বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির এভাবে করে দু দুটো মাস গেল ভালোভাবেই। এতদিন মিথি সন্তানসম্ভাবা এটা চোখের দেখাতেই না বুঝা গেলেও এখন দৈহিক গঠনের কারণে বুঝা যায় একটু একটু৷ তবুও এখনও পর্যন্ত যে কারোর কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি এতেই মিথি বোধহয় সুখী অনুভব করে। আজকাল মানুষের কথাকে ও ভয় পায়। মানুষজনকেও ভয় পায়। মানুষজনের প্রশ্নকে তো আরো। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। এখন রাত আটটা। তার কাজ শেষ। বাসায় যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যেতে নিতেই দেখা হলো ডক্টর ফাজরিনের সাথে। মিথিকে দেখে সর্বপ্রথম সে হাসল। বলল,
“ মিথি, ভালো আছো? ”
মিথি তাকাল। বিনিময়ে সেও হাসল৷ তবে মনে প্রশ্ন আসে আদ্রর সাথে কি ডক্টর ফাজরিনের যোগাযোগ হয়? কোনভাবে বলে দিলে? আদ্র জেনে গেলে? শুকনো হেসে বলল,
” ভালো আছি। আপনি? ”
“ একদম ভালো। তুমি এখানে জব করছো? এই অবস্থায় এতোটা পরিশ্রম শরীরে সইতে পারবে? ”
মিথি হেসে জানাল,
“ পারছি। ”
ডক্টর ফাজরিন মিষ্টি করে হাসল। বলল,
“ যত্ন নিও নিজের এবং বাচ্চার। ভালো থেকো। মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া অবশ্যই ভালো ”
এটুকু বলেই ডক্টর ফাজরিন পা বাড়াল। মিথি তাকিয়ে দেখল। অতঃপর সেও পা বাড়াল নিজের মতো। রাতের শহরে তখন ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট। চারপাশে মৃদুমন্দ হাওয়া৷ অথচ রাস্তায় এত গাড়ির সরগমেও রিক্সা মিলছে না। মিথি কিছুটা বিরক্তই হলো৷ প্রায় মিনিট বিশ দাঁড়িয়েও যখন রিক্সা পেল না তখন হতাশ হলো ও। ঠিক তখনই আচমকা নিজের সামনে একটা রিক্সা থামতে দেখা গেল। মিথি ভ্রু কুঁচকাল। রিক্সায় বসা মানুষটা হিমেল ভাই। মিথির দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকাল সে। জিজ্ঞেস করল,
“ রিক্সা নেই? ”
মিথি তাকাল। উত্তরে বলল,
“ আজ পাচ্ছি না। ”
হিমেল কিছুটা সময় চুপ থাকল। অতঃপর এদিক ওদিক চেয়ে দেখল খালি রিক্সার দেখা মিলছে না। তাই আবারও জিজ্ঞেস করল,
“ একই রিক্সায় যেতে অসুবিধা হবে তোর? ”
মিথি শুনল বোধহয়। তবুও জিজ্ঞেস করল,
“ জ্বী? ”
“ এই রিক্সায় যেতে অসুবিধা হবে তোর? ”
মিথি এবার ইতস্থত বোধ করল। হিমেল ভাই এর সাথে তার ইদানিং কয়েকদিন পরপরই দেখা হচ্ছে । কথা হচ্ছে। এবং না চাইতেও সাহায্য নিতে হচ্ছে। এই যেমন সেদিন ছাতা নিতে হলো, কয়েকদিন রিক্সা পাচ্ছে না বলে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল ও। তখনও হিমেল তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল যতোটা সময় রিক্সা পায়নি। মিথি ইতস্থত বোধ করে উত্তর করল,
“ আমি একটু পর রিক্সা পেলে চলে যাব হিমেল ভাই। পেয়ে যাব আশা করি। আপনি চলে যান। ”
