Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৯

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৯

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

নিজের তিন কবুল বলা স্ত্রীকে যেখানে পরপুরষের সাথে জড়িয়েছে আদ্র,নিজের সন্তানকে অন্যের সন্তান বলে দাবি রেখেছে সবটা জেনেও সেখানে আদ্রর মুখে কোন অনুশোচনার ছায়া দেখা গেল না মিথির কথা শুনে। ও বিশ্বাসই করে না ওর এই কাজের জন্যও ও ফল পেতে পারে বলে। একদিন আপসোস করবে এটাও যেন ওর কাছে হাস্যকর। আদ্রর মুখে কতোটা দম্ভ একটা মেয়ের জীবন শেষ করেও। আদ্র ঠোঁট এলিয়ে হাসল। ব্যঙ্গ করে বলল,
“ সে সময়টা কখনই আসবে না মিথি যখন আমি আপসোস করব। আমি বরং বেঁচে যাচ্ছি। তুই চলে গেলে আমার পথটা ক্লিয়ারই। আরামে মুহুকে নিয়ে সংসার করতে পারব মিথি। ইশশশ, আগে জানলে আমি আমি প্র্যাগনেন্সির এই টোপটা ইউজ করে তোর চরিত্রের দোষ দিতাম। অথচ শুরুর দিকে আমি তোর এই প্র্যাগনেন্সি কি ভয় পেয়ে গেলাম, ভাবলাম মুহু জেনে যায় যদি? জেনে গেলেই তো বুঝে যাবে যে আমি তোর সাথে ফিজিক্যালি ইনভলব্ড ছিলাম।অথচ হলো উল্টোটা। তোকেই এখন চলে যেতে হচ্ছে। আসলে উপরওয়ালা যা করে ভালোর জন্যই করে বল? ”

মিথির ঘৃণা লাগে এই পুরুষটার কথা শুনতে। এই পুরুষটার দিকে তাকাতেও ঘৃণা হয়। অথচ রূপের দিক দিয়ে এই পুরুষ কতোটাই সুদর্শন। তাকালেই চোখ জুড়িয়ে যায় এমন সৌন্দর্য তার। চোখ, নাক, ভ্রু সবই নজরকাড়া। এমনকি শিক্ষা? এই পুরুষটা অতিশিক্ষিতও। কিন্তু দিনশেষে ফলাফল কি হলো? এই পুরুষটার মধ্যে সব আছে৷ রূপ আছে, শিক্ষা আছে, অর্থ আছে। শুধু নেই মনুষত্ব্যটা। মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। জবাবে বলল,
“ বউ এর সাথে ফিজিক্যালি ইনভলব্ড ছিলেন জেনে যে প্রেমিকাকে হারানোর এতোটা ভয় সে প্রেমিকাকে হারানোর ভয়টা চিন্তা করে আগেই বউএর থেকে দূরত্ব মেইনটেইন করলে তো হতো আদ্র। নাকি কামনার কাছে ভালোবাসা নত হয়ে যেত রাতের আঁধারে? ”
আদ্রর মুখেচোখে তখনও দম্ভ, অহংকার। মিথির তাচ্ছিল্য নিয়ে বলা কথাটা যেন ও গায়েই মাখল না। উল্টে বেশ দাম্ভিকতার সহিত বলল,

“ মুহুকে আমি সত্যিই ভালোবাসি। মন থেকে ভালোবাসি। কিন্তু তুই ছিলি শুধুই আমার শারিরীক চাহিদা। ভালোবাসা না। বুঝলি? ”
“ আপনার মতো বিকৃত মানসিকতার পুরুষের ভালোবাসা হওয়ার ইচ্ছেও নেই আদ্র। ”
এটুকু বলেই মিথি ফের ঘরে গেল। সবকিছু বের করে নিয়ে, নিজে তৈরি হয়ে যখন বের হলো তখন ড্রয়িং রুমের সোফায় আদ্রর দাদী বসা। মিথিকে এভাবে ব্যাগপত্র গুঁছিয়ে আসতে দেখেই ভদ্রমহিলা সর্বপ্রথম ভ্রু কুঁচকালে। পরমুহুর্তে গাল কুুঁচকালেন। ভ্রু বাঁকিয়ে বললেন,
“ কিরে? যার বাচ্চা পেটে নিয়া ঘুরতাছস তার সাথেই পালাইয়া যাইতাছস নাকি ব্যাগপত্র নিয়া? যাক আপদ গেলে আমরাই বাঁচি।”
মিথি শুনল। এই কয়েকটাদিন দাদী নামক মানুষটা এক নাগাড়েই বলে যাচ্ছেন সে চরিত্রহীন, তার বাচ্চা অন্যের, তাকে বিয়ে করে তার নাতির জীবনটা শেষ এইসেই। মিথি উত্তর করতে চায়নি।তবুও আজ উত্তর করল ও। হেসে বলল,

