Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সামনের দৃশ্যটা দেখামাত্রই বুকটা কেঁপে উঠল ওর।
​পাগলের মতো ছুটে এসে সে মারিশাকে মেঝে থেকে তুলে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আশফির চোখেমুখে তখন চরম আতঙ্ক, “মাহি! কী হয়েছে তোমার? অ্যাই তাকাও আমার দিকে!”
​মারিশার মুখটা দুহাতে তুলে ধরে দিশেহারা গলায় জিজ্ঞেস করতে লাগল, “এত কাঁদছ কেন তুমি? কী হয়েছে বলো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? পেইন হচ্ছে কোথাও?”

​কোনো উত্তর দিতে পারল না মারিশা, আশফির বুকের সাথে মিশে নীরবে কাঁদতে লাগল শুধু। কিন্তু ওর এই বিধ্বস্ত দশা দেখে আশফির ভয়টা আরও বাড়তে লাগল। তারপরই হঠাৎ মনে পড়ল ওর গতরাতের সেই উদ্দাম মুহূর্তগুলোর কথা। যার জন্য মেয়েটার রক্তক্ষরণ হয়েছিল। সেই ধকলটাই কি মেয়েটা সইতে পারছে না?
মুহূর্তেই ​নিজের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হলো আশফির। কী একটা জানোয়ারের মতো আচরণ করেছে কাল! একবারও খেয়াল হলো না যে মারিশার কোনো কষ্ট হচ্ছে কিনা! শুধু নিজের পাশবিকতা নিয়েই মেতে ছিল সে কেমন করে?
​প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগতে লাগল সে৷ মারিশার কপালে গভীর একটা চুমু খেয়ে বলল, “আমি নিজেই নিজেকে মাফ করতে পারছি না এখন। তবু বলছি, সোনা। আমাকে মাফ করো প্লিজ? আমি সত্যিই বুঝিনি তোমার এতটা কষ্ট হচ্ছে।”

​ওকে সযত্নে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় বসাল সে। কিন্তু বুকের কাছ থেকে সরাল না৷ ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে নরম আদরে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল সে, “একটু বসো, আমি রিসেপশনে ফোন করি। ওদের এখানে নিশ্চয়ই ভালো কোনো পেইনকিলার আছে। ওষুধটা এখনই পাঠিয়ে দিতে বলি।”
ইন্টারকমের দিকে সে পা বাড়াতেই মারিশা কোনোমতে নিজের ভেতরের বিষাক্ত হাহাকার আর মনের ভয়াবহ দহনটুকু চেপে রাখল। সঙ্গে সঙ্গেই আশফির হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে, কান্নার তোড়ে বুজে আসা গলায় সে মৃদুস্বরে বলল, “না… তুমি কোথাও যাবে না। তুমি ব্যস্ত হয়ো না এত। আমার কাছে সাধারণ পেইনকিলার আছে, আমি সেটা নিয়ে নেব। প্তুমি দিশানের কাছে যাও … দেরি হয়ে যাচ্ছে তোমার।”
ওর ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে আশফি বেশ দৃঢ় গলায় বলল, “ওকে রিসিভ করা থেকেও তোমার কাছে থাকাটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। ওকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমার।”
মারিশা এবার নিজেকে একটু সামলে নিল। চোখের জল মুছে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমাকে নিয়েও এখন এত কনসার্ন হওয়ার কিছু নেই। আর মানুষটা দিশান না হলে আমি নিজেই তোমাকে আটকাতাম। আমি এখন ফ্রেশ হয়েই ভাইয়ার কাছে যাব। ব্রেকফাস্ট করে মেডিসিন নিয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাব আমি। তোমাকে টেনশনে থাকতে হবে না, তুমি যাও এখন। প্লিজ!”

