Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩১ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩১ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩১ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

“হুঁ”, মুচকি হেসে মাথাটা ওপর-নিচ দুলাল আশফি, “দেন আ বিগ সারপ্রাইজ অ্যাওয়েটস ইউ।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে আশফির ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে গেল, “তোমার ভাই কল করছে কেন?”
​“ভাইয়ার রুম তো আমাদের ঠিক পাশেই, তাই না?”
​“হুঁ, দরকার পড়লে এসে নক করলেই তো হতো”, বলতে বলতেই আশফি কলটা রিসিভ করে কানে ঠেকাল। “হ্যাঁ, বল।”
​ফোনের ওপাশ থেকে মিরানের শ্লেষাত্মক কণ্ঠস্বর ভেসে এল তখন, “কীরে, ঘর থেকে আজ আর বের হওয়ার কোনো ইচ্ছে টিচ্ছে নেই না-কি?”

“কেন, আমি নেই বলে কোনো অঘটন ঘটল না-কি?”
​“অঘটন আবার কী? সেই দুপুরে ঢুকেছিস, এখন রাত প্রায় ছুঁই ছুঁই। লজ্জাশরম কি সব বিসর্জন দিয়েছিস?”
​আশফি একটু আয়েশ করে বসল এবার। ঠোঁটে একটা শয়তানি হাসি ফুটিয়ে জবাব দিল, “তা লজ্জাটা কার সামনে পাব, শুনি? আমি এখন আপদকালীন হানিমুনে আছি। এটা তো আর শ্বশুরবাড়ি না যে, নতুন বউ নিয়ে সারাদিন ঘরের দরজা আটকে বসে থাকতে আমার লজ্জা হবে!”
মিরান একটা ধমক দিল, “হানিমুন, না? বেহায়া কোথাকার! শ্বশুরবাড়ি না থাক, এখানে তোর সুমুন্দি নেই?”
​“তাতে কী হয়েছে?” আশফি এবার মোক্ষম একটা জবাব দিল, “এই তো কয়েক বছর আগে, আমাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে কিচেনে দাঁড়িয়ে ঐন্দ্রীর সাথে যে পর্যায়ের চুমুলীলাটা করলি, তারপর কি তোকে আর লজ্জা পাওয়ার কিছু আছে?”

​“চুপ কর, হারামজাদা!” মিরান ওপাশ থেকে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “মাহির সামনে বসে এসব নোংরা কথা বলছিস তুই?”
​নিঃশব্দে হাসল আশফি। একবার আড়চোখে মারিশার দিকে তাকাল। দেখল, মেয়েটা চরম বিব্রত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। তা দেখে আর কথা বাড়াল না।
​মিরান তখন ওপাশ থেকে আবারও ধমকে উঠল, “বেয়াদব, জলদি বাইরে আয়! আমি তোদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি।”
আশফি মেকি বিরক্তি প্রকাশ করল, ​“তুই তো ভারি এক ডিস্টার্ব দেখি! তোকে আমাদের দরজায় কে পাহারা দিতে বলেছে?” ​
“দরকার আছে আমার মাহির সাথে। তুই কি দরজা খুলবি?”
​“না খুলে তো আর নিস্তার নেই। দাঁড়া আসছি।”
​মারিশাকে রেখে আশফি উঠে দাঁড়াল। মারিশা তখন ওকে চোখ রাঙিয়ে একটু শাসনের সুরে বলল, “তুমি এত অসভ্য কেন? ভাইয়ার ব্যাপারে এসব কথা আমার সামনে আর কখনো বলবে না কিন্তু।”
​হো হো করে হেসে উঠল আশফি। “তোমার ভাই আমাকে আগে বেহায়া বলল কেন? তাই তো মনে করিয়ে দিলাম আসল বেহায়া কে ছিল!”

