বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৩
রানী আমিনা
দ্রুত পায়ে কোটর সদৃশ কামরাতে ঢুকলো মীর৷ নরম আলোতে কামরা পরিপূর্ণ হলো তৎক্ষনাৎ। আলোকিত হতেই দেখলো আনাবিয়া ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে নিজের বুকের ওপর ঘুমাতে থাকা বাচ্চাটির দিকে৷ উঠে বসার উপায় নেই, চারদিকে তার যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে তার সন্তানেরা৷
লাইফিট্রির লতাগুলো তৎক্ষনাৎ নিজেদের শরীরের একাংশ দিয়ে তৈরি করে ফেললো একটি মোলায়েম দোলনা। লতার সাহায্যে বাচ্চাগুলোকে আলতো করে জড়িয়ে শুইয়ে দিলো দোলনার ভেতর৷
এক দল লতা কোথা থেকে একটা সফেদ চাদর এনে জড়িয়ে দিল আনাবিয়ার উন্মুক্ত শরীরে৷ মীর উদ্বিগ্ন চোখে বসলো আনাবিয়ার পাশে, আগলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“শরীর কেমন লাগছে এখন?”
আনাবিয়া উত্তর দিলনা। চাদরটা গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে বসলো দোলনার পাশে; স্নিগ্ধ, মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখতে রইলো তার সন্তানদের। মীর নিজেও এগিয়ে এলো। আনাবিয়াকে টেনে নিজের কোলের ভেতর নিয়ে ওর ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দেখতে রইলো বাচ্চাদের৷
নড়াচড়া করছে ওরা, ক্ষণিক পর পর আড়মোড়া ভাঙছে। হয়তো জেগে উঠবে এখনি। আনাবিয়ার ঠোঁটের কোণে মোলায়েম হাসি ফুটলো। একটা বাচ্চা অবিকল মীরের মতন। যেন মীরকে কেউ ছাঁপিয়ে দিয়েছে তার শরীরে। ঠিক একই রকম কুচকুচে কালো শরীরের রঙ; ধুসর, কোকড়া চুল মাথার ওপর৷ চোখ জোড়া মীরের মতোই, ঝলসানো স্বর্ণ যেন! মীর হাত বাড়িয়ে ঠোঁট জোড়া আলগা করে দেখলো তার, দুইটা ধারালো ক্যানাইন দাঁত। মীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো যেন। আনাবিয়া বলল,
“আমার শেহজাদারা যেমনই হোক ওরা আমার সন্তান! আমার বাচ্চাদের কেউ তাদের অ্যাপিয়ারেন্স এর জন্য ভুল করেও সমালোচনা করলে তাকে আমি সেখানেই খুন করে ফেলবো।”
মীর হাসলো তাতে, অধর জোড়া চেপে ধরলো আনাবিয়ার কাঁধের ওপর৷ অতঃপর পাশের বাচ্চাকে দেখিয়ে বলল,
“দেখো, এটা একদম তোমার মত হয়েছে!”
“এটা’ মানে? এটা ওটা করছো কেন? অলওয়েজ ভদ্রভাবে কথা বলবে আমার বাচ্চাদের সাথে!”
ঝাঁঝিয়ে বলে উঠলো আনাবিয়া৷ মীর সশব্দে হেসে বলল,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে৷ তিন নম্বর ছানা টা তোমার মতো।”
আনাবিয়া কটমট করে তাকালো ওর দিকে৷ পরক্ষণে কিছু মনে পড়তেই জিজ্ঞেস করলো,
“ওদের ভেতর আগে কে হয়েছে? কার পর কে হয়েছে?”
মীর ভুলে যাওয়ার ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়াল, অপ্রস্তুত হেসে মাথা চুলকে বলল,
“সেটা তো ভুলে গেছি!”
“একটা কাজ ঠিক করে করতে পারোনা? দেখোনি কেন? এখন আমরা কিভাবে বুঝবো ওদের ভেতর বড় কে ছোট কে?”