হিমেলের উত্তরটা মোটেও পছন্দ হলো না। জানাল,
“ পেয়ে যাবি তা আমিও জানি। কিন্তু কখন পাবি তা তুই জানিস? এতোটা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগবে নিশ্চয় তোর? ”
“ এতক্ষন অপেক্ষা করেছি যখন আর কিছুটা সময় অপেক্ষা করলে পাব। ”
হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। মিথি যে ওর সাথে এক রিক্সায় কখনোই যাবে না তা হিমেল ভালোভাবেই জানে৷ তাই নেমে গেল দ্রুত। জানাল,
“ আমি নেমে গেছি। তুই এবার যেতে পারিস। ”
“ প্রয়োজন নেই তো হিমেল ভাই। আমি একটু পর চলে যাব রিক্সা পেলেই। ”
“ আমার সাথে যেতেই তো অসুবিধা ছিল তাই না? নেমে গেলাম তো। একা যেতেও অসুবিধা হবে নাকি তোর? ”
মিথি উত্তর করল,
“ না, কিন্তু ওটা আপনি নিয়েছেন। আপনার নিশ্চয় দেরি হবে। আমি ঠিক চলে যেতে পারব প্রতিদিনের মতো। ”
হিমেলের এবার কপাল কুঁচকে এল। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” আমি তোকে খারাপ কিছু বলিনি নিশ্চয়? কিংবা খারাপ কোন উদ্দেশ্য নিশ্চয় আমার নেই এতে? ”
মিথি বিনয়ী স্বরে জানাল,
“ আপনি ভুল বুঝছেন। আমি সত্যিই আপনার থেকে এই সাহায্যটা নিতে চাইছি না বলেই উঠছি না। আর অন্যকিছু না। ”
“ কেন? আমি অপরিচিত? ”
“ আপনি আমার গ্রামের বড়ভাই। এইছাড়া খুব একটা পরিচিতি আমাদের নেই হিমেল ভাই। ছোট থেকে আপনাকে হিমেল ভাই হিসেবে জেনে এসেছি এটাই বলতে গেলে পরিচয়। কিন্তু এতবার সাহায্য নেওয়ার মতো আমার আপন কেউ নন আপনি।মোটকথা, আমি বারবার আপনার থেকে সাহায্য নিতে চাইছি না৷ ”
“ তুই আমাকে অপরিচিত বলছিস তাই তো? ওকে ফাইন। আমিও তোকে চিনি না আজ থেকে। ”
মিথি নিরাশ হলো। পরপরই খালি রিক্সা দেখা গেল। হাত উঁচিয়ে রিক্সাটা ইশারা করে মিথি শুধাল,
“ রিক্সা পেয়ে গেছি হিমেল ভাই। আপনিও চলে যান। ”
রিধি তখন সন্ধ্যায় দোকানে এসেছিল কিসের জন্য। দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনে আবারও সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিতেই দেখা হলো সেই অতি পরিচিত রিধির সেই অপছন্দে আন্টির সাথে। ভদ্র মহিলাও বোধহয় দোকানের জন্যই নামছিল। রিধিকে দেখে মুহুর্তেই ভ্রু কুঁচকে ডাকল,
“ এই রিধি, এই? ”
রিধির পছন্দ হয় না এই মহিলাকে। তবুও হেসে বলল,
“ কি আন্টি? কিছু বলবেন? ”
ভদ্রমহিলা সন্দেহি নজরে বলল,
“ তোমাদের সাথে যে মেয়েটা থাকে? ঐ যে মিথি নাকি টিথি নাম। ও প্র্যাগনেন্ট নাকি? দেখতে তো লাগে প্রেগন্যান্ট! কিছু হবে নাকি ঐ মেয়ের?”
রিধি বিরক্ত হয় মনে মনে। বলল,
“ প্রেগন্যান্ট মনে হলে তো কিছু হবে অবশ্যই আন্টি। ”
“ আরেহ মজা করছি না। সত্যি বলো। কিছু হবে? পেটটা কেমন ফুলো ফুলো৷”
রিধি হতাশ স্বরে জানাল,
“ হ্যাঁ, আপু প্র্যাগনেন্ট।”
ভদ্রমহিলা চমকে উঠলেন যেন। শুধালেন,
“ সে কি!”