​বলতে বলতেই ওর চেহারায় হঠাৎ একটুখানি গম্ভীর ছায়া পড়ল, “তবে তোমার ভাই কাজটা ঠিক করেনি। চিল করার জন্য ঐন্দ্রীর মতো একটা সহজ-সরল মেয়েকেই বেছে নিতে হলো ওর? আর শেষ পর্যন্ত যদি ছেড়েই দেবে, তবে বিয়ের মিথ্যা স্বপ্নটা না দেখালেই পারত। এই এক জায়গায় দেখছি তুমি আর তোমার ভাই একদম একই।”
​নিজের প্রতি করা বিদ্রূপটা মারিশা মুখ বুজে সইলেও ভাইয়ের ওপর আসা এই মিথ্যা অপবাদ সে সইতে পারল না। মুখটা থমথমে হয়ে উঠল তার। তীব্র প্রতিবাদী স্বরে বলে উঠল, “ভাইয়াকে কোনো দোষ দিও না, আশফি। ওদের সম্পর্কটা ঐন্দ্রী নিজেই ভেঙেছে। ইস্তাম্বুল ফেরার পর একদিকে আমাকে নিয়ে কখনো হাসপাতাল, কখনো সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে ছুটতে হয়েছে ভাইয়াকে। অন্যদিকে এজেন্সির বিশাল চাপ, তার ওপর বাবার অসুস্থতায় বারবার হাসপাতালে দৌড়ানো — এত কিছু সামলাতে গিয়ে ও নিজের জন্য এক দণ্ড সময় বের করতে পারছিল না। ফলে ওদের মধ্যে একটা বড়ো কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়। ঐন্দ্রী সেটা মানতে পারেনি, ভাইয়াকে অহেতুক সন্দেহ করতে শুরু করল। আর শেষে নিজেই বিচ্ছেদ চেয়ে বসল। ভাইয়া তখন চাইলেও তো সব ফেলে দেশে ফিরে যেতে পারত না! অনেকগুলো দিন খুব আপসেটও দেখাত ওকে।”

​কথাগুলো বলতে বলতে মারিশার কণ্ঠে জমাটবদ্ধ এক বিষাদ নেমে এল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান স্বরে যোগ করল, “বিপদটা যখন যার ওপর দিয়ে যায়, সে ছাড়া সেই পরিস্থিতির জটিলতা আর কেউ অনুভব করতে পারে না। এমনি এমনি কি কেউ কখনো কাউকে ছেড়ে চলে আসে?”
​আশফি এবার একদম স্থির হয়ে মারিশার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। ওর চাউনিতে তখন প্রগাঢ় কৌতূহল৷ খুব ধীরস্থিরভাবে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল ও, “আমিও তো সেই জটিল কারণগুলোই জানতে চাই, মাহি। আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর কেন আমাকে একবারও স্মরণ করলে না তুমি, তার পেছনের সেই রূঢ় সত্যটুকু জানার কি কোনো অধিকার নেই আমার?”

মারিশা তখন চট করে চোখটা নামিয়ে নিল। আশফির চোখে চোখ রেখে জবাব দেওয়ার সাহসটা ওর নেই। কান্না দমানোর আপ্রাণ চেষ্টায় ওর চোখের পাতাজোড়া তিরতির করে কাঁপছে। কী করে বলবে সে সত্যটা? বুকের ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে একটাই আশঙ্কায় — যদি সবটা শোনার পর আশফি ঘৃণাভরে তাকে চিরতরে ত্যাগ করে?
​কয়েক পলের এই নিস্তব্ধতা আশফির কাছে যেন অনন্তকাল মনে হলো। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, মারিশার চেহারাতে অদ্ভুত এক ভীতি আর অপরাধবোধের ছায়া। তাই যেন অধৈর্য হয়ে উঠল আরও বেশি, “সম্পর্কটা নতুনভাবে শুরু হওয়ার আগে আমাদের মধ্যে সব ধোঁয়াশাটুকু কাটানোর ইচ্ছেটা কি তোমার নেই, বলো?”
মুখটা তুলে ভেজা চোখে তাকাল মারিশা। ঠোঁট জোড়া কেঁপে উঠল কিছু বলার জন্য। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় সজোর করাঘাত আর সেই সাথে মিরানের বিরতিহীন হাঁকডাক শুরু হলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তখন আশফি। নিজের ভেতরের হতাশাটুকু গিলে নিয়ে, ​পা চালিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই মিরান মুখের ওপর গোটা কয়েক কড়া গালাগাল ছুড়ে দিল ওকে। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না সে। পকেটে হাতদুটো পুরে, দৃষ্টি নামিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পিছু ফিরে না তাকিয়েও সে টের পেল, পিঠের ওপর বিঁধে আছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মিরানের বিস্ময়ভরা চাউনি।

