধ চলছে, এমতাবস্থায় জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র বা পদার্থ পরিবহনের সম্ভাবনা বেশি। পারমাণবিক হলে অ্যাসাপ ডিসপোজ করতে হবে। নইলে মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশন পঞ্চদ্বীপের ইকোসিস্টেম ঝুঁকিতে ফেলবে।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, এমন কিছু হলে লাইফট্রি কি সেটার সমাধান করতে পারবে?”
জিজ্ঞেস করলো জায়ান, মীর শূণ্যে চেয়ে ক্ষণিক নিরব থেকে উত্তর করলো,
“লাইফট্রি আর শিনজো মিলে হয়তো দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারবে তবে এই মুহূর্তে তাকে আমি এসবে কোনোভাবেই জড়াতে চাইনা। ওর শরীর ভালো নয়, এখন এসবে শক্তি খরচ করলে সেটা ওর জন্য এলার্মিং হবে।”
তাদের কথার মাঝেই জাহাজ থেকে এক প্রকার লাফিয়ে নেমে ছুটে এলো কোকো। পরণে তার রেডিয়েশন রেজিস্টেন্স বিশেষ স্যুট। মীরের সামনে এসে আনুগত্য জানিয়ে সে ব্যাস্ত স্বরে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার ধারণাই সঠিক। জাহাজ ভর্তি বোমা তৈরির কাঁচামাল। শুধু এটমিকই নয়, এইচ বম্ব এর কাঁচামালও সেখানে উপস্থিত। সাথে কিছু গান ম্যাটরিয়ালস। কিন্তু কয়েকটি বক্স ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো থেকে রেডিয়েশন নির্গত হচ্ছে। এখন এগুলো আমরা কি করবো?”
“জাহাজের ভেতর যারা আছে তাদেরকে বেরিয়ে আসতে বলো এখনি। অন্য আর এক দলকে পাঠাও। ছোট ছোট গ্রুপ করে দশ পনেরো মিনিটের শিফটে কাজ করো। প্রয়োজনে রোবটের সাহায্য নাও। আমি এক্সপার্ট টিমকে খবর পাঠাচ্ছি। সীসার কন্টেইনার তৈরি করার ব্যাবস্থা করো যত দ্রুত সম্ভব। র’ ম্যাটরিয়ালস গুলোকে সীসার পাত্রে ঢুকিয়ে সিলগালা করে তবে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে, এমন স্থানে যেখানে কারো আনাগোনা নেই, বন্য প্রানীরও নয়। রিসার্চার টিমকে নিয়ে কাজ শুরু করে দাও এখনি। তারা ডিসপোজের স্থান নির্বাচন করার পর আমাকে জানাবে৷”
উদ্বেগ পূর্ণ স্বরে বলল মীর। কপালে ভাজ পড়েছে ইতোমধ্যে। কোকো তখুনি ওয়াকিটকিতে সবাইকে আদেশ দিলো জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসতে। মীরকে বলল,
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
আনুগত্য জানিয়ে দ্রুত পায়ে সে এগোলো আবার জাহাজের দিকে। মীর ব্যাস্ত স্বরে বলল,
“সবাইকে এ স্থান ত্যাগ করতে বলুন ভাইজান। গামার্যে এক্সপোজার মারাত্মক। কতটুকু লিকেজ হয়েছে এখনো অজানা, রেডিয়েশনের নাগালে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে সবাই। এট লিস্ট টেন কিলো দুরত্বে নিয়ে যান সবাইকে। আমি এখানেই থাকছি।
এই এরিয়া সম্পুর্ন সিলগালা করার ব্যাবস্থা করুন, জনসাধারণ এবং বন্য প্রাণী যেন এদিকে কোনোভাবেই প্রবেশ না করে৷ রেডিয়েশন মুক্ত হওয়া পর্যন্ত এই এরিয়াতে মাছ ধরা জাহাজ নিষিদ্ধ করে দিন। মাছের ব্যাবস্থা অন্য এরিয়া থেকে করা যাবে৷”
জায়ান তৎক্ষনাৎ ইয়ারপিসে সবাইকে জানিয়ে দিলো সমুদ্র পাড় হতে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতে। কথা শেষ করেই সে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদীকে একবার জানালে হত না?”
