বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে ভোরের ম্লান আলোটুকু ঘরের ভেতর এসে পড়ছে। রিসোর্টের বাইরে তখনো কুয়াশার ঘন আস্তরণ, যার ভেতর দিয়ে পাইন গাছের অস্পষ্ট অবয়বগুলো দেখা যাচ্ছে।
চারটি বসন্ত ধরে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বুকের ভেতর বয়ে বেড়ানো নীরব দহনের অবসান হয়েছে কাল রাতের সেই নিবিড় লগ্নে। জাগতিক সব হিসেব-নিকেশ আর বাস্তবতাকে তুচ্ছ করে দিয়ে তারা দুটি প্রাণ এখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। যন্ত্রণার পাহাড় ডিঙিয়ে তারা যেন এক শান্ত বন্দরে এসে থিতু হয়েছে। যেখানে সময় স্থির, আর চারপাশের পৃথিবীটা ওই ঝাপসা কুয়াশার মতোই অর্থহীন।
ঠিক এমন মুহূর্তেই দরজার ওপাশে অপ্রত্যাশিতভাবে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ভারী কাঠের দরজায় সেই আঘাতের শব্দে নিস্তব্ধতা টুটে ঘুমটা ভাঙল প্রথম আশফিরই। ধড়ফড় করে চোখ মেলল সে। এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রম জাগল মনে, ঠিক কোথায় আছে সে? কিন্তু নাসারন্ধ্রে আটকে থাকা মারিশার শরীরের সেই বুনো ফুলের সুবাস আর বাহুডোরের উষ্ণতা নিমেষেই ওকে রূঢ় বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল। চেনা সুবাসটা আরও একবার বুক ভরে টেনে নিয়ে মারিশার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকাল। ভোরের এই কাঁচা আলোয় ওকে দেখতে দেখতে আশফির মনে হলো, কোনো এক রূপকথার পরী যেন পরম মমতায় ওর সারা অবয়বে আশ্চর্য এক কোমলতা মাখিয়ে দিয়ে গেছে।
অবিন্যস্ত চুলে ওর চেহারাটা আধো-আড়াল, মুখাবয়ব জুড়ে এক প্রশান্ত ক্লান্তির ছাপ। কাল রাতের সেই প্রলয়ংকরী আবেগের পর এই মুখটা দেখে আশফি অনুভব করল, তার যাযাবর জীবনের ইতি ঘটে গেছে এবার। অবশেষে চির আকাঙ্ক্ষিত আশ্রয়ের ছাদ সে খুঁজে পেয়েছে। হাত বাড়িয়ে মারিশার চেহারা থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে গতরাতে নিজের পাগলামির কথাগুলো ভাবতে লাগল। ভীষণ কষ্ট দিয়ে ফেলেছে মেয়েটাকে। কাল কী যে হলো তার! আরেকটু ধৈর্য কি ধরতে পারত না? প্রথম রাতটা এভাবে আড়ম্বরহীন হবে, তা তো সে চায়নি৷
এর মাঝেই দরজাতে আবার শব্দ পড়ল৷ সেই সাথে এবার মিরানের কণ্ঠ, “মাহি, শুনতে পাচ্ছিস? এত সকাল সকাল ঘুম ভাঙানোর জন্য এক্সট্রিমলি সরি, বোন। দরজাটা খোল। ইট’স আর্জেন্ট।”
সহসা সম্বিত ফিরল আশফির। একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে দরজার দিকে তাকাল। এই সাতসকালে সম্বন্ধী নামের ওই আপদটার কী এমন জরুরি কাজ পড়ল যে, ওদের সাধের ঘুম নষ্ট করতে হলো? বিড়বিড়িয়ে মিরানকে দু-কথা শোনাতে শোনাতে যখন আশফি উঠে বসল, ঠিক তখনই বিছানার সাদা চাদরে লালচে কয়েকটা ছোপ ছোপ দাগ ওর নজরে এল। মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। বিরক্তি উবে গিয়ে সেখানে দানা বাঁধল বিষম এক উদ্বেগ। মারিশার কাঁধের সেই পুরনো ক্ষতটার কথা মনে পড়তেই আতঙ্কে মুখটা নীল হয়ে এল ওর। তবে কি তার সেই বেপরোয়া আদরেই বেচারির ক্ষতটাতে আবার চোট লাগল কাল?
