বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ এবরশন করাবি না তুই মিথি? আমারই বউ হয়ে, আমারই ঘরে থেকে আমার অবাধ্য হয়ে তুই বাচ্চাটা রাখতে চাইছিস? এত সাহস তোর? এই কারণেই আম্মুকে কল দিয়েছিস? আমার সাথে বেঈমানি করছিস জা’নোয়া’র?”
বলতে বলতেই মিথির চোয়াল চেপে ধরল আদ্র। ব্যাথা জায়গায় আবারও ব্যাথা দিয়ে নিজের শক্তপোক্ত হাতের অস্তিস্ব বুঝাল। মিথি কেঁদে উঠে। ব্যাথায়, কষ্টে, ভয়ে সে কেঁদে উঠল অসহায়ের মতো। এই যে ফুফিকে কল করতে নিল, নিজের গর্ভে বাড়তে থাকা ভ্রুণটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে নিল এইটা আদ্র জেনে ফেলার পর তাকে আস্ত রাখবে? নাকি তার গর্ভে বাড়তে থাকা ভ্রুণটাকে? মিথি কেঁদে উঠে। অসহায়ের মতো করে বলতে লাগল,
“ না, আদ্র। ভুল বুঝছেন আপনি আদ্র। আমি এই জন্য কল করিনি ফুফিকে। বিশ্বাস করুন,আমি এইজন্য কল করিনি আদ্র। ”
চোয়াল চেপে রাখায় কথাগুলো স্পষ্ট শোনাল না। একটুও স্পষ্ট শোনাল না। তবুও আদ্র বুঝল। কিন্তু বিশ্বাস করল না। একটা কথাও সে বিশ্বাস না করে দাঁতে দাঁত চেপে রক্তলাল চোখগুলো নিয়ে তাকিয়ে শুধাল,
“ তুই বলেছিলি না এবরশন করাবি না? তুই বলেছিলি না তুই বাচ্চাটা রাখবি? বলেছিলি তো। কি হলে বল,বলেছিলি কিনা? ”
মিথি কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“ বলেছিলাম। ”
আদ্র বিদ্ঘুটে একটা হাসি হাসে। একটা ছোট্ট ভ্রূণ! যার কিনা এখনও কোন সক্রিয়তা নেই তার জন্য মিথি নিজের প্রাণের মায়াও করছে না? মিথি কি জানে না আদ্রর মাথায় কি পরিমাণ রাগ চাপে? রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মিথিকে মেরে ফেলাও খুব অসম্ভব নয়। আদ্র তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মিথির চোয়াল ছাড়ে। অতঃপর শুধাল,
“ বাচ্চাটার বাবা হয়ে আমার যেখানে কোন মায়া হচ্ছে না, সেখানে তোর এত মায়া কেন?জীবনের মায়াও হচ্ছে না তোর? ”
মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। শুধাল,
“ কারণ আমি মা। ”
তাচ্ছিল্যের হাসিটা আদ্রর পছন্দ হলো না। গা জ্বলে উঠে যেন। শরীরে রাগগুলো বয়ে বয়ে চলে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,
“ এবরশন তোকে করাতেই হবে মিথি। ঐ বাচ্চাটা আমি রাখব না।শুধু এই বাচ্চা কেন, তোর গর্ভে আমার কোন সন্তানেরই জম্ম হবে না মিথি। তোকে আমি আমার সন্তানের মা হতে দিবই না। ”
মিথি স্থির চাহনিতে তাকায়। তার সন্তানের মা হতে দিবে না এটাই কারণ? আশ্চর্য! এই যে “আমার সন্তান” বলছে এইটুকুতেও কি একটুও মায়া হচ্ছে না আদ্রর? একটু ও নিজ নিজ লাগছে না? আপন লাগছে না? আদ্র পিশা’চ! আদ্র নি’ষ্ঠুর! মিথি শুধাল,
“ তাহলে আমার সন্তানেরই মা হতে দিন আদ্র। আপনার বলে কখনো ওকে আপনার কাছে আসতে দিব না প্রয়োজন হলে। ছেড়ে দিন না ঐ নিষ্পাপ অস্বিস্তকে। ”
আদ্র অতো সহজ মানুষ হলে তো কথা ছিল না। আদ্র মানল না। বরং বিদ্ঘুটে হেসে উত্তর করল,
“ সে নিষ্পাপ হলেও তুই তো নিষ্পাপ নোস মিথি। তোর শাস্তিটা হলেও তাকে পেতে হবে। এবং পেতে হবে মানে সত্যিই পেতে হবে! ”
