প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭০
সাইয়্যারা খান
আতঙ্কিত পলক ঘন্টা খানিক সময় ধরে এদিক ওদিক হাঁটছে। পা দুটো অবশ হয়ে যাচ্ছে এখন। ঘাম ছুটছে এত নিম্ন তাপমাত্রার রুমে। তুহিন সানন্দে দুটো মেয়ে বাচ্চা নিয়ে ঘুমাচ্ছে। ওদের সাথে বসে থাকতে থাকতে ওখানেই চোখ বুজেছে। এদিকে ঘুম হারাম হয়েছে পলকের। তুহিন কার বাচ্চা তুলে আনলো ওর মাথায় আসছে না। পলকের চোখ ভিজে উঠছে। দোষটা কি তাহলে তার নিজের? তুহিন বাচ্চা চেয়েছিলো সুন্দর ভাবে, পলক না করেছে তাই বলে সে অন্যের বাচ্চা তুলে আনবে? বাবা ডাক শোনার হঠাৎ এত তাড়া লাগলো কেন তার? নাকি তুহিন উল্টাপাল্টা কিছু ভাবছে? ভাবছে যে পলক কোনদিনই বাচ্চা নিবে না। নিজেকে পাগল পাগল লাগলো পলকের। তুহিন নেশা ছেড়েছে কিন্তু সেই পুরাতন উন্মাদনা না৷
“মামি, খাবেন এখন? টেবিলে দিব?”
কলির ডাকে চমকে যায় পলক। ওর চমকানো ভাব আর মুখটা কলি লক্ষ্য করে। পলক নিজেকে সামলাতে গিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে। ওর মন, মস্তিষ্ক ঠিক নেই। বেশ জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। এখন খাবার নামবে না গলা দিয়ে। কণ্ঠনালী ভেদ করে বেশ কষ্ট করে উত্তর দিলো,
“একটু পর। তোর মামা উঠুক।”
“জি, আচ্ছা।”
কলি সরে গেলো ওখান থেকে। পলক যদিও আগের মতো গায়ে হাত তুলে না তবুও পলককে ভয়ই লাগে। না জানি কখন মেরে বসে। এরা স্বামী-স্ত্রী খুব একটা সুবিধার তো না। এদের হাত উঠে যায় খুব তারাতাড়ি।
পলক ধীর কদমে হেঁটে বেড রুমে ঢুকলো। চোখ দুটো এবার কপালে উঠার উপক্রম। তুহিন মাঝে শুয়ে দুইপাশে বাচ্চাদুটোকে বুকে জড়িয়ে আছে। একই ব্ল্যাংকেটের নিচে শুয়ে আছে তিনজন। পলকের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কার বাচ্চা তুলে এনে তুহিন নিজের পিতৃত্বের স্বাদ পূরণ করছে? না জানি বাচ্চা দুটোর বাবা-মা এখন কি করছে নাকি এতিম বাচ্চা? চিন্তায় পলকের মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। সামনের দৃশ্যটা খুব সুন্দর হতো যদি সন্তান গুলো তাদের হতো কিন্তু এখন, এই মূহুর্তে বেশ চক্ষুশূল লাগছে। মাথা কাজ করছে না পলকের। কিছুটা রাগ আর হিংসেরও উদগীরণ হলো তার মাঝে। নিজের রাগের সব চাইতে ছোট্ট বহিঃপ্রকাশ করে দ্রুত বেরিয়ে গেলো পলক। এদিকে তুহিনের কপাল কুঁচকে গেলো। ইনি, মিনি কাঁদছে। তুহিন চোখ খুলে ওদের কান্নারত অবস্থায়ই পেলো। দু’জনের কান্নার কারণও খুব স্পষ্ট। ডান গালে ছোট্ট লাল দাগ। চিমটি কাটা হয়েছে গালে। তুহিন ঝুঁকে দু’জনের গালে চুমু খেলো। বুকে জড়িয়ে রেখে কান্না থামাতে চাইলো।
“টাটই বেতা পেয়েতি।”
“কোন ব্যথা নেই।”
“আপা যাব।”
“অ্যাঁহ্,আসছে আপাওয়ালী। কোন আপাটাপা নেই এখানে।”
“তাহনে দুতাবাই যাব।”
“নাক টিপলে দুধ পড়ে আসছে দুলাভাই যাবে। দুলাভাই কি ভালো জিনিস যে দুলাভাই যাবি?”
দু’জন কান্না থামিয়ে তাকালো। চোখে পানি দিয়ে টইটুম্বুর অবস্থা। তুহিন গম্ভীর মুখে দু’জনের চোখ মুছালো। গালে আদর করে বললো,
“এভাবে কি দেখে পাখি দুটো?”
“দুতাবাই তো বালো।”
“হ্যাঁ, ভালো কিন্তু বেশি ভালো না।”
“টাটই বালো?”