“মাহি! অ্যাই মাহি, ওঠো তো”, উদ্বিগ্ন সুরে ওকে ডাকতে লাগল আশফি।
ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন মারিশা যখন আধো-বোজা চোখে তাকাল, আশফি তখন ওকে প্রায় পাঁজকোলা করে টেনে তুলেছে। ওর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হাতদুটো হন্যে হয়ে মারিশার ক্ষতস্থানটা পরীক্ষা করতে লাগল। রুদ্ধশ্বাসে সে জিজ্ঞেস করল, “তোমার ব্লিডিং হচ্ছে? কী আশ্চর্য! ব্যথা পেয়েছিলে তো আমাকে তখন বলোনি কেন? প্লিজ দেখো তো ব্লিডিং হচ্ছে কোথা থেকে!”
মারিশা চোখের পাতা কচলাতে কচলাতে আশফির এই পাগলামি দেখছিল। তার এই অহেতুক অস্থিরতা দেখে ঘুম চোখে ওর বিরক্তিটা এবার চরমে পৌঁছাল। সে এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে দিয়ে গায়ের চাদরটা সজোরে টেনে নিল। তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে ধমক দিয়ে বলল, “থামবে তুমি?”
আশফি থমকে গেল। ওর সেই অপরাধী চাউনিটা এতই নিস্পাপ আর সরল ঠেকল যে, মারিশা চাইলেও বিরক্তিটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। হঠাৎ জামার গলাটা সামান্য নামিয়ে কাঁধের সেই পুরনো ক্ষতটা উন্মুক্ত করল তার সামনে। খুঁটিয়ে দেখে আশফি তখন নিশ্চিত হলো — না, ক্ষতটা তাজা হয়নি। কিন্তু এই রক্তটা তবে কিসের? এবার নিজের কাঁধের চোটটাও পরীক্ষা করে দেখল সে, সেখানেও সব ঠিকঠাক।
তার বিভ্রান্তি দূর করতে মারিশা বাধ্য হয়ে এবার মুখ খুলল। কণ্ঠে নির্লিপ্ততা নিয়ে সে সোজাসুজি জানাল, “ইউ ওয়ার টু ওয়াইল্ড লাস্ট নাইট। দ্য ব্লাড অ্যালোন প্রুভ্জ ইট। তাই আজেবাজে ভয় না পেয়ে বরং দরজাটা গিয়ে খোলো।”
কথাগুলো শোনা মাত্রই আশফি স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। ওর সমস্ত পুরুষালি গাম্ভীর্য যেন এক নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো একরাশ লজ্জা আর জড়তা। নিজেকে সবসময় খুব সংযত আর বুদ্ধিমান ভাবা মানুষটা লজ্জায় কেমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। কোনো কথা জোগাল না তার মুখে, কেবল অপরাধীর মতো মাথাটা নিচু করে ফেলল সে।
বাইরে মিরান তখন ধৈর্য হারিয়ে আবার হাঁক ছাড়ল, “কিরে আশফি, মরে গেছিস? নাকি ইচ্ছে করেই দরজা খুলছিস না?”
থতমত খেয়ে আশফি উঠে দাঁড়াল দ্রুত। দরজার দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে জবাব দিল, “মরিনি এখনো। আর দুটো মিনিট ওয়েট কর, ভাই!”
মিরানের কড়া নির্দেশ ছিল, বোনের এই শারীরিক অবস্থায় যেন কোনোরকম ধকল না যায়। মারিশা সুস্থ না হওয়া অবধি যেন নিজেকে সে সংযত রাখে৷ অথচ কাল রাতে সব বাঁধ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে সে৷ একবার সেটা টের পেলে মিরান কী যে অপমান করবে তাকে — তা ভেবেই আশফির মাথা খারাপ হওয়ার দশা।
সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্রায় তোতলাতে তোতলাতে মারিশাকে বলল, “আই অ্যাম… আই অ্যাম সরি, সোনা। আমি আসলে বুঝতে পারিনি … কী যে করে ফেললাম! মিরানকে প্লিজ কিছু বুঝতে দিয়ো না, ওকে? গেট ড্রেসড কুইকলি, জান।”
“হ্যাংআউট কি এখনো কাটেনি তোমার”, বলেই হতাশা আর বিরক্তিতে নিজের কপালটা চেপে ধরল মারিশা।
চিড়বিড়িয়ে বলে উঠল তারপর, “আই’ম অলরেডি ড্রেস্ড। প্লিজ লুক অ্যাট ইয়োরসেল্ফ, জান।”
বিভ্রান্ত অভিব্যক্তিতে আশফি তখন নিজের শরীরের দিকে নজর দিতেই পাথরের মতো জমে গেল। নিজেকে সম্পূর্ণ এক নগ্ন মূর্তির সংস্করণে আবিষ্কার করে সে মুহূর্তেই চরম বিড়ম্বনায় পড়ে গেল। বোকার মতো মুখ করে মারিশার দিকে একবার তাকাল৷ দেখল, গালে হাত দিয়ে বসে চোখে-মুখে বিরক্তি নিয়ে তাকে দেখে যাচ্ছে মেয়েটা৷ প্রচণ্ড অপ্রস্তুত হয়ে বলল সে, “অ্যাই প্লিজ, আর দেখো না আমাকে!”