“আমি তো তোমাকে নিয়ে ব্যাস্ত ছিলাম! এখন সব আমার দোষ?”
“হ্যাঁ, দোষ সব তোমারই!”
ওদের ঝগড়ার ভেতরেই লতাগুলো এসে নাম্বার প্লেট বসিয়ে দিল সবার মাথার ওপর৷ মীরের ফটোকপি টা সবার বড়। দ্বিতীয়টা হুবহু আনাবিয়ার মতন, ঠিক অমনই আইভরি শরীরের রঙ, ধবধবে সাদা চুল, হীরের মতোন ঝকমকে দুচোখ৷ তৃতীয় জন মীরের মতোই কৃষ্ণবর্ণের, অথচ চুল গুলো ধবধবে সাদা, চোখ জোড়া আনাবিয়ার চোখের মতোই ঝকমকে। চতুর্থ জন ঠিক তার উলটো, আনাবিয়ার মতন শুভ্র গায়ের রঙ, মীরের মতন ধূসর চুল, স্বর্ণাভ দৃষ্টি!
আর পঞ্চম জন সবচেয়ে অদ্ভুত!
শরীরের ডানপাশটা সম্পূর্ণ কুচকুচে কালো, সেপাশের চোখ টা স্বর্ণাভ, চুলগুলো ধূসর কালো! অথচ বা’ পাশটা পুরোটাই যেন আনাবিয়া! ঝকঝকে সফেদ রঙ, চোখটা হীরকখণ্ডের ন্যায় ঝলমলে, চুলগুলো দুধসাদা! যেন আমাবস্যা আর পূর্ণিমার মিলনস্থল!
আনাবিয়া তাকালো মীরের দিকে, চোখাচোখি হল দুজনের৷ আনাবিয়ার ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেলো। ছোট সন্তানটিকে নিজের কোমল আঙুলে ছুঁয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“ওদের নাম রাখবেনা?”
মীর ওদের দেখতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলো, আনাবিয়ার কথায় সম্বিত ফিরে পেলো যেন। শুধোলো,
“তুমি কি নাম রাখতে চাও?”
আনাবিয়া ভাবলো ক্ষণিক, কিঞ্চিৎ নিভে গিয়ে গলা খাকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার বড় ছেলের নাম কি রেখেছো?”
“সাইয়্যিদ আরহাম।”
“তোমার বাবার নামে রেখেছো?”
“হু।”
আনাবিয়া ফিরলো বাচ্চাদের দিকে। অবিকল মীরের মতোন দেখতে, নিজের বড় সন্তানটিকে দেখিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠলো,
“ওর নাম রাখব মীর মিশআল। আমার বড় শেহজাদা ওর নামের মতোই আলো ছড়াবে, কেউ ওকে ওর রঙে চিনবেনা, ওর কর্মেই চিনবে৷ নিজের ছোট ভাইদেরকে ও সারাজীবন আগলে রাখবে, পথ দেখিয়ে নিবে৷ কখনো নিজেদের ভেতর কোনো বিদ্বেষ প্রবেশ করতে দিবেনা!”
মীর মোলায়েম হাসলো, আদুরে ভঙ্গিতে মাথাটা এলিয়ে দিল আনাবিয়ার কাঁধে৷ নিজের শৈশবকে মনে পড়লো তার, তখন যদি এমনই শক্ত হাতে, এমনই আদরে তাকে আগলে নিত কেউ, যেন কেউ কখনো বাঁকা চোখে চাওয়ার সুযোগ টুকু পর্যন্ত না পায় তবে ওর জীবনের গল্প হয়তো আজ অন্যরকম হতো৷
পরক্ষণেই আনাবিয়ার দিকে দেখলো সে৷ না, তার জীবনও অমন বাঁধাহীন চললে আজ হয়তো আনাবিয়াকে পাওয়া হত না তার। হয়তো আনাবিয়া অন্য কারো স্ত্রী হতো, হয়তো দুজনের ভেতরে তখন নেহাত পারিবারিক বন্ধন ছাড়া আর কিছুই থাকতো না! কালে ভদ্রে, কোনো বিশেষ মুহুর্ত ছাড়া কখনো দেখাও হতো না! অন্য কারো হত সে! অসম্ভব!
