বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির অনেক সকালেই ঘুম ভাঙ্গল আজ। বলা চলে রাতে তেমন একটা ভালো ঘুম হয় ও নি ওর। তাই তো ভোর হয়েছে বুঝে উঠেই বেলকনিতে গিয়ে বসল। হিয়া, রিধি, ফিজা তিনজনই তখনও ঘুমে। মিথি বেলকনিতে বসে তাকিয়েই থাকল। বাইরে কুয়াশা পড়েছে কিছুটা। তখনও ভালো করে আলো ফুটে নি। শীত শীত অনুভবটা বেলকনিতে আরো তীব্র ভাবে বোধ হচ্ছে। অতঃপর ওভাবে আরো কিছুটা সময় যাওয়ার পর রিধি এল ঘুমঘুম চোখ মুখ নিয়ে। সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠার কারণে ওর মুখচোখ ফুলোফুলো ঠেকছে। মিষ্টিই দেখাচ্ছে। মিথি হাসল রিধিকে এগিয়ে আসতে দেখে। রিধি বলল,
“ তুমি ঘুমাও নি আপু? ”
মিথি উত্তর করল,
“ ঘুমালাম তো। ঘুম ভাঙ্গার পরই এসেছি। ”
“ চলো ঘুরে আসি। কুয়াশা কুয়াশা ভোরে ঘুম থেকে উঠেছি এটা ছবি টবি তুলে পোস্ট স্টোরি করতে হবে না বলো? ”
“ এই ভোরে? আলোও তো ফুটে নি ভালো করে। ”
“ তাতে কি? দেখছো না শহর কত ব্যস্ত। আচ্ছা থাক, তুমি না বললে যাব না আপু। ”
রিধির মুখটায় মন খারাপ মন খারাপ ভাব ফুটে উঠল যেন। মিথি তাকিয়ে হেসে বলল,
“ ওরা ঘুমোচ্ছে। উঠলে না হয় একসাথে যাব। ”
“ ওরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের খোঁজ করুক একটু। ওদের জন্য সারপ্রাইজ। চলো না আপু..”
মিথি এই ঠান্ডায় বের হতে চাচ্ছিল নুা। একেই কুয়াশা, ঠান্ডা। এর উপর ও বাড়ি থেকে জামা কাপড়ের সাথে শাল আনেনি। এভাবে বের হলে পরে ক্ষতি হলে? রিধি হয়তো ছোট মানুষ। না বুঝেই আবদার করছে। মিথি উশখুশ ভঙ্গিতে বলল,
“ আমি আসলে বাড়ি থেকে শাল আনিনি রিধি। এই ঠান্ডায় বাইরে যাওয়াটা খুব একটা ভালো হবে না। তাই না? আমরা আরেকদিন যাই?কিংবা আরেকটু পর? ”
রিধি খুশি হলো। উত্তর করল,
“ ওকে, রোদ উঠলে তখন বের হবো আপু। পড়ি এখন তাহলে। ”
রিধি পড়তে গেল এর পরপরই। কিছুটা সময় বই নিয়ে বসে থেকে এর পরপরই উঠে গেল চুলার সামনে। রিধি চা টাই কেবল ভালো পারে বানাতে। বাকি সবে ও কাঁচা। এ বাসায় রান্নাটা প্রায়সই হিয়াকেই করতে হতো। রিধি সাহায্য করত। আর ফিজা রান্নায় পুরোপুরিই কাঁচা বলা চলে। রিধি দুই কাপ চা নিয়েই ছুটল আবার বেলকনিতে। হিয়া আর ফিজা তখনও ঘুম ছেড়ে উঠেনি। মিথি বোধহয় আকাশ দেখছে এতো মনোযোগ দিয়ে। রিধি তাকাল। বলল,
“ মিথি আপু? কি দেখছো এত মনোযোগ দিয়ে? তুমি কেন এমন আপসেট হয়ে থাকো সবসময়? তুমি জানো তোমায় হাসলে সুন্দর লাগে? ”
“তুমি সাথে থাকলে তো হাসিই রিধি। ”
রিধি মানল না। পাশে বসতে বসতেই ঠোঁট উল্টে বলল,
“ কোথায়? কেমন যেন প্রাণহীন হাসি। কোন কাজ খুঁজে পাচ্ছো না বলে মুড অফ হু? তোমায় বললাম না, কাজ তোমায় অবশ্যই খুঁজে দিব আপু। তুমি সবসময় হাসিখুশি থাকবা হুহ? ”
মিথি হাসার চেষ্টা করল। হাসল এবং বলল,
“ থাকব। ”
রিধি ততক্ষনে চায়র কাপ এগিয়ে ধরেছে। মিথিও চুমুক বসাল।রিধি তাকিয়ে থেকে বলল,
“ তোমার জন্য চা করলাম। বলো কেমন হয়েছে হু?”
