Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৪

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৪

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি

ঝটিতি ফিরে তাকাল মারিশা‚ “কী?”
প্রথমে দেখাল ওকে চরম বিস্মিত—শেহনানের তীব্র সুরের কথাগুলো যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না ওর। তারপরই চোখের তারায় জ্বলে উঠল সংযম ভাঙা রাগ। দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে বেরিয়ে পড়ল সে।
“কী করবেন বললেন”‚ বলতে বলতে শেহনানের দিকে অগ্রসর হলো সে এমন ভঙ্গিতে‚ যেন মুঠো পাকিয়ে এক ঘুসিতে শেহনানের সুন্দর খাড়া নাকটা থেবড়ে দেবে এক্ষুনি।
ওর চোখ-মুখের ভঙ্গিমা দেখে শেহনানেরও ঠিক তাই-ই মনে হলো। শুধু চুলগুলো ছোটো থাকলে অনায়াসেই ওকে ‘টম বয়’ বলে দেওয়া যেত।

মারিশা যত এগোচ্ছে‚ শেহনান ততই পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে৷ না‚ মেয়েটার হাতে মার খাওয়ার ভয়ে নয়৷ আবেগের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে‚ বা জ্বরের ঘোরে যত যা-ই করুক‚ জনসম্মুখে এমন কিছু করবে না‚ তা শেহনান জানে। কিন্তু তার চেয়ে কমও করবে না‚ এটাও সে নিশ্চিত। দেখা গেল একেবারে পায়ের ওপর উঠে পড়ে তার কলার চেপে ধরছে। তারপরই শুরু করবে চেঁচামেচি। সবার সামনে ইজ্জতটা তার তখনই যাবে—এ আশঙ্কাতেই তার পিছু হটা।
তবে বুঝতে পারল সে‚ এভাবে আজ অবধি কেউ এই আহ্লাদীকে বকেনি বলেই খেপে গেছে এতটা। তার ওপর আবার চটপটে মেজাজের কিনা! কিন্তু এসব পরোয়া করা মানুষ তো আর সে নয়।
ঠান্ডা চোখে চাইল শেহনান৷ কিন্তু চাপাস্বরে হুমকিটা ছুড়ল খুব কড়াভাবে‚ “কোনোরকম সিন ক্রিয়েট করলে আমার চেয়ে খারাপ কিন্তু আপনি হতে পারবেন না। প্রয়োজনে ইস্তাম্বুল থেকে মীরান বারিশ সুলতানের কান ধরে টেনে আনব। বারবার ওর ছিটিয়াল বোনকে আমার ঘাড়ে তুলে দেওয়ার কৈফিয়তটাও নেব।”
মুহূর্তেই থেমে গেল মারিশা। দ্রুত শান্তও করল নিজেকে। তবে ভেতরে ভেতরে রাগটা জমিয়ে রাখল এই অপমানগুলোর৷ লম্বা করে শ্বাসটা নিয়ে দৃষ্টিজোড়া সরাল শেহনানের ওপর থেকে। খুব কষ্টেসৃষ্টে তারপর উচ্চারণ করল‚ “সরি।”

“ওই সরি দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই”‚ শেহনানও অন্য দিকে ফিরেই জবাবটা দিল।
বক্রাক্ষে তাকাল মারিশা‚ “তাহলে কী দিলে কাজ হবে?”
“আমাকে কিছু দেওয়ার মতো সামর্থ্য আর যোগ্যতা‚ কোনোটাই আপনার নেই। শুধু আমাকে কোনো কারণে চটাবেন না‚ বিরক্ত করবেন না। এটাই কেবল চাওয়া।”
কোনো জবাব দিল না মারিশা। হঠাৎ বিষণ্ণতা ভিড় করল তার চোখে। কেমন স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শেহনানের দিকে। শেহনানও চাইলো তখন তার দিকে। ভালোই পড়তে পারল ওই চোখের ভাষা। তবুও সে নির্বিকার৷ বললও তেমনইভাবে‚ “উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন যেহেতু‚ সেহেতু চেষ্টা করবেন কাউকে নিজের ঝামেলাতে না ফেলতে‚ চিন্তাতে না ফেলতে৷ সারা পথ আপনার অসুস্থতার দেখভাল করা আমাদের কারও দায়িত্বও না‚ কর্তব্যও না‚ রাইট? চোখে-মুখে পানি দিয়ে‚ খেয়েদেয়ে নিজেকে ফিট রাখার চেষ্টা করুন।”
“অলরাইট”‚ মাথাটা ঝাঁকাল মারিশা।