নিজের আলিঙ্গন শক্ত করে নিলো মীর, তার জীবনের দুঃখগুলোর বিনিময়ে তার এমন প্রাপ্তি নিয়ে সে অনেক অনেক সুখী, সীমাহীন সুখী। কোনো আফসোস নেই, কোনো অপ্রাপ্তি নেই আর!
আনাবিয়া দোলনায় তার অন্য শেহজাদাদের নামকরণে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো, নিজের মতো দেখতে শেহজাদাটিকে ছুয়ে বলল,
“ওর নাম রাখবো মীর ফিরাস। ”
মীর নিজের ডান ভ্রু উঁচু করলো তাতে, গলা খাকারি দিল একবার৷ আনাবিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো ওকে একবার, বলল,
“নিজের মন পরিষ্কার করো৷ অবশ্য যাকে অন্ধকারে দেখা যায়না তার মন আর কত পরিষ্কার হবে!”
“ভুলে যেওনা এগুলো অন্ধকারে দেখা না যাওয়া ব্যাক্তিরই বাচ্চাকাচ্চা, যারা তোমার পেট থেকে বেরিয়েছে।”
দোলনায় ঘুমোতে থাকা শেহজাদাদের দেখিয়ে বলল মীর৷ আনাবিয়া “হুহ্” বলে আবার বাচ্চাদের দিকে ফিরলো। মীরের রঙ পাওয়া, অথচ তার চোখ, আর সফেদ চুল পাওয়া বাচ্চাটিকে দেখিয়ে বলল,
“ওর নাম রাখবো মীর জিবরান, আর ওর পরের জনের নাম হবে মীর কাসওয়ার৷ ছোট শেহজাদার নাম তুমি রাখতে পারো, আমি কিছু বলবো না৷”
বলে নাক কুচকে হাসলো আনাবিয়া৷ মীর খেলাচ্ছলে চুল টেনে দিলো ওর, তারপর দেখলো নিজের ছোট সন্তানটিকে৷ সবাই যখন ঘুমোচ্ছে তখন সে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে। হয়তো অদম্য কৌতুহলী চোখে দেখে চলেছে নিজের বাবা মায়ের খুনসুটি! মীর ছুয়ে দিলো ওর ছোট্ট, বোতামের ন্যায় নাকটা, ওর মুখের ওপর ঝুঁকে মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো,
“ওর নাম রাখবো মীর আরসালান৷”
আনাবিয়া দুহাতে নিজের হাটু জোড়া জড়িয়ে ধরে দুলতে রইলো, মুখে ধরছেনা আনন্দের হাসি৷ চোখ জোড়া ঝিলিক দিচ্ছে তার! মীর ওকে দুলতে দেখে বলল,
“ছোট বেলায় এমন দুলতে, যখন তোমাকে তোমার পছন্দের খাবার খাওয়ানো হত। পছন্দের জায়গায় ঘুরতে নিয়ে গেলেও সিটে বসে দুলতে এভাবে।”
আনাবিয়ার হাসি চওড়া হলো আরও। ভালো লাগছে তার, অনকে অনেক ভালো! এমন পরিপূর্ণতা সে কখনো অনুভব করেছে কিনা বলতে পারেনা৷ মীর দেখলো ওকে, চোখে মুখে খুশির ঝিলিক, এক অদ্ভুত আলোয় যেন আলোকিত হয়ে আছে ওর সম্পুর্ন অবয়ব! একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে জিজ্ঞেস করলো,
“শরীর কেমন লাগছে এখন?”