বলেই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল সে। তবে মাঝপথে হঠাৎ কী মনে করে আবার থমকে পড়ল। তড়িঘড়ি ফিরে এসে মারিশার কপালে দ্রুত একটা চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “প্লিজ সোনা, মিরানের সাথে বিছানার চাদরটাও একটু সামলে নিয়ো?”
বলেই সে আবারও ছুট দিল ওয়াশরুমে। এই বিশালদেহী দামড়া লোকটার এমন বাচ্চামো কাণ্ডকারখানা দেখে মারিশা কয়েক মুহূর্ত স্রেফ হাঁ করে তাকিয়ে রইল তার যাওয়ার দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে দ্রুত হাতে চাদরের সেই দাগটার ওপর ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দিয়ে নিজেকে গরম কাপড়ে পরিপাটি করে নিল।
চঞ্চল পায়ে হেঁটে গিয়ে যখন শেষমেশ দরজাটা খুলল, মিরান ওকে দেখা মাত্রই তখন বিরক্তিতে ফেটে পড়ল, “আধা ঘণ্টা পার করে দিলি খালি দরজাটা খুলতেই! মানে সিরিয়াসলি? তোরা মানুষ না-কি গণ্ডার? এত জোরে ডোর নক করছি, শুনতেই পাস না কেউ!”
বিরক্তিতে গজগজ করতে করতে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরজাটা বন্ধ করে মারিশাও তার পিছু পিছু এল। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একবার কবজিতে বাঁধা ঘড়িটা দেখল মিরান, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে মারিশার কপালে হাতের উলটো পিঠ ঠেকিয়ে তাপমাত্রা মেপে নিল। গা টা কেমন গরম গরম লাগল তার৷ ভ্রু কুঁচকে মারিশার মুখটা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, “জ্বর এসেছে না-কি? চোখমুখ এমন বসে গেছে কেন? দেখে তো মনে হচ্ছে সারারাত এক ফোঁটা ঘুমাসনি। শরীরটা খারাপ লাগছে?”
অপ্রস্তুত হেসে এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুঁজতে গুঁজতে মারিশা বলল, “আরে নাহ, শরীর ঠিক আছে। পাহাড়ি ঠান্ডায় একটু বেশিই শীত শীত লাগছিল, এই যা।”
রাতে যদিও ভদ্র, সভ্য লোকটা আস্ত এক দস্যু বনে গিয়ে সত্যিই ওর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। সেই একান্ত সময়ের ধকলই শরীরটা সামলে উঠতে পারেনি এখনো।
মিরান আর কথা বাড়াল না। বারান্দার এসে বেতের চেয়ারটা টেনে বসল। বাইরের পাইন বন আর কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল সে, “আচ্ছা শোন, একটা ভালো খবর দেওয়ার ছিল তোকে। বাবা রেসপন্স করতে শুরু করেছে। ডক্টর জানাল, গত দুদিনে হাতের আঙুল বেশ কয়েকবার নাড়িয়েছেন। কন্ডিশন ধীরে ধীরে ভালোর দিকে আসছে। হয়তো আর খুব বেশিদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না।”
এক মুহূর্ত থামল মিরান। তারপর প্রলম্বিত শ্বাসটা ফেলে যোগ করল, “আর আজ দুপুর বারোটার ফ্লাইটেই ইস্তাম্বুল ব্যাক করছি আমি। এজেন্সির কাজ আইলিন আন্টি আর মেলিসা একা সামলাতে গিয়ে একটু হিমশিম খাচ্ছে৷ আর দেরি করা ঠিক হবে না আমার।”
বাবার খবরটা শোনা মাত্রই মারিশার বুকের ভেতরে জমে থাকা সকল কষ্টের ভার এক নিমিষেই হালকা হয়ে গেল। যেদিন সে জানল বাবার এমন পরিস্থিতির জন্য সেই দায়ী, সেদিন থেকেই যে পাথরটা বুকের ওপর চেপে বসে ছিল, সেটা যেন আজ এক লহমায় সরে গেছে। বিস্ময়ে আর আনন্দে ওর চোখের মণি দুটো চিকচিক করে উঠল।
“সত্যি বলছ? বাবা রেসপন্স করছে?” মারিশার কণ্ঠে উপচে পড়া উত্তেজনা, “তার মানে কি খুব শীঘ্রই কথা বলবে আমাদের সাথে?”