“একদম। আমি খুবই ভালো। দেখ কত আদর করি। ময়না পাখি। টিয়া পাখি দুটো।”
তুহিন ওদের বেশ আদর করলো। কলিকে ডেকে বরফ আনিয়ে গালে লাগালো। দু’জন লাফিয়ে উঠে। চেঁচায়,
“থান্ডা!”
“একটুই তো ঠান্ডা। লাল দাগ না গেলে তোদের আপা আমাকে গরম পানি ছুঁড়ে মারবে। আমার শরীর থেকে চামড়া তুলে নিবে। চাস আমি চামড়া ছাড়া হয়ে যাই?”
“মুলগিল মতো?”
“হ্যাঁ।”
দু’জন উত্তর দিতে পারলো না। শুধু একসাথে বললো,
“এখন আপা তলো।”
তুহিন কথা বাড়ালো না। দু’জনকে কোলে তুলে ছাদে চলে গেলো। এদিকে ড্রয়িং রুমে পলক ঠাই বসে আছে। তুহিন ওদের এত আদর করছে কেন? এক দিনেই এত পাগল হলো কেন? পলককে ডাকলো না কেন ছাদে যেতে?
পৌষের চোখ দুটো নিভু নিভু। তৌসিফ ঔষধ গুলো খাওয়ালো থেকেই চোখ ভেঙে ঘুম পাচ্ছে তার। পিহা পাশে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছে। চৈত্র পায়ের কাছে বসে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। জৈষ্ঠ্য থমথমে মুখ করে বসা। পৌষ ওমন অবস্থায়ই ধমকালো,
“নখ কাটবি না দাঁত দিয়ে। খয়রাতি হয়ে যাবে আমার জামাই। নিজের বাপের ঘরে বসে দাঁত দিয়ে নখ কাটবি।”
ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা অথচ নিজের বর নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। ছোট বেলায় দাঁত দিয়ে নখ কাটতেই সেঝ চাচি বকা দিতো। চিবিয়ে চিবিয়ে বলতো দাঁত দিয়ে নখ কাটলে সংসারে আয় উন্নতি কমে যায়। পৌষের জন্মই হয়েছে অন্ন ধ্বংস করতে। এত কটুবাক্য হজম করেও দাঁত দিয়ে নখ কাটা কমতো না ওর। এখন অবশ্য বড় হয়ে অভ্যস বদলেছে কিন্তু ছোট বেলার স্মৃতি গুলোও মাথা থেকে মুছে যায় নি। যেখানে কারো কারো ঘাড়ের ব্যথা ছিলো পৌষরাত নামটা সেখানে আজ তৌসিফের মাথার তাঁজ এই নামটা৷ অন্ন ধ্বংস করা পৌষ অন্ন দান করতে পারে, বড়ই আশ্চর্য ব্যাপার।
“তোর দুলাভাই কোথায়? আসছে না কেন এখনও? ওনার ভাই কি গুন্ডা যে মেরেধরে আনছে আমার বোনদের?”
“গুন্ডাই তো।”
মিনমিন করলো জৈষ্ঠ্য। পৌষ শুনলো না। ঘুমিয়ে গেলো সহসা। চোখের পাতা আর খোলা রাখা যাচ্ছে না। পিহা চিন্তিত মুখে চৈত্রকে বললো,
“দুলাভাই আসে না কেন?”
“জানি না৷”
এদিকে ছাদে এসে তৌসিফ ভিন্ন দৃশ্য দেখেছে। ছাদের স্টেনলেস স্টিলের বড় দোলনায় ইনি, মিনি বসা। পেছন থেকে বেশ মজা করে ধাক্কা দিচ্ছে তুহিন। দু’জন হাসছে, তুহিন হাসছে। দৃশ্যটা তৌসিফ চলতে দিতে চাইলো কিন্তু সবার আগে তার বউ। বউ ছাড়া সে আজকাল চোখেই তো দেখে না। চোখের রেটিনায় বউয়ের চেহারা জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে। ছোট ভাইয়ের আনন্দ আপাতত চাপা দিলো তৌসিফ। গম্ভীর কণ্ঠে ডেকে উঠলো,
“তুহিন।”
তুহিন উত্তর করার আগেই ইনি, মিনি চেঁচালো,
“দুতাবাই, এই যে আমলা।”
তৌসিফ ওদের দিকে তাকালো না। তুহিনের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে পকেটে হাত গুঁজে ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো। তুহিন বোকা চাহনি দিতেই তৌসিফ চোখ গরম করে তাকালো। চোখের ইশারায়ই যেন শাসালো চরম ভাবে। দোল থামিয়ে তুহিন সিনা টানটান করে দাঁড়ালো। ইনি, মিনি হাসি থামিয়ে তাকিয়ে আছে। তৌসিফ এগিয়ে আসায় দু’জন বাহু প্রসারিত করলো। বুঝালো কোলে নাও। তৌসিফ তুললো। দু’জন গলা জড়িয়ে ধরতেই তুহিন কপট রাগ দেখিয়ে বললো,
“সুবিধাবাদী কোথাকার।”
“তুহিন!”
