বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৬
ইশরাত জাহান
“সবগুলো ঘর মোছা হয়েগেছে মা।আর কি..
কিছু বলার আগেই মহিলা থমকে গেলো।বয়স্ক মহিলা।কাজ করে সংসার চালায়।ছেলে মেয়ে থাকতেও দেখে না।তাই বাড়ি বাড়ি কাজ করতে হয়।দর্শনের এই বড় বাড়িতে তার কাজ শুধু ঘর মোছা,ছাদ পরিষ্কার করা।বাকি কাজ দর্শন এমনিতেও করতে পারে।নিজের পোশাক নিজে ধুয়ে আয়রন করে রাখে।বিদেশে থাকতে নিজের খাবার নিজে রান্না করতো।একটা কি দুটো প্লেট অধোয়া হতো সেগুলো দর্শন নিজেই ধুয়ে রাখতো।এখন সংসার জীবনে এসে শোভা করে।যেহেতু দিজা এই বাড়িতে আপাতত আছে তাই সেও সাহায্য করে।
বয়স্ক মহিলার কণ্ঠে শোভা লজ্জায় দূরে সরে যায়।বিরক্ত হলো দর্শন।সে তার বউয়ের সাথে রোমান্টিক মুহূর্তে ছিল।এখন আসার কি দরকার?শোভা ওড়না ঠিক করে।দর্শনের জড়িয়ে ধরার কারণে গায়ের ওড়নাটা সরে যায়।মহিলাকে কিছু বুঝতে দিবে না বিধায় নিজেকে ঠিক করে বলে,“আচ্ছা,ভিতরে আসুন।”
মহিলাটি ভিতরে আসতেই দর্শন শোভার নজর দেখে বলে,“কিছু বলবে?”
“ওনার স্বামীর চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা প্রয়োজন।আমাকে আজকেই জানালো।যদি কিছু দিয়ে সাহায্য করা যায় তাই আর কি।”
দর্শন মহিলাটির দিকে তাকালো না।কাজে নেবার আগেই তার খোঁজ নিয়েছিল।এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে।দুজনেই বিবাহিত।ছেলে থাকে চট্টগ্রাম মেয়ে থাকে শশুর বাড়িতে।দর্শন প্রথমেই প্রশ্ন করে,“আপনার তো ছেলে আছে।ভালো চাকরি করে।টুকটাক খরচ দেয়না নাকি?”
শোভা দেখলো মহিলার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। ঠোঁট কেঁপে উঠেছে।চোখ নিচ দিকে।তাই শোভা নিজ থেকেই বলে,“আন্টির সন্তানেরা আন্টিদের দেখেন না।ছেলে নাকি বিয়ের পর বউ নিয়ে যেই চট্টগ্রাম গেলো ওখানেই আছে।ওদেরকে কল দিলেও ধরে না।বিরক্ত হয়ে একদিন কল ধরে অনেক বাজে কথা শুনিয়ে দেয়।বাবা মা এখন তাদের কাছে বোঝা।আঙ্কেলের সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়েছে দুই ছেলে মেয়ের নামে।ওরা সম্পত্তি পেয়ে বাবা মাকে ভুলে গেছে।আংকেল বিছানার রোগী।তার ভরণ পোষণ আন্টির দেখতে হয়।”
দর্শন আড়চোখে এবার ওনার দিকে তাকালো।মনে মনে ধারণা করলো যে মহিলা নিজের স্বামীর চিকিৎসার জন্য মানুষের বাড়ি কাজ করে সে তার স্বামীকে কতটাই না ভালোবাসে।এই যুগে নিজের সুবিধার জন্য কত নারী যে সংসার ভাঙ্গে এর ঠিক নেই।পৃথিবীতে হরেক রকমের নর নারী আছে।দর্শন জিজ্ঞাসা করে,“কত লাগবে?”