​আশফি তখন কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় ভুগল। মারিশার চোখেমুখে এমন এক অটল জেদ ফুটে উঠেছে যে, আর কথা বাড়ানোই বৃথা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে পকেটে ঢুকাল৷ ফোনটা নিতেই তখন ফিরে এসেছিল সে। তারপর মারিশার কাছে এগিয়ে এসে ওর গালে আর ঠোঁটে আলতো করে দুটো চুমু খেয়ে খুব কোমল স্বরে বলল, “ওকে। বের হচ্ছি তাহলে। তবে কোনো দরকার হলে সাথে সাথেই আমাকে কল করবে। আর বাকি মেডিসিনগুলোও খেয়ে নিয়ো।”
নীরব সম্মতিতে মাথাটা একবার নাড়াল মারিশা। আশফি তখন ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু চৌকাঠের ওপর পা রেখেও কেন যেন শেষবারের মতো একবার স্থির হয়ে দাঁড়াল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে যখন মারিশার দিকে তাকাল, ওর অবচেতন মন বারবার জানান দিতে লাগল, মারিশার ওই আকুল কান্নার উৎস কেবল শরীরের যন্ত্রণায় নয়। কোনো এক নিদারুণ দহন মেয়েটা সযত্নে লালন করছে নিজের ভেতরে, যা তাকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে।

তার ওই চাহনি আর মেকি হাসির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতা আশফির কাছে বড়ো বেশি স্বচ্ছ। এই পৃথিবীতে যদি কাউকে সে বিন্দুমাত্র ভুল না করে চিনে থাকে, তবে সে এই মারিশা বারিশ সুলতানই। মেয়েটা নিজেকে যতটুকু চেনে, আশফি তাকে চেনে সম্ভবত তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি।
​কিন্তু কী এমন নিগূঢ় মনস্তাপ মারিশা আড়াল করতে চাইছে? কেন আড়াল করতে চাইছে? সে যে চাতকের মতো অপেক্ষায় আছে, কখন মেয়েটা তার সমস্ত জড়তা ভেঙে সবটুকু কষ্ট উগরে দেবে ওর কাছে!
​বুকের ভেতর থেকে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল আশফির। মারিশার দিকে ও যখন চাইল, ওর দৃষ্টিতে তখন রাজ্যের উদ্বেগ আর অতল মায়া মাখানো। ওর দুশ্চিন্তাটুকু বুঝতে পেরে মারিশা তখন ঠোঁটের কোণে ম্লান এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ওকে আশ্বস্ত করার বৃথা চেষ্টা করল৷ ইশারায় বুঝিয়ে দিল, সে যেন এবার বিদায় নেয়।
​আশফিও আর দাঁড়াল না এরপর। দরজার ওপাশে তার পায়ের শব্দ করিডোর ধরে ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যখন একসময় মিলিয়ে গেল, ঠিক তখনই মারিশার সেই মেকি হাসির মুখোশটা খসে পড়ল। পুরো ঘরটা যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। আর সে শূন্য দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল এখন আর বাধার প্রাচীর মানছে না। নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর গ্লানি আর বর্তমানের এই ভালোবাসার টানাপোড়েনে ও যেন ক্রমশ এক নিঃসীম আঁধারে ডুবে যাচ্ছে।

​বিছানায় গুটিসুটি মেরে বসে মারিশা ভাবতে লাগল, অতীতের সেই দিনগুলোতে ও যা করেছিল, তা কি সত্যিই খুব বেশি ঘৃণিত ছিল? নিজের অস্তিত্বকে, পঙ্গু করে দেওয়া বাবাকে আর তিল তিল করে গড়ে তোলা এজেন্সিকে ডেনিজ আর সেলিনের মতো হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ওর সামনে আর কোনো পথ কি খোলা ছিল?
​সত্যি বলতে, ও তো কারোর কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়নি, নিজের সতীত্ব বিকিয়ে দেয়নি। কিন্তু আশফির বিশ্বাসের সেই নিষ্কলঙ্ক গুরাস হয়েও তো থাকতে পারেনি। সতীত্ব অটুট থাকলেও এই শরীরের খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ তো তখন অনেক পরপুরুষই পেয়েছিল। সে সুযোগ ও নিজেই করে দিয়েছিল নিজের স্বার্থে। আজ পেছনের কথাগুলো শুনলে ওর নিজেরই বিশ্বাস হয় না যে, ও কীভাবে অমন নোংরা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল! ভাবতেই ঘেন্নায় নিজের শরীরটা রি রি করে উঠল ওর, ওই লোলুপ দৃষ্টির পুরুষগুলোর পাশে নিজেকে কতটা সহজলভ্য করে তুলেছিল ও — যাতে শরীরের লোভে তারা ওর হাতের পুতুল হয়ে নাচে।