রিধি ভ্রু কুঁচকে জানাল,
“ কি? আপনার ধারণা সঠিক হলো। আপনার তো খুশি হওয়া উচিত। তা না করে এমন চ্যাৎ করে উঠলেন। ”
ভদ্রমহিলা সন্দেহি দৃষ্টিতে আবারও ফিসফিস স্বরে বলল,
“ বিয়েশাদী হয়েছে মেয়ের? ”
“ কেন হবে না? নাকে নাকফুল, হাতে চুড়ি দেখেন নি নাকি আপনি আন্টি? ”
“ তো বিয়ে হলে এভাবে পোয়াতি মেয়ে একা থাকে কেন পরিবার ছাড়া? তোমাদের সাথে এভাবে থাকে কেন? এই সময়ে কত কি সমস্যা হয়। ”
রিধি চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বলে,
“ হয়তো কোন কারণ আছে তাই থাকছে আন্টি। ”
” স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো তো? কই এতদিনেও তো কোনদিন স্বামীকে এসে দেখে যেতে দেখলাম। নিশ্চয় সংসারে কোন সমস্যা চলছে তাই না?”
রিধির বিরক্ত লাগে। তবুও জানাল,
“ আপনার কৌতুহল দেখে আমার হাসি পাচ্ছে আন্টি। আপুর এডমিশন টেস্ট না সামনে? ঐ কারণেই আপুর বান্ধবী মানে হিয়া আপু সহ একসাথে এখানে থাকছে। আর কিছুই না। আপনি একটু বেশিই বুঝেন। ”
ভদ্রমহিলা এবার বোধহয় কিঞ্চিৎ রাগ করলেন। জানালেন,
“ মোটেই বেশি বুঝছি না। আমার মন বলছে তোমরা কিছু লুকিয়ে যাচ্ছো।আধো মেয়ে বিবাহিত কিনা তাও সন্দেহ! ”
রিধি এবার সরাসরিই বিরক্তি দেখাল। উত্তর না করে ধপাধপ পা পেলে উঠে গেল। হতাশ হয়ে মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে এক কিনারায় বসতেই হিয়া তাকাল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ কি হয়েছে? ”
রিধি বলল,
“ ঐ যে আন্টিটা । বিরক্তিকর! মিথি আপুর সম্পর্কে তদন্ত করা শুরু করে দিয়েছে। ”
“ কেন?”
“ মিথি আপু প্রগন্যান্ট তাই।”
“ তো? ”
“ ওটা তো এতদিন বুঝে নি। এখন বুঝা যাচ্ছে। তাই মহিলার আজগুবি কথাবার্তা আরকি। বাদ দাও। ”
হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,
“ ওহ। মিথিকে বলিস না এসব। ও আবার ভাবতে শুরু করে দিবে। ”
“ আচ্ছা। ”
হিয়া কথা শেষ করে আবার নিজের জায়গায় গেল। ফোন হাতে নিতেই দেখা গেল দীপ্রর মিসড কল। এগারোটা কল। তাও প্রায় দশ মিনিট আগের। মোবাইল সাইলেন্ট থাকাতেই বোধহয় শুনে নি ও। হিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে ফোনে তুল নিয়ে কল ব্যাক করল। দীপ্র কল তুলতেই উত্তর করল,
“ দীপ্র? কল দিয়েছিলি? ”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“ কেন তোর ফোনে মিসড কলের নোটিফিকেশন দেখায় না হিয়া? ”
হিয়া ছোটশ্বাস ফেলল ত্যাড়া কথা শুনে। প্রশ্ন করল,
“ কেন কল দিয়েছিস? ”
“ এমনিই। ”
“ কোচিং এ তো নিয়মিত আসিসই না দীপ্র। পড়ালেখা কেমন চলছে তোর? ”
দীপ্র হতাশ স্বরে জানাল,
“ পড়ালেখায় মন দিল কিছুই বসছে না।তবে আমার খুব ইচ্ছে তোর সাথে একই ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার হিয়া। যদিও পরীক্ষার ডেইট কাছে এসেছে বলে পড়ার ইচ্ছে আরো মরে গিয়েছে। চল এডমিশন টেস্ট ফেস্ট না দিয়ে তুই আর আমি প্রাইভেট কোন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাই হিয়া। গুড আইডিয়া না?”