এর মাঝে অদূরে দাঁড়ানো বন্ধু চারজন ওদের দুজনের নিচুস্বরে চলা কথোপকথন না শুনতে পেলেও‚ ওদের মুখভঙ্গি‚ অঙ্গভঙ্গি দেখে কারোরই আর সন্দেহ হতে বাদ রইল না‚ এরা একে অপরকে নিশ্চয়ই আগে থেকে চেনে। দিব্য বাদে বাকি তিনজন অপেক্ষায় রইল‚ শেহনান ফিরলেই ‘ঘটনা কী’ তা জানার জন্য চেপে ধরবে তারা৷ কিন্তু দিব্যর যে অত ধৈর্য নেই!
রেস্তোরাঁগুলো সাধারণত নদীর খুব কাছেই তৈরি করা হয়েছে। রেস্তোরাঁর এক পাশ দিয়ে সরু একটি পথ নিচে নেমে গেছে‚ যেটা সরাসরি নদীর কাছে নিয়ে যায়। পথটি প্রতিটি ধাপ পাথর দিয়ে তৈরি। তার দু’পাশে ছোটো ছোটো পাহাড়ি গাছ আর লতা-পাতা। শেহনান আর মারিশার ভেতর ঘটছে কী‚ তা জানতে দিব্যও এগোল‚ আর মারিশা তখনই নদীতে যাওয়ার ওই সরু পথের দিকে হনহনিয়ে রওনা হলো। সেদিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে পেছন থেকে শেহনান বলে উঠল‚ “আশ্চর্য! ওদিকে কী?”

“বেনিম জেহেন্নেমিম”‚ উত্তপ্ত মেজাজে বাংলা ভুলে মাতৃভাষাতে চেঁচিয়ে উঠল মারিশা। বলার সময় দাঁড়ালও না‚ পিছুও ফিরল না৷
এদিকে কথাটা সবার কানেই পৌঁছল৷ অবাক চেহারায় বাকিরাও দিব্যর পিছু পিছু এল শেহনানের কাছে। বোকা বোকা চোখ করে মারিশার যাত্রাপথে তাকিয়ে দিব্য জিজ্ঞেস করল‚ “কীরে… ওটা কী বলল ও? রেগেমেগে যাচ্ছে কোথায়?”
অভিব্যক্তিহীন শেহনান সেদিকে চেয়েই কয়েক মুহূর্ত পর শীতল গলায় জানাল‚ “জাহান্নামে।”
এবার যেন সবাই-ই অধৈর্য হয়ে উঠল। পরাগ ধমক লাগাল‚ “ফালতু কথা না বলে ক্লিয়ার করে বল।”
পরাগের দিকে ফিরে তাকাল সে‚ “আমি ফালতু কথা বলি কবে থেকে?”
“এখনই তো বললি”‚ হৃদয় বলে উঠল‚ “হচ্ছে কী তোদের মধ্যে?”
জবাবে শেহনান বলল‚ “আমি কোনো ফালতু কথা বলি না৷ যা বলে গেল তাই বললাম। আরও ক্লিয়ার হতে চাইলে ওর কাছে জিজ্ঞেস করে নিস।”

সে যে সত্যিই নিরর্থক কথা বলছে না‚ তা ওর সব সময়ের নির্মল চোখ আর গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখটাই বলে দিল সবাইকে৷ কিন্তু অতি কৌতুহলী হৃদয় তখন উদ্ভট কাণ্ডে মগ্ন। মারিশার কথাটাকে গুগল ট্রান্সলেট করে অর্থটা বের করল সে৷ তারপর জোরে জোরে পড়ে শোনাল‚ “বেনিম জেহেন্নেমিম মানে হলো আমার জাহান্নাম।”
এমন কথা বলা আর অমন রেগেমেগে চলে যাওয়া মারিশার‚ সব মিলিয়ে সবাই বুঝে গেল‚ ওরা দুজন ঝগড়া করছিল! শেহনানও তখন বুঝে গেল‚ এবার সবাই ভাজা মাছ খাওয়ার বদলে প্রশ্ন করে করে ওর মাথাটা ভাজা ভাজা করে খাবে৷ তাই আর দাঁড়াতে চাইল না সে৷ ছাদ খোলা রেস্তোরাঁটার দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ দিব্য ওই সরু পথের দিকে রওনা হলো৷ এতক্ষণও মগজ ঠান্ডায় ছিল শেহনানের৷ কিন্তু এবার সে চকিত হয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় চেঁচিয়ে উঠল‚ “দিব্য…!”
দিব্য পিছু ফিরে তাকাতেই দেখল কটমটিয়ে তাকিয়ে আছে শেহনান। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল দিব্য‚ “কী হয়েছে?”
বড়ো বড়ো কদম ফেলে শেহনান চলে এল ওর কাছে‚ “তুই ওদিকে কই যাচ্ছিস?”
“কোথায় আবার? ওর কাছে…”‚ উদাসীনের মতো উত্তরটা দিয়েই দিব্য আর দাঁড়াল না। দ্রুত নেমে গেল পথটা দিয়ে।