হাসল মিরান, “হুঁ, বড়জোর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই বাবা পুরোপুরি কোমা থেকে ফিরবেন বলে ডক্টর আশা দিচ্ছেন।”
ফর্সা মুখটা খুশিতে লাল হয়ে উঠল মারিশার, “সপ্তাহ দুয়েক তো অনেক লম্বা সময় মনে হচ্ছে। ইশ! এখনই যদি বাবার পাশে থাকতে পারতাম!”
তাদের কথোপকথনের মাঝেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। ভেজা চুলে বেরিয়ে এল আশফি। কোমরে কেবল একটা সাদা তোয়ালে জড়ানো তার। প্রশস্ত কাঁধ আর বুক বেয়ে তখনো জলের কণা গড়িয়ে পড়ছে।
মিরান বারান্দা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক দেখল ওকে। এই হাড়কাঁপানো সকালে ওকে গোসল করে বের হতে দেখে ভ্রুজোড়া সামান্য কুঁচকে গেল। পরমুহূর্তেই পরিস্থিতিটা আঁচ করে ফেলল সে। এলোমেলো বিছানা আর বোনটার এমন বিধ্বস্ত চেহারা, সবকিছুর সমীকরণ মেলাতেই মুখটাতে একটু গাম্ভীর্যতা ভর করল যেন মিরানের। বিড়বিড়িয়ে আশফিকে জুতসই কটা গালি না দিয়েও থাকতে পারল না, “জানোয়ার একটা! বোনটা আমার অসুস্থ, শরীরটা এখনো ঠিকঠাক সারলই না, অথচ এই হারামজাদার কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে গেছে!”
তার ওই থমথমে মুখের অভিব্যক্তি দেখে আশফিও মুহূর্তেই সে বুঝে গেল, সম্বন্ধী মহোদয় ঘটনার আগাগোড়া সব আঁচ করে ফেলেছে এবং মনে মনে তার গুষ্টি উদ্ধার করছে। ওয়াশরুমে ঢোকার সময় সাথে করে এক সেট টি-শার্ট আর ট্রাউজার না নেওয়ায় নিজের ওপর একটুখানি বিরক্তও হলো সে। তবে মিরানের অমন কড়া চাউনি দেখে পিত্তি জ্বলে উঠল ওর। চার বছর আগের সেই পুরনো জ্বালাটাও আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
এই সেই শয়তান সম্বন্ধী, যে বিয়ের পরও নিজের ক্ষমতার জোরে ওর বাসর রাতটা হতে দেয়নি। বিয়ের দিন রাতে আঙুল উঁচিয়ে ওকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, “বিয়ে করিয়ে দিয়েছি বলে এটা ভাবিস না যে আমার বোনের ঘরে ঢোকার পারমিট পেয়ে গেছিস। যতদিন না বুক ফুলিয়ে তোর বাপ-দাদাকে এই বিয়ের কথা জানাতে পারবি, ততদিন কোনো বাসর-টাসর হবে না। খবরদার!”
সেদিনের সেই অপমান আর তিন মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা মনে পড়লে আশফির এখনো রক্ত টগবগ করে ওঠে। শেষমেশ ওর মমতাময়ী ফুপু, অর্থাৎ ওর শাশুড়ি মা ছেলের ওই একগুঁয়েমি দেখে প্রচণ্ড বকাঝকা করে তার বাড়াবাড়ি থামিয়েছিলেন। দীর্ঘ তিনমাসের অপেক্ষার পর দয়ালু ফুপুর জন্যই শেষ পর্যন্ত ফুলশয্যার অনুমতি পেয়েছিল সে।
সেসব দিনের কথা মনে পড়ে বাঁকা চোখে মিরানের দিকে তাকাল সে, আর মনে মনে বলল, “শালা, অনেক দাদাগিরি দেখিয়েছিস! এখন নিজের চরকায় তেল দিয়ে জলদি ভাগ এখান থেকে!”
