বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথি আসার ঠিক কিছুটা সময় পরই আদ্রর মা কল করেছিল। মিথির কথা জানতে চাইল। মিথি তখন ঘুমে বলে সরাসরি কথা বললেন না। মিথির ভাবী তাহিয়া অবশ্য বুদ্ধিমতী মহিলা। এই ফাঁকেই বারবার জিজ্ঞেস করে নিলেন মিথি আসলে কেন এসেছে, কোন সমস্যা হয়েছে কিনা। যদি আদ্রর মা সুন্দরভাবেই বুঝালেন যে কোন সমস্যা হয়নি, মিথিকে উনি কয়েকদিন পরই নিয়ে আসবেন। এতে বোধহয় তার ভাবী কিছুটা নিশ্চিন্তই হলেন। অথচ সে নিশ্চিন্ত থাকার মাঝে অস্থিরতা ঢেলে দিল আদ্র। কিছুটা সময় আগেই কল করে সে জানিয়েছে যে মিথিকে ও বউ হিসেবে মানে না আর। দোষ কি? মিথি অন্যের সন্তানের মা হতে চলেছে এটা দোষ। এরপরই শুরু হলো তাহিয়ার খচখচানো। মিথির ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা আর সে করতে পারল না। বরং রুমে গিয়ে মিথির ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা না করেই গায়ে ঝাঁকড়া দিয়ে বলে উঠল,
“ মিথি, এই মিথি? মিথি, তুমি নাকি কার সাথে কি করেছো? কার সাথে কি করেছো? কার সন্তান তোমার পেটে? এইজন্যই তো, এইজন্যই তো আমি বলি যে এই মেয়ে একা একা কেন এসে পড়ল। ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম। ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম যে ওদিকে কি না কি করে চলে এসেছে। ”
মিথির তখনও ভালোভাবে ঘুমই ভাঙ্গল না। ঘুমঘুম চোখে ও কথা গুলো ঠিক না বুঝলেও ভাবীর মুখভঙ্গি ঠিকই নজর কাড়ল ওর। মুখচোখে স্পষ্ট আপসোস, ভয়। মিথি ভ্রু কুঁচকে বুঝার চেষ্টা চালাল।অথচ বুঝে উঠার আগেই তাহিয়া আবার ও চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল,
“ কার সাথে কি করেছো বলে ফেলো মিথি। ভালোই ভালো বলে ফেলো। আগে তো তোমায় এমন মনে হয় নি কখনো মিথি। দিব্যি ভালো চরিত্রের মেয়ে মনে হয়েছিল। বিয়ের পর কি হলো হঠাৎ যে অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্ক করেছো? নাকি ঐ পরপুরুষটা মুহিব? ”
মিথির চোখের ঘুম গেলেও চোখজোড়া ঘুমোঘুমো।বোধহয় আজ কয়েকদিন পর তার এই সুন্দর ঘুমটা হলো। অথচ তাও পরিপূর্ণ হলো না। মিথি ছোটশ্বাস টানে। ভাবীর শেষ কথাটা শুনে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল,
“ ভাবী।”
তাহিয়া ও মুহুর্তেই উত্তর করল,
“ ভাবী বলবা না একদম, মুহিবরে তো তুমি পছন্দ করতা। করতা না ? মুহিব তো শহরেই থাকে। শহরেরই কোন একটা ভার্সিটিতে পড়ে। কোন ভাবে ওর সাথে তোমার সম্পর্ক হয়ে যায় নি তো মিথি? বিয়ের পরও আবেগ অনুভূতি গুলো জ্বলজ্বল করে উঠেনি তো তোমার মনে? ছিঃ ছিঃ! আমার ভাবতেই তো লজ্জা হচ্ছে মিথি। ”