রিসোর্টের দোতলার করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় কাঠের মেঝের মচমচে শব্দটা এ মুহূর্তে কেমন বিচ্ছিরি লাগছিল আশফির কানে। নিচতলায় নামার সিঁড়িটা পেরিয়ে আসতেই প্রশস্ত লবি, যেখানে পীত বর্ণের টিমটিমে আলোয় কয়েকটা নেপালি মুখোশ দেয়ালে ছায়া ফেলছে। রিসেপশন পার হয়ে সে যখন কাঁচের ভারী দরজা ঠেলে বাইরে পা রাখল, পাহাড়ের হিমেল হাওয়া এক ঝটকায় ওর মনের ভেতরের তপ্ত ক্ষোভটুকু যেন উড়িয়ে নিতে চাইল।
​রিসোর্ট থেকে বের হতেই সামনে চওড়া লেকসাইড রোড। রাতের পোখারা তখন আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে। রাস্তার দুপাশে রঙিন নিয়োন সাইন লাগানো ক্যাফে, ধূপের গন্ধ মাখানো স্যুভেনিয়ার শপ আর পশমি কাপড়ের দোকানগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। কোথাও হাসাহাসি, কোথাও ক্যাফে থেকে ভেসে আসা গিটারের হালকা সুর, সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত কোলাহল। আর এই উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেই রাস্তার ধারের এক খোলা ক্যাফেতে বসে ছিল দিব্য আর হৃদয়। ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে ওরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। তারপর হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে আশফিকে আনমনে হেঁটে যেতে দেখে পেছন থেকে দিব্য চিৎকার করে উঠল, “কিরে ওই? আশফিইইই? ওই, কই যাস? এদিকে আয়!”

​হৃদয়ও হাত নেড়ে ডাকল বেশ কয়েকবার। কিন্তু আশফি যেন তখন নিজের অস্তিত্বের অতল গহ্বরে ডুবে আছে। ক্ষোভ আর ব্যথার এমন এক দেয়ালে সে বন্দি যে, বন্ধুদের পরিচিত কণ্ঠস্বর ওর কান অবধি পৌঁছালই না। পাথরের মূর্তির মতো সে সামনের দিকে হেঁটে গেল।
মারিশার ওই অপরাধবোধ মাখানো নীরবতা, ওর ভেজা চোখের ভীতিপূর্ণ চাহনি ওকে একদম শান্তি দিচ্ছে না। একটা বাজে খচখচানি অনুভব হচ্ছে মনের মধ্যেও। মারিশাকে নিয়ে হওয়া ওর ষষ্ঠেন্দ্রীয়টা এবার কেমন এক ভয়ঙ্কর কিছুর ইশারা দিচ্ছে যেন। ওকে আভাস দিচ্ছে, ওর থেকে খুব খারাপ কিছু একটা লুকাচ্ছে মারিশা৷ যেটা হয়তো ওর সহ্যসীমারও বাইরে!