তখনই মিরান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর কাছে এসে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি আজ দুপুরের ফ্লাইটেই ইস্তাম্বুল চলে যাচ্ছি। হাতে সময় কম, আমাকে এখনই গোছগাছ শুরু করতে হবে। বেরোনোর আগে ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চটাও একসাথেই সেরে নেব। রেডি হয়ে ওকে নিয়ে নিচে আয়।”
তোয়ালেতে চুল মুছতে মুছতে আশফি তখন অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বলল, “আমি বোধহয় তোদের সাথে ব্রেকফাস্ট করার সময় পাবো না। এসে করতে হবে। দিশান রাতে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছে, ভোরেই ওর পোখারার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার কথা। ওকে এগিয়ে আনতে হবে বলেই সকাল সকাল একদম ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বের হব এখনই।”
“হুঁ”, বিদ্রুপের সাথে মাথা নেড়ে বিড়বিড়িয়ে বলল মিরান, “সে তো আমি বুঝতেই পারছি।”
এরপর আর কথা বাড়াল না সে। যাওয়ার আগে মারিশার দিকে ফিরে ওর মাথায় আলতো করে হাত রাখল, “তাহলে তুই ফ্রেশ হয়ে আমাকে ডাকিস? একসাথে খেতে যাব।”
জবাবে মারিশা কেবল একবার মাথা নাড়াল। মিরান তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই গুমোট ভাবটা যেন এক নিমিষেই কেটে গেল। কিন্তু আশফির ভেতর তখনো যেন আগ্নেয়গিরি জ্বলছে। সঙ্গে সঙ্গেই সে শুরু করল মিরানকে খিস্তি দেওয়া, “শালা, তিন কবুল পড়ে, রেজিস্ট্রি করে পাওয়া আমার বউ — আর তার সাথে বাসর করতে নাকি আমার ওর পারমিশন লাগবে? ওসমান বারিশের মুল্লুক পেয়েছে নাকি, হ্যাঁ?”
আশফির এমন তেড়েফুঁড়ে ওঠা দেখে মারিশা এক মুহূর্ত থমকে রইল। তারপর হঠাৎই ভ্রু কুঁচকে ধমকের সুরে বলল, “অ্যাই, একদম আমার বাবার নাম ওভাবে মুখে আনবে না। হয় স্যার বলবে, নয়তো বাবা ডাকবে। সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখো।”
আশফি মুখে কিছু বলল না, তবে ওর চোখে-মুখে তাচ্ছিল্যের ছাপ ফুটে উঠল। ক্লোজেট থেকে পোশাক বের করতে করতে সে মনে মনেই গজগজ করে উঠল, “শালার ব্যাটা শালা যে বলছি না, সেটাই তোমার বাপের ভাগ্য!”
সে চুপচাপ পোশাক পালটাতে শুরু করলে মারিশা পা বাড়িয়ে ওর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। আয়নায় ওর প্রতিবিম্বের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি না ড্রিঙ্ক করা একদম পছন্দ করো না? তো সেই তোমার কাল রাতে ঠিক কী হয়েছিল, হুঁ?”
প্রশ্নটা শোনামাত্র বেশ বিব্রতভাব আর লজ্জা ফুটে উঠল আশফির চেহারায়। গায়ে জ্যাকেটটা ঢুকিয়ে মারিশার দিকে ফিরে দাঁড়াল৷ কাঁচুমাচু মুখ করে নত স্বরে বলল, “খুব বেশি হার্ট করে ফেলেছি, না? মাফ করো প্লিজ! প্রমিজ করছি, আর কোনো বাড়াবাড়ি করব না।”
বিরক্ত হলো মারিশা, “আমার প্রশ্ন বুঝতে পারোনি? তুমি ড্রিঙ্ক কেন করেছিলে আর অমন ডেস্পারেটই-বা কেন ছিলে, আমি সেটা জানতে চাইছি।”
আশফি তখন ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরের জানালার ওপাশে কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব রইল সে। তারপর ধীর গলায় বলল, “তোমাকে নিয়ে কাল দুজনের সঙ্গে ফাইট হয়েছিল আমার।”
“তুমি ফাইট করেছ? তাও আবার আমাকে নিয়ে?” মারিশা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না। বিস্ময়মাখা চোখের কোণে শঙ্কার কালো ছায়াও ফুটে উঠল যেন। সে ব্যাকুল হয়ে আশফির হাতটা চেপে ধরল, “এখানে কাদের সাথে ফাইট করেছ তুমি? কী হয়েছিল আমাকে নিয়ে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, প্লিজ সবটা খুলে বলো।”