পেছন থেকে তখন বারবার ধমকের স্বরে ডাকতে থাকল শেহনান৷ দিব্য কানও দিল না। হতবুদ্ধি হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল সে। এগিয়ে গিয়ে দিব্যর ঘাড়টা ধরে টেনে আনতে ইচ্ছা হলো ওর। শুধু পরিবেশ আর পরিস্থিতি বিবেচনায় মাথা ঠান্ডা করে ফিরে গেল রেস্তোরাঁর দিকে।
দুটোর এই তামাশাতে হৃদয়‚ পরাগ আর সৌভিক যা বোঝার বুঝে নিল। তাতে হাসিও পেল ওদের‚ আবার চিন্তাও হতে লাগল। অতীতে ওদের বন্ধুদের মাঝে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে‚ আবার সবাই মিলেমিশেও গেছে৷ কিন্তু ঝগড়াটা কখনো নারী বিষয়ে হয়নি। এই প্রথমবারই বোধ হয় ঝামেলাটা হতে চলেছে নারীকেন্দ্রিক।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো‚ এমন দুই বন্ধুর মাঝে হতে চলেছে‚ যারা দুজনই নিজস্বভাবে সম্পূর্ণ।

অর্থবিত্ত‚ বংশমর্যাদা‚ সুদর্শনতা‚ বুদ্ধিমত্তা‚ সাহসিকতা এবং রাগ-জেদ সব দিকেই। যদিও দিব্যর ব্যক্তিত্বটা শেহনানের সামনে ফিকে পড়ে যায়। কারণ‚ দিব্য যতটা বেপরোয়া এবং উগ্র মেজাজী‚ প্রেমের সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়ে তোলাই তার স্বভাব। পক্ষান্তরে‚ শেহনান ততটাই বিবেচক ও ঠান্ডা মেজাজী। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওর সুনাম ভালো না হলেও খারাপও নয়। কোনো এক কারণে আজ অবধি কোনো সম্পর্কই সে এগোতে পারেনি। খোলাখুলিভাবে অপরাগতা স্বীকার করে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে সে। ফলে বহু মেয়েকেই কষ্ট পেতে হয়েছে। কেউ অভিযোগ রাখে‚ কেউ রাখে না। তবে দিব্যর মতো কাউকে বিছানা পর্যন্ত টেনে আনে না—এটাই বড়ো পার্থক্য। এবং সাদৃশ্য হলো‚ দুজনই নারী মন ভাঙে। একজন ঠকিয়ে‚ অন্যজন ক্ষমা চেয়ে। ওদের আরও একটি পার্থক্য‚ শেহনান কিছুটা ত্যাগী স্বভাবেরও। ওর জেদ দিব্যর তুলনায় কম। কেবল মারিশার জন্যে ওকে বারবার বদলে যেতে দেখা যাচ্ছে। যেন মেয়েটাকে আগুনের ছ্যাঁকাও দিচ্ছে‚ আবার সেখানে বরফও দিচ্ছে সে-ই।