মিথি হেসে শুধাল,
“ খুব ভালো হয়েছে। এটুকু মেয়ে, তুমি এমন চমৎকার চা ও বানাতে পারো? ”
রিধি লজ্জা পেল যেন প্রশংসা শুনে। শুধাল,
“ শুধু চা-টাই ভালো পারি। ”
“ খুবই ভালো পারো। ”
“ তুমি কি কি রান্না পারো? ”
“ মোটামুটি সব। ”
অতঃপর রিধিও চায়ে চুমুক বসাল। কয়েক মিনিট যাওয়ার রিধি যখন চায়ে শেষ চুমুকটা দিবে ঠিক তখনই মাথায় হুট করে কোন বুদ্ধির উদয় হয়েছে এমন ভাবভঙ্গি করে ও মিথির দিকে চাইল। চায়ে শেষ চুমুকটা না দিয়েই বলে উঠল,
“ আপু? প্র্যাক্টিকাল খাতা লিখবা? এটা তে আমি তোমায় অনেক অর্ডার এনে দিতে পারব। তোমার আয়ও হবে। যদিও একটু কষ্টকর। ”
মিথি চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ শুনে শুধাল,
“ হুহ? ”
“ আমার কলেজের অনেকেই করাবে।তোমার হয়ে প্রচারটা আমি করে দিব।”
মিথি শুনল। অতঃপর বলল,
“ করা যাক। এমনিতেও তো বসেই তো আছি তাই না? কিছু একটা করলে সময় যাবে। ”
রিধি ছটফট ভঙ্গিতে বলল,
“ ভেরি গুড। এবার আর মন খারাপ করবে না ওকে? চলো হেঁটে আসি। রোদ উঠে গেল তো। ”
“ আচ্ছা। ”
হিয়া, ফিজা তখনও ঘুমে। ওদের ঘুমে রেখেই মিথি আর রিধি বের হয়ে এল। অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেই রাস্তার ধারে চোখে পড়ল হিমেলের ভাবী স্নিগ্ধা ভাবীকে। মিথিকেই দেখেই সর্বপ্রথম স্নিগ্ধা একটা হাসি উপহার দিল। এগিয়ে এসে শুধাল,
“ মিথি না?তুমি এখানে? ”
মিথি চাইছিল তাকে না দেখুক। প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে স্নিগ্ধা ভাবী নামক মানুষটা বরাবরই তার সাথে বিনয়ী আচরণ করে এসেছে। নিজ থেকেই কথা বলেছে প্রতিবার। কোন অহংকার নেই, দম্ভ নেই। মিথির এই ধরণের মানুষদের ভালো লাগে। হেসে উত্তর করল ও,
“ জ্বী, আমি মিথিই ভাবী। ”
“ তো তুমি এদিকে? কোথাও বেড়াতে এলে নাকি? তোমার শ্বশুড়বাড়িটা এদিকেই নাকি? ”
মিথি উত্তর করল,
“ নাহ, তেমন নয়। হিয়ার সাথে এসেছিলাম একটু। ”
স্নিগ্ধা প্রশ্ন ছুড়ল,
“ হিয়া? ”
“ আমার বান্ধবী। ”
“ সে কোথায় থাকে? ”
মিথি বাসাটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে শুধাল,
“ এই বাসায়। ”
স্নিগ্ধাকে প্রফুল্ল দেখাল। শুধাল,
“ ওহ, আমাদের তো পাশের বাসাই! একদিন এসো বাসাতে মিথি। ”
মিথি ছোট করে উত্তর করল,
“ আসব। ”
ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল হিমেল আর আয়মান। হিমেল ছেলেটাকে গম্ভীর স্বভাবের দেখালেও বাস্তবে সে কাছের মানুষদের কাছে খুবই চঞ্চল ধরণের। যেমন কাছের বন্ধ, পরিবারের মানুষ। এর বাইরে বাকিদের কাছে ও বরাবরই নাক উঁচু স্বভাবের গম্ভীর মানুষ। তবে যাদের সাথে ও মিশে তাদের সাথে ও পুরোপুরিই মিশে। হিমেল ছাদের একোকোণ থেকেই তাকিয়ে ছিল নিচের দিকে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে এল হঠাৎ। ওর তাকানোর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আয়মানও অনুসরন করে তাকাল। পেছন দিক থেকে দুটো মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। অপরপাশে হিমেলের ভাবীকে। যে দুটো মেয়েকে দেখা যাচ্ছে এদের মধ্যে একজন রিধিই হবে। চেহারা না দেখেও আয়মান ধারণা করল। অপরজন হয়তো ফিজার থেকে শোনা সে নতুন মেয়েটি হবে। আয়মান সঙ্গে সঙ্গেই হিমেলের কাঁধে চাপড় মেরে বলল,
“ কি ব্যাপার? এমন হাবলুর মতো তাকিয়ে আছিস কেন মেয়েটেয়ের দিকে? তাও আবার আমার শালিকাদের দিকে। ”
হিমেল যেন অনেকটা মনোযোগ দিয়েই দেখছিল। কিছু বুঝার চেষ্টা চালাচ্ছিল যেন। ভ্রু জোড়া ওভাবেই কুঁচকানো ছিল। কিন্তু আয়মানের কথা শুনে কুঁচকানো ভ্রু শিথীল হলো। আয়মানের দিকে এমন ভাবে চাইল যে আয়মান ফের বলল,
“ না মানে, তুই তো এমন মেয়ে টেয়ের দিকে তাকাস না। হঠাৎ এমন ভাবে চেয়ে আছিস তাই প্রশ্ন জাগল। ”
হিমেল আবারও তাকাল। অতঃপর শার্টের হাতা গুঁটাতে গুঁটাতে বলল,
“ আমার মনে হলো আমি তাকে চিনি। কিন্তু এই মেয়েটা সে হবার পসিবিলিটি নেই। সে নয় এটা নিশ্চয়। ”
আয়মান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কে? ”
“ কেউ না। ”
“ কেউ না হলে তুই ওভাবে তাকিয়ে ছিলি কেন দোস্ত? ”
হিমেল এবার আয়মানের দিকে চাইল। শান্ত ভঙ্গিতে আয়মানের কলারটা চেপে ধরে ছাদের কর্নারে ওকে ঠেকিয়ে বলল,
“ তোকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার প্ল্যান করছিলাম মনে মনে। ফেলে দেই? ”
“ বিয়ে করিনি এখনো ভাই। আমার না হওয়া বউ কান্না করবে।বিয়েটা করতে দে ভাই। ”
হিমেলের হাসি এল আয়মানের কথা শুনে। বলল,
“ ছাদ থেকে না ফেললে কি এখনই কি গিয়ে বিয়ে সেরে ফেলবি ফিজার সাথে? ”
আয়মান পাল্টা উত্তরে বলল,
“ তুই কেন বিয়ে সেরে ফেলছিস না সাবিহার সাথে? পুরো পরিবার রাজি তবুও এত বাহানা কিসের এটাই বুঝি না বাপু। ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। আয়মানের কথা অনুযায়ী হঠাৎ মুখ গম্ভীর হয়ে এল। বলল,
“ কে সাবিহা? ”
“ ভাবীর ছোটবোন। ”
হিমেলের মুখ তখনও গম্ভীর। বলল,
“ ওকে বিয়ে করার প্রশ্ন এল কেন? ”