​রাস্তা পেরিয়ে ফেওয়া লেকের সমান্তরাল পায়ে চলা অন্ধকার পথটিতে উঠে এল আশফি। লেকসাইড রোডের কৃত্রিম আলো এখানে এসে ম্লান হয়ে গেছে। লেকের শান্ত কালো জলের ওপর দূর পাহাড়ের ছায়া আর আকাশের ঝাপসা নক্ষত্রগুলো এক অপার্থিব সৌন্দর্য আর সেই সাথে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তৈরি করেছে। তীরে সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা রঙিন ডিঙি নৌকাগুলো আধো-অন্ধকারে জবুথবু হয়ে পড়ে আছে।
কিছুটা পথ আনমনে হাঁটার পর লেকের একদম ধার ঘেঁষে থাকা একটি নির্জন পাথুরে বেঞ্চে এসে বসল সে। ​চারপাশটা এখানে বেশ নিরিবিলি। সামনের লেকের জলে পাহাড়ি বাতাসের মৃদু ঢেউগুলো একে একে তীরে এসে আছড়ে পড়ছে, যার শব্দে মিশে আছে যেন ওর বুকের মধ্যে জমে থাকা হাহাকার। দূরে কোথাও কোনো এক নেপালি বৃদ্ধের সারেঙ্গিতে করুণ এক ধুন বাজছে। সেটা যেন ওর এই নিঃসঙ্গতাকে আরও গাঢ় করে তুলতে চাইছে।
গা টা এলিয়ে বসল আশফি। মাথার ওপরে নক্ষত্রখচিত বিশাল আকাশ আর সামনে অতল জলের এই নিথর বিস্তৃতিতে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র অনুভব করল ও। ফোনের স্ক্রিনে একবার চোখ বুলিয়ে পকেটে রেখে আবার দূরে তাকাল, যেখানে আঁধারের বুক চিরে পাহাড়ের মাথায় দু-একটা আলো জোনাকির মতো জ্বলছে। চার বছরের শূন্যতাগুলো হৃদয়ের খাঁজে যেন ওই কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের মতোই গুমোট হয়ে আছে। যা বৃষ্টি হয়ে ঝরতেও পারছে না, আবার সরেও যাচ্ছে না।

মস্তিষ্কের ভেতর চিন্তার হিংস্র পোকাগুলো কিলবিল করছে আশফির। ট্রাওজারের পকেট থেকে লাইটার আর প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরল সে। আগুনের শিখাটা জ্বলে উঠতেই নিকোটিনের প্রথম টানটা ফুসফুসে টেনে নিয়ে সে মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিল। দৃষ্টি আটকাল তখন নিস্তব্ধ আকাশের বুকে। মারিশা একটু সুস্থ হলেই সে ভেবে রেখেছিল, সবার থেকে বিদায় নিয়ে ওরা শৈলশহরে যাবে। তামাখোর ক্রিকের আশেপাশে কোথাও ক্যাম্পিং করবে কেবল একাকী দুজন। কিন্তু ওর মনটা বলছে, তা হয়তো আর হবে না।
উদাস মনে সিগারেটে আরেকটা টান দিল সে। ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো লেকের হিমেল বাতাসে মিলিয়ে যা আগেই ওর নির্জনতায় ছন্দপতন ঘটল। অদূরেই কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল যেন। বুটের তলার মৃদু শব্দটা ক্রমশ ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। আড়চোখে তাকাল আশফি। দেখল, হাঁটুর নিচ অবধি ঝুলে থাকা ওভারকোট পরা এক আগন্তুক ওর দিকেই আসছে। লোকটার গায়ের রং তুষারের মতো ফর্সা, আর চওড়া হ্যাটটার নিচে আটকে থাকা চোখদুটো অদ্ভুত নীলাভ। দেখতে বেশ সুদর্শনই৷ মাথায় তার একটা রাজকীয় স্ট্র হ্যাট।

একজন অভিজ্ঞ ট্রাভেলার বলে দুনিয়ার নানা প্রান্তের মানুষ দেখেছে আশফি। তাই ওর চোখে লোকটার এমন বেশভূষা পোখারার এই পরিবেশে বড্ড বেমানান আর অদ্ভুতদর্শন লাগল।
​লোকটা এসে দাঁড়াল ওর সামনেই। অত্যন্ত মার্জিত স্বরে ইংরেজিতে বলল, “ইক্সকিউজ মি, উড ইউ মাইন্ড ইফ আই টুক দিস সিট ফর আ বিট? এভরিহোয়্যার এলস সিমস রাদার ক্রাউডেড।”
কিছুটা বিরক্তই হলো আশফি। ও আসলে চেয়েছিল এই নির্জনতায় একা কিছুক্ষণ সময় কাটাতে। তবুও ভদ্রতার খাতিরে সংক্ষিপ্ত করে মাথা নেড়ে বসার অনুমতি দিল।
লোকটা এসে পাশে বসতেই আশফি তাকে আপাদমস্তক মেপে নিল একবার। চালচলন আর অবয়ব দেখে অনুমান করল, বয়সটা ওর কাছাকাছিই হবে হয়তো। তারপর চোখটা ফিরিয়ে নিল৷ মনে মনে ঠিক করল, সিগারেটটা শেষ করেই উঠে পড়বে৷ কয়েক মুহূর্ত যেতেই আড়চোখে খেয়াল করল, এক দৃষ্টিতে লোকটা ওকেই দেখছে। অচেনা কারও এমন আচরণ বরাবরই অসহ্য লাগে ওর। কী ভেবে সৌজন্যের খাতিরে নিজের প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরে একটা সিগারেট অফার করল তাকে।