“এমন সিচুয়েশনে এর আগে আমরা কখনো পড়িনি, ভাইজান। রেডিয়েশনে ওর কোনো ক্ষতি হবে না এমন নিশ্চয়তা কে দিবে? ওকে এসবে আমি জড়াতে চাইছিনা। ও কেমন আপনি ভালো করেই জানেন। যদি কোনোভাবে জানতে পারে পঞ্চদ্বীপ ঝুঁকিতে আছে তবে এখুনি ছুটে চলে আসবে, নিজের কথা ভাববেনা৷ ওর ফিজিক্যাল মেন্টাল হেলথ নিয়ে আমি এমনিতেই চিন্তিত, এই মুহুর্তে ওকে এসবে ইনভলভ করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।”
জায়ান মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো তৎক্ষনাৎ।
প্রাসাদে, নিজ কামরার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে আনাবিয়া। চোখের দৃষ্টি শূণ্য। হাতের মুঠিতে গতকালের সংগ্রহ করা ওষুধটি পিষে যাবার উপক্রম।
সম্মুখে তার রেড জোনের বিরাট হরিৎ জঙ্গল। সকালের মিষ্টি আলোতে চমকাচ্ছে নতুন পল্লব গুলো। ঘন জঙ্গলের তলদেশে ছুটে চলেছে বন বিড়ালের এক ঝাঁক, তাদের মুখনিঃসৃত মিউ মিউ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছে চারদিক। থেকে থেকে ভেসে আসছে এক শিকারী পাখির তীক্ষ্ণ স্বর, পাখিটি খেলছে তার শিকারের সাথে। শিকারটি পালিয়ে যেতে চাইছে, কিন্তু শিকারীর তীক্ষ্ণ নখরের খাবলা হতে পালানো দুষ্কর! বারংবার পালানোর ব্যর্থ চেষ্টার পর অতঃপর শিকার ক্লান্ত হয়ে নিজেকে সপে দিলো শীকারির পদতলে।
শিকারী পাখিটি তার শিকারের এই হঠাৎ আত্মসমর্পণে বেশ মর্মাহত হলো, বারংবার নখরের গুতায় ঠেলে চলল শিকারকে পালিয়ে যাবার জন্য, খেলা জমছেনা যে তার। কিন্তু শিকারটি নড়লোনা পর্যন্ত! আচমকা শিকারী পাখিটি শিকার রেখেই উড়াল দিলো আকাশে, ক্লান্ত বিধ্বস্ত ছোট্ট শিকারটি পড়ে রইলো সেখানেই!
আনাবিয়া আচমকা হেসে উঠলো সশব্দে, তার হাসির নিদারুণ ঝংকার হাহাকারের মতন শোনালো। হাসি মুখখানায় পরক্ষণেই ছাপলো বিধ্বংসী যন্ত্রণা! দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওষুধটি চোখের সামনে তুলে দেখল সে ক্ষণিক। দৃষ্টি হয়ে এল শক্ত, হৃৎপিণ্ডের গতি হলো দ্রুততর!
অকস্মাৎ নিদারুণ শোকে ঝাপসা হয়ে এলো তার দৃষ্টি, চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো লোনা পানির বহর। তারই সাথে শিরো মিদোরিতে শুরু হলো বৃষ্টি, ক্রমে ক্রমে বেগ বাড়লো তার!
হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে, দেহ শক্ত করে, বুক ভরে দম নিয়ে কঠোর হাতে মুখে পুরে নিলো সে ওষুধটি, আর সেই মুহুর্তেই বুক ভেঙে কান্না এলো তার। এক তীব্র, চাপা চিৎকার দিয়ে সে ভেজা প্রকৃতিতে উন্মুক্ত করে দিলো তার সমস্ত শোক! বৃষ্টি ছাপিয়ে আকাশে তৎক্ষনাৎ শুরু হলো বিদ্যুৎ চমক! ভয়ানক বজ্রনিনাদে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠল শিরো মিদোরি!
সহসা নিজ গর্ভে সদ্য প্রাণসঞ্চার হওয়া ভ্রুণটির জন্য এক বুক ভর্তি স্নেহ, মমতা উদ্বেলিত হয়ে উঠল! মুহুর্তেই তলপেটের ওপর দুহাত দিয়ে আগলে নিলো সে!
পারবেনা সে, পারবেনা! পারবেনা নিজের হাতে তার গর্ভসঞ্চার সমূলে উৎপাটন করতে! এতটা নিষ্ঠুর সে হতে পারবেনা, কখনোই না!