আশফি ওর হাতের ওপর নিজের হাতটা রেখে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, “আরে এত প্যানিক হয়ো না। সেরকম বড়ো কোনো সমস্যা হয়নি। কাল রাতে মনটা ভালো ছিল না বলে একা একা লেকের ধারে গিয়ে বসেছিলাম। হঠাৎ এক অচেনা লোক এসে আমার পাশে বসল। লোকটা শুরুতে খুব ভদ্রভাবে কথা বলছিল, আমার ডকুমেন্টারি ফিল্মগুলো নিয়ে অনেক প্রশংসা করল।”
একটু থামল আশফি, যেন সেই মুহূর্তের দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে দেখছে, “আমি যখন ওর পরিচয় জানতে চাইলাম, সে খুব সংক্ষেপে বলল তার মাদারল্যান্ড ইস্তাম্বুল। আমি ভাবলাম হয়তো কোনো টুরিস্ট। কিন্তু এরপরই লোকটা হঠাৎ আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে অনধিকার চর্চা শুরু করল। আমার ফিয়াঁসের কন্ডিশন এখন কেমন, এই প্রশ্নের পরই হুট করে তোমার নাম আর পরিচয়ও বলে ফেলল সে।”
মারিশার কপাল কুঁচকে এল। আশফি তখনো বলতে লাগল, “আমি খুব অবাক হলাম। কোনো নিউজ চ্যানেলে তো আমি তোমার ছবি বা নাম প্রকাশ করতে দিইনি। ওই লোকটা তাহলে জানল কী করে? আমার প্রশ্নের জবাবে সে দাঁত বের করে হেসে বলল, সে আমাদের এই রিসোর্টেই উঠেছে। গতকাল লাঞ্চের সময় তোমাকে আর মিরানকে আমার পাশে দেখেই নাকি সে বুঝেছে তুমিই আমার ফিয়াঁসে। আমার তখন সন্দেহ হলো লোকটা হয়তো কোনো ট্যাবলয়েড রিপোর্টার হবে। তাই সরাসরি তাকে বললাম, আমাকে আর ডিস্টার্ব না করতে।”
এরপরই আশফির চোয়াল শক্ত হয়ে এল, গলার স্বরও কিছুটা কেঁপে উঠল আক্রোশে, “কিন্তু লোকটা যে কী পরিমাণ শয়তান আর খচ্চর, তা বুঝলাম তার পরের কথায়। বিচ্ছিরিভাবে হাসতে হাসতে সে চূড়ান্ত পর্যায়ের নোংরা কথা বলে বসল। আমাকে বলল, ‘আপনার ফিয়াঁসে আর তার বাবার তো অনেক স্ক্যান্ডাল আছে, সেসব কি আপনি জানেন না? আপনার ফিঁয়াসের উশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য আপনার হবু শ্বশুর নাকি বাধ্য হয়ে তার থার্ড ওয়াইফের কাছে এজেন্সির পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি হ্যান্ডওভার করে দিয়েছিলেন। আর সেই ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্যই আপনার ফিয়াঁসে এজেন্সির সমস্ত পার্টনারদের প্রতিনিয়ত তুষ্ট করেছে। মানে বুঝতেই তো পারছেন, কী করে? এমনকি নিজের বাবার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকেও নাকি সে অসন্তুষ্ট করেনি।’”
রাতের ওই ঘটনাগুলো মনে করে রাগে আশফির এখনো হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। “অ্যান্ড আই অ্যাম সরি … ওই নোংরা কথাগুলো শোনার পর আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। বাস্টার্ডটাকে হিট করে বসি আমি। ঠিক সেই মুহূর্তেই দিব্য আর হৃদয় ওখানে এসে হাজির হয়। ওরা না ঠেকালে কাল একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যেত।”
আশফি এবার মারিশার দিকে তাকাল, “তবে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগল, অতগুলো ঘুসি খাওয়ার পরও জানোয়ারটা কোনো পালটা আক্রমণ করল না, একটা গালিও দিল না। শুধু যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ আমার দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এরপর তো হৃদয়দের সাথে রিসোর্টে ফিরলাম। ওপেন-এয়ার ক্যাফেতে গিয়ে বসলাম। দিলিশাও ছিল ওখানে। ভেবেছিলাম একটু মাথা ঠান্ডা করতে পারব, কিন্তু দিব্য কুত্তাটা তখন শুরু করল আবার। ওখানে বসেই আমাকে নিয়ে বিশ্রীভাবে টন্ট মারা শুরু করল। ও সবার সামনে বলতে লাগল, তোমার কাছে যাওয়ার চান্স পাচ্ছি না বলেই নাকি আমার মাথা বিগড়ে গেছে, খ্যাপা কুত্তা হয়ে গেছি। তাই যাকে তাকে মারধর করে বেড়াচ্ছি৷ আমি তখনো নিজের মেজাজ সামলে উঠতে পারিনি৷ ওই বাস্টার্ডের কথাগুলোই মাথার মধ্যে ছোটাছুটি করছিল৷ তার মধ্যে ওর অপমানজনক কথাবার্তায় আমি আবারও আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যাই। বার কাউন্টারে এসে দু পেগ রেড ওয়াইন পেটে চালান করেই ফিরে এসে ওকেও আচ্ছামতো কয়েটা ঘুসি মেরে দিই৷ এই তো, এরপরই ওর সাথে একচোট হাতাহাতি হলো। হৃদয় আর দিলিশা মিলে আমাদের সামলে নেওয়ার পর আমি আর এক মুহূর্ত ওখানে দাঁড়াইনি।”