“ দাদী, এই যে আপনি দিনরাত এতবার করে মারা যাচ্ছেন? আমায় দেখে শ্বাস নিতে পারছেন না? এই জন্য ভাবলাম, আপনার বেঁচে থাকার জন্য হলেও আমার পালিয়ে যাওয়া উচিত। কি বলেন হুহ? ”
দাদী মুখচোখ কুঁচকালেন। তীব্র বিরক্তি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“ কত বড় বেয়াদব দেখছস? আমার মুখে মুখে ও কথা কইতে আসে। ”
মিথি আবারও হেসে বলল,
“ কথার উত্তর দেওয়াকে তো আমি ভদ্রতাই মনে করি দাদী। আপনি কি অভদ্রতা মনে করো?”
দাদী এবার ক্ষেপল যেন। চোখ রাঙ্গিয়ে বলল,
“ এই, তোর ঐ প্রেমিকই এসব সাহস দিচ্ছে না? নয়তো এতদিন তো মুখে বোমা মারলেও আটা বের হয় না এমন হয়ে পড়ে থাকতি। ”

“ অথচ তখনও আপনাদের চোখে ভালো হতে পারিনি। এখনও ভালো না। ”
আদ্রর মা এল তখন বাইরে থেকে। দুইজনকে এসব নিয়ে কথা বলতে দেখে শুধাল,
“ কি হচ্ছে আম্মা? ওর সাথেই এভাবে লাগেন কেন?”
উনি অসন্তুষ্ঠ হলেন বোধহয় ছেলের বউ এর উত্তরে। জবাব দিলেন,
“ লাগব না? ওরে তোমাদের মতো কইরা মাথায় তুইলা রাখব আমি? নষ্টা চরিত্রের মেয়েমানুষ কোথাকার। ঘরে স্বামী রেখে কোন পোলার সাথে কি কি করছে আল্লাহ জানে। ”
মিথি তাকাল। নিজের চরিত্রের দোষ নিতে নিতে ও ক্লান্ত।শুধাল,
“ দাদী? ঘরে স্বামী রেখে অন্য পুরুষের সাথে কিছু করলে নাহয় নষ্টা চরিত্রের মেয়ে সে। কিন্তু ঘরে বউ রেখে অন্য মেয়ের সাথে কিছু করলে সে পুরুষকে কি বলা হয় দাদী? মহান পুরুষ? ”
দাদী মুখ ভেঙ্গালেন। বললেন,
“ পুরুষ মানুষ পুরুষ মানুষ। তুই কি পুরুষ মানুষ নাকি? একে চরিত্র খারাপ আবার মুখে কথা ফুটেছে। ”
আদ্রর মা এবার বিরক্ত হলো। শ্বাশুড়ির দিাে চেয়ে শুধালেন,
“ আম্মা, মুখ থামান। ওর পেছনে কেন আপনার এত কথা বলতে হবে? আশ্চর্য! ”
উনি মুখ থামালেন না। আবারও বললেন,

“ হ,সবাই মিইলা মাথায় উঠাইছো দেইখাই তো এহন এমন করছে। মুখের উপর চুনকালি দিয়ে চইলা যাইতেছে। সবাই কইব ডা কি? চৌধুরী বাড়ির ছেলের বউ আরেক পোলার লগে…”
“ থামুন, এক কথা বারবার শুনতে ভালো লাগছে না আম্মা। আর আপনার নাতি যা বলে তাই বিশ্বাস করা বন্ধ করুন বুঝলেন আম্মা? আপনার নাতি ও একদম ধোঁয়া তুলসীপাতা নয়। ”
এটুকু বলেই আদ্রর মা মিথির দিকে চাইল। ব্যাগপত্র সব ওভাবে দেখে যা বুঝার বুঝেই গেলেন বোধহয় উনি। ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ মিথি, এদিকে আয়। তোর সাথে কথা আছে আমার। ”
মিথি চাইল। বোধহয় কি বলবে তা তার ধারণাতেই আছে। তাই বলল,
“ থেকে যাওয়ার কথাই তো বলবে তাই না? ”
উনি ক্লান্ত গলায় বলল,

