বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬২
ইশরাত জাহান
ডাক্তার আর্যের সামনে বসে আছে দর্শন।কপালে ভাঁজ পড়ে আছে ছেলেটার।ডাক্তার আর্য কোনো প্রশ্ন না করে বরং চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়।ইচ্ছা করেই প্রশ্ন করছে না।কি হয়েছে এটা দর্শন নিজেই বলবে।শুধু মেন্টালি প্রিপারেশন নিচ্ছে।ওর মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে তাই।
কিছুক্ষণ যেতেই দর্শন বলে,“আর কি করলে আমি নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারব?”
ডাক্তার আর্য এবার স্মিত হেসে বলেন,“বলেছিলাম তো যাকে বেশি ভালোবাসো মানে তোমার ওয়াইফের থেকে আগে দূরে থাকো।নিজেকে সুস্থ করতে আমার কথামত চলো।কিছু ট্রিটমেন্ট দরকার তোমার।”
“দূরে তো থেকেছিলাম কিন্তু …
“কিন্তু তুমি থাকতে পারোনি।”
“চার বছর কি কম ছিল?”
“বউয়ের থেকে চার বছর দূরে থাকতে তোমার খুব কষ্ট হয়েছে?”
দর্শন রাগী চোখে তাকালো।ডাক্তার আর্য আবারও বলেন,“তুমি মেয়েটার প্রতি এতটাই অবসেসড যে মেয়েটাকে নিয়ে ওভার্থিঙ্কিং করো।এটাই তোমার দুর্ভোগের কারণ।ওকে নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে ওর নেগেটিভ দিকটাই তোমার নজরে বেশি আসে।”
“আমি তো ওর সাথে রুড হতে চাইনা।আমি ওর সাথে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাই করি কিন্তু ওর থেকেই দূরত্ব অনুভব করি।তখনই মাথা ঠিক থাকে না।”
“চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করো?”
“না,ওর চরিত্র নিয়ে আমি কোনো সন্দেহ করিনা।”
“তাহলে?হারানোর ভয় কেন?”
“এই জীবনে আমি কিই বা পেলাম নিজের করে?জন্ম দেওয়া মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে আরেক ঘরে।দাদি আগলে রাখতো সেও মারা গেলো আমার জন্য জীবন দিয়ে।বাবা পঙ্গু হয় আমার জন্য মায়ের কাছে সংসারটা ভিক্ষা চাইতে গিয়ে।বাবা মা আলাদা হয়ে আলাদা সংসার গড়েছে।নিজেদের জীবন ছিল তখন নিজেদের চিন্তাধারা নিয়ে।আমাকে সামলে রেখেছি আমি নিজে।আমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছি নিজের ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে।একটা ঘরে একা বসে খেতাম।একা ঘুমাতাম। জ্বর আসলেও কেউ জানতে পারেনি।আজও আমার অসুস্থতায় কেউ পাশে নেই।তখনও ছিল না।আমি যেনো সবসময় একাই।আমি একাই বাঁচতে শিখেছি।মেয়েটাকে যেদিন আমি প্রথম দেখি ওর রূপ আমি দেখিনি।ওর আচরণ ওর সততা দেখে আমি ওর প্রতি মুগ্ধ হই।এরপর আমার মা মানে আমার বাবার সেকেন্ড ওয়াইফ তিনি তার বান্ধবীর বাসায় আমাকে পৌঁছে দিতে বললে সেদিন রাস্তায় দুজনের কথার মাধ্যমে জানতে পারি এই মেয়েটা আসলে আমার মায়ের বান্ধবীর মেয়ে।মেয়েটার বিষয়ে মায়ের সাথে কথা বলার আগ্রহ জন্মায়।কিন্তু যেদিন বলতে চেয়েছিলাম সেদিনই আমাদের একসিডেন্টলি বিয়েটা হলো।বিয়ের দিন এত বাজে বাজে কথা আশপাশ থেকে শুনি যে আমি আমার মন মেজাজ শান্ত রাখতে পারিনি।আপনি নিজেই তো বলেন আমার রাগটাই আমার কাল।আসলেই তাই।আমি রাগলে মনে হয় চারপাশটা ধ্বংস করে দেই।সেদিনটাও তাই হয়েছিল।এমনকি এমনটাই হয় আজও।আমি শিওর আমি রিকোভার করবো না।”
ডাক্তার আর্য পরখ করে বলেন,“তাহলে মেয়েটাকে মুক্ত করো।”
“করতেই তো চেয়েছিলাম।যখন মেয়েটা আমার ভালো লাগার ছিল তখন আমি ওকে ওর ভালোর জন্যই দূরে করতে চেয়েছিলাম।ডিভোর্সের মত নামটাও নিয়েছিলাম ওর ভালোর জন্য।”
“এখনও সুযোগ আছে।”
দর্শন মাথা নাড়িয়ে বলে,“না।”
“কেন?”