​আগন্তুকটাও খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল। যেন এই অফারটার জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। সিগারেটটা ধরিয়ে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে সে তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। তারপর হুট করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল, “বিশ্বাস করুন, স্যার, আমি আপনার বিশাল এক ভক্ত। আপনাকে দেখেই এজন্য আপনার কাছে আসার লোভটা সামলাতে পারলাম না।”
​সামান্য অবাক হয়ে তাকাল আশফি। একজন এক্সট্রিম ট্রাভেলার বা অ্যাডভেঞ্চারার, আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকার হিসেবে ওর পরিচিতি বিশ্বজুড়ে থাকলেও, এই নির্জন রাতে পোখারার লেকের ধারে কেউ ওকে এভাবে চিনে ফেলবে, সেটা একটু অভাবনীয়ই ছিল।
​লোকটা ওর বিস্ময় অগ্রাহ্য করে মুগ্ধতার সুরে বলতে লাগল, “আপনার সেই আর্কটিকের ডকুমেন্টারিটা আমি অন্তত দশবার দেখেছি।”

সিগারেটে দ্বিতীয় টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চঞ্চল গলায় বলতে লাগল সে, “আর্কটিকের সেই মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রির রাতটার কথা মনে আছে আপনার? আপনার সেই ডকুমেন্টারিটা দেখার সময় আমি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। চারদিকে যখন প্রচণ্ড তুষারঝড় আর হাড়কাঁপানো বাতাস আপনার তাবুটা ছিঁড়ে তছনছ করে দিচ্ছিল, তখন আপনি কী অদ্ভুতভাবে তুষারের নিচে গর্ত খুঁড়ে নিজেকে জ্যান্ত কবর দিলেন! বরফকেই নিজের বর্ম বানিয়ে মৃত্যু ডেকে আনা সেই মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রির রাতটা পার করা, ওটা স্রেফ মিরাকল ছিল। মৃত্যুর একদম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি যখন কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড় করে বলছিলেন, ‘আমার গল্প এখনই শেষ হতে পারে না … ‘ও খোদা, আমি তো মরতে আসিনি … আমি মরতে চাই না!’ তখন আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল, উফ! ওই দৃশ্যটা কোটি মানুষের মতো আমাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। একজন মানুষের স্নায়ু কতটা ইস্পাতকঠিন হলে ওই হিমশীতল কবরে শুয়েও প্রাণের স্পন্দন টিকিয়ে রাখা যায়, সেটা আপনাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, স্যার।”

আশফি এবার একটু নড়েচড়ে বসল। আগন্তুকের কণ্ঠে চাটুকারিতা নেই ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের জীবনের কোনো পুরনো অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শোনার মতো মানসিক অবস্থায় সে নেই। ওর অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর বিপরীতে মারিশার নিরুত্তর থাকা নিয়ে ওর মাথার ভেতর এখনো জট পাকিয়ে আছে। তাই এই অপরিচিত লোকটার অনাহূত আলাপচারিতা ওকে ভেতরে ভেতরে আরও বেশি ত্যক্ত করে তুলল।
​ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা চেপে ধরে সে আড়চোখে আরেকবার লোকটাকে মেপে নিল। নীল চোখের এই অদ্ভুত পোশাক পরা ব্যক্তিটির উপস্থিতিতে কেমন এক প্রচ্ছন্ন অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে ওর। যাই হোক, সে তো গলে যাওয়ার মতো মানুষ নয়। দীর্ঘদিনের যাযাবর জীবনে সে বহু বিচিত্র মানুষের মুখোমুখি হয়েছে। পোখারার এই ভিড়ে হুট করে কেউ এভাবে আলাপ জমানোর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই সে কোনো বাড়তি আবেগ না দেখিয়ে শুধু ধোঁয়া ছাড়ল।