মিথি একটা সময় সত্যিই মুহিবের প্রতি দুর্বল ছিল। সত্যিই কিশোরী অনুভূতির সাথে পেরে না উঠে ও মুহিবের পিছু ঘুরত, পাগলামো করত, চিঠি দিত। তার মানে এই নয় মিথির জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেয়েছে সেই অনুভূতির সাথে। মিথি তো যেদিন থেকে সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল যে সে আদ্রকে বিয়ে করে নিবে সেদিন থেকেই মুহিবকে ভুলার শপথ করেছিল। প্রথম দিকটায় ওর কিছুটা অনুভূতি কাজ করলেও ধীরে ধীরে বিয়ের পর যখন কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হলো তখন ওর মুহিবের কথা মনেই পড়ল না। মিথি এতোটা জ্ঞান বুদ্ধি হীন নয় যে ও বিয়ের পরও অন্য একটা পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়াবে। হোক সে একসময়কার আবেগ কিংবা অনুভূতি। মিথি সত্যিই পরকীয়ায় জড়ানোর মতো মন মানসিকতা নিয়ে বড় হয়নি। তাহলে? ভাবী কেন ভাবল এমনটা?মিথি সোজা হয়ে বসল। গায়ের কাঁথাটা একপাশে নিয়ে ভাজ করতে করতে বলল,
“ যে সম্পর্কটা আমার বিয়ের আগে এতো এফোর্ট দেওয়া স্বত্ত্বেও হলো না, সে সম্পর্কটা আমার বিয়ের পর হয়ে গেল? আমি এতোটাই নির্বোধ যে বিয়ের পর ও পরকীয়ার মতো নিচু একটা সম্পর্কে জড়িয়ে বাচ্চা নিয়ে নিব? আমি যেখানে আদ্রদের বাসা ছেড়ে দুয়েক পা অব্দি বাইরে যেতাম না কখনো, সেখানে মুহিব ভাই এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লাম আমি আরামে? শুধু সম্পর্কে জড়ানো হলে তো মানা যেত, আমি কিনা মুহিব ভাই এর বাচ্চার মা হয়ে গেলাম অবৈধ সম্পর্ক করে? রিয়েলি? তোমার সত্যি মনে হচ্ছে কাহিনীটা ভাবী? ”
মিথির ভাবী তাহিয়া শুনল এসব। অথচ থেমে গেলেন না। পরমুহুর্তেই আবার বলে উঠলেন,
” তাহলে? তাহলে কাকে দেখে তোমার এমন মতিভ্রম হলো শুনি? কার জন্য নিজের ন্যায়নীতি ভুলে বসেছো এভাবে? একটা অবৈধ সন্তান এভাবে পেটে বয়ে নেওয়ার কারণ কি মিথি? ”
অবৈধ? ওর সন্তান অবৈধ? ওর সন্তান অবৈধ নয়। মিথি জানে। ও বৈধ, ও পবিত্র, ওর গায়ে কোন কলঙ্ক নেই। তবুও কেন বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে? মিথি চোখজোড়া টানটান হয়ে যায়। ভাবীর দিাে চেয়ে স্পষ্ট ভঙ্গিতে বলে উঠল ও,
“ ভাবী! ওকে অবৈধ বলার অধিকার আমি তোমায় দেয়নি। বুঝেশুনে কথা বলো ভাবী। যা মুখে আসছে তাই বলে ফেলো না।মানব না আমি। ”
তাহিয়া মুখ ভেঙ্গাল। বলল,
“ অবৈধকে অবৈধ বলব না তো কি বলব? বৈধ বলব আমি? ”
মিথির মুখচোখ কঠিন হয়ে আসে কেমন। তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, উঠুক। মিথি মেনে নিচ্ছে তো। কিন্তু তার সন্তানকে অবৈধ বলার সাহস পায় কি করে? বলল,
“ ও বৈধ না অবৈধ এটা জাস্টিফাই করার তুমি কেউ না ভাবী। আবারও বলছি, ও অবৈধ না। ”
“ আমি কেউ না? উঠে তো বসেছো আমারই ঘাড়ে। আবার আমায় বলছো আমি কেউ না? শুনো মিথি, তোমার নিজেরই স্বামী এই বাচ্চাকে অস্বীকার করেছেন। আমাকে নিজেই বলেছে যে তোমার পেটের সন্তান তার নয়, অন্য কারো। এর দ্বারা কি বুঝায়? অবৈধ নয় এই সন্তান? ওকে আমি অবৈধ বলব না তো বৈধ বলব হ্যাঁ? ”
মিথি এবারে ঠোঁট বাঁকাল। আদ্রই বলেছে এসব তাহলে? আদ্র আর কতোটা নিচে নামবে? কতোটা? আদ্র আসলে কি চায়? মিথি যাতে কোনভাবে শান্তি না পাক তাই চায়? অথচ মিথি কিন্তু আদ্রকে সুখে থাকারই পথ করে দিয়ে এল। মুহুকে নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে এল। তবুও পুষাচ্ছে না? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,