“ কারণ তোর বিয়েটা ওর সাথেই হবে যে শতভাগ শিওর আমি। ”
হিমেল বিনিময়ে উত্তর করল,
“ আমার জন্য আমার একাকীত্ব এবং কল্পনাই যথেষ্ট। কোন সাবিহার এন্ট্রি হবে না আমার লাইফে। ”
আয়মানকে নিরাশ দেখাল। বলল,
“ বাট হোয়াই? সত্যিই ভাবীর কথা মতো কেউ আছে নাকি তোর লাইফে? বা ছিল? আমার বিশ্বাস হয় না তোর মতো একটা ছেলে কোন মেয়ের জন্য প্রেম ট্রেম পুষতে পারে বলে। ”
হিমেল রেগে তাকাল। বলল,
“ কেন? আমি কি গে? ”
“ তা নয়। কিন্তু তোর লাইফে কেউ থাকবে বা ছিল তা আমিও জানব না?এটা হয়? ”
উত্তর এল,
“ কারণ সে আমার একান্তই ব্যাক্তিগত কল্পনা ।”
“কে ভাই এই মেয়ে? আমার খুব ইচ্ছা দেখার। আর নয়তো তুই মিথ্যে বলছিস। হতে পারে ওটা কেবলই তোর কল্পনা। ”
“ কল্পনা বললাম কারণ সে এখন অন্যকারো। তবে কল্পনা হলেও সে আমার লাইফের খুব শক্তপোক্ত এক সত্য। ”
আয়মান বন্ধুর কথা শুনে হায়হায় করল। বলল,
“ ঠকাল তো তোকে। ছিহ! কোন মেয়ে তোকে ঠকিয়ে চলে গেল আর তুই কিনা বলছিস ওর জন্য কোন সাবিহার এন্ট্রি হবে না। ”
হিমেল গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,
“ ঠকায়নি সে আমাকে। ”
“ তাহলে? ”
“ আমি কখনো কাউকে বুঝতেই দেইনি যে আমার তার প্রতি কিছু আছে। এমনকি তাকেও না। ভাবী তো গোয়েন্দাদের মতো বহু পর্যবেক্ষনের পর জেনে গিয়েছিল।”
আয়মান বোধহয় এবারে বিশ্বাস করল। কারণ তার বন্ধু কিছু কিছু বিষয়ে অবশ্যই চাপা ধরণে সে হিসেবে তাকে না বলাটা স্বাভাবিক। আয়মান ছবিও দেখতে চাইল না। কারণ ও জানে হিমেল দেখাবে না। শত বললেও দেখাবে না। বলল,
“ কষ্ট হয় না ? ”
“ কষ্ট হয় না। তবে রাগ হয় তার প্রতি। তাকে দেখলেও রাগ হয়। সে আমার হলেও হতে পারত। বহু যত্নে রাখতাম তাকে আয়মান।হলো না। ”
“ না পেলে তখন সবাই বলে যত্নে রাখত। পেলে নির্ঘাত সাবিহার মতো ইগ্নোর করতি। ”
হিমেল হাসল এবার। বলল,
“ আমি শুরু থেকেই তাকে ইগ্নোর করেছি শুধু পাওয়ার পর যত্ন করব বলে। আমার লাভ ল্যাংগুয়েজ বোধহয় এড়িয়ে চলাটাই ছিল। ভেবেছিলাম তাকে পেলে সব পুষিয়ে নিব। কিন্তু পাওয়া হয়নি। আর, সাবিহাকে আমি ইগ্নোর করি না কখনো। ওর সাথে বরাবরই আমার যোগাযোগ ভালো। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখিস। ”
মিথিরা বাইরে থেকে আসার পরই হিয়াকে সর্বপ্রথম মিথি এটা বলল যে,
“ হিয়া, পাশের বিল্ডিং এ হিমেল ভাইরা থাকে। স্নিগ্ধা ভাবীর সাথে আজ দেখা হয়ে গেল। ”
হিয়া ঘুম ছেড়ে উঠেছে। চোখ কচলে বলল,
“কোন হিমেল ভাই? কোন স্নিগ্ধা ভাবী?”