“ভালো, খারাপ লাগছে না৷”
“হাটাহাটি করতে হবে, উঠো৷”
বসা থেকে উঠতে উঠতে বলল মীর৷ আনাবিয়াকেও টেনে উঠালো সাথে৷ ধীরে ধীরে ওকে হাটিয়ে নিয়ে চলল কামরা জুড়ে, জিজ্ঞেস করলো,
“ক্ষিদে পায়নি?”
“হু, অন্নেএক!”
“খেয়ে নিবে চলো, খাবার এসেছে অনেক আগেই।”
আনাবিয়া খাবারের বিরাট ট্রের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি কি খাবে?”
মীর প্রশ্ন বুঝতে না পেরে ক্ষণিক অবুঝের মতো চেয়ে থেকে দ্বিধাভরে বলল,
“আমিও…এগুলোই খাব।”
আনাবিয়া লাফিয়ে ট্রে টাকে দুহাতে নিজের পেছনে আড়াল করে তেজি স্বরে বলল,
“একদম না, এসব আমার! আমি খাবো! তুমি অন্য ব্যাবস্থা করে নাও।”
মীর একবার ট্রের খাবারের পরিমাণ দেখে নিয়ে বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“এই সব তুমি একা খাবে? খেতে পারবে?”
“অবশ্যই!”
“খাও দেখি!”
আনাবিয়া যেন চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্ট করে নিলো, ট্রের এক কোণায় পড়ে থাকা ধোঁয়া ওঠা মাঝারি আকারের গ্রিল চিকেনটি সস মাখিয়ে প্রায় তিন কামড়ে খেয়ে শেষ করে ফেললো, হাড় গুলো মুখ থেকে ছুড়ে ফেলে মীরের দিকে একবার তাকিয়ে বুঝিয়ে দিল, এই ট্রে ফাঁকা করা তার বা হাতের খেল।
মীর ভ্রু উচিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে মনে মনে বাহবা দিল যেন। তখনি লাইফট্রির এক ঝাঁক লতা নিয়ে এলো আরেকটি ট্রে৷ মীরের পিঠে টোকা দিয়ে ট্রে টা রাখলো মীরের সামনে। কিন্তু মীর তখনো আগ্রহভরে দেখতে রইলো আনাবিয়ার গোগ্রাসে খেয়ে যাওয়া!
মীর ধীর গতিতে বসলো ওর বিপরীতে। ততক্ষণে আনাবিয়া আরও কয়েকটি খাবারের প্লেট সাফ করে ফেলেছে৷ মীর নিজের খাওয়া রেখে চুপচাপ চেয়ে রইলো ওর দিকে, আনাবিয়ার গোগ্রাসে খাবার গলাধঃকরণ হাসালো ওকে৷ ধীরে ধীরে নিজের পূর্ণবয়স্ক দেমিয়ান রূপের দিকে পদার্পণ করছে আনাবিয়া। ওদের পরম্পরা ভীষণ রকম খাদক, মেটাবলিজম সর্বোচ্চ মাত্রায়৷ শুধুমাত্র রাজপরিবারের খাবারের চাহিদা মেটাতে রামাদি সামাতে আর্মি পার্সোনেজদের তত্বাবধানে গবাদিপশুর বিরাট বিরাট ফার্ম সামলানো হয়৷ গর্ভাধারণের কল্যাণে আনাবিয়ার দেমিয়ান বৈশিষ্ট্য গুলো আরও প্রকট হতে শুরু করেছে৷
আনাবিয়ার কোনো দিকে খেয়াল নেই, সে খেতে ব্যাস্ত। মুখভর্তি খাবার নিয়ে একবার দেখলো মীরের দিকে, তাকিয়ে সে ওরই দিকে, খাবার স্পর্শ করেনি এখনো। আনাবিয়া ওর খাবারের দিকে একবার লোভাতুর চোখে চেয়ে বলে উঠলো,
“খাবেনা? না খেলে এদিকে পাস করো।”
মীর হাসলো সশব্দে, তারপর নিজের ট্রে খানা হাতে ঠেলে এগিয়ে দিলো ওর দিকে। আনাবিয়া সোৎসাহে নিজের করে নিলো সেটাও৷
“প্রাসাদে ফিরবেনা?”