​“আমার কাজগুলো আপনার বেশ নখদর্পণে দেখছি”, আশফির কণ্ঠে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, বরং এক ধরনের নির্লিপ্ততা প্রকাশ পেল, “তবে এই শান্ত পরিবেশে ওসব অ্যাডভেঞ্চারের গল্প থেকে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করাটাই কি বেশি ভালো নয়?”
​লোকটা হ্যাটটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো চপলতা নেই। বরং এক ধরনের স্থৈর্য আছে।
আড়চোখে আশফি আরেকটু লক্ষ করল, লোকটার বসার ভঙ্গি আর হাতের আঙুলের নড়াচড়া। সবকিছুতেই একটা আভিজাত্য মেশানো শৃঙ্খলা আছে যেন। সে যে আর দশটা সাধারণ টুরিস্টের মতো শুধু অটোগ্রাফ নিতে আসেনি, সেটা ওর অভিজ্ঞ চোখ এড়াল না।
এবার সরাসরি লোকটার চোখের দিকে তাকাল ও। দৃষ্টিতে সূক্ষ্ম এক যাচাইয়ের ছাপ ওর, “আপনার পরিচয়টা কী, বাডি? সেটা তো জানা হলো না?”
মুচকি হাসল লোকটা, “আমি? আমি এখন আপনার মতোই একটু যাযাবর জীবনযাপন করছি৷ আমার মাদারল্যান্ড ইস্তাম্বুল।”

বারান্দার ঠিক নিচেই লেকের পাড়ে কে যেন ছোটো করে ক্যাম্পফায়ার জ্বালিয়েছে। সেই আগুনের কমলাটে শিখা অন্ধকারের বুক চিরে নাচছে, আর তার মৃদু সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে ওপরের তলায়। এই হিমশীতল নির্জনতায় দাঁড়িয়েও ওর ভেতরের অস্থিরতাকে একটুখানিও শান্ত করতে পারল না।
বারান্দার চেয়ারটায় বসে একটা সিগারেট ধরিয়েছে মিরান। আশফি তখন যেভাবে থমথমে মুখ করে বেরিয়ে গেল, সেটা দেখে ও বেশ চিন্তিত। নীরবতা কাটিয়ে চুপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত গলায় বলল, “অমন মুখ কালো করে আশফি বেরিয়ে গেল যে? তুই কি কিছু বলেছিস ওকে?”
রেলিং ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে মারিশা। ভাইয়ের প্রশ্নে চট করেই উত্তরটা দিল না। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর যখন কথা বলল, ওর গলার স্বরটা একটু ভাঙা শোনাল তখন, “কিছু বলিনি বলেই তো সমস্যা। ও আশা করেছিল আমি আজ সব পরিষ্কার করে দেব।”

​তারপরই মিরানের দিকে ফিরে তাকাল। চোখের কোণে পানি জমে আছে ওর, “সত্যিটা লুকিয়ে আমি কি ভুল করছি, আবি? নাকি সব বলে দেওয়া উচিত? আমি … আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিত।”
জবাবে ​মিরানও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বলল, “সত্যিটা বললে খুব খারাপ হবে রে। ও সবার আগে তোর ভালোবাসার ওপর থেকে বিশ্বাস হারাবে। এক ফোঁটাও ভরসা অবশিষ্ট থাকবে না হয়তো। আর এবার ও ঠিক কতটা ভেঙে পড়বে আর কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে, সেটা ভেবেই আমার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগছে।”
জলে থইথই করা চোখদুটো নিয়ে মারিশা আবার লেকের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে মুখ ফেরাল। কান্নায় বুজে আসা গলায় খুব অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “ও আমাকে একেবারে ছেড়ে চলে যাবে, তাই না রে ভাইয়া?”
বোনের দিকে ভীষণ মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকাল মিরান। কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। বরং নির্লিপ্ত গলায় যোগ করল, “কিন্তু এভাবে সত্যিটা ঝুলিয়ে রাখাটাও তো ওর জন্য এক ধরনের শাস্তি। দিন দিন সন্দেহ বাড়বে। এই সম্পর্কটা নতুন করে শুরু করলেও তোরা কেউ-ই মানসিক শান্তিতে থাকতে পারবি না।”