“হ্যাঁ, শুনছি।”
“ওদের ওভাবে এনেছিস কেন তখন? পৌষরাত…”
তুহিন সম্পূর্ণ করতে দিলো না। ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বললো,
“তুমি আজকাল পৌষরাত বাদে চোখে দেখো কিছু?”
“ভাবি ডাকবি।”
বউয়ের কথা মনে করে বললো তৌসিফ। তুহিন সেই আশায় পানি ঢেলে দিলো তাও ঠান্ডা পানি।
“আমার থেকে বয়সে ছোট। ওকে ভাবী কেন ডাকব? ফুপাতো বোন হয় আমার।”
“বেয়াদবী করবি না একদম। সম্মান দিবি ওকে।”
“আসছে, তোমার সম্মানওয়ালী বউ কতটা তর্ক করে তুমি জানো? আমাকে বেয়াদব বলে৷ বেলাজ বলে।”
“তুই সম্মান বজায় না রেখে ওর সাথে ঝামেলা পাকাস কেন? আর ওদের ওভাবে এনেছিস কেন? কাঁদছিলো দু’জন।”
“ওদের দত্তক নিব আমি।”
এমন মূহুর্তে এই কথা তুহিন বলেছে যা তৌসিফ সরাসরি নিজ কানে শুনেছে। সাথে শুনেছে আরেকজন। তৌসিফ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। মাত্রই কি শুনলো ও? তুহিন ঘোষণা করে চুপ করে আছে। তৌসিফ যে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে তা ঢের বুঝতে পারছে তাই নজর মেলাচ্ছে না। তৌসিফ ওখানে দাঁড়ালো না। শুধু যেতে যেতে বললো,
“রাতে নিচে অফিসে আসবি।”
“কিছু খাওয়াবে নাকি?”
“দুটো পাঞ্চ খাবি তুহিন।”
“তাহলে অফিসে কি কাজ? ওয়েট অ্যাঁ মিনিট, ওদের দত্তক নেওয়ার কাগজ ঠিক করবে?”
তৌসিফ দাম দিলো না। সিঁড়ির দিকে গিয়ে বললো,
“ওরা এতিম না।”
“আমি জানি।”
একটু জোরে বললো যাতে দূরে যাওয়া তৌসিফ শুনতে পায়। তৌসিফ শুনলো এবং ওখান থেকেই নিজ স্বরে বললো,
“তোর মেডিক্যাল রিপোর্ট সাথে নিয়ে আসবি৷ দেখব কি এমন সমস্যা দেখা দিলো যে তোর আমার শালীদের দত্তক নিতে হবে।”
হেমন্ত এসেছে ভাই-বোনদের বাসায় নিতে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কারো যাওয়ার নিয়ত নেই। হেমন্ত জোর করবেই বা কিভাবে? সবার কাছে এখানে থেকে যাওয়ার উপযুক্ত কারণ আছে। এমনকি এতটুকু এতটুকু মুরগীর ছানার মতো ইনি, মিনিও তাদের কাঁধে দায়িত্ব নিয়েছে। তারা আপা আর দুলাভাইয়ের খেয়াল রাখছে। হেমন্ত অসহায় বোধ করে। এদের তো বাসায় নিতে হবে। ওইদিকে শ্রেয়া আর ছেলে বাসায়৷ তৌসিফ হেমন্তের ওমন মুখ দেখে সরাসরি প্রশ্ন করে,
“ভরসা পাচ্ছো না হেমন্ত?”
দ্বিধাদ্বন্দ্বিত হেমন্ত কথা বলতে পারলো না। তৌসিফের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ওকে চুপ থাকতেও দিলো না। চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে উত্তরে বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৯
“বাড়ীঘর খালি ভাই।”
“ওদের নিয়ে গেলে যে আমার ফ্ল্যাটটা খালি হয়ে যাবে।”
হেমন্ত কি বলবে? কাকে বলবে? যেই ব্যাক্তি উত্তর জানে, প্রশ্ন জানে তাকে নতুন করে কিইবা বলবে? তৌসিফ গভীর চোখে তাকিয়ে আছে যেন খুব সাধারণ কথা বলেছে সে। তার দুই পাশে একদম বাহুর নিচে ঢুকে গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে ইনি, মিনি। পিহা পৌষের কাছে। পৌষ উঠে নি এখনও। হেমন্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। তৌসিফের দিকে অসহায় ভাবে তাকালো। তৌসিফ গুরুত্ব দিলো না। তার বউ অসুস্থ। কিছুতেই বউয়ের কলিজা, ফেপসাকে যেতে দেওয়া যাবে না। নিশ্চিত পৌষ উঠে খুশি হবে। খুশিতে আজ তৌসিফের কপালও খুলতে পারে। বউয়ের আদর যত্ন পেতে মরিয়া হয়ে আছে তৌসিফ তালুকদার।