আনাবিয়ার শুভ্র কেশগুচ্ছের একাংশ হাতের মুঠিতে নিয়ে শুধোলো মীর। আনাবিয়া খাওয়াচ্ছিলো আরসালান কে। বাকিরা ভরপেট খেয়ে ঘুমোচ্ছে দোলনায়, আঁতুড়ে ঘ্রাণ তাদের শরীরে এখনো। আনাবিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো ওকে একবার, বলল,
“না, শেহজাদাদেরকে প্রাসাদে নেওয়া এখন ঠিক হবে না। ওদের শরীরে এখন মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশন, যতদিন না ওরা নিজেদের রেডিয়েশন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে ততদিন ওদেরকে প্রাসাদে নেওয়া কারো জন্যই নিরাপদ হবে না।”
“তাহলে তোমরা কোথায় থাকবে?”
“ফ্যালকনকে বলেছিলাম আমার ট্রি হাউজটিকে আমাদের জন্য তৈরি করে রাখতে। আমি সেখানেই থাকবো। বছর তিন পর ওরা আস্তে আস্তে রেডিয়েশন কন্ট্রোল করা শিখে যাবে, তখন ওদেরকে প্রাসাদে নিয়ে যেও৷”
“নিয়ে যেও মানে কি? আমি নিব কেন? তুমি কোথায় যাবে?”
“আমি আর প্রাসাদে ফিরবো না, কখনো।”
বলল আনাবিয়া, কন্ঠস্বর নির্বিকার। মীর ভ্রুতে ভাজ ফেলে দ্বিধাভরে চেয়ে রইলো ওর দিকে, জিজ্ঞেস করলো,
“কখনো ফিরবেনা মানে কি?”
“চিন্তা নেই, তোমাকে ডিভোর্স দিবনা৷ এটা আমি কখনো পাবো না জানি, বা আমি চাইও না। কিন্তু আমি তোমার সাথেও থাকতে চাইনা। আর এটা হবে তোমার পানিশমেন্ট৷ আমি তোমাকে ভালোবাসি, অনেক বেশিই ভালোবাসি। কিন্তু তোমার অন্য সন্তানের সাথে একই প্রাসাদে আমি থাকতে পারবনা৷ আমার সন্তানরা অবশ্যই ফিরে যাবে কারণ প্রাসাদ ওদের অধিকার, তুমি ওদের বাবা। কিন্তু আমি ফিরবনা। না চাইতেও হয়তো তোমার অন্য সন্তানকে আমি ক্রোধের বসে অভিশাপ দিয়ে ফেলবো, কষ্ট দিয়ে ফেলবো, যেখানে ওর কোনো দোষ নেই। তাই আমি রেড জোনেই থাকবো, এবং তোমার থেকে সেপারেশনে থাকবো। তুমি মানলেও, না মানলেও।”
“আর এটা আমি মেনে নেব তোমার কেন মনে হল? তুমি ভালোভাবেই জানো তোমাকে আমি কোনো ভাবেই নিজের থেকে দূরে যেতে কখনোই দেবনা, তবে এমন জেদ কেন করছো? আর তুমি এমন করলে আমার বাচ্চারা কার কাছে বড় হবে? ওদেরকে তুমি মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত করতে পারোনা।”
“কে বলেছে বঞ্চিত করবো? আমার শেহজাদাদের জন্য আমি পুরো পৃথিবী দিয়ে দিতে পারি৷ ওদের সাথে তো আমার সম্পর্কের কোনো অবনতি হবে না! ওরা অবশ্যই আমার কাছে আসবে, থাকবে। ওদেরকে আমি আমার সব ভালোবাসা নিংড়ে দিব৷”
“আচ্ছা! আর আমি?”