“ আরেকবার ভাবা যায় না মিথি? এই অবস্থায় এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হচ্ছে? ”
“ আমার তো মনে হয়, এটার থেকে উচিত আর কোন কাজই হবে না ফুফি। ”
“ এমনিতে তো আলাদা রুমে থাকছিস মিথি।তুই বলাতে করে দিয়েছি না আলাদা থাকার ব্যবস্থা?তবুও.. ”
“ অথচ আলাদা ঘরে থেকেও লাভ কি? তোমার ছেলের কারণে আমি নিরাপদ অনুভব করছি না তো ফুফি। এর থেকে ভালো আমার গ্রামের বাড়িটাই। শান্তিতে তো থাকব বলো? ”
“ তাহলে চলেই যাবি? অন্তত তোর ফুফা আসুক। কথা বলে তারপর নাহয়… ”
মিথি হেসে শোনাল,
“ ফুফা বুঝবেন আশা করি আমার অবস্থাটা।”
“ আচ্ছা যা, ভালো কথা। আমি গিয়ে আবার নিয়ে আসব হ্যাঁ? তখন কিন্তু না করবি না। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ আমি আর ফিরতে চাই না এ বাড়িতে ফুফি। এমনকি,তোমার ছেলের সাথে জুড়ে যাওয়া সম্পর্কটাও আমি মুঁছে ফেলতে চাই ফুফি। তোমার ছেলের নামের অংশটাও আমার নাম থেকে মুঁছে ফেলতে চাই। আমি ঘৃণা করি তাকে।”

“ এতোটাই ঘৃণা? ”
“ হ্যাঁ, এতোটাই ঘৃণা। উনার মতো মানুষদের শুধু ঘৃণাই করা যায় ফুফি। শুধু এবং শুধু ঘৃণাই! ”
আদ্র মা অবাক হলেন না কথা শুনে। তার ছেলে যা করেছে তাতে বোধহয় এটাই প্রাপ্য তার। বলল,
“ বাদ দে, একটু বস।একা তো যেতে দিব না তোকে মিথি। আমারও শরীরটা খারাপ৷আদ্রকেই বলতাম। কিন্তু তোদের সম্পর্কটা তো ঠিক নেই এখন। তার চেয়ে বরং তোর ফুফা এসে নিয়ে যাক। ”
মিথি সঙ্গে সঙ্গে না করে বলল,
“ না, প্রয়োজন নেই ফুফি। আমি বাসে উঠিয়ে দিলে গ্রামে চলে যেতে পারব। তুমি আমায় বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসতে পারবে? ”
“ আমি তোকে একা ছাড়তে চাই না মিথি এই অবস্থায়। কেউ গেলে ভালো হতো না? ”
“বাস পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়ে এলেই হবে। ”
আদ্রর মা চিন্তা করলেন। অতঃপর উশখুশ করে বললেন আবারও,
“ তোর ফুফা নাহলে আদ্রকে বলি দিয়ে আসতে মিথি? ”
মিথি আবারও নাকোচ করে বলল,
“ না, ফুফি। দয়া করে আমায় সবকিছুতে এতোটা মূল্যহীন বানাবে না ফুফি।
অতঃপর আদ্রর মাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। শরীর সুস্থ না থাকায় অতদূর যেতে না পারলেও মিথিকে বাস অব্দি ছেড়ে দিয়ে আসল। এমনকি বাস ছাড়ার আগ মুহুর্ত অব্দি মিথির দিকে চেয়ে থাকল চিন্তিত ভঙ্গিতে, ঠিক যেভাবে তাকিয়ে থাকে মায়েরা।

মিথি যখন বাস থেকে নামল তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। শীতকাল হওয়ায় দ্রুতই আঁধার নামে যেন। মিথি আশপাশে তাকায়। এটা গ্রামের বাজার। এখান থেকেই সি এনজি নিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে হবে তাকে। অথচ শারিরীক দুর্বলতায় অথবা এতোটা সময় জার্নির জন্যই বোধহয় শরীর গুলিয়ে উঠছে তার। বমি বমি ভাব লাগছে। চোখমুখ ও ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যেই। মিথি হাতের দু দুটো ব্যাগ নিয়ে যখন বাজারে একপাশে দাঁড়াল তখনই মনে হলো ও শরীরের ব্যালেন্স হারাবে। চোখমুখ আঁধার হয়ে আসতেই ও ব্যাগপত্র ছেড়ে বসে পড়ল। ব্যাগ হাতড়ে পানির বোতলটা নিতেই পাশ থেকে শুনতে পেল,
“ এই, তুমি মিথি না? মাহমুদ ভাইয়ের বোন না তুমি? শুনছো? এভাবে বসে আছো কেন?”
মিথি কিছুটা পানি খেয়ে বাকিটা চোখমুখে দিল। কন্ঠ শুনে মাথা তুলে উপরে চাইল। পাশের বাড়ির আলোক ভাইয়ের বউ। নাম বোধহয় স্নিগ্ধা। অথচ উনারা তো শহরে থাকতেন। এখানে? এখানে কেন তবে? মিথি তাকাল। মুদুস্বরে জবাব দিল,
“ আসসালামুআলাইকুম ভাবী, কেমন আছেন? ”
স্নিগ্ধা হাসল। মিষ্টি করে বলল,