“সেদিন যখন আপনার সাথে কথা বলতে বলতে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলাম তখনই রিয়েলাইজ করেছি মেয়েটাকে আমার থেকে দূরে করা সম্ভব না।ওকে কাছে রাখাটা আমার নেশা।ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ওর মুখ দেখাটা আমার অভ্যাস।ওর সাথে তিনবেলা একসাথে খাওয়া আমার অভ্যাস।ওর মুখ দেখতে দেখতে চোখ বন্ধ করাটাও আমার নেশা।সব মিলিয়ে শোভা আমার জন্য চব্বিশ ঘণ্টার বেঁচে থাকার কারণ।আমাকে সুস্থ রাখার আসল ঔষধ।আমি যেদিকেই থাকি না কেন আমার মস্তিষ্কে ও থাকবেই।”
“আমার সাথে থেকেও কি তুমি ওর কথা ভাবছো?”
“হ্যাঁ ভাবছি।ভাবছি বলেই তো ওকে নিয়ে আপনার কাছে এতটা গভীরভাবে প্রকাশ করছি।”
“ও কি তোমার কথা ভাবছে?”
দর্শন এবার ডাক্তার আর্যর দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সাথে বলে,“দিলেন তো আবারও ওভার্থিংকিং বাড়িয়ে?”
ডাক্তার আর্য ম্লান হেসে চুপ করে আছেন।দর্শন নিজেই বলে,“আমার সবথেকে বড় আফসোস ওর মাঝে আমার জন্য কাতরতা দেখি না।আমি যেমন সকাল বিকাল ওর জন্য বিভোর হয়ে থাকি ও আমাকে ছাড়াও অন্য জগৎ খোঁজে।স্বাধীনতা চায় আমার থেকে।এর মানে হলো আমাকে ছাড়া বাঁচতে চায়।এসব নিয়ে এমনিতেই আমি বিরক্ত তারউপর ডাক্তার হয়ে আপনিও আমাকে এসব ভাবাচ্ছেন!”
দর্শন দীর্ঘশ্বাস ছাড়লে ডাক্তার আর্য বুঝলেন এই ছেলেকে স্বাভাবিক পুরুষে রূপান্তন করতে পারবেন না।এর মস্তিষ্ক উগ্র।শোভার রন্ধে রন্ধে দর্শন নিজেকে খুঁজতে চায়।তবেই ছেলেটা সুস্থ থাকবে।দর্শনের ব্রেন থেকে নেগেটিভিটি দুর করার ঔষধ হলো শোভার ভালোবাসা ও যত্ন।ডাক্তার আর্য সিদ্ধান্ত নেন শোভার সাথে কথা বলবেন।তাই বলেন,“তোমার ওয়াইফের সাথে আমার কথা বলিয়ে দিবে?”
দর্শন রেগে গেলো।চোখ গরম দেখিয়ে বলে,“কি দরকার আমার ওয়াইফের সাথে?”
“তোমার এই সমস্যাটা নিয়ে আমি ওর সাথে ডিসকাস করতাম।”
“সমস্যা যেহেতু আমার আপনি আমার সাথেই কথা বলুন।আমার ওয়াইফের সাথে কথা বলতে হবে না আপনাকে।”
“তোমার ওয়াইফের সাথে কথা বলা জরুরি।”
দর্শন এবার টেবিলের উপর হাত মুঠ করে দিলো বারি।রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে,“আপনি ডাক্তার।আপনার কাজ আমার রোগ সারানো।আপনার সাহস কি করে হয় আমার ওয়াইফের সাথে কথা বলার?”
“তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
“আমার ভালো তো এটাই যে আমার ওয়াইফের আশেপাশে কোনো পুরুষ মানুষ নেই।”
ডাক্তার আর্য ফোস করে নিশ্বাস নিয়ে ভাবছেন শোভার সাথে কন্টাক্ট করা সম্ভব না।এই ছেলে বউয়ের দিক থেকে একটু না অনেক বেশি সতর্ক।মনে মনে হেসে অতঃপর বলেন,“তোমার বউকে গুরুত্ব দেওয়া কমিয়ে দেও।”
দর্শন টেবিলের উপর বারি দিয়ে বলে, “হোয়াট?”
“তাকে বোঝাও তুমি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছ না।তুমি তাকে পুরো স্বাধীনতা দিয়েছো।”
“হ্যাঁ!এরপর সে আমার হাত থেকে ফসলে যাক।আপনিও দেখছি আমার দাদাজানের মত।পৃথিবীর একেকটা ব্যক্তি আমার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ডাক্তার আর্যর হাসি পেলো খুব কিন্তু হাসবেন না।এমন পেশেন্ট তার অহরহ দেখা।খুবই জটিল এরা।এদের সাথে সংসার করতে যাওয়াও রিস্ক।কখন না জানি বউয়ের প্রতি এত অবসেসড হয়ে বউকে খুন করে দেয়।যতটুকু দর্শনের ব্যাপারে ডাক্তার আর্য শুনল তাও তো কম।অনেক অনেক পেশেন্ট পেয়েছেন রিহ্যাবে দিতে হয়েছে।তাও ঠিক হয়নি।এদের মস্তিষ্কই আসল সমস্যা।এটা ঠিক করার উপায় থাকলে সেভাবে ঠিক করতে হবে নাহলে এদের থেকে দশ হাত দূরে থাকাই ভালো।
দর্শন বিরক্ত প্রকাশ করে বলে,“আপনার পিছনে টাকা খরচ করাটাই আমার বেকার।আমার ওয়াইফের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে আপনার সাথে কনভারসেশন করছি আপনি কি না আমাকে নেগেটিভ এডভাইজ দেন।”
ডাক্তার আর্য হাত দিয়ে ঠোঁট ঢাকলেন।হাসিটা আড়ালে রেখে স্মার্টনেসের সাথে বলেন,“আমি যেটা বলছি এটা করলে তুমি তোমার বউয়ের থেকে ভালোবাসা পাবে।”
ভ্রুকুটি করে দর্শন বলে,“কিভাবে?”
“তুমি তার যত্ন নিতে গিয়ে খুব বেশি গভীরে ভাবো।তোমার লাজুক ওয়াইফ তাই সবকিছুতে লাজুকতা নিয়ে এড়িয়ে গেলেও তুমি মানিয়ে নেও না।একটু যদি লুতুপুতু হয়ে চলতে বুঝতে বউয়ের মন জুগিয়ে কিভাবে চলতে হয়।বাই দ্যা ওয়ে তোমাকে তোমার রাস্তা দিয়েই ঠিক করতে হবে যেহেতু আইডিয়া ভিন্ন তো করতেই হবে।”
মনে মনে কথাটুকু বলে দর্শনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ঘি সোজা আঙুলে না উঠলে আঙুল বেকাতে হয়।”
“স্পুন থাকতে আঙুল নোংরা করবো কেন?”
ডাক্তার আর্য ফোস করে বলেন,“কারণ আঙুল দিয়ে ঘি তুললে স্বাদ বাড়ে তাই।”
দর্শন চুপ করে আছে।ডাক্তার আর্য বলেন,“আমার কথা মন দিয়ে শোনো।তুমি এতদিন কম কিছু করোনি।এবার থেকে উল্টো চলবে।”
“যেমন?”