এরপর বেশ কতক্ষণ ঘরের ভেতর আর কোনো শব্দ শোনা গেল না। বারান্দার ওই টিমটিমে হলদেটে আলোয় দুই ভাইবোন মূর্তির মতো চুপচাপ বসে রইল। মারিশার এই অসহ্য দ্বোটানার কোনো সহজ সমাধান মিরানের কাছেও ছিল না।
বাইরের হিমেল বাতাস এসে মারিশার গায়ের চাদরটা বারবার কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু ওর ভেতরে চলা অস্থিরতার কাছে বাইরের এই শীত কিছুই না।
​বেশ অনেকটা সময় পর গালের ওপর শুকিয়ে আসা জলের দাগ মুছে মারিশা সোজা হয়ে বসল। ওর বিষণ্ণ চোখের চাউনিতে হঠাৎ এক ধরনের কাঠিন্য ফুটে উঠল। দীর্ঘক্ষণ নিজের সাথে লড়াই করার পর একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাল সে। ও সেই স্থির চাউনিই বলে দিচ্ছিল, এবার হয়তো বড়ো কোনো পদক্ষেপই নিতে যাচ্ছে মেয়েটা।

রাত দশটা পার হয়ে গেছে। ফেওয়া লেকটা এখন এক বিশাল অন্ধকার গহ্বরের মতো স্থির পড়ে আছে। রিসোর্টের করিডোরগুলোতে জনমানুষের চিহ্ন নেই, শুধু পাইন গাছের সারির ভেতর দিয়ে বয়ে আসা বাতাসের একটানা দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা কুয়াশার চাদরটা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে রিসোর্টের বারান্দাগুলোকে গিলে খাচ্ছে। এই নিঝুমতায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকগুলোও কেমন ক্লান্ত শোনায়। প্রকৃতির এই থমথমে নীরবতা যেন বড়ো কোনো বিস্ফোরণের অপেক্ষা করছে।
​ঘরের ভেতর তখন টেবিল ল্যাম্পের ম্লান হলদেটে আলোয় মারিশার কলমটা দ্রুত চলছিল। নিজের নোটপ্যাডের কয়েকটা সাদা পৃষ্ঠা ইংরেজিতে অনেকগুলো শব্দ আর কাটাকাটিতে ভরে ফেলেছে সে। তবে এটা কোনো চিঠি নয়, তার বুকের ভেতর চেপে রাখা চারটা বছরের গোপন দহন আর সকল লুকানো সত্যের এক করুণ স্বীকারোক্তি।
লেখাটা শেষ করে কলমটা সরিয়ে রাখল সে। লেখা শেষে করে আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল ওর৷ একটা লম্বা, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নোটপ্যাডের কাগজগুলো ছিঁড়ে ভাঁজ করল, তারপর বিছানার পাশের ক্যাবিনেটের ওপর ওটা রেখে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল।
​ঠিক তখনই দরজার ওপাশে একটা শব্দ হলো। কোনো কড়া নাড়া নয়, যেন কেউ দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছে।

​“মাহি… দরজাটা খোলো। জলদি খোলো, প্লিজ… মাহি?”
​এ তো আশফির কণ্ঠস্বর। কিন্তু সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য বা আভিজাত্যের লেশমাত্র নেই তাতে। কেমন অদ্ভুত এক কাতরতা ঠিকরে বের হচ্ছে প্রতিটি শব্দে। বুকটা ধক করে উঠল মারিশার। কী হলো মানুষটার? দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই দরজার পাল্লাটা সামান্য ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল আশফি।
​কিন্তু তাকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল মারিশা। তার সবসময়কার পরিপাটি চুলগুলো এখন অবিন্যস্ত আর গলায় জড়িয়ে রাখা মাফলারটা উধাও। সবচেয়ে ভয়ংকর তার চোখ দুটো — রক্তাভ আর টলমলে। শরীরের নড়াচড়া আর বাতাসের সাথে মিশে আসা কড়া অ্যালকোহলের গন্ধটা বলে দিচ্ছে, মানুষটা আজ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। প্রচণ্ড নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে।
​মারিশা দ্রুত হাত বাড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল, পাছে বাইরের কেউ এই দৃশ্য দেখে ফেলে। উদ্বিগ্ন গলায় অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “এই? এটা কী অবস্থা তোমার! তুমি … তুমি ড্রিঙ্ক করেছ? আনবিলিভেবল!”