” গ্রামের আবহাওয়া পেয়ে একদম ভালো আছি। তোমাকে বাসে দেখলাম অনেকটা সময় যাবৎ। একাই তো এসেছো তাই না? ”
মিথি মাথা নাড়াল। জবাবে বলল,
“ হ্যাঁ।একাই এসেছি। ”
“ তোমার বোধহয় অসুস্থ লাগছে মিথি। চোখমুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে। ”
মিথি উত্তর করল,
“ একটুআধটু। ”
স্নিগ্ধা আবারও জানতে চাইল,
“ একা যেতে পারবে বাড়ি? নয়তো আমাদের সাথে চলো। একই সাথেই তো বাড়ি আমাদের। ”
“ একা পারব ভাবী। ধন্যবাদ। ”
স্নিগ্ধা মানল না। বরং বলল,
“ মোটেই পারবে না। আমাদের সাথেই চলো।”

মিথি এবারে না করল না। ওদের সাথেই উনাদের ভাড়া করা একটা সিএনজিতে উঠল। স্নিগ্ধা, স্নিগ্ধার বোন আর মিথি পেঁছনে বসল। সিএনজির সামনে বসল হিমেল। এই গ্রামেরই ছেলে এ এবং সম্পর্কে স্নিগ্ধার দেবর। স্নিগ্ধা হিমেলের দিকে চাইল। সিএনজির সামনের দিকে বসতে অসুবিধা হচ্ছে কিনা তা জানতে জিজ্ঞেস করল,
“ হিমেল, বসতে অসুবিধা হচ্ছে তোমার? ”
মিথি এবারে চাইল। হিমেল ভাইকে সে খেয়ালই করেনি এতোটা সময়। মিথির এবারে খারাপ লাগল। সে যে সিটটায় বসেছে এটা বোধহয় হিমেল ভাই এর জন্য বরাদ্ধকৃত। সে বসাতেই বোধহয় হিমেলকে সামনে বসতে হলো। মিথি উশখুশ করল।অতঃপর কি বুঝে নেমে গিয়ে বলল,
“ হিমেল ভাই এর বোধহয় অসুবিধা হচ্ছে ভাবী। আমি অন্য সিএনজিতেই যেতে পারব। আপনারা যান। ”
হিমেল ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিল কেমন করে। মিথির দিকে চেয়ে রাশভারী স্বরে শুধাল,
“ তোকে বললাম আমি অসুবিধা হচ্ছে? ভাবী? ওকে বসতে বলো। ”
হিমেল বরাবরই কেমন গম্ভীর। এই গম্ভীর কন্ঠের উপর বোধহয় আর কিছু বলা যায় ও না। অগত্যা স্নিগ্ধার কথাতে আবারও উঠতে হলো মিথিকে। তারপর হিমেলদের বাড়ির সামনে স্নিগ্ধা আর ওর বোন নেমে গেল। এর পরই মিথিদের বাড়ি। স্নিগ্ধাদের ব্যাগপত্র সহ ঘরে দিয়ে এসে হিমেল আবারও এসে সামনে বসল। সিএনজি এবার মিথিদের বাড়ির সামনে থামল। হিমেল চুপচাপ নামল। কোন কথা না বলে ভাড়া মিটাল। অতঃপর আগ বাড়িয়ে মিথির ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে পা বাড়াতেই মিথি বলল,

“ হিমেল ভাই, আমিই নিচ্ছি আমার ব্যাগপত্র। দিন,আমি নিতে পারব। ”
হিমেল ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। গম্ভীর কন্ঠে জানাল,
“ জানতে চেয়েছি মিথি? হাঁট তুই। ”
মিথির মুখ চুপসে যায়। হিমেল ভাই ছোট থেকেই এমন কিনা জানে না সে, তবে মিথির ধারণা হিমেল ভাই তাকে পছন্দ করে না। সম্ভবত এই কারণেই আগে থেকেও এমন গম্ভীর ভাবে কথা বলত। মিথি চুপচাপ হাঁটল। ঘরের সামনে গিয়ে হিমেল চুপচাপই ব্যাগপত্র রেখে আবার চলে গেল। মিথি বুঝলই না এই হিমেল ভাই অদ্ভুত? নাকি অন্যরকম? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে নিজেই ঘরে ডুকল। প্রথমেই তার ভাইকে চোখে পড়ল। মিথি ভাবল তার ভাই এগিয়ে আসবে, কেমন আছে জানতে চাইবে। অথচ তেমন হলো না। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“ একি মিথি? তুই? বলেছিলাম না আমি যাব? তুই কেন নিজে নিজে আসতে গেলি? আশ্চর্য। ”
মিথি হাসল। ভাই বোধহয় খুশি হলো না সে আসাতে। তবুও উপায় যে ছিল না ওর। আরো কোথায় বা যেত ও? মিথি বলল