সেই সময়কার ওই দ্বৈতসত্তার মানসিক ব্যাধিটা ওকে এক ভয়ংকর আর দুঃসাহসিক পাপী মানুষে রূপান্তরিত করেছিল … নিজের ভেতরে তখন অন্য এক মারিশার জন্ম হয়েছিল, যে লক্ষ্য অর্জনে কোনো ঘৃণ্য পথ বেছে নিতে দ্বিধা করেনি। আজ সেই ব্যাধি, সেই দ্বিতীয় সত্তা কোনোটাই ওর অস্তিত্বে নেই। কিন্তু তার ফেলে যাওয়া দীর্ঘ ছায়াটা ওর বর্তমান আর সুন্দর ভবিষ্যৎকে রাক্ষুসে খিদের মতো গ্রাস করে নিতে চাইছে। সে জানে, সতীত্বের চিরাচরিত সংজ্ঞায় সে ছিল অক্ষত। কিন্তু নিজেকে যেভাবে সে কামনার বস্তু হিসেবে বিলিয়ে দিয়েছিল, তার গ্লানি বইবার সাধ্য আজ আর ওর নেই। তাই তো আশফির পবিত্র ভালোবাসার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আজ ওর পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ঘৃণ্য অপরাধী মনে হচ্ছে।

তবে এই লুকোচুরির খেলা আর কতদিন? মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসার প্রাসাদে যে আর বেশিক্ষণ দম নিতে পারছে না ও। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলেও সে মনে মনে স্থির করল, আর দেরি নয়৷ আশফি ফিরেলই সবটা বলে দেবে। তিল তিল করে জমানো প্রতিটি সত্যি, প্রতিটি মুহূর্তের গ্লানি আর সেদিন ওকে ছেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে থাকা আসল কারণটা সে আজ প্রকাশ করবেই।
​আর ঠিক এই সত্যটা প্রকাশের কথা ভাবতেই মারিশা আবারও হুহু করে কেঁদে উঠল। কান্নার তোড়ে ওর সারা শরীর কাঁপছে। ও জানে, সত্যের শক্তি অনেক। কিন্তু সেই সত্য তো কখনো কখনো সব কিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ওর মনে এই ভয়টাই এখন বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলছে৷ সবটা জানার পর আশফি কি আদৌ আর ওর এই ভালোবাসাকে বিশ্বাস করবে? ওর পবিত্র চোখে যে শুদ্ধ গুরাসের ছবি আঁকা আছে, সেই ছবিটা যখন এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে যাবে, তখন কি মানুষটা তাকে আর কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে?
এই হারানোর ভয় আর নিজের করা পাপের দহনে সে যেন বারবার দিশেহারা হয়ে পড়তে লাগল। ওর ভয় হতে লাগল, আজ বিকেলের সূর্য ডোবার সাথে সাথেই হয়তো ওর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির চোখে ও অন্য এক মারিশা হয়ে যাবে।
এক নিদারুণ অনিশ্চয়তা নিয়ে সে বিছানার চাদরটা খামচে ধরে পড়ে রইল।