“আমাদের পাশের বাড়ির হিমেল ভাইরা। ফিজা আপুর উনার বন্ধু হিমেল। চিনতে পেরেছিস? ”
হ্যাঁ হ্যাঁ। হিয়া দেখেছে ফিজা আপুর প্রেমিক পুরুষের বন্ধুটিকে। গম্ভীর গম্ভীর। বলল,
“ চিনতে পেরেছি। কিন্তু তোদের বাড়ির পাশের হিমেল ভাই এটা চিনি না আমি। আশ্চর্য, একই গ্রামেরই তাহলে?অথচ আমি চিনি না। ”
“ হু। দেখা হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল এখানে কোথায় এসেছি। বলেছি তোর সাথে এসেছি হিয়া। ”
“ তো কি হয়েছে? তুই মানুষ নোস নাকি? লুকিয়ে বেঁচে আছিস নাকি তুই পাগল? ”
মিথির হুট করে শুধাল,
“কখনো আবার প্রশ্নের সম্মুখীন হলে গ্রামের মতো? ”
হিয়া আর মিথি কথা বলতে বলতেই হুট করে হিয়ার ফোনে কল এল। আননোন নাম্বার। হিয়া ভ্রু কুঁচকে রেখে কল তুলল। কানে নিতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বলল,
“ মিথি, ”
হিয়া ভ্রু আরো কুঁচকে নিল। শুধাল,
“ মিথি নয়, হিয়া বলছি। আপনি কে? মিথির ভাইভাবী কেউ হোন নাকি?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল না। বরং ত্যাড়া স্বরে জানাল,
“ মিথিকে ফোন দিন। কথা আছে আমার।”
গলাটা খুবই রূঢ শোনাল। যেন ওপাশের ব্যাক্তিটি আদেশ করছে। হিয়্ শুধাল,
“কিসের কথা? কে আপনি? ”
“মিথিকে দিচ্ছেন না কেন ফোন? কথা কানে যাচ্ছে না আপনার? ঐ জা’নোয়ারকে ফোন দিন। ওর অনেক দাম বেড়েছে তাইনা? এত দাম ও কোথায় রাখে আমিও দেখব। দিন ও পাশে থাকলে। ”
পাশ থেকে মিথি সমস্তটা শুনে বোধহয় একমুহুর্তেই ধারণা করে নিল যে এটা আদ্র। আদ্র ছাড়া কেউ এভাবে কল করে কাউকে হুমকিধামকি দিয়ে অভদ্রের মতো কথা বলতে পারে না। এটা আদ্রই। অন্যদিকে হিয়া বুঝল না এই লোক কে। ওকে বড্ড বিরক্ত দেখাল সকাল সকাল এই ঝামেলাতে। বলল,
” ও পাশে নেই। রাখুন ব্যাটা। আননোন নাম্বার থেকে কল দিয়েছেন, কথা বলছি এই তো অনেক। আবার রুডলি কথা বলছেন। ”
এইটুকু বলেই ও কল রাখল। অথঃপর সোজা এই নাম্বারটা ব্লক করল। বিরক্ত গলায় শুধাল,
“ কোন বেয়াদব এ কিজানি। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“ উনি আদ্র হিয়া। আমি শিওর উনি আদ্র। কেন কল করলেন উনি? ”
হিয়ার মুহুর্তেই রাগ হয়। বলে,
“ তোর বর জা’নোয়ারটা? ”
“ কন্ঠ এবং উগ্রতা তেমনই। ”
হিয়া আপসোস নিয়ে বলল,
“ ইশশ কল রেখে তো ভুল করে ফেললাম। ট্র্যাপে ফেলা যেত এই জা’ নোয়ারকে। ”