“ গুড। ভেরি গুড। কিন্তু তোর বাপের অনেক টাকা থাকলেও আমার বাপের নেই। সো ঐ প্ল্যান বাদ। আচ্ছা, তোর সেই পছন্দের মেয়ের মন জয় করতে পারলি? ওজন তো খুব কমালি। ঐদিন দেখলাম আগের থেকে বহু ওজন কমিয়েছিস। মুখচোখ শুকিয়ে গেল। ”
দীপ্র শুধাল,
” হু কমিয়েছি তো। কত কষ্ট করেছি৷ সুন্দর দেখাচ্ছিল নাকি আমায়? ”
“ ওভাবে দিন রাত পড়ে থেকে না খেয়ে ডায়েট মেইনটেন করলে আর দিনরাত এভাবে দৌড়াদৌড়ি আর জিমে গেলে আমারও ওজন কমবে। আমাকেও সুন্দর দেখাবে। ”
দীপ্র সঙ্গে সঙ্গেই জানাল,
“ তুই ওজন কমালে ব্যাঙ এর মতো লাগবে। ”
“ আমি তোর মতো পাগল ও নই যে ছেলে পটানোর জন্য ওজন কমাবো দীপ্র। আই থিংক মেয়েরা এমনই ভালো। ”
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক। তোকে এভাবে দেখেই অনেক ছেলে পটে যাচ্ছে হিয়া চিকন হলে তো আরো ছেলে পটে যাবে। তাই তোর ওজন কমানোর চিন্তাও নেই। ”
হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে। কথা বলতে বলতে আজগুবি টপিক উঠে এসেছে। তাই শুধাল,
“ এসব আজব টপিক বাদ দে। কল দিয়েছিস কেন? ”
“ তোর বাসার ওখান দিয়েই যাচ্ছিলাম। প্রায় পাঁচদিন হলো তোর সাথে দেখা হয়নাই। তাই ভাবলাম দেখা করি। কিন্তু তুই তো কলই তুললি না।”
“ সাইলেন্ট ছিল ফোন। ”
“ ওহ। দিপা আপু আসছে আজ দেশে। আম্মু বলেছিল তোকেও বলতে। আসবি? ”
হিয়া ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“ ইনভাইট করতে কেউ যদি এভাবে আসবি কিনা জিজ্ঞেস করে তো উত্তর কি দেওয়া যায়? ”
”না মানে তোকে তো এর আগেও বলেছিলাম। আসিস নি। ”
হিয়া উত্তর করল না এবারে। কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর বলল,
” আমার বাসা থেকে কতটুকু দূরে গেলি এই দশ মিনিটে? ”
“ বেশি না। তোদের রাস্তার মোড়ের রেস্টুরেন্টে।”
হিয়া মুহুর্তে প্রশ্ন ছুড়ল,
” রেস্টুরেন্টে? তোর ওজন সতর্কতা?”
“ তোর কল পেয়ে ওখানে বাইক থামিয়েছি। রেস্টুরেন্টে ডুকিনি। ”
হিয়া হেসে ফেলল। এই ছেলেটাকে সে পরিচয়ের শুরু থেকেই দেখছে ওজন নিয়ে লড়াই করতে। কিন্তু ইদানিং বেশিই করছে। দীপ্রকে তো ওর স্বাস্থ্য বেশি থাকায় অবস্থায়ও খারাপ লাগে নি। গালটা একদম সাদা ধবধবে হাসের ছানার ন্যায় ছিল। দীপ্রর গায়ের রং সাদা আর লম্বা হওয়াতে ওকে সাদা ভূতও বলে বেড়াত হিয়া। হিয়া শুধাল,
“ ভেরি গুড। আমার বাসার নিচে আয়। তারপর রেস্টুরেন্টে গিয়ে পেট ভরে খাব। টাকা কিন্তু তুই পে করবি দীপ্র। ”
দীপ্র মুহুর্তেই শুধাল,
“ ঠেকা পড়ছে আমার? তুই খাবি তুই পে করবি। আমি নাই। ”
“ ছিঃ! বোনের খাওয়ার বিলও পে করত পারবি না?”