কথাগুলো শেষেই মারিশার খুব কাছে এসে দাঁড়াল আশফি। ওর কণ্ঠে অপরাধবোধ, “আমার তখন শুধু মনে হচ্ছিল, মাথার ভেতর যে ঝড়-তুফান চলছে, তা সামলানোর জন্য এই মুহূর্তে কেবল তোমাকেই চাই। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে হার্ট করার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। আসলে ওই লোকটার বলা তোমার ওপর সেই জঘন্য অপবাদগুলো আমাকে সাময়িকভাবে হলেও ভেতরে ভেতরে কুড়ে খাচ্ছিল। এজন্যই হয়তো অবচতেন মনেই আমি অমন ডেস্পারেট হয়ে গিয়েছিলাম, রুডলি টাচ করেছি তোমাকে। আমি সত্যিই খুব লজ্জিত, মাহি।”
মারিশার মনের ভেতরও ইতোমধ্যে প্রলয়ঙ্করী এক তুফান শুরু হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা কামারের নেহাইয়ের মতো ধকধক করছিল, ওর ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই রক্তশূন্য হয়ে পড়ল যেন। কে ছিল ওই লোকটা? ডেনিজ? কিন্তু ডেনিজকে তো আশফি চেনে!
অনেক কষ্টে যেন কথা বের হলো ওর গলা থেকে। পাথরচাপা এক কণ্ঠে ফিসফিস করে ও জিজ্ঞেস করল, “তুমি… তুমি কি ওই কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলে? তাই কি আমার ওপর রাগ সামলাতে পারোনি?”
“একদম না!” কথাটা বলেই মারিশাকে সজোরে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল আশফি। ওর চুলের ভাঁজে মুখ গুঁজে দৃঢ় স্বরে বলল, “বাইরের কোনো একটা জানোয়ারের কথায় আমি তোমাকে অবিশ্বাস করব? আর তুমি কতটা শুদ্ধ ছিলে, তার প্রমাণও তো রাতেই পেয়েছি আমি। তাছাড়াও আমি জানি, আমার গুরাস যতই বেপরোয়া হোক। সে নিজেকে কখনো সবার কাছে সহজলভ্য করবে না। এই ব্যক্তিত্বের জন্যই তো এক টিপিক্যাল বাঙালি পুরুষ হয়েও আমি তোমার প্রেমে পাগল হয়েছিলাম। মাহি, আমার যা কিছু প্রশ্ন, যা কিছু কৈফিয়ত নেওয়ার, তা আমি সরাসরি তোমার কাছ থেকেই নেব। অন্য কেউ আমাকে যা খুশি বললেই আমি তা বিশ্বাস করে তোমাকে ভুল বুঝব, এতটাও টিপিক্যাল না আমি। তাই ওসব আবর্জনা চিন্তা করে একদম ফেডআপ হবে না।”
কথাগুলো শেষ হতেই ওর পিঠটা আঁকড়ে ধরে মাথাটা ওর বুকে পেতে দিয়ে সেখানে নিস্তেজের মতো পড়ে রইল মারিশা। গলায় দলা পাকিয়ে আসে কান্নাটা খুব কষ্টে চেপে রাখল শুধু। আর কিচ্ছু বলল না৷
কিন্তু আশফি ভাবল, তার কথাগুলোতে মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছে হয়তো। নিজের সাথে আরও নিবিড়ভাবে মিশিয়ে নিল ওকে। ওর কপাল, গাল আর ঠোঁটে প্রগাঢ় স্নেহে কতগুলো চুমু খেল৷ তারপর গাঢ় স্বরে বলল, “মাহি, আমি তোমাকে যে কতটা ভালোবেসে ফেলেছি, তা বলে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। এতটা ভালো আমার জীবনে আমি কাউকে বাসিনি৷ আমি আমার মাকে হারিয়েছি খুব ছোটো থাকতে, মার স্মৃতিগুলোও আজ ঝাপসা। হয়তো মা বেঁচে থাকলে তোমার স্থান হত তার ঠিক পরেই।”
আশফির কণ্ঠস্বর আবেগে একটুখানি কেঁপেও উঠল বোধ হয়, “আমি তোমাকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারব না, আমি ঠিক কতটা চেয়েছি তোমাকে৷ আমার সেই চাওয়া আমাকে এতটাই নির্লজ্জ করে তুলেছিল যে, তুমি ডেনিজের সঙ্গে থাকছ জেনেও আমি তখন কামনা করতাম, যদি কিছুক্ষণের জন্যও তোমাকে একটুখানি ভিক্ষা দিতে আমাকে! আমার তৃষ্ণার্ত বুকটা তাতেই একটুখানি শীতল হত৷ তোমাকে হারানোর পর একটা কুকুরের মতোই যেন হয়ে গিয়েছিলাম। আর আজ যখন তুমি আমার শূন্য বুকে ফিরে এসেছ, তখন আমি তোমাকে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই হারাতে চাই না। এখন শুধু একটাই চাওয়া আমার, তুমি আর কখনো আমাকে ছেড়ে যেয়ো না প্লিজ!”