রেস্তোরাঁর মূল অংশটি খোলা ছাদযুক্ত। এখানে কোনো নির্দিষ্ট মেনু থাকে না। সাধারণত প্রতিদিন তাজা মাছ যা ধরা হয় তাই রান্না করা হয়। মাছের ঝাল‚ মাছ ভাজা‚ আর সাথে মোমো‚ ডাল-ভাত‚ থুকপা‚ এসবই গরম গরম পরিবেশন করা হয়। এখানে রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে বারের মতো সাজানো কোনো জায়গা নেই৷ বরং সাধারণ মাটির বাড়ি‚ বাঁশ বা টিনের চাল‚ এই দিয়েই রেস্তোরাঁগুলো তৈরি করা হয়েছে। কাঠের টেবিল আর বেতের চেয়ারগুলো এমনভাবে সাজানো যেন নদীর হিমেল হওয়া আর সূর্যের আলো সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। আর সামনেই বয়ে চলেছে ত্রিশূলি নদী। রেস্তোরাঁর ভেতর বসে নদীর দিকে তাকালে পাহাড় আর তার ওপর ভেসে যাওয়া মেঘের দৃশ্য যেন অজানায় হারিয়ে পড়ার অনুভূতি দেয়।

দুটো টেবিল নিয়ে বসল ওরা ছজন। গল্প করতে করতে আর মাছ ভাজা খেতে খেতে সবাই যেখানে চারপাশের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত‚ সেখানে শেহনান খেতে খেতে কপালে ভাঁজ ফেলে চুপচাপ মারিশার পাগলামি দেখতে ব্যস্ত৷ রাক্ষসের মতো খাবারগুলো গিলছে মেয়েটা। মুখের মধ্যে একটার পর একটা মাছ ভাজা আর মোমো পুরছে‚ যেন খেয়ে খেয়েই নিজেকে মেরে ফেলবে‚ এমন পরিকল্পনা করে এসেছে নদীর পার থেকে। অথচ মাথা ঠান্ডা করার জন্য চাঁদিটা ভিজিয়ে এসেছে আচ্ছামতো৷ তাতে কোনো লাভই হয়নি৷ কপালের ওপরে পড়ে থাকা ফ্রিঞ্জি চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে ওর নীরস মুখের ওপর। সেদিকেও কোনো পরোয়া নেই।
ধারচোখে ওকে দেখতে দেখতে মনে মনে শেহনান ভর্ৎসনা করে উঠল‚ “যেই না তেজপাতার মতো এক শরীর! বাতাসেই উড়ে যাওয়ার মতো দশা! সেই শরীরের কোণাতে কোণাতে আবার রাগ ঠাসা। কে দেখছে তার রাগ! ছিটমহল একটা!”

খাওয়ার পর্ব শেষ করে বেলা সাড়ে চারটা নাগাদ ওরা রওনা হলো৷ মলেখু থেকে গাড়ি যখন আবার চলতে শুরু করল‚ তখন ত্রিশূলি নদী এক নতুন রূপ ধারণ করল। তার শান্ত আর স্থির রূপের বদলে এখন সে আরও বেশি চঞ্চল৷ কখনো উত্তাল ঢেউ‚ কখনোবা প্রবল স্রোত। নদীর জল এখানে আরও স্বচ্ছ৷ আর তার ওপর সূর্যের আলো পড়ে এক মোহনীয় উজ্জ্বলতায় চিকচিক করছে। পথের পাশে মাঝে মাঝেই ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝরনা দেখা যাচ্ছিল৷ যার জল সূক্ষ্ম সুতোর মতো পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে আসছে। ঝরনার শব্দেই মন জুড়িয়ে যেতে চায়।
মুগলিন বাজারে এসে তারা বুঝতে পারল‚ এটা এক গুরুত্বপূর্ণ জংশন। এখানকার ব্রিজ থেকে নদীর দৃশ্য আরও বেশি মনোমুগ্ধকর। ব্রিজটি নদীর ওপর দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এটা দুটি ভিন্ন জগৎকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। এখান থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় নদী দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দুটি ভিন্ন দিকে বয়ে চলেছে। এক পাশে পাহাড়ি গ্রাম আর অন্যপাশে সবুজ বন। নদীর এই বাঁক দেখে মারিশার মনে হলো‚ প্রকৃতির এই রূপ যেন ওর জীবনের পথকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে৷ প্রকৃতিতে যেখানে প্রতিটি মোড়ে নতুন এক দিগন্তের সূচনা হয়। সেখানে ওর জীবনের প্রতিটি মোড়ে হয়েছে নতুন এক যন্ত্রণার সূচনা।