এইটুকু বলেই মিথির হাত চেপে ধরল আদ্র।টেনে রুম থেকে বের করে নিতেই মিথি আকুতি মিনতি করে আদ্রর পা জড়িয়ে ধরল। দ্রুত বলল,
“ বিশ্বাস করুন, আমি ফুফিকে এই কারণে কল করিনি আদ্র। বিশ্বাস করুন।”
আদ্র ওভাবে পা জড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই পা ঝাড়া মারে। মিথি ছিটকে যায় আরেকটু দূরে। ফলস্বরূপ কপালে আঘাত লাগে। রক্ত বের হয়ে আসে দ্রুতই। অথচ আদ্র গলল না। নিজের মতোই পাশবিক ভাবে বলল,
“ তোর মতো ছোটলোক মেয়েকে বিয়ে করাই উচিত হয়নি আমার। তোর মতো মেয়ের মাথায় কত কুবুদ্ধি ঘুরে তা আমি প্রুভ পেয়ে গেছি বুঝেছিস? আশ্রয় দিয়েছিলাম। আশ্রিতা হয়ে দিব্যি জীবন কাটাতে পারতি। কিন্তু তোর তো আরো বেশি কিছু প্রয়োজন তাই না? তাই এই প্ল্যান করেছিস! ”
“ আমায় বিয়ে করেছেন আপনি আদ্র। আশ্রিতা নই আমি। এই বাড়ির বউ আমি। ”
মিথিকে কথাটা বলতে শুনেই ধমকে বলে উঠল,
“ শাট আপ,আমি শুধু মুহুকে ভালোবাসি। মাইন্ড ইট! আমার লাইফে শুধু মুহু আছে। তুই না। ”
এইটুকু বলেই আদ্রর এক গ্লাস পানি মুহুর্তেই ডকডক করে পান করল। অতঃপর পৈশাচিক হেসে মিথির দিকে এগিয়ে এসে আবারও হাত চেপে ধরল। বলল,
“ উঠ, উঠ। এক্ষুনিই উঠবি তুই। এক্ষুনিই বের হবি বাসা থেকে। উঠ বলছি মিথি। ”
মিথি ঘাবড়াল দ্বিতীয় দফায়। বলল,
“ এতরাতে? এতরাতে আমি কোথায় যাব আদ্র? ”
“ যেখানে ইচ্ছে হয় ওখানে যাবি। আমার বাড়িতে থাকতে হলে তোকে আমার কথা অনুযায়ী চলতে হবে। আমার কথায় উঠতে হবে, আমার কথায় বসতে হবে। ”
মিথির কান্না এল দ্বিগুণ বেগে। সত্যিই তো কোথায় যাবে ও? কিছুই তো চেনে না, জানে না। কি করবে ও বের করে দিলে? কেউ তো নেই ও বাড়িতে। মিথি ঠোঁট কাঁমড়ে বলার চেষ্টা করল,
“ আদ্র…”
আদ্র টেনে উঠাতে চেষ্টা করে। বলল,
“ স্টপ! এবরশন করাবি নয়তো বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। ”
“ এতরাতে কোথায় যাব আমি আদ্র? আমি, আমি তো কিছু চিনি না..”
আদ্র হেসে উঠল উল্লাস করে। মিথির এই অসহায় রূপটারই অপেক্ষায় ছিল বোধহয় ও। অতঃপর হেসে শুধাল,
” থাকতে দিব তোকে? তোর মতো ছোটলোককে থাকতে দিব আমার বাড়িতে?”
মিথি উত্তর করল না। আদ্রর ততক্ষনে মিথিকে টেনে তুলেছে। শক্তপোক্ত হাত দিয়ে মিথির হাতটা চেপে ধরে বলল,
“ চল, এবরশন করাবি। এখনই। ”
মিথির কন্ঠ কাঁপে। কি বলছে? মিথি আটকাবে কি করে? কোনভাবে বলল,
“ ক্ কি? ”
আদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে বলল,
“ আমার আর তোর যে বেবিটা পৃথিবীতে জম্মাবে বলে তুই উৎফুল্ল হচ্ছিস তাকে শেষ করব, এখনই, আজই! চল… ”
এইটুকু বলেই টেনে হিঁছড়ে মিথিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল আদ্র। মিথি পারে না ওর শক্তির সাথে। তবুও চেষ্টা করল আটকানোর। ভাঙ্গা গলায় বলার চেষ্টা করল,
“ আদ্র, আদ্র…
“ আদ্র, আমি যাব না। যাব না,।আদ্র প্লিজ শুনুন না আদ্র,,
“ আদ্র, প্লিজ আমার কথাটা শুনুন না আদ্র। এটা আমাদের প্রথম বেবি। আপনার আর আমার প্রথম বাচ্চা আদ্র। আমার প্রথম বাচ্চা আদ্র। ”
আদ্র টেনে হিঁচড়ে সোজা মিথিকে নিয়ে বাসার বাইরে এল। দরজা লক করতে করতে হিসহিসিয়ে বলল,
“ জাস্ট শাটআপ!