“ কোন বোন? ”
হিয়া উত্তর করল সঙ্গে সঙ্গে,
“ তোর দূর সম্পর্কের খালাতো বোন হই দীপ্র। বোনের মতোই তো। ”
দীপ্র প্রথমে চোখ ছোট ছোট করে চাইল। অতঃপর বলল,
“ শুনে খুবই খুশি হলাম। কিন্তু আমার পকেটে এই মুহুর্তে টাকার ট ও নেই যে আমি তোকে খাওয়াব রেস্টুরেন্টে নিয়ে।”
“ কষ্ট পেলাম।”
“ না করেছি কষ্ট পেতে?”
হিয়া মুখচোখ নিরাশ করে বলল,
“ ফোন রাখ বেয়াদব। ঘুম দিব আমি। ”
বিপরীতে দীপ্র শুধাল,
“ আমি আসলে তোর মুখে থাপ্পড় পড়বে হিয়া। বাসা থেকে নিচে আয়৷ আমি তোর বাসার নিচে আসছি। ”
মুহিবের হাতে একটা স্বস্তা সিগারেট। খুব যত্ন নিয়ে ও ঠোঁটে ছোঁয়ায়। অতঃপর নিকোটিনের ধোঁয়া আকাশে উড়িয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে,
“ ফুল, কেমন আছিস? জানি ভালো নেই৷ তবুও আমার সাহস নেই ফুল তোকে ভালো রাখার দায়িত্ব নেওয়ার। তোকে একবার দেখতে যাওয়ার ও সাহস নেই। যদি ভুলবাল অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হই? সেদিন তোর ভাবী যেমন প্রশ্ন করল। এই ভয়েই আমি গ্রামে যাচ্ছি না ফুল। আমি আসলে তোর অনুভূতির সত্যিই মূল্য দিইনি ফুল। সত্যিই তোকে ভালোবাসিনি। ভালোবাসলে মানুষ সর্বপ্রথম নিজের সম্মান নিয়ে ভাবতে পারে বল? যেদিন তোর ভাবী আমায় কল দিল, আমি সেদিনই টের পেলাম আমি তোকে ভালোবাসিনি ফুল। আমার যা কিছু আছে তা এক আকাশ পরিমাণ আপসোস। তোকে কেন তখন গুরুত্ব দিলাম না ফুল? এই আপসোস নিয়ে আমি আজীবন কাঁটাব কি করে? ”
রিধি পাশে এসে দাঁড়াল দুয়েক সেকেন্ড হলো। মুহিবের এমন আকাশে দিকে চেয়ে বিড়বিড় করা দেখে ও ভ্রু কুঁচকে নিল। এসেছিল রাগ ঝাড়তে মুহিবের উপর। অথচ এখন কৌতুহল জম্মাচ্ছে এই লোকের প্রতি। কি বিড়বিড় করছে এ? রিধি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
”প্রেমিকার শোকে পাগল টাগল হয়ে গিয়েছেন নাকি মুহিব ভাই? কি বিড়বিড় করছেন এমন? ”
মুহিব থেমে গেল। পাশ ফিরে চাইল রিধির দিকে। ভ্রু বাঁকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে মুখের সিগারেট ধোঁয়াটা আচমকা ছেড়ে দিল রিধির মুখের উপর। রিধি সঙ্গে সঙ্গেই নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে কেশে উঠল। অবশেষে কাশি থামিয়ে রিধি উত্তর করল,
“ মুহিব ভাই? সমস্যা কি? আপনি সবসময় আমার উপর এমন তোড়জোড় করেন কেন? ধোঁয়া কেন ছাড়লেন হ্যাঁ? কেন? ”
মুহিব উত্তর করল,
“ সবসময় আমি সিগারেট মুখে তুললেই তোমাকে আমার পাশে পাই কেন? নিশ্চয় তোমারও সিগারেটের ধোঁয়া ভালো লাগে? ”
“ মোটেই না। ”
” তো দাঁড়িয়ে আছো কেন? নাকি আমাকে ভালো লাগে? ”
রিধি মুহুর্তেই নাক মুখ কুঁচকে উত্তর করল,
” ছিঃ! আমি এসেছি রাগ ঝাড়তে।”
“ তো রাগ ঝেড়ে বিদায় হও। ”
রিধি এসেছিল কত কথা শুনাবে। অথচ গুলিয়ে ফেলেছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ও দম ফেলে শুধাল রাগী কন্ঠে,
” আমি পড়ালেখা না করলে আপনার সমস্যা কি? আমার আব্বুকে বলেছেন কেন আমি পরীক্ষায় গোল্লা পাই, পড়ালেখা করি না। আপনার সমস্যা কি হু?”