সন্ধ্যার ম্লান আলোতেও প্রকৃতি যেন ক্লান্ত হলো না‚ ঝিমিয়ে পড়ল না। মুগলিন পেরিয়ে ডামৌলির পথে যাত্রা শুরু হতেই পরিবেশ সম্পূর্ণ পালটে গেল। রাস্তাটি এখন আর নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছে না৷ বরং পাহাড়ের একেবারে গা ঘেঁষে ওপরে উঠতে শুরু করেছে। একপাশে উঁচু পাহাড়‚ আর অন্যপাশে গভীর খাদ। পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ বন‚ আর তারই মাঝে ফুটে আছে বেগুনি‚ হলুদ‚ আর গোলাপি রঙের বুনো ফুল। বাতাসের তালে তালে সেই ফুলগুলো দুলছে। যেন তারা শেহনানদেরই স্বাগত জানাচ্ছে।
গাড়ি একেবারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলছিল৷ জানালা দিয়ে মারিশা যখন নিচের খাদের দিকে তাকাল‚ নিমিষেই ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। চিন্তা উদয় হলো ওর‚ পাহাড়ে যখন চড়বে‚ তখন কি সামলাতে পারবে নিজেকে? বহুদিন যে পাহাড় চড়া হয় না৷ অথচ এক সময়ে এটাই ওর নেশা ছিল৷ বিষণ্ণ হয়ে ওঠার আগেই নিচে স্রোতস্বিনী নদী আর তার ওপর মেঘে ঢাকা পাহাড় দেখে মনটা ভিজল ওর।

এই অংশে অনেক ছোটো ছোটো গ্রাম আর চা-কফির দোকান। ডামৌলি মূলতঃ এই পাহাড়ি দৃশ্য ও চা–কফির দোকানের জন্য জনপ্রিয়। ওদিকে ফেলে আসা মলেখু হলো মাছের জন্য‚ মুগলিন হলো বাজার এবং জংশনের জন্য জনপ্রিয়।
পথের এই সৌন্দর্য আসলে কেবল চোখে নয়‚ হৃদয়েও অনুভব করা যায়। মার্চ মাসের এই সময়ে পাহাড়ের রূপ যেন সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সবুজের এই গভীরতা আর ফুলের এই রঙের বাহার‚ সবই যেন এক কল্পলোকের গল্প।

পোখরা পৌঁছাতে আরও ঘণ্টাখানিক দেরি৷ রাত বাজে প্রায় আটটা৷ পথের মাঝে আর বমি না হলেও পেট পাকিয়ে আসা ভাবটা সারা পথই ছিল মারিশার। শরীরের ক্লান্তি থেকেই হোক‚ আর পাহাড়ি বাতাসের শীতলতায় হোক‚ বেজায় ঘুম চাপল মারিশার৷ কথার ছলে পেছন ফিরে একবার দিব্য‚ হৃদয় আর সৌভিককে দেখে নিল৷ না‚ হৃদয় ছাড়া আর কারও মাঝেই কোনো ক্লান্তির ছায়া নেই৷ কানে ইয়ারবাড গুঁজে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে থাকা পাশের মহামানবের মাঝে তো আরও নেই৷ কেবল পরাগকেই একটু ঝিমাতে দেখা গেল৷
বড়ো এক হাই তুলে মারিশা হালকা বাঁকা হয়ে বসল শেহনানের দিকে মুখ ফিরিয়ে৷ মাথাটা এক কাৎ করে সিটে রেখে চোখদুটো বুজে ফেলল৷ চোখের কোণ থেকে সবই দেখতে পাচ্ছিল শেহনান। বুঝতে আর বাকি রইল না ওর‚ পাহাড়‚ জঙ্গল চড়ার ক্ষমতা তো দূরে পড়ে থাক‚ সামান্য গাড়ি ভ্রমণের শক্তিটুকুই এ মেয়ের আর নেই। যাক ভালোই‚ শক্তপোক্ত কারণটা দেখিয়ে ঘাড় থেকে বিদায় করা যাবে।