“ আদ্র, একটাবার শুনুন, একটাবার…
“ কি শুনব? কি শুনব আমি? তোকে না চাইতেও বউ করেছি। বিয়ে করেছি। এটুকু এনাফ। কিন্তু তুই আমার বাচ্চার মা হবি এই কথাটা মুহু পর্যন্ত গেলে মুহু আমায় ছেড়ে দিবে মিথি। আমি মুহুকে পাগলের মতো ভালোবাসি। তুই আন্দাজও করতে পারবি না ওকে আমি কতোটা ভালোবাসি মিথি!”
মিথি নিরবেই তাকায় এবার। মুহুর পরিচয় পেয়ে তার কষ্ট হচ্ছে না। একটুও দুঃখ হচ্ছে না। সে শুরু থেকেই জানে আদ্রর কাছে সে কেবল ভোগ্য বস্তু। ভালোবাসা না। অথচ কষ্ট হলো এই ভেবে যে আদ্রর ভালোবাসা কত স্বস্তা! ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সে শুধাল,
“ এতোটা ভালোবাসার পর ও অন্য একজনকে রাতের পর রাত নিজের শরীরে জড়িয়েছেন। ছুঁয়েছেন! আপনার মুহু এসব জানে আদ্র? ”
আদ্র তীক্ষ্ণ চাহনিতে চায়। ভ্রু বাঁকিয়ে মিথির দিকে এমনভাবে তাকায় যেন এক্ষুনিই মে’রে ফেলবে। বলল,
“ স্টপ! তোকে বিয়ে করেছি, তোর শরীরের উপর আমার অধিকার ছিল। তুই, তুই দেখতে সুন্দর বলেই আমি তোকে রাতের পর রাত কাছে টেনেছি। এইছাড়া আর কিচ্ছু না। আমি এতোটা নির্বোধ বা পৌরুষহীন নই যে মেয়ে পাশে নিয়ে শুঁয়েও স্থির ঘুমিয়ে থাকব! ”
মিথি শুনল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ কাপুরুষ! ”
আদ্র শুনল না স্পষ্ট। তবুও বোধহয় বুঝল।মিথির চুলগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে টেনে ধরল। রাগের সহিত বলল,
“ কি বললি? কি বললি তুই? ”
মিথি এবারে ব্যাথায় প্রতিক্রিয়া দেখাল না। উল্টে বলল,
“ ছাড়ুন, চলুগুলো ছাড়ুন আদ্র। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে এত উঠে পড়ে লেগেছেন কি শুধু মুহুর জন্যই? শুধুই প্রেমিকার জন্য? ”
“তোকে বলতে রাজি নই আমি। ”
ভীতু মিথির আজ বোধহয় সাহস হলো। আবারও বলল,
“ ও অবৈধ নয় আদ্র। ও বৈধ! ওর বাঁচার অধিকার আছে। ওর ও দুনিয়ার আলো দেখার অধিকার আছে আদ্র! ”
আদ্র এবারে স্রেফ মিথির গলা চেপে ধরল। শক্তোপোক্ত হাত দ্বারা গলা চেপে রেখে বলল,
“ আমি চাইলে ওর সঙ্গে সঙ্গে তোকেও মেরে ফেলতে পারি মিথি। তুই ভালোভাবেই জানিস এটা অসম্ভব না। এবার বল,মেরে ফেলব? মেরে ফেলব তোকে? ”
মিথি তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। কোনরকমে উত্তর করল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১
“ এই জীবনটাও যে আমার খুব একটা চাওয়ার আপনাকে কে বলল আদ্র? মে’রে ফেলুন। ”
“ তোকে মা’রা যাবে না শুধু আম্মুর জন্য। নয়তো বিয়ের রাতেই তুই শেষ হয়ে যেতি মিথি। ”
এইটুকু বলেই গলাটা ছাড়ল আদ্র। পুণরায় হাত টেনে সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নামাল মিথিকে। জোর করে গাড়িতে তুলল। অতঃপর গাড়ি চালাতে নিয়ে বলল,
“ এই কাহিনীর সমাপ্তি আজই হবে মিথি। আমিও দেখব তুই কিভাবে ঐ সন্তান তোর গর্ভে রাখিস। ”