মুহিব ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়েই সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ল। বলল,
“ যেটা সত্যি ওটাই তো বললাম। সমস্যা কি? ”
“ এটা সত্যি না। ”
“ মিথ্যে?তুমি পড়ালেখা করো?”
“ আমি পড়ালেখা করি। শুধু একটা পরীক্ষাতেই গোল্লা পেয়েছি। বুঝেছেন?”
মুহিব হেসে ফেলল। শুধাল,
“ গোল্লা ইজ গোল্লাই। একটা পরীক্ষা হোক আর দশটা পরীক্ষা। ”
“আমার আপনাকে অসহ্য লাগে। ”
মুহিব এবারেও হাসল। আশ্চর্যভাবে খেয়াল করল ও, এই মেয়েটার সাথে কথা বললে তার হাসি আসে। মন ভালো হয়। প্রফুল্ল লাগে এই মেয়ের বোকা বোকা কথা শুনলে। মন খারাপ হলর এবার থেকে এই মেয়ের সাথে কথা বলা যেতেই পারে! মুহিব শুধাল,
” তোমাকে আমার খুব সহ্যকর লাগে এমনও নয়। ”
” এই যে আপনি সারাদিন সিগারেট ফুকেন। জানে আপনার পরিবার? ”
“কেন? ”
রিধি নাক মুখ কুঁচকে বলল,
” আপনি আমার আব্বুকে আজেবাজে কথা বলেছেন। এখন আমিও আপনার আব্বু আম্মুকে আজেবাজে কথা বলব। ”
মুহিব ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ কি বলবে? ”
“ এই যে আপনি কোন মেয়ের থেকে ছ্যাঁকা খেয়ে সিগারেট ফুকেন রোজ, এটাই। ”
মুহিব হাসল। বলল,
“ তুমি বোকা রিধি। এটা ছ্যাঁকা নয়। ”
“ তো কি? ”
মুহিব চুপ থাকল। অতঃপর কিছুটা সময় চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বলল,
“ আপসোস।”
“ না পাওয়ার আপসোস? ”
“ না, কাউকে সঠিক সময়ে মূল্য দিতে না পারার আপসোস। ”
“ তো এখন দেন মূল্য। ”
“ এটাও সম্ভব নয়। ”
রিধি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ বিয়ে করে নিয়েছে নাকি আপনাকে ফেলে রেখে? ”
“ হ্যাঁ। ”
রিধি যেন পৈশাচিক আনন্দ পেল এবার। একদম ভালো হয়েছে। এই লোক কষ্ট পেয়ে সমুদ্রে ভেসে যাক। পৈশাচিক আনন্দ নিয়েই বলল ও,
“একদম উচিত কাজ করেছে। ঐ মেয়েটাকে সামনে ফেলে আমি একশোটা ধন্যবাদ দিতাম গুণে গুণে। ”
মুহুর সাথে সেদিনের পর থেকে আদ্রর আচরণ বোধহয় বদলাতে শুরু করল। যাকে এতোটা ভালোবেসেছে, আদুরে পুতুলের ন্যায় যত্ন করেছে তার প্রতি আদ্রর আচরণ বদলে যাচ্ছে। আদ্র নিজের প্রতিই বিরক্ত হলো বোধহয়৷ মুহু সাতদিনের ট্যুরে গিয়েছে। কোম্পানি থেকে যাওয়া। অথচ সে একই ট্যুরে মিস্টার এহসানও গিয়েছে৷ সাত সাতটা দিন ট্যুর শেষে ফেরার পর মুহু এবার আদ্রর সাথে দেখা করে নি। আদ্র কল দিয়ে ডাকেও নি৷ তবুও আদ্র এসেছে মুহুকে দেখার জন্য। এতগুলো দিন দেখেনি বলে কথা।