মুহিব! একাধারে রিধির কোচিং এর ভাইয়া এবং তার বাবার বন্ধুর ছেলে। অথচ এই লোকটাকে কেন জানি রিধির আজকাল সহ্য হয় না। একদম দেখলেই রাগ গা চিড়বিড় করার মতো অবস্থা যেন। এর অন্যতম কারণ অবশ্য ওকে কোচিং এ পড়ালেখা নিয়ে চাপে রাখার জন্য। রিধি তাকাল রাস্তার একপাশে। মুহিব দাঁড়িয়ে আছে। স্বগৌরবে ধূমপান করছে বুক ফুলিয়ে। রিধির এটা দেখেও অসহ্য লাগে। ওপাশ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় মুহিবের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ মুহিব ভাই, জনসম্মুখে পথে প্রান্তরে এমন ধূমপান করে কি সুখ পান? আশ্চর্য! ”
মুহিবকে বিরকাত দেখাল। বলল
“ তোমার সমস্যা রিধি? ”
“ অবশ্যই সমস্যা। আপনার ধূমপান করার হলে আমি দূরে কোথাও দরজা জানালা বন্ধ করে বদ্ধ রুমে ধূমপান করুন, কে নিষেধ করেছে? কিন্তু পথেপ্রান্তরে ধূমপান করে তো নিজের সাথে সাথে আমাদের ও ক্ষতি করছেন? একজন সচেতন বালিকা হয়ে কি করে মেনে নিই এসব? ”
মুহিব যেন মজা পেল। বলল,
“ সচেতন বালিকা? ”
“ অসচেতন নাকি? ”
“ সচেতন বালিকা হলে কোচিং এর পরীক্ষায় এমন গোল্লা পায় কিভাবে?”
রিধির রাগ এবার ফুঁসে উঠল। একটু আগেই কালকের পরীক্ষায় জিরো পাওয়ার কারণে ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, কোচিংয়ের সবার সামনে মজা ও করেছে। এর জন্য আরো রাগ লাগছে এসব মনে করে। বলল,
“ওটার সাথে সচেতনতার কি সম্পর্ক?”
মুহিব সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল একদম রিধির কানের পাশ দিয়ে। অতঃপর হেসে বলল,
“কতখানি সচেতন তাই দেখালাম আরকি। ”
“ আমি এই চ্যাপ্টারটা পড়িনি ভালো করে। নয়তো গোল্লা পেতাম না। ”
“ এভাবে রেগে কথা বলছো কেন? খারাপ কিছু বলেছি? এপ্রেশিয়েট করছি। গোল্লা পাওয়া ভালোই তো। তুমি কন্টিনিউ করতে পারো এটা । এমন সচেতন কাজ দেখে সবাই খুশি হবে।”
রিধির রাগে অসহ্য লাগে। মুহিবকেই অসহ্য লাগছে ওর। বলল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১৪
“ আপনি খুব অসহ্য মুহিব ভাই। আমায় কোচিং এ দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, সবার সামনে গোল্লা পেয়েছি বলে উপহাস করেছেন। এখন আবার পঁচাচ্ছেন। কি ভাবেন? আপনি খুব ভালো স্টুডেন্ট নাকি? আপনার সিজিপিএর খবরও আমি রাখি। বুঝলেন? ”
“ ভেরি গুড। তো পরীক্ষায় গোল্লা পেয়ে তুমি কি সুখ পেয়েছো? ”
রিধি এবারে উত্তরই করল না। সোজা ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে গেল। রাগ লাগছে ওর। রাগে শরীর জ্বলছে। আব্বুকে ও আজকেই বলবে যে মুহিব ভাই এর কোচিং এ ও আর পড়বে না।