ডুকরে কেঁদে উঠে মুখ থেকে সজোরে ফেলে দিলো সে প্রাণনাশী বটিকা টি! হাটু মুড়ে বসে পড়ল মেঝেতে, ক্লান্ত দেহখানা এলিয়ে দিলো রেলিঙে। বৃষ্টির উন্মাদ, দমকা ছাট এসে বার বার আছড়ে পড়ল তার শরীরে, ভিজিয়ে দিলো তার নাজুক দেহ, ধুয়ে নিয়ে গেলো তার চোখের জল।
দুপুরের খাবার নিয়ে ফিলোমেলা দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করলো বার কয়েক। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সে। সকালের ঝুম বৃষ্টির পর চারদিক বেশ শীতল হয়ে আছে, হয়ে আছে নিরব। ঠান্ডা হাওয়া বইছে চারদিকে।
ফিলোমেলা কামরায় আনাবিয়াকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হলো, এদিক ওদিক দৃষ্টি দিতেই দেখলো ব্যালকনির দরজা খোলা। সেদিকে এগোতেই প্রমাদ গুণলো ফিলোমেলা! ছুটে গিয়ে আর্তনাদ করে বলে উঠলো,
“শেহজাদী! আপনি ঠিক আছেন?”
দ্রুত হাতে আনাবিয়াকে ধরলো সে, আনাবিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে। চোখ জোড়া রক্তিম, গা পুড়ছে জ্বরে। ফিলোমেলা আঁতকে উঠে বলল,
“বৃষ্টিতে ভিজে ভেজা কাপড়েই আছেন এখনো! জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে! কি হবে এবার? হিজ ম্যাজেস্টি জানতে পারলে কি করবে বলুন তো! উঠুন দেখি, দ্রুত উঠুন! শুকনো পোশাক পরতে হবে এখুনি!”
আনাবিয়া প্রতিবাদ করলনা কোনো, চুপচাপ উঠে এগোলো ফিলোমেলার পেছন পেছন। ফিলোমেলা দ্রুত একটা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে দিলো ওর। ক্লজেট থেকে পোশাক নিয়ে এসে আনাবিয়াকে দিয়ে বলল,
“শেহজাদী, পোশাক বদলে নিন দ্রুত! আমি এখুনি হেকিমকে ডেকে পাঠাচ্ছি।”
ফিলোমেলা ছুটে চলে গেলো বাইরে। আনাবিয়া ধীর হাতে বদলে নিলো পোশাক। ভেজা চুল গুলো জড়িয়ে নিলো তোয়ালেতে৷ ফিলোমেলা ফিরলো আবার, উত্তেজিত স্বরে বলল,
“হেকিম আসছে, আপনি এখন দ্রুত কিছু খেয়ে নিন শেহজাদী! এত অনিয়ম করলে কিভাবে চলবে বলুন? খাওয়া নেই দাওয়া নেই, মুখখানা শুকিয়ে গেছে একদম! আসুন দেখি, আপনাকে আমি খাইয়ে দেই!”
“হেকিমকে ফিরে যেতে বলো। এটুকু জ্বর এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।”
শান্ত, মৃদুস্বরে বলল আনাবিয়া। ফিলোমেলা অবুঝ চোখে
তাকাল ওর দিকে। ক্ষণিক বিরতিতে আনাবিয়া আবার বলে উঠল,
“অনুমতি ব্যাতিত এ কামরাতে আর কখনো আসবেনা ফিলোমেলা, খাবার দরজাতেই রেখে যাবে, আমি নিয়ে নিবো। আর… খাবার পরিমাণে দ্বিগুণ দিবে, এতটুকুতে আমার পেট ভরেনা।”
ফিলোমেলা চুপসে গেলো, অপরাধী স্বরে বলল,
“ক্ষমা করবেন, শেহজাদী! আ-আপনি সর্বক্ষণ এমন পরিমাণেই খান…. তাই আমি পরিমাণ বাড়াইনি! আমাকে ক্ষমা করে দিবেন শেহজাদী! আমার জন্য আপনাকে অর্ধভুক্ত থাকতে হয়েছে! আমি এখন থেকে বেশি বেশি খাবার নিয়ে আসব।”
“তুমি এখন যাও, আমি খেয়ে একটু ঘুমোবো।”
“আম্-আমি খাইয়ে দেই?”