কন্ঠে উপহাস মিশিয়ে শুধোলো মীর। আনাবিয়া ঘুমন্ত আরসালানকে নিজের বক্ষ থেকে ছাড়িয়ে রেশমী কাঁথায় মুড়িয়ে দিল। উঠে বসে বলল,
“তুমি কি? আমাকে ছাড়া যে তোমার চলবে না তা তো নয়! তুমি আমাকে ছাড়াই দিব্যি ভালো থাকবে। আমাকে তোমার কেন প্রয়োজন, তোমার শারীরিক চাহিদা আর সন্তানদের খেয়াল রাখার জন্যই তো! প্রাসাদে তোমার চাহিদা মেটানোর জন্য ঢের দাসীরা উদগ্রীব হয়ে আছে, আর সন্তানের খেয়াল রাখার জন্যও লোকের অভাব হবে না। আমার সন্তানেরা আমার কাছে আসবে, থাকবে, খাবে। আমি ওদের যথাসম্ভব খেয়াল রাখবো, তাই তোমার চিন্তার কিছু নেই।”
“এই দুইয়ের বাইরে তোমাকে আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই?”
আনাবিয়া ঠোঁট উল্টালো, ঘাড় বাকিয়ে সিলিং এর দিকে চেয়ে ভেবে বলল,
“দেখি না তো! আর কি প্রয়োজন তোমার আমাকে? কম্ফোর্টের? সে তো তোমার দাসীগুলোই দিতে পারবে তোমাকে। মন খারাপ হলে, ভালো না লাগলে ওদের কোলে-”
“শাটাপ আনাবিয়া!”
ধমকে বলে উঠলো মীর। আনাবিয়া থেমে চেয়ে রইলো মীরের দিকে। কপালের রগটা ফুলে উঠেছে তার, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, হাত জোড়া মুষ্টিবদ্ধ। শক্ত গলায় সে বলে উঠলো,
“এসমস্ত রিডিক্যুলাস কথা বলা বন্ধ করো। তোমাকে আমার কেন প্রয়োজন সেটা তুমি ভালোভাবেই জানো। তুমি আমার লিগ্যাল ওয়াইফ এবং আমি তোমাকে প্রচন্ডরকম ভালোবাসি, আমার শেহজাদাদের মা তুমি। তুমি আমার সাথে, বাচ্চাদের সাথে আমার প্রাসাদে থাকবে এটাই ন্যাচারাল, এখানে আমি দ্বিতীয় কোনো তর্ক শুনতে চাইনা।”
“কেমন ভালোবাসো সেটা তোমার কথাতেই প্রমাণ হচ্ছে। আমাকে ধমকাচ্ছো! শাসাচ্ছো! আমার ওপর তোমার ফুল কান্ট্রোল চাই, নইলে তোমার রাতে ঘুম আসবে না।
শোনো, এসব আমি করতে পারবনা। তুমি সারাজীবন সন্তান চেয়ে গেছো, আমাকে তখন একা ছাড়তেও দ্বিধা করোনি।এখন তোমার সন্তান চলেও এসেছে৷ এখন আমাকে আমার মতো ছেড়ে দাও৷ আমি নিজের মত করে চলতে চাই, খেতে চাই, পরতে চাই, ঘুরতে চাই। আমার যা ভালো লাগবে তাই করতে চাই।”
“আমি তোমাকে কখনোই একা ছাড়িনি আনাবিয়া, আমি সবসময় তোমার সাথে, তোমার আশেপাশে থেকেছি। নিজে না পারলে বিশ্বস্ত লোক রেখেছি সেটা তুমি ডিনাই করতে পারোনা।”
“হ্যাঁ রেখেছো, তো? তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছো, এতে তো তোমার আমাকে দেওয়া কষ্ট গুলো মুছে যাবে না, তাইনা? সেগুলো আজীবন দগদগেই থাকবে।”
“শুনো, এখন তোমার শরীর যথেষ্ট নাজুক, এগুলো নিয়ে পরেও আলাপ করা যাবে৷ এখন এসব নিয়ে ঝগড়া কোরো না, শিনজো। তখন তোমার যা ভালো লাগে কোরো৷”
“যা ভালো লাগে তাই?”