​কোনো উত্তর দিল না আশফি। জড়ীভূতের মতো স্থির হয়ে মারিশার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। সেই চাউনিটা বড়ো অদ্ভুত আর তীক্ষ্ণ। মনে হচ্ছিল, সে যেন মারিশার এই অতি চেনা মুখটার ভেতরে নতুন কোনো অচেনা মানুষকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। আর তার ওই অপলক দৃষ্টি দেখে মারিশার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। কেমন এক অশুভ ইঙ্গিত দিল ওর অন্তরিন্দ্রিয়।
​কিন্তু সেই নীরবতা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আশফি হঠাৎ এক উন্মত্ততায় মারিশাকে নিজের দুই হাতের শক্ত বেড়াজালে বন্দি করে ফেলল। মারিশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাগলের মতো ওর সারা মুখে, ঠোঁটে, আর গলায় তপ্ত, ভেজা চুমুতে নাজেহাল করে তুলল। তার প্রতিটি স্পর্শে এক ধরনের মরিয়া তৃষ্ণা অনুভব করল মারিশা
​“অ্যাই আশফি, প্লিজ… শান্ত হও! কী করছ”, তার বুকে দুহাত দিয়ে ঠেলে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল মারিশা, “আমার কথা শোনো। তোমাকে কিছু একটা দিতে চাই আমি।”

কিন্তু ​আশফি কোনো কথায় শুনল না। সে যেন এখন এক অবাধ্য, জেদি বালকের মতো। মারিশার গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে উন্মত্তের মতো আদর করতে করতে সে অস্ফুট স্বরে আবদার জুড়ে দিল, “কিন্তু আমি শুধু এই মুহূর্তে তোমাকে চাই। প্লিজ সোনা, আজ একটু সামলে নাও আমাকে। একটুখানি…”
​তার কণ্ঠের এই অসহায়ত্ব আর অবুঝ আকুতি এক লহমায় মারিশাকে দুর্বল করে দিল। ও বুঝতে পারল, আজ রাতে কোনো সত্য বা কোনো যুক্তিই এই মানুষটার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। বহু দিনের এক বুক শূন্যতা নিয়ে, অধৈর্য হয়ে সে কেবল আজ ওর সান্নিধ্য খুঁজছে।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩১

মুখ ফুটে নিজের কথাটুকু প্রকাশের সুযোগটাও পেল না মারিশা। তার আগেই আশফি নিজের সোয়েটারটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলল। মারিশা তখন বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করল, বাইরের এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডাতেও ওর সারা শরীর যেন তপ্ত অগ্নিকুণ্ড। ঘামে ভিজে একাকার হয়ে থাকা ওর চওড়া বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।
​আশফি তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। নিজের স্বাভাবিক চেতনাটুকু হারিয়ে সে যখন মারিশাকে বিছানায় নিজের বুকের নিচে বন্দি করল, তখনো সে টের পেল না তার হাতের প্রবল চাপে মারিশার কাঁধের পুরনো চোটটা আবার জেগে উঠেছে। অসহ্য সেই মরণ ব্যথায় মারিশার চোখদুটো নোনাজলে ভিজে উঠল ঠিকই, কিন্তু আজ সে আর কোনো দেয়াল তুলল না দুজনের মাঝে। বরং এই তপ্ত বুকের নিচে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে সে শুধু বুঝতে চাইল, চারটা বছর এই পুরুষটার দূরত্বে কাটিয়ে সে নিজেও কতখানি হাহাকার বুকে জমিয়ে একেকটি তৃষিত রাত পার করেছিল।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২