“তোমার ওয়াইফের যত্ন নেওয়া থামিয়ে দেও।ওর সাথে একসাথে খাওয়া,ও অসুস্থ হলে ব্যাকুল হয়ে যাওয়া বন্ধ করো।অন্তত ওকে বুঝতে দিও না আর।ও হ্যাঁ,ও যা করতে ভালোবাসে তাই করতে দেও।দেখবে যখন তুমি ওর বিষয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করেছো ও নিজেই তোমার দিকে এগিয়ে আসছে।”
দর্শন গভীরভাবে ভাবলো।এটাই তো হয়েছিল শুরুতে।দর্শন মেয়েটাকে থাপ্পড় অব্দি মারতো।মেয়েটা প্রতিবাদ করতো কিন্তু ছেড়ে যেতো না।”আসলেই কি মেয়েরা যত্নের কদর বোঝে না?”ভাবছে দর্শন।
ডাক্তার আর্য বলেন,“চেষ্টা করে দেখো সব ঠিক হয় কি না।”
দর্শন সহমত প্রকাশ করে উঠে দাঁড়ায়।অতঃপর বলে,“আমার ওয়াইফের সাথে আমার সব মিটমাট হলে তো ভালো নাহলে এই যাবৎ আপনার পিছনে যত টাকা খরচ করেছি সব ফেরত নিবো তো নিবো ফ্রড ডাক্তার কেসে ফাসিয়েও দিবো।মাইন্ড ইট।”
হুমকি দিয়ে চলে যায় দর্শন।ডাক্তার আর্য কপালে হাত দিয়ে বসে থাকলেন।এই ছেলেকে সামলানো মুশকিল।
রাতের বেলা বাড়িতে এসে দর্শন দেখে ঘরে ব্যাগ প্যাক করা আর শোভা গায়ে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে।একটুতেই কেশে উঠছে।দিজা পাশেই বসে সেবা করছে।কপালে পট্টি দিয়ে দিচ্ছে।দর্শনকে দেখে উঠে দাঁড়ায়।বলে,“ভাবীর প্রচুর জ্বর।”
দর্শন ব্যাগের দিকে তাকাতেই দিজা সত্যিটা বলে,“রাগ করে বাসা থেকে চলে যেতে চেয়েছিল।আমি আটকিয়েছি।অজ্ঞান হয়েও পরে যায় তখন।এরপর দেখি জ্বর বাড়ছে।”
দর্শনের বুকের ভেতর মোচড় দিলো যেনো। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে বলে,“তুই কলেজে যাসনি আজ?”
“না।”
দর্শন আর কোনো কথা না বলে শার্টের উপরের কোর্ট খুলে চেয়ারের উপর রাখে।শোভা মন খারাপ করে শুষ্ক মুখে চেয়ে দেখছে।এতক্ষণে তো দর্শনের এসে তার কপাল ছুঁয়ে দেখার কথা।দর্শন যেভাবে এগিয়ে আসছে এতদিন সেভাবে আজকে আসছে না।শোভা অপেক্ষায় আছে মনে হলো।
দর্শন হাতা গুটিয়ে দিজাকে বলে,“সিনথিয়া কোথায়?”
“এতক্ষণ ছিল এখানে।একটু আগে কল আসাতে আমার ঘরে গেলো।”
“ওকে বলে দিস আজকের শুটিং হয়নি কিছু সমস্যার জন্য।এক সপ্তাহ লাগবে এই সমস্যা মিটতে।তখন ওকে আমাদের কোম্পানি থেকে কল করা হবে।যদি ও রাজি থাকে।”
দিজা মাথা নাড়িয়ে বলে,“ঠিক আছে।”
দিজা চলে যেতে নিলে দর্শন বলে,“চাইলে আজকের রাতে এখানে থাকতে পারিস।”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬১
দিজা অবাক হলো।এতদিন যেভাবে দর্শনকে দেখেছে শোভার একটু অসুস্থ হলেই মরিয়া হয়ে সেবা করতে আজ তা নেই।শোভা অভিমানের সাথে তাকালো দর্শনের দিকে।দর্শন দেখেও না দেখার অভিনয় করে আছে। ড্রয়ার থেকে গেঞ্জি আর ট্রাউজার নিয়ে অন্য ঘরের দিকে যেতে নেয়। দিজা এসে শোভার পাশে বসতেই শোভা বলে,“চিন্তা না দিজা।আমি কালকের মধ্যে ইন শা আল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবো।নাপা খেলেই ঠিক হয়ে যাই আমি।কালকে সুস্থ হলেই যশোর চলে যাব।”
কথাটুকু দর্শন শুনেও চুপ করে চলে গেলো।শোভার যেনো এখানেও আপত্তি।সে হয়তো ভেবেছিল তাকে দর্শন এসে আবারও হুমকি দিবে। তা তো হলো না।দর্শনের রাগী ভাবটা দেখতে না পেয়েও মেয়েটা অস্থির হয়ে যাচ্ছে।