“আমার থেকে দূরে যাওয়া ব্যাতিত।”
“আমি শুধু ওটাই চাই৷ তুমি আমার ওপর কোনো কর্তৃত্ব রাখতে পারবেনা, আমার ওপর নজরদারি করতে পারবেনা, আমার জীবনযাপনে দখলদারি করতে পারবেনা৷”
“তোমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার ওপর, আমি অবশ্যই তোমাকে নজরদারিতে রাখবো। তুমি আমার স্ত্রী, আমি তোমাকে যেখানে সেখানে ছেড়ে দিতে পারিনা, এটা তোমাকে বুঝতে হবে। তুমি চাইলেই সব হবে না৷”
“রেড জোনে আমি সম্পুর্ন সুরক্ষিত থাকবো, সেখানে আমার কোনো ক্ষতি হবেনা, তাই তোমার নজরদারি, দখলদারি কোনো কিছুরই আমার প্রয়োজন নেই।”
“চুপ করো শিনজো! আমি তোমার স্বামী, তোমার যাবতীয় দায়িত্ব আমার ওপর৷ তুমি আমাকে ছেড়ে, প্রাসাদ ছেড়ে, শেহজাদাদের ছেড়ে কোথাই যাবেনা, এটাই ফাইনাল।”
দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো মীর৷ আনাবিয়া ওর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
“তোমার মতামত কে চেয়েছে? আমি বলেছি আমি তোমার সাথে থাকবোনা। তোমার পার্মিশন চাইনি, নিজের ইচ্ছে জানিয়েছি।”
“সব কিছু সব সময় তোমার ইচ্ছেতে হবে না, শিনজো! আমি তোমাকে কোনো ভাবেই একা ছাড়বোনা, তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে, জোর করে হলেও।”
“কখনোই না। আমার যখন যেখানে ইচ্ছে হবে আমি সেখানে থাকবো।”
“যদি নিজের ইচ্ছেতেই সব করতে চাও তবে শেহজাদাদের সাথে তোমার সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, তুমি ওদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারবে না।”
দৃঢ় স্বরে বলল মীর। আনাবিয়া ওর দিকে অবজ্ঞার চোখে চেয়ে বলল,
“কতটা অমানুষ হলে তুমি আমার বিরুদ্ধে আমার সন্তানদের ব্যাবহার করতে পারো মীর!”
“তোমাকে কাছে রাখার জন্য আমি সব করতে পারি শিনজো, আর তুমি সেটা ভালোভাবেই জানো। হতে পারি আমি অমানুষ, তাতে আমার কোনো আফসোস নেই৷ এখন বলো, তুমি কি চাও!”
“তোমাকে যদি আমি ঘৃণা করা শুরু করি তখন কি করবে?”
মীর নিজের স্বর্ণাভ চোখ জোড়া দিয়ে দৃঢ়তার সাথে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে, ক্ষণিক নিরব থেকে বলে উঠল,
“তাতেও চলবে, কিন্তু তোমার থাকা চাই৷”
“ঠিক আছে, আমি শেহজাদাদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবনা। কিন্তু তুমি কখনোই আর আমার পথে আসতে পারবে না, কোনোদিনও না৷”
দৃঢ় স্বরে বলল আনাবিয়া। মীর থমকালো এবার, চুপ হয়ে গেলো সে। আনাবিয়া ওর দিকে ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলো,
“রাজি?”