আবদারের সুরে বলল ফিলোমেলা। আনাবিয়ার ক্লান্ত স্বর, শ্রান্ত মুখশ্রী আজ অন্যরকম ঠেকছে ফিলোমেলার নিকট। আনাবিয়া ক্ষণিক নিরব থেকে শান্ত চোখে তাকাল ওর দিকে। ভড়কাল ফিলোমেলা, আদেশ অমান্য করার সাহস হলনা। খাবার গুলো কামরায় রেখে সে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে গেলো বাইরে৷
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, বাহার মেয়েটার শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। তাকে গত পরশু লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে, যেকোনো সময়ে যা কিছু হতে পারে। আমরা আপনার আদেশের অপেক্ষায়, আপনি যদি আদেশ করেন তবে আমরা তার সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রিপারেশন নিবো, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“আপনারা আরেকটি মাস অন্তত চেষ্টা করে দেখুন, আলফানসো। বাচ্চাটিকে কোনোভাবে আট মাস পর্যন্ত গর্ভে রাখা যায় কি না। সাত মাস অনেক প্রিম্যাচ্যুর, এ সময়ে ভূমিষ্ট হলে তাকে অসংখ্য কমপ্লিকেশন্সের মুখোমুখি হতে হবে। বাহারের শারীরিক কান্ডিশনের কারণে এমনিতেই বাচ্চাটা ঝুঁকিতে আছে, সেখানে প্রিম্যাচ্যুর বার্থ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমরা শেহজাদাকে প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করছি। আশা রাখছি কোনো ধরণের বিপদে পড়তে হবে না, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর ঠোঁটের কোণ সামান্য বাকিয়ে মাথা নাড়লো। আজকাল অনেক বেশিই আনমনা হচ্ছে সে। আনাবিয়ার সাথে কথা বলা প্রয়োজন, সবকিছু তার নিকট সুন্দরভাবে ব্যাখা করা প্রয়োজন। কিভাবে বুঝালে সে বুঝবে আকাশের দিকে তাকিয়ে সেটাই ভেবে চলেছে সে প্রতিনিয়ত।
নিরবতা ভেঙে ডাক্তারটি আবার বলে উঠল,
“শেহজাদাকে নিয়ে আমরা অনেক আশাবাদী, ইয়োর ম্যাজেস্টি। অনেক বছর আগে, প্রথমবার যখন আমাদের মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র প্রফেসর এ কাজে নেমেছিলেন এবং বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলেন তখন আমরা সবে প্রথম বর্ষে। তিনি আমাদের হাত গোণা কয়েকজনের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করতেন, দিনের পর দিন পার করতেন কিভাবে দেমিয়ান সাম্রাজ্যের কারো টেস্ট টিউব বেবি তৈরি করা যায়। কিন্তু তিনি সফল হননি, আমরা তার স্ট্রাগল দেখেছি কাছে থেকে। বেশ দুঃখ নিয়েই তিনি এ পৃথিবী ছেড়েছেন। স্যারের অসম্পূর্ণ কাজ আমরা সম্পুর্ন করতে পেরেছি ভাবলেই আশ্চর্য হই। উনি এতদিন বেঁচে থাকলে নিশ্চয় তার ছাত্রদের এমন সফলতায় খুশি হতেন অনেক।”
“তোমাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ থাকবো, আলফানসো। তোমাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আমি অবশেষে আমার শেহজাদার মুখদর্শনের সৌভাগ্য অর্জন করেছি, দ্যাটস আ বিগ রিলিফ। আমাকে এখন বেরোতে হবে। বাহারের দিকে খেয়াল রেখো৷ কোনো জটিলতা দেখা দিলেই সিজারিয়ান ডেলিভারি করে ফেলবে, আমার আদেশের অপেক্ষার প্রয়োজন নেই।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর উঠে পড়লো তৎক্ষনাৎ, তার অতিসত্বর শিরো মিদোরিতে ফেরা প্রয়োজন।
সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে, কিমালেবের পর্বতসারির পাদদেশে খোড়া হয়েছে এক বিরাট খাদ। এক দল রিসার্চারকে সাথে নিয়ে কোকো আর তার মিলিটারি ফোর্স কাজ করে যাচ্ছে নিরলস৷ সীসার বিরাট বিরাট ধারক গুলো ক্রেনের সাহায্যে রাখা হচ্ছে খাদের ভেতর। এদিকে জনমানুষ, বন্যপ্রাণীর আনাগোনা কম। হাতে গোণা কয়েকটি পাহাড়ি ছাগল মাঝে মাঝে চলে আসে এ পাশে। সম্পুর্ন এরিয়াটা সিলগালা করায় তাদের চলাচলও বন্ধ হয়ে যাবে।