দুপুরের তপ্ত রোদ পোখারার উঁচু পাহাড়গুলোর গায়ে আছড়ে পড়লেও রিসোর্টের এই বিশাল ওপেন-এয়ার টেরেসে তার তাপ খুব একটা পৌঁছাচ্ছে না। চারপাশটা খোলা হওয়ায় লেকের দিক থেকে আসা হিমেল বাতাস পাইন বনের ওপর দিয়ে বয়ে এসে শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর গাঢ় নীল আকাশ, আর চোখের সামনে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের ধবধবে সাদা তুষারশৃঙ্গগুলো দুপুরের কড়া আলোয় হীরের মতো জ্বলজ্বল করছে। দূরে ফেওয়া লেকের বুকে ছোটো ছোটো রঙিন নৌকাগুলো দেখাচ্ছে ঠিক যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো। পাহাড়ি নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে মাঝেমধ্যে কোনো বুনো পাখির ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে।
টেরেসের পরিবেশটাও ছবির মতো সাজানো। দামি সেগুন কাঠের বিশাল পাটাতন দিয়ে তৈরি এই খোলা বারান্দাটা পাহাড়ের খাঁজে এমনভাবে ঝুলে আছে যে মনে হয় নীল আকাশের বুকেই বুঝি কেউ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছে। টেবিলের চারপাশে ঘের দেওয়া স্বচ্ছ কাঁচের রেলিংয়ের ওপাশে নীল জলরাশি আর দিগন্তজোড়া পাহাড়ের সারি। বড়ো বড়ো ছাতার নিচে ছড়ানো সাদা লিনেন বিছানো টেবিলটাতে রুপালি রঙের কাটলারি আর ক্রিস্টালের গ্লাসগুলো দুপুরের রোদে ঝিলিক মারছে। মাঝখানের সিরামিকের ফুলদানিতে তাজা পাহাড়ি বুনো ফুল থেকে হালকা সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ওয়েটাররা ধীর পায়ে এসে ধোঁয়া ওঠা কন্টিনেন্টাল ডিশগুলো একে একে সবার টেবিলে পরিবেশন করে যাচ্ছে।

এমন স্নিগ্ধ আর ঝলমলে রোদের দুপুরে দিশানই এখন ডাইনিং টেবিলের মধ্যমণি। ও আসার পর থেকেই চারপাশের গুমোট ভাবটা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। কথার তুবড়ি ছুটিয়ে পুরো পরিবেশটাকেই মাতিয়ে রেখেছে সে। তবে এত আড্ডা আর হাসাহাসির মাঝেও দিশানের সমস্ত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মারিশা।
​সুদীর্ঘ চারটে বছর পর সে আজ আবার দেখছে সেই পুতুল পুতুল আদুরে চেহারার বিদেশিনী মেয়েটাকে। যে মেয়েটা মাত্র কয়েক মাসের উপস্থিতিতেই ওদের সবার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। দিশানের কাছে মারিশার গুরুত্ব ছিল অন্য সবার চেয়ে আলাদা। ওর চোখে মারিশা কেবল বড়ো ভাইয়ের প্রেমিকা ছিল না, সে ছিল ওর কাছে পরিবারেরই একজন। ​আর সেই আবেগের টানেই গত চার বছরে আশফির জীবনে আসা কোনো নারীকেই সে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। ওর অবচেতন মনে মারিশার জন্য যে ভাবির আসনটা তোলা ছিল, সেখানে অন্য কাউকে বসানোর কল্পনাও করতে পারত না সে। তাই তো মারিশার ফোনকল প্রথম যেদিন পেল, পেছনের কোনো কথা আর না ভেবেই সে রাজি হয়ে গিয়েছিল ভাইয়ের জীবনে তাকে নতুন করে দেখার জন্য।
​দিশানের ঠিক পাশেই দিব্য আর হৃদয়। কাল রাতের সেই মারামারি বা তিক্ততার রেশটুকু যেন বেমালুম ভুলে গিয়ে ওরা দিশানের সাথে হোহো করে হাসিতে যোগ দিচ্ছে। তবে দিব্যর ঠোঁটের কোণের কালশিটে দাগটা এখনো স্পষ্ট। কিন্তু রোদচশমাটা কপালের ওপর তুলে সেও বেশ সহজভাবেই আড্ডা দিচ্ছে। দিলিশা হৃদয়ের পাশেই বসেছে। কেবল সেই একেবারে গম্ভীর আর নিশ্চুপ।