অতঃপর ঘন্টা দুয়েক মুহু আর আদ্রর সময়টা ভালোই কাঁটল। ফুরফুরে প্রেমিক প্রেমিকার ন্যায়। কিন্তু এর পরমুহুর্তেই মিস্টার এহসানের কল এল মুহুর ফোনে। আদ্র ভ্র কুঁচকে ফেলে৷ এত রাতে সে কেন কল করবে মুহুকে? আদ্র নিজেই শুধাল,
“ মুহু? আবার সে মিস্টার এহসান? সোজাসুজি বলো, তুমি তার প্রতি ইন্টারেস্টেড? ”
মুহুকে বিরক্ত দেখাল এই প্রশ্নে। ফোনটা কেড়ে নিল ও। আদ্র আবারও বলল,
“ আর কতবার এই নিয়ে ঝামেলা করব আমরা? পছন্দ হচ্ছে না আমাকে আর? নাকি নতুন পুরুষ দেখে চোখে লেগেছে? কোনটা? ”
মুহু তখনই জানাল,
“ আদ্র ভুল বুঝছো তুমি আমায়। ”
“ আমি যা বুঝার বুঝতে পারছি মুহু। ছোট বাচ্চা নই আমি। তুমি বলো? পুষছে না আর আমাকে দিয়ে তাই তো? কি চাইছো শিউরলি বলো। ”
মুহুকে আদ্রকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েলি গলায় শুধাল,
“ আমি তোমাকে ভালোবাসি আদ্র৷”
আদ্র তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল যেন। মুহুর চোখে চেয়ে বলল,
“ অথচ আমি স্পষ্ট দেখছি তুমি অন্য এক পুরুষকে চাইছো। ছিঃ!”
মুহুও শুধাল এবারে,
“ তুমি অন্য এক নারীকে বিয়ে করেছো। আমি মেনে নিয়েছিলাম তা তাই না? তাহলে আমার বিজন্যাস পার্টনার নিয়ে তোমার অসুবিধা হবে কেন? ”
আদ্রু ভ্রু কুুচকে বলল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১৮
“ শর্ত কি রেখেছিলে? আমার বিয়ে করা বউকে আমি ছুঁতেও পারব না। যদি ছুঁই তুমি সম্পর্ক ভেঙ্গে দিবে। বলেছিলে কিনা?”
মুহু তাচ্ছিল্য নিয়ে শুধাল,
” তোমার মতো পুরুষ বউকে ছুঁয়ে দেখেনি আদ্র? এটুকু বিশ্বাসযোগ্য? যে বিয়ের আগেই প্রেমিকাকে ছুঁতে পারে সে বিয়ের পর বউকে ছুঁয়ে দেখেনি? অধিকার থাকা স্বত্ত্বেও? ”
আদ্রর এদিকটায় নড়বড়ে হলেও ও দেখাল না৷ মুহুর গাল চেপে চোয়াল শক্ত করে শুধাল,
“ তোকর ছুঁয়েছি কারণ তুই-ই প্রথমে আমার কাছে আসতি বুঝলি? আমি প্রথমে তোর কাছে যাইনি। তুই অধিকার দিয়েছিস বলেই কাছে গিয়েছি। আর কারোর কাছে গিয়েছি? তুই আমার মতো পুরুষ বলতে কি বুঝালি? কি বুঝালি বল? ”