মহিলাটি চোখের পানি মুছে বলে,“পনেরো হাজার লাগবে।আমি কাজ করে কিছু জমাইছিলাম।সেগুলোর সাথে আর সাত হাজার হলেই হবে।”
দর্শন পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে এক হাজার টাকার পনেরোটা নোট গুণে বের করে দেয়।শোভা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো শুধু।মহিলাটি অবাক চোখ দেখে বলে,“এতগুলো দেওয়া লাগবে না বাবা। সাত হাজার দিলেই হবে।”
দর্শন টাকা এগিয়ে দিয়ে বলে,“আপনার জমানো টাকা আপনি কাছে রেখে দিন।ওগুলো অন্য কাজে লাগাবেন।যখন আমি আপনাকে সাহায্য করার জন্য থাকবো না।”
মহিলার মধ্যে টাকা নেওয়ার জন্য লজ্জাবোধ দেখা দিলো।মহিলাকে দেখলে বোঝাই যায় সে ভালো পরিবার থেকে আসা।কিন্তু পরিস্থিতি তাকে দরিদ্র করে দেয়।দর্শন তাকে টাকা দিয়ে উপরে চলে গেলো।ফ্রেশ হবে তাই।শোভা ওনাকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।রান্নাঘরে এসে রান্না শুরু করে।দর্শন গোসল করে ট্রাউজার পরে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে রান্নাঘরে এলো।শোভা খেয়াল করেনি।দর্শন রান্নাঘরে ঢুকে শোভার পিছনে দাঁড়ালো।শোভার মাথায় ওড়না নেই।বাড়িতে স্বামী ছাড়া কেউ না থাকায় শোভা চুল খোপা করে মাথা থেকে কাপড় সরিয়ে রেখেছে।যার কারণে শোভার ঘাড়ের খোলা জায়গাটা দেখা যাচ্ছে।দর্শন সেদিকে তাকিয়ে থাকলো নেশালো দৃষ্টিতে।আচমকা পিঠের ওপর পানির ফোঁটা পড়ায় কেঁপে উঠল শোভা।পিছনে ফিরতেই বাড়ি খেলো দর্শনের বুকের সাথে।উন্মুক্ত ঠান্ডা বুক।দর্শনের দুই কাঁধে হাত শক্ত করে রেখে নিজেকে সামলাতে নেয়।দর্শন তার শক্তপোক্ত হাত দিয়ে শোভাকে আগলে নেয়।দর্শনের মাথার ছোট ছোট চুলগুলো দিয়ে বিন্দু পানির ছিটা শোভার মুখে এসে লাগে।শোভার নাকে বাড়ি দিচ্ছে দর্শনের শরীরের পারফিউম।দর্শনের এমন আক্রমণে শোভা অবাক হলো।দর্শনের দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছে।দর্শন এক পলক গ্যাসের দিকে তাকালো অতঃপর শোভার দিকে।শোভা হুসে ফিরতেই বলে,“ভয় পাইয়ে দিয়েছেন আমাকে।এভাবে কেউ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে?”
দর্শন শোভাকে আরো শক্তভাবে জড়িয়ে প্রশ্ন করে,“তাহলে কীভাবে ধরে?একটু শিখিয়ে দেও ওয়াইফি।”
“আমি!”
“হ্যাঁ,তুমি।”
“আমি শেখাতে পারিনা।”
“কেনো পারো না?”
“কারণ আমি আপনার মত রোমান্টিক সিনেমা দেখি না।”
তরকারির পানি শুকিয়ে আসাতে তেল ছিটছিটে শব্দ আসে।শোভা দ্রুত পিছন ফিরে তরকারি নাড়িয়ে তাতে পানি দেয়।এর মাঝে যে গা থেকে ওড়না সরে নিচে পড়ে গেছে তা বুঝতেও পারল না।দর্শন নিচ থেকে ওড়না নিয়ে শোভার দিকে স্থির নয়নে চেয়ে আছে।শোভা অনেকটা খোলামেলা হয়ে আছে।দর্শন মৃদু হেসে বলে,“আমার ওয়াইফি বেশ ভালোই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।অনেক বেশি হট হয়ে থাকে দিনদিন।”
শোভা তড়িৎ গতিতে দর্শনের দিকে তাকালো।দর্শন দুষ্টু হাসছে দেখে শোভা ভ্রু কুঁচকে থাকে।দর্শন চোখ ইশারা করে দেখিয়ে দেয়।নিজের দিকে তাকাতেই শোভা বড় বড় চোখ করে দর্শনের হাত থেকে ওড়না কেড়ে নিতে চাইলে দর্শন ওড়না হাতে পেঁচিয়ে রাখে।ওড়না কেড়ে নিতে ব্যর্থ হলো শোভা।দর্শনের চোখের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত হয়ে হলে,“ওড়না দিন।”
“উহু।”
শোভা অনুরোধের সুরে মাথা নিচু করে বলে,“প্লিজ।”
শোভার হাত টেনে নিজের কাছে এনে শোভাকে বলে,“লুক এট মী।”
শোভা দুইদিকে মাথা নাড়ালো।যার অর্থ সে তাকাবে না।দর্শন ক্ষুব্ধ হলো।তার কথা শুনলো না শোভা।গ্যাস বন্ধ করে শোভাকে দুইহাতের মাঝে শক্ত করে ধরে।শোভা এমন পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।শোভাকে কোলে তুলে উপরে নিয়ে যাচ্ছে।শোভা হাত পা নাড়ায়।এমন আক্রমণে শোভা ভয়ও পায়।কথা নেই বার্তা নেই এমন করবে কেন দর্শন?শোভা ছোটাছুটি করে বলতে থাকে,“ছাড়ুন।”
দর্শন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,“ছাড়ব বলে তো ধরে রাখিনি তোমায়।”
“পাগলামি করছেন কেন?”