​টেবিলের অন্যপ্রান্তে আশফি বসেছে মারিশার ঠিক গা ঘেঁষে। ওর পরনে সাদা লিনেন শার্ট, আর ব্যাগি প্যান্ট। মারিশার পরনের সাদা ফ্লোরাল লং ফ্রক আর ডেনিম জ্যাকেটের সাথে মিলিয়েই আজ পোশাক পরেছে সে। তবে তার চোখেমুখে এখনো সেই ভোরের দুশ্চিন্তার রেশ। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ও বারবার মারিশার দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটার ফরসা মুখটা দুপুরের এই উজ্জ্বল আলোতেও কেমন যেন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। থালায় রাখা খাবারগুলোতে নিস্পৃহভাবে কাঁটাচামচ নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু এক গ্রাসও মুখে তুলছে না। তাই নিজ হাতে তার প্লেটে এক টুকরো গ্রিলড ফিশ তুলে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “শরীরটা আগের মতো ফিট দেখতে চাই আমি। খাওয়া-দাওয়ার দিকে খেয়াল দাও প্লিজ।”
মারিশা ম্লান চোখে একবার চাইল আশফির দিকে। চিবুক নামিয়ে মৃদুস্বরে উত্তর দিল, “চেষ্টা তো করছি, কিন্তু গলায় খাবার আটকে যাচ্ছে। পরে খেয়ে নেব আমি, এখন থাক।”
​ “এখনকার খাওয়া এখনই শেষ করতে হবে। পরে আবার ইচ্ছে হলে তখন না হয় অন্য কিছু খাবে”, বলতে বলতেই আশফি চামচে এক লোকমা খাবার তুলে সরাসরি মারিশার ঠোঁটের সামনে ধরল।
আশফির এই আকস্মিক কাণ্ডে মারিশা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। টেবিলের বাকিদের সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে ও আড়ষ্ট গলায় বলল, “আরে, বললাম তো পরে খাব! সবার সামনে এমন জোরাজুরি কেন করছ? সবাই কী ভাবছে বলো তো? পুরো ব্যাপারটা খুব ন্যাকামো দেখাচ্ছে। স্পুনটা রাখো প্লিজ!”

কথাটা শুনে আশফি মুহূর্তের জন্য থামল। এরপর নির্বিকার অভিব্যক্তিতে একবার টেবিলের সবার দিকে চোখ বুলাল। মিথ্যা বলেনি মারিশা। সবাই কেমন এক অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কিন্তু আশফির তাতে থোড়াই কেয়ার! সে বেশ নির্লিপ্ত গলায় সবাইকে শুনিয়ে বলল, “আমি আমার অসুস্থ বউকে নিয়ে একটু বেশিই কনসার্ন। তাতে তোদের কারও কোনো সমস্যা?”
​হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করল, “আমরা কখন বলেছি আমাদের সমস্যা?”
​হৃদয়ের কথায় এবার আশফি আচমকা ধমকে উঠল, “সমস্যা না থাকলে নিজেদের খাওয়া রেখে তাহলে বেহায়ার মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন সব?”
“কী বললি?” দিব্য এবার তপ্ত স্বরে তিরস্কার করে উঠল, “বেহায়া আমরা? এখানে আসল বেহায়াপনাটা কে করছে, সেটা কি নাম ধরে বলব আমি?”
আশফি তবু গা-ছাড়া এক অভিব্যক্তি প্রকাশ করল, “মার আবার খেতে না চাইলে চুপচাপ প্লেটের খাবার খা। আমি বেহায়াপনা করলেও আমার বউয়ের সাথে করছি৷ তোর কী তাতে? তোর দেখতে অসহ্য লাগলে বিদেয় হ আমার চোখের সামনে থেকে। কিন্তু খবরদার, আমাদের দিকে কোনো নজর দিবি না৷ তোর নজর তো আবার ভাগাড়ের ক্ষুধার্ত কুকুরের চেয়েও খারাপ!”