সমুদ্রের বালুকাময় তীর হয়ে মীরের কালো গাড়িখানা এসে থামলো তখন। তাকে দেখে এগিয়ে এলো কোকো, আনুগত্য জানিয়ে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার এভাবে খোলা বাতাসে থাকা একদমই অনুচিত। কনটেইনার গুলো সিলগালা হলেও বাতাসে এখনো রেডিয়েশন ঘুরে বেড়াতে পারে। আপনাকে এই এরিয়াতে প্রবেশ না করার অনুরোধ।”
মীর তাকিয়ে দেখলো একবার কাজের অগ্রগতি। বলল,
“সাবধানে কাজ শেষ করো কোকো। এগুলো শেষ হলে সম্পুর্ন ফোর্স নিয়ে রামাদিসামাতে হেকিমদের আন্ডারে চলে যাবে, কোনোভাবেই যেন এখানের কেউ লোকালয়ে প্রবেশ না করে, পরিবারের মানুষদের থেকেও তাদেরকে দূরে রাখবে, সম্পুর্ন বিপদমুক্ত হওয়ার পর তাদেরকে ছেড়ে দিবে। আমি কিমালেব ছাড়ছি, শিরো মিদোরিতে ফিরব। কোনো সমস্যা হলে তৎক্ষনাৎ আমাকে জানাবে৷”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
কোকোর সাথে কথা শেষ করে মীর তখুনি বেরিয়ে পড়লো শিরো মিদোরির উদ্দ্যেশ্যে।
রয়্যাল ফ্লোরের বারান্দায় বিরাট এক ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে ফিলোমেলা মহসিনের সাথে মিলে আনাবিয়ার রাতের খাবারের লিস্ট মিলিয়ে দেখছে। মহসিন একবার লিস্টে আরেকবার ট্রেতে চোখ বুলাচ্ছে। এক পর্যায়ে ফিলোমেলা জিজ্ঞেস করল,
“সব ঠিক আছে? কোনোটা বাদ পড়েনিতো?”
“কবুতরের বাচ্চার মাংস কই?”
“এই রে! থেকে গেছে রান্নার ঘরে, আমি এখনি নিয়ে আসছি!”
ফিলোমেলা ট্রে রেখে ছুটলো রয়্যাল কালিনারির দিকে। মহসিন ফিলোমেলার এমন উদাসীনতায় মনে মনে কিছুক্ষণ বকাবকি করে আবারও ব্যাস্ত হয়ে পড়লো লিস্ট মেলাতে৷ সেই মুহুর্তেই রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে ধ্বনিত হলো মীরের আগমনী সংবাদ৷ মহসিন নির্ধারিত নিয়মে দাঁড়িয়ে গেলো বারান্দার কিনার ঘেঁষে।
ক্লান্ত বিধ্বস্ত মীর বেশ দ্রুত পায়েই এগোলো কামরার দিকে। মহসিনকে পেরিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা তার চোখ পড়ল খাবারের ট্রের দিকে৷ দাঁড়িয়ে গেলো সে, কপালে ভাজ ফেলে আশ্চর্যের স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এত খাবার কার জন্য মহসিন?”
“শেহজাদীর জন্য, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মহসিনের উত্তরে মীর বিস্মিত চোখে তাকাল তার দিকে। মহসিন অপ্রস্তুত হাসলো তাতে। ফিলোমেলাও তখন এলো কবুতরের মাংসের পাত্র হাতে নিয়ে। মীরকে দেখে আনুগত্য জানিয়ে সে পাত্রটা রাখল ট্রেতে, তারপর নত মুখে দাঁড়াল মহসিনের পাশে।
মীর কিছুক্ষণ বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থেকে অবশেষে বিচলিত ভঙ্গিতে ধীর পায়ে এগোলো নিজের কামরায়। আনাবিয়ার খাবারের চাহিদা বেড়েছে এ খবর সে পেয়েছিল, কিন্তু সেটা যে এত পরিমাণে এ ধারণা তার ছিলনা! চিন্তিত দেখাল তাকে তৎক্ষনাৎ। শঙ্কা, উৎকন্ঠা এসে ভর করল তার মন মস্তিষ্কে।
দ্রুত পোশাক বদলে হাতে মুখে পানি দিয়ে সে গিয়ে দাঁড়াল আনাবিয়ার দরজার সম্মুখে, আলতো করাঘাতের পর মৃদুস্বরে ডেকে উঠল,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৬
“শিনজো!”
সাড়াশব্দ এলনা কোনো, মীর আবারও নরম স্বরে ডাকলো তাকে,
“শিনজো, দরজা খুলো!”
বারকয়েক ডাকাডাকির পরেই ভেতর থেকে ভেসে এলো ধীর ভারী পদশব্দ, শ্বেত পাথরের মেঝের রিনরিনে শব্দে মুখরিত হলো চতুর্দিক। ক্ষণিক পরেই দরজার নিকটে এসে থামলো স্নিগ্ধ, নির্মল শব্দটি, তারপরেই খট শব্দে ঘুরল দরজার নব!