“না৷”
কাঁপা স্বরে উত্তর দিল মীর৷ আনাবিয়া তাচ্ছিল্য হেসে ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। মীর ক্ষণিক চুপ থেকে বলল,
“ঠিক আছে, তুমি আলাদাই থেকো। যেখানে ইচ্ছা সেখানে থেকো, তবে সেটা শিরো মিদোরির ভেতর। আমার অনুমতি ব্যাতিত তুমি শিরো মিদোরি ছাড়তে পারবেনা৷ প্রাসাদ তোমার জন্য সর্বদা উন্মুক্ত, তুমি যখন ইচ্ছা সেখানে আসতে পারো, শেহজাদা দের সাথে সময় কাটাতে পারো।”
“না, শেহজাদারা আমার কাছে আসবে। আমি প্রাসাদে ঢুকবো না৷ ওরা সপ্তাহের কিছুদিন আমার কাছে থাকবে, অন্যান্য দিন তোমার সাথে।”
“ঠিক আছে।”
ক্ষণিক নিরব থেকে বলল মীর৷ তারপর আবার বলে উঠলো,
“সপ্তাহের একটি দিন তুমি আমাকে দিবে৷”
“অসম্ভব!”
“তুমি এখনো আমার সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আছো, ভুলে যেওনা।”
“তোমার দাসীদের অভাব নেই, বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান। এইটুকুর জন্য আবার আমার কাছে আসা কেন?”
“কি, কেন, কিভাবে সবই তোমার জানা। এসব নিয়ে তুমি দ্বিতীয় কোনো কথা না বললেই আমি খুশি হবো শিনজো। আর তুমি আমার স্ত্রী, আমার থেকে দূরে থাকার কোনো অধিকার তোমার নেই। তবুও আমি তোমার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিচ্ছি।”
“এই তোমার প্রাধান্য দেওয়া? হুমকী, ব্লাক মেইল, জোর জবরদস্তি —এসব তোমার প্রাধান্য?”
তাচ্ছিল্যের সাথে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর অধৈর্য হয়ে জোরালো হাতে নিজের কপাল ঘঁষলো। ওকে অশান্ত হতে দেখে আনাবিয়া কন্ঠে উপহাস মিশিয়ে বলল,
“রেগে যাচ্ছো যে! খুব রাগ হচ্ছে? সব ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে?”
মীর কপাল থেকে হাত সরিয়ে হিংস্র গলায় বলে উঠলো,
“তুমি কোনোভাবেই আমার থেকে দূরে যেতে পারোনা, আমি তোমাকে কখনোই যেতে দিব না। তুমি শুধুই আমার এবং সারাজীবন আমার থাকবে। সব ধ্বংস হয়ে গেলেও তুমি আমার থাকবে! আমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা ভাবার স্পর্ধা কিভাবে হয় তোমার?”
“নিজের ওপর এত প্রেশার দিও না মীর৷ তুচ্ছ কারণে রাগ দেখাচ্ছো, নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছো! ভুলে যেওনা পুরো সাম্রাজ্যের ভার তোমার ওপর, বউয়ের প্রতি এমন অবসেসড থাকলে তোমার এত সাধের, চেরিসড সাম্রাজ্য শিঁকেয় উঠবে৷ থ্যাঙ্ক মি ফ’ রিমাইন্ডিং ইউ।”
মীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, হতাশ চোখে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়া ওর হতাশাগ্রস্ত চেহারা দেখে হেসে উঠলো সজোরে, হাসি থামিয়ে বলল,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২ (২)
“ইশ, বউ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে! এ কি হলো ক্ষমতাধর বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ানের! নিজের বউ সামলাতে পারছেনা, সে সাম্রাজ্য সামলাবে কিভাবে? সো স্যাড!”
মীর চোখ জোড়া বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিলো, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমাকে রাগিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করবে ভেবেছো? অত সহজ নয়। যত কৌশলই অ্যাপ্লাই করো না কেন, আমার হাত থেকে তোমার মুক্তি নেই।”
আনাবিয়া শক্ত চোখে দেখলো ওকে। মীর উঠে যেতে যেতে বলল,
“ঘুমিয়ে নাও, তুমি ঘুম থেকে উঠলে বের হবো।”