দিব্য রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেলেই পরিস্থিতি বেগতিক হবে বুঝতে পেরেই দিশান ওর কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর ধমকের সুরে বলল, “এই! আমার সাধের লাঞ্চটাকে একদম পণ্ড করবি না কেউ। আগেভাগে বলে রাখছি, এরপর কেউ মুখ খুললে সবার কপালে খারাবি আছে বলে দিলাম! এখন চুপচাপ খেয়ে নে। খাওয়া শেষে কে কত বড়ো কুস্তিগির, সেটা আমি পপকর্ন হাতে আয়েশ করে দেখতে বসব।”
সত্যিই আর কেউ কথা বাড়াল না। আশফিও কারোর ভ্রুকুটি কিংবা মারিশার মৃদু বাধাকেও তোয়াক্কা করল না। জোর করেই নিজের হাতে পুরোটা খাবার সে খাইয়ে ছাড়ল। দিব্য তখন কপাল কুঁচকে, চোখেমুখে চরম তিক্ততা নিয়ে ওর এই প্রকাশ্য আদিখ্যেতা দেখছিল। ওর সেই বাঁকা চাহনি দেখে বাকিরা নিচু মাথায় মিটিমিটি হাসতে লাগল। এমনকি আশফির ঠোঁটের কোণেও চোরা মুচকি হাসি খেলা করছিল।
​টেবিলের এই হাসাহাসির মাঝে মারিশার নজর পড়ল কেবল দিলিশার ওপর। মেয়েটা পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে আছে, চোয়াল শক্ত। থালার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সে এমনভাবে ছুরি-চামচ চালাচ্ছে, যেন গ্রিলড ফিশের ওপর নিজের সমস্ত জমে থাকা আক্রোশ মেটাচ্ছে।

​অন্য কোনো সময় হলে হয়তো ওর সামনে আশফির এই পাগলামি তাকে আনন্দ দিত। কিন্তু এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে প্রতিটি লোকমা যেন বিষের মতো তিতা। আশফির এই প্রগাঢ় যত্ন আর ব্যাকুলতা তার ভেতরে এক অসহ্য দহন তৈরি করছে। প্রতিবার মানুষটা যখন মায়া চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে, তার বুকের ভেতরটা তখন অপরাধবোধে ক্ষণে ক্ষণেই মুচড়ে উঠছে। সে বুঝতে পারছে, এই আকাশছোঁয়া বিশ্বাসের প্রতিদান সে যা দিতে যাচ্ছে, তা এই মানুষটাকে হয়তো ভেতর থেকে একেবারে চুরমার করে দেবে।
সবার আগে খাওয়া শেষ করে আশফি টিস্যুতে হাত মুছে উঠে দাঁড়াল। মারিশার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে খুব মৃদু স্বরে বলল, “চলো, একটু ওপাশ থেকে ঘুরে আসি।”
​মারিশা কোনো প্রতিবাদ করল না। আশফির হাত ধরে নীরবেই টেবিল ছাড়ল। বাকিরা তখনো খাওয়া আর আড্ডায় মত্ত। কেবল দিলিশার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওদেরকে অনুসরণ করল কিছুক্ষণ।
​টেরেসের মূল চত্বর ছেড়ে ওরা একটু নিচের দিকে ঢালু হয়ে যাওয়া সরু একটা মেঠো পথ ধরে হাঁটা শুরু করল। এই পথটা রিসোর্টের বাগান পেরিয়ে একদম লেকের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্জন পাইন বনের দিকে চলে গেছে। ​খানিকটা দূরে যেতেই চারপাশের পরিবেশটা বদলে গেল। এখানে লম্বা লম্বা পাইন আর ফার গাছের সারি আকাশের নীলকে ঢেকে দিয়েছে। শুকনো ঝরা পাতার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় এক ধরনের মচমচে শব্দ হচ্ছে। দুপুরের রোদ গাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে এসে মাটিতে যেন আলপনা এঁকে দিচ্ছে। সামনেই লেকের শান্ত জলরাশি। যেখান থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস গাছগুলোর ডালপালায় লেগে এক অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ তুলছে। পাহাড়ের এই দিকটায় জনমানবের চিহ্ন নেই। কেবল বুনো ফুলের তীব্র সুবাস আর নাম না জানা পাখির ডাক।
লেকের ঠিক কোল ঘেঁষে পড়ে থাকা বিশাল এক পাথুরে খাঁজের ওপর মারিশাকে বসিয়ে দিল আশফি। এরপর কোনো কথা না বলে সে আচমকা নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটা সাদা উলের টুপিটা বের করে আনল। মারিশা বিস্ময়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কখন পকেটে ঢুকিয়েছিলে তুমি?”