“ উনি আমার বাচ্চাকে অস্বীকার করার কেউ নন। আমি নিজেই উনাকে আমার বাচ্চার বাবা হিসেবে অস্বীকার করেছি। এই বাচ্চাটা উনার নন,শুধুই আমার। ”
তাহিয়া বিরক্ত হলো। কপাল কুঁচকানো। চোখমুখে বিরক্তির তীব্র ছাপ। বলল,
“ কথা ঘুরাবে না মিথি। সংসারটা যে টিকবে না তা তো বুঝাই যাচ্ছে। কি করবে সারাজীবন? আমি বাবাহ তোমার দায়িত্ব আজীবন বয়ে বেড়াতে পারব না মিথি। ননদ ঘরে নিয়া আজীবন সংসারও করতে পারব না। সময় আছে, ঐ অবৈধ বাচ্চাটা ফেলে দিয়ে ওদের কাছে ভুলটা স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নাও। দেখো সংসারে তুললেও তুলতে পারে। ”
মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। কতোটা স্পষ্ট রূপ তার ভাবীর। বলল,
“ তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি ঐ সংসারে যেতে মরিয়া হয়ে আছি ভাবী? ”
“ তো কি করবে? বাপের বাড়িতে পড়ে থাকবে নাকি আজীবন? ”
“ কেন? বাপের বাড়িতে থাকার কি মেয়েদের অধিকার নেই নাকি ভাবী? আমার জানামতে তো আমার অধিকার আছে। এইছাড়াও, সেলাই পারি তো। আপাতত ওটাই চালিয়ে নিব। দেখি এটা করতে করতে আরো কিছু হয়তো পেয়ে যাব।বিয়ের আগেও তো সেলাই করে যা টাকা পেতাম তা তুমি নিয়ে নিতে। ”
মিথি সেলাই পারে। সেলাইটা অবশ্য তার মায়ের থেকেই শেখা।তার সেলাই মেশিনটা এখনো জানালার কাছে পড়ে আছে অবহেলায়। অথচ একটা সময় বিয়ের আগে মিথি এতে সেলাই করত মোটামুটি। আর যা আয় হতে তার সবটাই যেত তাহিয়ার হাতে। ভাই এর সংসারে খাচ্ছে বলে কথা! তাহিয়া মুখ ভেঙ্গাল। বলল,
“ সেলাই করে কত টাকাই আসবে? পড়ে তো থাকবে সে আমার সংসারেই। টানতে হবে সে আমাকেই। আমি বাবাহ তোমায় এত বহন করতে পারব না মিথি। এখনও সময় আছে । আদ্রর হাতে পায়ে ধরে হলেও সংসারে ফিরে যাও। দরকার হলে আমি আর তোমার ভাইও সুপারিশ করব। তবুও সংসারেই ফিরে যাও। ”
মিথির পছন্দ হলো না কথাগুলো। বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতেই বলল,
“বহন করতে হবে না আমায়। আমার খরচ আমি যেভাবে পারি ওভাবেই চালাব ভাবী, তবুও ওখানে আর কখনোই ফিরব না আমি।”
তাহিয়া আবারও বলল,
“ দেখো মিথি, ফটরফটর করো না। আমি তোমার ফটরফটর সহ্য করব না।ওখানে না ফিরলে বরং মুহিবের কাছেই চলে যাও। আমি আজই ওর নাম্বার নিয়ে কল করে জিজ্ঞেস করব এই অঘটনটা কে ঘটিয়েছে।”
তাহিয়া কথাটা বলল ঠিক। তবে সত্যিই সত্যিই যে করবে তা ভাবে নি। অথচ মিথিকে অবাক করে দিয়ে তাহিয়া মুহিবের নাম্বার কালেক্ট করল। সকাল সকাল মুহিবকে কল করেই বলে বসল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৯
“ এই মুহিব, মিথির সাথে তোমার কি সম্পর্ক? ওর পেটের বাচ্চাটা তোমার হ্যাঁ? তুমিই ঐ অবৈধ বাচ্চার বাপ? ”
মিথি তখনও নিজের ঘরে। বাইরে থেকে ভাবীর কন্ঠে এহেন কথাগুলো শুনে ওর ইচ্ছে হলে মরে যেতে। স্রেফ মরে যেতে ইচ্ছে হলো। ছিঃ! শেষ পর্যন্ত মুহিব ভাইকেও এসব জানানো হচ্ছে, এসবে টেনে আনা হচ্ছে।অতঃপর মিথি দ্রুতই নিজের ঘর ছেড়ে বাইরে এল।