মারিশার কান্নার বাঁধ ভেঙে গেল এবার। আশফির বুকের জামা খামচে ধরে ধরা গলায় সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “যাব না। আমি আর কোনোদিনই তোমাকে ছেড়ে যাব না। এবার তোমাকে হারালে আমি এই দুনিয়া থেকেই হয়তো হারিয়ে যাব।”
আশফি ওর দুই হাতের তালুতে মারিশার মুখটা তুলে ধরল। ওর চোখে তখন প্রশান্ত এক নির্ভরতা। কোমল স্বরে বলল ওকে, “আরে আমার ছিটিয়াল, আমাকে কেন হারাবে তুমি? আমি তো তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। পরিস্থিতি যেমনই হোক, তুমি যতই বদলে যাও না কেন, আমি তোমাকে ঠিক একইভাবে ভালোবেসে যাব আজীবন। বিশ্বাস করো, এই হাত আমি কোনোদিন ছাড়ব না।”
বলেই সে পরম আদরে মারিশার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলটুকু মুছে দিল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে দুষ্টুমির সুরে বলল, “এবার কান্নাকাটি থামাও তো! লক্ষ্মী বউয়ের মতো একটা সুন্দর হাসি দিয়ে আমাকে বিদায় জানাও। বউয়ের এমন দুঃখী মুখ দেখে ঘর থেকে বের হলে কিন্তু বরের সারাটা দিনই মাটি হয়ে যায়।”
তারপর হঠাৎই দিশানের কথা মনে পড়ল ওর৷ কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে যোগ করল, “তোমার দেবর কতদূর চলে এসেছে কে জানে! ওকে তো চেনোই৷ আস্ত এক নাটকবাজ। আমাকে না পেলে এসেই দেখা যাবে লবিতে দাঁড়িয়েই চিৎকার, চেঁচামেচি করে আমার প্রেস্টিজ খাবে।”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩১ (২)
মারিশা আর ওকে দেরি করাল না। মনের ভেতরে পাথরচাপা কষ্ট নিয়েও ঠোঁটে মেকি একটা হাসি ফুটিয়ে সে বিদায় দিল আশফিকে। কিন্তু দরজার ওপাশে আশফির পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই মারিশার সেই কৃত্রিম হাসির বাঁধ এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল। দুহাতে মুখ ঢেকে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ডুকরে ডুকরে কেঁদে বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে দংশন করতে লাগল সে, “আমি কী করব, আল্লাহ? কীভাবে নিজের ভয়ংকর অন্যায়ের স্বীকারোক্তি দেব ওকে? আমি তো মস্ত বড়ো পাপী! আমি চরম মিথ্যাবাদী! আমি ওর সেই শুদ্ধ গুরাসও নেই৷ ওর এত পবিত্র ভালোবাসাকে আমি কী করে ঠকাব? আমার তো মরে যাওয়া উচিত! ইয়া আল্লাহ, আমাকে হয় ধ্বংস করে দাও তুমি, নয়তো ওকে সব সত্যিটা বলার সাহস দাও…”
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সে একসময় অবসন্ন হয়ে মেঝেতেই লুটিয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আচমকা আশফির আগমন ঘটল। চঞ্চল পায়ে সে ঘরে ঢুকল।