​আশফি টুপিটা দুই হাতে মেলে ধরে বেশ শান্ত গলায় জবাব দিল, “যখন তুমি পরব না বলে ওটা অবহেলার সাথে ছুড়ে ফেলে দিলে। ঠিক তখনই তুলে পকেটে পুরে রেখেছি।”
​কথাটা শেষ করেই সে টুপিটা মারিশার মাথায় সযত্নে পরিয়ে দিতে শুরু করল। মারিশা ভ্রু কুঁচকে, বিরক্তিতে মুখটা একটু ছোটো করে হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, “ধুর! এটা একটুও পছন্দ না আমার৷ পরলে কেমন দেখাবে বলো তো?”
কিন্তু ​ওর নিষেধাজ্ঞাকে বিন্দুমাত্রও পাত্তা দিল না আশফি। উলটে শাসনের সুরে কপালে একটা হালকা ভাঁজ ফেলে বলল, “একদম চুপ! আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ঠান্ডায় রীতিমতো কাঁপছ তুমি। এই যে কানদুটো একদম বরফের মতো জমে গেছে। কিন্তু শীতের চেয়ে তোমার কাছে ফ্যাশনটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থায় জ্বরটা আরও বাড়লে খুব ভালো হবে?”

বিরক্তিতে আর কোনো কথাই বলল না মারিশা। থমথমে মুখে অভিমানী ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল সে। ওর সেই গম্ভীর মুখচ্ছবি দেখে আশফি বেশ মজা পেল। চাপা হাসতে হাসতে ওর ঠিক গা ঘেঁষে পাথরের ওপর বসল। এরপর ওর কাঁধে আলতো করে একটা ধাক্কা দিয়ে বেশ রগড় করার সুরে বলল, “অ্যাই শোনো, সারাবছর এমন রোগা-পটকা আর অসুস্থ বউ কিন্তু আমার পোষাবে না। দ্রুত সুস্থ-সবল হয়ে ওঠো তো দেখি! আমার বাপকে এবার একটা জুনিয়র চৌধুরী উপহার দিতে হবে। আমি তো ভাবছি একেবারে নাতি-নাতনি বগলদাবা করে তবেই বাড়িতে হাজির হব। আইডিয়াটা মন্দ না, কী বলো?”
অদ্ভুতদর্শনের মতো চোখ করে ঘাড়টা ধীরে ঘুরিয়ে তাকাল মারিশা। কপাল কুঁচকে বলে উঠল, “তুমি এমন ফিল্মি, ড্রামাবাজ ক্যারেক্টার হলে কবে থেকে? এটা শুধু জোক হিসেবে পারফেক্ট। সিরিয়াসলি না।”
বলেই আবার গম্ভীর মুখটা ফিরিয়ে লেকের জলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে। আশফি তখন গালটা আলতো করে চেপে ধরে মুখটা ওর দিকে ফিরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত আদুরে স্বরে বলল, “আচ্ছা বাবা, হয়েছে তো! আর কতক্ষণ রাগ করে থাকবে? এমন রেগে থাকলে তোমার সাথে একটু রোমান্টিক সময় কাটাব কখন বলো তো? এই টুপিটাতে তোমাকে কত কিউট লাগছে জানো? আমাদেরকে পাশাপাশি এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব থেকে কিউট কাপল লাগছে। সিরিয়াসলি! আচ্ছা ওয়েট, বিশ্বাস না হলে একটা সেলফিতেই না হয় নিজেকে দেখে নাও।”