“তুমি তো যেতে না ভাইয়া, জানতাম আমি।”
তার ভাই, মাহমুদ তার আগপিছে চাইল। সাথে কেউ এসেছে কিনা সেজন্য। যখন দেখল কেউ নেই জিজ্ঞেস করল,
“ একাই এসেছিস? ”
“ হ্যাঁ, একাই এসেছি। ”
মাহমুদের নজরটা এবাে বোধহয় তার হাতের ব্যাগপত্রের দিকে গেল। এত বড়বড় ব্যাগ। মনে হচ্ছে জামাকাপড় সব নিয়ে চলে এসেছে। নিশ্চয় এমনি এমনি নয়? মাহমুদ কপালটা সামন্য কুঁচকেই বলল,
“ ব্যাগপত্র সব নিয়ে? ওদিকে সব ঠিকঠাক আছে না মিথি? ”
মিথি হাসে। ভাই এর চিন্তাটা বোধহয় ও খুব সহজেই বুঝে গেল। বলল,
“ হ্যাঁ, সব ঠিকঠাক। তুমি ভয় পাচ্ছো নাকি ভাইয়া? এ বাড়িতে থেকে যাব বলে? ”
“ ভয় পাওয়ার কি আছে। ”
“ আমি যদি একেবারে চলে আসি থাকি তবুও ভয় পাবে না? ”
“ আহ মিথি, ভালোই মজা করছিস দেখছি। ফুফুরা আসেনি কেন? তোকে একা পাঠাল হঠাৎ?”
মিথি এবারেও হাসল। এতোটা সময় পরও তার আপন ভাই, একমাত্র বড়ভাই একটাবার সে কেমন আছে এটা জিজ্ঞেস করল না। অথচ একা কেন এল, এত ব্যাগপত্র নিয়ে কেন হাজির হলো এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। উত্তর করল,

“ ফুফুদের ব্যস্ততা ছিল তাই। ভাবীরা নেই? ”
“ আছে। ভেতরে যা। ”
মিথি ভেতরে গেল। ভাবীকে বিছানায় হাত পা মেলে বসে থাকতে দেখে হেসে এগোতে নিবে ঠিক তখনই মুখচোখ কুঁচকালেন তার ভাবী তাহিয়া। ভ্রু কুঁচকে প্রথমেই শুধাল,
“ একি মিথি, ব্যাগপত্র সব নিয়ে একেবারে একা একা আচমকা বাড়ি হাজির হয়ে গিয়েছো? কি ব্যাপার? একেবারে পাঠিয়ে দিল নাকি তোমায়? ”
মিথি হেসে উত্তর করল,
“ ভাইয়া না বললেও তুমি যে ঠিক কথাটা ঠিক সময়ে বলে ফেলবে জানতামই ভাবী। ”
তাহিয়ার কপাল আরে কুঁচকাল। সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ ঠিক কথা মানে? সত্যি সত্যিই বের করে দিয়েছে নাকি? ”
মিথির ইচ্ছে হলো ভাবীর সাথে কথা বাড়াতে। ক্লান্ত লাগছে তার। সত্যিই ক্লান্ত লাগছে। গা গুলাচ্ছে। কথা না বাড়িয়ে ও বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৮

“ একটু রেস্ট করি ভাবী? তারপর নাহয় তোমার প্রশ্নের উত্তর দিব হুহ? ”
মিথির ভাবী খুবই নিরাশ হলো যেন। হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে স্বামীকে দেখামাত্রই মুখচোখ কুঁচকে বলল,
“ দেখো গিয়ে সত্যি সত্যিই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আশ্চর্য! মিথিরে যতই না দেখতে পারি কিন্তু মিথি তো স্বামীর সংসার থেকে বের করে দেওয়ার মতো মেয়ে না। কোন দোষে বের করল বলো তো? এখন যদি আমার সংসারে উঠে বসে থাকে কি করব?আজীবন তোমার বোনকে ঘাড়ে বয়ে নিয়ে চলব নাকি? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ১০