“পাগলামি করে যদি তোমাকে নিজের কাছে রাখতে পারি তবে এই পাগলামি আমি বারবার করতে রাজি।”
“আপনার মাথা খারাপ হয়েগেছে!”
“নতুন করে জানলে আমাকে?”
শোভাকে ঘরে এনে দর্শন নিজ ঘাড় থেকে তাওয়াল সরিয়ে বিছানায় রাখলো।শোভা নিজের দিকে একবার তো দর্শনের দিকে একবার তাকালো।দুইহাত দিয়ে বক্ষ স্থান ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা।দর্শন ঠোঁট এমনভাবে বাকালো যেনো শোভা বুঝতে পারছে না সামনের ব্যক্তি আসলে হিংস্র নাকি ভালোবাসা দিয়ে তাকাচ্ছে।গম্ভীর ভাবের জন্য দর্শনকে নিশ্চয়ই রোমাঞ্চকর লাগবে না।কিংবা অন্যদের মতো মিশুক সভাবের লাগবে না।শোভা ভয় পাচ্ছে হঠাৎ।দর্শন না জানি আবার কি করে।শোভার ওড়না দুইহাতে নিয়ে পেঁচাচ্ছে।শোভার দিকে স্থির দৃষ্টি দিয়ে এগিয়ে আসছে।শোভা ভিত মুখ করে পিছিয়ে দেয়ালের দিকে যাচ্ছে দর্শনের আগমনে।কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকাবার আগেই দর্শন ওড়না দিয়ে শোভার পিছন থেকে শোভাকে জড়িয়ে নিজের নিকটে হাজির করে।শোভা জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে।শোভার খোপা খুলে দেয় দর্শন।লম্বা হাঁটুর নিচ অব্দি চুলগুলো এলোমেলো ঢেউ খেলে।কিছু চুল দর্শনের হাতে কিছু চুল শোভার মুখের সামনে তো কিছু চুল নিচ দিকে গড়াগড়ি খাচ্ছে।শোভা হতবম্ব চাহনি।এমন পরিস্থিতিতে কী করবে সে?কি করা উচিত?দর্শনকে ভয়ানক দেখাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সে তো ভয়ানক কিছু করছে না।যেটা করছে তাতে নিজের অধিকার আদায় করা বলে।শোভার তো এখানে বাধা দেওয়া উচিত না।তারপরও এই লোকের চাহনি দেখলেই ভয় পায় শোভা।ইচ্ছা করছে ঘরটাকে অন্ধকার করে দিক।দর্শনের দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছামত ঝগড়া করবে শোভা।যেনো একটু হলেও মনকে শান্তি দিতে পারে।ভয়ে শোভাকে বড় বড় চোখে নিজের দিকে তাকাতে দেখে দর্শন বলে,“যখন আমার দিকে তাকাতে বলেছিলাম তখন তো তাকাওনি বরং না করছিলে এখন আবার ডেবডেব করে তাকিয়ে আছো কেন?”
শোভা হা হয়ে গেলো।তারমানে আপনার দিকে না তাকানোর কারণেই এভাবে নিয়ে এলেন আমাকে?”
দর্শন হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়িয়ে বলে,“হ্যাঁ।”
“আপনি কি পাগল!”
“আগে ছিলাম না।এখন হতে পারি।”
“মানে?”
“আগে কখনও আমাকে এমন উদ্ভট পাগলামি করতে দেখেছো?”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৫
“না।”
“ইদানীং করছি।”
“কেন করছেন?”
“তোমার জন্য শুধুমাত্র তোমার জন্য ওয়াইফি।”