কথাটা শেষ করেই আশফি মারিশার হাত থেকে ওর ফোনটা নিয়ে নিল। তারপর সত্যি সত্যি ক্যামেরা অন করে দুজনের একটা ছবি তুলল। ছবিতে মারিশার মুখটা আগের মতোই গম্ভীর আর উদাসীন হয়ে আছে। অথচ ঠিক তার পাশেই ওর কাঁধটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, গালের সাথে গাল মিশিয়ে আশফি এক চিলতে মুচকি হাসিতে মেতে আছে। ছবিটা দেখে আনমনেই মারিশার ঠোঁটেও একটা মিষ্টি হাসি ফুটল৷
আশফি তখন আবার ওর ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর দুহাত নিজের মুঠোয় পুরে নিয়ে গভীর মায়ায় মারিশার ওর দিকে চাইল। নরম স্বরে বলল তারপর, “আজ সারাটা সকাল ধরে তোমাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে, মাহি। মনে হচ্ছে খুব গভীর কোনো কষ্ট তুমি ভেতরে পুষে রেখেছ৷ আমার সাথে থেকেও তুমি যেন কোথাও নেই। এটা আমাকে কতখানি কষ্ট দিচ্ছে, সেটা কি বুঝতে পারছ না? কী লুকাচ্ছ আমার কাছে? আমি কি এতটাই পর এখনো, যে তোমার এই বিষণ্ণতার কারণটুকুও জানার অধিকার রাখি না?”

​ওর এই আকুল প্রশ্নে মারিশার বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইল। চারপাশের এই স্নিগ্ধ প্রকৃতি আর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা এই মানুষটার অসীম ভালোবাসা ওকে এক নিদারুণ কষ্টের খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছে। সে জানে, এই সুন্দর মুহূর্তটাই হতে যাচ্ছে ওর জীবনের শেষ প্রশান্তি, কারণ একটু পরেই ও এমন এক ঝড়ের শুরু করবে যা এই সাজানো বাগানটাকেই তছনছ করে দেবে।
আশফির ব্যথিত মুখটার দিকে মারিশা আর তাকাতে পারল না। এক বুক হাহাকার নিয়ে সে মুহূর্তেই মাথাটা নিচু করে ফেলল। বুকের ভেতরটা এমনভাবে মুচড়ে উঠছে যে গলা দিয়ে স্বর ফুটছে না, কণ্ঠটা নিমিষেই বুজে এল ওর। কিন্তু এই অসহ্য সত্যের বোঝা আর কতক্ষণ বইবে সে?
নিজের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে মারিশা এবার মুখ খুলল। অত্যন্ত দুর্বল আর ক্ষীণ স্বরে, কথাগুলো আটকে আটকে যেতে লাগল ওর, “আশফি … আমি … আমি কিছু কনফেস করতে চাই তোমাকে। কাল রাতেও অনেকবার বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিচুয়েশন তো ঠিক ছিল না তখন।”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২

​আশফি ভ্রু কুঁচকে মারিশার পাণ্ডুবর্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। মারিশা এক মুহূর্তের জন্য থামল, ওর কাঁপা হাতদুটো নিজের কোলের ওপর মুঠো করে চেপে ধরে আবারও বলতে লাগল, “আমি একটা চিঠি লিখেছি তোমার জন্য। সমস্ত কনফেশন আমি সেখানেই লিখে রেখেছি। আমার কাছেই সেটা৷ এখনই পড়বে তুমি?”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