মারিশা ঘুমিয়ে গেছে পুরোদমে। পরাগের সঙ্গে গল্পের মাঝেই শেহনান হঠাৎ ভড়কে গেল। মাথাটা হেলে একদম ওর বুকের দিকে এসে ঠেকেছে মেয়েটার৷ পাশ থেকে পরাগ আর পেছন থেকে বাকি দুই বন্ধু তা দেখতে পেয়ে চাপাস্বরে দুষ্টু দুষ্টু মশকরা শুরু করল। গম্ভীর হয়ে রইল শুধু দিব্য। এমনকি শেহনান নিজেও৷ নির্দয়ের মতো কনুই দিয়ে ঠেলে দিল সে মারিশাকে। একটু বেকায়দাভাবেই রইল তখন মাথাটা। ওভাবেই পড়ে থাকলে ঘাড়টা ব্যথা হবে। তবে তার চেয়ে বেশি সম্ভাবনা মাথাটা আবারও শেহনানের বাহুতে এসে পড়ার। একটু পর হলোও তাই৷ পরাগ তখন বলল‚ “মাথাটা রাখ কাঁধে। এমন অমানবিক আচরণের মানে কী? তবে রিসোর্টে পৌঁছাই‚ তারপর তো তোকে ধরব আমি।”

শেষ কথাটাকে কোনো গুরুত্ব না দিলেও প্রথম কথাটা রাখল শেহনান৷ কিন্তু কাঁধে আর টেনে নিল না৷ বাহুতে যেভাবে ঠেকে রইল মাথাটা‚ সেভাবেই থাকতে দিল৷
শেহনানকে নিয়ে ঠাট্টা‚ মশকরা চলছে। একটা গল্পটা শোনাচ্ছে সৌভিক। গত বছরে স্কটল্যান্ডে হ্রদ‚ পাহাড় আর দুর্গম গ্রাম সফরে বেরিয়েছিল শুধু সে আর শেহনানই৷ পথিমধ্যে সোলো ট্রাভেলার এক চাইনিজ মেয়ে যুক্ত হয়েছিল ওদের সঙ্গে৷ গাড়িতে বসে সে মেয়েটিও নাকি ঘুমের বাহানায় বারবার ঢলে পড়ছিল শেহনানের গায়ে৷ তবে সেবার মানবিকতার খাতিরে শেহনান মেয়েটাকে আগলে নিয়েছিল নিজের বাহুতে। ওকে নিয়ে হাসতে হাসতে পরাগরা বলল‚ ও যেন আজ থেকে ওর কাঁধ আর বুকটাকে ফ্রি সেবামূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ঘোষণা করে দেয় ক্লান্ত থাকা সুন্দরীদের জন্য।

শেহনান তখন নাকচ করে জানাল‚ “কিসের ফ্রি! ঘণ্টা চুক্তি ভাড়া হবে। রিসোর্টে গেস্টরা ভাড়া কমাতে চাওয়া নিয়ে হৃদয়ের মতো কাইজ্জা লাগিয়ে নেব‚ যদি ঘণ্টা প্রতি থাউজেন্ড ডলার না দেয়।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই আচমকা কোমরটা জ্বলে উঠল শেহনানের৷ চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল সাথে সাথেই। কেবল আর্তনাদটুকু বের হতে দিল না মুখ থেকে। ভাগ্যিস ওর মুখের দিকে কেউ চেয়েও নেই! ওর কথা কেন্দ্র করেই সবাই হাসাহাসি আর টিটকারিতে ব্যস্ত। সেই ফাঁকে ব্যথায় দাঁতে দাঁতে চেপে মারিশাকে ধমকে উঠল নিচু কণ্ঠে‚ “কী করলে এটা‚ বেয়াদবের বেয়াদব?” রেগেমেগে তুমিতে নেমে এসেছে‚ তা খেয়ালই করল না ও।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩

রাগে আগুন হয়ে থাকা মারিশা জ্বলন্ত চোখদুটো খুলল তখন। তবে মাথাটা তুলল না। শুধু জবাব দিল ওর কোমরে কঠিন আরেকটা চিমটি কেটে। দু আঙুলে ধরা মাংসটুকু সহজে ছাড়লই না৷ সেখানে জ্বলেপুড়ে জান বেরিয়ে আসার উপক্রম শেহনানের। বিশ্রীরকম চিমটি কাটতে জানে বদমাশ মেয়েটা। আর সহ্য করতে না পেরে তার হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে এমন এক কড়া চাপ দিল‚ মারিশার মনে হলো শুকনো হাতটার হাড্ডি যেন ভেঙেই গেছে তার৷ ব্যথার চোটে সে আর রাখঢাক করার জ্ঞানে রইল না৷ চিৎকার করে উঠল‚ “আ… ব্লাডি হেলিশ…!”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৫